Today 20 Jan 2020
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

অপমান

লিখেছেন: ওয়াহিদ মামুন | তারিখ: ০১/১২/২০১৩

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 890বার পড়া হয়েছে।

আমাদের গ্রামে হাই স্কুলের একজন শিক্ষক ভাড়া থাকেন। তার পরিবারটি খুব সংস্কৃতিমনা। তার মেজ মেয়ে নিলু ইন্টারমিডিয়েটে পড়ে। একুশে ফেব্রুয়ারীতে শিশিরসিক্ত ভোরবেলায় খালি পায়ে সে যখন শহীদ মিনারে ফুল দিতে যায় তখন তাকে ফুলের মতই নির্মল মনে হয়।

আমার বন্ধু মাসুদ নিলুকে ভালোবাসে। উঠতে, বসতে তাকে নিয়ে কল্পনা করে আর জীবনানন্দের কবিতা আবৃত্তি করে, “ঐখানে যেওনাকো তুমি বলোনাকো কথা ঐ যুবকের সাথে, ফিরে এসো সুরঞ্জনা, ফিরে এসো এই মাঠে, ঢেউয়ে, ফিরে এসো হৃদয়ে আমার – – -”।

নিলুর কলেজে যাওয়া আসার পথে তাকে এক নজর দেখার আশায় অধীর আগ্রহে চেয়ে থাকে। বিকেলে তাদের বাড়ির আশেপাশে ঘুর ঘুর করে তার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য।

নিলুদের বাসার মালিকের বাড়িতে হাফিজ নামে এক ছেলে কাজ করে। তার মাধ্যমে নিলুকে ভালোবাসার কথা জানানোর সিদ্ধান্ত নেয় মাসুদ।

সে বিভিন্ন উপন্যাস ঘেঁটে প্রেমের ডায়ালগ সংগ্রহ করে নিজের মত করে চিঠি লেখে। তারপর হাফিজকে দোকানে নিয়ে কিছু খাইয়ে তাকে আগে খুশী করে। এরপর চিঠিটা দেয় নিলুকে দেওয়ার জন্য।

চিঠিটা হাফিজ নিলুর হাতে দিয়েছে এটা নিশ্চিত হওয়ার পর দুশ্চিন্তা করতে থাকে যে সে কি তার ভালোবাসা গ্রহণ করবে? নাকি প্রত্যাখ্যান করবে? তাকে নিয়ে যে স্বপ্ন সে দেখেছে তা কি ভেঙ্গে যাবে?

ইতিবাচক ফলাফল পাওয়ার আশায় অপেক্ষা করতে থাকে। কিন্তু অপেক্ষার প্রহর যেন শেষ হতে চায় না। কয়েকদিন কেটে যাওয়ার পরও কোনকিছু না জানতে পেরে সে আরও অস্থির হয়ে পরে।

একদিন সন্ধ্যায় মাসুদ বাইরে থেকে বাড়িতে ফেরার সময় নিলুকে ও তার ছোট বোনকে ওদেরই বাড়ির দিক থেকে আসতে দেখে কৌতূহলী হয়ে ওঠে। কোথায় গিয়েছিল নিলু?

বাড়িতে গিয়ে কান খাড়া করে এ ঘর থেকে ও ঘরে যায় নিলুর ব্যাপারে কেউ কোন কিছু আলোচনা করে কিনা তা শোনার জন্য। এক সময় তার ছোট বোন কথাচ্ছলে বলে যে তাদের বাড়িতে নিলুরা বেড়াতে এসেছিল। এ কথা শুনে আনন্দে মনটা নেচে ওঠে। চিঠি পাওয়ার পর তাদের বাড়িতে নিলুর আসা মানে তো তার প্রস্তাব গ্রহণ করা!

সেদিন রাতে তারাতারি খাওয়া শেষ করে গান চালিয়ে দেয়। বাজতে থাকে, ‘ফুলের কানে ভ্রমর এসে চুপি চুপি বলে যায়’। আর সে বিছানায় শুয়ে নিলুর কথা ভাবে।

পরদিন সে তাদের নিজেদের ক্ষেত থেকে একা রোদের মধ্যে মটরশুঁটি তুলতে থাকে। ওর বাবা মাঠের মধ্যে বেড়াতে গেলে ওকে প্রশ্ন করে জানতে চান ও করছে। ও আমতা আমতা করতে থাকে। ওর বাবা অন্যদিকে চলে গেলে মটরশুঁটি তোলা শেষ করে। তারপর তরমুজ তুলে হাফিজকে দেয় নিলুকে দেওয়ার জন্য। এ সবই সে করে নিলুকে খুশী করার জন্য।

এরপর কয়েকটা উপন্যাস ও পারফিউম পাঠিয়ে দেয়। পছন্দের গানও সিডি করে পাঠায়।

এভাবেই চলছিল দিন। মফস্বল এলাকায় সকলেই সকলের কাছে পরিচিত। একটা মেয়ের সাথে একটা ছেলের কথা বলা খুব একটা সহজ নয়। তাই নিলুর সাথে অনেক কথা বলতে ইচ্ছা জাগলেও তা হয়ে ওঠে না। তবুও তার উপহার নিলু যে গ্রহণ করছে এবং সে তার সুন্দর পায়ের স্পর্শ তাদের বাড়িতে দিয়ে গেছে সে কথা ভাবতেই প্রশান্তিতে মনটা ভরে ওঠে।

মাসুদের ছোট ভাই ঢাকায় তার বড় ভাইয়ের বাসা থেকে বেড়িয়ে এসে একরাতে বাড়ির সবাইকে জানায় যে মাসুদ চাকরী কিম্বা কোন ব্যবসা-বানিজ্যে ঢুকলে তাকে বিয়ে করাবে বলেছে।

এ কথা শুনে মাসুদের দুশ্চিন্তা শুরু হয়ে যায়। সে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেছে নিলুকে নিয়ে। কিন্তু পরিবার থেকে যদি অন্য কোন মেয়েকে বিয়ে করিয়ে দেয় তবে তো তার এতদিনের স্বপ্নটা খান খান হয়ে ভেঙ্গে যাবে। এ সব ভেবে রাতে ভালো ঘুম হয় না।

ভোরে ঘুম থেকে উঠতেই রাতের কথা তার মনে পড়ে যায়।

মনে হয় যা করার তারাতারি করতে হবে। তা না হলে নিলুকে সে হারাবে।

এক প্রকার হিতাহিত জ্ঞানশূন্য অবস্থায় সেই ভোরবেলাতে নিলুদের বাসায় গিয়ে হাজির হয়। নিলুর বাবাকে জানায় যে সে নিলুকে ভালোবাসে, নিলুও তাকে ভালোবাসে এবং সে নিলুকে বিয়ে করতে চায়। নিলুর শিক্ষক পিতা ঐ মুহূর্তে কিছু না বলে বাড়ির ভিতর চলে যান। মাসুদ বাড়ি ফিরে আসে।

সকাল এগারোটার দিকে নিলুর বাবা মাসুদের বাড়ি এসে তার বাবাকে অপমান করেন।

মাসুদের বাবা এলাকার একজন নামকরা লোক। অগাধ জমি-জমা আছে তার। এলাকায় তিনি একজন সম্মানীয় ব্যক্তি। মাসুদের কারণে তাকে অপমানিত হওয়ায় মাসুদকে তিনি অনেক তিরস্কার করেন।

মাসুদ সবকিছু অনুধাবন করতে পারে। নিলুকে সে ভালোবাসলেও নিলু তাকে ভালোবাসেনি। তার চেয়ে বয়সে ছোট নিলু তার ভালোবাসা নিয়ে শুধুই মজা করেছে। লজ্জায়, অপমানে সারাদিন সে ঘর থেকে বের হয় না।

অপমানিত মুখ নিয়ে গ্রামের রাস্তায় সকলের মধ্য দিয়ে চলাফেরা করাটা তার কাছে খুব কঠিন বলে মনে হয়।

বাড়ির সকলের নিষেধ সত্ত্বেও আহত হৃদয় নিয়ে সে গ্রামেই আর থাকবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয়। তাই ভোর হবার সাথে সাথে প্রয়োজনীয় দু’চারটা কাপড় চোপড় নিয়ে ঢাকায় বড় ভাইয়ের বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। ভাবে সেখানে থেকে চাকরী খুঁজবে। চাকরী পেলে নিজের মতো করে আলাদা জায়গায় থাকবে।

বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে গাড়ির কাউন্টারে টিকেট কেনার জন্য টাকা দিচ্ছিল এমন সময় একটা হাতের বাধা পেয়েই ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল পাশে নিলু দাঁড়িয়ে আছে।
মাসুদ বললো, কি ব্যাপার?
নিলু বললো, কোথায় যাচ্ছেন আপনি?
মাসুদ বললো, কোথায় যাচ্ছি তা তোমাকে বলতে আমি বাধ্য নই।
নিলু বললো, কিন্তু বললে সমস্যাও তো নেই।
মাসুদ বললো, ঢাকা যাচ্ছি।

এরপর নিলু মাসুদকে মার্কেটের ভিতরে নিরিবিলি জায়গায় নিয়ে গিয়ে মুচকি হেসে বললো, আপনি যে ঢাকা যাচ্ছেন তা তো আমি জানিই।

মাসুদ বললো, কিভাবে জানলে?
নিলু বললো, পরে বলবো। কিন্তু আজ না গেলে হয় না?
নিলুর বাবার অপমানের কথা মাসুদের মনে পড়ে যায়। সে বললো, তুমি আমাকে কেন এসব কথা বলছো তা আমি বুঝতে পারছি না।
এই বলে সে পা বাড়াতে উদ্যত হলো। নিলু তার বাহু ধরে তাকে থামালো। তারপর বললো, আমার বাবার সাথে আপনি যেভাবে কথা বলেছেন তাতে তিনি তো ক্ষেপে যেতেই পারেন। তিনি ওটাকে আপনার পাগলামি মনে করেছেন কিন্তু আমি জানি যে আপনি আমাকে খুব ভালোবাসেন বলে ও রকম করেছেন।

মাসুদ অবাক হয়ে নিলুর দিকে তাকালো। বললো, কিন্তু তুমি কিছু করলে না কেন?

নিলু বললো, আমি তো করতামই। কিন্তু আপনিই তো তাড়াহুড়ো করে ঝামেলাটা বাধিয়ে ফেললেন। আপনি মাথা গরম না করে অপেক্ষা করুন প্লিজ।
নিজের বোকামীর জন্য মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে হলো মাসুদের।
নিলুর দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। সকালের শুভ্রতায়, অগোছালো চুলে ওকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। যার জন্য মাসুদ বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছিল তার কাছ থেকে অমন কথা শুনে মাসুদের আবেগ উথলে ওঠে।

কাঁপা কাঁপা কন্ঠে মাসুদ বললো, তার মানে তুমি আমাকে – – –
নিলু লজ্জায় মুখ লুকিয়ে বললো, এখন ওসব কথা থাক। আমাকে তাড়াতাড়ি বাসায় যেতে হবে। আপনিও বাড়ি যান প্লিজ।

নিলুকে রিক্সায় তুলে দিয়ে মাসুদ বাড়ির পথে হাঁটতে শুরু করলো। সকালের কোমল বাতাসে হেঁটে যেতে যেতে আগেরদিন রাতেও যে গ্রামটাতে থাকতে গায়ে জ্বালা করছিল সেই গ্রামটাকেই তখন মনে হচ্ছিল চরম এক শান্তির জায়গা।

৯৭২ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
বাড়ি পাবনা জেলায়। বর্তমানে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) কর্মরত। মানুষের মানুষ থাকা ও মানুষ হয়ে ওঠার জন্য পড়াটাই বোধ করি সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন। তাই আমি বই পড়া ভালোবাসি।
সর্বমোট পোস্ট: ৩৫ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ২৮৬ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৬-১৮ ০৪:১২:৫১ মিনিটে
banner

১০ টি মন্তব্য

  1. শাহ্‌ আলম শেখ শান্ত মন্তব্যে বলেছেন:

    আপনার গল্প বরাবরই সুন্দর হয় ।

  2. এস এম আব্দুর রহমান মন্তব্যে বলেছেন:

    আপনার গলাপটি ভাল লাগল । শুভ কামনা । ভাল থাকুন ।

  3. আরজু মন্তব্যে বলেছেন:

    চমৎকার লাগল আপনার গল্প।এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেললাম।
    ধন্যবাদ আপনাকে।

  4. আমির হোসেন মন্তব্যে বলেছেন:

    অপমান সহ্য হল না্

  5. ওয়াহিদ উদ্দিন মন্তব্যে বলেছেন:

    ধন্যবাদ।

  6. সহিদুল ইসলাম মন্তব্যে বলেছেন:

    ওয়াহিদ উদ্দিন ভাই দারুন লাগলো আপনার লেখা। ভালো থাকুন।

  7. ওয়াহিদ উদ্দিন মন্তব্যে বলেছেন:

    অশেষ ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top