Today 17 Oct 2019
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

একজন উইলিয়াম কেরী : খ্রিস্ট সমাজ বনাম বাংলা ভাষাভাষী

লিখেছেন: আহমেদ ফয়েজ | তারিখ: ২৪/০৮/২০১৩

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 926বার পড়া হয়েছে।

11

আহমেদ ফয়েজ

হায়দারাবাদ এর একটা কলেজ ক্যাম্পাসে আমি তিন সপ্তাহ ছিলাম। পাশে একটা স্কুলও। স্কুলের কপালের উপরে লেখা আছে “Expect great things from God, Attempt great things for God” লেখাটির তাৎপর্য ও উৎপত্তি নিয়ে তেমন মাথা ঘামাইনি। তবে আজ প্রায় চার বছর পর লেখাটির উৎপত্তি পেয়ে লেখা প্রকাশের স্থানটির তাৎপর্যও আমার কাছে নতুনভাবে উদ্ভাসিত হলো। উক্তিটি বাইবেল থেকে নেওয়া হলেও মহাত্মা ড. উইলিয়াম কেরী’ই এর সার্থক প্রয়োগকারী। এমন আরো কত হাজারো উক্তিকে তিনি প্রতিষ্ঠা করে গেছেন আমাদের জন্য তার কয়টার খোঁজ খবর আমরা রাখি বা রাখতে পেরেছি?
ড. উইলিয়াম কেরী’র এই উপমহাদেশে আগমনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমরা জানি। এবং এক বাক্যে আমরা সবাই বলে ফেলি যে খ্রিষ্ট ধর্ম প্রচারের লক্ষ্যেই এই দেশে আগমন ঘটে এই মহামহিম এর। কিন্তু ওই একটি উদ্দেশ্যে আসার পর ভাষা, সংস্কৃতি ও অর্থ ব্যবস্থাকে তিনি কিভাবে ঢালাও করে সাজিয়েছেন এবং এর পরে সমগ্র ভারতীয় সভ্যতা যে একটা নতুন মাত্রা পেয়েছে সে বিষয়টিকে কিন্তু আমরা কেবল গবেষণার উপাদান হিসেবে রেখে দিয়েছি।
গত ১৭ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যপ্টিস্ট চার্চ সংঘ এই মহান ব্যক্তির ২৫২ তম জন্মদিন উদযাপন করেছে। উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন চেয়ারম্যান প্রফেসর আবুল কাসেম ফজলুল হক, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগের শিক্ষক ড. সাইম রানা।
অনুষ্ঠানে ড. উইলিয়াম কেরীর স্মৃতি ও তার সৃষ্টিকে আরো বিশদাকারে চর্চা করার জন্য বাংলাদেশ ব্যপ্টিসট চার্চ সংঘের প্রতিষ্ঠিত ড. উইলিয়াম কেরী মেমোরিয়াল লাব্রেরী এন্ড রিসার্চ সেন্টার এর উদ্বোধন করা হয় এবং কেরীর একটি মুরালও প্রতিষ্ঠা করা হয় প্রতিষ্ঠান ক্যাম্পাসে। অনুষ্ঠানটিতে সভাপতিত্ব করেন জনাব জয়ন্ত অধিকারী, সভাপতি- বাংলাদেশ ব্যাপ্টিস্ট সংঘ।

সাহিত্যের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলেই মোটামোটি অবগত আছেন যে, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস অনেক পুরনো হলেও বাংলা গদ্যসাহিত্যের চর্চা শুরু হয়েছে প্রায় দুশো বছর আগে। বাংলা গদ্যসাহিত্যের পথপ্রদর্শক হলেন এই বৃটিশ নাগরিক। উইলিয়াম কেরিকেইই বলা হয় বাংলা ভাষায় গদ্য চর্চার পথিকৃৎ। তিনিই পদ্যের গঠনে বাংলা ভাষা রীতির প্রচলন ভেঙে গদ্য আহিবের ব্যবহার শুরু করেন।
উইলিয়াম কেরি ১৭৬১ সালের ১৭ আগস্ট ইংল্যান্ডের নর্দাম্পটনশায়ারের এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। প্রথম জীবনে তিনি জুতা তৈরি ও মেরামতের কাজ করতেন। তবে শৈশব থেকেই ধর্ম ও জ্ঞানচর্চার প্রতি তার আগ্রহ ছিল প্রবল। টমাস জোন্সের কাছে তিনি গ্রিক ও লাতিন ভাষা শিক্ষা এবং বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল প্রভৃতি বিষয়ে জ্ঞানলাভ করেন। ১৭৮৬ সালে উইলিয়াম কেরি মোল্টন গ্রামে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৭৯২ সালে তার নেতৃত্বে খ্রিস্টানদের মধ্যে খ্রিস্টধর্ম প্রচার করার উদ্দেশ্যে কেটারিং শহরে একটি সমিতি গঠিত হয়। এ সময় খ্রিস্টধর্ম প্রচারের পন্থা সম্পর্কে ইংরেজি ভাষায় তিনি একটি বই লেখেন। ১৭৯৩ সালে ব্যাপ্টিস্ট মিশন থেকে তাকে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের জন্য ভারতে পাঠানো হয়। কেরি, তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র ফিলিক্স, স্ত্রী ও কন্যাসহ একটি ইংরেজ জাহাজে চেপে ১৭৯৩ সালের ১১ নভেম্বর সপরিবারে কলকাতায় এসে নামেন। কলকাতায় পৌঁছে তাঁবু প্রস্তুত ও মেরামতির কাজ করে তাঁদের জীবনধারণ ও মিশন স্থাপনের জায়গা প্রস্তুত করতে হয়। স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে সংযোগস্থাপনের জন্য তাঁরা বাংলা ভাষা শিখতেও শুরু করেন। তারপর বাংলা ভাষা শেখা এবং এদেশের কৃষ্টি-সংস্কৃতিকে জানার জন্য বিখ্যাত বাঙালি পন্ডিত রাম বসুকে প্রাইভেট সেক্রেটারী নিয়োগ করেন এবং তার সহায়তায় বাংলায় ‘বাইবেল’ অনুবাদ করেন। তখন থেকেই তিনি বাংলা ভাষার প্রতি আকৃষ্ট হন এবং ১৭৯৪ সালে তিনি বাংলা ভাষায় একটি শব্দকোষ ও একটি ব্যাকরণ রচনা করেন। এবছর অর্থাৎ ১৭৯৪ সালে কেরি মালদহের মদনবাটি নীলকুঠির তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত হন। স্থানীয় কৃষক-প্রজাদের শিক্ষার সুবিধার্থে এখানে তিনি বিদ্যালয় স্থাপন করেন। ১৭৯৭ সালে বই ছাপানোর উদ্দেশ্যে দেশি হরফ তৈরির কারখানা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলে তার সঙ্গে চার্লস উইলকিন্সের শিষ্য পঞ্চানন কর্মকারের পরিচয় হয়। এ সময় পঞ্চানন কর্মকারও এ মিশনের ছাপাখানায় যোগ দেন। কেরি ও পঞ্চাননের যৌথ প্রচেষ্টায় ‘মিশন সমাচার’ নামে বই ছাপার মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষায় প্রথম মুদ্রণকাজের সূচনা হয়। পরে শ্রীরামপুর থেকে কেরির নেতৃত্বে প্রায় ৪০টি ভাষা ও উপভাষায় খ্রিস্টধর্মীয় গ্রন্থের অনুবাদ প্রকাশিত হয়।
এরপর নীলকুঠি বন্ধ হয়ে গেলে কেরি কিছুকাল খিদিরপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস করে ১৭৯৯ সালের শেষদিকে জোশুয়া মার্শম্যান, উইলিয়াম ওয়ার্ড, গ্রান্ট প্রমুখ মিশনারির সঙ্গে শ্রীরামপুরে যোগ দেন এবং ১৮০০ সালের জানুয়ারিতে শ্রীরামপুর মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮০০ সালের আগস্ট মাসে তিনি মথি লিখিত ‘মিশন সমাচার’ শ্রীরামপুর প্রেস থেকে মুদ্রিত করেন ও প্রকাশ করেন। এটাই প্রথম গদ্যপুস্তক। ১৮০১ সালের ৪ মে কলকাতায় সদ্য প্রতিষ্ঠিত ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা ভাষার অধ্যাপক হিসাবে যোগ দেন। এখানে ভাষা শিক্ষাদানের দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি ভারতীয় ভাষাগুলো, বিশেষ করে বাংলা ভাষার সর্বাঙ্গীণ উন্নতিসাধনে আত্মনিয়োগ করেন। সুশৃঙ্খলভাবে ভাষা শিক্ষাদানের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব পূরণের উদ্দেশ্যে তিনি পাঠ্যপুস্তক, ব্যাকরণ এবং অভিধান রচনা করেন। তার অধীন পÐিতদেরও তিনি এই কাজে উৎসাহিত করতে থাকেন। ১৮০৬ সালে কেরি কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্য হন। ১৮০৭ সালে আমেরিকার ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ‘ডক্টর অফ ডিভিনিটি’ উপাধিতে ভূষিত করে।
কেরির রচিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় অর্ধশত। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো গ্রামার অফ দ্য বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ (১৮০১ সালে ইংরেজি ভাষায় রচিত), ডায়ালোগস (বাংলা-ইংরেজি দ্বিভাষিক গ্রন্থ, ১৮০১), ইতিহাসমালা (গল্পসংগ্রহ, ১৮১২), বাংলা-ইংরেজি অভিধান (১৮১৫-২৫), চার খÐে ওল্ড টেস্টামেন্ট বা ধর্মপুস্তক (১৮০২-০৯, হিব্রু থেকে অনূদিত)। এছাড়া তিনি মারাঠি ব্যাকরণ ও অভিধান এবং পাঞ্জাবি ব্যাকরণ, তেলিঙ্গা ব্যাকরণ, কানাড়ি ব্যাকরণ প্রকাশ করেন। তিনি ওড়িয়া, পাঞ্জাবি, সংস্কৃত ও অসমিয়া ভাষায়ও বাইবেল অনুবাদ করেন। জোশুয়া মার্শম্যানের সঙ্গে মিলে তিনি মূল বাল্মীকি রামায়ণের অযোধ্যাকা- পর্যন্ত ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করে তিন খÐে প্রকাশ করেন। ‘এ ইউনিভার্সাল ডিকশনারি অফ দি ওরিয়েন্টাল ল্যাঙ্গুয়েজেস’ নামের সংস্কৃতসহ ১৩টি ভারতীয় ভাষায় এক সমন্বিত শব্দকোষ কেরির অসামান্য পাÐিত্যের স্মারক হিসেবে চিহ্নিত। কিন্তু এই শব্দকোষের পাÐুলিপির কিছু অংশ অগ্নিকাÐে বিনষ্ট হওয়ায় এর মুদ্রণ সম্পন্ন হতে পারেনি। উইলিয়াম কেরি বাংলা ভাষায় ‘কথোপকথন’ (১৮০১) ও ‘ইতিহাসমালা’ (১৮১২) গ্রন্থ রচনা করেন। ওই সময় তার উদ্যোগে ৪০টি ভাষায় খ্রিস্টধর্মের বিভিন্ন গ্রন্থ প্রকাশ হয়। তিনি বাংলা হরফের সংস্কার, অন্যান্য ভারতীয় ভাষার হরফ তৈরি করেন। রচনা করেন বাংলা ব্যাকরণ ও বাংলা-ইংরেজি অভিধান। তার উদ্যোগে ১৮১৮ সালে ‘ফ্রেন্ড অফ ইন্ডিয়া’ নামে একটি পত্রিকাও প্রকাশিত হয়। পুস্তক রচনা, অনুবাদ ও প্রকাশের পাশাপাশি বাংলা হরফের সংস্কার এবং অন্যান্য ভারতীয় ভাষায় হরফ তৈরির কাজেও তিনি উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন।
উইলিয়াম কেরি ১৮২২ সালে বিখ্যাত লিনিয়ান সোসাইটির এবং ১৮২৩ সালে লন্ডন জিওলজিক্যাল সোসাইটি ও রয়াল এগ্রিকালচারাল সোসাইটির সদস্য হন। ১৮২৩ সালে ভারতবর্ষে তিনিই প্রথম এগ্রি-হর্টিকালচারাল সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮২৪ সালে কেরি তৎকালীন বৃটিশ সরকারের বাংলা অনুবাদক নিযুক্ত হন। ১৮৩১ সাল পর্যন্ত ৩০ বছর ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে অধ্যাপনা জীবনে তিনি বাংলা ভাষার ব্যাকরণ, অভিধান, পাঠ্যপুস্তক ছাড়াও ভারতীয় আরো অনেক ভাষায় বাইবেল অনুবাদ এবং ব্যাকরণ ও অভিধান সংকলন করে প্রকাশ করেছিলেন। ১৮৩১ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে অধ্যাপনা থেকে অবসর নিয়ে তিনি পরবর্তী এক বছর শ্রীরামপুর কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন।
উইলিয়াম কেরি ভারতবর্ষের জ্ঞান বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৮৩৪ সালের ৯ জুন শ্রীরামপুরে তার জীবনাবসান ঘটে। একদা পাদুকা নির্মাতা উইলিয়াম কেরি বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিকাশে যে অনন্য ভূমিকা রেখেছিলেন তা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। আধুনিক মিশনসমূহের জনক (“father of modern missions”) বাংলা গদ্যসাহিত্যের পথপ্রদর্শক, বাংলা প্রেমিক উইলিয়াম কেরি ব্যাপ্টিস্ট মিশনারি সোসাইটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।

এক নজরে উইলিয়াম কেরী’র সংক্ষিপ্ত জীবন
১৭৬১ সালের ১৭ আগস্ট ইংল্যান্ডের নর্থহাম্পাটনশায়ারের পলাইপুরী গ্রামে উইলিয়াম কেরী জন্মগ্রহণ করেন ।
১৭৭৯ সালে তিনি ননকনফরমিস্ট সম্প্রদায়ভুক্ত হন।
১৭৮১ সালের অক্টোবর মাসে বিশ্ববাসীর অবগাহন প্রার্থী হন এবং নর্থ হ্যাম্পটনের জন রাইল্যান্ড নামে এক বিশিষ্ট চালক দ্বারা রাইন্ডলিন নদীতে অবগাহিত হন।
১৭৯২ সালে উইলিয়াম কেরীর বিখ্যাত পুস্তিকা ‘অনুন্ধান’ প্রকাশিত হয়।
১৭৯২ সালের ৩১ অক্টোবর চালক সংঘের সভায় ‘প্রথম ইংলিশ মিশনারী’ সোসাইটি স্থাপিত হয়।
১৭৯৩ সালের ১৩ জুন  এই উপমহাদেশের মানুষের জন্যে স্মরণীয় দিন। এদিন কেরী উপমহাদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন।
১৭৯৩ সালের ১১ নভেম্বর ৩১ বছর বয়সে কেরী ও তার সহযাত্রীগণ কলকাতায় অবতরণ করেন।
১৭৯৩ সালে কলকাতায় এসেই তিনি একটি অবৈতনিক দৈনিক পাঠশালা খোলেন আর সাথে সাথে তিনি হিন্দু মুসলমান যুবকদের জন্যে মদনাবাটিতে একটি এবং রামপাল দীঘিতে একটি কলেজ স্থাপন করার চিন্তা প্রকাশ  করেন।
১৭৯৬ সালের গ্রীষ্মে উইলিয়াম কেরী ৩ বৎসরের কম সময়ের মধ্যে বাইবেলের নতুন নিয়মের অনুবাদ প্রায় শেষ করেন। পেন্টাটিউকের এর বেশ খানিকটা অংশও তিনি এ সময় অনুবাদ করেন।
১৭৯৮ সালে শ্রীরামপুর ছাত্রাবাস স্থাপন।
১৮০০ সালে স্থাপন করেন শ্রীরামপুর ব্যাপ্টিস্ট মিশন।
১৮০০ সালের ৫ মার্চ সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায় নতুন নিয়ম ছাপিয়ে প্রকাশ করেন। এটিকে বাংলা ভাষার প্রথম গদ্য সাহিত্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
১৮০০ সালেই তিনি বালকদের জনে প্রথম অবৈতনিক দৈনিক স্কুল স্থাপন করেন এবং পুরাতন নিয়মের মাত্র দুটো পুস্তক ছাড়া সম্পূর্ণ বাইবেল অনুবাদ শেষ করেন।
১৮০১ সালের মে মাসে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা ভাষার শিক্ষক নিযুক্ত হন।
১৮০১ সালের আগস্ট মাসে কেরীর লেখা কথোপকথন প্রকাশিত হয়। এটি ইংরেজীতে dialogues বা Colloguies নামে বিখ্যাত।
১৮০১ সালেই বাংলা ব্যাকরণ বইটি প্রকাশিত হয়
১৮০৬ সালের হিন্দি, উড়িয়া, মারাঠি ও সংস্কৃত ভাষায় নতুন নিয়ম অনুবাদ করতে আরম্ভ করেন। ফলে কেরীর জীবিত অবস্থায় ৩৪টি ভাষায় সম্পূর্ণ বাইবেল অথবা বাইবেলের অংশ বিশেষ অনূদিত হয়।
১৮০৬ সালে এশিয়াটিক সোসাইটি তাকে সভ্যপদ দান করে।
১৮০৭ সালে বাউন ইউনিভার্সিটি তাকে সম্মান সূচক ডক্টর অফ ডিভিনিটি ডিগ্রি প্রদান করেন। এ বছরই তার প্রথম স্ত্রী ডরোথী প্লাকেট মৃত্যুবরণ করেন।
১৮০৮ সালে তিনি সার্লট রুউমোরকে বিয়ে করেন।
১৮০৯ সালে পূর্ণাঙ্গ বাইবেলটি বাংলা ভাষায় ছাপানো হয়।
১৮১২ সালের ১১ মার্চ সন্ধ্যায় তার প্রতিষ্ঠিত শ্রীরামপুর ছাপাখানায় আগুন লাগে। এতে পুস্তক, অনুলিপি, টাইপসহ অনেক মূল্যবান সম্পদ সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়। ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। এ সংবাদ কলকাতা পৌঁছাবার পর এক সপ্তাহের মাঝে সেখান থেকে আট হাজার দুইশত টাকা সংগৃহীত হয়েছিল। ইংল্যান্ডে খবর যাবার দুই মাসের মধ্যে প্রায় এক লাখ ৪২ হাজার টাকা সংগৃহীত হয়। এ বছরই কেরীর ইতিহাস মালা পুস্তকটি প্রথম প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থে ১৫০টি শিরোনামের নানা স্থানের ১৪৮টি গল্প মুদ্রিত হয়।
১৮১৪ সালে ভারতবর্ষের জনসাধারণের জন্যে বিজ্ঞান শিক্ষা বিষয়ক প্রস্তাব Plan for instructing native inhabitants of India in European Sciences সরকারের কাছে পেশ করেন।
১৮১৭ সালে দেশীয় ছাত্রদের মাঝে পুস্তকের অভাব মেটানোর উদ্দেশ্যে কলকাতা স্কুল বুক সোসাইটি স্থাপিত হয়। এ বছরই উইলিয়াম কেরীর নেতৃত্বে ৪ জন বাঙালী হিন্দু, ৪ জন মৌলভী ও বাকি ১৬ জন ইউরোপীয় নিয়ে এর পরিচালক সমিতি গঠিত হয়।
১৮১৮ সালে তিনটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এগুলো হচ্ছে দিকদর্শন নামে একটি বাংলা মাসিক, সমাচার দর্পণ নামে একটি বাংলা সাপ্তাহিক এবং Friends of India নামে একটি ইংরেজী সাপ্তাহিক। এ বছর শ্রীরামপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। স্কুল পরিচালনার জন্য কলকাতা স্কুল সোসাইটি স্থাপিত হয়। স্কুল কলেজের জন্যে পাঠ্য পুস্তক প্রণয়নের জন্যেও কেরী কাজ শুরু করেন। ভারতে স্ত্রী শিক্ষা প্রবর্তনের পক্ষে এবং সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের জনসাধারণের মনোযোগ আকর্ষণের জন্যে তিনি বিশেষভাবে তৎপর হন।
১৮১৯ সালের বড়লাট পতœী লেডি হেস্টিংসের উৎসাহে ড. কেরী সর্বপ্রথম কৃষি সমিতি স্থাপন করেন।
১৮২১ সালে কেরীর দ্বিতীয় স্ত্রীটিও মারা যান ।
১৮২২ সালে তার জীবনে আরো দুটো বড় ধরনের দুঃখজনক ঘটনা ঘটে। এ বছর তিনি তার যোগ্য পুত্র ফেলিক্স কেরীকে হারান এবং তার বহু পরিশ্রমের ফসল ইউনিভার্সাল ডিকশেনারি বা ভারতীয় ১৩টি প্রধান ভাষার সর্বশব্দ কোষ আগুনে পুড়ে যায়।
১৮২৯ সালে ৫ ডিসেম্বর লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক আইন জারি করে সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ করেন এবং ঐ দিনই এই আইনের বাংলা অনুবাদের জন্যে বিশেষ দূতের মাধ্যমে কেরীর কাছে পাঠান। বৃদ্ধ কেরী সারাদিন ধরে এটি অনুবাদ করে নিজেই বেন্টিঙ্কের হাতে পৌঁছে দেন এবং যে দিন কোন উপাসনায় যোগ না দিয়ে ঘোড়ায় চড়ে কলকাতার আশেপাশের লোকদের এই আইনের কথা জানান।
১৮৩০ সালে কেরী ৩১ বছর যে কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ ছিলেন সেই ফোর্ট উইলিয়াম কলেজটি বন্ধ হয়ে যায়।
১৮৩২ সালে ৭১ বছর বয়সেও কেরী নিয়মিত প্রচার বাংলা ইংরেজীসহ ভারতের বিভিন্ন ভাষায় সাহিত্য চর্চা বক্তৃতা ও বাইবেল অনুবাদ অব্যাহত রাখেন।
১৮৩৪ সালের ৯ জুন ৭৩ বছর বয়সে উইলিয়াম কেরী নামের বাংলা প্রেমিক একটি বিরাট রকমের প্রতিষ্ঠানের মহান কর্মময় জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। তাকে সমাহিত করা হয় শ্রীরামপুর ব্যাপ্টিস্ট মিশনারীদের সমাধি ক্ষেত্রে।

উপরোক্ত আলোচনায় আমরা কেরী’র ভারত বর্ষে আগমনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জেনেছি এবং তার জীবদ্দশায় তিনি কি কি করে গেছেন তা-ও জানার বাকি নেই। কিন্তু সত্যিকার অর্থে বাঙালি জাতি তথা যাদেরকে আমরা শিক্ষিত সম্প্রদায় বলি; যারা এই মহান ব্যক্তির সৃষ্টি কর্মকে উপভোগ করছি ব্যবহার করছি; উইলিয়াম কেরীর জীবন ও সাহিত্যকর্মকে স্বীকৃতি জানানোর মতো কোন ইচ্ছা বা উদ্যোগ কি আমাদের নেওয়া উচিত নয়? উইলিয়াম কেরীর একজন মিশনারী; তিনি বাইবেল অনুবাদ ও ব্যপ্টিস্ট সংঘ প্রতিষ্ঠা ব্যতিত আর কোন কাজটি কেবল খ্রিস্টানদের জন্য করেছেন। তিনি যা করেছেন তা সমগ্র বাঙালি তথা সমগ্র ভারতবর্ষের জন্য করেছেন। আজকে কেরীকে স্মরণ করা হয় কেবল তার জন্ম ও মৃত্যু দিবসে। তা-ও স্বল্প পরিসরে এবং কেবল একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায় দ্বারা। কেরী খ্রিস্টানদের জন্য যা করেছেন তার চেয়ে শত গুণ বেশী কাজ করেছেন এই দেশের ভাষা, সাহিত্য, আইন, কৃষি, উদ্ভিদ বিজ্ঞান, লাইব্রেরী সাইন্স, গভর্ণমেন্ট অনুবাদক ও সামাজিক সমস্যা যেমন সতীদাহ প্রথা বাতিলের আইন পাশ, গঙ্গায় শিশু বিসর্জন বন্ধকরণ সহ নানা বিষয় নিয়ে। তাই সভ্যতার ডিজাইনার এই মহামহিম ব্যক্তির জন্ম ও মৃত্যু দিবস নয় কেবল তিনি যেসব কাজে উন্নয়ন করেছেন রাষ্ট্রিয় ভাবে সেগুলোকে স্বীকৃতি প্রদান ও তার বিশেষ দিনগুলো রাষ্ট্রিয়ভাবে স্মরণ করে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আমাদের সকলের অন্যতম প্রধান কর্তব্য। ধর্মের ব্যানারে ফেলে একজন কারিগরকে পেছনে রাখা মানে তার সৃষ্টিকর্মকে ফেলে রাখা; বাঙালির ভাষা, সাহিত্য, আইন, সমাজব্যবস্থা ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে আড়ালে রাখা।

১,০১৭ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
লেখালেখির জন্য কাজ করি। পড়ি। লিখি। লেখা হয় কিনা জানি না। কাজ করছি একটি এনজিওতে। এছাড়া পাক্ষিক সময়ের বিবর্তন’র সহকারি সম্পাদক হিসেবে কাজ করছি প্রায় ১০ বছর ধরে।
সর্বমোট পোস্ট: ৩০ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ২৭৪ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৭-০৫ ১৩:২০:৫৮ মিনিটে
banner

১০ টি মন্তব্য

  1. এ হুসাইন মিন্টু মন্তব্যে বলেছেন:

    উইলিয়াম কেরী সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারলাম আপনার পোস্টের মাধ্যমে। ধন্যবাদ ফয়েজ ভাই।

    • আহমেদ ফয়েজ মন্তব্যে বলেছেন:

      কেরী আমাদের ভাষা ও সস্কৃতির সাতে সাংঘাতিক ভাবে জড়িত। তাঁকে বাদ দিয়ে আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতি ও বাঙালি সভ্যতা কল্পনা করা যায় না। অথচ তার নাম গন্ধও আমরা অনেকেই জানি না।
      ধন্যবাদ মন্তব্য করার জন্য।

  2. তাপসকিরণ রায় মন্তব্যে বলেছেন:

    উইলিয়াম কেরীর জীবনী সম্বন্ধে অনেক নতুন তথ্য জানতে পেলাম।আপনাকে জানাই অনেক ধন্যবাদ।

    • আহমেদ ফয়েজ মন্তব্যে বলেছেন:

      ধন্যবাদ তাপসকিরণ রায়। বাংলা ও বাঙালি সংস্কৃতিকে আরো গভীরভাবে জানতে হলে এর শিকড়ে ফিরে যেতে হয় আমাদের। আর সেখানে অনেকের অবদা উল্লেখযোগ্য।

  3. তুষার আহসান মন্তব্যে বলেছেন:

    অনেক অজানা কিছু জানলাম।ধন্যবাদ।

  4. আমির হোসেন মন্তব্যে বলেছেন:

    ফয়েজ ভাই কবিতা ছেড়ে অন্যদিকে মোড় দিচ্ছেন দেখছি। ভাল লাগল। অনেক কিছু শিখলাম।

    • আহমেদ ফয়েজ মন্তব্যে বলেছেন:

      ভাই আমি কিন্তু কবিতার মানুষ না। আমি একবার বলেছিনা যে, বাংলাদেশে কাকের চেয়ে কবি বেশী। আমি সেই ধরনের কবি। আমার বিষয় কিন্তু গবেষণা, প্রবন্ধ, রাজনৈতিক নিবন্ধ। কিন্তু ব্লগের পাঠক তো বড় বড় রচনা পড়ার ধৈর্য্য পাবে না। তাই ব্লগের উপযোগি লেখা পোস্ট করতে হয়।
      মন্তব্য করার জন্য ধন্যবাদ।

      • আহমেদ ফয়েজ মন্তব্যে বলেছেন:

        কবিতা আমি ভালোবাসি। নিজে কবিতা লিখতে না পারলেও কবিতাই আমার প্রথম ভালো লাগা। আমার কেনা বইয়ের মধ্যে প্রথম বইটিই কবিতার।

  5. আঃ হাকিম খান মন্তব্যে বলেছেন:

    কেরীর জীবনী সম্বন্ধে অনেক নতুন তথ্য জানতে পেলাম।আপনাকে জানাই অনেক ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top