Today 21 Sep 2019
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

আমার দেখা পৃথিবী

লিখেছেন: আযাহা সুলতান | তারিখ: ২১/০৮/২০১৩

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 781বার পড়া হয়েছে।

॥৭॥

একদিন কয়েকজন বন্ধু মিলে চেপে ধরল, আল-আইন নামক শহরটা দেখতে যাবে। সেখানের চিড়িয়াখানাটা নাকি আমিরাতের একটা বড় চিড়িয়াখানা। আরও কিছু দেখার মতো স্থান আছে যা পর্যটকদের বিশেষ আকর্ষণের।

আমি বললাম, ঠিক আছে তবে আমি গাড়ি চালাতে পারব না। কারণ আমি কয়েক ঘণ্টা একটানা ড্রাইভিং করতে পারি না, আমার ঘুম আসে।

তারা খুশি হয়ে বলল, কোনো চিন্তা নেই…

 

বন্ধুদের মধ্যে অনেকে ড্রাইভার। কারও কারও নিজস্ব গাড়িটারিও আছে। তবে দূরে কোথাও যেতে হলে বন্ধুরা সব সময় আমাকেই কেন চেপে বসে জানি না! জিজ্ঞেস করলে কেউ কেউ বলে, নিরানন্দ লোকের ভ্রমণ মানে মধুনগরের নাম পানসে। এর বেশি উপমা যদি দিতে হয়–কানার সঙ্গে বোবার বাস। গাড়ির আসনানুযায়ী পাঁচ জন চললাম। মাদাম নামক একটা জায়গা অতিক্রম করে কিছুদূর এলেই বিরাট মরুভূমি। এ মরুভূমির উপর দিয়ে চলে গেছে বিভিন্ন শহরের একটিমাত্র রাস্তা। এখান থেকে শুরু হয়েছে মরুঝড়। একেবারে রাস্তাটির মাঝামাঝি এলেই হঠাৎ আমাদের গাড়ির স্টার্ট বন্ধ হয়ে যায়! চালক বন্ধুকে বললাম, বনিট্‌‌ খুলে দেখ্‌‌ ত জামিল কী হয়েছে। আমি ব্যস্ত ছিলাম একটা গান লিখাতে। জামিল দেখে এসে বলল, অরে রাখ তোর কবিগিরি; সর্বনাশ যে ঘটেছে সেই খবর আছে কি।

সর্বনাশ! সকলে তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে নামলাম–দেখলাম, ইঞ্জিনের মোবিলকর্ক গায়েব! অয়েল অনেকটা ছিটকে পড়ে ইঞ্জিনের বারটা থেকে তেরটা বেজেছে। ধুলোবালিতে ইঞ্জিন-এরিয়্যা উইঢিবি। পড়লাম মহাবিপদে। সুনসান ভূমি, জনবিহীন রাস্তা। যেদিকে দেখি ধূধূ মরু ছাড়া কিছুই নজরে আসছে না। এমন সময় একটি কারগাড়ি আমাদের গাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল! গাড়ি থেকে এক আরবি ভদ্রলোক নেমে এল। গাড়িতে বসে আছে এক অপূর্বা–নিশ্চয় ওঁর স্ত্রী। রীতিমতো বেড়েই চলছে সাইমুম–হাওয়া বেগতিক। ভদ্রলোক এক হাতে তাঁর মাথার পাগড়ি চেপে অন্য হাতে আমাদের সবার সঙ্গে হ্যান্ডশেক্‌‌ করল এবং শুভাশুভ জানল। লুহাওয়া এমনভাবে বইছে একেবারে তুফানবেগ বলা যায়। মাথার সম্পূর্ণ চুল উড়ে যাওয়ার আশঙ্কা যেখানে সেখানে পাগড়ির কথা বলা বাহুল্য। আমাদের চুলের চেয়ে ওঁদের পাগড়ির অনেক দাম। ভদ্রলোক : আমার খুব তাড়া আছে নাহয় তোমাদেরকে টু-রোপ করে গ্যারেজ পর্যন্ত নিয়ে দিতাম বলে খুব দুঃখপ্রকাশ করল। যাই হোক, এমন মরুসাইমুমে সুন্দরী স্ত্রী রেখে গাড়ি থেকে নেমে কোনো ভদ্রলোকের সান্ত্বনাই আমাদের জন্যে যথেষ্ট। এখানের বেশির ভাগ মানুষের মধ্যে এমন উদারতা দেখা যায়। তারা কারও উপকার করতে পারল না কমপক্ষে দুঃখপ্রকাশ হলেও করবে। তবে কোনো আরবি ইনশাল্লাহ্‌ বললে মনে করতে হবে, সেটা ইহজনমে আর কার্যকর হওয়ার নয়। ভদ্রলোক বলে গেল, সামনে পাঁচ-ছয় কিলোমিটারের মাথায় কিছু দোকানপাট আছে, সেখানে হয়তো কোনো ওয়ার্কশপটুয়ার্কশপ পাওয়া যেতে পারে। তবে শুক্রবার বিধায় খোলা আছে কিনা সন্দেহ। আমরাও সন্দিহান, কারণ এদেশে শুক্রবার সবকিছু বন্ধ থাকে। দেখা যাক তবে বরাতে কী আছে। চার জন মিলে গাড়ি ঠেলছি। জামিল মাঝে মাঝে দরজা খুলে বলছে, আরেকটু জোরে…আরেকটু জোরে…এভাবে ঠেলতে থাকলে দুপুর গড়িয়ে বিকাল হতে বেশিক্ষণ লাগবে না। আর বিকালমাত্র সন্ধ্যা। তা হলে মনে কর রাতের ঘুম বালির বিছানায়। তখন এ ধূধূ মরুভূমিতে তক্ষকের মতো বাতাস খাওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় থাকবে না।

 

গাড়ি ঠেলতে কোনো অভিজ্ঞতার দরকার আছে বলে মনে হয় না। তবে গায়ের জোর থাকা খুবই দরকার মনে করি। গাড়িমালিকদের এ-ই এক ভাগ্যের পরিহাস, গাড়ি সব সময় মনিবের বাহক হলেও মনিবও কখনো হতে হয় তার ঠেলক। আর এটা খুব মজার ব্যাপারও বটে। যেই মালিক জীবনে কখনো গাড়ি ঠেলতে হয় নি, সে এমন অনাবিল সৌন্দর্যের এক আনন্দ থেকে বঞ্চিত মনে করি। বলা যায়, গাড়ি ঠেলাতে আবার কেমন আনন্দ! ওই যে নিরানন্দের ভ্রমণ যেমন। এতক্ষণে আমরা এক কিলোমিটারের কিছু বেশি বোধ হয় ঠেলে নিতে পেরেছি। জামিল রাগ করে নেমে এল–ব্যঙ্গ করে বলল, মহাশয়রা, আপনারা এবার গাড়িতে আসনগ্রহণ করতে পারেন; আমি একাই ঠেলতে পারি কিনা দেখি। এটা অস্বাভাবিক হলেও সত্য, জামিল আমাদের বন্ধুদের মধ্যে খুবই বলিষ্ঠ। তাকে দেখে বাঙ্গালি ঠাওর করা মুশকিলই নয় একেবারে অসম্ভব। সাড়ে ছয় ফুটের এমন বলিষ্ঠ দেহ থাকলে যে কেউ পাহাড় ঠেলতে পারে। জামিল প্রায় তিন কিলোমিটারের মতো একাই ঠেলে নিয়েছে। আমি অন্য বন্ধুদেরকে বলি, এটা আমাদের ন্যায় হচ্ছে না। একজন কামাই করবে বাকিরা তার কাঁধের উপর বসে খাবে, এটা যেমন ন্যায্যকথা নয়, তেমনি একজনের ঘাড়ে চেপে পথচলা মোটেও সভ্যখাতে পড়ে না। জামিলের অভিমানকে আমরা সম্মান করা চাই। অন্য একজন বন্ধু হেসে বলল, কষ্টের কথা বলতে হলে আমাদের হয়েছে, জামিলের ভাগে যা পড়েছে অনেকটা ঢালু…

আমি বললাম, যতই ঢালু হোক তবু সে একা, এটা আমরা অস্বীকার করতে পারি না। বাকি পথ জামিলের সঙ্গে তারাও ঠেলেছে। ভদ্রলোকের কথা ঠিক, সব কটি দোকানই বন্ধ। একমাত্র চায়ের দোকান ছাড়া। সেখানে ঢুকে দেখি বাংলাদেশি মালিক। ধুলোবালিতে আমরা নাস্তানাবুদ–ভূতের চেয়ে কম নই। আমাদের হালত দেখে দোকানে উপস্থিত সকলে অবাক। বললাম, ভাই, বিপদে পড়েছি–গাড়ি নষ্ট আর মাথা নষ্ট একসমান। প্রায় পাঁচ-ছয় কিলোমিটার ঠেলে এনেছি। গ্যারেজ পাব কই? দোকানিজন বলল, আগে হাতমুখ ধুয়ে আপনারা চা-পানি খান। সেই ব্যবস্থা হবে। আশ্বাস পেয়ে আমাদের মন সজীবতায় ফিরে এল।

 

ওর পাশের দোকানটা একটা অয়েলচেঞ্জের দোকান। তিনি আমাদের সঙ্গে এলেন, ওই দোকানের কাউকে ডেকে দিবে। দেখি দরজার এক পার্ট খুলে দুজন ইরানি ভদ্রলোক ভিতরে বসে চিনির এক দলা মুখে পুরে লাল চা খাচ্ছে আর সিগ্যারেটের ধোঁয়া ফুঁকছে। আমাদের আপদের কথা শুনে ভদ্রলোকের মুখে মায়াকান্নার সুর! ছুটির দোহাই টেনে বলল, আমি বেশিজোর মোবিলগুলো চেঞ্জ করে দিতে পারি। তবে…

আমরা বললাম, সে ত আমরা জানি। আপনাকে চিন্তা করতে হবে না ভাই, যত টাকাই বলবেন দিতে প্রস্তুত আছি তবে দোয়া করুন গাড়িটা যাতে ঠিক হয়ে যায়। ভদ্রলোক দেখি সাহায্যের নামে স্বার্থ হাসিলের চেষ্টায় আছে। একটু রাগতস্বরে বলছে, বললামনা ভাই আমি কোনো মেকানিক নই। তার কথা শুনে জামিল খুব রেগে যেতে চাচ্ছে, আমি অনুরোধকণ্ঠে বললাম, জামিল, রাগ করার সময় এটা নয়। ভদ্রলোককে মিনতিগলায় বললাম, জানি দাদা আপনি মেকানিক নন্‌‌, তবে ইঞ্জিনের কি যে অবস্থা আপনি ত নিজেই দেখতে পাচ্ছেন; একটু হাওয়াটাওয়া উড়িয়ে দিলে এমন কোনো ক্ষতি হবে না আপনার। কার্বেটরটা একটু ধুলোবালি পরিষ্কার হলে সম্ভবত স্টার্টটা নিতে পারে। আপনার বাড়তি কাজের সার্চটা অবশ্য পে করব। এবার লোকটা বোধহয় বেশ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিনব ফন্দি এঁটেছেন, আসলে আমার একটি জায়গায় যাওয়ার তাড়া ছিল, তবে কারও বিপদে সারা না দেওয়াটা ইনসানিয়তের পরিপন্থী। গাড়িতে বিশেষ কিছু কাজ আছে তার আগে প্ল্যাগ-পয়েন্ট সবগুলো চেঞ্জ করে দেখব কি? তারপর নাহয় কার্বেটরটা খুললাম, এটুকুতে নিশ্চয় চালুটা হবে। তার জন্যে…

জামিল বলল, ওগুলো আজকেই বদলি করা হয়েছে মিস্টার। অত ঝামেলায় যেতে হবে না। আর আপনি বললেন, আপনি কোনো মেকানিক নন্‌—তা হলে? এগুলো ত একজন মেকানিকের কাজ।

লোকটা বলল, মেকানিক নই ওটা বলেছি ঠিক তবে কিছু কিছু জানি না একথা ত বলি নি।

জামিল বলল, ওটা ত আমরাও বলছি–আপনি কিছু কিছু ত জানেন।

আমি জামিলকে বাধা দিয়ে বললাম, তোর মনে হয় বালুচরে ঘুমানোর অভ্যাস আছে…

আমাদের অন্যান্য বন্ধুদের মধ্যে একজন তার দোষ দেখিয়ে বলল, জামিল যেখানে-সেখানে পেঁচাল করার আদি–সুযোগে কে না চায় লাভ করতে? মানুষের মধ্যে নাকি ঈশ্বরের বাস, মানুষ ত আর ঈশ্বর নয়। বেটা যদি এখন তোর পেঁচালে নাকরে দেয়, তা হলে তুই তাকে জোর করে করাতে পারবি? গাধা কোথাকার। জামিল আর পেঁচাল না করে চেয়ার টেনে চুপচাপ বসে পড়ল।

 

লোকটা আগে কম্প্রেসরের হাওয়া মেরে ইঞ্জিন চকচকে করল। তারপর অয়েল-ফিল্টার সবকিছু বদলি করল। কোনো কিছুই কাজে আসছে না, সব চেষ্টাই ব্যর্থ। আমরা আল্লানাম জপছি–পিছে দুই শ কিলোমিটারের মতো পথ আর সামনে এক শ কিবা দেড় শর মতো। মানুষ বিপদে পড়লে আল্লাকে ডাকতে ডাকতে কণ্ঠ শুকিয়ে ফেলে : উদ্ধার হলে–আল্লা কোথায় কে জানে। আমাদের দশাও আজ কণ্ঠ শুকানোর মতো। ভাগ্য ভাল, ইঞ্জিনের ঢাকনাটা পাওয়া গেল স্যাচিছের উপরে! কিছুটা ভেঙে গেছে তবু কার্যক্ষমতা ঠিক আছে। আমি জামিলকে বললাম, এবার প্ল্যাগ-পয়েন্টটা খুলে একটু পরিষ্কার করে দেখ ত জামিল, খোদার কৃপা হলে হয়তো কাজ হতে পারে। নতুন হলেওবা দোষ থাকবে না এমন কথা হয় না। আশ্চর্য–প্ল্যাগ-পয়েন্ট পরিষ্কার করে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্টার্ট! দোষ কোথায়, আর আমরা অযথা হয়রান হলাম কোথায়! তখন মনে করলাম, প্রত্যেক চালককে মেকানিকের বেশকিছু অভিজ্ঞতা আয়ত্তে রাখা একান্ত জরুরি।

চলবে…

৮৮৬ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
সর্বমোট পোস্ট: ৩৭ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ১০৩ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৫-২৯ ২২:০৪:১৮ মিনিটে
banner

১৪ টি মন্তব্য

  1. এ টি এম মোস্তফা কামাল মন্তব্যে বলেছেন:

    পরের পর্ব পড়ার অপেক্ষায় রইলাম।
    ভালো লাগলো আপনার লেখার ভঙ্গি।

  2. আমির হোসেন মন্তব্যে বলেছেন:

    আপনার ধারাবাহিক ভ্রমণ কাহিনী নিয়মিত পড়ছি।

  3. এ হুসাইন মিন্টু মন্তব্যে বলেছেন:

    পড়ছি, এবং আরো পড়ার আশায় রইলাম।

  4. আরিফুর রহমান মন্তব্যে বলেছেন:

    পড়ছি খুব ভাল লাগছে।

  5. এম, এ, কাশেম মন্তব্যে বলেছেন:

    খুব ভাল লেগেছে

  6. ঘাস ফড়িং মন্তব্যে বলেছেন:

    আমাৱো যেতে ইচ্ছে কৱে নদীটিৱ ঐ পাড়ে

  7. ঘাস ফড়িং মন্তব্যে বলেছেন:

    সোনাৱগাঁও প্ৰাচিন ঐতিহ্যেৱ এক অভয় আৱন্য কেন্দ্ৰ

  8. ঘাস ফড়িং মন্তব্যে বলেছেন:

    কথিত আছে ইশা খাঁ এৱ বউ সোনা বিবিৱ নামে এই যায়গাৱ নামকৱন কৱা হয় সোনা বিবি

  9. ঘাস ফড়িং মন্তব্যে বলেছেন:

    তাছাৱা সোঁনাৱ গাঁও নিয়ে আছে নানান ৱুপ কথা আৱ কিবদন্দি

  10. ঘাস ফড়িং মন্তব্যে বলেছেন:

    পর্যটক ৱা এখানে এসে কেবল তাৱ সুন্দর্য ই উপভোগ কৱেন না বৱং তাৱা এইসব দর্শধ ও কৱেন

  11. ঘাস ফড়িং মন্তব্যে বলেছেন:

    আৱ তাই বলছি কম আৱ বেশ সকলেৱ ই উচিত ওসব জায়গা পৱিদর্শন কৱাৱ জন্যে

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top