Today 11 Dec 2019
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

ধারাবাহিক উপন্যাস “নরক”

লিখেছেন: এ হুসাইন মিন্টু | তারিখ: ২৭/০৭/২০১৩

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 779বার পড়া হয়েছে।

পর্ব-১৬
কাঁঠাল গাছের ছায়াগুলো ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। সূর্য তার তেজশক্রিয়ার ষোলকলা পূরণ করতে চলছে। সকাল পেরিয়ে দুপুর হতে চলল। সবুজ এই সময় তার চেম্বারে থাকে। মজনুও বাড়িতে নেই। বারান্দায় জলচৌকির উপর বসে আছে বর্ষা । বেগম তার পাশেই টুল পেতে বসেছে।

বর্ষা আসার পর থেকেই বেগমকে কেমন যেন উৎফুল্যমন্য লাগছে। ইতোমধ্যে বর্ষাকে সে রাজকন্যা বলে ডাকতে শুরু করেছে। বর্ষা কয়েকবার মানা করে বলেছে, আমাদের দেশ প্রজাতন্ত্র দেশ, এখানে কোনো রাজা বাদশাহ নেই। রাজা বাদশাহ নেই যেহেতু, আমি রাজকন্যা হলাম কীভাবে ?
প্রজাতন্ত্র কাকে বলে, বেগম তা জানে না, এবং জানতে চায়ও না। বর্ষা মানা করা সত্বে বেগম তাকে রাজকন্যা বলেই ডাকছে।
তার যুক্তি বর্ষা যে রকম সুন্দরী, নিশ্চয় সে কোনো রাজার মেয়ে। বেগম ছোট বেলায় তার বাবার কাছে অনেক রাজকন্যার গল্প শোনেছে। তার ধারনা মেয়েদের মধ্যে রাজকন্যারাই সবচেয়ে বেশি সুন্দরী হয়।
বেশ কিছুক্ষণ ধরে বেগম বর্ষার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। বর্ষা বিষয়টি লক্ষ্য করার পর জিজ্ঞাস করল, কিছু বলবে ?
বেগম ছোট বাচ্চাদের মতন হ্যা সূচক মাথা ঝাঁকাল। তারপর টুল টেনে নিয়ে বর্ষার গা ঘেঁষে বসে বলল, আপনি আর ডাক্তার সাহেব এক সাথে লেখাপড়া করতেন ?
বর্ষা বলল, না।
বর্ষার মুখে না শোনার পর বেগমের মুখমন্ডলে কেমন যেন মলিনতা নেমে এল। নিরামিষ স্বরে বলল, ও..।
বেগমের মুখের দিকে তাকিয়ে বর্ষা বলল, কেন, কোনো সমস্যা ?
বেগম মুখে কিছু না বলে মাটির দিকে তাকিয়ে রইল।
বর্ষা ফের বলল, আমাকে বলা যাবে ?
এবার মুখ তুলে বর্ষার দিকে তাকিয়ে বেগম মুচকি হাসল। খানিক পর দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে ধীরে ধীরে বলল, আজকাল শুধু ডর ডর লাগে । প্রায় রাতেই খারাপ স্বপন দেখি, মনে হয় আর বাঁচব না।
বর্ষা বেগমের হাত ধরে মমতামাখা কন্ঠে বলল, ছিঃ, এসব কী বলছ ?
দুইদিন পর তুমি মা হবে। এখন শুধু নিজের কথা ভাবলে চলবে ? বাচ্চার কথাও ভাবতে হবে। মা যদি মন খারাপ করে থাকে, বাচ্চারও মন খারাপ হবে যে । আর সব স্বপ্নই কি সত্য হয় ?
বর্ষার মুখের দিকে তাকিয়ে বেগম ফের সান্ত্বনার হাসি হাসল।
বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, একটা কথা বলি।
একটা না, দশটা বলো। সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলো বর্ষা ।
হাসিমাখা ঠোঁটে বেগম বলল, আপনি অনেক ভালো।
বর্ষাও মুচকি হেসে বলল, তুমিও।
খানিক পর বর্ষার হাত থেকে নিজ হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বেগম বলল, ডাক্তার সাহেব যদি আপনাকে বিয়ে করে, আমার কোনো আপত্তি নেই।
এ কথা বলেই বেগম উঠে দ্রুত পায়ে চলে গেল। তার চলে যাওয়া দেখে মনে হচ্ছে সে লজ্জা পেয়েছে। বর্ষা পেছন থেকে চেচিয়ে বলল ধীরে ধীরে যেতে। বেগম তার কথা কানে না তুলে দ্রুত গিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করল। বর্ষা একা বসে মিটি মিটি হাসছে। বেগমের উক্ত বাক্যটি তাকে নতুন করে ভাবনার জগতে নিয়ে গেল।

রাতেই বেগমের মতামতের ব্যাপারে সবুজের সাথে বর্ষার কথা হল। দুই দিনের মধ্যে সবুজের দ্বিতীয় বিবাহ সম্পূর্ণ হল।
নিতান্তই শাদামাটা আয়োজনে বিয়ে। একেবারে কাছের লোকদেরকে ছাড়া আর কাউকে নিমন্ত্রণ করা হল না।
বিবাহ সম্পূর্ণ হবার প্রায় সপ্তাহ পর, সবুজ ও আসাদ সবুজদের বাহির বাড়ির আঙ্গিনায় বসে গল্প করছে।
আলোচনার এক ফাঁকে আসাদ হঠাৎ বলল, তা কেমন চলছে ?
সবুজ বলল, কী কেমন চলছে ?
দাম্পাত্য জীবন, সংসার ?
হঠাৎ এই প্রশ্ন ?
আসাদ মুচকি হেসে বলল, দুই বউয়ের কপাল তো আর আমাদের নেই, তাই তোর কাছে শোনে তুষ্ট হবার চেষ্টা করছি।
সবুজ কোনো জবাব করল না, সব প্রশ্নের জবাব করতে নেই। সে বুঝতে পারছে আসাদ তার সাথে রসিকতা করছে।
কিছুক্ষণ পর আসাদ ফের বলল, তুই যাই বলসি না কেন দোস্ত, অনেক দিন পর নিজেকে হালকা মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে মাথা থেকে অনেক ভারী বোঝা নেমে গেছে।
সবুজ আসাদের কথার আগমাথা বুঝতে না পেয়ে একবার আসাদের দিকে তাকিয়ে ফের দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো।
ক্রমাগত আলোচনার রেশ ধরেই আসাদ ফের বলল, বেগমের সাথে তোর বিয়ে হবার পর থেকে নিজেকে কেমন যেন অপরাধী অপরাধী মনে হচ্ছিল।
সবুজ বলল, অপরাধী মনে হচ্ছিল কেন ?
তোর মত ছেলের ঘাড়ে বেগমের মত একটি মেয়েকে চাপিয়ে দেওয়াটা অপরাধ নয়ত কী ? জবাবে বলল আসাদ ।
সবুজ বলল, তোরা তো জোরপূর্বক বেগমের সাথে আমার বিয়ে দেস নি। তাছাড়া বেগমের সাথে আমি সুখেই আছি।
সবুজের মুখের দিকে তাকিয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে আসাদ বলল, বলতে পারিস, মানুষ এত ভালো হয় কেন ?
সবুজ মুচকি হেসে বলল, ভালো মানুষটির আশে পাশের মানুষগুলো বেশি ভালো যে, সেজন্য।
ভোর থেকেই বেগমের প্রসব ব্যাথা শুরু হয়েছে। এলাকায় প্রশিক্ষন প্রাপ্ত কোনো দাই নেই। একজনকে আনা হয়েছে যিনি এলাকায় দাই বলে পরিচিত। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো প্রশিক্ষন না থাকলেও এই এলাকার অনেক বাচ্চাই তার হাত ধরে পৃথিবীতে এসেছে।
প্রসবের দিন ক্ষণ ঘনিয়ে আসায় বেগমকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য বর্ষা কয়েকবার তগিদ করলেও সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষনের পর স্বাভাবিক ডেলিভারির সম্ভাবনা দেখে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যাপারটি সবুজ আমলে নেয় নি।
কিন্তু গতকাল বিকাল থেকে একেবারে ভিন্ন চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাচ্চা একদম নড়াচড়া করছে না। পূর্বাহ্নের শুরুতে মৃত বাচ্চা প্রসব হয়েছে।
ভূমিষ্ঠ হবার আগে থেকেই মা বাবার স্বপ্নের মণিকোঠায় বিচরণ করে প্রথম সন্তান। দশ মাসেরও অধিক সময় ধরে যে সন্তানের আগমনী বার্তা গুনে বাবা মা, পৃথিবীর আলো দেখার আগেই সেই সন্তান যখন চিরতরে হারিয়ে যায় অন্ধকারে। না পেয়েই হারানোর আর্তনাদ তখন বুক চিড়ে বেরিয়ে এসে বিলাপে পরিণত না হলেও, বুকের ভেতর চাপা রোদন ব্যার্থতার অগ্নি হয়ে মা বাবার অন্তর জ্বালিয়ে করে অঙ্গার।
বারান্দায় বসে সবুজও বোধ হয় সেই অনলে জ্বলে পুড়ছিল। সামান্য দূরে বিরস মুখে দাড়িয়ে আছে মজনু।
কিছুক্ষণ পর আতর ঘরের দিক থেকে ছুটে এসে বর্ষা জানাল বেগমের অবস্থা ভালো নয়। রক্ত ক্ষরণ বন্ধ হচ্ছে না, তাকে হাসপাতালে নিতে হবে। এই কথা শোনার সাথে সাথে মজনু দৌড়ে চলে গেল ভ্যানগাড়ী ডাকতে।
কয়েক মূহুর্ত পরই পরিমল ভ্যানগাড়ী নিয়ে হাজির হল। গত রাতে বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি হলে লাল মাটির কাঁচা রাস্তার দশা একেবারে বেহাল হয়ে যায়।
বেগম ভ্যানগাড়ীতে শুয়ে আছে। মজনু ফুলবাড়ীয়া পর্যন্ত ভ্যানগাড়ী ঠেলে নিয়ে গেল। ততক্ষণে বেগম একেবারে নিঃস্তব্দ হয়ে গেছে। সারা শরীর কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।
ফুলবাড়ীয়া থেকে টেম্পু গাড়ী করে বেগমকে ময়মনসিংহ নিয়ে যাওয়া হল। হাসপাতালে পৌছার সাথে সাথে ডাক্তার ইমার্জেন্সিতে পাঠিয়ে দিলেন। সমস্ত চিকিৎসাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে আসরের পর পর বেগম চলে গেল না ফেরার দেশে।

( যা না বললেই নয়, এই উপন্যাসের সময়কাল নির্ধারণ করা হয়েছে ১৯৭১ থেকে ১৯৯৩ পর্যন্ত ।)

৮৫৯ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
পুঁজিবাদের এই জমানায় কলম আমার পুঁজি চেনা মানুষের ভিড়ে আমি অচেনা মুখ খোঁজি,, কলমে ভর করে দাড়ানোর প্রচেষ্টায় রত এক শব্দ শ্রমিক । লেখকের প্রকাশিত বইসমূহঃ- কাব্যগ্রন্থ-জীবন নদীতে খরা উপন্যাস-অশ্রু, নরক ও প্রচ্ছায়া ।
সর্বমোট পোস্ট: ৯৮ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ১২৫০ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৬-২৬ ১২:২৭:৩১ মিনিটে
banner

৮ টি মন্তব্য

  1. আনোয়ার জাহান ঐরি মন্তব্যে বলেছেন:

    আজ প্রথম এটা পড়লাম। পড়েই ভাল লেগেছে। প্রথম থেকে পড়তে হবে।

  2. আলামগীর কবির মন্তব্যে বলেছেন:

    পরবর্তী লেখার জন্য অপেক্ষাই রইলাম।

  3. এ হুসাইন মিন্টু মন্তব্যে বলেছেন:

    ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।

  4. এ হুসাইন মিন্টু মন্তব্যে বলেছেন:

    কষ্ট করে পড়ার জন্য, সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা ।

  5. শাহ্‌ আলম শেখ শান্ত মন্তব্যে বলেছেন:

    পড়লাম ভাল হয়েছে এ পর্ব ।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top