Today 08 Dec 2019
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

বাংলা সাহিত্যে পলাশী দিবস

লিখেছেন: মুহাম্মদ আনোয়ারুল হক খান | তারিখ: ২৩/০৬/২০১৩

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 986বার পড়া হয়েছে।

sirajuddola

আজ ২৩ জুন। ঐতিহাসিক পলাশী ট্র্যাজেডি দিবস। ১৭৫৭ সালের এই দিনে ইতিহাসের প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে যুদ্ধের প্রহসন হয়েছিল পলাশীর আমবাগানে। সেদিন বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব তরুণ সিরাজউদ্দৌলাকে পরাজিত করার মাধ্যমে স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হয়। বেদনাবহ স্মৃতিকে স্মরণ করে এ দিনটিকে পালন করে এ অঞ্চলের মানুষ।

 

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৬ শতকের শেষের দিকে ওলন্দাজ, পর্তুগিজ ও ইংরেজদের প্রাচ্যে ব্যাপক বাণিজ্যের প্রসার ঘটে। একপর্যায়ে ইংরেজরা হয়ে যায় অগ্রগামী। বাংলার সুবেদার-দেওয়ানরাও ইংরেজদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলে। ১৭১৯ ঈসায়ী সালে মুর্শিদ কুলি খাঁ বাংলার সুবেদার নিযুক্ত হন। তার মৃত্যুর পর ওই বছরেই সুজাউদ্দিন খাঁ বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার সিংহাসন লাভ করেন।

 

এ ধারাবাহিকতায় আলীবর্দী খাঁর পর ১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল সিরাজউদ্দৌলা বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার সিংহাসনে আসীন হন। তখন তার বয়স মাত্র ২২ বছর। তরুণ নবাবের সঙ্গে ইংরেজদের বিভিন্ন কারণে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়।

 

এছাড়া রাজসিংহাসনের জন্য লালায়িত ছিলেন সিরাজের পিতামহ আলীবর্দী খাঁ’র বিশ্বস্ত অনুচর মীর জাফর ও খালা ঘষেটি বেগম। ইংরেজদের সঙ্গে তারা যোগাযোগ স্থাপন করে। এরপর নবাবের বিরুদ্ধে নীলনকশা পাকাপোক্ত করে তারা।

১৭৫৭ সালের ২৩ এপ্রিল কলকাতা পরিষদ নবাবকে সিংহাসনচ্যুত করার পক্ষে প্রস্তাব পাস করে। এই প্রস্তাব কার্যকর করতে ইংরেজ সেনাপতি লর্ড ক্লাইভ রাজদরবারের অভিজাত সদস্য উমিচাঁদকে ‘এজেন্ট’ নিযুক্ত করে।

 

২৩ জুন ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর আমবাগানে সকাল সাড়ে ১০টায় ইংরেজ ও নবাবের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মীর মদন ও মোহন লালের বীরত্ব সত্ত্বেও জগত্ শেঠ, রায়দুর্লভ, উমিচাঁদ, ইয়ার লতিফ প্রমুখ কুচক্রী প্রাসাদ ষড়যন্ত্রকারীর বিশ্বাসঘাতকতায় নবাবের পরাজয় ঘটে। সেই সঙ্গে বাংলার স্বাধীনতার লাল সূর্য পৌনে দুইশ’ বছরের জন্য অস্তমিত হয়। কবি আবদুল হাই শিকদারের একটি লেখা আমার দেশ পত্রিকাতে ২০১১ সালের ২০মে তে প্রকাশিত হয়। সেখান থেকে আমরা বেশকিছু কথা জানতে পারি যার উল্লেখযোগ্য অংশ তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

 

বাংলা সাহিত্যে পলাশী

বাংলা সাহিত্যে পলাশী প্রসঙ্গটি যতটা পুর্বত্বের সাথে আলোচিত ও পর্যালোচিত হওয়া আবশ্যক ছিল ততটা হয়নি। এটি একটি জাতির জন্যে চরম দুর্ভাগ্যের বিষয়। যে জাতি তার নিজের ইতিহাস উপেৰা করে চলে সে জাতি বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। বাংলা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জনকারী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনায় পলাশী প্রসঙ্গটি উপেক্ষিত। তেমনি উপেক্ষিত হয়েছে অন্যান্য বিখ্যাত সাহিত্যিকগণের সাহিত্যকর্মেও। অবশ্য আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল  ইসলাম এবং কয়েকজন নাট্যকার যেমন গিরিশচন্দ্র ঘোষ (৯১৮৪৪-১৯২২), শচীন সেন গুপ্ত, সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৮-১৯৭৫) প্রমুখ তুলে ধরার কিছুটা চেষ্টা করেছেন।

 

বিয়োগান্তক ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলা সাহিত্যে বেশ কয়েকটি নাটক রচিত হয়েছে। যেগুলোর মধ্যে গিরিশচন্দ্র ঘোষ, সচীন সেন গুপ্ত এবং সিকান্দার আবু জাফর রচিত তিনটি নাটক বিশেষ গুরুত্ব রাখে। এ তিনজন নাট্যকারের মধ্যে সিকান্দার আবু জাফর রচিত সিরাজউদ্দৌলা নাটকটি সবচেয়ে ইতিহাসঘনিষ্ঠ এবং নির্ভরযোগ্য হিসেবে সকল মহলে সমধিক সমাদৃত। এ ব্যাপারে সিকান্দার আবু জাফরের লেখা সিরাজউদ্দৌলা নাটকের ভূমিকায় প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব অধ্যাপক মমতাজ উদ্দীন আহমদ লিখেছেন- সিকান্দার আবু জাফরের রচনার পূর্বে বাংলা রঙ্গমঞ্চের জন্য সিরাজউদ্দৌলা বিষয়ে আরো কয়েকখানি নাটক রচিত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উলেৱখযোগ্য হলো- ১. গিরিশচন্দ্র ঘোষ (১৮৪৪-১৯১২) রচিত সিরাজউদ্দৌলা নাটক। ৫ অঙ্কের এবং ৩৬টি দৃশ্যের এই নাটক গিরিশচন্দ্র ঘোষ রচনা করেছেন ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনার বির্বদ্ধে স্বদেশী আন্দোলনের সময়। ১৯০৬ সালে নাটকটি প্রকাশিত হয়। ১৯১১ সালের ৮ জানুয়ারি তারিখে তৎকালীন সরকার সিরাজউদ্দৌলা নাটকের অভিনয় ও প্রচার বন্ধ করে দেয়।

সিরাজউদ্দৌলা নাটকের ভূমিকায় নাট্যকার গিরিশ ঘোষ বলেছেন: বিদেশী ইতিহাসে সিরাজ চরিত্র বিকৃত বর্ণে চিত্রিত হইয়াছে। সুপ্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক বিহারীলাল সরকার, শ্রীযুক্ত অৰয়কুমার মৈত্রেয়, শ্রীযুক্ত নিখিলনাথ রায়, শ্রীযুক্ত কালীপ্রসন্ন বন্দোপাধ্যায় প্রভৃতি শিৰিত সুধিগণ অসাধারণ অধ্যবসায় সহকারে বিদেশী ইতিহাস খ-ন করিয়া রাজনৈতিক ও প্রজাবৎসল সিরাজের স্বরূপ চিত্র প্রদর্শনে যত্নশীল হন। আমি ঐ সমস্ত লেখকগণের নিকট ঋণী।

২. সিরাজউদ্দৌলা বিষয়ক দ্বিতীয় উলেৱখযোগ্য নাটকটি রচনা করেন শচীন সেনগুপ্ত। বস’তপৰে শচীন সেনগুপ্তের সিরাজউদ্দৌলা বাংলার রঙ্গমঞ্চে সর্বাপেৰা জনপ্রিয় নাটক। এ নাটকটি প্রথম অভিনীত হয় ২৯ জুন ১৯৩৮ সালে।

নাট্যকার শচীন সেনগুপ্ত বলেছেন:

ইতিহাস ঘটনাপঞ্জি। নাটক তা নয়। ঐতিহাসিক লোকের ঘটনাবহুল জীবনের মাত্র একটি ঘটনা অবলম্বন করেও একাধিক নাটক করা যায়। এইজন্য যে, ঘটনাটি ঘটাবার কারণই নাট্যকারের বিষয়বস’। রাজনীতিক যে পরিসি’তিতে সিরাজ বিব্রত ও বিপণ্ন হয়েছিলেন, বহু দেশের বহু নরপতিকে সেইরূপ পরিসি’তির সম্মুখীন হতে হয়েছে। কেউ তা অতিক্রম করে স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন, কেউ তা পারেননি। এইখানেই তাঁর স্বভাবের, তাঁর চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যের কথা এসে পড়েছে। সেইখানেই রয়েছে নাটকের কাজ।

 

আমি এই (সিরাজ) চরিত্র বিশেৱষণ করে দেখাতে চেয়েছি, সিরাজের মতো উদার স্বভাবের লোকের পৰে, তাঁর মতো তেজস্বী, নির্ভীক, সত্যাশ্রয়ী তর্বণের পৰে কুচক্রীদের ষড়যন্ত্র জাল ছিন্ন করা সম্ভবপর নয়। বয়স যদি তাঁর পরিণত হত, কূটনীতিতে তিনি যদি পারদর্শী হতেন, তাহলে মানুষ হিসেবে ছোট হয়েও শাসক হিসেবে তিনি হয়তো বড় হতে পারতেন। সিরাজের অসহায়তা, সিরাজের পারদর্শিতা, সিরাজের অন্তরের দয়া দাৰিণ্যই তাঁকে তাঁর জীবনের শোচনীয় পরিণতির পথে ঠেলে দিয়েছিল। তাঁর অৰমতাও নয়, অযোগ্যতাও নয়। অধিকাংশ বাঙালির চরিত্রেরই এই বৈশিষ্ট্য। সিরাজ ছিলেন খাঁটি বাঙালি। তাই তাঁর পরাজয়ে বাংলার পরাজয় হল। তাঁর পতনের সঙ্গে সঙ্গে বাঙালিও হল পতিত।

 

শচীন সেনগুপ্তের সিরাজউদ্দৌলা ৩ অঙ্কে ৯ দৃশ্যের নাটক। এ নাটকে ইতিহাসের তথ্য যেমন আছে তেমনি ইতহাসের সম্ভাবনাসিদ্ধ কাল্পনিক চরিত্রের সমন্বয়ও ঘটেছে। তৎকালীন বাঙালির দেশপ্রীতির সঙ্গে সিরাজের দেশ্রপ্রেমের সম্মেলন সাধন করে নাট্যকার সিরাজউদ্দৌলাকে বাঙালি জাতির নায়করূপে নির্ণয় করেছেন।

 

সিকান্দার আবু জাফরের সিরাজউদ্দৌলা নাটকটি ৪ অঙ্কে ১২টি দৃশ্যে রচিত। এ নাটকটি রচনা প্রসঙ্গে নাট্যকার বলেছেন: এক যুগের ইতিহাসের কাছ থেকে পরবর্তী যুগ নানা জ্ঞানের পাঠ গ্রহণ করে। এই পাঠগ্রহণ সার্থক হয় না ইতিহাস অখ- সত্য-নির্ভর না হলে। কিন’ অনেক ৰেত্রেই দেখা গেছে যে এক একটি জাতি যুগের সীমানা অতিক্রম করে নিজেদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা এবং প্রভাব অৰুণ্ন রাখবার জন্যে ইতিহাসকে খুশিমত নির্মাণ করে গেছে; অথবা তাদের স্বার্থানুযায়ী ইতিহাস নির্মিত হওয়ার মত পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়তা করেছে। ফলে অসংখ্য অসত্যের স্তূপে সত্যের হয়েছে সমাধি। নূতন নূতন কণ্ঠে অসত্য নূতন নূতন সুরে ঝঙ্কৃত হয়েছে। জমে উঠেছে বিভ্রান্তির পাহাড়। ইতিহাস নির্মাণের এই কৌশলে ইংরেজের দৰতা বিস্ময়কর। দূরদর্শিতা, অভীষ্ট-সিদ্ধির জন্যে সজাগ তৎপরতা, ক্লান্তিহীন প্রচেষ্টা, নির্লজ্জ চাতুরী প্রভৃতির সমন্বয়ে তারা তাদের স্বার্থানুযায়ী ইতিহাস অনেকের দ্বারা লিখিয়াছে (শক্তি প্রয়োগে নয়- তাদের কৌশল-সৃষ্ট পরিবেশের বিভ্রান্তিতে উদ্বুদ্ধ করে) এবং জনসাধারণকে তা যথাসম্ভব বিশ্বাসও করিয়েছে। আমাদের ইতিহাসে সিরাজউদ্দৌলার নামটি কলঙ্ক এবং নৃসংশতার সঙ্গে সমার্থবোধক করে তোলা ইংরেজের অন্যতম উলেৱখযোগ্য কীর্তি।

 

শাঠ্যকে শৌর্য, হঠকারিতাকে বীরত্বের মর্যাদায় ভূষিত করেছি আমরা বছরের পর বছর। ক্লাইভের মত ন্যায়নীতি-বর্জিত হৃদয়হীন দস্যুর কণ্ঠে বীরের জয়মাল্য দিতে আমরা কুণ্ঠিত হইনি। সিরাজউদ্দৌলাকে শুধু যে বর্বরতার দুর্লভ দৃষ্টান্ত হিসেবেই খাড়া করেছি তা নয়, তাঁকে ধিক্কৃত করেছি চরম কাপুর্বষতার গৱানিতে। নবীন সেনের মত প্রতিভাধর দেশপ্রেমিক কবিও মুখর হয়েছেন সিরাজের কলঙ্ক-কীর্তনে। যদিও সিরাজের হত্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘নিবিল তখন ভারতের শেষ আশা।’ অর্থাৎ সিরাজউদ্দৌলা যে বঙ্গদেশ তথা ভারতের স্বাধীনতার সর্বশেষ প্রদীপ সে বিষয়ে কবি সচেতন ছিলেন। তবু ব্যক্তি হিসেবে সিরাজউদ্দৌলার কলঙ্ক-কীর্তনের লোভ তিনি সংবরণ করতে পারেননি। কারণ, অপরের কুৎসায় মানুষের আনন্দ অপরিতৃপ্ত। সে কুৎসা কলঙ্কের ভিয়েনে পরিপক্ব হলে ত কথাই নেই। এক কান থেকে আর এক কান এবং তারপর তৃতীয় চতুর্থ কানে যেতে যেতে প্রথম প্রচারিত কুৎসা শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে মহীরূহ হয়ে ওঠে এবং এক সময়ে মানুষের কাছে তা ইতিহাসের তথ্য সমৃদ্ধ চেহারায় পরিচিত হতে শুর্ব করে। সিরাজউদ্দৌলার ৰেত্রে ইংরেজের সুপরিকল্পিত প্রচারণা ঠিক এই সাফল্যই এনে দিয়েছিল।

 

মদ্যপ যথেচ্ছাচারী সিরাজউদ্দৌলার তুলনা টাইবেরিয়াস ক্লডিয়াস নীরো, নৃশংসতায় তিনি হালাকু খান, লাম্পট্যে রাসপুটিন। এর চেয়ে জোরালো দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়নি বলে কলঙ্কের ঘুড়ি আরও অগ্রসর হতে পারেনি।

 

সিরাজউদ্দৌলার চরেরা সন্ধান পাবার পরও এ-দেশের কোনো সুন্দরী যুবতী সামাজিক মর্যাদায় ভূষিত ছিল তা কেউ বিশ্বাস করেনি। নিরীহ মানুষকে নদীতে ডুবিয়ে দিয়ে তার মরণ-অপেৰা তিনি উপভোগ করতেন। পূর্ণকাল গর্ভিনীর গর্ভ বিদীর্ণ করে তিনি সন্তানের অবস’ান নির্ণয় করতেন- এ সবই সিরাজউদ্দৌলার বির্বদ্ধে বহুল প্রচারিত কলঙ্ক এবং রসাল কাহিনী।

 

কিন্তু সত্য হল সর্বগ্রাসী অগ্নি। অসত্যের স্তূপে তা সাময়িকভাবে চাপা পড়লেও নির্বাপিত হয় না। একদিন আবর্জনার আস্তরণ পুড়িয়ে ফেলে সে আত্মপ্রকাশ করে। ইংরেজের সুচতুর চক্রান্তে সিংহাসনচ্যুত এবং নিহত সিরাজউদ্দৌলার জীবন-কাহিনীও সত্যের হাত ধরে ধীরে ধীরে এ-দেশবাসীর সামনে উপসি’ত হতে শুর্ব করে। অবশ্য সে চেষ্টা সহজ সাধ্য ছিল না। কারণ, পরাধীন মানুষের পৰে সত্য ভাষণের অধিকারও ভ্রূকুটির শাসনে অবদমিত। তবু সব আশঙ্কা এবং শাসনের রক্তচৰু উপেৰা করেও শুর্ব হয়েছিল ঐতিহাসিক সত্যের মুক্তি অভিযান। সাহস এবং প্রেরণা যুগিয়েছিলেন ঈড়ষ গধষষবংড়হ এবং অন্যান্য ইংরেজ ঐতিহাসিক। এই অভিযানে সবচেয়ে উলেৱখযোগ্য কৃতিত্বের অধিকারী অৰয়কুমার মৈত্রেয়। তাঁকে উৎসাহ এবং সমর্থন দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। অৰয়কুমার ইংরেজের কারসাজির জঞ্জাল ঘেঁটে সিরাজউদ্দৌলার কলঙ্ক মোচনের চেষ্টা করেছেন এবং সমসাময়িক কালের সত্য-নির্ভর ইতিহাস নির্মাণের পথিকৃত হয়েছেন। তাঁর গ্রন’টি প্রকাশিত হয় ১৩০৪ সালে।

 

জাতীয় জাগরণের প্রয়োজনে উদ্দীপনার প্রেরণা হিসেবে সিরাজউদ্দৌলা জাতীয় বীরের আসন লাভ করেছেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের নির্ভীক নায়ক রূপে সিরাজউদ্দৌলা সর্বজনপ্রিয় চরিত্র। এই সাফল্যের পথে প্রসারিত হয়েছে জাতীয় নাট্যান্দোলনের মাধ্যমে। উক্ত আন্দোলনে যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছেন তাঁদের মধ্যে গিরিশচন্দ্র ঘোষ এবং শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের কৃতিত্ব অবিস্মরণীয়। গিরিশচন্দ্র ঘোষের নাটক প্রথম অভিনীত হয় ১৩১২ সালের ২৪শে ভাদ্র। শচীন সেনগুপ্তের সুবিখ্যাত নাটকটি প্রথম মঞ্চস্থ হয়েছে ১৯৩৮ সালের ২৯শে জুন। এছাড়াও লেখাটি তৈরি করতে ঢাকা থেকে প্রকাশিত বাংলাকথা পত্রিকার তৃতীয় সংখ্যার জনাব খালিদ বিন অলিদ এর লেখার সাহায্য নেওয়া হয়েছে।

 

রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমেও সিরাজউদ্দৌলার কলঙ্ক মোচনের চেষ্টা হয়েছে। ইংরেজের সুপরিকল্পিত আন্তর্জাতিক প্রচারণায় অবিসংবাদী সত্য হিসেবে গৃহীত সিরাজউদ্দৌলার বর্বরতার সবচেয়ে ভয়াবহ দৃষ্টান্ত ‘অন্ধকূপ হত্যা’ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে। অনুরূপ হত্যার স্মারক স্তম্ভ ‘হলওয়েল মনুমেন্ট’ অপসারণে রাজনৈতিক নেতা সুভাষচন্দ্র বসুর ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা, ছেনী-হাতুড়ি নিয়ে কলঙ্ক-স্তম্ভটি চূর্ণ করবার জন্যে তাঁর প্রত্যৰ আত্মনিয়োগের আমি চাৰুস সাৰী।

জাতীয় চেতনা নূতন খাতে প্রবাহিত হয়েছে। কাজেই নূতন মূল্যবোধের তাগিদে ইতিহাসের বিভ্রান্তি এড়িয়ে ঐতিহ্য এবং প্রেরণার উৎস হিসেবে সিরাজউদ্দৌলাকে আমি নূতন দৃষ্টিকোণ থেকে আবিষ্কারের চেষ্টা করেছি। একান্তভাবে প্রকৃত ইতিহাসের কাছাকাছি থেকে এবং প্রতি পদৰেপে ইতিহাসকে অনুসরণ করে আমি সিরাজউদ্দৌলার জীবনাট্য পুননির্মাণ করেছি। ধর্ম এবং নৈতিক আদর্শে সিরাজউদ্দৌলার যে অকৃত্রিম বিশ্বাস, তাঁর চরিত্রের যে দৃঢ়তা এবং মানবীয় সদগুণগুলিকে চাপা দেবার জন্যে ঔপনিবেশিক চক্রান্তকারী ও তাদের স্বার্থান্ধ স্তাবকেরা অসত্যের পাহাড় জমিয়ে তুলেছিল, এই নাটকে প্রধানতঃ সেই আদর্শ এবং মানবীয় গুণগুলিকেই আমি তুলে ধরতে চেয়েছি।

 

নাটকের বিভিন্ন দৃশ্যে যে তারিখগুলি উল্লেখ  করা হয়েছে তার ভেতরে কিছু কিছু অবশ্যই কাল্পনিক। ঐতিহাসিক ঘটনাসূত্রে নথিবদ্ধ তারিখগুলির মাঝে মাঝে এক একটি ঘটনার সময় কল্পনা করে নেওয়া হয়েছে। সেটা ঘটনা প্রবাহের একটা অবিচ্ছেদ্য গতি দেখাবার জন্যে। এটা ইতিহাস-গ্রন’ নয়। সেই হিসেবে নাটকীয় ঘটনার কাল্পনিক তারিখ-সন্নিবেশ তেমন একটা অপরাধ বলে গণ্য হবে না।

 

এছাড়াও বাংলা সাহিত্যে পলাশী বিষয়ে উলেৱখযোগ্য যেসব সাহিত্যকর্ম চোখে পড়ে তার মধ্যে অৰয় কুমার মৈত্রেয় রচিত সিরাজউদ্দৌলা, তপন মোহন চট্টোপাধ্যায়ের পলাশীর যুদ্ধ, মৃণাল চক্রবর্তীর সিরাজউদ্দৌলা, শ্রী পারাবত রচিত আমি সিরাজের বেগম, নিখিল নাথ রায় রচিত মুর্শিদাবাদ কাহিনী অন্যতম। বস’ত ‘বাংলা সাহিত্যে পলাশী’ বিষয়ে এত স্বল্প পরিসরে আলোচনা করা সম্ভব নয়। বিগত শতকের মোটামুটি মাঝামাঝি সময়কাল পর্যন্ত ঐতিহাসিক লেখক, কবি, সাহিত্যিকদের লেখনিতে যে অনুসন্ধিৎসা লৰ করা গেছে তা বর্তমান কালে নিতান্তই অনুপসি’ত। ভবিষ্যতের ইতিহাস গবেষকদের জন্য মূল্যবান উপাদান হবে পলাশী- তাতে সন্দেন নাই। ব্রিটিশ প্রভাবে রচিত সিরাজউদ্দৌলা আর আজকের সিরাজউদ্দৌলার মধ্যে যেমন বিস্তর ফারাক রয়েছে তেমনি সত্যিকার দেশপ্রেমিক নেতৃত্বের ইতিহাস অবশ্যই একদিন উদ্ভাসিত হবে সূর্যালোকের ন্যায়। তবে এৰেত্রে এ সময়ের ইতিহাস গবেষক লেখকদের দায় কম নয়। সচেতনভাবে তাঁরা তা এড়িয়ে গেলে ইতিহাসের ডাস্টবিন তাদেরই জন্যে অপেক্ষা  করে থাকবে। -সংকলিত

 

১,১১৯ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
আমার জন্ম পিরোজপুরে নানা বাড়িতে। দাদা বাড়িও পিরোজপুরে। পিরোজপুর শহরের সার্কিট হাউজ – ফায়ার সার্ভিস এর মাঝখানে আমাদের বাড়ি। পিরোজপুর আমার কাছে স্বপ্নের শহর। যদিও ক্লাস থ্রী থেকে আমি ঢাকাতে মানুষ। এসএসসি ১৯৯৬ সালে। পড়াশুনা করেছি ফার্মেসিতে, পরে এমবিএ করেছি আন্তর্জাতিক বিপননে। জুলাই ১৫, ২০১১ থেকে সব ধরনের রাজনৈতিক আলোচনা থেকে অবসর নিয়েছি। বিশেষ ব্যক্তিত্বঃ নবিজী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বঃ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান যে ব্যক্তিত্ব আমাকে টানেঃ ডঃ মুহম্মদ ইউনুস প্রিয় লেখকঃ মুহম্মদ জাফর ইকবাল, হুমায়ুন আহমেদ, হেনরি রাইডার, জুল ভান প্রিয় টিভি সিরিয়ালঃ Spellbinder, Spellbinder 2: Land of the Dragon Lord, The girl from tomorrow, Tomorrows end, Time Trax, MacGyver, Alice in Wonderland, The Chronicles of Narnia প্রিয় টিভি নাটকঃ কোথাও কেউ নেই, অয়োময়, রুপনগর, বহুব্রিহী, বার রকম মানুষ প্রিয় টিভি শোঃ ইত্যাদি, সিসিমপুর, Pumpkin Patch Show লেখালেখি আমার শুধু শখই না, মনে হয় যেন রক্তের টান। বিশেষ করে বিজ্ঞান-কল্পকাহিনি। বিজ্ঞান-কল্পকাহিনি আমার কাছে রঙ্গিন ঘুড়ির মত। কল্পনার সীমানা পেরিয়ে যে ছুটে চলে মহাজগতিক পরিমণ্ডলে। এ যেন সময়টাকে স্থির করে দিয়ে এর আদি-অন্ত দেখার মত। তারপরও এ ঘুড়ি যেমন ইচ্ছে তেমন উড়তে পারে না, সুতোয়ে টান পড়ে বলে। এ টান যুক্তির টান। যৌক্তিক কল্পনা বললে ভুল হয় না। তারপরও নিজ ইচ্ছেয়ে সুতোটাকে ছিঁড়ে দিতে ভাল লাগে মাঝে মাঝে। আমি যেমন নিজে স্বপ্ন দেখি তেমনি সবাইকে স্বপ্ন দেখাতে চাই। অঞ্জন দত্তের ভাষায় বলতে হয়, ‘মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যখন-তখন কান্না পায়, তবু স্বপ্ন দেখার এই প্রবল ইচ্ছাটা কিছুতেই মরবার নয়।’ কনফুসিয়াসের এই লাইন টা আমাকে খুব টানে … journey of a thousand miles begins with a single step। আমার প্রথম লেখা প্রকাশ হয় ১৯৯৬ সালে আধুনালুপ্ত বিজ্ঞান সাপ্তাহিক আহরহ তে। আমার নিজের একটা ব্লগ আছে, mahkbd.blogspot.com। আমার ইমেইল mahkbd@gmail.com।
সর্বমোট পোস্ট: ৯৬ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ১৫৫ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৫-১১ ০৩:১৪:৫৫ মিনিটে
banner

৯ টি মন্তব্য

  1. আজিম হোসেন আকাশ মন্তব্যে বলেছেন:

    ধন্যবাদ শেয়ার ও স্মরণ করার জন্য..

  2. বদরুল হোসেন মন্তব্যে বলেছেন:

    অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়’র বইটি সিরাজউদ্দৌলা’র মৃত্যুর ৫০ বছর পরে রচিত হয়। এটি ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোন থেকে অনেক নির্ভরশীল ও নির্মোহ রচনা।

  3. নোমান রহমান মন্তব্যে বলেছেন:

    ‘বাংলা সাহিত্যে পলাশী’ নিবন্ধাংশ পূর্ব-পঠিত মনে হচ্ছে। লেখকের নাম মনে করতে পারছি না বলে নিশ্চিত হতে পারছি না একই লেখকের পুনঃপ্রকাশনা কি না। এরকম হলেও পূর্ব-প্রকাশের উল্লেখ (রেফারেন্স) থাকা স্বস্তিকর। আর ধার করা হলে ঋণ স্বীকার অবশ্য-করণীয়।

    • মুহাম্মদ আনোয়ারুল হক খান মন্তব্যে বলেছেন:

      নোমান ভাই
      আমি ১৫ তম লাইনে বলেছি, “কবি আবদুল হাই শিকদারের একটি লেখা আমার দেশ পত্রিকাতে ২০১১ সালের ২০মে তে প্রকাশিত হয়। সেখান থেকে আমরা বেশকিছু কথা জানতে পারি যার উল্লেখযোগ্য অংশ তুলে ধরার চেষ্টা করছি।” এছাড়াও বাংলাকথা পত্রিকার তৃতীয় সংখ্যার জনাব খালিদ বিন অলিদ এর কথা বলেছি। সবশেষে বলেছি যে লেখাতটি সংকলিত। তবে হ্যাঁ, সবশেষে সিরিয়াল করে আমার তথ্যসূত্র দেওয়া উচিত ছিল। সেটা ভুল হয়েছে। তবে আপনি সময় নিয়ে লেখাটি পড়েছেন সে জন্য আমি আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আপনি যে ভুল ধরিয়ে দিয়েছেন সেটা যেন পরবর্তীতে আর না হয় সে চেষ্টা করব।

    • সম্পাদক মন্তব্যে বলেছেন:

      আপনারা সবাই গঠনমূলক সমালোচনা করুন। তাহলে সবাই শিখতে পারবে। আরও উৎসাহ পাবে। আনোয়ারুল ও নোমান ভাইকে চলন্তিকার পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা।

  4. আমির হোসেন মন্তব্যে বলেছেন:

    আনোযার ভাই আপনার লেখাটি খুবই সময় উপযোগী। এমন লেখা বার বার আপনার কাছ থেকে আশা করি।

  5. আরিফুর রহমান মন্তব্যে বলেছেন:

    ধন্যবাদ শেয়ার করার জন্য। আবার জানা হল।

  6. শাহ্‌ আলম শেখ শান্ত মন্তব্যে বলেছেন:

    সুন্দর লিখেছেন তো !
    অসংখ্য অসংখ্য ভাল লাগা জানিয়ে দিলাম ।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top