Today 10 Dec 2019
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

প্রাণের প্রিয়তমা(পর্ব-৫)

লিখেছেন: আমির ইশতিয়াক | তারিখ: ১৬/০৬/২০১৩

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 833বার পড়া হয়েছে।

(পূর্বে প্রকাশের পর)
হেমন্তের শিশির ঝরা দিনগুলোর ভেতর দিয়ে ঘন কুঁয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে আবির্ভাব হয়েছে শীতকাল। অন্যন্য বছরের তুলনায় এবারের শীতটা যেন একটু বেশি। হাঁড়কাপানো শীত। প্রকৃতি এখন তার সমস্ত আবরণ খুলে জীবনের চাঞ্চল্যকে অম্লান করে দিয়েছে। গাছপালা গুলো থেকে বৃষ্টির ফোঁটার মতো এখনও যেন টুপটাপ করে একের পর এক পাতা ঝরছে। যেন গাছগুলো অলংকার শূন্য বিধবা হয়ে যাচ্ছে।
সকাল বেলা কুয়াশাকে ভেদ করে সূর্য মামা বাঁশ ঝাড়ের ফাঁক দিয়ে উকি মারছে। মনে হয় যেন সূর্য দেখা করতে আজ খুব লজ্জা পাচ্ছে। সূর্যের আলো দুর্বা ঘাসে পড়তেই মুক্তার মত ঝলমল হয়ে উঠেছে। এমনই শীতের সকাল খুবই উপভোগ্য। কিন্তু যারা গরিব, মিসকিন, যাদের ঘরের দু’বেলা দু’মোঠো ভাত জুটেনা তাদের জন্য কি এমন শীত উপভোগ্য? নিশ্চয় নয়। কারণ তাদের তো শীতের কাপড় কেনার মত তৌফিক নেই।
রহিছ মিয়ার আজ সেই অবস্থা। আজকের শীতটা যেন রহিছের জন্য মরণ ডেকে আনছে। কারণ সে তো আর কোটিপতি নয় যে কম্বল গা দিয়ে থাকবে। তার তো ‘নুন আনতে পান্তা ফুরোয়।’
আজ রহিছ মিয়ার ঘরে কোন খাবার নেই। গত সপ্তাহে অসুস্থতার কারণে কোন কাজ করতে পারেনি। তাই হাতে টাকা পয়সাও নেই যে বাজার করে খাবে। সকালে আছিয়া বেগম প্রতিবেশির ঘর থেকে কিছু আটা এনে রুটি বানাল। আছিয়া বেগম যখন রুটি বানাচ্ছিলেন তখন বাবুল পিঁড়ি নিয়ে চুলোর পাশে এসে বসল। রহিছ মিয়া চুলোর পাশে বসে আছে। বাবুল অশ্রু সজল চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, মাগো, ভাইয়া কি আর আসবে না।
আছিয়া বেগম ছেলের মাথায় স্নেহের হাত বুলিয় বলল, আসবে বাবা।
কবে আইব মা?
এই কিছু দিন পরে আসবে।
অবুঝ বাবুল আবার বলে, মা ভাইয়া আমার জন্যে কি নিয়ে আসবে?
এভাবে একের এক আছিয়া বেগমকে প্রশ্ন করেই যাচ্ছে, কিন্তু আছিয়া বেগম ছেলের সব উত্তর দিতে পারেনা। শুধু মিথ্যে সান্ত্বনা দেয় ছেলেকে।
আছিয়া বেগম রুটি বানিয়ে ছেলে ও স্বামীকে দিলেন। রুটি ঠিকই দিলেন কিন্তু তরকারির ব্যবস্থা করতে পারেননি। তরকারি ছাড়া রুটি খেতে বাবুলের কাছে ভাল লাগছে না। এমনিতে আবার লাল আটা।
একটা রুটির টুকরা মুখে দিয়ে বাবুল রহিছ মিয়াকে বলল, বাবা আমরা গরিব কেন? করিমের বাবা কি বড় লোক! জান বাবা করিমের বাবা প্রত্যেক দিন মাছ আনে গোস খায়, দুধ খায়। আপনি এগুলো আনতে পারেন না?
রহিছ মিয়া যেন এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পায় না। তার চোখ দু’টো জলে টল মল করছে। আছিয়া বেগমের চোখেও পানি জমে গেল। রহিছ মিয়া মনে মনে বলেন, হে খোদা তুমি কেন আমাকে এভাবে গরিব করে দুনিয়ায় পাঠাইছ? ভাতিজাকে লেখাপড়া শিখিয়েছিলাম। ভাবছিলাম ওকে দিয়ে বুঝি আমার সংসারের স্বচ্ছলা ফিরে আসবে। কিন্তু ও আমাকে বুঝলনা। একি আমার অপরাধ ছিল? আজ কেন স্ত্রী, ছেলেকে দু’মোঠো শাক ভাত খাওয়াতে পারিনা? কেন আজ ছেলের প্রশ্নের জবাব দিতে পারি না।
বাবুল দু’জনের দিকে ভাল করে তাকিয়ে বলল, একি! আম্মা, আব্বা আপনারা কাঁদছেন কেন?
রহিছ মিয়া ছেলের কথায় চেতনা ফিরে পেলেন। হাত দিয়ে চোখের পানি মুছে ছেলের পিঠে হাত রেখে বললেন, দেখ বাবা আমরা একদিন অনেক বড় লোক হব।
করিমের বাবার চেয়েও কি বড় লোক হবে।
হ্যাঁ।
নাও এখন খেয়ে নাও।
পরদিন সকাল বেলা। দিনটি ছিল শনিবার। অত্র এলাকায় সপ্তাহিক বাজার বসে শনিবার। যারা মানুষের বাড়িতে কামলা হিসেবে কাজ করে তাদের শনিবারে বাজারে যাবার পূর্বেই টাকা পাওয়া যায়। রহিছ মিয়া একজনের কাছে দু’শত টাকা পেত। সকালে ঘুম থেকে উঠে টাকার জন্যে গেলেন। কিন্তু টাকা না পেয়ে নিরাশ হয়ে এলেন। সে ব্যক্তির টাকা দেয়ার ইচ্ছে ছিল কিন্তু তার ঘরে গতকাল চুরি হওয়ায় সে টাকা দিতে পারেনি। এদিকে রহিছ মিয়ার ঘরেও কোন চাউল নেই। কি করবে চিন্তা করে কিছুই ভেবে পাচ্ছে না রহিছ মিয়া।
বাবুলকে একটা ভাগি ছাগল এনে দিয়েছিল রহিছ মিয়া। অনেক দিন আগেই সে ছাগলটি একটি বাচ্চা দিয়েছিল। সে বাচ্চাটি এখন অনেক বড় হয়েছে। বাচ্চাটি সোমবারে জন্ম হয়েছে বিধায় বাবুল শখ করে বাচ্চাটির নাম রেখেছিল সেমুলী। সেমুলী দেখতে কুচকুচে কালো। কান দু’টি খাঁড়া। বাবুলের আদর যত্ন পেয়ে সেমুলী অতি অল্প সময়ে অনেক বড় হয়ে গেছে। সারাদিন আলগা থাকে। বাবুল যেখানে যায় সেমুলীও সেখানে যায়। এখনো রান্না ঘরে গিয়ে আছিয়া বেগমকে খুব জালাতন করে। মাঝে মাঝে আছিয়া বেগম বিরক্তি হয়ে সেমুলী কে কান মলি দিয়ে দেয়। কান মলি খেয়ে সে যেন আরও খুশি হয়। এমনকি সে রাত হলে বাবুলের সাথে ঘুমায়। আর্শ্চাযের বিষয় হচ্ছে; কখনো সেমুলী বিছনায় প্রস্রাব করেনি। বাবুল এই দুষ্ট সেমুলীর ভক্ত হয়ে গেল। তাকে ছাড়া আর কিছুই ভাল লাগেনা।
রহিছ মিয়া দিশা হারিয়ে আছিয়া বেগমকে নিয়ে ঘরে বসলেন। রহিছ মিয়া বলল, আছিয়া।
কি বলেন?
ভাবছিলাম সেমুলীকে বিক্রি করে দেব। তুমি কি কও?
সেমুলীর কথা শুনে আছিয়া বেগমের মনটা ছ্যাৎ করে উঠল। একি কন আফনে। সেমুলী কে বিক্রি করে দিবেন? বাবুল তো ওকে খুব ভালবাসে। ওতো বেঁচতে দিবে না।
এছাড়া আর কি উপায় আছে বল? না খেয়ে তো আর মরতে পারিনা? তুমি বাবুল কে বুঝিয়ে বল। আছিয়া বেগম কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল, আপনার যা কিছু খুশি করেন। আমি কিছু জানিনা।
বাবুল এ খবর শুনে মাকে বলল, মা আব্বাকে বল, সেমুলীকে না বেঁচতে।
আছিয়ার মুখে কষ্টের ছাপ। বিক্রি না করলে খাবি কি?
না খেয়ে থাকব, তবু ওকে বেঁচতে দিব না।
তোর বাবাতো আমার কথা শুনে না।
বাবুল কখনো সেমুলীর কাছে যায় আবার কখনো আছিয়া বেগমের কাছে যায়। সেমুলীকে সে আর দেখতে পাবে না। তাকে বিক্রি করে দিবে একথা ভাবতেই তার মাথা ঘুরে যায়। বোবা সেমুলী ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে বাবুলের দিকে। কখনো বা জিহবা দিয়ে লেহন দিচ্ছে বাবুলকে। মনে হয় যেন তাকে বুঝাচ্ছে আর বলছে, বাবুল তোমরা কোথায় আজ নিয়ে যাবে আমাকে? তোমাদের কি একটুও দয়া মায়া নেই আমার জন্যে? কিন্তু কে বুঝে এই বোবা প্রাণীর ভাষা।
সেমুলীকে নিয়ে রহিছ মিয়া বাজারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো। বাবুল ছেঁড়া একটা হাফপ্যান্ট ও কালা একটা গেঞ্জি গায় দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে সেমুলীর পেছনে রওয়ানা হল। আছিয়া কেগম বিষন্ন মনে উঠানে দাঁড়িয়ে এ দৃশ্য দেখছে কিন্তু কিছু বলতে পারছেনা। রহিছ মিয়া বাবুলকে বার বার বাজারে আসতে নিষেধ করার পরও সে বাজারে যাচ্ছে। সেমুলী কিছু দূর গিয়ে আর যাচ্ছে না। বার বার বাড়ির দিকে ফিরে আসতে চাচ্ছে। এক পর্যায়ে রহিছ মিয়া তাকে লাঠি দিয়ে আঘাত করতে করতে বাজারে নিয়ে আসল।
বাজারে শত শত ছাগল। বিক্রেতারা ছাগল নিয়ে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। রহিছ মিয়াও একটি গাছের ছায়ায় গিয়ে সেমুলীকে নিয়ে দাঁড়ালেন। অনেক্ষণ বসে থাকার পর এক ক্রেতা আসল। দাম ঠিক হলো পাঁচ শত টাকা। রহিছ মিয়া সেমুলীর পিঠে হাত বুলিয়ে ক্রেতার হাতে রশিটি দিল। পরে টাকা পকেটে ভরলো। ক্রেতা যখন সেমুলীকে নিয়ে চলে যাবার জন্য পা বাড়াল তখনই বাবুল অ্যা… অ্যা… করে কাঁদতে লাগল। তার কান্না শুনে ক্রেতা রহিছ মিয়াকে জিজ্ঞেস করলেন, ও কে?
রহিছ মিয়া বললেন, আমার ছেলে।
কাঁদছে কেন?
ও ছাগলটাকে খুব ভালোবাসে। ও চায় না যে, আমি এটাকে বিক্রি করে দেই। কিন্তু ভাই অভাবের তাড়নায় একে বেঁচতে বাধ্য হলাম। জানেন ও আদর করে ছাগলটির নাম পর্যন্ত রেখেছে সেমুলী।
লোকটি হাসল। তাই নাকি?
আল্লাহ হয়তো বাবুলের কান্নাকে কবুল করেছেন। তাইতো ক্রেতা আবার ফিরে তাকালেন। লোকটি হাসলেও তাদের দুঃখটা বুঝলেন। লোকটি বলল, শুনেন ভাই আমি ছাগলটি কিনেছি ভাগি দেয়ার জন্যে। এখন যেহেতু আপনার ছেলে তার মায়ায় কাঁদছে আমার মনে হয় আপনি একে ভাগি নিয়ে গেলে ভাল হবে। ওর কাছে থাকলেই মনে হয় ছাগলটি ভাল থাকবে। অন্যের বাড়িতে গেলে হয়তো স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে যেতে পারে।
ক্রেতা লোকের মুখে একথা শুনে রহিছ মিয়াও খুশি। আর বাবুলের খুশিরতো সীমা নেই। লোকটি ছাগলের রশিটি বাবুলের হাতে দিয়ে বলল, নাও তোমার সেমুলীকে। এবার খুশিতো?
তার কথা শুনে বাবুল হেসে ফেলল। আর দু’হাত দিয়ে চোখের পানি মুছে ফেলল। তারপর রহিছ মিয়া ও ক্রেতা লোকটি দু’জন দু’জনার ঠিকানা নিল। পরে তারা তিনজন মিষ্টির দোকানে গিয়ে মিষ্টি খেল। ক্রেতা লোকটির নাম ছিল গাফফার। তিনি বললেন তাহলে রহিছ ভাই আজকের মতো আসি। কোন একদিন হয়তো আপনাদের বাড়িতে চলে আসব।
অবশ্যই আসবেন।
গাফফার সাহেব চলে গেলেন। বাবুল খুশি মন নিয়ে বাড়ির দিকে রওয়ানা হলো। এখন যেন সেমুলীও খুশিতে দৌঁড়াচ্ছে।
চলবে…

প্রাণের প্রিয়তমা(পর্ব-১)পড়ুন।
প্রাণের প্রিয়তমা(পর্ব-২)পড়ুন।
প্রাণের প্রিয়তমা(পর্ব-৩)পড়ুন।
প্রাণের প্রিয়তমা(পর্ব-৪)পড়ুন।

৯৬৮ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
আমির ইশতিয়াক ১৯৮০ সালের ৩১ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর থানার ধরাভাঙ্গা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা শরীফ হোসেন এবং মা আনোয়ারা বেগম এর বড় সন্তান তিনি। স্ত্রী ইয়াছমিন আমির। এক সন্তান আফরিন সুলতানা আনিকা। তিনি প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন মায়ের কাছ থেকে। মা-ই তার প্রথম পাঠশালা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু করেন মাদ্রাসা থেকে আর শেষ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নরসিংদী সরকারি কলেজ থেকে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখি শুরু করেন। তিনি লেখালেখির প্রেরণা পেয়েছেন বই পড়ে। তিনি গল্প লিখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করলেও সাহিত্যের সবগুলো শাখায় তাঁর বিচরণ লক্ষ্য করা যায়। তাঁর বেশ কয়েকটি প্রকাশিত গ্রন্থ রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হলো- এ জীবন শুধু তোমার জন্য ও প্রাণের প্রিয়তমা। তাছাড়া বেশ কিছু সম্মিলিত সংকলনেও তাঁর গল্প ছাপা হয়েছে। তিনি নিয়মিতভাবে বিভিন্ন প্রিন্ট ও অনলাইন পত্রিকায় গল্প, কবিতা, ছড়া ও কলাম লিখে যাচ্ছেন। এছাড়া বিভিন্ন ব্লগে নিজের লেখা শেয়ার করছেন। তিনি লেখালেখি করে বেশ কয়েটি পুরস্কারও পেয়েছেন। তিনি প্রথমে আমির হোসেন নামে লিখতেন। বর্তমানে আমির ইশতিয়াক নামে লিখছেন। বর্তমানে তিনি নরসিংদীতে ব্যবসা করছেন। তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা একজন সফল লেখক হওয়া।
সর্বমোট পোস্ট: ২৪১ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ৪৭০৯ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৬-০৫ ০৭:৪৪:৩৯ মিনিটে
Visit আমির ইশতিয়াক Website.
banner

৯ টি মন্তব্য

  1. আমির হোসেন মন্তব্যে বলেছেন:

    যারা পূর্বের পর্ব গুলো পরেননি তাদেরকে অনুরোধ করব সবগুলো পর্ব পড়ে মন্তব্য করার জন্য।

  2. আজিম হোসেন আকাশ মন্তব্যে বলেছেন:

    চলুক অবিরত…

  3. কাউছার আলম মন্তব্যে বলেছেন:

    ৫ম পর্বটি পড়লাম ভাল লাগল।

  4. আরিফুর রহমান মন্তব্যে বলেছেন:

    এই পর্বটি মোটামুটি লাগল।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top