Today 17 Nov 2019
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

বাংলা ভাষা-সাহিত্য আমাদের অহঙ্কার

লিখেছেন: সৃজনী মণ্ডল | তারিখ: ১৫/০৫/২০১৫

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 774বার পড়া হয়েছে।

 

বাংলা ভাষা ও সাহিত্য শুধু বাঙালিদের অহঙ্কার নয়, সারা বিশ্বেরও অহঙ্কার। সাহিত্যের শ্রেষ্ঠত্বের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে স্থায়ী ও সার্বজনীন মানব কল্যাণে এটার অবদান। সাহিত্যের বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে ডিনামাইটের আবিষ্কারক সুইডেনের শিল্পপতি রসায়নবিদ ও ইঞ্জিনিয়ার আলফ্রেড বার্ণহার্ড নোবেলের (১৮৩৩-১৮৯৬) উইল অনুযায় ৮ ফাল্গুন ১৩৫৯ মোতাবেক ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ – ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ভাষা সংগ্রামী ছাত্র-ছাত্রীদের ১৪৪ ধারা ভাঙার প্রস্তুতি নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়। এটা ১৯০১ ইংরেজি সন হতে চালু রয়েছে। ১৯১৩ সনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) বাংলা ভাষায় তাঁর গীতাঞ্জলি নামক কবিতা গ্রন্তুটি লিখে এই পুরস্কার লাভ করেন। পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ গীতাঞ্জলিতে পরিবেশিত কবিতা হতে অনেক উচ্চ মানের কবিতা লিখেছেন। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার হতে যদি আরো কোনো মূল্যবান পুরস্কার থাকতো তাহলে ওটা তাঁকেই দিতে হতো। গীতাঞ্জলিতে এই উপমহাদেশের হাজার হাজার বৎসরের সংস্কৃতি ও হৃদয় মাধুর্য বিধৃত হয়েছে। ব্রিটিশ ও আমেরিকার অনেক কবি ও সাহিত্যিক নোবেল পুরস্কার লাভ করেছেন – নোবেল পুরস্কার সাহিত্যের উৎকর্ষতার একমাত্র মাপকাঠি নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় এমন অনেক কবি ও সাহিত্যিক রয়েছেন যাদের সাহিত্য কর্ম সম্বন্ধে নোবেল পুরস্কার যারা দেন তারা অবহিত নন। নানা কারণে এগুলো তাদের দৃষ্টিতে ধরা পড়ে না। তবে একথা ঠিক যে, যারা নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তারা বহু উঁচু মানের কবি ও সাহিত্যিক। প্রফেসর এডওয়ার্ড জিঃ ব্রাউনের মতে, ফার্সী সাহিত্যের ইতিহাস খৃষ্টপূর্ব ৫৫০ সন হতে আরম্ভ হয়েছে। ফার্সী সাহিত্যের বয়স ২৫৫৮ বৎসরের মতো হবে। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে দেখা যায় ফেরদৌসী (৯৩৫-১০২০), ওমর খৈয়াম (১০৩৮-১১২৩), আত্তার (১১৩৫-১২২৯), জালালুদ্দীন রুমী (১২০৭-১২৭৩), শেখ সাদী (১১৮৪-১২৯৩), হাফেজ (১৩২৬-১৩৯২), মোল্লাজামী (১৪১১-১৪৯১) ফার্সী সাহিত্যকে তাঁদের কাব্য মারফত সমৃদ্ধ করেছেন। ইরানের বাইরে উল্লেখিত কবিদের মতো কোনো ইরানী কবি অত সুপরিচিত নন, যদিও উল্লেখিত কবি ছাড়া আরো অনেক কবি ও সাহিত্যিক ইরানে জন্মগ্রহণ করেছেন, যাদের সাহিত্য কর্ম অত্যন্ত উচ্চমানের। এই সময়ের মধ্যে ভাষার পরিবর্তন হয়েছে, সাহিত্যের ধারা ও ধরন অনেকখানি বদলে গেছে কিন্তু আমরা ওগুলোর সঙ্গে খুব সুপরিচিত নই। উল্লেখিত কবিদের ইরানের বাহিরে সুপরিচিত হওয়ার কারণ হচ্ছে তাঁদের সাহিত্য কর্মে মানুষের স্থায়ী কল্যাণের সন্ধান রয়েছে। অনুরূপ প্রায় ৫ (পাঁচ) শত বৎসরের আগের মধ্যযুগীয় বাঙালি বৈষ্ণব কবিরা এখনও বাঙালিদের হৃদয় জুড়ে আছে। মধ্যযুগ বলতে আমরা মোটামুটিভাবে ১৩শ হতে ১৭শ পর্যন্ত সময়কে বুঝি। এমন শিক্ষিত বাঙালি খুব কম পাওয়া যাবে যারা চন্ডীদাস, (পঞ্চদশ শতকের মধ্যভাগ), বিদ্যাপতি (১৩৫৮-১৪৫৮), বৃন্দাবন দাস (১৫৩৭-১৬২৯), বলরাম দাস (১৬-১৭শ শতাব্দী), নরোত্তম দাস (ষোড়শ শতকের মধ্যভাগ), জ্ঞান দাস (জন্ম ১৫৩০), ঘনরাম (পঞ্চদশ শতাব্দী), গোবিন্দ দাস (১৫৩৭-১৬১৯) এবং সৈয়দ আলাওল (১৬১৮-১৬৬৮) এর পদাবলীর সঙ্গে কম বেশি পরিচিত নন। বাগদাদের মনসুর হাল্লাজের (মৃত্যু-৮২১ খৃঃ) অমর বাণী ‘আনাল হক’ অর্থাৎ আমিই (মানুষই) পরম সত্য, তার উপরে কোনো সত্য নেই; রুমীর বাণী ‘মানুষের হৃদয় হচ্ছে পরম সত্যের আবাসস্থল’ বাংলার কবি চন্ডীদাস বাংলা ভাষায় এমন সুন্দর ও সহজ করে অনুবাদ করেছেন যা যতদিন পর্যন্ত বাঙালি জাতি থাকবে, যতদিন বাংলা ভাষা ও সাহিত্য থাকবে, ততদিন জীবিত থাকবে। পূর্বোক্ত দুই ম

 

নীষীর বাণী তিনি এইভাবে অনুবাদ করেছেনঃ

 

শুনহে মানুষ ভাই –

 

সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।

 

আমিই পরম সত্য (আনাল হক) বলাতে মনসুরকে শূলেতে চড়িয়ে বধ করা হয়। প্রবাদ আছে তাঁর রক্ত চিৎকার করে বলছিল – ‘আমিই পরম সত্য।’

 

এটাকে ইন্দ্রজালের প্রভাব মনে করে তাঁর রক্ত আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়, তখন রক্তের ছাইও ‘আনাল হক’, ‘আনাল হক’ – ‘আমিই পরম সত্য’, ‘আমিই পরম সত্য’ বলতে থাকে। আকাশে-বাতাসে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে – ‘আনাল হক’, ‘আনাল হক’, ‘আমিই পরম সত্য’, ‘আমিই পরম সত্য।’

 

বাইবেলের যে ইংরেজি অনুবাদ বর্তমান সারা বিশ্বে চালু রয়েছে ওটাকে ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম জেমস (১৫৬৬-১৬২৫ খৃঃ) এর বাইবেল বলা হয়। রাজা প্রথম জেমস ১৬১১ খৃষ্টাব্দে মূল হিব্রু ও গ্রীক ভাষা হতে বাইবেলের ইংরেজি অনুবাদ করান। এটা একটি ধর্ম পুস্তক। যেহেতু এটাতে মানব কল্যাণের স্থায়ী বাণী রয়েছে এটা কালজয়ী হয়ে থাকবে। অনেক পণ্ডিত মনে করেন বাইবেল না পড়লে ইংরেজি শিক্ষা অপূর্ণ থেকে যায়। অনুরূপ কুরআন না পড়লেও আরবী শিক্ষা পরিপূর্ণ হয় না। এজন্য আরবী ভাষা জানার উদ্দেশ্যে অনেক খৃষ্টান ও ইহুদি আগ্রহের সাথে কুরআন পাঠ করে।

 

কেউ কেউ মনে করে, খৃষ্ট জন্মের চার হাজার বৎসর পূর্বে ব্যাবিলন হতে দ্রাবিড়রা ভারতে এসে সিন্ধু, পাঞ্জাব ও বাংলাদেশে বসতি স্থাপন করে। বাংলাদেশে বাংলা ভাষাই ছিলো তাদের ভাষা। সুতরাং বাংলা ভাষার বয়স পাঁচ হাজার বৎসরের উপর। অনেকে মনে করেন, বাঙালিরা একটি শঙ্কর জাতি। এই জাতিটি আর্য ও দ্রাবিড়দের সংমিশ্রণে সৃষ্টি হয়েছে। এটা মেনে নিলে বাঙালিদের আদি দ্রাবিড় ভাষা ও আর্যদের সংস্কৃত ভাষার সংমিশ্রণে বাংলা ভাষার সৃষ্টি হয়েছে। লক্ষ্যণীয় মাদ্রাজ, বোম্বে ও শ্রীলঙ্কার লোকদের সঙ্গে বাঙালিদের অনেক দৈহিক সামঞ্জস্য রয়েছে। তামিলনাড়ু, মাদ্রাজ ও শ্রীলঙ্কার লোকের ভাষা যে দ্রাবিড়দের ভাষা হতে সৃষ্টি হয়েছে এতে পণ্ডিতদের মধ্যে দ্বিমত নেই।

 

দ্রাবিড়রা সরাসরি বাংলাদেশে না আসলেও ওখান হতে বিভিন্ন সময়ে তাদের বাংলাদেশে আগমন করা খুবই স্বাভাবিক। সুতরাং স্বীকার করতে হয় বাংলা ভাষার বয়স পাঁচ হাজার বৎসরের ওপর। এই ভাষাতে কি নেই? মহাকাব্য, গীতি কবিতা, নাটক, উপন্যাস, প্রবন্ধ, গল্প প্রভৃতিতে বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ।

 

মুসলমানগণ ছয়শত বৎসরের ওপর এই দেশ শাসন করেছে, ফলে ধর্মের কারণে ও রাজনৈতিক কারণে এই দেশের লোককে তাদের ভাষা শিখতে হয়েছে। তবে মুসলমান শাসকগণ এদেশবাসীকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উৎকর্ষ সাধন করতে উৎসাহিত করেছেন। পরাগলি মহাভারত (১৫১৯ খৃঃ) এটার একটি উদাহরণ। কাশীদাসী মহাভারতের (সপ্তদশ শতাব্দী) সঙ্গে পরাগলি মহাভারতের ভাষা ও বর্ণনায় অনেক মিল রয়েছে। উল্লেখ্য, কৃত্তিবাসী রামায়ণও রচিত হয়েছিল মুসলমান শাসক সুলতান রুকুনুদ্দিনের পৃষ্ঠপোষকতায়। কাশী দাসী মহাভারত ও কৃত্তিবাসী রামায়ণ বাংলাদেশের সাহিত্যে ও সংস্কৃতিতে বিরাট অবদান রেখেছে। মহাভারত বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ গ্রন্তু। এটাতে এক লক্ষ দশ হাজার শ্লোক রয়েছে। রামায়ণে রয়েছে বিশ হাজার শ্লোক, হোমারের ইলিয়াডে আছে ষোল হাজার শ্লোক, ভার্জিলের এনিডে আছে প্রায় দশ হাজার শ্লোক। আর ফেরদৌসীর শাহনামায় রয়েছে ত্রিশ হাজার শ্লোক।

 

ইংরেজরা প্রায় দুইশত বৎসর এই দেশটি শাসন করেছে। তারা বাঙালিদের ইংরেজি শিখতে বাধ্য করেছে এবং তাদের সাহিত্যে যা আছে তা গলধঃকরণ করতে উৎসাহিত করেছে। এটাতে সুফল ও কুফল দুটোই দেখা দিয়েছে। সুফলের মধ্যে রয়েছে একটি সমৃদ্ধ বিদেশী ভাষার সঙ্গে পরিচিত হবার সুযোগ এবং কুফলের মধ্যে রয়েছে নিজ মাতৃভাষা ও সাহিত্যের দিকে সম্যক মনযোগী হতে না পারা। মাইকেল মধুসূদনের কবিতাই তার প্রমাণঃ

 

‘হে বঙ্গ! ভান্ডারে তব বিবিধ রতন

 

তাসবে অবোধ আমি অবহেলা করি

 

পরধন লোভে মত্ত করিনু ভ্রমণ

 

পরদেশে ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচারি

 

কাটাইনু বহুদিন সুখ পরিহারি

 

অনিদ্রায় অনাহারে সঁপি কায়মন

 

মজিনু বিফল তপে অবরণ্যে বরি

 

খেলিনু শৈবালে ভুলি কমল কানন।’

 

মাতৃভাষার সেই দৈন্য দশা এখন কেটে গেছে। কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বাঙালিদের ওপর উর্দু ভাষা চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বীর বাঙালিরা তা হতে দেয়নি। তারা বিদ্রোহ করেছে, প্রাণ দিয়েছে। আমাদের কেউ আরবী, ফার্সী বা উর্দু ভাষা হতে বিচ্ছিন্ন থাকতে বলবে না। ওগুলোকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অঙ্গীভূত করতে হবে। আমরা তাদের যা উৎকৃষ্ট তা গিলে হজম করবো, তাদের ভাষা ও সাহিত্যকে আমাদের ভাষা ও সাহিত্য গিলে ফেলতে দেবো না। আমরা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে কোনো জাতি হতে কম নই। বাঙালিরা মাতৃভাষার জন্য যে ত্যাগ স্বীকার করেছে তা সমগ্র বিশ্বের শ্রদ্ধা অর্জন করেছে। এখন প্রতি বৎসর ২১ ফেব্রুয়ারি সারা বিশ্বে মাতৃভাষা দিবস হিসাবে পালিত হচ্ছে। এটা বাঙালি জাতি এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জন্য এমনকি বিশ্বের জন্য বিরাট গৌরবের বিষয়। ইসলামও নিজ নিজ মাতৃভাষার উৎকর্ষ সাধনের জন্য উৎসাহ প্রদান করে।

তথ্যঃ সৈয়দ আহমদুল হক

৭৬০ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
সর্বমোট পোস্ট: ১৯ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ০ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৯-২৫ ১২:২৮:৪৭ মিনিটে
banner

৫ টি মন্তব্য

  1. দ্বীপ সরকার মন্তব্যে বলেছেন:

    খুব ভালো লাগলো।

  2. অনিরুদ্ধ বুলবুল মন্তব্যে বলেছেন:

    তথ্যবহুল সুন্দর লেখা।
    লেখককে ধন্যবাদ জানাই।

  3. দীপঙ্কর বেরা মন্তব্যে বলেছেন:

    অনেক তথ্য বহুল ঠিক কথা
    ভাল লাগল

  4. জসিম উদ্দিন জয় মন্তব্যে বলেছেন:

    বাংলা ভাষা-সাহিত্য আমাদের অহঙ্কার আমরা গর্বিত । অনেক তথ্যভিত্তিক লেখা । পড়ে অনেক কিছু জানলাম। ধন্যবাদ

  5. টি. আই. সরকার (তৌহিদ) মন্তব্যে বলেছেন:

    বাংলা ভাষা-সাহিত্য নিয়ে অনেক তথ্যসমৃদ্ধ সুন্দর লেখা । অনেক জানার সুযোগ হল । অনেক ধন্যবাদ জানবেন ।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top