Today 26 Aug 2019
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

ফার্ষ্টবয়

লিখেছেন: বিএম বরকতউল্লাহ্ | তারিখ: ৩১/০৮/২০১৩

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 558বার পড়া হয়েছে।

পরীক্ষা শুরু হয়ে গেল। আমরা প্রশ্নপত্র পেয়ে খাতায় লিখতে শুরু করেছি মাত্র। এরই মধ্যে কয়েকজন স্যার অস্থিরভাবে জনে জনে গলা খাটো করে বলতে লাগলেন, “কি রে, পরীক্ষা যে শুরু হয়ে গেল, মনির তো এখনও আসেনি। তার কি কোনো সমস্যা-টমস্যা হলো নাকি! তোরা কিছু বলতে পারবি?“ আমরা আশ্চর্য হয়ে জবাব দিলাম, “না, আমরা তো কিছুই জানি না স্যার।“ খুব বিমর্ষ মনে ছোটাছুটি করতে লাগলেন স্যারেরা।
আমাদের ৫ম শ্রেণীর ফার্ষ্টবয় মনির। সে আজ অনুপস্থিত। তার অনুপস্থিতির কারণ জানি না কেউ।
আমাদের ৩ টি সেকশনে ১৬৫ জন ছাত্র। আমার রুল নম্বর ২। যতই পড়ি না কেন, মনিরের সাথে পড়ালেখায় কোনোভাবেই কুলিয়ে উঠতে পারি না। মনে মনে খুব হিংসা করি তাকে। সে স্কুলে না এলে, অসুস্থ হলে কিংবা কদাচিত পড়া একটু কম পারলে মনে মনে খুব খুশি হই। কিন্তু আজ সে পরীক্ষা দিতে না আসায় যতটা আনন্দিত হওয়ার কথা ততটা আনন্দ লাগছে না; তার জন্য কেন জানি খুব মায়া লাগছে আমার।
আজকের পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর বাসায় যেতে আন মন চাইল না। আমাদের ক্লাশের রনি ও শুভকে নিয়ে আমি মনিরের খবর জানতে বের হয়ে গেলাম। কিন্তু তার বাসা কোথায় তা আমরা জানি না। ষষ্ঠ শ্রেণীর একজন ছাত্র আমাদের চিনিয়ে নিয়ে গেল। আধ ঘন্টার মত হাঁটার পর ছেলেটি রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমাদের বলল, ‘ওই যে বস্তিটা দেখছ না, মনির ওইখান থেকেই আসে।
বস্তিটা পানিতে ভাসছে। ছোট ছোট খুপড়ি ঘর। মাঝে মধ্যে দু‘এক জনের খল খল করে হাঁটা-চলার ও শিশুর কান্নার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। আমরা নেমে গেলাম পানিতে। আস্তে করে হাঁটছি। মনে হলো, ঢেউয়েরা দাঁড়িয়ে থাকা বস্তির নড়বড়ে ঘরগুলোকে ঠেলে ফেলে দেয়ার চেষ্টা করছে।

মনিরের কথা বলতেই বস্তির একজনকে হাত ইশারায় একটা নড়বড়ে ছোট ঘর দেখিয়ে দিল। ঘরে হাঁটু পরিমাণ পানি। চুপি দিয়ে দেখি, খুঁটির উপর জোড়াতালি দেওয়া কয়েকটা কাঠের ওপর জবুথবু হয়ে বসে আছে মনির। “মনির তুই যে আজ পরীক্ষা দিতে যাসনি! সবাই চিন্তা করছি। কী হয়েছে তোর?“ বলতেই সে চমকে উঠল। সে কিছু বলার আগেই বুঝতে পারলাম, সে খুব অসুস্থ। কপালে হাত দিয়ে অনুভব করলাম তার প্রচন্ড জ্বর। সে কাঁপছে। ঠোঁট-মুখ শুকিয়ে গেছে। তার সামনে একটা টিনের বাসনে চাল ভাজা ও পাউরুটির কিছু অংশ পড়ে আছে। এতে মাছিরা ভনভন করছে। তার বাবা নেই। তার মা ও বোন অন্যের বাড়িতে ঝি এর কাজ করতে গেছে। ঘরে সে একা। মনির লজ্জায় আরো ছোট হয়ে ক্ষীণ স্বরে বল্ল, “ভাই আমি তোদের বসতেও বলতে পারছি না। তোরা কেন খালি খালি কষ্ট করছিস? পরীক্ষা কেমন হলো রে“ বলেই সে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগল সে।

বৃষ্টি ও বন্যার জলে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেছে তার। ঘরের কোণায় দেখলাম তার খাতা, বই ভাসছে। তার ইউনিফর্ম নাকি পানিতে ভেসে গেছে। তার ওপর প্রচন্ড জ্বর। এসব দেখে আমাদের চোখও ভিজে গেল। আমরা অনুমানও করিনি আমাদের কাশের ফার্ষ্টবয় মনির যে এত গরিব।

আমরা তার দুরবস্থা দেখে অবাক হয়ে গেলাম। সে লজ্জায় বারবার বলছে, “কোনো চিন্তা করিস না ভাই। আমি এমনিতেই ভাল হয়ে যাব। পরীক্ষার জন্য ভীষণ কষ্ট হচেছ!“ আমরা আর কোনো কথা বাড়ালাম না। দ্রুত বের হয়ে মেইন রোডে এসে তিন জন পরামর্শ করলাম, কী করা যায় তার জন্য। চট করে বুদ্ধি পেয়ে গেলাম। আমরা তিন জন একত্রে তিন জনের বাসায় গিয়ে বাবা মাকে বিষয়টা খুলে বল্লাম। তাঁরা আমাদের অস্থিরতা দেখে খুব খুশি হলেন। তিনজনের আব্বুর কাছে ৫০০/- টাকা করে চাইলাম। তাঁরা সাথে সাথে দিয়ে দিলেন। আমরা ১,৫০০/- টাকা নিয়ে মনিরের বাসায় রওনা হয়ে গেলাম। যাওয়ার পথে একটা চকি, স্যালাইন, ফিটকিরি, ডাক্তারের পরামর্শে কিছু ঔষধ ও পথ্য নিয়ে হুড়মুড়িয়ে গিয়ে হাজির হলাম তার ঘরে। আমাদের হাতে ওসব দেখে তার মা, বোন ও মনিরের চোখ তো ছানাবড়া। আশপাশের কেউ কেউ এসে আমাদের অনেক প্রশংসা করতে লাগলেন। আমরা চকি পেতে বসলাম। মনির এবং তার মা ও বোনের চোখ আনন্দ-কৃতজ্ঞতায় অশ্রুসজল হয়ে উঠল। আমরা মনিরকে অবশিষ্ট টাকা ও অভয় দিয়ে চলে এলাম।

স্কুলে এসে স্যারদের কাছে সব খুলে বললাম। আমাদের উদ্যোগের কথা শুনে স্যারেরা অনেক খুশি হলেন। স্যারেরা আমাদের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘ভালো কাজ কখনও হারিয়ে যায় না রে। তোমাদের এই ছোট্ট একটা ভাল কাজের দৃষ্টান্ত ভবিষ্যতের বৃহৎ কাজের অণুপ্রেরণা হয়ে রইল।‘ স্যারের এসব কথায় আমরা ভাল কিছু করার আনন্দ নিয়ে বাসায় ফিরলাম।

পরীক্ষা শেষ হওয়ার তিন দিন পরে মনির দুর্বল শরীর নিয়ে স্কুলে এলো। তার বিষয়টি নিয়ে স্যারেরা জরুরি মিটিং করলেন। পরে বিশেষ ব্যবস্থায় মনিরের পরীক্ষা নেয়া হলো।
পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন সবার চু ছানাবড়া। এবারও ফার্ষ্ট হয়েছে মনির!

৬৭৫ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
@ লেখালেখি করি সেই ছোটোবেলা থেকেই। বাবার কাছে হাতেখড়ি। বাবা লিখে আমাকে পড়াতেন। আর আমি লিখে বাবাকে দেখাতাম। তালে তালে তালাতালি! জাতীয় দৈনিকে, রেডিওতে আর্টিকেল, ফিচার, রম্য ও ছড়া লিখতাম একসময়। তারপর শিশুতোষ গল্পের প্রতি ঝুকে পড়ি। ছড়া লিখি মাঝে মধ্যে। @ প্রকাশিত গ্রন্থঃ ছয়টি। @ প্রাপ্ত পুরষ্কারঃ জাতিসংঘ (ইউনিনসেফ) কর্তৃক আয়োজিত দেশব্যাপী বড়োদের গ্রুপে গল্পলেখা প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করে "মীনা মিডিয়া এ্যাওয়ার্ড ২০১১" লাভ করি। @ পেশাঃ চাকরি। @ পেশাগত কারণে ব্যস্ততার মধ্যেই কাটে সময়। এরই মধ্যে সময় করে লেখালেখি করার চেষ্টা করি। প্রিন্ট ও ইলেকট্রিক মিডিয়াতে নিয়মিত লিখছি। লেখায় গতানুগতিক চিন্তা-চেতনার পরিবর্তে স্বকীয়তার ছাপ রাখার চেষ্টা করি। ব্লগে লিখে অনেক আনন্দ পাই। প্রিয় পাঠকদের মন্তব্য, পরামর্শ ও উপদেশ আমার লেখালেখির মতো সৃজনশীল কাজে শুধু অণুপ্রেরণাই যোগায় না; নিজেকে পরিশুদ্ধ ও লেখার উৎকর্ষ সাধনে যথেষ্ট ভূমিকা রাখে।
সর্বমোট পোস্ট: ২৮ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ১৬৭ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৫-২৯ ১১:৫১:৫৪ মিনিটে
banner

১০ টি মন্তব্য

  1. এম, এ, কাশেম মন্তব্যে বলেছেন:

    গল্পটা ভালো লাগলো

  2. আমির হোসেন মন্তব্যে বলেছেন:

    গল্পটি মনের মাধুরী মিশিয়ে লেখা। বেশ ভাল লাগল।

  3. এ টি এম মোস্তফা কামাল মন্তব্যে বলেছেন:

    ভাঙা ঘরে চাঁদের আলোর বন্যা বইয়ে দেবার মতো অনেক মনির আমাদের সমাজে আছে। গল্পটি ভালো লেগেছে।

    • বিএম বরকতউল্লাহ্ মন্তব্যে বলেছেন:

      জ্বী, এমন অনেক মনির আছে আমাদের দেশে যাদেরকে আমরা অদম্য বলি। এরা কোনো না কোনোভাবে আলোর জগতে আসবেই। ধন্যবাদ আপনাকে। ভালো থাকবেন।

  4. আহমেদ ফয়েজ মন্তব্যে বলেছেন:

    অনেক সুন্দর গল্প। এরকম মনির যে আমাদের দেশ কত শত! কত জনের খবর রাখি আমরা।

  5. তুষার আহসান মন্তব্যে বলেছেন:

    আপনার গল্পটি মনে দাগ কাটে,

    অশেষ ভাল লাগা।

  6. মোঃ অলিউর রহমান মন্তব্যে বলেছেন:

    ভালো লাগলো

  7. মোঃ ওবায়দুল ইসলাম মন্তব্যে বলেছেন:

    ভাল লাগল। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। শুভেচ্ছা রইল। ভাল থাকবেন।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top