Today 18 Jul 2018
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

বাজী ( তিন খন্ডে সমাপ্য বড় গল্প / প্রথম পর্ব )

লিখেছেন: আহসান হাবীব সুমন | তারিখ: ২০/০১/২০১৪

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 315বার পড়া হয়েছে।

১.

 

নীমতলী শ্মশাণ ঘাট ।

সন্ধা নেমেছে কম করে হলেও ঘন্টা দুয়েক । এরই মাঝে শ্মশানের বিশাল এলাকা জুড়ে নেমে এসেছে গাঢ় অন্ধকারের নিকষ কালো চাদর । চারপাশে বিরাজ করছে থমথমে রাত্রির গম্ভীর নিরবতা ।যদিও মাঝেমধ্যেই সেই নিরবতাকে বিনা নোটিশে ভেঙ্গে দিতেই যেন আশেপাশের অন্ধকার কোন ঝোপ থেকে আচমকাই ডেকে উঠছে নিশাচর কোন প্যাঁচা বা ব্যাঙ । তাতে অবশ্য এই থমথমে অন্ধকারের গাম্ভীর্য কমছে না বিন্দুমাত্র । বরং তা যেন এই পরিবেশের নিস্তব্দধতাকেই বাড়িয়ে দিচ্ছে আরও বহুগুন ।

আশেপাশের এলাকার অধিবাসীরা সন্ধার পরে নিতান্তই প্রয়োজন না পড়লে শ্মশান এলাকার দিকে আসে না । আসলে মৃতদেহ সৎকারের যে কোন জায়গা সম্পর্কে মানুষের মনে এমনিতেই একটা অযথা ভয় কাজ করে । আর গ্রামীণ সাধারণের মধ্যে যে কোন বিষয়ে কুসঙ্সকারের প্রভাবটা দেখা যায় আর একটু বেশী । এই এলাকার সহজ সরল মানুষগুলোও তার ব্যতিক্রম নয় । ফলে দেখা যায় , রাতেরবেলা আশেপাশের লোকালয়ের মানুষেরা নিতান্তই বাধ্য না হলে – এদিকটা মাড়ায় না । তাও আসে মড়া নিয়ে অবশ্যই একদল শ্মশাণযাত্রী নিয়ে ।

অথচ এই রাতের অন্ধকার নির্জন পরিবেশেই কিনা একজন পঁচিশ ছাব্বিশ বছর বয়সী যুবককে হনহন করে শ্মশানর দিকে হেঁটে যাচ্ছে !সম্পূর্ণ একাকী হলেও যার মধ্যে দেখা যাচ্ছে না বিন্দুমাত্র দ্বিধা বা অস্বস্হির কোন চিহ্ন । বরং তার দৃঢ় আর নিশ্চিত পদক্ষেপই জানান দিচ্ছে এই পথ তার ভীষণরকম চেনা এবং সময়ে অসময়ে এই পথ ধরে চলাফেলায় ভীষণ অভ্যস্তও বটে । এবং সে জানে তার আসল গন্তব্য কোথায় !
আর তাইতো লোকালয়ের শেষমাথায় যেখানে আশেপাশর কয়েকটা এলাকার পথ এসে মিলেমিশে গিয়ে পরিনত হয়েছে শ্মশানমুখী একটামাত্র পথে !যুবকটি অল্পসময়ের মধ্যে দ্রুত পা চালিয়ে পথটুকু পেরিয়ে এসে ঢুকলো শ্মশানের মূল প্রাঙ্গনে । কিন্তু তারপরও থামলো না সে । বরং প্রাঙ্গণ পেরিয়ে সোজা চলে এল শ্মশাণের পেছনদিকে বয়ে যাওয়া খালপাড়ে । যদিও চৈত্রের প্রচন্ড খরতাপে শুকাতে শুকাতে খালটি এই মুহুর্তে আসলে বইছে তিরতিরে নালার মতই ।

খালপাঁড় ঘেঁষে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে আছে অনেকগুলো বিশালাকৃতির বৃক্ষ । আর বলাই বাহুল্য তাদের মধ্যে নীম গাছের সংখ্যাধিক্যই এই শ্মশাণ এলাকার নামকরণের হেতু । যদিও সমস্ত বৃক্ষের মধ্যে সবচাইতে বৃহদাকার বৃক্ষটি হলো বুনো তেঁতুলের । দৈর্ঘ্য প্রস্হের বিশাল ঐ তেঁতুল গাছটার উঁচু ডালগুলো যেন একপলক আকাশটাকে ছুঁয়ে দিয়েই গোত্তা খেয়ে ফের সোজা নেমে নেমে এসেছে পৃথিবীর টানে । নিজেদের ভালবাসা প্রমান করতেই যেন ঘণ লতাপাতায় আবৃত অনেকগুলো ডাল চুমু খেতে চাইছে সোজা মাটির বুকে । ফলে গাছটির চারপাশ ঘিরে জমাট বেঁধে আছে আশেপাশের তুলনায় খানিকটা বেশিই অন্ধকার !

আগন্তুক যুবকটি হনহন করে এগিয়ে গেল সেই তেঁতুল গাছটার দিকেই । আর লক্ষ্যের কাছাকাছি আসা মাত্রই তার নাকে এসে ভক করে আছড়ে পড়লো ঝাঁঝালো ধোঁয়ার তীব্র কটু গন্ধটা । অতি পরিচিত আর কাঙ্খিত সেই গন্ধ যেন আমুল নাড়িয়ে দিল যুবকের সমস্ত অস্তিত্বকে ।

– অই জীবু , বাইনচোত জলদি আয় ! ঝাইড়া দৌড়ায়া আয় বে । আমার পাঁচশো আগে বাঁচা হালার পো !

কাছাকাছি আসতেই তার নামধরে হাশুর চিৎকার শুনতে পায় জীবু নামের আগন্তুক যুবক । বুঝতে পারে , ওর বন্ধুরা বেশ আগে থেকেই আসতে দেখতে পেয়েছে ওকে । ঐখানটায় ওরা বসেই আসলে এই একটা কারণে । ঐ গাছের তলায় অন্ধকারের জন্য বসে থাকা কাউকে সহজে দূর থেকে দেখতে পাওয়া যায় না । অথচ অবস্হানগত কারনে তেঁতুলগাছটার নীচে বসে অনেক দূর থেকেই নজরে পড়ে এদিকে আসা যে কাউকে ।

কিন্তু শালারা এতো দূর থেকে এই অন্ধকারের মধ্যে ওকে ঠাঁওর করলো কি করে ! আজব তো ! নাকি সবগুলো রাতের পেঁচা জাতীয় কোন কিছু হয়ে গেল !খালি দেখেইনি , ওর আসা নিয়ে যে নির্ঘাৎ স্বভাবমতন বাজী ধরে বসে আছে হারামীগুলো – তা হাশুর চিৎকারের মধ্যে ঐ পাঁচশো শুনেই বুঝতেই পারে জীবু ।

 

– হালার পুতেরা , আমারে ফালায়া থুইয়াই ভালা জমায়্যা বইসো দেহা যায় ! খাড়াও আইজ সব সুদে আসলে তুলতাছি আমি !

মুচকি হেসে আরো দ্রুত পদক্ষেপে বাকী পথটুকু পেরিয়ে চলে আসে জীবু ।

 

 

২ .
-এই ল বে । দেখ হালার কাউল্যা ,অহনো নয়টা বাজে নাই !জীবু আইয়া পড়ছে । দে আমার পাঁচশো ।

আগেথেকেই গাছতলায় বসে থাকা তিনজনের দলটার মাঝে জীবু এসে দাঁড়াতেই বলল তাদের মধ্য থেকে একজন ।

– দিতাছি । দিতাছি বে । বাজীর ট্যাকা কাউল্যা কুনুদিন মাইরা খায় নাই । আইজও তর মতন হাইস্যার টেকা এই কাউল্যায় খাইবো না ।

বিরসকন্ঠে কথাগুলো বলে জীবুর দিকে অভিযোগের দৃষ্টিতে তাকায় কালাম ওরফে কাউল্যা ওরফে কালু ।

– দেরীই যহন করতাছিলি তাইলে আর দশটা মিনিট দেরী কইরাই আইতি !

-আবে আমি কি জানি নি যে নয়টার আগে আইলে তুই পোড়াকপাইল্যা ইমুন ধরা খাবি !

বলে হেসে ফেলে জীবু ।

– তা হাচাই দোস্ত তর এত্তো দেরী অইলো ক্যান ? অন্য কুনুহানে গেছিলিনি আবার কাছারীর থিকা ?

এবার প্রশ্নটা করে হাশু ।

– হরে দোস্ত , তগোরে ঐদিন কইলাম না জেলখানায় একজনের লগে চিন পরিচিত অইছে । আবু সামাদ বাই । এই লাইনে ঘাঘু মাল । কাইলই হে জামিনে বাইর অইসে । আমারে ঠিকানা দিয়া কইছিল বাইর অয়াই দেহা করতে । তা আইজ দুইফরের পর পরে আমিও বাইর অয়া দেখলাম আতে সময় যহন আছে আর ঠিকানা যহন কাছারীর লগে লগেই – একবারে দেহাটা সাইরাই আহি । পরে আবার কুন জামেলায় ভুইলা যাই কেডায় জানে ।

– হ । হেইডা ভালা করছোস । তা কামের কতা কিছু অইছে নি ?

-তা তো অইছেই ! তয় ফাইনাল না কিছুই । তয় যা হুনলাম যুদি হাছা অয় আমাগো আর এইদিক উইদিক ছ্যাঁচড়ার মথন মাল দেওন লাগবো না । যা কারবার অই একজনের লগে ঠিকঠাক মথন করতে পারলেই লাল অয়া যামু রে দোস্ত !

– কি রহম মাল টানতে অইবো , কইসে কিছু ?

– হ । কইসে । যহন যেই জিনিসের চাইদা থাকবো তহনই অইডা জোগানের ব্যবস্হা থকতে অইব – এইডাই অইল মূল কতা । অষুধ থিকা শুরু কইরা মিশিন , বিচ্চি সবকিছুর ওয়াডার আহে বাইয়ের কাছে ।

– মিশিন ? কস কি ?

একটু যেন ভয় পায় কালাম মেশিন – বিচ্চি বা অস্ত্র – গুলির কথায় ।

– কি ভয় খাইলি মনে অয় বে । আবে নাচতে নাইমা ঘুমটা টানলে অইব ? আর কত এই ছেচড়ামী করবি বে ?

– হ । জীবু ঠিকই কইছে । মারলে অহন থে বড় দান । নাইলে নাই । আর এমতেই যহন ঠোলাগো খাতায় নাম উইঠা গেছে অহন আর পিছায়া লাভ নাই ।

– অহন এই কামের প্যাঁচাল বাদ দে তো তরা । হালার পাক্কা পাঁচদিন রে বাইর অইলাম । গলামলা সব হুগায়া কাট অয়া গেছে ।তার উপরে তগো কল্কির গন্দ হেই আদা মাইল দূর থন হুঙতে হুংতে আইছি । হালার কইলজাডা পুরা আউলা পাথাইলা লাগতাছে । ও হড়িয়া দাদা , তা আছ কেমুন গো তুমি ! দেও তুমার পেসাদ দেও আগে ইকটু । কইলজাডা জুড়াই ।

ওদের মধ্যে পোশাক আশাক ,বয়স ইত্যাদি সবদিক থেকে আলাদা যে লোকটি তার দিকে তাকিয়ে শেষের কথাগুলো বলে জীবু ।

হাড়িয়া নামের ছোটখাটো গড়নের ন্যাড়া  মাথা লোকটাকে দেখে তার বয়স অনুমান করার কোন উপায় নেই । এমনকি সে নিজেও তার বয়স সমন্ধে সঠিক কোন ধারণা রাখে না । জিজ্ঞেস করলে স্বভাবসুলভ ভাবালু হাসি দিয়ে জানায় ,সেই দেশবিভাগের সময় নাকি তার বাবামার সাথে ওপাড়ে যাবার সময় হারিয়ে গিয়েছিল । তাই সে রয়ে গেছে এদেশেই । নানানভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে করতে শেষে এসে থিতু হয়েছে এই শ্মশানে । কাজ নিয়েছে একাধারে ডোম চাড়াল যাবতীয় সবকিছুর । বলতে গেলে এখানকার সর্বসরবা হাড়িয়া থাকেই এই পাশেই মাটির ছোট্ট একটা ঘরে ।

সত্য বয়স কত হবে – তা আন্দাজ করতে না পারলেও ওরা ঠিক এরকমই দেখে আসছে আসছে নিজেদের ছোটবেলা থেকে । সেই সারাবছর খালি গায়ে হাফপ্যান্ট পরা মানুষটাকে একটু শুধু অন্যরকম লাগে যখন তীব্র শীত পড়ে তখন মাঝেমধ্যে হাতকাটা নিজের বয়েসী পুরনো একটা শোয়েটার যখন গায়ে চাপায় তখন । আসলে নইলে গায়ে পোশাক চাপানোর কোন দরকার তার পড়ে না । নিজের বানানো চোলাই মদেই তার শরীরে আবরণ হয়ে থাকে । এই হাড়ির দেশি মদের কারণেই তার নাম হয়ে গেছে হাড়িয়া ।
– আমি ভালা আছি গো দাদা । দিতাছি । তুমার লেগা এক্কেবারে নয়া পেসাদ চড়াইতাছি রখো ইকটু ।

– আঈচ্ছা তুমি তুমার ইস্পিশাল জিনিস বানাও দাদা । পয়লা চোটেই যাতে কইলজা ঠান্ডা অয়া যায় !

বলতে বলতে নিজের গায়ের শার্টটা খুলে রেখে আরাম করে বসে জীবু । হেঁটে আসতে আসতে প্রচন্ড গরমে ভিজে একেবারে জবজবে হয়ে গেছে শার্টটা ।
( ক্রমশঃ )

 

 

৩৮৫ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
সর্বমোট পোস্ট: ৪০ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ২৮৩ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-১১-২৭ ০৭:০৩:১৭ মিনিটে
banner

৮ টি মন্তব্য

  1. আমির হোসেন মন্তব্যে বলেছেন:

    ভাল লিখছেন। সঙ্গে আছি।

  2. আহসান হাবীব সুমন মন্তব্যে বলেছেন:

    ধন্যবাদ আমির হোসেন ভাই ।

  3. আরজু মন্তব্যে বলেছেন:

    সুন্দর গল্প।পড়তে খুব ভাল লেগেছে।আমিতো শশ্মানাটের বিবরন দেখে প্রথমে মনে করলাম ভূতের গল্প নাকি? যাই হোক চমৎকার গল্প। লিখতে থাক ক্রমাগত।ধন্যবাদ।

  4. আহসান হাবীব সুমন মন্তব্যে বলেছেন:

    না রে ভাই ! এটা ভূতের গল্প নয় । আমি ভূত খুব ভয় পাই । তাই ভূত ভদ্রলোকদের চেষ্টা করি সবসময় এড়িয়ে চলতে ।

    এটাকে বরং বলা যেতে পারে সমাজবিচ্যুত কিছু মানুষের গল্প ।

    অসংখ্য ধন্যবাদ আরজু তোমাকে ।

  5. এস এম আব্দুর রহমান মন্তব্যে বলেছেন:

    গল্প ভাল লাগর । পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায় রইলাম । শুভ কামনা ।

  6. আহসান হাবীব সুমন মন্তব্যে বলেছেন:

    ভাল লেগেছে জেনেছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি রহমান ভাই ।

    ইনশাল্লাহ আজ এবং আগামীকালই অবশিষ্ট অংশ দুটি দিয়ে দেব ।

    দোয়া করবেন ।

  7. কে এইচ মাহবুব মন্তব্যে বলেছেন:

    দারুণ লাগলো । আমার পাতায় আমন্ত্রণ।

  8. আহসান হাবীব সুমন মন্তব্যে বলেছেন:

    আমি সময় পেলেই যাচ্ছি মাহবুব ভাই !

    ভাল লাগা প্রকাশের জন্য আমার পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি ।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top