Today 26 May 2020
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

প্রিয়ন্তী-১৪ (সংস্কারের প্রাচীর ভাঙ্গা তরুণী)

লিখেছেন: জিল্লুর রহমান | তারিখ: ০১/১১/২০১৩

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 703বার পড়া হয়েছে।

Priontiমন্দিরের সামনে বিরাট খোলা মাঠে একটা চৌচালা টিন সেড। সেখানে প্রতি বৎসর একবার করে কীর্তন হয়। তখন প্রচুর লোক সমাগম হয়। অনেক দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা আসে, কীর্তন চলে একটানা অনেকদিন। মন্দির সংলগ্ন একটা আশ্রম আছে, আশ্রমে প্রতিদিন আগতদের জন্য খাবার-দাবার রান্না হয়, কত মানুষ এখানে খেয়ে পরে বাঁচে তার হিসেব নেই। প্রতিদিন অনেকে আসে ঠাকুরের পায়ে পুষ্পমাল্য দিতে। বৃদ্ধ পুরোহিত সারাদিন খালি গায়ে পৈতা ঝুলিয়ে সেবায় মশগুল থাকে আর মাঝে মাঝে প্রসাদ বিতরণ করে।
মন্দিরের গেটে দু’টা রিক্সা এসে দাঁড়ালো। একটা রিক্সায় সুশান্ত আর প্রিয়ন্তী আর আরেকটা রিক্সায় দিলীপ এবং তিথি। কয়েকমাস আগে ওদের বিয়ে হয়েছে পারিবারিকভাবে ধুমধাম করে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। রিক্সা থেকে নেমেই দিলীপ পুরোহিতের কাছে গেল।
পুরোহিত জিজ্ঞেস করলেন, এ্যাফিডেভিট নিয়ে এসেছ?
হ্যাঁ।
দেখি।
পুরোহিত এ্যাফিডেভিটটা দেখে কিছুটা অবাক বিস্ময়ে বলল, বরের নাম সুশান্ত দত্ত আর কনের নাম প্রিয়ন্তী চক্রবর্তী!
দিলীপ কিছু বলল না।
শংকর জম্ম হবে বাপু, তোমরা তো আজকাল জাত-পাত কিছুই মানতে চাও না। এসব কাজ ভালো না, ভবিষ্যতে খারাপ হয়।
দিলীপ বলল, ঠাকুর মশাই, ওরা এ্যাফিডেভিট করে ফেলেছে এখন শুধু আনুষ্ঠানিকতাটা বাকী আছে।
আচ্ছা ঠিক আছে, শাঁখা সিঁদুর এনেছ?
দিলীপ একবার এদিক-সেদিক তাকাতেই তিথি সাড়া দিল, কী হলো?
দিলীপ কাছে গেল, শাঁখা সিঁদুর এনেছ?
তিথি প্রিয়ন্তীর মেসে থাকে, এমনিতেই প্রিয়ন্তীর সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো কিন্তু এ্যাফিডেভিট করার সময় সে ছিল না। গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিল। পরদিন সকালবেলা প্রিয়ন্তী তার কাছে শুধু গভীর রাতে হাজত বাসের কথাটুকু গোপন করে সব কথা বলেছে এবং আজ যে মন্দিরে গিয়ে বিয়ের অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করবে সেকথাও বলেছে। শুনে তিথি নিজেই এক রকম আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে এসেছে এবং দিলীপকেও তার মেসে আসতে বলেছে।
বিকেলবেলা সবাই যখন রিক্সায় উঠেছে তখন সুশান্ত কিংবা প্রিয়ন্তী কেউ-ই খেয়াল করেনি বিয়ে সম্পন্ন করতে কী কী লাগবে?
তিথি কাউকে না জানিয়ে সবকিছু কিনে রেখেছে, সে সুশান্ত আর প্রিয়ন্তীর দিকে তাকিয়ে মুখ আংশিক বিকৃত করে একটা মুচকি হাসি হেসে বলল, সে কি আর আমি বাদ রেখেছি, যার বিয়ে তার তো এসবের কোন খেয়াল নেই। সে তো কনে সেজে বাসর ঘরে ঢোকার জন্য তৈরি হয়ে আছে।
প্রিয়ন্তী আজ লাল শাড়ি পরেছে, মা ছোটবেলা তাকে যে গয়নাগুলো দিয়েছিল সবগুলো পরেছে, কানে এক জোড়া ঝুমকা ঝুলছে, গলায় একটা হার। কপালে একটা বড় টিপ পরেছে। তিথি তাকে বউ সাজিয়ে মাথায় ঘোমটা দিতে একবার শিখিয়ে দিয়েছে। প্রিয়ন্তীকে আজ খুব সুন্দর মানিয়েছে, সে মাথা নত করে সুশান্তর পাশে দাঁড়িয়েছিল। তিথির কথাগুলো তার কানে গেল, অন্য সময় হলে সে অবশ্যই উত্তর দিত কিন্তু আজ কিছু বলল না। লজ্জায় তার মুখ লাল হয়ে গেল।
তিথি তার ছোট ব্যাগ থেকে শাঁখা সিঁদুরসহ প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র বের করে দিল।
পুরোহিত মন্ত্র পড়ে প্রিয়ন্তীকে শাঁখা সিঁদুর পরিয়ে দিয়ে বিয়ের কাজ সমাপ্ত করল।

বিয়ের পর তিথি খুব করে ধরল তাদের বাড়িতে যাওয়ার জন্য। তিথির বাড়ি চাপাইনবাবগঞ্জ জেলার রহনপুর উপজেলায়। সুশান্ত আর প্রিয়ন্তী দুজনে পরামর্শ করে তাদের সঙ্গে গেল। সেখানে তিনদিন কেটে গেল। তারপর একদিন রাতে প্রিয়ন্তী তার বাবার মোবাইলে রিং করল।
কিন্তু মোবাইল বন্ধ।
সে আর কাউকে মোবাইল করল না। তার মনের মধ্যে একটা প্রশ্ন দেখা দিল, বাবা তো কখনো মোবাইল বন্ধ রাখে না। কয়েকদিন পর আবার মোবাইল করল কিন্তু মোবাইল তখনো বন্ধ। তারপর সে তার অরুণের মোবাইলে রিং করল কিন্তু অরুণ মোবাইল রিসিভ করল না।
বিষয়টি প্রিয়ন্তীর মনে আরো বেশি চিন্তার কারণ হলো, কেউ কি আমাদের বিয়ের কথা বাড়িতে বলে দিয়েছে? না এই মেসে তাদের এলাকার কোন মেয়ে থাকে না, সুশান্তর মেসেও তেমন কেউ থাকে না। সুশান্তর সঙ্গে আমার বিয়ের কথা জানলে কি সবাই চুপ করে থাকতো? এতদিনে লঙ্কা কাণ্ড করে ফেলতো।
প্রিয়ন্তীর কাছে তার দিদি এবং জামাই বাবুর মোবাইল নাম্বারআছে কিন্তু সেদিন তার মেসে জামাই বাবু এসে সুশান্তকে দেখার পর আর তাদের মোবাইলে রিং দিতে গিয়ে প্রিয়ন্তীর বুক কেঁপে উঠল। জামাই বাবু কিংবা দিদিকে মোবাইল করলে তার কি বলে ঠিক নেই আর তার বিয়েতে সবচেয়ে বেশি স্বার্থজড়িত আছে জামাই বাবুর।
সেদিন বিকেলে প্রিয়ন্তী আর সুশান্ত মার্কেটে বেরিয়েছিল ছোট-খাটো কিছু কেনাকাটা করতে কিন্তু প্রিয়ন্তী বার বার করে আনমনা হয়ে যাচ্ছিল।
সুশান্ত ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছে, সে মার্কেট থেকে বের হওয়ার জন্য বাইরের দিকে এগিয়ে গেল।
প্রিয়ন্তী জিজ্ঞেস করল, সুশান্ত কোথায় যাচ্ছ?
সুশান্ত দাঁড়ালো, প্রিয়ন্তী পিছনে পিছনে এসে সুশান্তর কাছে এলো।
সুশান্ত প্রিয়ন্তীর একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে নিল, চলো আগে কোথাও গিয়ে ঘুরে আসি।
কেন?
তোমার মনটা ভালো হবে।
প্রিয়ন্তী একটা শুষ্ক হাসি হেসে বলল, আমার মন খারাপ?
হ্যাঁ।
পণ্ডিত মশাই তুমি কিভাবে বুঝলে যে আমার মন খারাপ?
শুধু মন খারাপ না, তোমার মনের সব খবর আমি বলে দিতে পারবো কিন্তু বলি না।
এটা আবার চাপাবাজি।
দু’জনে হেসে উঠল।
ততক্ষণে দু’জনে হাটতে হাটতে রাস্তায় এসে দাঁড়ালো।
একটা রিক্সা সামনে এসে দাঁড়ালো, মামা যাবেন নাকি?
চলো।
কিছুদূর যাওয়ার পর রিক্সাওয়ালা জিজ্ঞেস করল, মামা কই যাবেন?
সুশান্ত প্রিয়ন্তীকে জিজ্ঞেস করল, প্রিয়ন্তী কোথায় যাবে?
এতক্ষণ তো বললে আমার মনের খবর জানো, তবে আবার জিজ্ঞেস করছ কেন? বলে দাও।
তুমি পদ্মার পাড়ে যাও। সুশান্ত বলল।
প্রিয়ন্তী হেসে বলল, আমি পদ্মার পাড়ে যাওয়ার কথা ভাবছিলাম?
সুশান্ত পণ্ডিতের মতো বলল, হ্যাঁ।
এক্সাক্টলি।
কয়েকমিনিটের মধ্যে রিক্সা পদ্মার পাড়ে এলো।
দু’জনে রিক্সা থেকে নেমে তাদের চিরচেনা পদ্মার পাড়ের একটা বেঞ্চে বসল।
প্রিয়ন্তীর আনমনা ভাবটা তখনো কাটেনি।
সুশান্ত জিজ্ঞেস করল, প্রিয়ন্তী বলোতো কী হয়েছে?
না কিছু হয়নি।
তাহলে আমি ঠিকভাবে তোমার মন পড়তে পারিনি, আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলো কিছু হয়নি।
প্রিয়ন্তী সুশান্তর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি আমার মনটা ঠিক পড়তে পেরেছ। আমার মনটা আসলে ভালো নেই।
কেন?
ক’দিন থেকে খুব বাবার কথা মনে পড়ছে।
মোবাইলে কথা বলো।
মোবাইল করছি কিন্তু বাবার মোবাইল বন্ধ, দাদা রিসিভ করছে না। আমার মনে হচ্ছে বাড়িতে কোনভাবে আমাদের বিয়ের বিষয়টা জানতে পেরেছে। সেজন্যই কেউ আমার মোবাইল রিসিভ করছে না।
তোমাদের পাড়ার কারো মোবাইল নাম্বারতোমার কাছে নেই। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করো।
প্রিয়ন্তী গম্ভীর হলো, রাগান্বিতচোখে সুশান্তর দিকে তাকিয়ে বলল, সুশান্ত, এই তোমার বুদ্ধি? বাবা-মা’র সঙ্গে আমার যোগাযোগ নেই এটা প্রতিবেশীদের জানাবো?
সরি প্রিয়ন্তী।
সুশান্ত আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
কী সিদ্ধান্ত?
আমি বাড়ি যাবো।
যাবে তবে সামান্য অসুবিধা আছে।
কী অসুবিধা?
না, আমি তোমার পথ রোধ করব না। তুমি যেতে চাইলে আমি তোমাকে পারমিশন দিব।
আমি বাবার বাড়িতে গেলে তোমার পারমিশন নিয়ে যেতে হবে!
হ্যাঁ আশ্চর্য হচ্ছ কেন? স্ত্রী বাবার বাড়ি গেলে তো স্বামীরপারমিশন নিয়ে যেতে হবে।
এই সুশান্ত আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলোতো, আমি বাবার বাড়ি গেলে কি তোমার পারমিশন নিয়ে যেতে হবে?
সুশান্ত প্রিয়ন্তীর চোখের দিকে তাকাল না। বলল, না আমি তোমাকে পারমিশন দিয়ে দিলাম।
প্রিয়ন্তী কৃত্রিমরাগান্বিত কণ্ঠেবলল, সুশান্ত।
সুশান্ত মুখ তুলে তাকাল, তারপর দু’জনে হেসে ফেলল।
সুশান্ত জিজ্ঞেস করল, তুমি একাই যাবে?
প্রিয়ন্তী প্রথমে ভেবেছিল একাই যাবে কিন্তু সুশান্তর আগ্রহ তাকে আরো চিন্তার মধ্যে ফেলল। সে সুশান্তকে জিজ্ঞেস করল, তুমি যাবে?
গেলে অসুবিধা কী?
জানি না কিন্তু আমার খুব ভয় হচ্ছে ওরা যদি তোমাকে অসম্মান করে।
আমি কিচ্ছু মনে করব না কিন্তু আমি তোমাকে একাই ছেড়ে দিব না। যা কিছু ঘটবে দু’জনে ফেস করব।
প্রিয়ন্তীর চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল, তুমি খুব ভালো সুশান্ত।
সুশান্ত প্রিয়ন্তীর চোখের জল মুছে দিল।
কিছুক্ষণ কারো মুখে কোন কথা নেই, হৃদয় আবেগ আল্পুত, অকৃত্রিম ভালোবাসায় বোবা দু’টি প্রাণী।
সুশান্ত প্রথম নীরবতা ভাঙ্গল, তাহলে আমরা যাচ্ছি কবে?
পরশুদিন যাই।
প্রিয়ন্তী ক’টা দিন ওয়েট করো, আগামী সপ্তাহে যাই।
কেন?
যেতে তো অনেক টাকা খরচ হবে, কোচিংয়ের বেতন পাই তারপর আগামী সপ্তাহে যাবো।
তুমি না ক’দিন আগে বললে ব্যাংকে তোমার কিছু টাকা আছে।
ছিল, এখন নেই।
কী করলে?
খরচ হয়ে গেছে।
প্রিয়ন্তী রেগে গেল, সুশান্ত তোমাকে না আমি একদিন বলেছি তুমি আমাকে কোনদিন মিথ্যা কথা বলবে না, কোন কথা লুকাবে না।
প্রিয়ন্তী কথাটা আমি আসলে তোমাকে বলতে চাইনি কিন্তু বলতে হচ্ছে, না হলে তুমি আমাকে বিশ্বাস করবে না।
বলো।
মিজানের আমাদের থানা থেকে ছাড়িয়ে আনতে পুলিশকে পাঁচ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। তারপর এ ক’দিন আমাদের খরচ সবকিছু মিলিয়ে আর বোধ হয় বেশি টাকা নেই।
আমার কিন্তু তোমার ঐ বন্ধুটাকে বিশ্বাস হয় না, আমার মনে হয় ওতো টাকা লাগেনি।
প্রিয়ন্তী বিপদের সময় আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে, তখন তাকে বিশ্বাস না করে আমাদের উপায়ও ছিল না।
তাই বলে উপকারের বিনিময় নিবে?
প্রিয়ন্তী বাদ দাও তো ওর কথা।
এখন কি প্রথমবার বউকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার মতো টাকাও তোমার কাছে হবে না?
ব্যালেন্স দেখলে তা হয়ত হবে। বলে সুশান্ত প্রিয়ন্তীকে দুশ্চিন্তামুক্ত করার জন্য বলল, তুমি কিছু ভেবো না একটা ব্যবস্থা হবেই।
প্রিয়ন্তী একটা শুষ্ক হাসি হেসে বলল, ঠিক আছে।
চলবে…

৭৬১ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
আমি পেশায় একজন প্রকৌশলী। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে একসময় লেখালেখি শুরু করেছিলাম। বর্তমানে আমার লেখা উপন্যাসের সংখ্যা ১৮টি। এখনো লেখা চলছে অবিরত। আমার ফোন নাম্বার-০১৭১৮১৫৭০৭৬
সর্বমোট পোস্ট: ৩৯ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ৮৭ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৮-০২ ০৪:০১:৪৪ মিনিটে
Visit জিল্লুর রহমান Website.
banner

৩ টি মন্তব্য

  1. আমির হোসেন মন্তব্যে বলেছেন:

    প্রিয় প্রিয়ন্তী ভাল লাগছে।

  2. আরজু মন্তব্যে বলেছেন:

    পড়ছি প্রিয়ন্তী ১৪। আগেরআআভভা

  3. শাহ্‌ আলম শেখ শান্ত মন্তব্যে বলেছেন:

    এ পর্ব ভাল লাগল ।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top