Today 23 Sep 2019
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

কৃষকের হাসিমাখা মুখের ছবি আঁকে হেমন্ত

লিখেছেন: মুহাম্মদ দিদারুল আলম | তারিখ: ১৫/১১/২০১৪

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 1090বার পড়া হয়েছে।

চারিদিকে মৌ মৌ নবান্নের ঘ্রাণ-/কার্তিকের সোনা ধানে ভরে যায় গোলা,/হেমন্তের দিনগুলো আসে ঝকঝকে/সোনার থালায়/উৎসবমুখর নক্ষত্র রাত ঝিকিমিকি ধান-শিষ/হয়ে কাঁপে আকাশের সুনীল মাঠজুড়ে।
প্রকৃতপক্ষে চিরসবুজের নিঃস্বর্গ শোভায় থরে থরে সজ্জিত এমন ভূমি পৃথিবীর আর কোথাও নেই। এ দেশ যেন ঋতুতে ঋতুতে নব নব রূপে নিজেকে উন্মোচিত করে বিশ্ব মাঝে ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে প্রকৃতি দৃশ্যপটও পরিবর্তিত হয় সমান তালে।
ঋতুর এ পালা বদলে শরতের শেষে আসে হেমন্ত। বাংলা সনের হেমন্ত ঋতুর দু’টি মাস, কার্তিক ও অগ্রহায়ণ। ‘কৃত্তিকা’ ও ‘আর্দ্রা’ তারার নাম অনুসারে নাম রাখা হয়েছে কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাসের।
‘মরা’ কার্তিকের পর বাংলাদেশের সকল মানুষ প্রবেশ করে এক সর্বজনীন লৌকিক উৎসব নবান্নে। ‘অগ্র’ ও ‘হায়ণ’ এ দু’অংশের অর্থ যথাক্রমে ‘ধান’ ও ‘কাটার মওসুম’।
মাঠের পর মাঠ সোনালী ফসল চকমকিয়ে ওঠে হেমন্তের বাতাসে। কৃষকের হাসিমাখা মুখের ছবি আঁকা যেন হেমন্তের বুকে, কেননা হেমন্ত আসে পাকা ধানের খবর নিয়ে। কাস্তে হাতে কৃষকরা মাঠে মাঠে আমন ধান কাটায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আঁটি আঁটি ধানে ভরে গৃহস্থের গৃহ আর খুশির জোয়ারে ভাসে মন। পাকা ধানের মিষ্টি গন্ধে ময়ময় কৃষকের আঙিনা, এ যেন বাংলার প্রাণবন্ত রূপ। নতুন ফসল ওঠার আনন্দে আত্মহারা কৃষক। তাই ঘরে ঘরে শুরু হয় নবান্নের উৎসব। আমাদের দেশে কোন কোন অঞ্চলে ফসল তোলার পরদিনই নতুন ধানের নতুন চালে ফিরনী-ফায়েশ অথবা ক্ষীর তৈরি করে আত্মীয়স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীর ঘরে ঘরে বিতরণ করা হয়। নবান্নে জামাইকে নিমন্ত্রন করা হয়। মেয়েকেও বাপের বাড়িতে ‘নাইয়র’ আনা হয়।
হেমন্তকে তাই উৎসবের ঋতু বললেও ভুল হবে না এতটুকুও। কিষাণীরা সারা রাত জেগে পিঠা তৈরি করে আর সে কষ্ট আনন্দময় হয়ে ওঠে সকালে তা পড়শিদের মাঝে বিতরণ করে। নারিকেল এ ঋতুর প্রধান ফল। সুতরাং গৃহিণীর পিঠার তালিকায় থাকে নারিকেলে তৈরি রকমারি মুখরোচক খাবার। নানা ধরনের পিঠার সুবাস আর শেফালী, কামিনী ফুলের সুবাসে মাখামাখি হয় কৃষকের আঙিনা। সে সুবাসে কৃষকের মনেও আসে অনাবিল তৃপ্তি যা তাকে নতুন ফসল ফলাতে অনুপ্রেরণা জোগায়।
বাংলা সাহিত্যের একটা অংশ জুড়েও আছে শিশিরের নরম স্পর্শ। এটার জন্ম ও অন্তর্ধান দুটোই রহস্যে ঘেরা। কখন কোথা থেকে ঝরে পড়ে ঘাসে ঘাসে, গাছের পাতায় মুক্তোর মালা পরায়, কেউ জানে না। আর সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতিকে কাঁদিয়ে কোন সুদূরে মিলিয়ে যায়, তাও মানুষের দৃষ্টির বাইরে।
হেমন্তের শিশির ভেজা ঘাসের ডগা যেন মনে হয় মুক্তর মেলা। প্রকৃতি এ রহস্যময় উপাদানটি পানিরই বিন্দুবৎ রূপ। সকালে বা সন্ধা তা আকাশ থেকে অদৃশ্য আকারে ঝরে।
আবহমানকাল থেকে আমাদের এই ষড়ঋতু আর নদী অঞ্চলের মানুষ বিশ্বাস করে, শিশির কমনীয়তার প্রতীক। স্রষ্টার অপার করুণা।
ভোরের কাঁচা কোমল রোদ, মৃদু হিমস্পর্শ প্রাণে শিহরণ জাগায়। হেমন্তেই দেখা যায় সোনা রোদের ঝিলিক। হেমন্তের সকালের শিশির ভেজা সকাল, দুপুরের রোদের স্নিগ্ধতা, সন্ধায় বাঁশ ঝাড়ে পাখির কলকাকোলি ভিন্নমাত্রিক দোতনা সৃষ্টি করে। হেমন্তের রাতে মেঘ মুক্ত আকাশে জোৎ¯œার আলো যেন অন্য সময়ের চেয়ে একটু বেশি ঠিকরে পড়ে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এদেশে হেমন্তের উৎসবে বাংলার প্রাকৃতিক দৃশ্যে নবরূপের সংযোজন হয়। পিঠা, পুলি আর নবান্নের উৎসব লালিত বাঙালির জীবনে হেমন্ত তাই বেশ আদরণীয়।
অনেকে হেমন্তকে বলে অনুভবের ঋতু, ম্লান, ধূসর, অস্পষ্ট, তাকে যতো অনুভব করা যায় তাতো দেখা যায় না; শীত, গ্রীষ্ম কিংবা বর্ষার মতো হেমন্ত এমন তীব্র, প্রখর, উন্মোচিত নয়, বসন্তের মতো তার বর্ণ, গন্ধ, গরিমা নেই, হেমন্ত মৌন, শীতল, অন্তর্মূখী।
হেমন্ত-প্রকৃতি আকৃষ্ট করে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘নৈবদ্যে স্তব্ধতা’ কবিতায় লিখেছেন-
‘আজি হেমন্তের শান্তি ব্যাপ্ত চরাচরে
জনশূন্য ক্ষেত্র মাঝে দীপ্ত দ্বিপ্রহরে
শব্দহীন গতিহীন স্তব্ধতা উদার
রয়েছে পড়িয়া শ্রান্ত দিগন্ত প্রসার
স্বর্ণশ্যাম ডানা মেলি।’

কবি সুফিয়া কামাল তার কবিতায় হেমন্তে ফসল তোলার চিত্রটি এঁকেছেন এভাবে-
‘এই তো হেমন্ত দিন, দিল নব ফসল সম্ভার
অঙ্গনে অঙ্গনে ভরি, এই রূপ আমার বাংলার
রিক্তের অঞ্চল ভরি, হাসি ভরি, ক্ষুধার্তের মুখে
ভবিষ্যৎ সুখের আশা ভরি দিল কৃষকের বকে
শিশির সিঞ্চসে সিক্ত দ্বারা বুকে তৃণাঞ্চল জাগে,
সোনালী ধানের ক্ষেতে ঈষৎ শীতার্ত হাওয়া লাগে
আনন্দ অশ্রুতে যেন ভিজা ভিজা আঁখির পল্লবে
মাটি,মাতা হেরিতেছে নবান্ন আসন্ন উৎসবে,
বিমুগ্ধ নয়নে হেরে পরিপূর্ণ ফসলের ভার,
অঙ্গ ভরিয়া আছে-আমার বাংলার।’

কবি জসিমউদ্দীন লিখেছেন-
‘সবুজে হলুদে সোহাগ ঢুলায়ে ধান ক্ষেত,
পথের কিনারে পাতা দোলাইয়া করে সাদা সঙ্কেত।
ছড়ায় ছড়ায় জড়াজড়ি করি বাতাসে ঢলিয়া পড়ে,
ঝাঁকে আর ঝাঁকে টিয়া পাখিগুলি শুয়েছে মাঠের পরে।
কৃষাণ কনের বিয়ে হবে হবে তার হলদি কোটার শাড়ি,
হলুদে ছোপায় হেমন্ত রোজ কচি রোদ রেখা-নাড়ি।’

হেমন্ত ঋতু কোথা থেকে শুরু, কোথায় শেষ তা নিরূপন করা দুরূহ, শরৎ থেকে সে খুব পৃথক নয়; শীত থেকেও তেমন বিচ্ছিন্ন নয় তার প্রকৃতি, শীত-শরতের মাখামাখি এই হেমন্ত, একটি সম্পূর্ণ নিজস্ব বাংলা ঋতু। হেমন্তের রঙ ধূসরতা, বর্ষার মতো রুদ্র রুক্ষ নয় তার রূপ, শীতের দুঃসহ শৈত্যপ্রবাহও তার পরিচয় নয়, হেমন্ত উদাসীন, মগ্ন, নিভৃত, একগুচ্ছ প্রিয় ঝরাপাতা। আমাদের দেশে হেমন্ত আসে ধীর পদক্ষেপে। শীতের পরশ আলতো করে গায়ে মেখে।
এখন বাংলাদেশে হেমন্ত আসে ঠিকই কিন্তু নবান্ন উৎসব আসে না। কারণ, আজ বাংলার সেরূপ নেই, প্রাচুর্য নেই, মন মানসিকতাও নেই।
আজ বাংলার কৃষক রোগে-শোকে, অভাবে-তাড়নায়, দুঃখে-দারিদ্র্যে ও হতাশায় আমূল নিমজ্জিত। ঋণভারে জর্জরিত। তাই ‘নবান্ন উৎসব’ আর তাদের স্পর্শ করতে পারে না। হেমন্তে নতুন ধানের অন্ন জুটলেও তা নবান্ন উৎসবের আঙ্গিকে নয়, প্রয়োজনের তাগিদে। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের সার্থক পরিচয়বাহী এই সার্বজীন নবান্ন উৎসব। এক আবার বাঁচিয়ে তোলা দরকার। নতুবা আমরা ঐতিহ্যিক সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবো। কোন একদিন হয়তো বই পুস্তক ও পত্রপত্রিকা ঘেঁেটেই হেমেন্তের এই নবান্ন উৎসব সম্পর্কে জানতে হবে।
কবির ভাষায়:
‘পথের কিনারে দাঁড়ায়ে রয়েছে আমার ধানের ক্ষেত,
আমার বুকের আশা-নিরাশার বেদনার সঙ্কেত।’

 

 

 

১,০৭০ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
সর্বমোট পোস্ট: ৭৭ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ১০১ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৮-২৮ ১১:৫৮:৪৮ মিনিটে
banner

৫ টি মন্তব্য

  1. সহিদুল ইসলাম মন্তব্যে বলেছেন:

    আস্তে আস্তে আমার মনে হয় এমন এক সময় আসবে যখন হেমেন্তের এই নবান্ন উৎসব শুধু ইতিহাসের পাতায় ছবি এবং লেখা দেখবো।

  2. দ্বীপ সরকার মন্তব্যে বলেছেন:

    অনেক ভালো লাগলো ভাই

  3. দীপঙ্কর বেরা মন্তব্যে বলেছেন:

    কৃষকের কথা তো কেউ ভাবেই না ।
    গ্রামের এই উৎসব আর নেই ।

  4. এই মেঘ এই রোদ্দুর মন্তব্যে বলেছেন:

    গ্রামে না থাকলে ঋতুর পরিবর্তন বুঝাই দুষ্কর

    আমার দেশ আমার গর্ব আমার অহংকার

    ভাল লাগল পোস্ট

  5. মুহাম্মদ দিদারুল আলম মন্তব্যে বলেছেন:

    ধন্যবাদ সবাইকে…

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top