Today 30 Oct 2020
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

ডাকিনীবিদ্যায় অভিযুক্তদের আশ্রয়স্থল-অদ্ভুতুড়ে ডাইনি ক্যাম্প

লিখেছেন: মোঃ অলিউর রহমান | তারিখ: ০৯/০৬/২০১৩

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 995বার পড়া হয়েছে।

আফ্রিকানদের মধ্যে ভুডু বা ডাকিনীবিদ্যা চর্চার রেওয়াজ বহু পুরনো। ‘ভুডু’ বা কালো জাদুতে যেমন এরা সিদ্ধহস্ত, তেমনি ভালো কাজের বিদ্যার জন্য বিখ্যাত ‘শামান’রা। কিন্তু পুরনো সেই দিন আর নেই। সভ্যসমাজে এ দুই বিদ্যার অবস্থানই নড়বড়ে। তবে বিশ্বাসটি টিকে আছে এখনো। আজও আফ্রিকার অনেক নারীকে ডাইনি আখ্যা দিয়ে তাদের পরিবার থেকে বের করে দেওয়া হয়। সংসারবিচ্ছিন্ন এসব নারীর আশ্রয় হয় ডাইনি ক্যাম্পে।

image_761_121144

ঘানার এক নিবিড় গ্রামের বাসিন্দা পাকপেমা ব্লেগ। ওখানকার অন্য আট-দশজন নারীর মতো সহজ ও সংগ্রামী জীবন ছিল তার। কিন্তু একদিনের একটি ঘটনা তার জীবনে নিয়ে এলো বিপর্যয়। দুর্ঘটনাবশত তার ভ্রাতুষ্পুত্রের আঙ্গুলে সুই ফুটে মারাত্দকভাবে জখম হয়। স্বভাবতই আক্রান্ত আঙ্গুলটা ফুলে মারাত্দক ক্ষতের সৃষ্টি হলো। ব্লেগ তখন সেখানে অনুপস্থিত ছিল। কিন্তু এরপরও পরদিন সকালে এ ঘটনার জন্য তাকে দায়ী করা হলো। ব্লেগের দেবর বিষয়টি নিয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করল। ব্লেগকে ডাইনি আখ্যা দিয়ে বাজেবাজে কথা বলতে শুরু করল। অল্প সময়ের মধ্যেই লোক জড়ো হয়ে গেল। ডাকিনি বিদ্যায় বিশ্বাসী আফ্রিকার গ্রাম্য বাসিন্দারাও দায়ী করল ব্লেগকে। এরই মধ্যে আবির্ভাব ঘটল এক গণকের। সে ব্লেগের আত্দার শুদ্ধি পরীক্ষা করার পরামর্শ দিল। আত্দার শুদ্ধি পরীক্ষা করলেই বোঝা যাবে ব্লেগ নির্দোষ, নাকি ডাইনি। অতি উৎসাহী লোকজন দেরি করল না। দ্রুততম সময়ের মধ্যেই শুদ্ধি পরীক্ষার জন্য একটা বুনো পাখি ধরে আনা হলো। এরপর পাখির গলা চিরে সেটিকে পবিত্র মন্দিরের উপরের দিকে ছুড়ে ফেলা হলো। শর্ত জুড়ে দেওয়া হলো পাখিটি যদি মন্দিরের পেছনের দিকে পড়ে তাহলে ব্লেগ নির্দোষ প্রমাণিত হবে। আর পাখিটি যদি সামনের দিকে এসে পড়ে তাহলে সে নিশ্চয়ই ডাইনি। কপাল মন্দ ব্লেগের। পাখিটি এসে পড়ল মন্দিরের সামনের দিকে। ফলে সবাই তাকে ডাইনি আখ্যা দিল। সংসার-ঘরবাড়ি আর এলাকা ছেড়ে চলে যেতে হবে ব্লেগকে। শেষমেশ তার আশ্রয় হলো ঘানার উত্তরাঞ্চলীয় একটি ডাইনি ক্যাম্পে। সেখানে তার মতো ৯০০ ডাইনি রয়েছে। তাদের সবার গল্প প্রায় একই রকম।

প্রাচীন বিশ্বাসকে সামনে রেখে এখনো আফ্রিকার অনেক নারীকেই ডাইনি আখ্যা দিয়ে তাদের পরিবার থেকে বের করে দেওয়া হয়। আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে ঘানায় এ বিশ্বাস বেশ প্রকট। বিশেষ করে ঘানার উত্তরাঞ্চলে টোগোর সীমান্তবর্তী এলাকায় এ বিশ্বাস সবচেয়ে বেশি। এসব জায়গায় বিশ্বাস করা হয়, ডাইনিবিদ্যার কারণে নানা ধরনের রোগ-শোক, দুর্ঘটনা এমনকি কারও মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। আফ্রিকার এসব অঞ্চলের লোকজনের বিশ্বাস করা হয় ডাইনিরা তাদের আধ্যাত্দিক শক্তি কিংবা জুজুর শক্তিকে কাজে লাগিয়ে রাতে নানা অঘটন ঘটায়। এরা কখনো কখনো দুষ্ট আত্দাকে নিয়ন্ত্রণে রেখে অন্যদের অসুস্থ করে ফেলে কিংবা শিশুদের ঘাড়ে উঠে নানা অপকর্ম করে থাকে। স্থানীয়রা বিশ্বাস করে ডাইনিরা যে কোনো সময় যে কোনো রূপ ধারণ করতে পারে। যা খুশি তাই করতে পারে। তাই যে কোনো জায়গায় কোনো অঘটন ঘটলেই মনে করা হয় নিশ্চয়ই কেউ ডাইনি বিদ্যার প্রভাব খাটাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ওই এলাকার লোকজন, পাড়া-প্রতিবেশী, পরিবারের লোকজন দুষ্ট আত্দার সন্ধান করতে থাকে। শুরু হয় সন্দেহের তীর ছোড়াছুড়ি। সবাই দলবেঁধে ডাইনি খোঁজা শুরু করে। অনেক সময় ডাইনি খুঁজতে গিয়ে রীতিমতো অনাচার করা হয়। সন্দেহজনক ব্যক্তিকে অনেক সময় মেরে ঝুলিয়ে রাখা হয়। এসব ক্ষেত্রে তারা দোষী না নির্দোষ সে সিদ্ধান্ত দেয় কিছু পুরোহিত। আর এ প্রক্রিয়াটিও রীতিমতো হাস্যকর। আর তাই নির্দোষ ব্যক্তিকেও সাধারণের রোষানলে পড়ে প্রাণ দিতে হয়।

এসব কর্মকাণ্ড প্রসঙ্গে ঘানার মানবাধিকার কমিশনের পরিচালক এবং ইয়েন্ডির প্রশাসনিক বিচারকের কাজ করা আব্বাস ইয়াকুবু বলেন, ‘এটা অন্যায়। রীতিমতো বর্বরোচিত কাজ। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের কোনো সুযোগ পায় না। তারা নিজেদের ঘরে পর্যন্ত থাকার ঝুঁকি নিতে চায় না। অভিযুক্তদের দিকে কঠোরভাবে অভিযোগের তীর ছুড়ে দেওয়া হয়। আর মুহূর্তের মধ্যেই সে অভিযোগ সহিংসতার রূপ নেয়। এসব এলাকায় উচ্ছৃঙ্খল জনতার রোষানলের কারণে প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে একজন শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।

প্রায় ৯০০ নারীর আশ্রয়স্থল ঘানার উত্তরাঞ্চলীয় ডাইনি ক্যাম্প গ্লানি। গ্লানির এ ক্যাম্পটা সরকারিভাবে পরিচালিত কোনো ক্যাম্প নয়। মূলত কুসংস্কারে বিশ্বাসী মানুষের প্রচেষ্টায় ক্যাম্পটি টিকে আছে। এখানে অভিযুক্ত হয়ে আসা লোকজনকে পরিচালনা করে থাকে একজন পুরোহিত। ডাইনি অভিযোগে এখানে আসা সবাইকে থাকার জন্য টাকা গুনতে হয়। প্রত্যেককে দিতে হয় ঘানার মুদ্রার ৬০ সেডি। যা কিনা ২৯ পাউন্ডের কাছাকাছি। এ ছাড়া যে পাখির মাধ্যমে তাদের ডাইনিবিদ্যার অস্তিত্ব পরীক্ষা করা হয়, তার জন্যও টাকা দিতে হয়। গ্লানির এ ক্যাম্পটিতে সমীক্ষা চালিয়ে জানা যায়, এটা মূলত এক দুর্ভোগের জায়গা। এখানে স্যানিটেশনের কোনো ব্যবস্থা নেই, বিদ্যুৎ নেই। কোনো কিছুই এখানে ঠিকমতো কাজ করে না। পানির জন্য এখানকার নারীকে ছুটে যেতে হয় কয়েক মাইল দূরে। অভিযুক্তদের থাকার জন্য ছোট একটি কুঁড়েঘরের ব্যবস্থা রয়েছে। কুঁড়েঘরটি তার পরিবারের লোকজন, পুরোহিত কিংবা তার ছেলের সহায়তায় তৈরি করা হয়। অভিযুক্তরা এখানে মুরগি লালন-পালন করে, পাশের বন থেকে কাঠ জোগাড় করে বিক্রি করে অথবা আশপাশের কৃষকদের খামারে ভুট্টা, আলু ইত্যাদির বিনিময়ে কাজ করে থাকে। তাদের কাজের বিনিময়ে অর্জিত এসব জিনিসপত্র পুরোহিত নিয়ে নেয়। দাতা সংস্থাগুলো এখানকার মানুষের জন্য ভুট্টা চাষের জন্য মাঝে মাঝে সহযোগিতা করে। তাদের কুঁড়েঘরের পাশে ভুট্টা চাষের ব্যবস্থা করে দেয়। এখানকার তাপমাত্রা প্রায় ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

ওখানকার পুলিশ কমান্ডার জর্জ কুমাহ মনে করেন, ডাইনিবিদ্যার অজুহাত তোলার কারণে সমাজে নানা ধরনের সহিংস ঘটনা ঘটছে। এর অনেকই ডাইনিবিদ্যার সঙ্গে মোটেও সংশ্লিষ্ট নয়। পূর্বশত্রুতা বা ব্যক্তিগত রেষারেষির কারণেও অনেককে ডাইনি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তিনি বলেন, আমাদের কাছে এমন একজন গ্রেফতার হয়েছেন যিনি জাদুটোনার অভিযোগ তুলে তার মাকে খুন করেছেন। গ্রেফতার হওয়ার পর সে পুলিশের কাছে দাবি করে, একজন পুরোহিত তাকে জানিয়েছিল তার জীবনের নানা অশান্তির পেছনে রয়েছে তার মায়ের জাদুটোনা। এ কথা শুনে সে সঙ্গে সঙ্গে তার মায়ের ওপর হামলা চালিয়ে তাকে খুন করে। কুমাহ এ ঘটনায় প্ররোচনাকারী ওই পুরোহিতকেও আটক করেছে।

তিনি আরও বলেন, এ ধরনের প্ররোচনাকারীর বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর কোনো আইন নেই। ফলে অনেকেই এসবের সঙ্গে জড়িয়েও পার পেয়ে যাচ্ছে। আমরা জাদুটোনায় বিশ্বাসী না হলেও আইনের দুর্বলতার কারণে এদের বিরুদ্ধে তেমন ব্যবস্থা নিতে পারি না। তবে এ ক্ষেত্রে ইয়েন্ডির মানবাধিকার ব্যুরোর পরিচালক ইয়াকুবু যথেষ্ট দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। যতক্ষণ পর্যন্ত এ ধরনের ঘটনা সমাজ থেকে বন্ধ না হচ্ছে, ততক্ষণ তিনি তার যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। মানুষের মধ্যে জনসচেতনতায় তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি ১০ জন নারীকে এমন অভিযোগ থেকে রক্ষা করেন। তাদের অফিসে এনে পরামর্শ ও সহযোগিতা করেন। ক্যাম্পটিতে যেসব নারী আছেন তারা মনে করেন, এখানে জীবন সহজ না হলেও অন্তত বেঁচে থাকা সম্ভব। তাই তারা বাকি জীবন এখানেই কাটাতে চান। নিজের গ্রামে ফিরে যেতে চান না। ফিরে যেতে চান না প্রিয় মুখগুলোর কাছে, প্রিয় মানুষগুলোর কাছে।

১,০৭৭ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
সর্বমোট পোস্ট: ৩২ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ২০ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৫-১৯ ০৭:৪০:২১ মিনিটে
banner

৯ টি মন্তব্য

  1. আজিম হোসেন আকাশ মন্তব্যে বলেছেন:

    ধন্যবাদ শেয়ার করার জন্য।

  2. মুহাম্মদ আনোয়ারুল হক খান মন্তব্যে বলেছেন:

    এই ব্যাপারটা নিয়ে একটা গল্প লেখার প্লান আছে। আপনাকে ধন্যবাদ।

  3. আমির হোসেন মন্তব্যে বলেছেন:

    ভাল লাগল।অনেক কিছু শিখলাম। লিখুন সবসময়।

  4. সুমাইয়া বরকতউল্লাহ্ মন্তব্যে বলেছেন:

    ektokhani poresi, Thank u.

  5. আরিফুর রহমান মন্তব্যে বলেছেন:

    আমাদের কাছে শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ।

  6. কাউছার আলম মন্তব্যে বলেছেন:

    ভাল লাগল।অনেক কিছু শিখলাম।

  7. শাহ্‌ আলম শেখ শান্ত মন্তব্যে বলেছেন:

    চমত্‍কার লিখেছেন !
    অনেক ভাল লেগেছে ।

  8. তুষার আহসান মন্তব্যে বলেছেন:

    ভাল লিখেছেন !

    অশেষ ধন্যবাদ ভাই
    ভাল থাকবেন সব সময়।

  9. এই মেঘ এই রোদ্দুর মন্তব্যে বলেছেন:

    আজব কাহিনী
    ভয়ংকরো বটে

    ভাল লাগল পোস্ট

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top