Today 18 Feb 2020
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

কাজের মেয়ে-০২

লিখেছেন: জিল্লুর রহমান | তারিখ: ২৪/০৭/২০১৫

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 880বার পড়া হয়েছে।

kajer Mayaসেদিনের পর থেকে তছিরনের চোখে ঘুম নেই। ঠিক আলতার মতো বয়সে তার জীবনে এক অভিশাপ এলো, তো ঠিক আলতার মতো না, তার ওপর ঝড়টা ছিল একটু ভিন্ন। কাজের প্রস্তাব না, তার এলো বিয়ের প্রস্তাব, আয়নালের সঙ্গে। আয়নাল তখন টগবগে যুবক, লম্বা, ফর্সা, রোদে পুড়ে গায়ের ফর্সা রংটা একটু তামাটে হয়ে গেছে, সুঠাম দেহ। তাহোক সারাদিন মাঠে কাজ করে এই চরের জমিতে সে যেন সত্যিকারের সোনা ফলায়, প্রতি বছর কিছু না কিছু জমি কেনে। বাপের একমাত্র ছেলে, কয়েক বিঘা জমি আছে, সারা বছরের খাবার নিজের জমির আবাদ করা ধান থেকেই আসে। কোদালকাটির চরে সে তখন বিয়ের পাত্র হিসেবে আকর্ষণীয়। তখন আয়ানালেরও প্রতিদিন কোন না কোন বিয়ের প্রস্তাব আসছিল।
চার বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে তছিরন প্রথম। সামান্য জমি নিয়ে তছিরনের বাবার এতবড় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তছিরন প্রতিদিন স্কুলে যায় কিন্তু তার পড়ালেখার প্রতি কারো তেমন গুরুত্ব নেই। কোনদিন গেল কী না তারই কোন খেয়াল নেই, এমনদিনে তছিরনের এক দূরসম্পর্কের এক দুলাভাই আয়নালের সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এলো। এমন সুপাত্রের সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাবে যৌতুকের পরিমান একটু বেশি হলেও তার বাবা স্বীকার করল, পরে অবশ্য সেই যৌতুকের দায় মেটাতে তার বাবার আরো এক বিঘা জমি হাতছাড়া হলো। কিন্তু মেয়ের সুখের কথা ভেবে সবাই যেন হাসিমুখে মেনে নিল।
শুরু হলো তছিরনের দাম্পত্য জীবন। জীবনের শুরুটা ভালোই ছিল, দিনে দিনে সংসারের উন্নতি হতে লাগল। কিন্তু এই সুখ, এই স্বাচ্ছন্দ্য বেশিদিন টিকল না। ব্রম্মপুত্রের করাল গ্রাস তাদের প্রায় জমিজমা সব রাতারাতি কেড়ে নিয়ে গেল। চরের জমি এমনই, আজ যে জমিদার কাল সে পথের ভিখারী। শুধু তাদের জমি না, আরো অনেকের জমি নদীগর্ভে বিলীন হলো। কেউ কেউ এই চর ছেড়ে রৌমারী-রাজিবপুর রাস্তার ওপর আশ্রয় নিল, কেউবা মিয়া সাহেবের কাছে অনেক অনুনয় বিনয় করে ঘর করে থাকার, এমনকি দু’য়েক বিঘা আবাদী জমিও বর্গা নিল।
আয়ানালের বাবার সঙ্গে মিয়া সাহেবের বেশ শখ্যতা ছিল সেই সুবাদে মিয়া বাড়িতে আয়নালের যাতায়াত দীর্ঘদিনের। আয়নালের বাবার মৃত্যুর পরও তার যাতায়াতে তেমন বাধা পড়েনি। আয়নালের এই দুর্দিনে মিয়া সাহেব এগিয়ে এলেন, বাড়ি করার জায়গা দিলেন, বর্গা চাষের জন্য তিন বিঘা জমি দিলেন। এসব তছিরনের নিজের চোখে দেখা। এতকিছুর বিনিময়ে মিয়া সাহেব কোনদিন কিছু চাননি, আজ তিনি অনেক আশা নিয়ে এসেছেন, তাকেই বা তছিরন আর আয়নাল নিরাশ করবে কীভাবে?
কিন্তু আলতাকে নিয়ে তছিরনের অনেক স্বপ্ন। তছিরন নিজেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিল কিন্তু তা সে স্বপ্ন সফল হয়নি তাই এখন সে আলতার মাঝে তার স্বপ্ন দেখছে অথচ আজ মিয়া সাহেব যে প্রস্তাব দিলেন তাতে তার স্বপ্ন যেন ভেঙ্গে মুচড়ে যেতে বসেছে। তছিরন আয়নালকে মৃদু কণ্ঠে ডাক দিল, এই শুনছ?
পর পর দু’বার ডাক দেয়ার পর আয়নাল সাড়া দিল, উঁ।
তুমি কি আমার সঙ্গে একটু কথা বলবে?
বলো?
তুমি যে মিয়া সাহেবের কথায় রাজি হয়ে গেলে, এখন কী হবে?
কী হবে মানে?
আমি আলতাকে লেখাপড়া শেখাবো, ওকে আমি অনেক বড় করবো। তুমি দেখোনা ও কোনদিন ক্লাসে সেকেণ্ড হয়নি, আমার এমন মেয়েটার লেখাপড়া বাদ দিয়ে আমি ঢাকা পাঠাবো কাজের মেয়ের কাজ করতে?
কিন্তু মিয়া সাহেব? আমি যে মিয়া সাহেবকে কথা দিয়েছি, এখন যদি কথার বরখেলাপ করি..
কী করবে মিয়া সাহেব?
মিয়া সাহেব যদি তার সব জমিজমা নিয়ে নেয়, যদি তার ভিটেমাটি থেকে আমাদের তাড়িয়ে দেয়?
করবে তো করবে, তছিরন জোর গলায় বলল।
তুমি যত সহজে বলছ, কাজটা তত সহজ না, মিয়া সাহেব যদি তার জমিজমা নিয়ে নেয়, ভিটেমাটি থেকে তাড়িয়ে দেয় তবে তখন আমরা খাবো কী? সংসার চালাবো কী করে?
তছিরন বিছানায় উঠে বসে আয়নালের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, আচ্ছা আমি তোমাকে একটা কথা বলি? রাখবে?
বলো?
তুমি মিয়া সাহেবকে একবার বুঝিয়ে দেখো, যদি ..
আয়নাল কিছুটা রাগান্বিত স্বরে বলল, তছিরন তুমি মিয়া সাহেবকে জানো না, মিয়া সাহেব একবার যেটা বলে সেটা আর উল্টায় না।
তবু একবার চেষ্টা করতে অসুবিধা কি? যদি…….
আচ্ছা তুমি যখন বলছ তো চেষ্টা করবো কিন্তু আমার মনে হয় কোন লাভ হবে না। এখন ঘুমাও চিন্তা করে লাভ নেই কপালে যা আছে তাই হবে।

পরদিন সকালবেলা আয়নাল মিয়া বাড়ি গেল অনেক আশা নিয়ে, এ যেন এক অন্য রকমের আশা, নিজের মেয়েকে অন্যের কাছ থেকে ফিরে পাওয়ার আশা। আয়নাল অল্প শিক্ষিত মানুষ, মিয়া সাহেবের প্রতি তার শ্রদ্ধা অগাধ, সেই সঙ্গে মনের মধ্যে আতংকও কম নয়। আয়নালের বাড়ি থেকে মিয়া বাড়ি প্রায় এক কিলোমিটার পথ, মাঝখানে অনেকটা অংশ জুড়ে পাট ক্ষেত, পাটক্ষেতের মাঝে একসময়ের মেঠোপথ একটু প্রশস্থ হয়েছে। কিন্তু এ রাস্তায় তেমন চলাচল নেই। আয়নাল পথে যেতে যেতে কীভাবে মিয়া সাহেবকে তার মনের কথা বলবে, তার নিজের কথা বলবে নাকি তছিরনের কথা বলবে, নাকি আলতার কথাই বলবে সেকথা ভাবছিল আর আপনমনে বিড়বিড় করছিল।
মিয়া সাহেব বাড়িতেই ছিলেন, আয়নালকে দেখে সহাস্যে বললেন, এই যে আয়নাল, আসো আসো।
আয়নাল বরাবরের মতো মাথা নত করে বিনয়ের সঙ্গে সালাম দিল, আসসালামুয়ালায়কুম মিয়া সাহেব।
মিয়া সাহেব সালামের জবাব দিয়ে কয়েকমুহূর্ত আয়নালের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। আয়নাল মিয়া সাহেব বলে কথা বলতে শুরু করতে যাচ্ছিল কিন্তু মিয়া সাহেব থামিয়ে দিয়ে বলতে শুরু করলেন, আয়নাল কাল আবার রুমার সঙ্গে কথা বললাম, ও তোমার খুব প্রশংসা করল, তোমাকে তো ও বড় ভাইয়ের মতো শ্রদ্ধা করে, তোমার নাম শুনেই বলল ও আয়নাল ভাই’র মেয়ে তো, আয়নাল ভাইকে আমার কথা বলবেন, দেখবেন না করবে না।
আয়নাল মাথা নত করে শুনছিল। মিয়া সাহেবের কথা বলা শেষ হতেই আবার বলতে যাচ্ছিল কিন্তু মিয়া সাহেব আবার তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, তুমি তো জানো, আমি আমার বিষয়-সম্পত্তি ছেলেমেয়েদের নামে ভাগ করে দিয়েছি, তুমি যে জমিটা বর্গা চাষ করো সেই জমিটা দিয়েছি রুমার নামে, ওর নামে আরো জমি আছে, ও আগামীকাল ঢাকা থেকে আসবে, ও আসলে আমি ওর ভাগের আরো এক বিঘা জমি তোমাকে দিতে বলব, তুমি দেখো ও না করবে না।
আয়নালের রাস্তায় আসতে আসতে সব সাজানো কথা যেন এলোমেলো হয়ে গেল। সে বলল, কিন্তু আলতার মায়ে বলছিল..
আয়নালের কথা শেষ হওয়ার আগেই মিয়া সাহেবের চোখ-মুখ লাল হয়ে গেল, তিনি রাগান্বিত স্বরে বললেন, কী বলছিল? বাড়ির মেয়েছেলে মানুষ এত কথা বলে কেন?
আয়নাল আর কথা বলতে পারল না, মিয়া সাহেবের মুখের দিকে তাকাতেই তার বুক কেঁপে উঠল।
মিয়া সাহেব গম্ভীর স্বরে বললেন, তুমি কী বলতে এসেছ আমি বুঝতে পেরেছি আয়নাল, আগামীকাল রুমা আসবে দু’দিন বাদেই আবার ঢাকা চলে যাবে, যাওয়ার সময় আলতাকে নিয়ে যাবে আর যদি-
আয়নাল কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, ঠিক আছে মিয়া সাহেব, সব ঠিক আছে, আপনি কিছু চিন্তা করবেন না।
আয়নাল বাড়িতে ফিরল তার মুখের দিকে তাকিয়ে তছিরনের মুখ শুকিয়ে গেল। সে কোনকিছু জিজ্ঞেস করার আগেই আয়নাল উঠানে একটা মোড়ার ওপর ধপাস করে বসে মিয়া সাহেবের সঙ্গে তার কথাবার্তার সারমর্মটুকু বলল। সবকিছু শুনে তছিরনের কণ্ঠস্বর বুজে এলো, ঠোঁট দু’টো সামান্য ফাঁকা হয়ে হৃদয়ের গভীর থেকে একটা কষ্ট বেরিয়ে এলো, শেষ পর্যন্ত.., বলেই অসমাপ্ত কথার সমাপ্তি টানল।
চলবে…
আমার সব লেখা একসাথে পড়তে ভিজিট করুন:www.writerzillur.com
আমার ফেসবুক পেজ:https://www.facebook.com/writerzillur?ref=hl

৮৭৭ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
আমি পেশায় একজন প্রকৌশলী। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে একসময় লেখালেখি শুরু করেছিলাম। বর্তমানে আমার লেখা উপন্যাসের সংখ্যা ১৮টি। এখনো লেখা চলছে অবিরত। আমার ফোন নাম্বার-০১৭১৮১৫৭০৭৬
সর্বমোট পোস্ট: ৩৯ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ৮৭ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৮-০২ ০৪:০১:৪৪ মিনিটে
Visit জিল্লুর রহমান Website.
banner

৭ টি মন্তব্য

  1. সবুজ আহমেদ কক্স মন্তব্যে বলেছেন:

    দারুণ লিখা ভেরি নাইস

  2. দ্বীপ সরকার মন্তব্যে বলেছেন:

    ভালো লাগলো ভাই।

  3. এই মেঘ এই রোদ্দুর মন্তব্যে বলেছেন:

    লিখা খুব সুন্দর

    পড়ে কষ্ট লাগল

  4. দীপঙ্কর বেরা মন্তব্যে বলেছেন:

    ভাল লাগল

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top