Today 22 Sep 2020
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

আমার দেখা পৃথিবী

লিখেছেন: আযাহা সুলতান | তারিখ: ৩০/০৬/২০১৩

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 959বার পড়া হয়েছে।

॥৪॥

একদিন চেঙ্গিসদের বাড়ি বেড়াতে এলাম। ছোটবেলায় এভাবে প্রায়ই আসা হত। চেঙ্গিসের বন্ধুত্বটা সেকালে খুবই অম্লমধুর ছিল। অম্লমধুর এজন্যে, কখনোবা দুজনেতে ঝগড়াঝাটি হলেও বন্ধুত্বতে এতটুকু ভাটা পড়ত না। ভাল হোক বা মন্দ দুয়ে মিলে এমন কোনো কাজ করা হয় নি তখন যা শয়তানকেও হার মানায়। তাদের বাড়ির অদূরে যোগীদের একটা মস্ত পুকুর ছিল, নাম ছিল তালপুকুর। তবে এখন আছে কিনা জানি না। কারণ, আজ থেকে বত্রিশ বছর আগেকার ধারণ করা স্মৃতি বত্রিশ বছর পরে অবিকল আছে বলেও বর্ণনা করতে পারি না। ক্রমান্বয়ে মানুষের যেমন রূপ পাল্টে যায় তদ্রূপ যুগেযুগে যুগেরও অনেক পরিবর্তন ঘটে যায়। পুকুরের আশেপাশে কোনো বাড়িঘর নেই। একেবারে নির্জন-নিরালা বলা যায়। এবং রাত্রিকালে জিনপরী ও ভূতপ্রেত্নীর অবাধ মেলামিশাও নাকি এপুকুরপাড়ে অনেকে দেখেছে। আমাদের তখন এব্যাপারে অগাধ বিশ্বাসও ছিল। কারণ বয়স্করা অনেককে ভয় দেখাতে দেখেছি, সন্ধ্যার পর থেকে ওই পুকুরের ধারেকাছে যেন না যাওয়া হয়। সন্ধ্যার পর পর সেখানে জিনভূতের আড্ডা বসে। তবে এ জিনভূতে কাউকে ক্ষতি করেছে বলে কেউ প্রমাণ দিতে পারে না। এ অলীক কথার সিলসিলা বোধহয় আদিপুরুষ থেকে চলে আসছে। ফলের গাছগাছালিতে ভরপুর এ পুকুরটার অসাধারণ এক মাধুর্য দেখেছি। বায়ুকোণে আকাশছোঁয়া একটি তালগাছ, হয়তো এ গাছটার জন্যেই পুকুরটার নামকরণ। দিনের বেলায়ও তবে এপুকুরপাড়ে আসা অনেকে ভাল মনে করে না। কারণ জিনপরীদের পাকার বাতাস অশুভ হয়। চেঙ্গিস আর আমি ত সেসময় পারলে জিনের কাছ থেকে কোনো পরীবালাকে ছিনিয়ে আনি, এমন মনোবলও আমাদের ছিল। জ্যৈষ্ঠদুপুর–কাঁঠালগাছে হেলান দিয়ে আমি বাঁশি বাজাচ্ছি। বাঁশিতে তেমন একটা সুর দিতে পারছি না, কারণ তখন বাঁশি বাজানোটা মাত্র হাতেকড়ি। চেঙ্গিস জামগাছের শিকড়ে বসে ডাং চাঁচ্ছে। বেলা প্রায় দুইটা হতে চলেছে কিবা হয়েছে। আমাকে ডেকে বলল, অরে অই বেসুরা বংশীবাদক, তোর বাঁশির কানপাকাসুর থামা। পরীরা শুনলে মাথায় মুতবে। জীবনে ত পরী দেখা দূরে থাক পরীর ঠেংও দেখবি না। চল, দৃশ্যত পরী দেখি গে, রেণুকা দিকে একটু জ্বালাই গে…

 

রেণুকা আপা তাদের চাচাতবোন সম্পর্ক বাড়ির অন্যতমা। সেও কিন্তু পরীর চেয়ে কম না। যেমন রূপ তেমন গঠন। বাড়ির জনশূন্য পিছে পাটিবনের ধারে কোদাল দিয়ে মাটি কোপাচ্চে। বয়স বলতে গেলে, চেঙ্গিসের চেয়ে মাস-দুয়েকের বড় হতে পারে। সেজন্যে চেঙ্গিস তাকে বুবু বলে ঠিক কিন্তু সুযোগ পেলে তার দুর্যোগের ঘণ্টা বাজাতে একপল দেরি করবে না। এমনই বদমাশের গুরু সে। আজকের মতলব কিন্তু বিদ্রূপ…

 

এসে জিজ্ঞেস করল, বুবু কী করিস?

রেণুকা আপা বলল, শিমের চারা লাগাচ্ছি ভাই। তবে এমন ভরদুপুরে ঝিঁঝিঁ পোকার মতো কেবল ঘুরাঘুরি! ঘুমুতে পারস-না?

চেঙ্গিস বলল, কি করব বুবু, ঘুম যে আসে না।

রেণুকা বলল, আসবে কোথা থেকে, দুপুরে যখন সবাই ঘুমাবে তখন ত তোদের আবার মহৎকাজ শুরু–কারও খেতের শসা ছিড়ে খাওয়া, নাহয় তালপুকুরের আম-জাম-আতা চুরি। তোরা কবে যে ভাই ভাল হবি জানি না। এভাবে কিছুক্ষণ এ-আলাপ ও-আলাপ চলছে। চেঙ্গিস কথার ফাঁকে একবার বলছে, বুবু কিছু দে। আবার সুযোগমতো বলছে, বুবু কিছু দে।

রেণুকা বারবার জানতে চাচ্ছে, কী দিতাম–আমার কাছে কী আছে… …যখন বুঝার অবকাশ রয় না তার তখন কুত্তার কুত্তা বলে কোদাল নিয়ে পিছু ছুটে। চেঙ্গিস ‘ধা রে ধা’ বলে ঝড়ের বেগে ছুটে : আমি তার পিছু পিছু–একদৌড়ে দুজন রূপন কাওয়ালের আমবাগানে এসে প্রাণ বাঁচাই।

 

এ নিয়ে পরের দিন তাদের বাড়িতে বিরাট এক হাঙ্গামার সৃষ্টি। পুরো বাড়ির লোকজন দুদলে বিভক্ত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র নির্মাণ করবে এ পরিস্থিতিতে পৌঁছে যায়! মুরব্বিরা শালিসি বসে পরিস্থিতি শান্ত করে–চেঙ্গিসকে কান ধরে এক শবার উঠাবসা করতে হবে এবং রেণুকার পায়ে ধরে মাফ চাইতে হবে। আমি তার সহযোগী আমাকে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে যতক্ষণ-না তার উঠাবসা শেষ না হয়। বিরোধীজনদের কেউ কেউ বলছে, হারামিটাকে জুতাপিটা করে জুতার মালা পরিয়ে আস্ত গ্রামে ঘুরাও তারপর শিক্ষা হবে বদমাশের। আমি কান ধরে দাঁড়ালেও দুঃখ নেই বরং মনে মনে হাসছি, কারণ এ জানোয়ারটা যে জনমের শিক্ষা পাচ্ছে তাতে খুব খুশি। তার জ্বালাতন কখনো কখনো অসহ্য লাগে। কথায় কথায় পাছায় মারে লাথি। একটু ব্যতিক্রম হলেই ভূতসওয়ার–সবকিছু ভেঙেচুরে চুরমার। আমি মনে মনে মুরব্বিদের উপর চটে বলছি, কলার বিচার জান তোমরা। জুতাপিটা কি, মুখ কালা করে জুতার পাহাড় পরিয়ে সাত গ্রাম ঘুরালেও কিচ্ছু হবে না হারামির। বোকাদের দল, বিচার কীভাবে করবে তাও জান না, আমার কাছে পুছ–গুয়ের হাঁড়ি মাথায় ঢেলে মান্দারের কাঁটাডাল দিয়ে পিটাও তারপর গাধায় বসিয়ে সারা গ্রাম ঘুরাও তবু সাজা কম। খোদার দোহাইও মানবে না জানোয়ার, এখন বুঝুক–কত ধানে কত চাল।

 

বেচারা চেঙ্গিস, অপমানে দুদিন ঘর থেকে বের হয় না। রাগে-দুঃখে আমাকে বলছে, দেখিস, রেণুকার রক্ষা নাই। তার মুখ যদি কালা করতে না পারি তবে আমার নামের উপর মুতিস।

আমি বললাম, নামের উপর মুতলে কী হবে?

সে বলল, কী হবে মানে?

বললাম, মানে, তোর নামে কি আর মুতের দুর্গন্ধ ছড়াবে।

সে বলল, তা হলে আমার মাথায় মুতলে ভাল–না? অরে, ঐ ভালমানুষ, তোর ইঙ্গিত কি আমি একটুও বুঝি না মনে করস? খুব বুঝি। এমুহূর্তে তোর মন কী বলছে সেটাও পাকা বলতে পারি। আর হামদরদি মারাতে হবে না।

আমি একটু রাগ দেখিয়ে বললাম, দোষ তোর, আবার উল্টো রাগও মারাস! মনে রাখিস, ক্ষতি করা খুব সহজ কিন্তু ভাল করা খুব কঠিন। তবে কারও ক্ষতি করার আগে দশবার চিন্তা করিস কাজটা কেমন এবং পরিণতি কী। এটা কোনো শাস্তি হল! এ শাস্তির উপর ত তোকে সন্তুষ্ট থাকা চাই।

সে বলল, তবে তুই চাস আমার মাথা কেটে কুকুরকে খাবাক? জুতার মালা পরিয়ে গেরামে গেরামে ঘুরাক? তোর মতলবটা কী? এটা কোনো শাস্তি হয় নি–না?

আমি বললাম, দেখ্‌‌, তুই খামকা বাড়াবাড়ি করিস। হামেশা তিলকে তাল করিস। এটা তোর জন্মের বদভ্যাস। এ অভ্যাস কখনো ছুটার নয়। যা তোর যেমন ইচ্ছে কর গে, আমি তোর সাথে আর নেই।

 

চেঙ্গিস কিন্তু মনের দিক দিয়ে খুব একটা খারাপ না, বন্ধুদের সহযোগিতা থাকলে আকাশকে মাটিতে নামাতে পারে কিন্তু কারও সাড়া না পেলে আকাশ ত দূরের কথা, মাটিতে চলতেও অক্ষম! একথা আগেও একবার উল্লেখ করেছি।

 

বেশ কিছুদিন কেটে গেল। আরেকদিন শুনলাম রেণুকা আপার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। তবে তা জানার কয়েকদিনপর চেঙ্গিসেরও পত্র পাই। সে আমাকে লিখে, রেণুকা জাহান্নামির বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। তোকে শিগ্‌‌গির আসতে হবে। তবে বিয়ের নেমন্ত্রণে নয়; আমাদের একটা প্ল্যান আছে, ওটাতে তোর সহযোগিতা পাব না জানি এবং তার আশাও করি না। তবে তোকে দেখাতে চাই, অপমানের আগুন কীভাবে পোড়াতে পারে। তার চিঠির ভাষা দেখে আমি বিমূঢ়! তাড়াতাড়ি ছুটে আসলাম। এসে দেখি দলবল ভারী। ফন্দি যা এঁটেছে জঘন্য। কোনেক রাত্রে রেণুকা দিকে কোনো অজুহাতে একবার ঘর থেকে বের করতে পারলেই হয়। আমি ঘোর আপত্তি জানালাম–বললাম, এটা জঘন্যতম অপরাধ। এ অপরাধকে কেউ মাফ করবে না। তোদের ফাঁসি হবে। কারও এমন অনিষ্ট করে পার পাওয়া যায় না, সুখ পাওয়া ত দূরের কথা। তোদের ধারণা ভুল। তোরা পৃথিবীকে যত সহজ মনে করিস, আসলে পৃথিবী তত সহজ না। আঘাতের প্রতিশোধ নিয়ে হয়তো সামান্য সুখ পাওয়া যায় কিন্তু চিরসুখী হওয়া যায় না। অন্যের ঘরে আগুন দিলে মনে করিস নিশ্চিত নিজের ঘর জ্বলছে…

 

তবু দুঃখের শেষ নেই : সেদিন সর্বনাশের হাত থেকে একজন রেণুকা দিকে বাঁচিয়েছিলেম ঠিক কিন্তু নিষ্ঠুর পৃথিবীর হাজার অসহায় রেণুকা দিকে বাঁচাতে পারলাম না–দুঃখ এখানে।

চলবে…

১,০৫১ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
সর্বমোট পোস্ট: ৩৭ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ১০৩ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৫-২৯ ২২:০৪:১৮ মিনিটে
banner

৬ টি মন্তব্য

  1. কাউছার আলম মন্তব্যে বলেছেন:

    সুন্দর ভ্রমণ কাহিনী

  2. আরিফুর রহমান মন্তব্যে বলেছেন:

    ভ্রমণ কাহিনী খুব ভাল লাগল।

  3. এম, এ, কাশেম মন্তব্যে বলেছেন:

    চলতে থাক
    অনেক ভাল লাগা
    সাথে আছি……………।

  4. তুষার আহসান মন্তব্যে বলেছেন:

    এই পর্বটি পড়ে ভাল লাগল।

    ধন্যবাদ।

  5. শাহ্‌ আলম শেখ শান্ত মন্তব্যে বলেছেন:

    এ পর্ব ভাল লেগেছে ।

  6. সবুজ আহমেদ কক্স মন্তব্যে বলেছেন:

    পর্ব টা বেশ চমৎকার লাগলো পড়ে

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top