Today 15 Oct 2018
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

প্রতীক্ষা

লিখেছেন: শওকত আলী বেনু | তারিখ: ২৩/১২/২০১৩

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 495বার পড়া হয়েছে।

স্হান গৃহস্থের বাড়ি।কলম চাচা সাড়া রাত ঘুমাতে পারেনি।কী এক অদ্ভূত দুশ্চিন্তা তাকে গ্রাস করছে বার বার।কাউকে ঘুচিয়ে বলতে পারছে না কিছুই।চৈত্রের প্রচন্ড দাবদহে দিনের বেলায়ও ঘুমাতে না পেরে শুধু ছটফট করছে। আর এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে।দুপুর হতে না হতেই কলম চাচা ভ্যাপসা গরম সহ্য করতে না পেরে ঘরের দক্ষিন কোণের শিমুল গাছটির নিচে জল চৌকির উপর বসলো।দুই কদম দুরেই তার অজুখানা।অজুখানার পাশেই চতুর্ভুজ আকৃতির জীর্ণ একটি শীতল পাটি। অন্য সব দিনের মতো আজও প্রিয় তাল পাখাটি তার একান্ত সঙ্গী।

শিমুল গাছটির যত্সামান্য কোমল ছায়া কলম চাচাকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিচ্ছে।এই ভর দুপুরে কলম চাচা কখনো টিনের ওই ঘরটিতে বসে থাকতে চায় না।টিনের ঘরের চালার উপর কোনো বড় বৃক্ষ না থাকায় সুর্যের পুরো তাপ সরাসরি টিনের উপর এসে পড়ে।কলম চাচার ধারণা সেই জন্যেই হয়তো ঘরের ভিতরটায় এতো ভ্যাপসা গরম।ধম বন্দ্ব হয়ে আসে তার।একটি মাত্র থাকার ঘর।অন্য কোনো উপায় না থাকায় গরম কালে ওই শিমুল গাছটাই যেন তার এক মাত্র ভরসা।শিমুল তলায় সামান্য হিমেল হাওয়া এই ভর দুপুরে কিছুটা হলেও মনে প্রশান্তি এনে দেয়।

শিমুল গাছের পাশেই মাটির গর্তে লুকিয়ে আছে অতি প্রাচীন একটা পানির কূপ।বাপ দাদার আমলের তৈরী এই জীর্ণ কুপ থেকে এখনো সুপেয় পানি পাওয়া যায়।দু’ চার গ্রামে এমন পানির কূপ আর এখন কোথাও নেই।চোখেও পরেনা।পার্শবর্তী গ্রাম থেকে হত-দরিদ্র নারী পুরুষ চৈত্র মাসে সুপেয় ঠান্ডা পানি নেয়ার জন্যে প্রতিদিন ভিড় করে কলম চাচার জীর্ণ-শীর্ণ ওই বাড়িতে।সহজ সরল কলম চাচার তাতে কোনো আপত্তি নেই।প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ হত দরিদ্র মানুষগুলোর কাছে বিনে পয়সায় বিলিয়ে দিতে পেরে কলম চাচার মনে ভীষণ শান্তি।

তবু কী এক অন্তহীন ভাবনা যেন তার শরীরটাকে ক্রমশ দুর্বল করে দিচ্ছে।দুশ্চিন্তা যেন আর কিছুতেই কাটছেনা।কেন এতো দুশ্চিন্তা কলম চাচার মনে? বাড়ির একমাত্র প্রবেশদ্বার পশ্চিম দিকের ওই সরু রাস্তাটার দিকে বার বার উদাস দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে থাকে। ভাবতে থাকে এই বুঝি এসে যাবে তার বুকের মানিক।তার আদরের ধন।

দুই।
দিন সাতেক হলো রমিজের কোনো খোঁজ নেই।রমিজকে নিয়েই তার যত্ত সব দুশ্চিন্তা।রমিজ তার একমাত্র সন্তান।বাবাকে রমিজ বলেছিল ঢাকা শহর যাবে।কেন যাবে তা স্পষ্ট করে কিছুই বলেনি।তবে, কিছু না বল্লেও তার বৃদ্ব বাবা খানিকটা হলেও আঁচ করতে পেরেছে।এভাবে না বলে বাড়ি থেকে চলে যাওয়া রমিজের জন্যে নতুন কিছু নয়।রমিজ এমনটি প্রায়ই করে থাকে।এর আগেও করেছে।এর জন্যে কম মাশুল গুনতে হয়নি কলম চাচাকে।

রমিজ খুব জেদি ছেলে।মাকে বেশি দিন কাছে পায়নি।যৎদিন পেয়েছিল আদর সোহাগ পেলেও মায়ের মুখের ভাষা অনেক চেষ্টা করেও বুজতে পারেনি।পাক হানাদারদের নির্যাতনে বাকরুদ্ব হয়ে যায় তার মা।সেই থেকেই রমিছা বেগম কোন কথাই বলছেনা।রমিজ জন্ম নেয় আরো বছর কয়েক পর।বাকরুদ্ব মা মাতৃভাষায় কথা বলতে না পারলেও মাতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত করেনি রমিজকে।কিন্তু সেই স্নেহ আর মমতাও রমিজের ভাগ্যে বেশি দিন জুটেনি। রমিজের বয়স তখন এগারো কী বারো।হঠাত একদিন তার মা পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যায়।সেই তখন থেকে বাবাই ছিল রমিজের একমাত্র আশ্রয়।

একমাত্র সন্তানকে অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া শিখিয়েছেন কলম চাচা। বাপ দাদার ছোট্ট একটি ভিটে ছাড়া এখন আর কিছুই নেই।জমি-জমা যা ছিল সব বিক্রি করে ফতুর। রমিজের লেখাপড়ার জন্যই এসব করেছেন।এই বৃদ্ব বয়সে তার একমাত্র ভরসা শিক্ষিত ছেলে।

তিন।
পাশের বাড়ির ফজলু মিয়া অনেক আগে থেকেই খেয়াল করছিল কলম চাচা শিমুল গাছটার নিচে বসে আছে।গরম পড়লে কলম চাচা এই শিমুল গাছটার নীচে এভাবে বসে থেকে সময় কাটায় এটা ফজলু মিয়া ভালো করেই জানে।
“কিন্ত আজ কলম চাচাকে এত বেশি বিষন্ন লাগছে কেন”?
-ভাবছে ফজলু মিয়া।
বুদ্ধিদীপ্ত ফজলু মিয়া দূর থেকেই আঁচ করতে পেরেছিল কলম চাচাকে আজ খুব চিন্তিত লাগছে।কলম চাচা তো অত্তো সহজে ভেঙ্গে পরার লোক নয়।
“কী হয়েছে কলম চাচার আজ? রমিজকেও দেখছি না যে! কোনো দুঃসংবাদ নয়তো”?
– ফজলু মিয়া দূর থেকেই মনে মনে এমনটিই ভাবছে।
না, ফজলু মিয়া এমনটি ভাবলেও কিছুই বিশ্বাস করতে চায় না। মা মরা ছেলেকে কলম চাচা কিভাবে মানুষ করেছে তা ফজলু মিয়া খুব ভালো করেই জানে। নিজের চোখে সব কিছুই দেখেছে দিনের পর দিন।এখন খারাপ কিছু একটা ভাবতে গেলেই তার মাথায় কেমন একটা খোঁচা লাগে। রমিজকে মানুষ করার জন্যে কত কষ্টই না সহ্য করেছে কলম চাচা।
ফজলু মিয়া দু’ চার কদম এগিয়ে মাথা উচু করে দীর্ঘস্বরে ডাকতে থাকে-
“কলম চাচা,ও কলম চাচা, রমিজ কোথায়? রমিজকে দেখছিনা যে”?
কলম চাচা একটু নড়াচড়া করে জলচৌকি রেখে শীতল পাটিতে বসলো।মনে হলো ফজলু মিয়ার চিত্কার কিছুই শুনতে পায়নি।
ফজলু মিয়া আবারো উচ্চস্বরে- “রমিজ শহরে গ্যেছে বুঝি। হ্যুনলাম শহরে গন্ডগোল, ‘রাজাকাররা’ নাকি অনেক গাড়ি পুড়াইছে”।
কলম চাচা কানে কম শুনলেও হঠাত কেন জানি আঁতকে উঠলো।মনে হলো কেমন একটা ধাক্কা খেল ফজলু মিয়ার চিত্কার শুনে।ফজলু মিয়া বড় বড় চোখে কলম চাচার দিকে তাকিয়ে রইলো।
“আচ্ছা, কলম চাচা কী ‘রাজাকার’ শব্দটা শুনতে পেয়ে এই ভাবে আঁতকে উঠলো”!
“নাকি অন্য কিছু”?
– ভাবছে ফজলু মিয়া।
ফজলু মিয়ার ভাবনা যেন আর শেষ হয়না।
কলম চাচা কী যেন ফিস ফিস করে বলে যাচ্ছে।খুব স্পষ্ট করে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।
মাথা থেকে সাদা গোল টুপিটা সরিয়ে মাথা চুলকাতে চুলকাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে নিল। কি যেন ভাবলো।মনে হয় সুর্যের দিকে তাঁকিয়ে জোহর নামাজের সময় হয়েছে কিনা তা আঁচ করে নিল।নামাজের সময়গুলো এভাবেই বের করে নেয় কলম চাচা।
‘রাজাকার’ শব্দটা কলম চাচার খুব এলার্জিক। ভূত-পেত্নীর গল্প শুনলে যেমন আঁতকে উঠে, তেমনি রাজাকার শব্দটা কানে আসলে বুড়ো কলম চাচা এখনো তেমনি আঁতকে উঠে।বিচলিত হয়।মাথা ঠান্ডা রাখতে পারেনা।কলম চাচার মানসপটে এখনো রাজাকার মানে একশ্রেনীর লুচ্চা-বদমাইস ও জল্লাদ নরপশুদের চিত্রই ভেসে উঠে।রাজাকার মানে গরু কাটার কসাই।এক দল ইতর প্রাণী।অসভ্য জানোয়ার।এমনটিই দেখে ছিল যুদ্বের সময়।

চার।
রমিছার বয়স তখন বারো কি তের।চতুরঙ্গ গ্রামের এক অসাধারণ সুন্দরী বউ ছিল রমিছা।যুদ্ব শুরু হওয়ার মাস তিনেক আগে রমিছাকে বিয়ে করে ঘরে তোলেন কলম চাচা।হাতের মেহদীর লালচে রঙ তখনো অদৃশ্য হয়নি।পাক বাহিনীর আক্রমনের খবর ছড়িয়ে পড়লো চারিদিকে।শুরু হলো ভয়ংকর যুদ্ব।সুন্দরী ছিল বলে সবার চোখ পড়তো রমিছার দিকে।একদিন হলোও তাই। আইল্লা রাজাকারের বদ নজর পড়লো রমিছার উপর। আইল্লা রাজাকারের আসল নাম আলিম উদ্দিন।সবাই তাকে আইল্লা রাজাকার বলেই ডাকে। আলিম উদ্দিন তার আত্নীয় হলেও রমিছাকে পাক বাহিনীর হাতে তুলে দিতে একটুও দ্বিধা করেনি।কলম চাচা সেই থেকেই আইল্লা রাজাকারের সাথে আর কোনো সম্পর্ক রাখেনি।ভাগ্যগুনে রমিছা কয়েক মাস পর ছাড়া পেয়ে স্বামীর ঘরে ফিরে এলেও বাকরুদ্ব হয়ে যায়।বাকরুদ্ধ রমিছা দুই দুইবার আত্নহত্যার চেষ্টা করেও মরতে পারেনি।কলম চাচা অলৌকিক ভাবেই রমিছাকে বার বার মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে।বারো বছর বাকরুদ্ধ থাকার পর হঠাত একদিন রমিছা কিভাবে কথা বলতে শুরু করলো তা কলম চাচা আজও বুঝে উঠতে পারেনি।সব কিছুই আল্লাহর অশেষ রহমত বলে মনে করেন তিনি।

সেই থেকেই ‘রাজাকার’ শব্দটা কলম চাচার কাছে ভীতিকর।ভূত-পেত্নীর গল্পের চেয়েও বেশি চমকে উঠে ওই নৃশংস শব্দটা কানে আসলে।
“আচ্ছা, ভূত-পেত্নীর চেয়ে রাজাকাররা কি অনেক বেশি ভয়ঙ্করী”?
ফজলু মিয়ার মনে এই প্রশ্নটা অনেক দিন ধরেই ঘুরছে।এর কোনো সঠিক উত্তর মিলাতে পারছেনা সে।এই নিয়ে অনেক বই পুস্তকও ঘাঁটাঘাঁটি করেছে।কোনো লাভ হয়নি।রাজাকারের সাথে ভূত পেত্নীর তুলনা কোথাও খুঁজে পায়নি।ফজলু মিয়ার ধারণা কেউ হয়তো এটা নিয়ে এইভাবে ভাবেনি।
“আর ভাববেই বা কেন? শুনিছে ভূত-পেত্নী নাকি অশরীরী আত্মা। কিন্তু রাজাকার তো আর অশরীরী আত্মা নয়।এরা তো জীবন্ত মানুষ”।
এইসব ভেবে ফজলু মিয়ার আবার খটকা লাগে।কিছুদিন আগে পত্রিকায় পড়েছিল রাজাকাররা নাকি পাকিস্থানের প্রেতাত্তা।
“এটা আবার কি জিনিস? প্রেতাত্তা মানে কী”?
শুরু হলো নিজে নিজে পন্ডিতি।প্রেতাত্তা মানে কী বদ মানুষের মৃত আত্মা?
ফজলু মিয়া সঠিক জবাব না পেলেও রাজাকারদের চাইতে ভূত-পেত্নীরা যে অনকে বেশি নিরাপদ তার একটা যুক্তি আবিষ্কার করলো।ফজলু মিয়ার যুক্তিটা ফেলে দেয়ার মতো নয়।বেশ মজাদার ও কৌতহলী।
ফজলু মিয়া দীর্ঘদিন ধরেই শুনে আসছে একটি শ্লোগান ‘রাজাকার মুক্ত বাংলাদেশ চাই’।
কিন্তু ভূত-পেত্নিরাও যে ভীষণ ভয়ঙ্করী এটা তো সবাই জানে।ভূত-পেত্নীরা এতো ভীতিকর হওয়া সত্বেও “ভূত-পেত্নী মুক্ত দেশ চাই”- এই শ্লোগানটি কেউ দেয়নি কেন? এটা নিয়েই ফজলু মিয়ার যত্ত সব খটকা।ফজলু মিয়া এবার নিজে নিজেই একটা সমাধান বের করলো।তার ধারণা ভূত-পেত্নীরা মানুষের জন্যে অনেক বেশি নিরাপদ।ওই সব লুচ্চা-বদমাইস-জল্লাদ নরপশুদের চেয়ে। তাই এটা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না।আর সেই জন্যই হয়তো এই দেশ থেকে রাজাকার তাড়াবার প্রয়োজন হলেও ভূত পেত্নী তাড়াবার প্রয়োজন পড়েনি।

পাঁচ।
ফজলু মিয়ার এখনো মনে পড়ে সেই যুদ্বের কথা।৭১’ সালের মুক্তিযুদ্বের কথা। তখন সে ছিল খুব ছোট্ট।মুক্তিবাহিনীরা ফজলু মিয়ার বাড়িতে ক্যাম্প বসিয়েছিল।গভীর রাত হলেই তারা গুপ্ত হামলার জন্যে বাড়ি থেকে বের হত।বের হওয়ার পূর্বে কখন কোথায় কী ভাবে অপারেশন চালাবে তা ঠিক করে নিতো।পাকহানাদার ক্যাম্পে মুক্তিবাহিনীরা কীভাবে গুপ্ত হামলা করত তার অনেক গল্প শুনেছে মুক্তিযুদ্বাদের কাছ থেকে।কিন্তু একদিনের বিভিষিকাময় স্বজনহারা স্মৃতি ফজলু মিয়া আজও ভুলতে পারেনি।

সেদিন রাতেই পাকবাহিনী চুতরঙ্গ কলেজে ঘাঁটি করে।পাক হানাদারদের আগমনের কথা শুনে ফজলু মিয়া ভয়ে কাঁদছিলো। বিকাল বেলা ঘরের উঠানে বসে মা-বাবার সঙ্গে গল্প করছে। হঠাৎ হৈ হৈ শব্দে মানুষের চিৎকার শুনে বাইরে কি ঘটছে তা জানার চেষ্টা করে।এমন সময় একদল পাকহানাদার এসে তার বাবাসহ আরো কয়েক জনকে ধরে নিয়ে যায়।
তারপর? তারপর শুরু হয় জল্লাদী কান্ড। আইল্লা রাজাকারের নির্দেশে ঘাতকরা ব্রাশ ফায়ার শুরু করে।মহুর্তেই সবাই মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।কী ভয়ংকর কান্ড! ফজলু মিয়া নিমিষেই জ্ঞান হারালো। অনেকক্ষণ পর জ্ঞান ফিরলে সে আবিষ্কার করলো লাশের স্তুপের নিচে তার বাবার নিথর দেহ।অন্যদের তাজা রক্তে তার বাবার সারা শরীর লাল রঙ্গে রঞ্জিত হয়ে আছে।ফজলু মিয়া আজও সেই নৃশংস স্মৃতি ভুলতে পারেনি।
যেমনটি পারেনি রমিছা চাচীর স্মৃতি। রাজাকাররা কিভাবে রমিছা চাচীকে পাক বাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছিল সেই নিষ্ঠুর স্মৃতি। সব কিছুই যেন তার চোখের সামনে ভাসছে।
“আহা রে, কলম চাচা কত কান্নাকাটি করলো কিন্ত আইল্লা রাজাকার কোনো কথাই হ্যুনলনা”।
পুরনো স্মৃতি মনে পরায় ফজলু মিয়ার কান্না পায়।
ফজলু মিয়া আবারো ফিস ফিস করে বলতে থাকে “আইল্লা রাজাকার ছিল একটা খবিসের বাচ্ছা।একজন মুসলমান হইয়্যা আর একটা মুসলমান মাইয়্যারে কেমতে ইজ্জত নষ্ট করাইল। এইড্যা কী কোনো মুসলমানের কাজ অইলো ! এরা কি মানুষ! সব রাজাকার ছিল অ-মানুষের বাচ্চা।মাথায় টুপি পৈরা মুসলমান সাইজ্যা কি নষ্টামি গুলো করলো”।

ফজলু মিয়া কলম চাচার কোনো আত্মীয় নয়।তবে আত্মীয়ের চেয়েও অনেক বেশি। কলম চাচার যে কোনো বিপদে আপদে ঝাঁপিয়ে পড়ে।ফজলু মিয়া এই স্বভাব পেয়েছে তার বাপের কাছ থেকে।তার বাবা ওবায়দুল হক মিয়া ছিলেন একজন খাঁটি জনদরদী মানুষ।গ্রামের যে কোনো দুর্যোগ, আপদ-বিপদ এমন কি কোনো মানুষ মারা গেলে তার কবর খোড়া থেকে শুরু করে হেন কাজ নেই যে ওবায়দুল হক মিয়া দায়িত্ব নিয়ে করে থাকেন নাই।গ্রামের সকল মানুষ এখনো তার জন্যে কত অফসোস করে। ভালো মানুষ দুনিয়া থেকে বিদায় নিলে এমনটাই হয় বুঝি! পরকালের হিসাব নিকাশের অঙ্কটা ইহকালেই কষে ফেলা যায় হয়তো অনেকটা।কিন্তু আইল্লা রাজাকার তারে বাঁচতে দিলনা।

ছয়।
কলম চাচা শিমুল গাছের নিচেই জোহর নামাজ সেরে নিল।ফজলু মিয়া প্রতিদিনের মত আজো সংবাদপত্র পড়ার নেশায় বাজারে হাশিম বেপারীর চা স্টলে উঁকি মারে।হাশিম বেপারী খুব ধূর্ত লোক।বেশি করে খরিদ্দার পাওয়ার জন্যে দোকানের সামনে একটি টেবিলের উপর দুইটি দৈনিক পত্রিকা রাখে।এতে স্থানীয় লোকজনের বেশ আড্ডা জমে উঠে এবং হাশিম বেপারীর ব্যবসাও ভালো চলে।ধূর্ত হাশিম বেপারী এক ঢিলে দুই পাখি মারে।
গরম পানি দিয়ে চায়ের কাপ পরিস্কার করতে করতে ফজলুর দিকে চোখ পরতেই হাশিম বেপারী বলে উঠলো: “কি মিয়া ফজলু, চা দিব? সাথে কী বিস্কুট চলবে”?
ফজলু এক আঙ্গুল উঠিয়ে ইশারা দিলে হাশিম বেপারী বুঝে যায় শুধু চা হবে।চা মুখে দিতে দিতে সংবাদের হেডলাইন গুলো দেখে নিল ফজলু।শহরের খবরা খবর জানার জন্যই ফজলু মিয়া নিয়মিত সংবাদপত্র পড়ে থাকে।
রমিজ এখনো বাড়ি ফিরেনি।কলম চাচার দীর্ঘ অপেক্ষা যেন শেষ হয়না।নির্ঘুম রজনী কাটছে তার।সন্তানকে ফিরে পাবার আকুতি জানানোর তার কেউ নেই।একমাত্র সন্তানকে দেখার মুহুর্তের অপেক্ষার প্রহর কাটছে।পুত্রকে জড়িয়ে ধরার সেই চরম মুহুর্তের অপেক্ষায় আছেন তিনি।সেই মুহূর্তটি আর কোনদিন ফিরে আসবে কিনা সেটাও তার জানা নেই।স্ত্রী হারানোর শোক আজো ভুলতে পারেনি।পুত্রের বিরহে চলছে অশ্রু বিসর্জন।
নিখোঁজ সন্তানের প্রতীক্ষায় এখনো নির্ঘুম প্রহর কাটছে বৃদ্ব  কলম চাচার।

৫৯৬ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
লেখালেখি করি।সংবাদিকতা ছেড়েছি আড়াই যুগ আগে।তারপর সরকারী চাকর! চলে যায় এক যুগ।টের পাইনি কী ভাবে কেটেছে।ভালই কাটছিল।দেশ বিদেশও অনেক ঘুরাফেরা হলো। জুটল একটি বৃত্তি। উচ্চ শিক্ষার আশায় দেশের বাইরে।শেষে আর বাড়ি ফিরা হয়নি। সেই থেকেই লন্ডন শহরে।সরকারের চাকর হওয়াতে লেখালেখির ছেদ ঘটে অনেক আগেই।বাইরে চলে আসায় ছন্দ পতন আরো বৃদ্বি পায়।ঝুমুরের নৃত্য তালে ডঙ্কা বাজলেও ময়ূর পেখম ধরেনি।বরফের দেশে সবই জমাট বেঁধে মস্ত আস্তরণ পরে।বছর খানেক হলো আস্তরণের ফাঁকে ফাঁকে কচি কাঁচা ঘাসেরা লুকোচুরি খেলছে।মাঝে মধ্যে ফিরে যেতে চাই পিছনের সময় গুলোতে।আর হয়ে উঠে না। লেখালেখির মধ্যে রাজনৈতিক লেখাই বেশি।ছড়া, কবিতা এক সময় হতো।সম্প্রতি প্রিয় ডট কম/বেঙ্গলিনিউস২৪ ডট কম/ আমাদেরসময় ডট কম সহ আরো কয়েকটি অনলাইন নিউস পোর্টালে লেখালেখি হয়।অনেক ভ্রমন করেছি।ভালো লাগে সৎ মানুষের সংস্পর্শ।কবিতা পড়তে। খারাপ লাগে কারো কুটচাল। যেমনটা থাকে ষ্টার জলসার বাংলা সিরিয়ালে। লেখাপড়া সংবাদিকতায়।সাথে আছে মুদ্রণ ও প্রকাশনায় পোস্ট গ্রাজুয়েশন।
সর্বমোট পোস্ট: ২০৩ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ৫১৯ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৬-১৭ ০৯:২৪:৩১ মিনিটে
banner

৯ টি মন্তব্য

  1. আরজু মন্তব্যে বলেছেন:

    চমত্কার মুক্তিযুদ্দের গল্প. অনেককিছু লিখার ইচ্ছে ছিল আপনার লিখায়।এই কম্পিউটার এ অভ্র নাই .আমার বারবার গুগল এ গিয়ে ট্রান্সলেট করতে হচ্ছে সুতরাং বেশি কমেন্টস করতে পারলামনা .
    এককথায় আপনার গল্প অসাধারণ হয়েছে .
    অনেক শুভকামনা আপনার জন্য

  2. জিয়াউল হক মন্তব্যে বলেছেন:

    দারুন গল্প। ভাল বেশ স্বাচ্ছন্দময়।
    উপরে আরজু আপা কমেন্ট করতে গিয়ে লিখেছেন তার কম্পিউটারে নাকি অভ্র নেই। আরজু আপাকে বলছি, গুগলে গিয়ে অভ্র লিখে সার্চ দিন পেয়ে যাবেন ডাউনলোডের অনেক লিংক। সেখান থেকে একটি ডাউনলোড করে নিয়ে সেটআপ দিন।

    • আরজু মন্তব্যে বলেছেন:

      ধন্যবাদ জিয়াউল হক ভাই .আমার বাসার কম্পিউটার এ আছে অভ্র .এখানে বাহিরে একজনের কম্পিউটার থেকে কমেন্টস করছি তো .তার এটাতে এই মুহুর্তে নাই. সময় নাই ডাউনলোড করার .

      ধন্যবাদ ভাই আপনি অনেক চমত্কার মানুষ .লিখাতে এবং মনে হচ্ছে মানুষ হিসাবে অনেক ভালো.
      অনেক শুভকামনা আপনার জন্য
      ভালো থাকবেন কেমন .

  3. শওকত আলী বেনু মন্তব্যে বলেছেন:

    ধন্যবাদ।

  4. শাহ্‌ আলম শেখ শান্ত মন্তব্যে বলেছেন:

    মুক্তি যুদ্ধ সম্পর্কিত গল্প ।

  5. আমির হোসেন মন্তব্যে বলেছেন:

    ভাল লাগল আপনার গল্পটি।

  6. এস এম আব্দুর রহমান মন্তব্যে বলেছেন:

    ভাল লাগল গল্পটি । শুভ কামনা । ভাল থাকুন ।

  7. সবুজ আহমেদ কক্স মন্তব্যে বলেছেন:

    মুগ্ধকর গল্প
    মুগ্ধই হলাম পড়ে

    শুভ কামনা

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top