Today 11 Dec 2019
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

একজন অবসরপ্রাপ্ত মানুষ

লিখেছেন: মুহাম্মদ আনোয়ারুল হক খান | তারিখ: ২৪/০৬/২০১৩

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 723বার পড়া হয়েছে।

প্রিয় পাঠক, যদি আপনার জীবনের স্বর্ণালী বছরগুলো, আপনার উজ্জ্বল যৌবন, কোন অফিসের চৌহদ্দীতে বিরক্তিকর বন্দীদশায় কাটিয়ে থাকেন, আর যদি সেই বন্দীজীবন মধ্যবয়স অতিক্রান্ত হয়ে আজ অক্ষম অবসাদ আর রূপালি চুলের খবর নিয়ে এসে থাকে; যদি আপনি সেই বছরগুলি এমনভাবে কাতিয়ে থাকেন যে, নিস্তার পাবার কোন আশাই ছিল না আপনার, এমনকি শিশুবয়সের উপরি পাওনার স্মৃতিটুকু ছাড়া ছুটির দিন কাকে বলে তাও ভুলে গিয়ে থাকেন আপনি, তাহলে তখনই – আপনি আমার মুক্তি পাওয়ার তাৎপর্যকে অনুভব করতে পারবেন।

 

মিন্সিং লেনের একটি অফিসে সেই বিশেষ চেয়ার-টেবিলটি আমি দখল করেছিলাম আজ থেকে ছত্রিশ বছর আগে। চাকরিটা আমি নিয়েছিলাম চৌদ্দ বছর বয়সে। সেই বয়সে মনের খিশিতে খেলাধুলার অজস্র সময় ছিল আমাদের, আর ছিল স্কুলের দীর্ঘছুটির অবকাশ। সেই জীবনকে পিছনে ফেলে টাকা-পয়সার হিসেব রাখার এক দপ্তরে, আট, নয় অথবা কোন কোন দিন দশঘন্টার হাজিরা দেওয়ার মধ্যে অভ্যাসের যে পরিবর্তন এসেছিল তা ছিল বিষণ্ণতায় ভরা। কিন্তু সময় ধীরে ধীরে সব কিছুর সঙ্গে আমাদের আপোষ করতে শেখায়। ধীরে ধিরে আমিও শান্ত হয়ে এলাম – মেনে নিলাম সবই, যেমন বন্য প্রাণীরা তাদের খাঁচাটাকে মেনে নেয় অনেকটা তেমন।

 

এটা অবশ্য ঠিক যে রবিবারগুলো আমার নিজেরই ছিল। কিন্তু রবিবার যেহেতু উপাসনার জন্য নির্দিষ্ট, ঠিক সেই কারনেই যেন আমোদ আহ্লাদের জন্য অনুপযুক্ত। বিশেষত আমার মনে হয় শহরের রবিবারে একটা অনুজ্জ্বল ভাব থাকে, বাতাস যেন ভারী হয়ে থাকে সেদিন। লন্ডন শহরের আনন্দময় রাস্তায় রাস্তায় কর্মব্যস্ততা আর কোলাহল, গুঞ্জন, গান-বাজনা, ব্যালাড গানের অনুষ্ঠান – রবিবারে এসব কোন কিছুই পাওয়া যায় না। অনন্তকালের বার্তাবহ যে সব ঘন্টাধ্বনি সেদিন শুনতে পাওয়া যায় তা আমাকে মনে মনে বিষাদ্গ্রস্ত করে তোলে। বন্ধ দোকানগুলো যেন বিতৃষ্ণা জাগায়। বিভিন্ন ছাপা আর ছবি, ঝকমকে কমদামী গহনা আর নানান হস্তশিল্প, আর ব্যাপারীদের অসংখ্য উপাচারের যে বিরামহীন প্রদর্শনী শহরের অপেক্ষাকৃত কম ব্যস্ত এলাকাগুলোতে কাজের দিনে দেখতে দেখতে হেঁটে যাওয়া যায়, তা খুবই মজার অভিজ্ঞতা, কিন্তু সে সবকিছু রবিবার দিনে বন্ধ থাকে। অলস ভাবে পাতা উল্টে দেখার জন্য কোন বইয়ের দোকান সেদিন খোলা থাকে না। দেখে ক্ষনিকের চিন্তা ভাবনা করা যাবে এমন ব্যস্ত মুখও পাশ দিয়ে হেঁটে যায় না – নিস্পৃহভাবে পাশে দাঁড়িয়ে দেখা কর্মব্যস্ততার এইসব ছবি ক্ষনিক অবকাশের মুহুর্তে শিথিল আনন্দের উপাদান হতে পারে। রবিবারে এসব কিছুই থাকে না। অসুখী মুখ ছাড়া রাস্তায় কিছুই দেখিনা সেদিন – অসুখী না হলে বডজোর অর্ধেক সুখী যেমন ক্ষনিক মুক্তি পাওয়া শিক্ষানবিস আর দোকানের কর্মচারীর দল – এখানে সেখানে দু’একজন বাড়িতে কাজ করার মহিলা যারা সারা সপ্তাহ দাসত্ব করার পর একদিন বাইরে যাওয়ার ছুটি পেয়েছে, আর এই মুক্তির প্রহরটা কীভাবে আনন্দে কাটাবে তাও ভুলে গেছে – এমনি সব লোকজন। তাদের এই একদিনের চেষ্টাকৃত খুশির প্রকাশ যেন তার শুন্যতাকেই প্রকট করে তোলে। এই দিন খোলা আকাশের নিচে ঘুরে বেড়ায় যে সব মানুষ তারা যে খুব স্বস্তিতে আছে তা মনে হয় না।

 

কিন্তু রবিবারগুলো ছাড়াও ইস্টারের দিনে আর বড় দিনে আমার ছুটি থাকত। আর পুরো এক সপ্তাহের ছুটি থাকত গরমের সময়। এই সময়টা হার্তফোর্ডশায়ারে আমার পরিচিত মাঠে ঘাটে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ ছিল আমার। এই শেষের ব্যাপারটি আমার কাছে খুবই উপভোগ্য ছিল। আর এটা যে ফিরে ফিরে আসবে এই প্রত্যাশাই সারা বছর আমাকে বাঁচিয়ে রাখত আর সব কিছু সহ্য করার শক্তি যোগাত।

 

কিন্তু যখন সপ্তাহ ঘুরে আসত, তখন দুরত্বের এক উজ্জ্বল অপচ্ছায়া কি আমার সঙ্গে সঙ্গেই থাকত? নাকি এটা ছিল সুখের বিরামহীন সন্ধানে ব্যায় করা সাতটা করে অস্বস্তিকর দিনের একটা শৃংখলা আর তাদের সেরা ব্যবহারের পথ বের করার একটা ক্লান্তিকর উদ্বিগ্নতা?

 

কিন্তু বছর শেষের সেই শান্তি, সেই প্রতিশ্রুত বিশ্রামই বা কোথায়?

 

কোন রকম স্বাদ পাবার আগেই সে উধাও। আমি ফিরে আসি আবার আমার চেয়ারে – পরবর্তী সুযোগের অপেক্ষায় ক্লান্তিকর একান্নটি সপ্তাহ আবার কাটাতে হবে আমাকে। তাহলেও তার এই ফিরে আসার সম্ভাবনা আমার বন্দীদশার অন্ধকারের মধ্যে আলোক রশ্মির মত ছিল, এটাকে বাদ দিয়ে এই দাসত্বের ভার আমি এতদুর বহন করতে পারতাম কিনা সন্দেহ।

 

নিয়মিত হাজিরা দিয়ে যাওয়া সত্বেও, হয়ত এটা নেহাতই একটা খেয়াল ছিল, তবুও, আমার সর্বদাই নিজেকে এই সব দপ্তরের কাজকর্মে খুব অপারগ মনে হত। শেষের বছরগুলোতে এই ধারনা এমন বেড়েছিল যে আমার মুখের সমস্ত রেখায় তাকে দেখতে পাওয়া যেত। স্বাস্থ আর মনের জোর ধীরে ধীরে কমে আসছিল। আর সর্বদাই একটা ভয় হত যে আমি হয়ত শেষে এমন একটা সঙ্কটের মধ্যে পড়ব যা থেকে উদ্ধারের উপায় আমার জানা থাকবেনা। সারা দিনের দাসত্ব রাত্রে আমার ঘুমের মধ্যেও পুরোপুরি বজায় থাকত। খাতায় অঙ্ক লেখার কাল্পনিক সমস্ত ভুল, হিসেবের ভুল, এইসব নানা জাতীয় ভুলের আতঙ্কে মাঝে মাঝে জেগে উঠতাম। বয়স এখন পঞ্চাশ বছর, আর মুক্তির কোন আশাই ছিলনা আমার। চেয়ার-টেবিলের একটা অংশ হয়ে গিয়েছিলাম আমি, আর কাঠগুলো তখন আমার আত্মার গভীর পর্যন্ত পৌছে গেছে। আমার অফিসের সহকর্মীরা কখনও কখনও আমার মুখের চেহারায় মনের অবস্থা বুঝতে পেরে আমার মনোবল বাড়ানোর চেস্টা করত। কিন্তু ইতোমধ্যে আমার হাবভাব যে মালিক পক্ষকে সন্দিহান করে তুলেছে এটা আমার জানা ছিলনা। শেষমেশ, গত্মাসের পাঁচ তারিখে, বাকি জীবনটায় সর্বদাই মরে রাখার মত সেই দিনে, আমাদের মালিকপক্ষের ছোট তরফের অংশীদার আমাকে একলা ডেকে আমার চেহারায় ক্লান্তির স্পস্ট লক্ষনের কথা বললেন এবং তার কারন জিজ্ঞাসা করলেন। সরাসরি এই রকম প্রশ্ন করায় আমিও তাঁর কাছে পরিস্কারভাবেই স্বীকার করলাম যে আমার শরীর ও মন আগের মত সক্ষম নেই এবং আমাকে হয়ত শীঘ্রই পদত্যাগপত্র দাখিল করতে হবে, তিনি অবশ্য আমার মন ভালো করার জন্য কয়েকটা কথা বললেন। ব্যাপারটা তখন ওই পর্যন্তি এগিয়েছিল। এর পরে সপ্তাহ খানেক ধরে আমার কেবলই মনে হতে লাগল যে সব কথা বলে ফেলে আমি অবিবেচকের মত কাজ করেছি। আমার নিজের বিরুদ্ধেই পদক্ষেপ গ্রহণের যথেষ্ঠ অজুহাত তাদের হাতে তুলে দিয়েছি আমি। সঙ্গত কারনেই আমাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে এমন একটা আশঙ্কা আমি করে ছিলাম। এইভাবে এক সপ্তাহ গেল, আমার জীবনের সবথেকে বেশি উদ্বেগের মধ্যে কাটানো সাতটা দিন। তার পরের বারই এপ্রিল, তখন মনে হয় আটটা বাজে যখন আমি টেবিল ছেড়ে উঠে বাড়ি যাবার কথা ভাবছি, ঠিক তখনই অফিসের পিছন দিকের ভীতিপ্রদ সভাগৃহে মালিক পক্ষের বড় কর্তাদের আলোচনার মধ্যে তাদের সবার সামনে হাজীর হওয়ার জন্য আমার ডাক পড়ল। আমি ভাবলাম এবার তাহলে আমার আশঙ্কামত সেই সময় এসে গেছে। আমার সর্বনাশ আমি নিজেই ডেকে এনেছি। তাঁরা এইবার আমায় বলেয় দেবেন যে আমার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। আবশ্য সেখানে পৌঁছে এটাও দেখলাম যে আমার অবস্থা আন্দাজ করে ছোট তরফের অংশীদার মৃদু মৃদু হাসছেন। তাতে আমিও খানিকটা ভরসা পেলাম। ঠিক তখনই আমাকে অবাক করে দিয়ে কোম্পানির প্রধান অংশীদার ও পরিচালক মিস্টার বোল্ডারো আমার দীর্ঘ কর্ম জীবন সম্বন্ধে এবং এই প্রতষ্টঠানে ব্যয় করা সুদীর্ঘ সময়ে আমের সুন্দর আচরন ও উল্লেখযোগ্য ও কৃতিত্বময় কাজ কর্মের সম্বন্ধে একটি রীতিমত আনুষ্ঠানিক বক্তৃতা শুরু করলেন। তখন ভাবছিলাম, ‘কিমাশ্চর্য্যমতঃপরম’। ইনি আমার সম্বন্ধে এত সব জানলেন কি করে? নিজের সম্বন্ধে এত কিছু ভাবার আত্মবিশ্বাস আমার কখনও ছিলনা। এর পরে তিনি জীবনে কোন এক সময়ে অবসর নেওয়ার প্রয়োজন ও উপযোগিতার কথাও বললেন। তখনই আমার বুক ধড়ফড় করা শুরু হল। এরপর আমার ব্যক্তিগত ধনসম্পত্তি সম্বন্ধেও দু-একটা প্রশ্ন করা হল। পরিচালক মন্ডলির কাছে রাখা একটি প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে যেটাতে কোম্পানির তিনজন অংশীদারই গম্ভিরভাবে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন এবং তার মাধ্যমে আমাকে জানান হল তাঁদের প্রতিষ্ঠান,  আমার সারা জীবনের নিষ্ঠা ও সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ বাকী জীবনের জন্য আমাকে মাসিক বেতনের দুই-তৃতীয়াংশ প্রতিমাসে পেনশন হিসাবে দেবার অঙ্গিকার করছে। বলতে গেলে আমার প্রতি একটা অভাবনীয় উপহার! বিস্ময় আর কৃতজ্ঞায় কী উত্তর আমি সেদিন দিয়েছিলাম, তা আজ মনে নেই। কিন্তু আমার বক্তব্য থেকে এটা বোধহয় অন্তত বোঝা গিয়েছিল যে তাদের প্রস্তাব আমি গ্রহন করেছি। আমি যে সেই মুহুর্ত থেকে তাদের প্রতিষ্ঠানের প্রতি সেবার দায়িত্ব থেকে অব্যহতি পেলাম, তাও আমায় জানিয়ে দেওয়া হল। আমি কোন গতিকে তাঁদের একটা বিদায় সম্ভাষন জানালাম, তার পরে আটটা বেজে দশ মিনিটে বাড়ির দিকে রওনা হলাম, চিরকালের মত।

 

উদার হৃদয়ে আমাকে এই সুবিধাটুকু দেওয়ার জন্য আমি বোল্ডারো, মেরিওয়েদার, বোসানকোয়েট ও লেসীর প্রতিষ্ঠানের কাছে কৃতজ্ঞ – আমার কৃতজ্ঞতাই অন্তর থেকে বলছে যে তাঁদের নাম আমার প্রকাশ করা উচিত।

 

এই ঘটনার পর প্রথম দুদিন আমার কাটল অভিভুত অবস্থায়, আমার সম্ভাব্য সুখের অল্প অল্প ধারনাই শুধু তখন মনের মধ্যে আসছে। কিন্তু ভাবনা চিন্তা তখন এমন বিশৃংখল যে তার স্বাদ নেওয়ার অবস্থা নেই। কয়েকদিন আমি শুধুই ঘুরে বেড়ালাম। তখন মনে মনে ভাবতাম যে এইত বেশ সুখে আছি, কিন্তু অন্তরে জানতাম যে না এটা বোধহয় ঠিক সুখকর পরিস্থিতি নয়। আমার অবস্থা তখন চল্লশ বছর বন্দিদশার পরে হটাৎই  যাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বাস্তিল দুর্গের সেই কয়েদীদের মত। নিজেকে নিয়ে নিজের বিশ্বাস ছিল না। এটা যেন প্রতিদিনের সময়ের সীমারেখা থেকে অসীমের মধ্যে চলে যাওয়া, কারন যে মানুষের সমস্ত সময়ই তার নিজের হাতে সে তো প্রায় অনন্তকালের মুখমুখিই দাঁড়িয়ে থাকে। মনে হত আমার হাতে এত সময় আছে যে তাকে সঠিক ব্যবহারের পদ্ধতি আমার জানা নেই। সময়ের মালিকানায় অত্যন্ত গরীব ছিলাম আমি, আর আখন সেই সম্বন্ধে এত বেশি ধনী যে নিজের প্রাচুর্য্যের কুলকিনারা পেতাম না। এই সময়ের সাম্রার্জ্য প্রতিপালনের জন্য তখন আমার একজন মুনশি অথবা দেওয়ানজির প্রয়োজন মনে হচ্ছিল। এই ব্যাপারে আমি এখনও যাঁরা কর্মরত আমার মত সেই সব বয়স্ক মানুষদের সাবধান করে দিতে চাই। তাঁরা যেন নিজেদের সমস্ত সহায় সম্পদ ও সামর্থ্য সম্পুর্ন বিচার না করে হটাৎ করে নিজেদের পুরানো কাজকর্ম ছেড়ে না দেন। কারন এই রকম পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে নিরাপদ নয়।

 

এই বিপদের কথা আমি নিজেকে দিয়ে অনুভব করতে পাচ্ছি, কিন্তু আমি জানি এই পরিস্থিতিতে সঠিক পদক্ষেপ নিতে সক্ষম আমি। আমার বর্তমান অবস্থা যে আমার পক্ষে আশীর্বাদ স্বরূপ এটা মেনে নিয়ে আমি বেশ স্বচ্ছন্দে আছি। কোন বিষয়েই আমার এখন কোন তাড়া নেই। যেহেতু আমার সব দিনই ছুটির দিন। যদি দীর্ঘ সময় বিরক্তির কারন হয় তাহলে আমি হেঁটে বেড়াতে পারি, কিন্তু এখন কখনই সারাদিন হেঁটে বেড়াইনা। তেমন করতাম আগে, যখন ছুটির দিনগুলি আসত আর চলে যেত – তাদের পুরোপুরি উশুল করার জন্য দিনে তিরিশ মাইলও হেঁটেছি। সময় যদি সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় তাহলে বই পড়ে তাকে কাটিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু এখন আমি আগের মত শীতের রাতে, যখন আমার যা কিছু নিজস্ব সময় সবই ছিল মোমবাতির আলোয় আলোকিত, তখন যেমন পড়তাম – সেই ভাবে দৃষ্টিশক্তি ও মস্তিস্কের উপর অত্যাচার করে পড়াশুনা করিনা। আমি বেড়িয়ে বেড়াই, বই পড়ি, দু’একলাইন লিখিও – এই যেমন এখন লিখছি, যখন তেমন মনে হয় তখন। আমি সুখকে আর খুঁজে বেড়াইনা, বরং তাকে আমার কাছে আসতে দিই। আমি এখন অনেকটা সেই মানুষের মত-

 

এমন মানুষ হতেও পারতো তুমি-

যে জন্ম নেয় আর দেখে চোখ মেলে-

বছরেরা সব আসে তার কাছে-

একের পরেতে এক

তার চার পাশে সবুজ মরুর ভূমি।

[- That’s born, and has his years

come to him, In some green desert ] ।

 

আপনি হয়ত বলবেন ‘বছরগুলি সব একের পরেতে এক’ ‘হুঁ’? এই অবসরপ্রাপ্ত বোকাসোকা মানুষটি কিসের গননা করছেন? তিনি তো একবার বলেইছেন যা তার বয়স পঞ্চাশের ওপর।’

 

বেশ গুনে দেখলে আমি নিশ্চয়ই পঞ্চাশ বছর বেঁচে রয়েছি কিন্তু তাই থেকে সেই সময়টা বাদ দিন যেটা আমি নিজের জন্য নয় বরং অপরের জন্য ব্যয় করেছি, তাহলে দেখবেন যে আমি এখনও একজন অল্প বয়সী যুবা পুরুষ মাত্র।

 

কারন সেইটাই হচ্ছে আসল সময়, যাকে একজন মানুষ সম্পুর্নভাবে তার নিজের বলতে পারে, বাকিটা যদিও একভাবে দেখতে গেলে হয়ত তারই জীবনের অংশ, কিন্তু আসলে সেই বাকি সময়টা তার নয় অন্য লোকের। আমার আড়ম্বরশূন্য জীবনের বাকি যে কটা দিন আছে, তা দীর্ঘই হোক আর অল্পই হোক তাকে তিন দিয়ে গুন করলে তবে আসল সময় পাওয়া যাবে। আমার পরবর্তি দশ বছর, যদি আমি ততদুর পৌছুতে পারি, তা’হলে আমার গত তিরিশ বছরের জীবনের সমান হবে। এটাকে বলা যায় একটা পরিষ্কার ‘তিনের নিয়মের অঙ্ক’।

 

এই নবলব্ধ স্বাধীনতার গোড়ার দিকে বেশ কিছু অদ্ভুত বিভ্রম আমার সঙ্গী হয়েছিল। তাদের সবগুলো চিহ্ন যে এখন দুর হয়ে গেছে তাও নয়। তাদের মধ্যে একটা হচ্ছে চাকরিতে অবসর নেওয়ার সেইদিন আর আজকের মধ্যে বিরাট একটা সময়ের ব্যবধান কোথা থেকে যেন এসে পড়েছে। অবসর গ্রহন ব্যাপারটা যে এই সেদিনের ঘটনা এটা কিছুতেই আমার মনে হচ্ছেনা। কোম্পানির মালিকরা আর অন্য কর্মচারিরা যাদের সঙ্গে আমি একসাথে এতগুলো বছর কাটিয়েছি, প্রতিদিন কত ঘন্টা করে কাছাকাছি ছিলাম আমরা, এখন তাদের থেকে দুরে সরে এসে মনে হয় তারা যেন কেউ কোথাও নেই – সবাই মৃত।

 

এই প্রসঙ্গে একটি কবিতার কয়েকটি লাইন মনে পড়ল, তার ভাবনা যেন আমার অনুভুতির সঙ্গে মিলে যায়। লাইন কটি স্যার রবার্ট হাওয়ার্ডের একটি বিয়োগাত্মক রচনা থেকে নেওয়া, যেখানে একজন বন্ধুর মৃত্যুতে তিনি লিখেছেন –

 

এইতো এখনই সে চলেগেছে

পাইনি অশ্রুরও অবসর,

তবুও মনে হয় দুর সে বহুদুর

হাজারো বছরের অন্তর-

সময় যতিহীন অসীমে মিশে গেলে-

আমায় পেছনে সে ফেলে গেছে।

 

[–Twas but just now he went away;

I have not since had time to shed a tear;

And yet the distance does the same appear

As if he had been a thousand years from me

Time takes no measures in eternity]!

 

এই অদ্ভুত অনুভুতি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আমি দু’একবার তাদের সঙ্গে গিয়ে দেখাও করেছি। আমার প্রাচীন সহকর্মীরা – যাদের সঙ্গে আমার সহযুদ্ধ ছিল কলম চালানোর; যুদ্ধমান অবস্থায় তাঁদের ফেলে চলে এসেছি আমি। কিন্তু তাঁরা যতই সহানুভুতি ও দয়ামায়ার সঙ্গে আমাকে অভ্যর্থনা করুননা কেন, পুরুনো সেই পরিচয়ের উচ্ছাস যা আমি এতদিন উপভোগ করে এসেছি তা আর পাওয়া গেলনা। আমরা কিছু পুরনো হাসিঠাট্টার কথাও বললাম, কিন্তু আমার মনে হল তারা যেন খুব একটা দাগ কাটলনা সবার মনে। আমার চেয়ার-টেবিল, একটি হ্যাঙ্গার যেখানে আমার টুপিটি ঝুলিয়ে রাখতাম, এখন সব অন্য কাউকে দেওয়া হয়েছে। এসব হবেই তা জানতাম, তবু এগুলোকে আমি সহজভাবে নিতে পারতাম না।

 

কেউ আবার ভেবেছিলেন তাঁদের ছেড়ে আসতে আমার কষ্ট হয়নি-এমন যদি হত তাহলে অমানুষ ভাবতে হত আমাকে। দীর্ঘ ছত্রিশ বছর ধরে আমার বিশ্বস্ত সহকর্মী ছিলেন তাঁরা, পাশাপাশা টেবিলে বসে একই রকম পরিশ্রম করতে হয়েছে আমাদের, মাঝে মাঝে হাসি মজা ঠাট্টায় আমার কর্মজীবনের রুক্ষ ও বন্ধুর পথযাত্রা সহনীয় করে রেখেছিলেন তাঁরা। এখন আবার ভাবি, আমার পথ কি সত্যই রুক্ষ ও বন্ধুর ছিল? নাকি আমিই একটা নিছক কাপুরুষ ছিলাম। যাই হোক আজকে এ নিয়ে পরিতাপ করে লাভ নেই। আমি জানি এইরকম পরিস্থিতিতে মানুষের মন এই ধরনের কিছু ভ্রম নিজেই তৈরি করে। কিন্তু তবুও একটা অনুশোচনা গুমরে উঠছিল মনের মধ্যে। তাদের সঙ্গে আমার বন্ধন আমি হটাৎ করেই ছিন্ন দিয়েছি। এটা অন্তত শিষ্টাচারসম্মত হয়নি। এই বিচ্ছেদের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে আমার আরও কিছু সময়ের প্রয়োজন হবে। তাহলে বিদায় বন্ধুগণ, তবুও তা যেন দীর্ঘকালের জন্য না হয়, কারন যদি তোমরা অনুমতি দাও আমি তোমাদের কাছে মাঝে মাঝে আসতে চাই। বিদায় চ-, তুমি ছিলে রুক্ষ স্বভাবের, কথা বলতে কাটা কাটা, অথচ আসলে বন্ধুভাবাপন্ন; ক-, তুমি মৃদু স্বভাবের, ধীর গতিতে চলতে তুমি, এবং আসলেই একজন ভদ্রলোক ছিলে, ড-, খুব রীতিমাফিক চলতে, অথচ এগিয়ে এসে সাহায্য করতে, আর তুমি-, হে ইট আর কাঠের  স্তুপ- গ্রীষ্মে অথবা হুইটিংটনের মত কোন বিশাল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অফিস বাড়ী হওয়ার যোগ্যতা ছিল তোমার – গোলক ধাঁধার মত তোমার চলাচলের রাস্তা, অসূর্যস্পর্শা তোমার বদ্ধ ঘরগুলো, যেখানে বছরের অর্ধেক দিন মোমবাতিতেই সূর্যালোকের কাজ চলত, আমার কষ্টের কারনগুলির অন্যতম অস্বাস্থ্যকর অংশীদার, হে আমার জীবিকার কঠোর এবং অচঞ্চল পালনগৃহ, তোমাকেও বিদায়। আমার লিখিত সমস্ত পুঁথিপত্র কোন ভ্রাম্যমান পুস্তক বিক্রেতার অপ্রচলিত গ্রন্থ সংগ্রহের মধ্যে নেই। আছে আমার কাছে।

 

তাহলে আলমারির তাকের উপর অজস্র ফাইলে পরিপূর্ণ আমার সেই সব পরিশ্রমের ফল আখন আমার মতই বিশ্রাম নিক্ল। আমার এখানকার সমস্ত পরিচয়, সব কর্মফল আমি তোমাদের দান করে গেলাম।

 

এই লেখা শুরু করার পর প্রায় পনের দিন হয়ে গেছে। সেই সময় আমি অনুভব করেছিলাম যে ধীরে ধীরে নিস্তরঙ্গ হয়ে আসছে আমার মন। কিন্তু পূর্ণ প্রশান্তি তখনও আসেনি আমার মধ্যে। আমি খুব শান্তি অনুভব করছি এটা খুব গর্ব করে বলেছিলাম বটে। কিন্তু সে মন্তব্য আসলে শুধু তুলনামূলক। অন্য ধরনের একটা অস্থিরতা ছিল মনের মধ্যে। একটা চিন্তায় ফেলে দেওয়া নতুনত্ব। দুর্বল অনভ্যস্ত চোখে হঠাৎ আলোর ঝলকানি এলে যেমন হয়। আমার পুরনো শিকলগুলো এতদিন ধরে আমার পোষাকের মত হয়ে গিয়ে ছিল। আজকে আমি যে তার অভাব বোধ করছিলাম তার মনে মনে। আমি যেন কার্থুসিয়ান চার্চের একজন সন্ন্যাসী মাত্র, যাকে তার প্রকোষ্ঠে আবদ্ধ জীবনের কঠিন শৃঙ্খলা থেকে হটাৎ  করেই কোন এক বিপ্লবের মাধ্যমে সাধারন মানুষের মাঝখানে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এখন আমার এও মনে হয় যেন আমি সর্বদাই আমার নিজের প্রভু ছিলাম। আমার পক্ষে যেখানে খুশি যাওয়া বা যা খুশি করা এ সবই যেন খুব স্বাভাবিক। কোন কোন দিন বেলা এগারটার সময় বন্ড স্ট্রীটে গিয়ে হাঁটতে থাকি, এমন একটা ভাব করে যেন আমি সেখানে এই রকম সময়ে গত একবছর ধরেই হাঁটাহাঁটি করি। কখনও কখনও নিজের মধ্যে একটা বৈচিত্র আনতে সোহোতে চলে যাই, একটা বইয়ের দোকানে গিয়ে উল্টেপাল্টে দেখি। তখন মনে হয় গত তিরিশ বছর ধরেই আমি বই ও শিল্পবস্তু সংগ্রহ করে আসছি। এরমধ্যে আশ্চর্য্য হওয়ার মত বা নতুন কিছু নেই। কোন কোন দিন সকালবেলায় সংগ্রহশালায় কোন সুন্দর ছবির সামনে দাঁড়িয়ে থাকি আমি। তখন মনে হয় এছাড়া অন্যরকম কি হয়েছে কখনও? ফিস স্ট্রীট হিল এর এখন কি অবস্থা, ফেন চার্চ স্ট্রীটই বা কোথায়? প্রাচীন মিন্সিং লেনের পাথরেরা, ছত্রিশ বছর ধরে আমার প্রাত্যহিক তীর্থযাত্রায় তোমাদের সঙ্গে আমিও ক্ষয় হয়েছি, এখন তোমাদের চকমকি পাথরের দেহ আবার কোন শ্রান্ত করনিকের পদশব্দে মুখরিত? এখন আমি ঝলমলে আনন্দ মুখর পরিবেশই বেশি পছন্দ করব। এখন সবকিছু পাল্টানোর সময় হয়েছে আর আমি এলজিন এর মর্মর শোভার মধ্যে দাঁড়িয়ে এখন। আমার পরিস্থিতিটা যে আমি অন্য একটা জগতে চলে যাওয়ার সঙ্গে তুলোনা করেছি সেটা মোটেই অতিকথন নয়। সময় আমার কাছে এখন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। ঋতুর বৈচিত্রও আজকাল আর আমি খেয়াল করিনা। সপ্তাহ, তারিখ ও মাস সবগুলোই ভুলতে থাকি আমি।

 

আগে প্রত্যেকটা দিন আমি পৃথকভাবে অনুভব করতাম। এই পার্থক্যের অনেকটা আসত পরবর্তি রবিবার থেকে তার দুরত্ব অথবা বিদেশ থেকে ডাক আসার দিন থেকে হিসেব করে, বুধবারের অনুভুতি, শনিবার রাত্রের প্রত্যাশা এ সবের আলাদা আলাদা অস্তিত্ব ছিল। প্রতিটা দিনের নিজস্বতার প্রভাব আমার ওপর পড়ত সারাদিন ধরে – আমার ক্ষুধা – তৃষ্ণা, মানষিক উৎসাহ কোন কিছুই তার প্রভাবের বাইরে ছিল না। রবিবারের আনন্দের ওপরে থাকত পরের দিনের অপচ্ছায়া, তার পিছনেই থাকত বিষন্ন পাঁচটি দিন।

 

ইথিওপিয়ার কাল মানুষদের চেহারার দিনগুলো এরকম গৌরবর্ণ হয়ে গেল কোন যাদুতে? সেই কৃষ্ণ সোমবারই বা কোথায় এখন? এখন সব দিনই সমান। এমন কি সাধারন ছুটির দিন হিসাবে যা প্রায়ি দুর্ভাগ্যজনকভাবে হতাশ করত সেই রবিবারও এখন সাধারন একটা দিনে বিবর্তিত হয়েছে – সপ্তাহান্তে পলাতকের মত তার কাছে আমার আশ্রয় নেওয়ায় আর সর্বাধিক পরিমাণ আনন্দ তার থেকে আদায় করার অতিচেষ্টার আজ আর প্রয়োজন নেই।

 

ছুটির দিনের একটা বড়সড় অংশ গ্রাস করার জন্য অভিযোগ না করেও আমি এখন রবিবার চার্চে যেতে পারি। আমার সব কিছুর জন্য সময় আছে। আমি কোন অসুস্থ বন্ধুকে দেখতে যেতে পারি। প্রচুর কাজকর্ম করে এমন লোককেও সে যখন সব থেকে ব্যস্ত তখন তার কাজের মাঝখানে উপস্থিত হয়ে তাকে থামিয়ে দিতে পারি। এমনকি এই সুন্দর মে মাসের সকালটি আমার সঙ্গে উইন্ডসরে কাটানোর আমন্ত্রন জানিয়ে তাকে অপমানও করতে পারি।

 

এখন আমি তাদের দেখি – সেই সব বেচারা যন্ত্রের মত পরিশ্রমী মানুষদের, যাদের আমি আমার দৈনন্দিন জগতের পেছনে ফেলে এসেছি – সারাদিন তাদের কাজকর্ম সামলানোর ক্লান্তিকর চেষ্টা – যেন ঘানি টানা বলদের মত – একই পথে তারা অনন্তকাল ঘুরেই চলেছে – কিন্তু এই সব কিছু কিসের জন্য?

 

একটা মানুষের নিজস্ব সময় যতটাই থাকনা কেন কখনই তার প্রয়োজনের থেকে বেশি হতে পারেনা। তার নিজের থেকে পৃথিবীতে তেমন কিছু করার নেই এটাও হতে পারেনা। আমার যদি একটা পুত্র সন্তান থাকত আমি তার নাম দিতাম – ‘কিছু না করা’ – সে ধরা বাঁধা কিছুই করবেনা।

 

আমার বিশ্বাস মানুষ যতক্ষন এই ছকে বাঁধা কাজকর্ম নিয়ে ব্যাস্ত থাকে ততক্ষনই সে থাকে তার স্বাভাবিক জীবনের বাইরে। জীবনের যে অন্তর্মুখী ধারা গভীর চিন্তার সঙ্গে যুক্ত তাকেই পেতে চাই আমি। আচ্ছা এমন কোন মহান ভূমিকম্প আসতে পারেনা যে এসে শুধু এইসব অভিশপ্ত সুতোর কলগুলোকে গ্রাস করে নেবে? আপনারা কেউ আমার ওই ডেস্কটাকে তুলে নিনতো, আর দুরে ফেলে দিন কোন অতল গহ্বরে একেবারে শয়তানের রাজত্বে।

 

আমি আর মিঃ অমুক – অমুক ফার্মের করণিক নয়। আমি এখন সেবানিবৃত্ত, অবসরের মূর্তিমাণ উদাহরণ – আমাকে এখন মধ্যে মধ্যে পাবেন সুন্দর সাজানো বাগানে। ভাবলেশহীন মুখ আর উদ্বেগহীন হাবভাবে লোকে এখন আমায় চেনে – এখন হাঁটাচলা করি অনেক ধীরে ধীরে – কোন নির্দিষ্ট গতি বা কোনও নির্দিষ্ট উদ্দশ্যে নয়। আমি ঘুরে বেড়াই – তবে তা এই জায়গা থেকে ওই জায়গা, এমন কোন নির্দিষ্টভাবে নয়। সবাই বলে আমার মধ্যে একটা সম্ভ্রান্ত ভাব এসেছে। এতদিন এটা আমার আরও অনেক গুনের সঙ্গে কোথাও লুকিয়ে ছিল, এখন যেন ছেয়ে রয়েছে আমাকে। আমি যে ধীরে ধীরে রীতিমত একজন সম্মানিত ভদ্রলোক হয়ে উঠেছি এটা বেশ টের পাওয়া যাচ্ছে। এখন হাতে খবরের কাগজ নেই গান বাজনা অপেরার জগতে কোথায় কী হচ্ছে এই সব পড়বার জন্য। এই পৃথিবীতে আমি যা করবার জন্য এসেছিলাম সবই করা হয়ে গেছে। আমার দিনের কর্ম শেষ। এখন বাকি সময়টা আমার নিজের।

 

মূল লেখকের জীবনী

‘চার্লস ল্যাম্বের জন্ম ১০ই ফেব্রুয়ারি ১৭৭৫ সালে ‘ইনার টেম্পলে’, পড়াশুনা ‘ক্রাইস্ট হসপিটালে’, কর্মক্ষেত্র ‘ইস্ট ইন্ডিয়া হাউস’এ একজন করনিক হিসেবে, তেত্রিশ বছর চাকুরি জীবনের পর ১৮২৫ সালে অবসর প্রাপ্ত হন। তিনি বর্তমানে একজন ঝামেলামুক্ত শান্তশিষ্ট ভদ্রলোক। একবার তিনি উড়ন্ত চড়াইপাখীকে ধরে ফেলেছিলেন, এছাড়া বড় মুখ করে বলার মত নিজের জীবনের কোন বিশেষত্ব তাঁর মনে পড়ে না, চেহারার গড়ন মাঝারি আকৃতির। মুখটা অনেকটা ইহুদীদের মত। তবে তাঁর গাত্রবর্ণে কোন ইহুদীত্বের আভাষ নেই। খুব দুঃখজনকভাবে তোতলাতে থাকেন। তাই তাঁর কথোপকথন সুদীর্ঘ বক্তৃতার চেয়ে ছোট্ট শ্লেষ অথবা মন্তব্যে বেশিরভাগ সময় সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে তাঁকে অনেকেই সর্বদা চাতুর্যপূর্ণ কথা বলার অভিযোগে অভিযুক্ত করে থাকেন। অবশ্য তিনি এই রকম একজন অভিযোগকারিকে বলেছিলেন যে সর্বদা চাতুর্যপূর্ণ কথা বলা চেষ্টা করা সর্বদা সাদামাটা কথা বলার থেকে খারাপতো কিছু নয়। পরিমানে কম খান, তবে পানের ব্যাপারটা তা নয়। একসময় প্রচুর সিগারেট খেতেন, এখন তাঁকে বরং একটা মৃত আগ্নেয়গিরির সঙ্গে তুলনা করা যায়। মাঝেমাঝে ধোঁয়া ছাড়তে থাকেন। জনসাধারণের প্রতি তাঁর করা অপরাধের মধ্যে আছে ‘রোসামান্ড গ্রে’ নামে প্রকাশিত একটি গল্প, ‘জন উইভিল’ নামে একটা ছোট নাটক, ‘ফেয়ারয়েল টু টোবাকো’ নামে আর একটি রচনা আর কিছু কবিতা। যেগূলোকে ছোট ছোট দুটো বইয়ের মধ্যে বাঁধিয়ে ঘটা করে তাঁর ‘কাজ’ বলে চালানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু আসলে এগুলো মোটেই তাঁর কাজ ছিলনা, বরং আত্মবিনোদন ছিল বলা যায়। তাঁর সত্যিকারের ‘কাজ’ পাওয়া যাবে লিওডনহল স্ট্রিটে, শখানেক ফাইল সেগুলো দিয়ে ভর্তি হয়ে আছে। এছাড়া তিনিই হচ্ছেন সত্যকারের ‘ইলিয়া’, দুএক বছর আগে একটা ছোটখাট বই হিসেবে প্রকাশীত যার প্রবন্ধগুলি এখনও বেঁচেবর্তে রয়েছে। আর তিনি নিজে এখন পর্যন্ত যা করেছেন বা করবার আশা করতে পারেন তার থেকে ওই অর্থশূণ্য ‘ইলিয়া’ নামটাই তাঁকে পরিচিতি এনে দিয়েছে। এছাড়া ‘শেক্সপিয়ারের সমকালিন ইংরাজ নাট্যকার বলে পনের বছর আগে প্রকাশিত একটি রচনায় তিনি জনসাধারনের দৃষ্টি প্রথম এদিকে আকর্ষণ করেন। তিনি ১৮.. সালে মারা যান। অনেকেই তাঁর মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলেন।’

৮২৩ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
আমার জন্ম পিরোজপুরে নানা বাড়িতে। দাদা বাড়িও পিরোজপুরে। পিরোজপুর শহরের সার্কিট হাউজ – ফায়ার সার্ভিস এর মাঝখানে আমাদের বাড়ি। পিরোজপুর আমার কাছে স্বপ্নের শহর। যদিও ক্লাস থ্রী থেকে আমি ঢাকাতে মানুষ। এসএসসি ১৯৯৬ সালে। পড়াশুনা করেছি ফার্মেসিতে, পরে এমবিএ করেছি আন্তর্জাতিক বিপননে। জুলাই ১৫, ২০১১ থেকে সব ধরনের রাজনৈতিক আলোচনা থেকে অবসর নিয়েছি। বিশেষ ব্যক্তিত্বঃ নবিজী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বঃ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান যে ব্যক্তিত্ব আমাকে টানেঃ ডঃ মুহম্মদ ইউনুস প্রিয় লেখকঃ মুহম্মদ জাফর ইকবাল, হুমায়ুন আহমেদ, হেনরি রাইডার, জুল ভান প্রিয় টিভি সিরিয়ালঃ Spellbinder, Spellbinder 2: Land of the Dragon Lord, The girl from tomorrow, Tomorrows end, Time Trax, MacGyver, Alice in Wonderland, The Chronicles of Narnia প্রিয় টিভি নাটকঃ কোথাও কেউ নেই, অয়োময়, রুপনগর, বহুব্রিহী, বার রকম মানুষ প্রিয় টিভি শোঃ ইত্যাদি, সিসিমপুর, Pumpkin Patch Show লেখালেখি আমার শুধু শখই না, মনে হয় যেন রক্তের টান। বিশেষ করে বিজ্ঞান-কল্পকাহিনি। বিজ্ঞান-কল্পকাহিনি আমার কাছে রঙ্গিন ঘুড়ির মত। কল্পনার সীমানা পেরিয়ে যে ছুটে চলে মহাজগতিক পরিমণ্ডলে। এ যেন সময়টাকে স্থির করে দিয়ে এর আদি-অন্ত দেখার মত। তারপরও এ ঘুড়ি যেমন ইচ্ছে তেমন উড়তে পারে না, সুতোয়ে টান পড়ে বলে। এ টান যুক্তির টান। যৌক্তিক কল্পনা বললে ভুল হয় না। তারপরও নিজ ইচ্ছেয়ে সুতোটাকে ছিঁড়ে দিতে ভাল লাগে মাঝে মাঝে। আমি যেমন নিজে স্বপ্ন দেখি তেমনি সবাইকে স্বপ্ন দেখাতে চাই। অঞ্জন দত্তের ভাষায় বলতে হয়, ‘মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যখন-তখন কান্না পায়, তবু স্বপ্ন দেখার এই প্রবল ইচ্ছাটা কিছুতেই মরবার নয়।’ কনফুসিয়াসের এই লাইন টা আমাকে খুব টানে … journey of a thousand miles begins with a single step। আমার প্রথম লেখা প্রকাশ হয় ১৯৯৬ সালে আধুনালুপ্ত বিজ্ঞান সাপ্তাহিক আহরহ তে। আমার নিজের একটা ব্লগ আছে, mahkbd.blogspot.com। আমার ইমেইল mahkbd@gmail.com।
সর্বমোট পোস্ট: ৯৬ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ১৫৫ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৫-১১ ০৩:১৪:৫৫ মিনিটে
banner

৪ টি মন্তব্য

  1. আজিম হোসেন আকাশ মন্তব্যে বলেছেন:

    ভাল লাগল।

  2. আরিফুর রহমান মন্তব্যে বলেছেন:

    আপনার লেখা পরতে আমার খুব ভাল লাগে। আপনাকে ধন্যবাদ।

  3. শাহ্‌ আলম শেখ শান্ত মন্তব্যে বলেছেন:

    সুন্দর লিখেছেন তো !
    অসংখ্য অসংখ্য ভাল লাগা জানিয়ে দিলাম ।

  4. আরজু মন্তব্যে বলেছেন:

    অনুবাদ গল্পটি ভাল লাগল।ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top