Today 18 Jul 2018
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

অপদার্থ

লিখেছেন: তৌহিদ উল্ল্যাহ শাকিল | তারিখ: ০৮/০৭/২০১৩

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 349বার পড়া হয়েছে।

একাকী পথ চলতে চলতে আমি আজ ক্লান্ত।একসময় অনেক স্বপ্ন দেখতাম।নিজের ইচ্ছেমত ছুটে বেড়াতাম,এখানে সেখানে।আজ আমি রেলের পুলের ধারে এসে বসে থাকি একাকি।এখানে বসেই আমি আমার নিজস্ব জগতের স্বপ্ন বুনতাম। তখন আমার সাথে আরো একজন এসে বসত। এখন কেউ আসে না । ব্রিটিশ আমলের তৈরি পুরানো রেললাইন আজো আছে। দেশ স্বাধীন হয়েছে ,কিন্তু এই রেললাইনের কোন পরিবর্তন ঘটেনি।সেই পুরানো লোহার স্লিপার গুলো আজো আছে। এখনো দেখি মাঝে মাঝে পাথর বোঝাই ট্রেন আসে , এলাকার ছেলে গুলো পরম আনন্দে চলন্ত (ধীর গতির)ট্রেনে লাফিয়ে উঠে ।বাসের ড্রাইভিং হুইলের মত হুইল গুরায়।হুইল ঘুরালে নিচে পাথর পড়ে রেল রাস্তায়। সব ঠিকই আছে শুধু সময় পরিবর্তন হয়ে গেছে। যেখানে একসময় আমি রানা, পিপলু কালাম আরো অনেকে লাফিয়ে উঠতাম। আজ তারা আছে তবে কাছে নেই। একেকজন একেক জনের চাকুরী কাজকর্ম নিয়ে ব্যাস্ত। আমি আজো ব্যাস্ত হতে পারিনি। মা বলে আমি নাকি এখনো জীবনকে চিনতে পারিনি। হয়তো তাই। আসলে আমার স্বপ্ন গুলো যখন মরে যেতে থাকে চৈত্রের দুপুরের কোন গাছের শুকনো পাতার মত,তখন থেকেই আমি কেমন ঘুটিয়ে যাই। আজ অনেকদিন পর হলে ও আমি তা বুঝতে পারি। লেখাপড়ায় আমি নেহায়েত মন্দ ছিলাম না। স্কুল কলেজে ভাল ছাত্র হিসাবে আমার বেশ সুনাম ছিল বলা চলে। একদিন দুঃসময় আসে। সবার জীবনেই দুঃসময় আসে , কারো জীবনের শুরুতে আবার কারো জীবনের মাঝামাঝি। কেউ সেই ঝড়ে উড়ে যায় খড়কুটার মত। কেউ মাটি আঁকড়ে পড়ে থাকে সুপারি গাছের মত। যত ঝড় আসুক সুপারি গাছে নুয়ে পড়ে কিন্তু ভেঙ্গে পড়ে না। আমার সাথের সকলে হয়ত সেই সুপারি গাছের মতই জীবনকে আঁকড়ে ধরেছিল। কিন্তু আমি পারি নি । কেন পারিনি সে প্রশ্নের উত্তর আজো খুঁজিনি। কিন্তু আজ কেন জানি খুঁজতে ইচ্ছে হয়।

আমার স্পষ্ট মনে পড়ে সেই দিনের কথা । যেদিন আমি অনেক আসা নিয়ে বুয়েটে ভর্তি হতে গিয়েছিলাম। মা সকাল বেলা নামাজ পড়ে অনেক দোয়া করেছিল । বাবা পকেটে দুইশত টাকা গুঁজে দিয়ে বলেছিল-

‘যা বাবা, আমার বিশ্বাস তুই পারবি।আমার দোয়া তোর সাথে থাকবে’।

বাবা বোধহয় জানত না শুধু দোয়া থাকলেই কি সব হয়?হয় না!সে কথা আমার চেয়ে আর বেশি কে জানে। ভর্তির লিস্টে আমার নাম ছিল ।সেদিন বুয়েটে গিয়ে কি শুনেছি জানেন?বলতে ইচ্ছে করছে না তবু বলছি।আমার জায়গায় নাকি অন্য এক ছেলে ভর্তি হয়ে গেছে । আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একে একে অনেকের কাছে গেলাম।জানেন তারা কি বলেছে,আমি নাকি ভর্তি পরীক্ষায় সিলেক্ট হয়নি। কি তাজ্জব ব্যাপার। পরে জানলাম আমার জায়গায় অন্য এক বিজনেস ম্যানের ছেলেকে ভর্তি করা হয়েছে। সেজন্য নাকি সেই ভদ্রলোককে অনেক মালপানি খরচ করতে হয়েছিল। আমাকে সেদিন সকলে ফিরিয়ে দিয়েছিল। আমি দরিদ্র বাপের সন্তান। আমার পক্ষে দিনের পর দিন ঢাকায় গিয়ে থাকা সম্ভব ছিল না । আমি ভাগ্যেকে মেনে নিয়েছিলাম। এছাড়া কি করার আছে। আমার মত এমন অনেকে ছেলের ভাগ্যেই এমন হয়।

এরপর ও থেমে থাকিনি।জীবনকে সামনে এগিয়ে নিতে চেয়েছি। কিন্তু সেখানে ও পারি নি। কেন পারি নি সেটা আরেক গল্প।অনেকের হয়ত শুনতে ইচ্ছে হচ্ছে।হবেই তো।আমরা পত্রিকার পাতায় দারিদ্রতা নিয়ে সংবাদ গুলো বেশ রসিয়ে রসিয়ে পড়ি।সেখান থেকে আনন্দের খোরাক জোগাই। অনেকে বলবেন আরে বাবা তোমার এত কথা বলার দরকার কি? আসলেই তো আমার এত কথা বলার কি দরকার। আমি নিজের গল্পটাই বলি। আমি মানিক।তাই বলে কালো মানিকের (পেলের) মত কালো নই । বাবা মা অনেক শখ করে আমার এই নাম রেখেছেন। মানিক মানে রত্ন। আমি তাদের কাছে বোধহয় সেই রকম ছিলাম। এখন মনে হয় তারা আফসোস করেন আমার এই নাম রেখেছেন বলে।

ঢাকায় ভর্তি হতে না পেরে কলেজে অনার্সে ভর্তি হলাম। দিন গুলো বেশ ভালই কাটছিল। সেই সময় একদিন সুমনার সাথে দেখা হয়। সুমনা আর আমি একই ডিপার্টমেন্টে পড়তাম। আমি মেয়েদের এড়িয়ে চললে ও সুমনাকে এড়িয়ে চলতে পারিনি। পাশাপাশি পথ চলতে চলতে একসময় অনুভব করতে শুরু করলাম সুমনাকে আমি ভালবাসি। সুমনা ও আমাকে ভালোবাসে কিন্তু কেউ কাউকে বলিনি। এভাবে দিনগুলো বেশ চলছিল। একদিন কলেজের মাঠে বসে বাদাম খাচ্ছিলাম সুমনা পাশেই ছিল। আমি একটি করে বাদামের খোসা ছাড়িয়ে দিচ্ছি সুমনা একটি করে খাচ্ছে। উহ!কি সময় ছিল সেটা।হুট করে সুমনা বলে উঠল

‘তুমি আমায় ভালবাস’।

আমি কি বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম

‘তোমার কি মনে হয়’।

‘আমি কি করে বলব, আমি তোমাকে ভালবাসি।আমি বলেছি,তুমি আমাকে ভালো নাও বাসতে পার আবার ভালবাসতে ও পার।আর সে কারনে তোমার মত জানতে চেয়েছি’।

অনেকদিন ধরে যে কথা বলব বলে অনেক প্রস্তুতি নিয়েছি, সেদিন সুযোগ পেয়ে ও আমি অনেক সময় নিয়ে বলেছিলাম

‘হা আমি তোমায় ভালবাসি সুমনা’।

সুমনা আমার হাত চেপে ধরে বলল

‘চল , তাহলে আমাকে এখনি বিয়ে করতে হবে’?

আমি ভাবলাম সুমনা ঠাট্টা করছে । কিন্তু কিছুক্ষণ পর বুঝলাম সুমনা ঠাট্টা করছে না।সে খুব সিরিয়াস।আমি শুধু বললাম

‘এভাবে কি করে তোমাকে এখন বিয়ে করব’।

‘আমি সব ব্যাবস্থা করব’,সুমনা বলে উঠল।

আমার দুইজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু আর সুমনার কিছু বান্ধবী মিলে একটা বাসায় আমাদের বিয়ে হয়ে গেল কাজী ডেকে এনে। আমার তখনো বিশ্বাস হচ্ছিল না। সুমনার বান্ধবীর বাসা ছিল সেটা। সেদিন রাতে আমাদের ফুলশয্যার ব্যাবস্থা ও সেখানে হয়েছিল। সকলে আমাদের বিবাহ জীবন সুখী হতে দোয়া করে চলে গেল। সেদিন রাতে আমি আমার জীবনের সবচেয়ে মধুর রাত কাটালাম। রাতের সুখের আবেশে আমার ঘুম ভাঙতে একটু বেলা হয়ে গিয়েছিল। ঘুম থেকে উঠে দেখি সুমনা আমার জন্য চা করে নিয়ে এসেছে। আমাকে চা দিতে গিয়ে সুমনা মাথা ঘুরে পড়ে গেল। আমি সুমনাকে উঠিয়ে তার চোখে মুখে পানি দেই।সুমনার জ্ঞান ফিরে আসে। এরপর সে বমি করতে শুরু করে। আমি ভাবি হঠাৎ ওর এমন হল কেন। বললাম ডাক্তারের কাছে যাবে। সে বলল

‘না,এমন কিছু হয়নি।শরীরটা দুর্বল লাগছে তাই হয়ত এমন হয়েছে।তুমি অযাথা চিন্তা করোনা’।

আমি কি করব বুঝতে পারছিলাম না। এদিকে বাড়ি যেতে হবে। সুমনাকে এই অবস্থায় ফেলে যেতে ইচ্ছে করছিল না। তবু ও সুমনাকে বললাম

‘আমি বাড়ি যাই,রাতে আবার আসব।এখুনি আমাদের বিয়ের কথা বাড়িতে জানাতে চাই না’।

বাড়ি এসে পড়ার টেবিলে বসে বসে সুমনার কথা ভাবছি। এই সময় পাশের বাড়ির স্বপন ভাইয়ের বউ এসে বলল

‘কি হয়েছে মানিক ভাই।গতকাল কোথায় ছিলেন সাথি কে পড়াতে আসেননি যে’।

‘ভাবি আমি এক বন্ধুর বাড়িতে ছিলাম,তাই আসতে পারিনি।আজ পড়াতে যাব’।

ভাবি আমার সাথে কথা বলার সময় হঠাৎ করে বাইরে বেরিয়ে বমি করতে লাগল।আমার ছোট বোন সায়লা দৌড়ে এসে ভাবীকে ধরল। আমি ও ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম,কি হয়েছে দেখার জন্য?সায়লা ভাবীর কানে কি যেন বলল, ভাবীকে দেখলাম মাথা ঝাকাতে।এরপর সায়লা আমাকে বলল

‘এই ভাইয়া তুই কি দেখছিস, এসব মেয়েলি ব্যাপার তোর না দেখলে ও চলবে’।

আমার হঠাৎ করে সুমনার কথা মনে হল। আমি সায়লাকে ঘরে ডাকলাম।ভাবীর কি হয়েছে জানতে চাইলাম।প্রথমে সায়লা বলতে চাইল না। কিন্তু আমার পীড়াপীড়িতে বলল ভাবী মা হতে যাচ্ছে। আমার মাথা ভনভন করে ঘুরতে লাগল। আমি আর কোন কথা না বলে সুমনার বান্ধবীর বাসার দিকে ছুটলাম।তখন ও জানতাম না আমার জন্য কি অপেক্ষা করছে।

সুমনার বান্ধবীর বাসায় এসে দেখি সুমনা একটি ছেলের সাথে গল্প করছে। আমাকে দেখে বলল

‘কি ব্যাপার সাহেবের যে তর সইছে না।এই না মাত্র বাড়ি গেলে আবার চলে এলে।এসো পরিচয় করিয়ে দেই আমার কাজিন রায়হান’।

আমি সৌজন্য মূলক হাত বাড়িয়ে দেই করমর্দনের জন্য। সুমনার কাজিন আমার সাথে হাত না মিলিয়ে সুমনাকে বলে

‘আমি আসছি,পরে আবার দেখা হবে বলে চলে গেল’।

আমি সুমনাকে তার শরীর কেমন আছি জিগ্যেস করি,সুমনা বলে ভাল আছি। আমি সুমনাকে বেরুতে বলি।সুমনা রাজি হয়। দুইজনে বেরিয়ে ক্যাম্পাসে আসি। সেখান থেকে আমি সুমনাকে এক প্রকার জোর করে আমার এক পরিচিত মহিলা ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই। তিনি সুমনাকে পরীক্ষা করে আমাকে যা বললেন,তাতে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। ডাক্তার বলছে সুমনা দুই মাসের প্র্যাগনেন্ট । আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। সুমনা কিছু বলছে না । আমি তাকে জোরাজুরি করতে লাগলাম। একসময় সুমনা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল এবং আমাকে বলতে লাগল।

সুমনার কাজিন নাকি তার এই অবস্থার জন্য দায়ী।সেটা নাকি এক রাতের দুর্ঘটনা ছিল।সুমনা নাকি আমাকেই ভালোবাসে আর কাউকে নয়।  কিন্তু সে তাকে বিয়ে করতে রাজি হচ্ছিল না। আর কোন পথ না দেখে সুমনা আমাকে বেছে নিয়েছে। আমাকে ব্যাবহার করেছে। আমি সেখান থেকে বেরিয়ে আসি। আর কোনদিন সুমনার মুখ দেখব না বলে স্থির করি। কিন্তু আমি সে কথা রাখতে পারিনি।

আমি বাড়িতে ফিরে এলে সুমনা আর বাসায় ফেরেনি। সে আমাকে ঠকিয়েছে এটা সে বুঝতে পেরেছে। আর সে কারনে চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজেকে শেষ করে দিয়েছে। সুমনার আত্নহত্যার খবর পেয়ে আমি ছুটে গিয়েছিলাম তাকে দেখতে। আমার সকল বন্ধু সুমনার সাথে আমার বিয়ের ব্যাপারটা চেপে যায়। নয়তো আমার উপর সব দোষ এসে পড়ত। কিন্তু সুমনাকে আমি ভুলতে পারিনি আবার ক্ষমা ও করতে পারিনি। আস্তে আস্তে আমি লেখাপড়া বন্ধ করে দেই। আমি যেখানেই যাই সুমনার আত্না আমার সামনে এসে দাঁড়ায়। আমাকে বলে

‘তুমি আমাকে বাঁচাতে পারলে না মানিক, তুমি আমাকে বাঁচাতে পারলে না’।

লেখাপড়া  বন্ধ করে দেওয়ার পর বাড়িতে  আমাকে আর কেউ দেখতে পারে না আমার মা এখন শয্যা নিয়েছে। তার ডায়বেটিস ধরা পরেছে।বাবা এখনো মাঠে গরু নিয়ে যায়। ধান চাষ করে । বাড়িতে এটা সেটা চাষ করে বিক্রি করে । তা দিয়ে কোনমতে টেনেহিঁচড়ে সংসার চালায়। সংসারের প্রতি আমার দায়িত্ববোধ জেগে উঠেনা। আমি আসলে অপদার্থ হয়ে গেছি।

দুইটা প্রাইভেট পড়াই , তাও অনিয়মিত।যে কয়টাকা পাই তা দিয়ে সিগারেটের পয়সা হয়ে যায়। সুমনা মারা যাবার পর থেকে সিগারেট আমার পরম বন্ধু হয়ে গেছে।

 

ছোট বোন সায়লাকে দেখতে এসেছে। তার বিয়ের বয়স পার হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু চালচুলাহীন পরিবারের সাথে কেউ আত্নীয়তা জুড়তে চায় না। সকলে কনে দেখতে এসে প্রথমে জিগ্যেস করে কনের ভাই কি করে? আমার কথা শুনে তখন তাদের কথাবার্তা আর বেশি এগোয় না। বাবা আমাকে তখন অনেক গালিগালাজ করে। বাবা বলে

‘ধামড়া ছেলে বাড়িতে বসে বসে থাকিস কিছু করতে পারিস না, তোর জন্য আমার মেয়েটার ও বিয়ে হবে না।তুই মর’।

আমি অনেকবার বাবার কথা শুনে মরতে চেয়েছি কিন্তু পারিনি। আসলে আমি একটা আস্ত ভীতুর ডিম। তা না হলে কেউ কি এমন হয়।

এবারের সম্বন্ধটা বেশ ভাল । ছেলে পক্ষ একটি মোটর সাইকেল দাবী করেছে। আমার বাবার সেই সাধ্য নেই।বাবাকে এই নিয়ে বেশ আপসোস করতে দেখলাম। এসব দেখে আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না । ভাবলাম বোনের বিয়েটা অন্তত দিতে হবে । সে যেভাবেই হোক।

ছেলের বাড়িতে গেলাম। আমি গোপনে ছেলের পক্ষকে কথা দিয়েছি তাদের কে মোটর সাইকেল কিনে দেব। কিন্তু বাবাকে না জানাতে বলেছি।  আমার কথা শুনে ছেলের বাবা আর কিছু বলেনি। বিয়ের জন্য রাজী হয়েছেন ।

গতকাল দেখেছি বাবা তার হালের বলদ দুইটি বিক্রি করার জন্য এক বেপারীকে বাড়িতে ডেকে এনেছে। মেয়ের বিয়ের জন্য টাকা জোগাতে  । আজ আমাকে একবার গরু বেপারীর বাড়িতে যেতে হবে। তার সাথে কিছু কথা বলার প্রয়োজন আছে।

ট্রেনের শব্দ শুনা যাচ্ছে। সাগরিকা এক্সপ্রেস আসছে। মানুষের জীবনটা কি ট্রেনের মত। আবোল তাবোল কি ভাবছি। আমাকে একবার আমার বন্ধু সাগরের কাছে যেতে হবে। সাগর এখন বড় ডাক্তার ।তার ব্যাবসা এখন রমরমা।সাগরেরই বা কি দোষ, দেশে যেভাবে ব্যাঙের ছাতার মত হাসপাতাল হচ্ছে। সেই সব হাসপাতালে কতটুকু স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হয় তা আমার জানা নেই।

সেদিন একটা বিশেষ কারনে সাগরের হাসপাতালে যেতে হয়েছিল।সেদিন দেখেছিলাম, এগুলো তো স্বাস্থ্য সেবার জন্য খোলা প্রাইভেট ক্লিনিক নয়, একেকটা যেন আস্ত কসাইখানা। আমার মত লোক এসব কথা বলার আসলে কোন অধিকার নেই। তারপর মাথার মধ্যে এসব জিনিস ঘোরপাক খায়। আসলে আমি নিজেকে যতটা অপদার্থ মনে করি আসলে ততটা অপদার্থ আমি নই।

আমার কথা শুনে সাগর প্রথমে না করলে ও পরে ব্যাবসায়িক স্বার্থে ঠিকই রাজী হয়েছে। আমি ও জেনে শুনেই এই কাজটা করছি। আসলে আমি তো অপদার্থ। আর অপদার্থ যারা তারাই তো এমন কাজ করবে। আমার বোনের বিয়ে হবে , বাবার হালের বলদ গুলো বিক্রি হবে না। আমার মায়ের একটু চিকিৎসা হবে। সংসারে কয়দিন হাসিখুশি আসবে। এইতো অনেক। আমার মত দারিদ্র শ্রেণীর পরিবারে হাসিখুশির উপলক্ষ তেমন একটা আসে না। তাই সকলে মুখে হাসি ফুটাবার সামান্যতম দায়িত্ব আমার কি নেওয়া উচিৎ নয়? আমি জানি অনেকে আমাকে নানা কথা বলবে তাতে কি আসে যায়।

ব্যাপারটা নিয়ে সাগরের সাথে আজ ফাইনাল সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। রেলের এই পুলটা আমার ভীষণ প্রিয়। কেন জানি এখানে এসে বসলে আমি অতীত কে রোমন্থন করি। রেলের পুলের নিচ দিয়ে বেশ ক্ষীণ ধারায় পানি বয়ে যাচ্ছে। সেই পানির মাঝে মুক্তভাবে ছুটে চলছে কিছু মাছ একেবারে স্বাধীন ভাবে।ঈশ!আমাদের মানে আমার জীবনটা যদি এমনি হত? দক্ষিণা বাতাস শরীর কে জুড়িয়ে দেয়। না এখন উঠতে হবে। প্রথমে বাড়ি যাব , এরপর হাসপাতালে সাগরের কাছে। সাগর সেইদিন বিশ হাজার টাকা দিয়েছিল, সেখান থেকে সায়লাকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছি। বলেছি তোর ইচ্ছেমত কিছু কেনে নিস। সায়লা টাকা পেয়ে কেঁদেদিয়েছে। সায়লার বিয়ের দিন আমাকে থাকতে মানা করে দিয়েছে বাবা। আমাকে দেখে শেষমেষ বিয়েটা যদি ভেঙ্গে যায়। সেইদিনকেই আমি বেঁচে নিয়েছি। আজ কনে পক্ষকে মোটর সাইকেল কেনার  টাকাটা দিয়ে দেব। বেপারিকে ও টাকাটা দিয়ে দেব। সে যেন গরু গুলোকে বিয়ের পর ফিরিয়ে দেয়।

আজ সকালে খুব তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে গেলাম। কিছুক্ষণ পর বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। আজ সায়লার বিয়ে। কলাগাছ দিয়ে বেশ সুন্দর একটা গেট বানিয়েছি আমি গত রাত্রিতে। ছোট বোনের বিয়েতে বড় ভাই কি কখনো গেট সাজায়। চার কোনায় চারটি কলাগাছ পুঁতে তার উপর বাঁশের ছাঁটাই দিয়েছি। সেই ছাটাইয়ের উপর রঙ্গিন কাগজ দিয়ে অনেক রকম নকশা বানিয়েছি। সায়লা এখনো ঘুমাচ্ছে। তার চোখে মুখে মিষ্টি একটা হাসি লেগে আছে। চুলগুলো ছড়িয়ে আছে সারা বালিশময়। অনেক সুন্দর লাগছে সায়লাকে। আসলে আজকের মত এত মমতা নিয়ে সায়লার দিকে কখনো তাকাইনি আমি। মায়ের রুমে গেলাম। মা বসে বসে তাজবী গুনছে। ইচ্ছে হল মায়ের পাশে গিয়ে বসি। না অনেকদিনের পুরানো অভ্যাস এত সহজে বদলে  ফেলা ঠিক নয় । মাকে আরেকবার দেখার ইচ্ছে হল। না আর দেখব না। বাবা বারান্দায় বসে কয়লা দিয়ে দাত মাজছে । বাবার সামনে দিয়ে যাব না। বাবা হয়ত রেগে যাবে। কি দরকার যাবার সময় বাবাকে রাগিয়ে দেওয়ার। ভাবীর কাছে যেতে হবে ভাবী বোধহয় ঘুমাচ্ছে। বাড়ির পেছনের দিক দিয়ে বের হয়ে ভাবীদের বাড়িতে আসলাম। ভাবী হাঁস মুরগীকে খাবার দিচ্ছে। ভাবীকে বললাম

‘ভাবী এদিকে আস , তোমার সাথে কথা আছে’।

ভাবী এগিয়ে এল। আমি তার হাতে একটি চিঠি দিয়ে বললাম

‘সায়ালার বিয়ে হয়ে গেলে তুমি বিকালে চিঠিটা বাবাকে পড়ে শুনাবে’।

ভাবী বলে উঠল

‘কি আছে এতে’।

‘তেমন কিছু না , আপনার কাছে এইটুকু অনুরোধ’।

আর বেশি কিছু না বলে আমি রাস্তার দিকে পা বাড়ালাম।আমার কেমন যেন করছে। সুমনা যেন আমায় ডাকছে। আমি হাঁটতে লাগলাম হাসপাতালের পথের দিকে।

কিছুক্ষণ পর সায়লার বিয়ে হবে।এতক্ষণে বর পক্ষ এসে গিয়েছে বোধহয়য়। সাগর আমার সামনে আসছে না। আসবে কি করে হাজার হলেও বন্ধু তো।কিছুক্ষণ পর আমার অপারেশন হবে। আপনাদের এবার বলেই ফেলি।আমি আমার কিডনি বিক্রি করে দিয়েছি।আমার কাছে আর কিছু ছিল না , যা দিয়ে আমি আমার সংসারকে সুখী করতে পারব। তাই নিতান্তই বাধ্য হয়ে আমাকে এই কাজটা করতেই হল।

আমি শেষ বার আমার বন্ধু সাগরকে দেখতে চাইলাম। সাগর আমার সামনে এল।আমি বললাম

‘তোকে বন্ধু বলে পরিচয় দিলে তোর হয়ত সন্মানে লাগতে পারে তবু একসাথে পড়তাম একসময় আমরা , সেই কারনে বলছি আমার যদি কিছু হয়ে যায় তুই আমার পরিবারের সকলকে বলিস আমাকে ক্ষমা করে দিতে’।

সাগরকে কেমন যেন আনমনা মনে হল। সে আমার হাতে হাত রাখল। তারপর নার্স কে ডেকে ওটি তে নিয়ে যেতে বলল। কালো মতন একটা ওষুধ সিরিঞ্জে পুরে আমাকে ইনজেকশন দেওয়া হল। আমার মাথা কেমন যেন ফাঁকা আর শুন্য মনে হতে লাগল। সারা পৃথিবী কেমন যেন হলুদ আলোয় ছেয়ে যেতে লাগল। আমার মনে হল আমি যেন সেই আলোর মাঝ দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছি। এরপর হলুদ রঙটা কেমন যেন ঘোলাটে হয়ে গেল । আর আমার চারপাশ গভীর আঁধারে ডুবে যেতে লাগল। আমি জ্ঞান হারালাম।

পুনশ্চঃ

আজ হাসপাতালের ম্যানেজার হিসাবে আমার  প্রথম দিন। সাগর আমাকে চাকুরীটা দিয়েছে। সাগর আমাকে মরতে দেয়নি। সে আমাকে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে রেখেছিল পুরো চব্বিশ ঘন্টা। হয়ত কোন এক মমতা কিংবা একসময়ের সহপাঠী কিংবা বন্ধু ভেবে। আমার কিডনি সে বিক্রি করতে পারেনি। আমার বোনের বিয়ের সকল খরচ সে আমাকে ধার হিসাবে দিয়েছে । আমি চাকুরী করে আস্তে আস্তে সব শোধ করে দেব। সায়লা তার স্বামীকে নিয়ে এসেছে আমার চাকুরী দেখতে । শায়লাকে বেশ হাসি মুখে দেখছি। সাগর তখন হাসি মুখ নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। সাদা পাঞ্জাবী পড়ে আমার বাবা আমাকে নিয়ে আমার চেয়ারে বসিয়ে দিল। আমার চিঠি পড়ে বাবা নাকি অনেক কেঁদেছিল সেদিন ।

আমার জীবনটা হয়ত উপরের অংশটুকুর মতই হতে পারত। কিন্তু আসলে তা নয়। অপারেশন করার সময় ভুল করায় আমার প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। সাগর তখন আমাকে বাঁচিয়ে রাখার বদলে আমার বাকি কিডনিটা ও খুলে ফেলে। অপারেশন থিয়েটারেই আমার মৃত্য হয়। সাদা কাপনের নিচে আমি ঠিক দেখতে পাচ্ছি আমার বাবা আমার জন্য কাঁদছে। আসলে আমি যে একটা অপদার্থ । অপদার্থ না হলে কেউ কি বাপকে এমন করে কাঁদায়। সাগর তখন পুলিশি ঝামেলা এড়াতে আমার স্বাক্ষর করা কাগজটা সকলকে দেখাচ্ছে।আমার শব মিছিল তখন কবরস্থানের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। আমি পৃথিবীকে একবার দেখতে চাইলাম। কিন্তু একরাশ কালো অন্ধকার আমার চোখ দুটোকে ডেকে রেখেছে।

 

৪৪১ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
সময় বয়ে যায়।আমি ও বেড়ে উঠি . নিশ্চিত জীবনের পথ খুঁজে ফিরি কিন্তু অস্থির অবস্থা সে পথ ভুলিয়ে দেয়।কোলাহল ব্যাস্ততা ছেড়ে মনের আনন্দে লিখি।যশ খ্যাতি এসবের পেছনে কখনো ছুটে চলিনি আর চলতে ও চাই না ।কেমন লিখি জানি না । কারো কাছে ভালো লাগলে খুশি হব। touhidullah82@gmail.com
সর্বমোট পোস্ট: ১৯ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ৪৪ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৬-০২ ০২:৩৯:৪২ মিনিটে
banner

৭ টি মন্তব্য

  1. এ হুসাইন মিন্টু মন্তব্যে বলেছেন:

    অনেক লম্বা গল্প, জীবন চিত্র ফুঁটে ওঠেছে

  2. এ হুসাইন মিন্টু মন্তব্যে বলেছেন:

    বিশেষ করে বেকারত্ব ও দারিদ্রতা

  3. শাহরিয়ার সজিব মন্তব্যে বলেছেন:

    খুবই প্রয়োজনীয় লিখা ।

  4. আরিফুর রহমান মন্তব্যে বলেছেন:

    কিছু শিখনীয় গল্প।

  5. আমির হোসেন মন্তব্যে বলেছেন:

    গল্পে জীবনের চিত্র ফুটে উঠে।

  6. শাহ্‌ আলম শেখ শান্ত মন্তব্যে বলেছেন:

    আপনাকে এখন মিস করি ।
    চলন্তিকায় দেখিনা যে ?

  7. সবুজ আহমেদ কক্স মন্তব্যে বলেছেন:

    সুন্দর জীবন চিত্র ফুঠিয়ে তুলতে চেয়ে ছেন অনেকাংশে সফল ও বলা চলে

    শুভ কামনা

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top