Today 26 May 2020
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

প্রিয়ন্তী-১৫ (সংস্কারের প্রাচীর ভাঙ্গা তরুণী)

লিখেছেন: জিল্লুর রহমান | তারিখ: ০৮/১১/২০১৩

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 778বার পড়া হয়েছে।

Priontiবরেন্দ্র এক্সপ্রেস ট্রেন রাজশাহী থেকে সৈয়দপুরের উদ্দেশ্যে ছাড়লো। বিরামপুর পৌঁছাতে প্রায় তিন ঘণ্টা সময় লাগবে। কয়েক বছরের ছাত্র জীবনে প্রিয়ন্তী অনেকবার বরেন্দ্র এক্সপ্রেস ট্রেনে বিরামপুর যাতায়াত করেছে। ট্রেনে উঠেই তার মনে হতো কতক্ষণে ট্রেন পৌঁছাবে, ট্রেনটা যেন তার পুরো গতিতে চলছে না। ট্রেনে উঠেই মা’র মুখটা মনে পড়তো, নারিকেলের নাড়ুর সঙ্গে মুড়ি মিশিয়ে খাওয়া প্রিয়ন্তীর খুব প্রিয়। প্রতিবার বাড়িতে গিয়ে সে আগে তার প্রিয় খাবার খেত, মা পাশে বসে দেখতো আর বলতো, হ্যাঁরে মা ওখানকার খাবার বুঝি ভালো না, না?
না মা, খাবার খারাপ না।
তবে শুকিয়ে গেছিস কেন?
মা একথা তুমি প্রতিবারই বলো, তুমি যতবার শুকিয়ে যাওয়ার কথা বলছ ততবার যদি আমি শুকিয়ে যেতাম তবে এতদিন আমার ওজন জিরো হয়ে যেত।
বাসন্তী বলতো মায়ের চোখ তো, তুই যেদিন মা হবি সেদিন বুঝবি।
মাতৃস্নেহ অতুলনীয় একথা অস্বীকারকরার কেউ নেই, এ নিয়ে বিভিন্ন ধর্ম গ্রন্থ এবং সাহিত্যে কত যে উপদেশ, নির্দেশ এবং গল্প রচিত হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। প্রিয়ন্তীরপ্রায়ই মনে হয় পৃথিবীতে কোন ধর্ম গ্রন্থ এবং সাহিত্যে মাতৃস্নেহের পাশাপাশি পিতৃস্নেহের কথাটা এমনভাবে এড়িয়ে যাওয়ায় পুরুষদের প্রতি অন্যায় করা হয়েছে।
দীপক বাবু প্রিয়ন্তীকে খুব স্নেহ করে। প্রিয়ন্তীর কাছে মাতৃস্নেহ এবং পিতৃস্নেহের মধ্যে তফাৎটা খুব সামান্য। প্রিয়ন্তী যখন প্রথম রাজশাহী ভর্তি হলো তখন বিরামপুর পর্যন্ত এসে বাবা কিংবা অরুণ তাকে ট্রেনে উঠিয়ে দিয়ে যেত আবার যেদিন রাজশাহী থেকে ফিরবে সেদিন বিরামপুর এসে তার পৌঁছার জন্য অপেক্ষা করতো। অরুণের বিয়ে হয়েছে কয়েক মাস হলো এর মধ্যে তার মধ্যে কিছু পরিবর্তন হয়েছে। আজ ট্রেনে তার আসার কথা সে কাউকে জানায়নি। অনেকদিন থেকে মোবাইলে কারো সঙ্গে কথাও হয়নি।
অঞ্জনার সঙ্গে তার ঝগড়া সব সময় লেগেই থাকতো, সম্পর্কটা যেন ছিল খুব মধুর। ঝগড়া করার সঙ্গে সঙ্গে আবার কোন খাবার খেলে প্রিয়ন্তীকে ছাড়া মুখে তুলত না। প্রিয়ন্তীকে একাই কোন আত্মীয়-স্বজনদেরবাড়িতে যেতে দিত না তার একা থাকতে কষ্ট হবে বলে। পূজোয় দু’জনে ঠিক একই রকম জামা কাপড় কিনত অথচ বিয়ের পর অঞ্জনা কেমন যেন বদলে গেল। এখন অনেকটা আত্মকেন্দ্রিক হয়েছে, তার শ্বশুরবাড়ির আর্থিক অবস্থা ভালো কিন্তু তারপরও বাবার বাড়ি এলে কী নিয়ে যাবে তা নিয়েই অস্থির হয়ে পড়ে।
আজ ট্রেনে বসে প্রিয়ন্তীর নানান কথা মনে পড়ছে। একদিন যে মা নারিকেলের নাড়ু আর মুড়ি নিয়ে প্রিয়ন্তীর জন্য অপেক্ষা করতো, যে দাদা স্টেশনে তার ফেরার জন্য অপেক্ষা করতো আজ তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিম্ন বর্ণের একজন ছেলেকে বিয়ে করে হাতে শাঁখা সিঁদুর নিয়ে উপস্থিত হয়ে সে তাদের কী জবাব দিবে? অথচ কোন উপায়ও ছিল না, প্রিয়ন্তীর আচরণে সংশয় হওয়ায় তারা বার বার করে যেভাবে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছিল তাতে করে যে কোন সময় তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে বিয়ে দিয়ে দিত।
জানালার দিকে তাকিয়ে এমনি নানান কথা ভাবতে ভাবতে প্রিয়ন্তীর গণ্ডদেশ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। সুশান্ত চোখের পানি মুছে দিল, প্রিয়ন্তী মন খারাপ করছ কেন? আমি তো তোমার সঙ্গে আছি।
প্রিয়ন্তী মুখে কিছু বলল না। মনে মনে বলল, হ্যাঁ তুমি আছ বলেই তো ভরসা।
ছন্দহীন শব্দের পতন ঘটিয়ে ট্রেন থামলো। শান্তাহার স্টেশন।
সুশান্ত জানালা দিয়ে ডেকে চিনাবাদাম কিনলো। তারপর প্রথম কয়েকটা বাদাম খোসা ছড়িয়ে প্রিয়ন্তীর হাতে দিল।
সুশান্ত প্রিয়ন্তীর কানের কাছে মুখ নিয়ে আস্তে আস্তে বলল, অনেকদিন প্রেম করলাম অথচ তোমার সঙ্গে কোনদিন কলেজের মাঠে বসে বাদাম খেতে পারলাম না।
প্রিয়ন্তী আর হাসি ধরে রাখতে পারল না। সে বলল, সুশান্ত জীবনের কেবল শুরু আগে খেতে পারনি তাতে কী? এখনো সামনে সারাজীবন পড়ে আছে।

বজ ঠাকুর তখন মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়েছিল। দূর থেকে একটা রিক্সা ভ্যান আসতে দেখে চোখ পরিস্কার করে ভালো করে তাকাল। ততক্ষণে ভ্যান মন্দিরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। বজ ঠাকুর জিজ্ঞেস করল, প্রিয়ন্তী না?
প্রিয়ন্তী প্রণাম জানিয়ে বলল, হ্যাঁ ঠাকুর মশাই আমি প্রিয়ন্তী।
বজ ঠাকুর মুখ গম্ভীর করে বিড় বিড় করে কী বলল তা বোঝা গেল না। তারপর জিজ্ঞেস করল, তোমার হাতে শাঁখা, মাথায় সিঁদুর ব্যাপার কী?
প্রিয়ন্তী বজ ঠাকুরকে সুশান্তর সঙ্গে পরিচয় করে দিল, ঠাকুর মশাই ও হলো সুশান্ত আমার স্বামী।
সুশান্ত কী? নামের পরে পদবী আছে না?
প্রিয়ন্তী মুখ গম্ভীর করে বলল, সুশান্ত দত্ত।
বজ ঠাকুর পৈতা ছুঁয়ে বলল, রাম, রাম, রাম। শেষ পর্যন্ত একটা নিচু জাতের ছেলেকে বিবাহ করিলে, এই বংশে এই রকম কাজ আগে কেউ করে নাই। কলি যুগ জাত-পাত সব উচ্ছন্নে গেল।
প্রিয়ন্তী আর দাঁড়ালো না। সোজা ভ্যান থেকে মালামাল নিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকে বারান্দায় মালামালগুলো রাখল। বারান্দার একাংশে একটা চেয়ার ছিল, সেই চেয়ারে সুশান্তকে বসতে দিল। মাকে তার চোখে পড়েনি, বউদি রান্নাঘর থেকে আঙিনায় এসে চেঁচিয়ে বলল, কী ব্যাপার প্রিয়ন্তী? কাউকে না বলে একেবারে বিয়ে করে স্বামীকেনিয়ে চলে এলি?
প্রিয়ন্তী বউদিকে প্রণাম করল।
সুশান্তও প্রণাম করতে গেল।
থাক আর প্রণাম করতে হবে না। নিজের জাতের তো বারোটা বাজিয়েছিস এখন এসেছিস ভাইকে সমাজের কাছে ছোট করতে, না?
বউদি।
তুই বারান্দায় বস, আমি তোর দাদাকে মোবাইলকরছি, তুই ততক্ষণ ঘরে ঢুকিস না।
কথাটা প্রিয়ন্তীর বুকে তীরের মতো বিদ্ধ হলো। এটা তার বাবার বাড়ি, এই বারান্দায় সে ছোটবেলা হামাগুড়ি দিয়ে বড় হয়েছে, যে ঘরের সঙ্গে বারান্দায় সে মালপত্র রেখেছে সে ঘরে তার শৈশব, কৈশোর কেটেছে। এই ঘরে ঢুকতে তার কারো অনুমতি লাগবে একথা সে কোনদিন কল্পনাও করতে পারেনি। তারওপর একথা যদি তার মা-বাবা কিংবা ভাইবোন বলতো তবে সেকথা মানতে তার কম কষ্ট হতো কিন্তু তার বউদি যে মাত্র কয়েক মাস আগে এ বাড়িতে এসেছে তার মুখ থেকে এ কথা শুনে প্রিয়ন্তীর যেন হৃৎপিণ্ড রক্তাক্ত হলো।
সে জিজ্ঞেস করল, কেন?
বউদি একথার কোন জবাব না দিয়ে আঙিনার অপর প্রান্তে গিয়ে মোবাইল করতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যে হন্তদন্ত হয়ে অরুণ এলো। তার চুল সমপ্রতি ন্যাড়া করা হয়েছে, মাথার ওপর কাঁটার মতো নতুন চুল গজাতে শুরু করেছে, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, চোখ দু’টো লাল যেন চোখ দিয়ে রক্ত ফেটে বের হচ্ছে।
প্রিয়ন্তী ও সুশান্ত দুজনে প্রণাম করল।
অরুণ রাগান্বিত কণ্ঠেজিজ্ঞেস করল, এই ছেলেটার নাম কি সুশান্ত দত্ত?
হ্যাঁ।
তুই এ রকম একটা নিচু জাতের ছেলেকে বিয়ে করে তাকে বাড়িতে নিয়ে আসার সাহস কোথায় পেলি?
প্রিয়ন্তী মৃদু কণ্ঠে বলল, এটা আমার বাবার বাড়ি, দাদার বাড়ি, জামাইকে তো এখানেই নিয়ে আসবো দাদা।
না, বাপ-দাদার মুখ তুই রাখিসনি। তুই সমাজে আমাকে ছোট করেছিস, তোর সঙ্গে আমার আর কোন সম্পর্ক নেই-
অরুণের মোবাইলের রিং বেজে উঠল।
সে রিসিভ করল, হ্যালো জামাইবাবু।
বউদি মোবাইল করেছে, প্রিয়ন্তী নাকি সেই নিচু জাতের ছেলেটাকে বিয়ে করে বাড়িতে নিয়ে এসেছে।
হ্যাঁ।
আমার একটা কথা আছে দাদা?
কী কথা বলুন?
প্রিয়ন্তী আমাদের সবার মান-সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে, আমাদের আত্মীয়-স্বজনদেরমধ্যে এখনো কোন উঁচু-নিচু জাতের রক্ত মিশ্রিত হয়নি। নিচু জাতের কারো সঙ্গে আমাদের কোন আত্মীয়তাও নেই। তাই আমি বলছি প্রিয়ন্তী এবং সুশান্তকে যদি আপনারা মেনে নেন তবে আমার সঙ্গে আপনাদের কোন সম্পর্ক থাকবে না।
ঠিক আছে তোমার কথা আমার মনে থাকবে, বলে অরুণ মোবাইল রেখে দিল।
প্রিয়ন্তী তখনো মাথা নত করে দাঁড়িয়ে আছে। সুশান্ত কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে চেয়ারে বসে আছে।
অরুণ বলল, প্রিয়ন্তী এখনি জামাই বাবু মোবাইল করল, তোর সঙ্গে কোন সম্পর্ক রাখলে সে আমাদের সঙ্গে কোন সম্পর্ক রাখবে না, তোর পাপের জন্য তো আমরা প্রায়শ্চিত্ত করতে পারি না। তুই বেরিয়ে যা, আর কখনো এ বাড়িতে আসবি না। আমি মনে করব প্রিয়ন্তী নামে আমার কোন বোন নেই।
এতক্ষণ প্রিয়ন্তী খেয়াল করেনি, অরুণের মাথা ন্যাড়া কেন? সে সব সময় লুঙি পরে থাকে আজ সে ধুতি পরেছে কেন?
এমন সময় তার মা বাড়িতে ঢুকল। মা সাদা শাড়ি পরেছে, হাতে শাঁখা-সিঁদুর নেই। তার আর বুঝতে বাকী রইল না।
সে তার মায়ের বুকে মাথা রেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল।
বউদি বলল, এখন মায়া কান্না করে আর কি হবে? বাবার মাথাটা তো তুই খেলি। মা আমি দিব্যি করে বলছি আপনি কিন্তু প্রিয়ন্তীকে কোনভাবেই মেনে নিবেন না।
বাসন্তীও কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। সেই কান্নার রোল ভেদ করল বউদির কথাগুলো, আপনি এ কি করছেন মা? বাবার কথাগুলো আপনার মনে নেই।
বাসন্তী জোর করে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, তুই চলে যা প্রিয়ন্তী, আর কখনো এ বাড়িতে আসবি না।
প্রিয়ন্তী চোখ মুছল তারপর দৃঢ়ভাবে বলল, আসবো না কিন্তু তার আগে আমাকে বলতে হবে বাবা মারা যাওয়ার আগে আমাকে মোবাইল করলে না কেন?
সেটা তোর বাবার নির্দেশ, স্বর্গবাসীহওয়ার আগে সবাইকে বলেছে তোকে যেন তার স্বর্গবাসীহওয়ার খবর না জানাই।
প্রিয়ন্তী কিছু বলল না, তার বুক চিরে একটা কথা অষ্ফুটস্বরে বের হলো, বাবা।
অরুণ বলল, হ্যাঁ বাবাই বলেছে।
প্রিয়ন্তী কান্না ভাঙ্গা গলায় বলল, তোমার ওপর আমার ভরসা ছিল মা। আমি আশা করেছিলাম সবাই ত্যাগ করলেও তুমি আমাকে ফেলে দিবে না কিন্তু আমার ধারণা ভুল। আমি চলে যাচ্ছি মা, আর কোনদিন বোন হয়ে ভাইয়ের কাছে এবং মেয়ে হয়ে মায়ের কাছে অধিকার নিয়ে আসবো না। আমি শুধু তোমার আশীর্বাদ চাই মা, আর কিচ্ছু চাই না। বলে প্রিয়ন্তী সুশান্তকে ইশারা করে বলল, চলো সুশান্ত, তুমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই। স্ত্রী হয়ে তোমাকে শ্বশুরবাড়ি এনে শুধু অপমান করলাম।
সুশান্ত বলল, চলো প্রিয়ন্তী।
চলবে…

৮১৬ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
আমি পেশায় একজন প্রকৌশলী। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে একসময় লেখালেখি শুরু করেছিলাম। বর্তমানে আমার লেখা উপন্যাসের সংখ্যা ১৮টি। এখনো লেখা চলছে অবিরত। আমার ফোন নাম্বার-০১৭১৮১৫৭০৭৬
সর্বমোট পোস্ট: ৩৯ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ৮৭ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৮-০২ ০৪:০১:৪৪ মিনিটে
Visit জিল্লুর রহমান Website.
banner

৪ টি মন্তব্য

  1. শাহ্‌ আলম শেখ শান্ত মন্তব্যে বলেছেন:

    পড়লাম ভাল লাগল ।
    সাথেই আছি ।

  2. আমির হোসেন মন্তব্যে বলেছেন:

    পড়লাম সাঘে আছি।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top