Today 16 Dec 2018
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

ক্ষুধা এবং একটি মৃত্যু

লিখেছেন: আহসান হাবীব সুমন | তারিখ: ০৪/১২/২০১৩

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 661বার পড়া হয়েছে।

এ্যাঁ …. এ্যাঁ…. এ্যাঁ !

সেই কখন থেকে খিদার জ্বালায় নাঁকি সুরে ঘ্যানঘ্যন করে কেঁদে চলেছে বাচ্চা ছেলেটা ! নানানভাবে চেষ্টা করে চলেছে সামনেই বসে রান্না নিয়ে ব্যাস্ত মায়ের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ! কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না ! মা যেন তার এই মুহুর্তে আমাদের দেশের সেই বোবা -কালা সরকারপ্রধাণ , যার কানে দেশের বঞ্চিত আর অসহায় জনতার আওয়াজ পৌছে না কখনোই !

ছেলেটির নাম আমির হোসেন ! কানাছেলের নাম পদ্মলোচনের মতই আর যাই হোক তার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে না আমিরির সামান্যতম চিন্হ ! বয়স  তিন পেরুলেও তার অপুষ্টর কারণে বাড়তে না পারা  হাড় জিরজিরে শরীরটা দেখে বছর দুইয়েকের বেশি বলে মনে হয় না কিছুতেই  !

চুলোর আগুনে বসানো মাটির হাঁড়ির দিকে থমথমে মুখে স্থির চেয়ে আছে আম্বিয়া ! এই মুহুর্তে তার চাইতে অসহায় আর কেউ বুঝি দুনিয়াতে নেই ! চোখের সামনে তার দুধের বাচ্চা ছটফট করছে ক্ষুধার যন্ত্রণায় ! অথচ মা হয়ে সন্তানের মুখে সামান্য একটু খাবার তুলে দেবার ক্ষমতা এই মুহুর্তে তার নেই ! সারা ঘরে তন্ন তন্ন খুঁজে মুঠোখানেকের একটু বেশী চাল আর কয়টা পঁচন ধরা আলু পাওয়াতে সেগুলোই একসাথে বেশি করে পানি দিয়ে মিশিয়ে চুলোয় বসিয়ে দিয়েছে আম্বিয়া !  কিন্তু কাঁকড় মেশানো চাল যেন আর ফুটবে না বলে পণ করে বসেছে !

এদিকে খিদার চোটে দিশেহারা আমির হোসেন সোচ্চার হয় যেন তার দাবী আদায়ে ! এগিয়ে এসে খামছে ধরে তার মায়ের বাহু ! এবার আর তাকে উপেক্ষা করতে পারে না আম্বিয়া ! ভীষণ মমতায় দু হাত বাড়িয়ে কলে তুলে নেয় ! শতছিন্ন শাড়ীর আঁচল সরিয়ে নিজের একটি স্তন তুলে দেয় ছেলের মুখে ! যদিও তার প্রায় চুপসে যাওয়া বেলুনের মতন আকার ধারণ করা স্তনে দুধের প্রবাহ বন্ধ হয়েছে বহু আগেই ! তবু এটা সে মাঝেমধ্যই কররে ছেলেকে ভুলিয়ে রাখার জন্য ! এই ফাঁকে রান্নাটা শেষ হোক । তারপর ছেলেকে সত্যি সত্যি খাওয়াবে !

তবে আজকের দিন নিয়ে আসলে ভাবছে না আম্বিয়া ! তার স্বামী মোতালেব জোগালীর কাজ করে ! প্রতিদিনের মতন আজও সেই কাকভোরে নিজের টুকরী আর কোদাল নিয়ে দাঁড়িয়েছে বাজারের বড় সড়কের পাশে অন্য জোগালীদর সাথে লাইন দিয়ে ! কিন্তু সমস্যা হল এখন আর আগের মত নিত্য কাজ জোটে না ! প্রতিযোগিতা যে বেড়ে গেছে অনেক ! এই তো মোতালেব শেষ কাজ পেয়েছিলো চারদিন আগে ! সেই টাকায় কেনা বাজারের উচ্ছিষ্টাংশই আজ রান্নার জন্য বসিয়েছে আম্বিয়া ! আজও যদি মোতালেবের কাজ না জোটে তা হলে কাল থেকে না খেয়ে থাকতে হবে ! নিজেদের জন্য ভাবে না আম্বিয়া ! তারা বড় মানুষ – দ চারদিন উপোস থাকার অভ্যাসও আছে ! তার যত চিন্তা এই কোলের বাচ্চাটকে নিয়ে !

 

উহ আল্লারে !

হটাৎ করেই তীব্র ব্যাথায় কঁকিয়ে উঠে আম্বিয়া ! আসলে তীব্র খিদায় দিশেহারা আমির হোসেন তার তীক্ষ্ন ছোট ছোট দাঁত দিয়ে কাঁমড়ে দিয়েছে মায়ের স্তনের বোঁটা ! মুহুর্তে সারা শরীরে তীব্র একটা ব্যাথা ছড়িয়ে পড়ায় কেঁপে ওঠে আম্বিয়া !

-শুয়োরের বাচ্চা শুয়োর ! কত খিদা তর প্যাটে ! রাক্ষসের বাচ্চায় আমারে কামড়ায়্যা এক্কেবারে শ্যাষ কইরা দিসে ! কি আমারে খাবি ? খা ! খা ! আমার আড্ডি মাংস সব চিবায়্যা খা তুই ! জনমের মতন তর খিদা মিটুক !

ভবিষ্যতের ভাবনা , নিজের অসহায়য়ত্ব – সব মিলিয়ে যেন পাগল হয়ে ওঠে আম্বিয়া ! প্রচন্ড রাগে দুমদুম করে একের পর এক কিল দিয়ে যেতে থাকে আমির হোসেনের রুগ্ন শরীরে ! সেই সাথে ঝড়ের বেগে দিতে থাকে অভিশাপ !

এভাবে অনেকক্ষন পাগলের মত আচরণের পর হটাৎ করেই যেন সম্বিত ফিরে পায় আম্বিয়া ! আচমকা সুস্থির হয়ে তাকায় তার দিকে ভয়ার্ত দৃষ্টি মেলে ফ্যাফ্যাল করে চেয়ে থাকা ছেলেটার দিকে !

– ওরে আমার সোনারে ! আমারে তুই মাফ কইরা দে বাজান ! আমি তর অক্ষম পাপী মা রে বাজান ! তর মুখে একটু খাওন তুইলা দেওনের ক্ষমতা আমার নাইরে বাজান !

ভীষণ মায়ায় ছেলেকে বুকে চেপে ধরে আম্বিয়া ! অনুশোচনায় ডুকরে কেঁদে ওঠে !

কিন্তু এ কি ! ছেলে যে তার এত মার খেয়েও কাদছে না ! নড়ছে না একটুকু ! শুধু হা করে ভয়ার্ত চোখে চেয়ে আছে তার দিকে !

– বাজান , ও বাজান ! কি অইসে তোমার ! কতা কও না ক্যান বাজান !

প্রচন্ড ভয়ে উল্টে পাল্টে ছেলেকে পরীক্ষা করতে গিয়ে এবার সত্যি সত্যি পাগল হয়ে যায় আম্বিয়া ! আবিষ্কার করে তার শক্ত হাতের প্রচন্ড মার সইতে পারেনি তার ছেলের দর্বল শরীর !

– ওরে তোমরা কে কই আছো ! জলদি আসো ! আমার আমির হোসেন যে কতা কয় না রে আল্লাহ  !

আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে আম্বিয়া !!!

 

পরিশিষ্ট :

 

– কি রে আম্বিয়া কি অইছে তর ? কই যাইতাছস ইমুন পাগলনীর লাহান ।

– ও আম্বিয়া বু , এই ভর দুইফর কালে পোলা লইয়া যাইতে আছো কুনে ?

আম্বিয়া তার আমির হোসেনকে বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধীর পদক্ষেপে হেঁটে চলেছে গ্রামের পথ ধরে । তার আলুথালু বেশ আর নিমগ্ন পথ চলা দেখে পরিচিতরা অবাক হয়ে নানান  প্রশ্ন করতে থাকে । কিন্তু আম্বিয়া মনে হয় তখন সম্পূর্ণ বোবা হয়ে গেছে । নিশিতে পাওয়া মানুষের মতন নির্বাক আম্বিয়া হেঁটে চলে একটানা । ঔৎসুক গ্রামের লোকেরা এক এক করে পিছু নিতে থাকে । দেখতে আম্বিয়ার  পেছনে অনুসরণরত কৌতুহলী মানুষের লাইন ছোটখাটো একটা মিছিলের আকার নেয় কখন – তা টেরও পায়না আম্বিয়া !

মানুষজন  ভীষণ অবাক হয়ে দেখে আম্বিয়া বহুপথ হাঁটতে হাঁটতে গ্রাম ছাড়িয়ে চলে এসেছে শহরতলীর মধ্যে ! থানার কাছাকাছি এসেও থামেনি সে । বরং সেই একই ভঙ্গিতে সোজা ঢুকে যাচ্ছে থানা এলাকার ভিতরে । থানার বারান্দায় চেয়ারে বসে দুপুরের ঠাঁ গরমে তখন নিশ্চিন্তে ঝিমোচ্ছে দুজন সেপাই ।

– দারোগা সাব । ও দারোগা সাব ।

একসময় বুঝি পথ চলা শেষ হয় আম্বিয়ার । ভীষণ মমতা ভরে বারান্দার মেঝেতে একেবারে সেপাই দুজনের পায়ের কাছে নিয়ে আস্তে করে শুইয়ে দেয় নিথর আমির হোসেনের দেহটা ! নিজেও ভীষণ ক্লান্ত ভঙ্গিতে হাত পা ছড়িয়ে বসে পড়ে ছেলের পাশ ঘেঁষে ।

আম্বিয়ার খরখরে কন্ঠের ডাক শুনে সেপাইদের দিবানিদ্রা শিকেয় ওঠে । প্রথমেই চোখে পড়ে থানা চত্বরে ঢুকে পড়া মানুষের ভীড় । এরপরই একেএকে দেখতে পায়  পাগলিনীর বেশে বসে থাকা আম্বিয়াকে । আর সবশেষে নিজেদের পায়ের কাছে পড়ে থাকা নিথর শিশুদেহ । এবং তাদের অভিজ্ঞ চোখে মুহুর্তে ধরা পড়ে সামনে পড়ে থাকা শিশুটি আসলে মারা গেছে বেশ অনেকক্ষণ আগেই । প্রায় একই সঙ্গে দুইজন লাফিয়ে সরে দাঁড়ায় মৃত শিশুটির সামনে থেকে ।

– কি হইছে , এ্যাঁ ! ঘটনা কি তোমাগো !

উপস্হিত জনতার দিকে চেয়ে খেঁকিয়ে ওঠে সেপাইদের একজন । কিন্তু কেউ উত্তর দেয় না । শুধু চাওয়া চাওয়ি করে একে অন্যের মুখের দিকে তাকিয়ে । উত্তর দেবে কি ! তারা নিজেরাই তো জানে আসল ঘটনা কি !

অবশেষে  জবাব আসে আম্বিয়ার কাছ থেকেই । রহস্যময় ভঙ্গিতে প্রথমে নিজের দুই হাত বাড়িয়ে দেয় দারোগাদের দিকে । ততোক্ষণে ঘটনা কিছু ঘটছে টের পেয়ে থানা ভবন থেকে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে ভেতরের প্রায় সবাই ।

– দারোগা সাবেরা এই লন । আমারে আপনেরা ফাঁসি দিয়া দেন । পেটে আমার বহুৎ খিদা । কিন্তুক ঘরে খাওন নাই । হের লাইগা আমি আমার বাজানরে খায়্যা ফেলছি গো !

উপস্হিত সবাইকে হতবাক করে দিয়ে অপ্রকৃতস্হ  আম্বিয়া  খিলখিল করে হেসে ওঠে !!!  ( শেষ )

_____________________ ************* __________________________

 

 

 

 

৭৭৪ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
সর্বমোট পোস্ট: ৪০ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ২৮৩ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-১১-২৭ ০৭:০৩:১৭ মিনিটে
banner

১২ টি মন্তব্য

  1. তৌহিদুল ইসলাম ভুঁইয়া মন্তব্যে বলেছেন:

    এমন কাহিনী আজ আমাদের সমাজের আনাচে-কানাচে। তাই আপনার গল্প পড়ে কান্না চেপে রাখাটা বড়ই কষ্টের। কেমন করে লেখনি দিয়া অন্তরের পাখিটারে কাঁদাতে হয় তা ভালোই জানেন। আপনার শুভ কামনায় রইলাম।

  2. আজিম মন্তব্যে বলেছেন:

    অত্যন্ত মর্মস্পর্শী একটি লেখা । অশেষ ধন্যবাদ ।

  3. আহসান হাবীব সুমন মন্তব্যে বলেছেন:

    চেষ্টা করছি নিজের মত করে কিছু লিখতে ! আর আপনাদের শুভকামনায় আমি সত্যিই এখন দারুন উৎসাহিতবোধ করছি ! অনুপ্ররণা প্রদানের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি ! @ আজিম ভাই @ তৌহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া ভাই !

  4. তাপসকিরণ রায় মন্তব্যে বলেছেন:

    সামান্য ঘটনাকে সুন্দর ভাবে বাস্তবে রুপ দিতে পেরেছেন। বাস্তব রুপ পেয়ে জীবন্ত হয়ে উঠেছে গল্প।অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

  5. শাহ্‌ আলম শেখ শান্ত মন্তব্যে বলেছেন:

    ভাল লেগেছে গল্পটি । নিয়মিত লিখবেন আশা রাখি ।

  6. এস এম আব্দুর রহমান মন্তব্যে বলেছেন:

    ঘটনাটি সুন্দর বর্ণনায় প্রান্জল হয়ে উঠেছে । ভাল লাগল গল্পটি । ভাল থাকুন ।

  7. আরজু মন্তব্যে বলেছেন:

    হৃদয় ছুয়ে যাওয়া মর্মস্পর্শী গল্প।ছোট একটা ঘটনাকে চমৎকার গল্পের রুপ দিয়েছেন। লেখকের পারদর্শীতাকে সালাম।
    লেখকের উজ্জল ভবিষ্যত কামনা করছি।

  8. শাহ্‌ আলম শেখ শান্ত মন্তব্যে বলেছেন:

    ভাল হয়েছে গল্পটি ।

  9. আমির হোসেন মন্তব্যে বলেছেন:

    ক্ষুধা এবং একটি মৃত্যু—— অসাধারন হয়েছে

  10. আহসান হাবীব সুমন মন্তব্যে বলেছেন:

    ধন্যবাদ শান্তভাই ও আমির হোসেন ভাই আপনাদের দুজনকেই ।

  11. সহিদুল ইসলাম মন্তব্যে বলেছেন:

    কঠিন, হৃদয় বিদারক, ধন্যবাদ আহসান হাবীব সুমন ভাই।

  12. সবুজ আহমেদ কক্স মন্তব্যে বলেছেন:

    অসাধারণ
    মুগ্ধকর লিখনী

    ভালো লাগলো

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top