Today 18 Nov 2017
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

আমিরাতে দুই হাজার বছর

লিখেছেন: আযাহা সুলতান | তারিখ: ০৭/০৮/২০১৪

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 449বার পড়া হয়েছে।

আমিরাতে দুই হাজার বছর কথাটা শুধু চিন্তার বিষয়ই নয়, পৃথিবীর সকল মানুষকে অবাক করে দেওয়ার মতো একটি কথা। এটা কোনো গল্পকারের রূপকথা নয়, না কোনো ইতিহাসের ঐতিহাসিক ঘটনাবলী, না কোনো অলৌকিককাহিনী। এটি একটি বাস্তবচিত্র এবং যথার্থ সত্যঘটনা। আমিরাতে এসে জানতে পারি, প্রবাসীদের অন্তিমদশা! যারা ছোটখাটো ব্যবসাবাণিজ্য করছে তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে! যেখান থেকে তারা এক পাও নড়তে পারছে না! যা রোজগার করছে, বছর শেষে সরকারি ফি–এ-ফি ও-ফি কর-ফি দিতে দিতে রীতিমতো জীবনটা তাদের অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে! না পারে পালাতে, না পারে ফেলে যেতে। বলা বাহুল্য, প্রবাসের চেয়ে নির্বাসন ভাল।

 

‘আমিরাতে দুই হাজার বছর’ কথাটার রহস্য পরে জানা যাবে। এখানে আমরা অনেকের কথা বাদ দিয়ে একজনমাত্র অসহায়ের কথা প্রচার করতে চাই, যেজন ছত্রিশ বছর বিদেশ খেটে নিঃস্বই রয়ে গেছে! ঊনিশ শ ছিয়াশি সালের কথা, সতের বছর বয়সের অতি গরিবপরিবারের এক নিরুপায় কিশোর সচ্ছল জীবনের আশায় জমিজমা যা ছিল সব বিক্রি করে আমিরাত নামক দেশটিতে আগমন করে। কারণ অভাব মোচন করতে তখন বিদেশকেই অনেকে একমাত্র অবলম্বন বলে মনে করছে। তাই স্বদেশ ও মা-বাবা ভাইবোনের মায়া ত্যাগ করে পরদেশকেই তারা আপন করে নিতে দেখা যাচ্ছে। তবে বিদেশ এসে অনেকেই যে অভাবমোচন করতে পারে নি এ কথাও নয়। সকলের বিবেকবুদ্ধি যেমন এক হয় না তদ্রূপ সকলের ভাগ্যলিখনও একই কলমে লিখা হয় না। বিধাতা ’হও’ বললে সব হয়ে যায় কিন্তু সব ত আর একই ধাঁচে হয় না, তেমন মানুষের ভাগ্যলিপিও বোধহয় ভিন্ন ভিন্ন কলমে লিখা হয়? বিচারক ফাঁসি দেওয়ার পর যেমন কলমের নিপ ভেঙে ফেলে, কুল মখলুকাতের মালিক স্রষ্টাও বোধহয় এক-একজনের জীবনবৃতান্ত লিখার পর কলমটি ভেঙে ফেলে? নাহয় এক-এক মানুষের ভাগ্যকরোটি এক-এক রকম হয় কেন? যাই হোক, যেকথা আজীবন গোপন আছে সেকথা আজীবন গোপনই থাকুক। যার কথা নিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু তার কথাই বলে যাই, যেই বয়সে একজন কিশোর বন্ধুবান্ধব নিয়ে হৈহল্লায় ও খেলাধুলায় মেতে দিন কাটার কথা, সেই বয়সে তাকে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস ও বছরের পর বছর হাড়ভাঙা খাটুনি করে যুগের পর যুগ কাটাতে হয় পরদেশে! এটাই অনেক প্রবাসীর নিয়তি।

 

জিন্দেগি খুব ছোট কিন্তু জিন্দেগির আশা-আকাঙ্ক্ষা অনেক বড়। একজন মানুষের জিন্দেগি শেষ হয়ে যায় তবু স্বপ্নদেখা বা ইচ্ছের শেষ হয় না। মানুষ শেষমুহূর্ত পর্যন্ত কামনার দাস। তাই এ বালকও এমনই স্বপ্নের সুখপাখির শিকারে বাইর হয়েছিল একদিন। এপাখির খুঁজে ছুটতে ছুটতে জীবনমাঠের শেষসীমায় চলে আসে তবু সেই পাখির দেখা মিলে না! তবু আশায় থাকে : আজ নাহয় কাল অথবা–দিন যায় মাস যায় বছরের পর বছর যায় তবু অপেক্ষায় থাকে সুখ নামক পাখিটির জন্যে–ছত্রিশ বছর কেটে যায় কিন্তু কোথায় তার সেই সুখপাখি!

 

এর মধ্যে খবর পেল, বাবা মরে গেল! তখন আকাশ ভেঙে মাথায় পড়লেও মায়ের সান্ত্বনাই ছিল পথচলার প্রেরণা। আরেকদিন চিঠি এল, মা নেই! তখন আশার আলো নিবে চার দিকে দেখে আঁধার আর আঁধার। নিরুপায়–ভিসা নামক শিশা ভেঙে কবেই চুরমার হয়ে গেছে জানা নেই। চুপিসারে কাজকর্ম করে চলছে এখানে-ওখানে। এক দিন করতে পারলে তিন দিন বসে খেতে হয়। বাড়ি যাওয়ার কথা একবার ভাবলে তিনবার মনের বাধা আসে, কারণ চিরনিষিদ্ধের লালকালির মোহরের ভয়। পুনরায় আসতে পারলে নাহয় কোনো একটা সদগতি হত। বাড়ি গিয়ে করবে কী এ কথাও চিন্তার বিষয়। এতটুকু জমিজমা অবশিষ্ট রাখে নি যে, তা বিক্রি করে কিছু একটা করবে। সম্বল বলতে সামান্য ভিটেবাড়ি ছাড়া আর কিছু নেই। সব সময় লেগে থাকে আইনের হাতে ধরা পড়ার ভয়। অবৈধ প্রবাসীদের মন ফাঁসির দণ্ড আসামির মনের চেয়েও ছোট। ধরা পড়ে দেশফেরত হলে কেউ কেউ মৃত্যুকামনা করে। কেউ কেউ লজ্জার চেয়ে মরণ ভাল বলে।

 

আমরা বলছি না, দুনিয়ার সকল অবৈধ প্রবাসীদের বৈধতা দাও। আমরা এটুকু কামনা করছি, তাদের একটা সদগতি হোক। কারণ অনেকে বিদেশ এসে হাজার কোটি টাকার মালিক না হলেও কোটিপতি ত বনেছে–এটা অবশ্য বাস্তব। তাদের অনেকেই আশেপাশের গরিবিদূরিকরণে যে দানদাক্ষিণ্যের সবল হাত বাড়ায় নি–এটাও অবাস্তব নয়। গরিবিকে যারা খুব কাছ থেকে দেখেছে তারা তার চেহারা কখনো ভুলতে পারবে না। তাই যেখানেই তারা গরিবির ছায়া দেখবে সেখানেই তাদের সবল হাতের ছাপ আশা করা যাবে।

 

গ্লাফের যে আইনকানুন আমরা দেখছি সাধারণত তা অন্যসব দেশে দেখা যায় না। এখানে ভিনদেশিরা ব্যবসাবাণিজ্য করতে গেলে (স্পন্সর) কফিল। অন্য কোথাও চাকরি করতে গেলে বাধা। আইনের হাতে ধরা পড়লে জেলজরিমানাপর চিরনিষিদ্ধ! এ কেমন বিচার? এমন একটি নগণ্য অপরাধে যদি জেলজরিমানাপরও আজীবন নিষিদ্ধ হতে হয়, তা হলে এসব দেশে শ্রম দেওয়ার যৌক্তিকতা কী? নিজের দেশে খেটে খাওয়া অনেক ভাল। কারণ যে গাছটি ছায়া দিতে অক্ষম তার তলে আশ্রয় নেওয়া বোকামি। নিজেকে যারা সবকিছু মনে করে তাদের কাছে ভাল কিছু আশা করা ভুল। গ্লাফের আলোবাতাস কারও জন্যে নয়, সকল প্রবাসীদের জন্যেও যদি নিষিদ্ধ হয়, আশা করি বিন্দুমাত্র প্রভাব পড়বে না কোনো প্রবাসীর জীবনে। তা হলে? মানুষ দিন দিন গ্লাফের প্রতি যেহারে বিমুখ হচ্ছে, একদিন গ্লাফ নামের কোনো শব্দ মানুষের অন্তরে থাকবে বলে মনে হয় না! কারণ অমৃত মনে করে বারবার বিষফল খাওয়া যায় না।

ভিনদেশিদের প্রতি যে আচরণ তারা করছে! এ আচরণ কিন্তু মনুষ্যত্বের আচরণ নয়। এ আচরণ বর্বরতার পরিচয়। আল্লাহ্‌র কাছেও ফেরেস্তার চেয়ে মানুষের মর্যাদা বড়। আর তাদের কাছে দরিদ্রদেশের শ্রমিকেরা মানুষই নয়! শত্রু শত্রুর প্রতি বিমুখ হয় তবে এমন আচরণ করে না। মানুষ মানুষকে ভালবাসা মনুষ্যত্বের পরিচয়। যারা মনুষ্যত্বের পরিচয় দিতে অক্ষম তারা ঘৃণিত। পৃথিবীতে এমন কোনো দেশ নেই, যেখানে ভিনদেশি নেই। যারা পরকে আশ্রয় দেয়, পরের স্বার্থের কথা ভাবে তারা সবচেয়ে মহান এবং হৃদয়বান। তবে আজকাল বেশির ভাগ দেশেই দেখা যাচ্ছে, ভিখারিকে ভিক্ষা দেখিয়ে তার ভাণ্ড কেড়ে নেওয়ার কাজ।

 

আজ গ্লাফজুড়ে দেখা যাচ্ছে, ভিসাব্যবসা একটা অন্যতম ব্যবসায় পরিণত হয়েছে! সরকার যেখানে সামান্য একটা কাগজের বিনিময়ে হাজার হাজার টাকা কেড়ে নিতে একবিন্দু সংঙ্কোচ করছে না, সেখানে সাধারণ মানুষ লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিতে দ্বিধা করবে কেন! সামান্য একটা কাগজের মূল্য যদি এত হয়, তা হলে হিরামুক্তা ও সোনাচাঁদির মূল্য তত বেশি অস্বাভাবিক নয়। মজলুমের প্রতি জুলম করা যদি অন্যায় হয়, তবে এটা কেমন ন্যায়? এটা কি মজলুমদের প্রতি অত্যাচার নয়? শক্তি যার আছে সে দুর্বলকে লাথি দিতে একটুও চিন্তা করবে না, এটাই দুনিয়ার দস্তুর এবং এটাই মানুষের নীতি। এই নীতির কাছে একজন দুর্বল কখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না। তাই তাকে বাধ্য হয়ে অন্যপথ অবলম্বন করতে হয়।

 

মনে রাখা দরকার, নতুন মানুষের চেয়ে একজন পুরাতন মানুষ সব সময় কার্যকর এবং অগ্রসর ও অভিজ্ঞ। যে কথাটা একজন অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞই বলতে পারে। মানুষ মনুষের প্রতি বিমুখ হওয়া স্বাভাবিক কিন্তু এমন নির্দয় হতে পারে না। এখানে ভিনদেশিরা অপরাধ করে, তবে সকলে এমন অপরাধ করে না যে, যার জন্যে তার ফাঁসির আদেশ জারি করা হোক! অর্থাৎ অন্যকোথাও শ্রম দিলে চিরনিষিদ্ধের দণ্ড। এটা একজন শ্রমিকের জন্যে ফাঁসির দণ্ডই বটে। কারণ আমরা এমন কতজনকে দেখেছি, এ আদেশের কারণে তার লক্ষ টাকার (রিয়াল বা দিরহাম) ব্যবসাবাণিজ্য রেখে শূন্য হাতে বিদায় নিতে হয়েছে! আজকাল খুনি আসামীর প্রতিও সহানুভূতি দেখানো হচ্ছে, হয়তো কোনেক পরিস্থিতির শিকার সে। মানুষ কখনো স্বেচ্ছায় অপরাধ করে না–হয়ে যায়। তাই অপরাধীর অপরাধানুসারে দণ্ডিত করা প্রত্যেক বিচারকের কর্তব্য। বিচারকগণ মনে রাখতে হবে, তাদের এ আদালত শেষ আদালত নয়, তার উপর আরেকটি মহা আদালত আছে এবং আরেকজন মহাবিচারক আছে আর সে বিচারকের আদালতের কার্যক্রম এতই নিখুঁত যে, চুলচেরা বিশ্লেষণ করেও খুঁত পাওয়া যাবে না। একথা যেন দুনিয়ার বিচারকগণ মনে রাখে, ওই আদালতের কাঠগড়া সকলের জন্যে অপেক্ষা করছে।

 

আমরা এমন কথা কখনো বলব না যে, সকলে নিরাপরাধী এবং নিতান্ত ভাল মানুষ। সকলেরই কিছু-না-কিছু অপরাধ থাকে। তবে চুরিডাকাতি খুনখারাবি রাহাজানি প্রবঞ্চনা ধর্ষণ ইত্যাদি জঘন্য অপরাধ মানি। কিন্তু একস্থানের ভিসায় অন্যস্থানে শ্রম দেওয়া কোন্‌‌ ধরনের জঘন্য অপরাধ আমাদের বুদ্ধির অতীত! যদি তা জঘন্য অপরাধই হয়, তা হলে হত্যা কী ধরনের অপরাধ? যার জন্যে একজন মানুষকে আজীবন নিষেধাজ্ঞার গ্লানি বহন করতে হয়! এজন্যে মনে করি, সকল দেশের দূতাবাসকে সোচ্চার হতে হবে, আলোচনা করতে হবে এসব দেশপ্রধানদের সঙ্গে। মনে রাখতে হবে, স্বীয় জনস্বার্থ যেখানে প্রতিষ্ঠিত নয় সেখানে কোনো অধিষ্ঠান কল্যাণকর নয়। ঠিক আছে, ভিক্ষুকের জন্যে এক দ্বার বন্ধ হলে অন্যদ্বারের আশা আছে। তবে একি ন্যায়! এখানে যে তার জন্যে সকল দুয়ার বাঁধা! তা হলে ভিখারির ভিক্ষা কোথায়? এ কেমন কানুন? এক দেশের অপরাধে বহু দেশ নিষিদ্ধ! এক অপরাধে যেমন দশবার মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যায় না, তদ্রূপ এক অপরাধে দশ দেশ সাজা দিতে পারে কি? “আমরা মানুষকে ভালবাসি…আমরা মানবতার ঊর্ধ্বে…আমরা মুসলিম…আমরা আরব…” কিন্তু পশ্চিমের দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, মধ্যমরা মানবতার কত নিচে! পশ্চিমেরা এক দেশের অপরাধীকে কিন্তু আরেক দেশ আশ্রয় দেয়, সাজা দেয় না। তাই সেই আবহমানকাল হতে শোনা যাচ্ছে মানুষ পশ্চিমের গুণগ্রাহী। আজও দেখা যাচ্ছে সেই ধারাবাহিকতা জারি রয়েছে। টাকার পাহাড়ের বিনিময়ে মানুষ ইউরোপ-আমেরিকায় পাড়ি দিতে প্রস্তুত। কিন্তু, ইদানীং দেখা যাচ্ছে বিনামূল্যেও মানুষ মধ্যপ্রাচ্যে আসতে নারাজ! সেই একটা সময় ছিল দুবাইয়ের নাম শুনলে অনেকে আশ্চর্য অনুভব করত। আজকাল দেখা যাচ্ছে তার নামোচ্চারণেও যেকেউ অবজ্ঞা প্রকাশ করছে! এটা বৃহত্তর নামি অথবা ধনী একটি রাষ্ট্রের জন্যে কম লজ্জার বিষয় নয়। দুর্ভাগ্য এমন দেশের, যারা মানুষের আশ্রয়স্থল তৈরির মাধ্যমে সুনাম অর্জন করতে পারে না। দুর্ভাগ্য এমন ধনীদের, যারা অসহায়ত্বের জন্যে একদণ্ড সহায়তার হাতছানি দিতে পারে না।
আইনের পর আইন–ভিনদেশিদের জন্যে প্রতিদিন একটার চেয়ে একটা কঠিন করে করে নতুন নতুন আইন জারি করা হচ্ছে! এবং এ আইনের বেড়িতে আবদ্ধ করতে করতে করতে ভিনদেশিদের অবস্থিতি এমন দুর্বিষহ করে তুলেছে জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ফাঁসির কারাবাস অনুভব করতে হচ্ছে! কোনো সুযোগসুবিধা গ্লাফদেশের প্রবাসীদের আছে বলে মনে হচ্ছে না। চার দিকে দেখলে শূন্য ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না। তবু প্রবসীরা আশার  মশাল জ্বালিয়ে পথ চলছে। এ মশাল যেকোনো সময় খপ করে নিবে যেতে পারে, তার গ্যারান্টি আছে। এটা বড়ই দুঃখের কথা এবং সত্যকথাও বটে, মানুষ পৃথিবীতে আসে সুনাম অর্জনের জন্যে, যে সুনাম অর্জন করতে পারে না সে মানুষ হতে পারে না। হোকবা একটি দেশ। আমরা বহুজনের কথা শুনেছি এবং দেখেছি, শেষসম্বল ভিটেবাড়ি বিক্রি করে গুপ্তধনের আশায় উপসাগর পাড়ি দিয়েছে; এসব আশাবাদীজনদের গুপ্তধনপাওয়া ত দূরের কথা, অর্জিত ধনও পাওয়া হয় না! অনেকে অনেক জায়গায় চাকরি করে প্রতারিতও হচ্ছে অনেক। মাসের পর মাস শ্রম দিয়েও কানাকড়ি পাচ্ছে না! অনেকে কোম্পানির জন্যে মামলা ঠুকেও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এমন লোকেরা বাধ্য হয়ে পালাতে হচ্ছে, অন্যত্র কাজ করতে হচ্ছে এবং বাধ্য হয়ে অবৈধ হতে হচ্ছে।

 

এবার একটা সত্যকথা বলি, আমরা হুজুকে পথ চলি। নাটকে চরিত্রের ফাঁসি হলে আন্দোলন করতে পারি! কিন্তু বহুতল ভবন থেকে ছিটকে পড়ে শ্রমিক মরলে তার জন্যে ওহু শব্দও করতে পারি না! কারণ, সে ত বেনামি একজন সামান্য শ্রমিক মাত্র। আমার গরজ কি তার জন্যে আফসোস করা। ও ত আমার কেউ নয়, না আত্মীয়–না ভাইবেরাদর, না কোনো আপনজন–কেউ ত নয় আমার। তা হলে, আমি কেন বেনামি কারও জন্যে দরদ দেখাব! এখানে মনুষ্যত্বের খর্বতা। এখানে মানুষ-অমানুষের তফাৎ। বিখ্যাত কেউ হুঁ করলে ভুঁ হয়ে যায়, গরিব ডুবে মরলেও চোখ তুলে কেউ না চায়! এ পৃথিবী কি তা হলে গরিবদের বাসস্থান নয়? গরিব ডুবে মরে ত মরুক তাতে আমার কি, আমি তেতলায় আরামের ঘুমে ঘুমাতে পারলেই হয়! এ পৃথিবীতে বোধহয় তারাই মানুষ হতে পারে, যারা পিছনে পদাঘাত করে সামনে দাঁড়াতে পারে হাতজোড়ে।

 

এই ত সেদিনের কথা, বাংলাদেশ যখন জলোচ্ছ্বাসে ভাসছে; এদিকে আমিরাত ঘোষণা করল, অবৈধ প্রবাসীদেরকে দেশফেরত হওয়ার সাধারণ ক্ষমা। বাংলাদেশ প্লাবনে সমুদ্র হোক অথবা কাঠফাটা রোদে সাহারা মরুভূমি, তাতে তাদের কিছু যায়-আসে না। আর তাদের দরকারইবা কী, তারা ত বাংলাদেশের বন্ধুদেশও নয় এবং প্রতিবেশি দেশও নয়। তা হলে? কোন্‌‌ দুঃখে তাদের মাথাব্যথা হবে! আজকাল পাড়াপ্রতিবেশিও পাড়াপ্রতিবেশির জন্যে দরদ দেখায় না, সেখানে সুদূর একটি দেশ আরেকটি দেশের প্রতি সহানুভূতি দেখাবে কোন্‌‌ আশায়। হাঁ তবে মানবতার কথা বলা যায়, দুনিয়ার সকল মানুষ ভাই-ভাই বলা যেতে পারে। কিন্তু তা দিয়ে নিষ্ফল কান্না চলে, আশা করা চলে না। তবে একটি দেশ যতই গরিব হোক কখনো আরেকটি দেশের মুখাপেক্ষী নয়। তার দেশে নাইবা থাকুক পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিল্ডিংবাড়ি এবং বিলাসবহুল মোটরগাড়ি। তবু দেশটি ধন্য নিজের ক্ষুদ্রতায়–দীনতায়। ধুলাবালি কাদামাটি পাতার ঘরে যেই সুখ প্রাচুর্যের বিলাসভূমিতে বোধহয় সেই সুখ নেই। কারণ শৌখিনতায় দুঃখ না থাকলেও সুখের যে বড়বেশি অধিকার সেটা বলা যায় না। কথায় আছে, বড়বেশি সুখ কপালে সয় না। স্মরণ করিয়ে দিতে চাই না, সুখের মোহে যারা অতীতের দুঃখের কথা ভুলে যায় তারাই একদিন বড়বেশি দুঃখ ভোগ করে। স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, সুখের সঙ্গে দুঃখের বড়বেশি সখ্যতা। তাই অসহায়ের কথা বিবেচনা করা সুখীজনদের কর্তব্য। পৃথিবীর যেসকল দারিদ্র্যদেশ থেকে দরিদ্র শ্রমিকেরা এসে এসব মরুভুমিকে আজ স্বপ্নভূমিতে পরিণত করছে, তারা কতটুকু স্বপ্নোত্তীর্ণ হতে পারছে? বিনিময়ে তারা যে অর্থ পাচ্ছে না এমন কথা নয়, অর্থ আর অধিকারের মধ্যে অনেক পার্থক্য। যেমন পার্থক্য দয়া আর সহানুভূতি মধ্যে। ভাবলে অবাক লাগে, যারা রক্ত পানি করে–মাথার ঘাম পায়ে ফেলে এসব দেশকে শ্রম দিয়ে, মেহনত দিয়ে–রাস্তাঘাট, অফিস-আদালত, টওয়ার-ইমারত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বড় বড় উচ্চভবন নির্মাণ করে গেছে এবং করে যাচ্ছে তারা কী পেয়েছে বা পাচ্ছে, দুঃখবঞ্চনা হাহাকার ছাড়া? কী অধিকার মিলেছে তাদের? তুচ্ছ অপরাধে ফাঁসির সমান মৃত্যুরায়–আজীবন নিষেধাজ্ঞার একমাত্র লালসিল ছাড়া! কী পেয়েছে? সামান্য অর্থ, যা দিয়ে না তার ভাল জীবন গঠন করতে পারছে, না তার পরিবারের। গুলী মেরে বা গলাটিপে হত্যা করাকে শুধু হত্যা বলা হয় না, চক্রান্তে ফেলে আত্মহত্যা করাকেও হত্যা বলা হয়।

 

এবার আমিরাতে দুই হাজার বছরের তাৎপর্যটা বলি, সতের বছরের ছেলে ছত্রিশ বছর বিদেশে অবস্থান করার পর সে ছেলে আর ছেলে রয় না; হয়তোবা রোগাক্রান্ত মৃত্যু পথপথি একজন, না হয়তোবা লাঠি আশ্রিত বাঁকাদেহী পুরাপুরি বৃদ্ধ একজন।

 

ঊনিশ শ নিরানব্বই সালের কথা, বহু কষ্টের সুদির্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে একটা প্লাটফর্মে উপনীত হয় সে। ছোটখাটো একটা মোটরপার্টেসের ব্যবসা করছে। চরম উন্নতির দেখা না পেলেও ভালই কাটছে দিন। কিন্তু, একথা কি কখনো অস্বীকার করা যায়–সুখের দুয়ারে সব সময় অশুভছায়া এসে দাঁড়ায়। তার ঘনিষ্ঠ এক আত্মীয় পড়ল মহাবিপদে। ভিসার কী সমস্যা সমাধানে কেটে উঠতে পারছে না। দেশফেরত হতে বাধ্য। তাকে উদ্ধার করতে হবে। তার দোকানটার ভার নিতে হবে। নিল। পাঁচ-কি-ছয় মাস থালা ঝুলে রাখার পর সময় এল দোকানটা খোলার–আত্মীয়কে ভিসা দিতে হবে। মাঝে মাঝে একাজে ওকাজে দোকনটা খুলছে, কিছু কিছু সময় বসে জরুরি কাজকর্ম সারছে। কিন্তু ইতোমধ্যে একটা আইন জারি হয়েছে, যেকেউ অন্যত্র কাজ করতে পারবে তবে (মিনিস্ট্রী অফ ইন্টিরিয়র) লেবারকোর্ট থেকে ছয় মাসের ছাড়পত্র নিতে হবে। সেই আইনানুযায়ী ছয় মাসের ছাড়পত্র নেওয়া হল তার। তবে ভিসার মেয়াদোত্তীর্ণ-তারিখানুযায়ী সেই ছাড়পত্রটি তাকে প্রদান করা হয়েছে চার মাসের জন্যে। এটা অযৌক্তিক নয় এবং আইনের বাইরেও নয়। যেদেশে বাস করা হয় সেদেশের আইনকে শ্রদ্ধা করা কর্তব্য–অবশ্য করতে হবে।

 

এবার এল ভিসা ধারণের সেই কান্নাপল! কান্নাপল এজন্যে বলছি, চোখের পলকে বর্তমানে গ্লাফপ্রবাসীদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। এ ভিসার মেয়াদ দুয়েক বছরের বেশি কোথাও দেখা যাচ্ছে না। যাই হোক, এটাই যখন একটি দেশের আইন এ আইন অমান্য করা কিছুতেই চলবে না এবং মেনে চলাই ভাল। যতই কষ্ট হোক, টাকার পাহাড় লাগুক একাজের সমাধা করতে হবে, নাহলে লাঞ্ছনাগঞ্জনার অবশিষ্ট থাকবে না। তাই যেভাবেই হোক ভিসার মেয়াদ সচল রাখা প্রত্যেক প্রবাসীর জন্যে মঙ্গল।

 

ইদানীং তার ছাড়পত্রের মেয়াদ শেষ। তাই বেশির ভাগ সময় দোকানটা বন্ধ রাখা হয় । আজ কী জন্যে–হয়তো ভাগ্যবিড়ম্বনায় দির্ঘক্ষণ এসে বসল দোকানখুলে। এমন সময় কয়েকজন লেবারকোর্ট-অফিসার এসে হাজির, কাজের অনুমতিপত্র চায় অর্থাৎ ওয়ার্ক পারমিট। ছাড়পত্রটা ওঁদের হাতে দেওয়া হল। একজন অফিসার ভাল করে দেখে সঙ্গিদের আরেকজনকে ডেকে বলছে, দেখ দেখ–এটার মেয়াদ শেষ হয়েছে কবে–প্রায় মাস ছুঁই ছুঁই!
হয়ে গেল ফাঁসির দণ্ডীয়মান অপরাধ। অপরাধী বিমর্ষ–ভয়ে কেঁপে কেঁপে বলল, স্যার, আরেকটা কাগজ তৈরি আছে অনুগ্রহপূর্বক একটু দেখুন। অফিসারগণ দেখল, এ কাগজটাও ছাড়পত্র বটে কিন্তু রেজিস্ট্রেশন্ করা হয় নি।
অফিসারজন বলল, একি? পরিহাস করার জায়গা এটা নয়…
অপরাধী হাতজোড় করে বলল, স্যার, সাম্মিট করতে পারি নি, কারণ আমার পাসপোর্টে ভিসার মেয়াদ শেষ–নবায়ন না করে এটা জমা করা যাচ্ছে না।
অফিসার একজন বলল, সেই দেখা যাবে–চল…

 

সপ্তা পনের দিন হাজতবাসের পর কারাবাস। শুরু হল অন্ধকার জীবনের অবাঞ্ছিত অধ্যায়। সেই জ্বালাময়ী দিনগুলোর কথা বললাম না আর। শুধু এটুকু বললাম, এক-একটি পল যেন কেটেছে তার এক-একটি মাসের মতো। এক-একটি মাস যেন কেটেছে তার এক-একটি শতাব্দীর মতো…
এধরণের নগণ্য অপরাধে যদি কোনো প্রবাসী জঘন্য অপরাধের কারাভোগ করতে হয়, তা হলে এমন দেশে বসবাসের চেয়ে বনবাস ভাল। এখানে সমস্ত পাবন্দি এবং আইনকানুন তবে ভিনদেশিদের জন্যে। স্বদেশিরা ইচ্ছে করলে রাতকে দিন–দিনকে রাত বানাতে পারে। তাদের জন্যে আইন কি আর কানুন কি। যারা লোক্যাল তাদের সাত খুন মাফ! বলা বাহুল্য, একজন অতিথির প্রতি আতিথ্য করা যেমন গৃহস্থের কর্তব্য, বিদেশিদের প্রতি তেমন উত্তম আচরণ করা একটি রাষ্ট্রের এবং তার নাগরিকের কর্তব্য। সকল প্রবাসী অতিথির মতো।

 

আইন! আইন!! আইন!!! আইনের এ কঠিন শব্দ ভিনদেশিদের কানে এসে শেষ। সকালে এক আইন! বিকালে আরেক আইন! প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ধারা, নতুন নতুন আইন একমাত্র ভিনদেশিদের জন্যে। ভিনদেশিরা সব সময় ভয়াতঙ্কে দিন কাটছে, কখন কী আইন হয়ে বসে! সকালে ঘুম থেকে জেগে কখন যে দেখতে হয় তাদের দুনিয়াটা অন্ধকার–লাখ টাকার ব্যবসাবাণিজ্য ফেলে চলে যেতে হচ্ছে খালি হাতে। ব্যবসায়ীরা ব্যবসাবাণিজ্যে এত বেশি কর দিয়েও কোনো সুযোগসুবিধা ভোগ করতে পারছে না। কারণ, এসব দেশে কোনো ব্যবসাবাণিজ্য ভিনদেশির নামে হতে পারে না, অতএব নেই বলা যায়। তবে এখানে বেশির ভাগ ব্যবসায়ী ভিনদেশি। তাই করের বোঝা বইতে বইতে ছোটখাটো দোকানদারেরা–ব্যবসায়ীরা মরেই যাচ্ছে। কারণ আমাদের দেশের মতো করফাঁকি দিতে পারলে বাঁচামরার কোনো কথায় আসত না। এসব দেশে লক্ষ-হাজার টাকা ত দূরের কথা, সিকি-আধুলি-এক টাকা করফাঁকি দেওয়ার মতো কোনো সুযোগ নেই। তাই বলে এসব দেশ আজ উন্নতির চূড়ায়। তাই কোনো কোনো ব্যবসায় লাভ করেও লোকসান গুনতে হচ্ছে। এসব ব্যবসায়ীরা তাড়াতাড়ি ব্যবসা গুটিয়ে অন্যপথ খুঁজতে হচ্ছে। কোনো কোনো দোকানে মাস শেষে হিসাব করলে দেখা যায় দুয়েক শ টাকাও জমা হচ্ছে না! এসমস্ত দোকানিরা বছর শেষে কাঁদাকাটি জোড়তে হচ্ছে–মোটা অঙ্কের লাইসেন্স ফি, ভিসা ফি, এ ফি, ও ফি, করফি ভরতে ভরতে দেখা যাচ্ছে অনেক ঋণ হয়ে গেছে। এসব ঋণ শেষ হতে-না-হতে আবার ঘুরে আসছে বছর! ফি দিতে দিতে একদণ্ড স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারছে না তারা! স্বদেশিরা মনে করছে, টাকার পাহাড় নিয়ে যাচ্ছে প্রবাসীরা। কিন্তু তারা একথা একটুও চিন্তা করছে না যে ভিনদেশিরা ছাড়া এসব দেশ কীভাবে ডেভেলাপ করা সম্ভব হত? তবু ভিনদেশিরাই অপদার্থ! কারণ দাঁত থাকতে কেউ দাঁতের মর্যাদা বুঝে না। এভাবে চলছে গ্লাফপ্রবাসীদের করুণজীবন।

২রা সেপ্টেম্বর, ২০১১ সাল

৪২৮ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
সর্বমোট পোস্ট: ৩৭ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ১০৩ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৫-২৯ ২২:০৪:১৮ মিনিটে
banner

৪ টি মন্তব্য

  1. এস এম আব্দুর রহমান মন্তব্যে বলেছেন:

    ধন্যবাদ আপনার লেখাতে প্রবাসীদের সম্পর্কে অনেক কিছু জানা গেল । ভাল থাকুন ।

  2. আজিম মন্তব্যে বলেছেন:

    অতি করূন। এর চেয়ে করূন আর হতে পারে কী কোন চিত্র!
    ভীনদেশী মানুষেরা ওদের দে্শের উন্নয়ণে অবদান রাখা বিদেশী মানুষদেরকে মর্যাদা দেয়া শিখবে কবে? মনুষত্বের চর্চা কবে তারা করতে শুরু করবে ভীনদেশী, বিশেষত: শ্রমজীবি মানুষদের সাথে! বিদেশী মানুষদের প্রানান্তকর কষ্টকে কবে তারা অনূধাবন করতে শিখবে!
    লেখকের প্রকাশিত অনুভূতির সাথে সর্বোতভাবে সহমত প্রকাশ করি এবং অনেক শ্রদ্ধা করি তাঁর অনুভূতিকে

  3. সহিদুল ইসলাম মন্তব্যে বলেছেন:

    সব টুকু পড়তে পারিনি, তবে অর্ধেক পড়েই বুঝলাম অনেক করুণ, কারণ আমি একজন প্রবাসি, তবে আল্লাহ আমাকে অনেক ভাল রেখেছেন, হাজার শুকুর।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top