Today 22 Mar 2019
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

ভূটান…. দ্রুক ইয়ুল বা থান্ডার ড্রাগন এর দেশ ( দ্বিতীয় পর্ব )

লিখেছেন: রুবাইয়া নাসরীন মিলি | তারিখ: ২৮/১০/২০১৪

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 796বার পড়া হয়েছে।

চারপাশে উচু পাহাড়ের সারি আর তার মাঝে আঁকাবাকা পাহাড় কাটা পথ। মাঝেমাঝে মনে হয় ঘন কুয়াশা পরেছে ।ড্রাইভার ভাই কে গিজ্ঞেস করলাম বছরের এই সময়টায় কতক্ষণ কুয়াশা থাকে ? সে অবাক হয়ে বলল কুয়াশা মানে ফগ পেলেন কই এগুলো তো মেঘ । থোকা থোকা মেঘমালা রাস্তায় এসে জমা হচ্ছিল ,অনেক কাছে বলে কুয়াশা বলে ভ্রম হয় আবার বাঁক ঘুরে অন্য পাশে চলে গেলেই বোঝা যায় আসলে ওগুলো সব মেঘমালাই ।

Vutan

 

অনেকক্ষন হল আমরা পথ চলছি , দেড় দুই ঘন্টা হবে কিন্তু একটা জনমানবের চিহ্ন দেখতে পেলাম না । আমি বাংলাদেশি তার উপর বাস করি ঢাকাতে এমন বিরান দেশ আমার জানি একটু একটু কেমন কেমন লাগছিল ।যদিও আমি ভিড়ভাট্টা পছন্দ করি না তাই বলে এত সুনসান !! সবাই একদম চুপচাপ ,মনোযোগ দিয়ে দেখছে পাহাড়ি প্রকৃতি । হঠাৎ মনে হল সেই কখন চিপস খেয়েছি আর এতক্ষণ ধরে না খাওয়া । কি করা যায় ? এমন সময় নাসরিন আপা তার ব্যাগ খুলে বের করলেন মজার মজার হোম মেড কেক আর নাস্তা ।আহ কি সুন্দর বুদ্ধি । পেট ভরেই খেলাম সবাই । এখন শুধু দরকার এক কাপ চা বা কফি । হঠাৎ ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে দিল ,সামনে একটা ছোট জটলা ।আমরা ভাবলাম বোধহয় অ্যাকসিডেন্ট । মানুষ দেখে ভীষণ ভাল লাগলেও পরক্ষনেই সব ভাল লাগা হুশ্ করে উড়ে গেল । সামনে ল্যান্ড স্লাইড বা ভূমিধ্বস । রাস্তার উপর বড় বড় পাথরের চাই পরে আছে । প্রবল বর্ষণে ভূমিধ্বস হয়েছে। আমি এর আগে কখনও পাহাড়ি ভূমিধ্বস দেখি নাই। আমাদের দেশে  নিউজ পেপার বা টিভি তে দেখি টিলা ধ্বস । এত্ত বড় বড় পাথরের চাই আমি দেখি নাই ।

পাহাড় ধ্বস

পাহাড় ধ্বস

সেনা বাহিনীর লোকজন দেখলাম রাস্তা পরিস্কার করছে আর পাশে রাস্তার ধারে একটা দুমড়ানো জীপ । ভাঙ্গা খেলনার মত ঢালে ঝুলে আছে । যা বুঝার বুঝে নিলাম ।ওদিকে পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে থোকা থোকা মেঘ জমে আছে ।   ড্রাইভার বলল শক্ত করে বসে থাক আমি একটানে এই পথটুকু পার হব।কেয়া আপুকে দেখলাম মেয়েকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বসলেন ,ওরা সামনের সিটে বসেছিল ।সবার মুখ কাল দেখে আমারও ভয় ভয় করতে লাগল ।বাসার সবার কথা খুব মনে পড়ছিল ।কয়েক মুহূর্তেই ভাবলাম যদি পরিনতি হয় ওই জীপ এর আরোহীদের মত কিভাবে বাসার সবাই জানবে ,কেমন হবে ওদের প্রতিক্রিয়া । থেমে থেমে তখনও পাথর গড়াচ্ছিল । ড্রাইভার একটানে হুশ্ করে পার হয়ে  গেল পথটুকু আর আমরাও হাপ ছেড়ে বাঁচলাম।

 

 

DSC00414

 

 

মিনিট পাঁচেক এর মধ্যেই পৌঁছে গেলাম এক গ্রামে।কেতাবি ভাষায় একেই বলে হ্যামলেট , মাত্র কয়েক ঘর বসতি আর রাস্তার পাশে এক চমৎকার চায়ের ক্যান্টিন । অবাক চোখে এক বয়স্ক ভুটানি নারী আমাদের দেখছিল ।

 

DSC00413

 

 

চা পানের জন্য গাড়ি থেকে নামতেই হু হু করে শীতে কাঁপতে লাগলাম । যদিও সময়টা শীতকাল না তারপরও বৃষ্টির কারনে ঠাণ্ডা বেশ ভালই পড়েছে । ক্যান্টিনের সামনের রাস্তায় মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছিল ,আমি আর সফেন পা দিয়ে লাথি মারার চেস্টা করছিলাম আর পা ভিজে যাচ্ছিল  । একটু আগের ভয়ডর সব নিমেষে উধাও। কি যে ভাল লাগছিল বলে বুঝাতে পারব না । কেয়াপুর তাড়া খেয়ে গাড়িতে উঠে বসলাম ,আবার যাত্রা শুরু ।   পাহাড়ে সন্ধ্যা নামে ঝুপ করে । হঠাৎ করেই মনে হয় দিনের আলো নিভে গেল । তারপর আবার সুনসান পাহাড়ি রাস্তায় পথ চলা। এবার চারপাশটা অন্ধকার ।শুধু গাড়ির হেডলাইটের আলো দেখা যাচ্ছিল ।গাড়ির কাঁচ একটু নামালেই শোনা যাচ্ছিলো পোকার একটানা ডাক ।   DSC00412

 

 

 

অনেকক্ষণ থেকে আমার কানে একটা ব্যাথা অনুভব করছিলাম ।মনে হচ্ছিল চোখা কিছু দিয়ে কেউ কানে খোঁচা দিচ্ছে কিন্তু ভয়ে বলি নাই । হঠাৎ জেসমিন আপা বললেন উনার কান খুব ব্যাথা করছে তখন আমিও সাহস করে বলেই ফেললাম আমারও । আসলে এটা উচ্চতার কারনে হচ্ছিল । চলতে চলতে সহসাই দেখি দূরে আলো ঝলমলে কি যেন । একেবারে রূপকথার পরীর দেশের মত । অমন নির্জন পাহাড়ে হঠাৎ আলোর রেখা । ড্রাইভার বলল ওগুলো ছোট ছোট বসতি কিন্তু সাধারন মানুষের না জল বিদ্যুৎ প্রকল্পের ।তাই এত আলোর খেলা।বেশ লাগছিল দেখতে । থিম্ফু পর্যন্ত এমন তিন চারটা প্রকল্প পড়ল পথে। শহরে পৌঁছার আগে আরও একবার একটা দোকানে থেমে কিছু কিনে নিলাম খাবার জন্য । এরপর রাত প্রায় সাড়ে এগারটার দিকে পৌঁছলাম নরজিন লাম এ । এসে দেখি আরেক গাড়িতে যে বাংলাদেশী পরিবারটি ছিল তারাও হাজির । এরপর ড্রাইভার ই আমাদের সবাইকে নিয়ে গেল হোটেল জি জাঙ এ । ঢাকা থেকেই এ হোটেলটি রেফার করা হয়েছিল যদিও এটা অফিসিয়াল ট্যুর ছিল না। মাঝারি মানের বাজেট হোটেল আর বেশ চমৎকার ব্যবহার । আপুরা অনুরোধ করে সেলিম ভাই আর তার বউকে অল্প দামে একটা স্যুইট ঠিক করে দিলেন । আন্তজাতিক  সংস্থায় কাজ করলে দেখা  যায় সব জায়গায় একটু কনসেশন  মিলে কারন ওই সংস্থাটি  যদি সে দেশেও কাজ করে থাকে তবে পরে আরও গেস্ট পাওয়া যায় ।

10614355_10204841431697882_7778373978979291574_n

 

যাক রুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে রাতে খেতে নামলাম । দেখি সেই তিন জনের দলটি আগেই নেমে এসেছে । এই হোটেল এ মাছ,মাংস ,ডিম পাওয়া যায় না । বৌদ্ধ ধরমালম্বি অনেকেই মাছ মাংস খায় কিন্তু এরা একদম অহিংস নীতিতে বিশ্বাসী । কি আর করা  ভাবলাম এত রাতে আর কই যাব কাল না হয় অন্য হোটেলে খাওয়া যাবে । কিন্তু খেতে বসে সবাই মুগ্ধ হয়ে গেলাম ।অনেক মজার খাবার । ওরা অনেক খাবারেই পনির ব্যবহার করে। ইয়াক মানে চমরী গাই এর দুধের পনির । সেদিন ভাত সব্জি আর পালক পনির দিয়ে রাতের খাবার সারলাম ।পরবর্তীতে সেই কেওয়া দাসি/দাতসি হয়ে উঠেছিলো আমাদের কমন আর প্রিয় আইটেম। খাওয়া সেরেই আমরা হোটেলের মালিকের সাথে কথা বললাম পরেরদিনের বেড়ানোর প্লান নিয়ে ।

 

10687206_10204841431657881_7813375965113451792_n

 

 

আমি আগেই নেট থেকে আর শায়লা আপু যে কিনা মাত্র ভূটান সফর করে গেলেন তার কাছ থেকে তথ্য নিয়ে ট্যুর প্ল্যান করে নিয়ে এসেছি। উনি আমাদের পরের দিন  সারাদিনের জন্য গাড়ি ঠিক করে দিলেন । অপর দলটিও আমাদের ট্যুর প্ল্যান দেখেই বেড়ানোর জায়গা ঠিক করে নিলেন । সেলিম ভাই ভদ্রলোক বেশ হাসিখুসি মানুষ ।উনার বউটা একটু কম কথা বলেন কিন্তু ভারি মিস্টি দেখতে ।অল্প সল্প আলাপে জানলাম  উনি ইডেন এ পড়েন আর বর নারায়ণগঞ্জের ব্যাবসায়ি । সব কিছু ঠিকঠাক  করে রুমে গিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম ।সত্যি সবাই খুব ক্লান্ত ছিলাম ,প্রায় দুই দিনের ধকল । পরের দিন সকাল সকাল রেডি হয়ে একবারে নাস্তা খাওয়ার জন্য নামলাম । গরম গরম পনির পরোটা আর একটা সবজী । আবার নাস্তার  রুমে এসে সেই দলটি দেখলাম নাস্তা খাচ্ছে । আপু কথায় কথায় জানতে পারলেন সেলিম ভাই নারায়ণগঞ্জ এর ব্যাবসায়ি আর উনার বউ ইডেন এ মাস্টার্স এ পড়েন । সাথের ভদ্রলোক উনার বন্ধু ।  যাক সে কথা গাড়ি রেডি ছিল ,আমাদের ড্রাইভার কাম গাইড হল মিঃ লেত্তঠো । থিম্ফু তে আমরা প্রথমেই গেলাম রাজার দাদী যে প্রাসাদে থাকেন সেখানে । কি সুন্দর চারপাশটা ।ভিতরে প্রবেশের সুযোগ না থাকলেও গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুললাম ।চারিদিকে স্কচ পাইন মানে ক্রিসমাস ট্রি , ব্লু পাইন আর ওক গাছের  সারি। সেখান থেকে গেলাম ওয়াং ছু বা রাইদাক নদীর ধারে ।ভুটানি ভাষায় ছু মানে নদী । ওয়াং ছু কে আবার থিম্ফু ছু নামেও ডাকা হয়। এটা একটা ট্রান্সবাউন্ডারি নদী ।

DSC00482

 

 

 

হিমালয়ে এর উৎপত্তি  ভুটানে প্রবেশ করা এই ওয়াং ছু ভূটান ছাড়াও ভারত আর বাংলাদেশে প্রবাহিত হয়েছে। বাংলাদেশে এসে হয়ে  গেছে ব্রহ্মপুত্র নদ। DSC00484

এটা ভাবতেই আমার কেমন জানি লাগছিল ।একটা নদীর কতই না রূপ । এখানে কেমন খল বলিয়ে চলছে কিন্তু বেশি প্রশস্ত না আবার আমাদের দেশে কত প্রশস্ত কিন্তু এমন উত্তালতা নেই ।আমরা নদীর তীরে পাথরের উপর বসে ছবি তুললাম । পানির স্রোত এত তীব্র আর এমন ভাবে আছড়ে পরছিল যে নদীর মাঝে থাকা পাথরের উপর যে পানির ছাঁট এসে আমদের গায়ে লাগছিল ।

CIMG0276

সেখান থেকে আমরা গেলাম চোরতেন  এ। বর্তমান রাজার বাবার দাদার সমাধি এখানে আছে। এটা মেমরিয়াল চোরতেন বা থিম্ফু চরতেন নামে পরিচিত। তৃতীয় রাজা জিগ মে দরজি ওয়াংচুক, যিনি ১৯৭২ সালে মারা গেছেন তার স্মরণে ১৯৭৪ সালে এটি নির্মাণ করা হয় ।

 

19142273

 

অনেককেই দেখলাম প্রার্থনা করছে । সবাই খুব শান্ত। কোন হৈ চৈ নেই । সেখান থেকে বের হয়ে আমারা গেলাম থিম্ফু এর সবচেয়ে বড় জং ত্রাসি ছো জং দেখতে। ক্ষেত্র বিশেষে এটা তাসি ছো জং উচ্চারিত হয় । যাওয়ার পথে পড়ল ত্রাসি ছো জং এর দর্শন । তবে এখান দিয়ে প্রবেশ করা যায় না । এটা ভূটানের সচিবালয় ।এখানেই রাজার সিংহাসন আর অন্যান্য সামগ্রীও আছে।ভূটানে পুরোহিতরা অত্যন্ত প্রভাবশালী ।

 

 

DSC00481

বেশ খানিকটা রাস্তা ড্রাইভ করার পর  আমরা পৌঁছালাম জং এর প্রবেশ পথে। বিশাল এলাকা জুড়ে এর অবস্থান । একটা ভবনে অনেক গুলো ছোট ছোট সন্ন্যাসী । কেউ বসে গল্প করছে আবার অনেককেই দেখলাম পায়রা কে খাবার দিচ্ছে । এখানে দেখলাম আমাদের মাদ্রাসার মত বালকদের ধর্মীয় শিক্ষা দেয়া হয় । এদের প্রায় সবাই দরিদ্র পরিবারের সন্তান । তবে একটা জিনিষ না বলে থাকতে পারছি না আর তা হল শীত প্রধান দেশ বলে এরা মনে হয় গোসল করে কম আর মোটা কাপড় পরে বলে হয়ত ধোয় না তাই সবার গা থেকে কেমন একটা বোটকা গন্ধ আসছিল ।

 

DSC00469

 

একটু এগুতেই কানে আসলো ওদের মন্ত্র । একটানা সুরে সুরে আউরাচ্ছে , মানি পদ্মে ছাড়া আর কিছু বুঝলাম না ।এই মন্ত্রটা আমি নেপালেও শুনেছি । পরে এর সিডি কিনে নিয়ে আসছিলাম । জংটা অনেক বড় ।আলাদা আলাদা কয়েকটা ভবন ।এর মাঝে বিশাল এক রুমে বুদ্ধ এর মূর্তি সাথে মনি পদ্মে সন্ন্যাসী সহ আরও কয়েকজন সন্ন্যাসীর মূর্তি । এখানে ছবি তোলা নিষেধ । ঘুরেফিরে দেখে এবার আমরা রওয়ানা দিলাম হোটেলের পথে লাঞ্চ খেয়ে আবার বের হব । ফেরার পথে ড্রাইভার আমাদের দেখাল ওই দূর পাহাড়ের গাঁয় যে প্রাসাদ দেখা যায় সেখানেই থাকেন রাজার চার মাতা ।   তারপর ফিরে গেলাম হোটেল এ । খাবারের অর্ডার দিয়ে ফ্রেশ হতে রুমে গেলাম । এখানে আগে থেকে রান্না করা থাকে না ।তাই অর্ডার দেয়ার প্রায় পৌনে একঘন্টা পর খাবার পরিবেশন করা হল । গরম গরম ভাত ডাল আর কয়েক রকম সব্জি ।

৭৮১ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
আমি মিলি ,ভাল লাগে বই পড়তে,ঘুরে বেড়াতে আর বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে ।
সর্বমোট পোস্ট: ৩৮ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ৩৯৩ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৪-০৯-০৩ ১৫:৫৪:৫০ মিনিটে
banner

৬ টি মন্তব্য

  1. সহিদুল ইসলাম মন্তব্যে বলেছেন:

    মিলি আপুর কালেকশন
    জাগায় মিনে শিহরণ।

  2. দীপঙ্কর বেরা মন্তব্যে বলেছেন:

    চমৎকার
    খুব ভাল লাগল

  3. মরুভূমির জলদস্যু মন্তব্যে বলেছেন:

    সময় সুযোগ আর অর্থের সমন্বয় করতে পারলেই আমিও যাব।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top