Today 17 Sep 2019
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

ধারাবাহিক উপন্যাস “নরক”

লিখেছেন: এ হুসাইন মিন্টু | তারিখ: ২১/০৭/২০১৩

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 688বার পড়া হয়েছে।

পর্ব-১৩
এখনো সূর্য উঠে নি। মজনু আসাদ মাস্টারের বাড়ির আঙ্গিনায় দাড়িয়ে আছে। আসাদ বাথরুম থেকে বের হয়ে মজনুকে দেখে সামান্য চমকাল এই ভেবে, এত ভোরে মজনুর আগমন কেন ? কোনো অঘটন ঘটে নি তো ?
কাছে গিয়ে জিজ্ঞাস করল, এত ভোরে কী মনে করে মজনু ?
মজনু স্বগর্বে এগিয়ে গিয়ে মুচকি হেসে বলল, আলাপ আছে ভাইজান।
কোনো সমস্যা ? আরো দুই কদম এগিয়ে সামনে এসে বলল আসাদ ।
মজনু সঙ্গে সঙ্গে বলল, সমস্যা মানে, মহা সমস্যা।
আসাদ ফের জানতে চাইল, কী হয়েছে ?
বেগম রাতে গলায় ফাঁসি দিতে গিয়েছিল। শুকনো গলায় জবাব দিলো মজনু ।
আসাদ বলল, তুমি জানলে কীভাবে ?
মাথা চুলকাতে চুলকাতে মজনু বলল, আমি সারারাত জঙ্গলে বসে ছিলাম।
মজনুর কথার আগ মাথা আসাদ কিছুই বুঝতে পারল না । কোনো সুস্থ মানুষ সারা রাত জঙ্গলে বসে থাকবে কেন ? আসাদ বলল, তুমি কী বলছ, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
মজনু শান্ত গলায় বলল, আপনি তো জানেন ভাইজান, গ্রাম এলাকার মেয়েদের বিয়ে ভেঙ্গে গেলে তারা আত্মহত্যা করতে চায়। আমি ভাবলাম, বেগমও আত্মহত্যা করতে পারে। সেজন্য সারারাত জঙ্গলে বসে রইলাম। শেষ রাতের দিকে দেখলাম বেগম দড়ি হাতে নিয়ে বাগানের দিকে আসছে। তারপর গলায় ফাঁসি লাগানোর সাথে সাথে কাস্তে দিয়ে রশি কেটে দিলাম..
মজনুকে শেষ করতে না দিয়ে আসাদ বলল, বেগম এখন কেমন আছে ?
মজনু উচ্ছ্বাসিত স্বরে বলল, ভালো আছে, ভাইজান।
আসাদ কি বলবে ঠিক বুঝতে পারছে না । মানুষ যে কিভাবে এত সহজে জীবন বিসর্জন দিতে আসাদ ভাবতেও পারে না । খানিক পর মজনুর জিজ্ঞাসু চোখের দিকে তাকিয়ে আসাদ ফের বলল, তুমি কি আরো কিছু বলবে ?
মজনু বলল, জ্বী ভাইজান।
বলো।
বেগমের একটা ব্যবস্থা করতে হবে না ?
কী ব্যবস্থা ?
বেগমের বিয়ে শাদী দিতে হবে না ?
লম্বা শ্বাস ফেলে আসাদ বলল, হ্যা, তাতো দিতেই হবে। কিন্তু কিছুই ভেবে পাচ্ছি না।
খানিকক্ষণ ভেবে মজনু বলল, আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে, ভাইজান। আসাদ মজনুর দিকে তাকানোর সাথে সাথে মজনু ফের বলল, সবুজ ভাইজানের সাথে বেগমের বিয়ে দিলে কেমন হয় ?
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আসাদ বলল, সবুজ রাজি হবে বলে মনে হয় না।
আরো কিছুক্ষণ পর বলল, তুমি করলেই তো পারো।
মজনু লজ্জিত ঠোঁটে বলল, কি যে বলেন ভাইজান, আমি নিজেই থাকি আরেকজনের বাড়িতে। চাল নাই, চুলা নাই। বউকে খাওয়াবো কি ?
আসাদ বারান্দায় গিয়ে টুলে বসতে বসতে বলল, সবুজ রাজি হবে ?
মজনু একেবারে ঝোঁকে এসে বলল, কেন রাজি হবে না ? বয়স কি কম হয়েছে, এখন বিয়ে না করলে, কবে করবে ?
আসাদ ফের বলল, সবুজ শিক্ষিত মার্জিত, তালুকদার বংশের ছেলে। না না, সবুজ রাজি হবে বলে মনে হচ্ছে না।
মজনুও পিড়িতে বসতে বসতে বলল, ভাইজান তো আপনার কোনো কথাই ফেলে না। আপনি বললে মনে হয় কাজ হবে।
সেটা কি ঠিক হবে ? সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞাস করল আসাদ ।
মজনু নরম সুরে বলল, একবার বলেই দেখুন না।
আসাদ বলল, ঠিক আছে। তুমি যাও, স্কুল থেকে ফেরার সময় তোমাদের বাড়ি হয়ে আসব।
মজনু হাস্যজ্জ্বল মুখ নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হল। আসাদ গভীর ভাবনায় পড়ে গেছে। কিছুতেই ভেবেই পাচ্ছে না মজনুর এমন যুক্তিহীন অদম্য ইচ্ছাকে প্রশ্রয় দেয়া উচিৎ হবে কিনা। এমন অযৌক্তিক প্রস্তাব শোনে সবুজ কি ভাববে তাও বুঝতে পারছে না।
এইদিকে সবুজও চিন্তিত। বেগম রাতে আত্মহত্যা করতে গিয়েছিল, সেই খবর সবুজ ভোরেই পেয়েছে। এখন বসে বসে ভাবছে, অন্যায় হলে হত। যৌতুক দিয়ে হলেও বেগমের বিয়েটা সম্পূর্ণ করা উচিৎ ছিল।
বার বার কেন যেন মনে হচ্ছে, অন্যায়কে প্রশ্রয় না দিয়ে সে নিজেই অন্যায় করে ফেলেছে। অন্যায় যেখানে ন্যায়-এ পরিনিত হয়েছে ! অনিয়মই যখন নিয়ম হয়ে দাড়িয়েছে ! সেখানে বোধ হয় নীতি বাক্য না বলাই শ্রেয় ছিল।
সকাল দশটার দিকে তালুকদার বাড়িতে বৈঠক বসেছে। এ বৈঠক কোনো গানের বৈঠক নয়। শালিসি বৈঠকও নয়। অনুরোধ আর সুপারিশের বৈঠক। এক বুক দ্বিধা আর সংসয় নিয়ে আসাদ প্রথমে কথা খোলাসা করল।
আসাদ যা ভেবেছিল সবুজ সে রকম কোনো প্রতিক্রিয়া না করায় আসাদ ও মজনু সামনে অগ্রসর হওয়ার আরো সাহস পেল। শুরু হয়ে গেল বিয়ের আয়োজন।
মজনু এক দৌড়ে চলে গেল করিমের বাড়িতে। করিম নিজ কানে শোনার পরও বিশ্বাস করতে পারছে না। বেগম তো মোটেও নয়। ডাঃ সবুজ তালুকদারের মতন লোক তাকে বিয়ে করবে কেন? মজনু কসম খেয়ে বলার পর করিম নফল নামাজে দাড়িয়ে পড়ল।

 

প্রায় একমাস হতে চলল বেগমের সাথে সবুজের বিয়ে হয়েছে। যা কেউ কল্পনাও করতে পারে নি সবুজ তাই করে দেখিয়েছে। এ নিয়ে এলাকায় এক ধরনের আলোচনা ও সমালোচনার গুঞ্জনও চলেছে বেশ কয়েকদিন। তাতে সবুজের কিছু যায় আসে না। সে কখনো কোনো সমালোচনাকে পাত্তা দেয় নি। তার বাবার মতন নিজ বিবেচণায় এলাকার জন্য যা মঙ্গল মনে হয়েছে, বরাবর তাই করেছে। তাইতো কোনো সমালোচনাই সবুজের জীবনের গতিকে শ্লথ করতে পারে নি।
সকালের নাশতা খাওয়ার পর সবুজ পত্রিকা নিয়ে বসেছে। গতকালের পত্রিকা। এই এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা বেহাল বলে যেদিনের পত্রিকা সেদিন পাওয়া যায় না। এখানে যাদের খবরের কাগজের প্রতি বেশি রকম ঝোঁক আছে, তারা বাধ্য হয়েই একদিনের বাসী পত্রিকা পড়ে।
সবুজও বাসী পত্রিকা নিয়ে বসেছে। মিনিট পাঁচেক হতে চলল করিম এসে পাশে দাড়িয়েছে। আজ করিমকে অন্য রকম লাগছে। গায়ে বরাবরের মত ময়লাক্ত জামা নেই। আজ পরেছে পরিচ্ছন্ন সাদা পাঞ্জাবি আর মাথায় টুপি। করিমের এই এক বাতিক, যতক্ষণ পর্যন্ত সবুজ জিজ্ঞাস না করবে, কিছু বলবেন ? ততক্ষণ পর্যন্ত কিছুই বলবে না। নিরবে দাড়িয়ে একবার চুঁলকাবে হাত, আবার চুঁলকাবে মাথা।
সবুজ কি যেন একটি খবর অতিশয় গুরুত্বের সহিত পড়তে ছিল বলে করিমের দিকে তার চোখ পড়ে নি। করিমের দিকে চোখ পড়তেই জিজ্ঞাস করল, কিছু বলবেন ?
করিম তার অভ্যাসের বশবর্তী হয়ে হাত চুঁলকাতে চুঁলকাতে বলল, জে বাবাজি।
বলুন।
আমি চিল্লায় যাবার চাইতেছি। বলল করিম ।
কখন ?
আপনি যদি অনুমতি দেইন, তাইলে আজকাই রওনা দিমু।
কবে ফিরবেন ?
আর ফিরতাম না বাবাজি।
সবুজ কিঞ্চিৎ বিস্ময়ের সুরে বলল, মানে ?
আমি জীবন চিল্লার নিয়্যত করছি।
সবুজ অপ্রস্তুত স্বরে বলল, হঠাৎ জীবন চিল্লার সিদ্ধান্ত নিলেন কেন ?
করিম ধীরে ধীরে বলল, জীবনে বোধ অয় অনেক পূন্যি করছিলাম বাবাজি, নইলে জিম্মাদারী শেষ করার মত সুভাগ্য কয়জনের অয় ? আপনি লেহাপড়া শেষ কইরা বাড়িত আইছেন। আপনার আমানত আপনার কাছে ফেরত দিবার পাইছি। একটা মাত্র মাইয়া আমার, তার মাথার উপরে আপনার মতন ফেরেশ্তার ছায়া। আমার আর কী চাইবার আছে ? তাই ভাবছি বাকি জীবনডা তার নাম ডাকতে ডাকতে রাস্তায় রাস্তায় কাটাইয়া দিমু। বাকিডা তার মর্জি।
সবুজ ফের পত্রিকায় চোখ রেখে বলল, বেগমের সাথে দেখা করে যান।
বেগম চৌকাঠের ওপাড়ে দাড়িয়ে সব শোনেছে। এখন সে খাটের উপর বসে কাঁদছে। করিম ভেতরে ঢুকে মেয়ের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল, কান্দস ক্যান রে মা ?
বেগম বাবার দিকে ঘুরে ফিঁসফিঁস করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, এমন সিদ্ধান্ত ক্যান নিলা বাজান ?
করিম সান্ত্বনার সুরে বলল, মন খারাপ করছ ক্যান রে মা ?
বেগম কান্না সিক্ত কন্ঠে বলল, তুমি ছাড়া আমার কি অইবো বাজান ?
তোর উপরে যে ফেরেশ্তার ছায়া, তার সামনে আমি তো কিছুই না। তোর কিসমত অনেক ভালা, ডাক্তার বাবাজির মতন লোক তরে বিয়া করব ক্যান ? হের খেয়াল রাখিস, জীবনে অনেক সুখি অইবি। এসব বলেই চোখ মুছতে মুছতে করিম দরজার দিকে পা বাড়াল ।
চৌকাঠের দিকে পা বাড়াতেই বেগম বলল, বাজান যেও না।
করিম দাড়িয়ে মেয়ের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল, মানা করিস না রে মা। না চাইতেই যে আমারে এত সুখ দিলো, তার শুকরিয়া আদায় করতে অইবো না ?
করিম আর কিছু বলল না। খানিকক্ষণ মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে চৌকাঠের দিকে লম্বা পা ফেলল।
বেগম কিছুক্ষণ খাটের উপর বসে থাকার পর দৌড়ে গিয়ে দরজায় দাড়াল। বাবা যে পথ ধরে হেটে যাচ্ছে, সেই পথের দিকে তাকিয়ে ঘন ঘন চোখ মুছছে।
করিম আর পেছন ফিরে তাকাল না। তার দুই চোখ গলে পানি পড়ছে। মেয়ের মায়াবি মুখখানি দেখলে হয়ত পা কেঁপে উঠবে, এই ভেবেই সে হয়ত আর পেছন ফিরে তাকাল না।

(এই বইটি ২০১৩ বইমেলায় প্রকাশিত)

(যা না বললেই নয়-এই উপন্যাসের সময়কাল নির্ধারণ করা হয়েছে ১৯৭১ থেকে১৯৯৩ পর্যন্ত)

৮০০ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
পুঁজিবাদের এই জমানায় কলম আমার পুঁজি চেনা মানুষের ভিড়ে আমি অচেনা মুখ খোঁজি,, কলমে ভর করে দাড়ানোর প্রচেষ্টায় রত এক শব্দ শ্রমিক । লেখকের প্রকাশিত বইসমূহঃ- কাব্যগ্রন্থ-জীবন নদীতে খরা উপন্যাস-অশ্রু, নরক ও প্রচ্ছায়া ।
সর্বমোট পোস্ট: ৯৮ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ১২৫০ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৬-২৬ ১২:২৭:৩১ মিনিটে
banner

৭ টি মন্তব্য

  1. আমির হোসেন মন্তব্যে বলেছেন:

    উপন্যাসটি নিয়মিত পাচ্ছি না।

  2. আরিফুর রহমান মন্তব্যে বলেছেন:

    উপন্যাসটি ভাল লেগেছে। ধন্যবাদ।

  3. কাউছার আলম মন্তব্যে বলেছেন:

    নিয়মিত উপন্যাসটি চালালে আরও ভাল লাগবে।

  4. এ হুসাইন মিন্টু মন্তব্যে বলেছেন:

    এখন থেকে নিয়মিত পোস্ট করব ইনশাল্লাহ

  5. শাহ্‌ আলম শেখ শান্ত মন্তব্যে বলেছেন:

    অসংখ্য ভাল লাগা জানিয়ে দিলাম । শুভ কামনা ।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top