Today 14 Dec 2019
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

বাবার সিগারেট ছাড়ার গল্প

লিখেছেন: সুমাইয়া বরকতউল্লাহ্ | তারিখ: ০৩/০৯/২০১৩

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 670বার পড়া হয়েছে।

বাসায় বিরাট গণ্ডগোল!
রাত এগারোটা। মা ওয়াক ওয়াক, গগগ করতে করতে এক দৌড়ে এসে বেসিনে হাঁপিয়ে পড়লেন। আমরা দুই ভাই-বোন রিডিং রুমে পড়ছিলাম। দৌড়ে গেলাম। মা বকবক করে বাবাকে বকে যাচ্ছেন। অর্ধেক বকা দিতেই আবার গগগ ওয়াক থুঃ। ঘটনার কিছুই বুঝতে পারছি না আমরা।

মা বমি করে দিয়ে বেসিনে উপুড় হয়ে হাঁপাচ্ছেন। চোখ-মুখ বেয়ে পানি পড়ছে।
ভাইয়া মার মাথাটা একটু ধরতে গেলেন। কিন্তু মা বিছার মতো লাফিয়ে উঠে একটা ঝেংরা মেরে বললেন, ‘সর, সর, আমার সামনে থেকে, সর। ধরতে হবে না।’ ভাইয়া ভয়ে দুই পা সরে গিয়ে বলল, ‘আমি আবার কী করলাম? আমার সাথে এভাবে কথা বলছ কেন? কী হয়েছে তোমার এমন করছ যে?’
মা হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, ‘তোমার বাবা জোর করে আমার মুখের ভেতর সিকেরেটের ধুমা দিছে। ওয়াক থুঃ।’
ভাইয়া বলল, এ জন্য এমন করতে হবে নাকি তোমার?
মা বললেন, ‘এমন করতে হবে না মানে? ইন্দুর পচা গন্ধ। ওয়াক থুঃ।’

মা নিজে নিজেই বকবক করতে লাগলেন। ‘আর সম্ভব না। আমি আলাদা থাকব। যার ইমান আমল নেই, তার সাথে কীসের সংসার? একশ বার কিরা-কসম কেটে সিকারেট খাওয়া ছাড়ে; আবার একশবার সিকারেট ধরে। বিদ্যা নিয়ে কিরা, পশ্চিম দিকে ফিরে কিরা, কানে ধরে কিরা, আমার মাথায় ধরে পর্যন্ত কিরা কসম কেটেছে। কিরা-কসম কেটে সিকারেট ছেড়ে ধরে পান। কদিন বাদে দেখি, পান সিকারেট দুটোই সমানে খায়। লোকটার মনে আল্লা-খোদার ভয় নি আছে।’

বাবা খুব রাগী মানুষ হলেও মাঝে মধ্যে খুব দুষ্টুমি করে আমাদের সাথে। আমি ভয়ে ভয়ে বাবার ঘরে চুপি দিয়ে দেখি, বাবা সমানে সিগারেট টানছে শুয়ে শুয়ে। পায়ের উপর পা দোলাচ্ছে। আর মুখে মুচকি হাসি। হাসি দেখে সাহস করে গিয়ে বললাম, ‘এহ্ কিরা কেটে কেটে সিগারেট খাও আবার মাকেও খাওয়াও, নাহ্? আবার হাসে? এখন বকা খেতে মজা লাগে তোমার, হেহ্?’ এ কথা বলে এক দৌড়ে চলে এলাম রিডিং রুমে। ভাইয়া বলে, ‘তোর তো সাহস কম না! এখন না দুজনেই থাপ্পড় খামু।’ ভাইয়া ভয়ে জোরে জোরে পড়তে লাগল মাথা ঝাকিয়ে।
বাবা কিছুই বললেন না।

মা হনহন করে এসে বললেন, ‘এই লোকের সাথে থাকা সম্ভব না। ওই রুমে কেউ যাবি না। রুমে বিষ। আমি অন্যরুমে থাকব। মা বালিশ নিয়ে ধপ থপ করে অন্যরুমে গিয়ে ঠাস করে শুয়ে পড়লেন।
সব কিছু নীরব হয়ে গেল।

২.
দাদির ডাক পড়ল।
খোকা, ‘আমার ঘরে আসো।’ (বাবার ডাকনাম খোকা)।
বাবা সার্ট পরে কুলি করে দাদির সামনে গিয়ে কাচুমাচু হয়ে দাঁড়ালেন।
দাদি বললেন, ‘তুমি তিন দিনের মধ্যে সিগারেট খাওয়া ছাড়বে। এটা আমার নির্দেশ।’
বাবা কী যেন বলতে চাইলেন, দাদি বললেন, ‘কোনো কথা শুনতে চাই না আমি। যাও।’
বাবা মুখটা ইঁদুরের মুখের মতো চোখামোখা করে বেরিয়ে এসে চুপ করে শুয়ে রইলেন।

দাদি আবার ডাকলেন, ‘গালিব সুমাইয়া আমার কাছে আসো।’
আমরা দাদির পাশে গিয়ে গাল ফুলিয়ে বেজার মুখে দাঁড়ালাম। দাদি বললেন, ‘আজ সালাম দিতেও ভুলে গেছ তোমরা।’ এ কথা শুনে আমরা দুজনেই হাতে মুখে সমানে সালাম দিলাম। দাদি বললেন, ‘এটা সালাম নয়। সালাম দিতে হয় মন থেকে। তোমাদের মন ভালো নেই।’

কতক্ষণ চুপ থেকে দাদি বললেন, ‘মা-বাবার ঝগড়া দেখার ভাগ্য সব সন্তানের হয় না। তোমাদের হয়েছে। আজ বড় আনন্দের দিন। কোনো পড়া হবে না এখন। বই বন্ধ করে আনন্দ করো গিয়ে, যাও।’
আমরা পা টিপে দাদির ঘর খেকে এসে চুপ করে শুয়ে পড়লাম।

সকালবেলা ভাইয়া আমাকে বলে, ‘একটা চুপি দিয়ে দেখে আয়, আব্বু আর আম্মু এখন কী করছে. যা।’
আমি পা টিপে গিয়ে চুপি দিলাম। দেখি, ‘মা কফিতে টোস্ট ভিজিয়ে বাবার মুখে দিচ্ছে। আর হাসি হাসি মুখে কথা বলছে। দেখে রাগের চোটে আমি ফোরে একটা উষ্ঠা মেরে চলে এলাম।

ভাইয়া বলে, ‘দেখছস, রাতে কেমন ঝগড়া করলো। এখন কেমন খাতির? আমাকে কেমন একটা বকা দিয়েছিল মনে নেই? আর এখন? আয় আমরা আবাবু-আম্মুর সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেই, হে?
আচ্ছা।
আমরা গাল ফুলিয়ে বসে রইলাম।
মা আমাদের জন্য কফি আর টোস্ট নিয়ে এসে পাশে বসলেন। ভাইয়া চেয়ার ঘুরিয়ে একদিকে আর আমিও মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে ফিরে বসে রইলাম। রাগে আমাদের শরীর কাঁপছে।
আমাদের ভাব দেখে মা বললেন, ‘শোনো, রাগ করে তিন ঘণ্টার বেশি কথা না বললে ভীষণ পাপ হয়, নইলে আমি বুঝি এ ভদ্রলোকের সাথে কথা বলি? জীবনেও না।’
মা আমাদের রাগ দেখে হাসতে হাসতে ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে গেলেন।

৩.
বাবা অফিস থেকে বাসায় দেরি করে এলেন। মা বললেন, এতো দেরি কেন আপনার? বাবা বলে, ‘নিউ মার্কেট গিয়েছিলাম।’
‘নিউ মার্কেটে কেনো?’
বাবা ব্রিফকেস থেকে একে একে বের করতে লাগল ইয়া বড় বড় সিগারেট। দেশ-বিদেশের যত পদের সিগারেট আছে সব কিনে এনেছেন। কোনটা মশলার তৈরি। কোনটা চিকন, কোনটা আবার ছয় ইঞ্চির মতো লম্বা, কোনটা মোটা সিগারেট। আমরা অবাক।
বাবা বললেন, ‘জীবনের শেষ টানা টানবো এই তিন দিন। আমাকে কিছু বলতে পারবে না তোমরা। মা তিন দিন সময় দিয়েছেন। এটা আমি ষোলোআনা কাজে লাগাবো। এমন খাওয়া খাবো, যাতে কোনদিন আফছুছ করে বলতে না হয়, এই ব্র্যাণ্ডের সিগারেটটা তো খাওয়া হয়নি আমার!’
বাবা অনেক রাত পর্যন্ত বারান্দায় বসে এই সিগারেট টানেন।

আজ তিনদিনের শেষ দিন। এমনভাবে সিগারেট টানলেন যে, ঠিক রাত বারোটাও বাজল, বাবা সিগারেটে শেষ টান দিলেন।
বাবা ঝিমাতে ঝিমাতে ঘরে এসে বললেন, ‘তোমরা আমার পাশে এসে বসো। আজকে একটা ভাল সিদ্ধান্ত নেবো আমি।’
আমরা হাসি হাসি ভাব নিয়ে বাবার দুপাশে গিয়ে লাফিয়ে বসলাম। মা-ও এএসে বসলেন।

বাবা খুব বিনয়ের সাথে বললেন, ‘তোমাদের সবার সামনে শপথ করে বলছি, আমি আর ধূমপান করবো না, আজ আমি মুক্ত, আমি পবিত্র ।’
দিলাম জোরে হাততালি।

৮১৪ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
আমি সুমাইয়া বরকতউল্লাহ্। ছাত্রী। লেখালেখি করা আমার ভীষণ পছন্দ। আমি ছড়া, গল্প লিখি। পত্রিকায় নিয়মিত লিখি। ব্লগ আমার কাছে একটা বিশাল লাইব্রেরির মতো। অনেক কিছুই শেখা যায় এখান থেকে। ব্লগ পড়তে আমার খুব ভাল লাগে। আমি পড়ালেখার ফাঁকে ব্লগ পড়ি আর মাঝেমধ্যে লিখি। আমি আশা করি যারা ব্লগে লিখেন তাঁদের কাছ থেকে আমি অনেক কিছু শিখতে পারবো। আমার প্রকাশিত বইঃ ৩টি। নামঃ ১) ছোট আপুর বিয়ে। সাহিত্যকাল প্রকাশনী থেকে ২০১২ সালে প্রকাশিত। ২) দুই বন্ধু ও মেকাও পাখির গল্প এবং ৩) ভূতের পেটে টুনির বাসা। এ দুটি প্রকাশিত হয়েছে ২০১৩ সালে সাহস পাবলিকেশান্স থেকে। শিশু অধিকার রক্ষায় বিশেষ অবদান রাখার স্বীকৃতি স্বরূপ (প্রিণ্ট মিডিয়া) ৪ বার জাতিসংঘ-ইউনিসেফ-এর মীনা মিডিয়া এ্যাওয়ার্ডসহ আরো কিছু পুরষ্কার পেয়েছি। প্রাপ্ত পুরস্কার ১. জাতিসংঘ শিশুতহবিল (ইউনিসেফ)-এর ‘মীনা মিডিয়া এ্যাওয়ার্ড’ ২০১৩ (১ম পুরস্কার) ২. জাতিসংঘ শিশুতহবিল (ইউনিসেফ)-এর ‘মীনা মিডিয়া এ্যাওয়ার্ড’ লাভ ২০০৮ (২য় পুরস্কার) ৩. জাতিসংঘ শিশুতহবিল (ইউনিসেফ)-এর ‘মীনা মিডিয়া এ্যাওয়ার্ড’ লাভ ২০০৯ (২য় পুরস্কার) ৪. জাতিসংঘ শিশুতহবিল (ইউনিসেফ)-এর ‘মীনা মিডিয়া এ্যাওয়ার্ড’ লাভ ২০১০ (২য় পুরস্কার) ৫. ’ডানো ভাইটা-কিডস’ মাসিক সাতরং’-ব্র্যাকগল্পলেখা প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন পুরস্কার (২০০৯) ৬. ঐতিহ্য গোল্লাছুট প্রথম আলো গল্প লেখা প্রতিযোগিতা ২০০৭-এ অন্যতম সেরা গল্পকার পুরস্কার। ৭. প্রথম আলোর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলে আয়োজিত লেখা প্রতিযোগিতায় (২০০৭) অন্যতম সেরা লেখক পুরস্কার ৮. প্রথম আলোর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলে আয়োজিত লেখা প্রতিযোগিতায় (২০০৮) অন্যতম সেরা লেখক পুরস্কার ৯. ’চিলড্রেন্স ফিল্ম সোসাইটি-বগুড়া’ এর গল্পলেখা প্রতিযোগিতায় ২য় পুরস্কার (২০০৯) ১০. প্রথম আলোর ‘বদলের বয়ান’-এ লেখা প্রতিযোগিতায় (২০০৯) ২য় পুরস্কার ১১. আন্তর্জাতিক শিশু-কিশোর চলচ্চিত্র উৎসব ২০১০-এ গল্পলেখা পর্বে ‘অন্যতম সেরা গল্পকার’ পুরস্কার। ১২. কথাসাহিত্য কেন্দ্র পুরস্কার ২০১১ ঢাকা। ২য় পুরস্কার। ১৩. ঐতিহ্য গোল্লাছুট গল্পলেখা প্রতিযোগিতা-২০১২ অন্যতম সেরা গল্পকার পুরষ্কার
সর্বমোট পোস্ট: ১৭৯ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ৪১৩ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৫-৩০ ০৮:০৯:০৬ মিনিটে
banner

১০ টি মন্তব্য

  1. তুষার আহসান মন্তব্যে বলেছেন:

    গল্পটি নির্বাচিত হয়েছে দেখে আমি খুশি।

    ধূমপান,বিষপান।

    ভাল লাগল বলার কৌশল।

  2. আহমেদ ফয়েজ মন্তব্যে বলেছেন:

    অনেক সুন্দর একটি বিষয় নিয়ে লিখেছেন সুমাইয়া। ধন্যবাদ আপনার সরলতার জন্য। নিজের জীবনের কথা বলে অনেক বড় শিক্ষা দিলেন আপনি।

  3. সুমাইয়া বরকতউল্লাহ্ মন্তব্যে বলেছেন:

    আপনার কথায় আমি খুবই উৎসাহ পেলাম। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

  4. এ টি এম মোস্তফা কামাল মন্তব্যে বলেছেন:

    জীবনের গল্পের ভেতর দিয়ে জীবনমুখী শিক্ষার আভাস দিলেন। ভালো লাগলো।

  5. আলামগীর কবির মন্তব্যে বলেছেন:

    লেখালিখর শুরুর দিকে রবি ঠাকুরের লেখায় বঙ্মিমের প্রভাব ছিল। আপনার লেখায় এযুগের কোন লেখরে প্রভাব থাকতেই পারে। লিখে যান লেখার হাতটা বেশ ভাল। শুধু মাত্র এই যুগের বিখ্যাত লেখকের প্রভাব মুক্ত থাকলেই হবে।

  6. এম, এ, কাশেম মন্তব্যে বলেছেন:

    খুব ভাল লাগলো,
    আমি ও ছেড়েছি
    সকলের উচিৎ ধুমপান ছেড়ে দেয়া ।

    খুব কঠিন কিছু না
    শুধু দরকার নিজের কাছে নিজের অঙ্গিকার
    আর শক্ত মনোবল,

  7. আমির হোসেন মন্তব্যে বলেছেন:

    আপনার এই লেখাটা এবারের ঈদ সংখ্যার (ই-বুক)এর ৭৮ নং পৃষ্ঠায় প্রকাশ হয়েছে। ওখান থেকে পড়ে নিব।

  8. আমির হোসেন মন্তব্যে বলেছেন:

    আপনার বাবার সিগারেট খাওয়ার গল্পটি ই-বুকে পড়লাম। সহজ ভাষায় আপনার পরিবারে গল্পটি তুলে ধরলেন। খুব ভাল লাগল। আপনার গল্পের মাধ্যমে সবাইকে আহ্বান করব আসুন আমরা ধুমপান মুক্ত বাংলাদেশ গড়ি।

  9. সবুজ আহমেদ কক্স মন্তব্যে বলেছেন:

    খুবই ভাল লাগলো
    চমৎবকার লিখনী
    দেখা হোক বারবার পড়ে

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top