Today 23 Sep 2019
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

ভারতের রূপকুন্ডের ‘কঙ্কাল হ্রদ’ ও লোমহর্ষক এক রহস্য!

লিখেছেন: মোস্তাক চৌধুরী | তারিখ: ২৬/১০/২০১৩

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 1009বার পড়া হয়েছে।

7

রূপকুণ্ডু ।

এটি একটি হিমবাহ হ্রদ। এটির অবস্থান ভারতের উত্তরখণ্ডে। হিমালয় পর্বতমালায় অবস্থিত সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৬৪৯৯ ফুট উপরে অবস্থিত।

এই জনবিরল অঞ্চল কেন আলোচনার শীর্ষে চলে এল তা এক করুণ কাহিনী। এখানে ৫০০এর মত মানুষের কংকাল পাওয়া গিয়েছে। এই কারনে রূপকুণ্ডু হ্রদের নাম হয়ে গেছে কংকাল হ্রদ।

4

১৯৪২ সালে নন্দা দেবী রিসার্ভ পার্কের রেঞ্জার এইচ কে মাধওয়াল এই কঙ্কালগুলো প্রথম আবিষ্কার করেন। যদিও অনেকে বলেন উনবিংশ শতাব্দী থেকে মানুষ জানত এই কংকালগুলোর কথা।

কারা এই হতভাগ্যরা? কিভাবে তারা মারা গেল? কবে মারা গেল?

বছরের পর বছর মানুষ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে।

5

প্রথমে মনে করা হয়েছিল এগুলো জাপানী সৈন্যদের কংকাল যারা ঐ অঞ্চলে অনুপ্রবেশ করেছিল কিন্তু ঠাণ্ডাতে মারা যায়। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। স্থানীয় ব্রিটিশ প্রশাসন বিষয়টি তদন্ত করতে গিয়ে দেখল কংকালগুলো অন্তত এক শতাব্দী প্রাচীন।

অনেকে ভাবলেন এটা জম্মু কাশ্মীরের রাজা জেনারেল জরাইয়ার সিং য়ের সেনাদের যারা বালিতস্থান আক্রমণের সময় হারিয়ে গিয়েছিল।

১৯৫৬ সালে ভারতীয় সরকার সেখানে সার্ভে টিম পাঠায়। তারা সেখান থেকে স্যাম্পল সংগ্রহ করে রেডিও কার্বন ডেটিং করে জানা গেল এগুলো অন্তত ১২ থেকে ১৫ শতাব্দীতে হবে। তখন অনেকে ধারণা করলেন এরা মোহাম্মদ বিন তুঘলকের সেনাবাহিনী হবে যারা তিব্বত দখল করতে গিয়ে ধ্বংস হয়ে যায়। তবে ১৯৫৬ সালের পদ্ধতি ছিল অনেক ত্রুটিপূর্ণ।

2

অনেকে ধারণা করলেন এরা কোন মহামারীর শিকার হয়েছে।

এই অঞ্চলের নিচের জনপদ গুলোতে লোককাহিনী প্রচলিত আছে যে, প্রাচীনকালে কৌনুজের রাজা জাসয়াল এখানে আসেন নন্দ দেবীর উপাসনা করতে। কিন্তু সাথে নিয়ে আসেন বাইজী। এতে এই স্থানের পবিত্রতা নষ্ট হয়। তাদের উপর অভিশাপ বর্ষিত হয়। তাদের উপর শিলাবৃষ্টি হয়। এবং তারা হ্রদের ভিতর নিক্ষিপ্ত হয়।

অধিকাংশ মানুষ লোককাহিনীকে গালগল্প বলে ধরে নিলেও এর ভিতর ঐতিহাসিক সত্য লুকিয়ে থাকে।

1

(একটা উদাহরণ দেই, ইন্দোনেশিয়ার ছোট্ট দ্বীপ ফ্লোরস (Flores)। এখানকার অধিবাসীরা অন্যান্য সব জাতির মতই কাজ করে, খায় দায়, ফুর্তি করে আর অবসর সময়ে গল্পগুজব করে। এখানকার বুড়োবুড়িরা আমাদের দাদী-নানীদের মতই ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ সাজিয়ে বসে নাতি-নাতনীদের কাছে – হাজার বছরের মুখে মুখে চলে আসা উপকথাগুলোকে বলে যায় তাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে। কিন্তু এদের ঠাকুরমার ঝুলিগুলো যেন কেমনতর অদ্ভুত! লালকমল-নীলকমল আর দেও-দৈত্য নেই ওতে, আছে কতকগুলো ক্ষুদে বামনদের গল্প। মাত্র এক মিটারের মত লম্বা বেটে লিলিপুটের মত একধরনের মানুষ অনেক অনেকদিন আগে তাদেরই আশে পাশে নাকি বাস করতো, যা সামনে পেতো তাই মুখে দিতো, তাদের ফসল নষ্ট করতো, নিজেদের মধ্যে ফিস ফিস করে কথা বলতো আর যা শুনতো তাই নাকি নকল করার চেষ্টা করতো। এমনি একজন ক্ষুদে বামনের নাম ছিল এবু গোগো (এবু মানে নানী আর গোগো মানে এমন কেউ যে যা সামনে পায় তাই খায়), তাকে খেতে দিলে সে খাওয়ার বাসনটা পর্যন্ত খেয়ে ফেলতো, সুযোগ পেলে নাকি মানুষের মাংসও খেতে দ্বিধা করতো না।

6

দ্বীপবাসীদের বলা গল্পগুলো শুনলে মনে হয় যেনো এই সেদিনই তারা সবাই একসাথে বসবাস করতো। নিছক রূপকথা ভেবেই বেঁটে-বাটুলদের গল্পগুলো সবাই উড়িয়ে দিয়েছিলো এতদিন। অবাক এক কান্ড ঘটলো ২০০৩ সালের অক্টোবর মাসে। বিজ্ঞানীরা ফ্লোরস দ্বীপেরই মাটি খুড়ে পেলেন এক মিটার লম্বা এক মানুষের ফসিল-কঙ্কাল; প্রথমে সবাই ভেবেছিলো হয়তো কোন বাচ্চার ফসিল হবে বুঝি এটা। কিন্তু তারপর ঠিক ওটারই কাছাকাছি জায়গায়ই পাওয়া গেলো আরও ছয়টি একই রকমের অর্ধ-ফসিলের কঙ্কাল। বিজ্ঞানীরা আরও পরীক্ষা করে বুঝলেন এগুলো আসলে পূর্ণাংগ মানুষেরই কঙ্কাল, কার্বন ডেটিং থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী জানা গেলো, মানুষের এই নব্য আবিষ্কৃত প্রজাতিটি মাত্র ১২,০০০-১৪,০০০ বছর আগেই এই দ্বীপটিতে বসবাস করতো। ১২,০০০ বছর আগে এই দ্বীপে এক ভয়াবহ অগ্নুৎপাত ঘটে, বিজ্ঞানীরা মনে করছেন হয়তো দ্বীপের অন্যান্য অনেক প্রাণীর সাথে এরাও সে সময়ে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিলো। সূত্রঃ বিবর্তনের পথ ধরে – বন্যা আহমেদ)

 

যাই হোক ২০০৩ সালে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলের উদ্যোগে একদল গবেষক এই রহস্য ভাঙ্গার উদ্যোগ নেন। এর নেতৃত্ব দেন জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ব বিভাগের প্রফেসর ডঃ উইলিয়াম সাক্স। এই দলটিকে ভারতীয় বিজ্ঞানীরাও ছিলেন। তারা নানা হাড়গোড়ের নমুনা সংগ্রহ করেন। এই দলটি একটি বিশাল সাফল্য লাভ করে যখন তারা একটি অক্ষত দেহ উদ্ধার করে। হিমালয়ের বরফশীতল তাপমাত্রা এই দেহটিকে সংরক্ষণ করে রেখেছিল। এতে তারা ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করতে সুবিধা পেলেন।

3

ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা কংকালের খুলিতে অগভীর আঘাতের চিহ্ন পেলেন। পুনের ডেকান কলেজের প্রফেসর ডা সুভাষের মতে এই অগভীর আঘাতের কারণ কোন তুষারধ্বস নয় বরং ক্রিকেটবলের মত ছোট কঠিন বস্তুর আঘাতের ফলাফল। একই সাথে কয়েকশত মানুষ মাথায় একই রকম আঘাত পেল এবং মারা গেল এটা নিশ্চয়ই উপর থেকে আঘাত করেছে। তাদের ধারণা এটা শিলাবৃষ্টি হবে।

 

প্রফেসর ডঃ উইলিয়াম সাক্স স্থানীয় একটি পালাগানের কথা স্মরণ করেন সেখানে বলা হয়েছে রুষ্ট দেবী পাপিষ্ঠদের উপর এমন শিলা নিক্ষেপ করেন যা পাথরের থেকেও ভারী।

 

এছাড়াও বিজ্ঞানীরা কাপড়, জুতা, কাঁচের চুড়ি, বাঁশের লাঠি উদ্ধার করেন। এ থেকে বোঝা যায় তারা তীর্থযাত্রী ছিল। সেখানে এখনও বরফের নিচে ৬০০ দেহ চাপা পরে থাকতে পারে।

 

এই নমুনাগুলো ব্রিটেনের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের adiocarbon Accelerator Unit এ পাঠানো হয়। সেখানকার গবেষকরা জানান এই নমুনাগুলো ৮৫০ সালের দিকের। যা ১৯৫৬ সালের রিপোর্টের আরও ৩০০ বছর আগে। হায়দারাবাদের Centre for Cellular and Molecular Biology র বিজ্ঞানীরা লাশের হাড়ের নমুনা থেকে বের করলেন ৩ টি নমুনাতে এমন জীন পাওয়া গিয়েছে যা মহারাষ্ট্র ছাড়া বিশ্বের আর কোথাকার মানুষের ভিতরে খুঁজে পাওয়া যাবে না। এখানে আরও কিছু মানুষের চেহারা হিমালয়ের আশেপাশে মঙ্গোলীয় জাতিগোষ্ঠীর। অতএব এটা বলা স্বাভাবিক যে তীর্থযাত্রীরা স্থানীয়দের কুলি হিসেবে নিয়োগ করেছিল। রূপকুণ্ডু থেকে স্থানীয় মানববসতির দূরত্ব ৩৫ কিমি। তাই বাইরের লোকেরা স্থানিয়দের সহায়তা ছাড়া সেখানে যেতে পারবে না এটাই স্বাভাবিক।

8

এটা ধারণা করা যায় আজ থেকে ১৩০০ বছর আগে এক হাজারের মত লোক হিমালয়ের উপরে অজানা পরিবেশে চলছিল। তাদের সাথে কুলি হিসেবে ছিল স্থানীয়রা। সেখানে পুরুষ, মহিলা এবং শিশু ছিল। হঠাৎ শিলাবৃষ্টি শুরু হল। পালানোর কোন উপায় ছিল না। শিলার আঘাতে একে একে মৃত্যুমুখে পতিত হল সবাই। কিছুক্ষণের ভিতর রূপকুণ্ডু হয়ে গেল এক মৃত্যুপুরী। তাদের দেহ হ্রদের উপর পতিত হল। কিছু বরফ চাপা পড়ল। দিন পেরিয়ে মাস হল, মাস পেরিয়ে বছর হল, তারপর শতাব্দীও কেটে গেল। কিন্তু রূপকুণ্ডুর ভয়াবহ কথা মানুষ ভুলে গেল। এই লোকগুলোর পরিবার এবং প্রিয়জন ছিল। তারা কি জেনেছে তাদের স্বজনদের করুণ পরিণতি?

১,১৭৫ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
লেখালেখি করতে ভালবাসি। মাঝে মাঝে পত্রপত্রিকাতে কিছু লেখার চেষ্টা করি। আকাশ ছোঁয়া স্বপ্ন দেখার ভরসা পাই না। আমার বন্ধুও কম। কিন্তু যারা আছে তাদের জন্য সবকিছু করার মানসিকতা আমার আছে।
সর্বমোট পোস্ট: ৩৩ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ২ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৫-১৯ ১২:৫৮:৫৪ মিনিটে
banner

৭ টি মন্তব্য

  1. তাপসকিরণ রায় মন্তব্যে বলেছেন:

    আপনার লেখাটির নতুনত্ব পেলাম–ছবিগুলি বেশ স্পষ্টতা পেয়েছে।ভাষা বেশ সচ্ছন্দ।

  2. শাহ্‌ আলম শেখ শান্ত মন্তব্যে বলেছেন:

    অনেক কিছু অবগত হলাম ।

  3. জিয়াউল হক মন্তব্যে বলেছেন:

    অজানা বিষয়টি জেনে ভাল লেগেছে।

  4. আমির হোসেন মন্তব্যে বলেছেন:

    ভয়ে গা ছম ছম করছে।

  5. আরজু মন্তব্যে বলেছেন:

    অদ্ভুত এক হ্রদের রোমাঞ্চকর ইতিহাস পড়লাম।ভাল রচনার জন্য ধন্যবাদ লেখককে।

  6. এই মেঘ এই রোদ্দুর মন্তব্যে বলেছেন:

    বাপরে কি ভয়ংকর
    শুনলেই গা চমচন করে

    কত অজানাকে এখনো হয়নি জানা।

  7. দীপঙ্কর বেরা মন্তব্যে বলেছেন:

    দারুন তথ্য
    বেশ ।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top