Today 25 May 2018
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

ভূটান…. দ্রুক ইয়ুল বা থান্ডার ড্রাগন এর দেশ ( ৩য় বা শেষ পর্ব )

লিখেছেন: রুবাইয়া নাসরীন মিলি | তারিখ: ০২/১১/২০১৪

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 639বার পড়া হয়েছে।

খাওয়া সেরে আবার বের হয়ে গেলাম। এবার গেলাম একটু শপিং করার জন্য । চাইনিজ জিনিষ দিয়ে ভর্তি বিশেষত ক্রোকারিজ । আর আছে ওদের হাতে বোনা কাপড় । কাপড় এর ডিজাইন বা নকশা যত সুন্দরই হোক না কেন তা আমাদের দেশের আবহাওয়ায় পড়ার উপযোগী না। মনে হয় যেন তোষকের কাপড় । ভূটানের পুরুষরা হাঁটু সমান লম্বা যে পোশাক পরে তার নাম ঘো বা গো আর মেয়েরা গোড়ালি পর্যন্ত লম্বা যে পোশাকটি পরে তার নাম কিরা । এখানে জিনিষ পত্রের দাম বেশ চড়া । ভুটানি মুদ্রা গুল্ট্রাম এর মান ভারতীয় মুদ্রার সমান ছিল যখন আমরা গিয়েছিলাম । আমার একটা ইয়াক এর উলের হাতে বোনা শাল ক্রয় করার ইচ্ছা হইছিল কিন্তু  জেসমিন আপুর ধমক খেয়ে ক্ষান্ত দিলাম । অনেক ক্ষণ মার্কেটে ঘোরাঘুরি করে ফেরার পথ ধরলাম । সন্ধ্যা সন্ধ্যা আমরা হোটেলে ফিরে এলাম ,খাবারের অর্ডার দিয়ে রুমে গিয়ে আড্ডা আর পরের দিন কোথায় কোথায় যাব তার প্ল্যান আবার ঝালিয়ে নিলাম ।

 

পরের দিন সকাল বেলা একটু দেরি করেই উঠলাম ,নাস্তা সেরে যথারীতি বের হয়ে গেলাম মিঃ লেত্তঠো এর গাড়িতে । এদিন আমরা প্রথমেই গেলাম একটা মিউজিয়াম এ।থিম্ফুর ন্যাশনাল ফোক হেরিটেজ জাদুঘর ।  প্রাচীন কালে এদের মানে ভুটানিদের জীবনযাত্রা কেমন ছিল তা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এখানে । এই মিউজিয়ামের ভিতরেও ছবি তোলা নিষেধ ।

 

 

জাদুঘর

জাদুঘর

তবে পাহারার কড়াকড়ি নাই তাই চুপিসারে দুই একটা তুলে ফেলা যায় । ভিতরে মাটির তৈরি চুলা আর বাইরে মরিচ সহ অন্যান্য মশলাপাতি শুকাতে দেয়া হয়েছে।

ঘুরে ফিরে সব দেখে বের হয়ে আসলাম ।বাইরে ছোট একটা ধান ক্ষেত আর ওপাশে কতগুলা আপেল গাছ । আমি ওখানে দায়িত্বে থাকা মিস থুকপা কে জিজ্ঞেস করলাম যে ,আমি কি একটা আপেল নিতে পারি? সে মিষ্টি হেসে উত্তর দিল যত পার নাও । আমিও দেরি না করে  অনেকগুলা টসটসে সবুজ আপেল পারলাম ।হাত দিয়েই ছোঁয়া যায় । কি মিস্টি আর সুস্বাদু। কেয়াপু বলল মজা তো হবেই একেবারে গাছ পারা আপেল ।আমরা যেগুলা খাই সেগুলা তো যৌবন কালে জাহাজে উঠে আর বৃদ্ধ বয়সে আমাদের  খাবার টেবিল এ পৌঁছে।

 

 

আপেল বাগান

আপেল বাগান

সেখানে বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে আমরা গেলাম মতিথাং এ টাকিন দেখতে, মাত্র গতকাল এর সম্পর্কে শুনেছি ড্রাইভার এর কাছে। হরিণ জাতীয় এই প্রাণীটিকে ঘিরে যে পৌরাণিক কাহিনী আছে তা শুনলাম আর বিস্মিত হলাম ।এর নাম আমি আগে শুনি নাই। এ বিষয়ে একটা টপিক আছে তাই নতুন করে কিছু লিখলাম না । শুধু এটুকুই বলি যে এই প্রাণিটি দেখতে অনেকটা গরু আর ছাগলের মিশ্রন। বেশ শান্ত আর তৃণভোজী এই প্রাণি এখন বিপন্নপ্রায় । টাকিন দেখে বের হয়ে আসলাম দুপুরের খাবার খেতে। আজ দুপুরে আমরা বাইরে একটা রেস্টুরেন্ট এ খেলাম কিন্তু জি জাং এর মত মজা না।

 

 

10293731_10204030496425007_5191326836041593183_o

এবার গন্তব্য বিবিসি টাওয়ার। এখানে দাড়ালে পুরা থিম্ফু শহরের একটা ভিউ দেখা যায় ।

 

থিম্ফু শহর

থিম্ফু শহর

পুরা শহরটাই কি শান্ত নিরিবিলি আর সব জায়গায় প্রেয়ার ফ্ল্যাগ এর ছড়াছড়ি । এমন সময় হঠাৎ শুরু হল ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টি   ।তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে গেলাম ,একটু পরেই বৃষ্টি থেমে গেল আর আমরা থামলাম একটা দুর্গ বা  ছোট জং এর  সামনে। ধাপে ধাপে পাহাড় কাটা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলাম। বিশুদ্ধ বায়ু সেবন আর পাহাড়ি শহরের সৌন্দর্য দেখছি দু চোখ ভরে ।একটা ভুটানি পরিবার দেখলাম । কি কিউট একটা বেবি পিঠে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পালা করে সবাই বেবিটার সাথে ফটো তুললাম । নিচে নামার পর আমার মনে হল আমি যেন বাংলা গান শুনছি । আবার একটু খেয়াল করার চেস্টা করলাম একি রকম মনে হল ।সবাইকে বলাতে প্রথমে হেসেই উড়িয়ে দিল । তারপর ওরাও বলল আরে তাইত বাংলা গান …তাও আবার মমতাজের বন্ধু যখন…। আমাদের ভাবভঙ্গি আর বাংলা গান শুনে ড্রাইভার বলল বাংলা । খুব অবাক হলাম এবং পরে জানলাম বাংলাদেশের প্রায় দুই হাজার নির্মাণ শ্রমিক ওখানে কাজ করে।  আবার শুরু হল ঝিরিঝিরি বৃষ্টি তাই দেরি না করে হোটেলে ফিরে এলাম । ফেরার পথে গাড়ি থামিয়ে দেখলাম তীর ধনুকের খেলা। অনেক তীরন্দাজ মাঠে আর রাস্তার পাশে প্র্যাকটিস করছিল। এটা ভূটানের জাতীয় খেলা।

 

হোটেলে ফিরে গরম গরম কফি খেতে খেতে ঠিক করলাম পরের দিন যাব পুনাখা আর তাই হোটেল কতৃপক্ষের হাতে পাসপোর্ট তুলে দিলাম জেরক্স বা ফটোকপি করার জন্য কারন আবার অনুমতি নিতে হবে তবে এবার ওরাই সব করে দিল ,অনুমতি পেলাম পুনাখা আর পারো যাবার । আর আমরা জেসমিন আপুদের রুমে আড্ডা শেষে একবারে রাতের খাবার খেয়ে গেলাম ঘুমাতে কারন পরের  দিন আবার অন্য শহর পুনাখাতে যাব তাই।

পরের দিন সকাল বেলা ভরপেট নাস্তা খেয়ে রওয়ানা দিলাম পুনাখার উদ্দেশ্শ্যে । থিম্ফু থেকে পুনাখার দূরত্ব ৩৪.৪ কিলো মিটার। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ আর দুপাশের মনোরম দৃশ্য দেখতে দেখতে যাচ্ছিলাম । রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে । এখানে সবাই প্রচুর হাঁটে ।

DSC00422

হঠাৎ এক জায়গায় জেসমিন আপু গাড়ি থামাতে বললেন । ড্রাইভার আস্তে করে একপাশে গাড়ি থামাল আর আমরা নেমে আপুর পিছনে পিছনে চললাম ।কি দেখেছে কে জানে? নিশ্চয়ই সুন্দর কিছু। ওমা দেখি সামনে পাহারের ঢাল লাল হয়ে আছে ছোট ছোট  ফল এর গাছে ।মনে হয় মিনি আপেল। টুকটুকে লাল আর ফলের জন্য গাছের পাতাই দেখা যায় না । যথারীতি আমি আর সফেন ছুটলাম কয়েকটা ছিঁড়ে আনার জন্য । এমন সময় আমাদের শান্ত ড্রাইভার হই হই করে ছুটে আসলো । আমরা তো রীতিমত ভয় পেয়ে থমকে গেলাম। আধো আধো হিন্দিতে সে যা বোঝানোর চেস্টা করল তা হল এই ফলগুলা মারাত্মক বিষাক্ত। একটা খেলে একজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষ মারা যেতে পারে।

জেসমিন আপু জোরের সাথে বলে উঠলেন তা হলে তোমরা এগুলা কাটো না কেন? এবার ড্রাইভার এর অবাক হবার পালা । সে  বলল কেন কাটব? তুমি না খেলেই হল। আপুরা নিজেরা নিজেরা বলাবলি করছিল যে আমাদের দেশ হলে এতক্ষণে এগুলা কেটে পরিস্কার করে ফেলত। যাক আমরা একেবারে নিরাশ হলাম না ড্রাইভার একটু হেঁটে সামনে থেকে ছোট একটা গাছ থেকে কমলা রঙের ফল এর থোকা ছিঁড়ে এনে বলল এটা খাও অনেক মজা। এগুলা আবার দেখতে মিনি আঙ্গুর এর মত। স্বাদটা টক মিস্টি।পরে জেনেছিলাম ওগুলা ছিল ডুয়ারফ রাস্পবেরি ।

 

আমরা আবার গাড়িতে উঠে বসলাম, বেশ কিছুক্ষণ চলার পর গাড়ি থামল দোচুলা পাস এ। আগেই বলেছি সময়টা যদিও শীতকাল না তবে একটু বৃষ্টি হলেই ঠাণ্ডা লাগছে । এখানে এসে দেখলাম জম্পেশ কুয়াশা পড়েছে।

20354300

 

এই দোচুলা পাসে আছে এক চরতেন ।আমরা গাড়ি থেকে নেমে আস্তে আস্তে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করলাম।বাতাস আর কুয়াশায় মিলেমিশে একাকার। ভাল করে চাদর মুরি দিয়ে উঠতে লাগলাম । চারপাশটা কি সুন্দর আর সুনসান । আয়তন অনুসারে লোক সংখ্যা বড্ড কম বা আমি এত বেশি ঘনবসতিপূর্ণ দেশে থাকি যে আমার কাছে বেশি কেমন জানি লাগছিল।

যত উপরে উঠছি তত বেশি শীত করছে । এখানে একশত আটটি স্টুপা আছে। এই পাসটি দ্রুক ওয়ানগয়াল চরতেন নামেও পরিচিত। স্থানীয় লোকজন এবং পর্যটক সবার কাছেই এই স্থানটি অনেক জনপ্রিয় । কুয়াশা না থাকলে এখান থেকে হিমালয়ের চুড়া গুলো দেখা যায় আর এর আশেপাশের দৃশ্যাবলী অপূর্ব । যেহেতু থিম্ফু থেকে খুব একটা দূরে না তাই পিকনিক বা সময় কাটানোর জন্য পরিবার পরিজন নিয়ে ভুটানিরা এখানে বেড়াতে আসে ।

এছাড়া ধর্মীয় ভাবেও এ স্থানটিতে অনেক মানুষ আসে কারন এখানেই আছে চিমি লাহখাং মন্দির। ভুটানিরা ওদের ভাষা মানে জংখা ভাষায় বড় মন্দিরকে বলে জং আর ছোট মন্দিরকে বলে লাহখাং।দোচুলা  পাস থেকে একটু এগুলেই চিমি লাহখাং ভ্যালি ।

আমরা মন্দিরে না নেমেই পাশ দিয়ে গাড়ি থামিয়ে দেখে রওয়ানা দিলাম । কারন আমাদের পুনাখায় রাত কাটানোর ইচ্ছা নাই । তবে এখানে এক দারুন জিনিষ দেখলাম । এই মন্দিরটা হল উর্বরতার মন্দির।এর পাশেই দেখলাম সাত/আট জন মহিলা সুর করে গান গাইতে গাইতে ধান কাটছে। আর এসব শস্য জমা করছে মন্দিরের উঠানে। কারও দিকে কোন  ভ্রুক্ষেপ নাই,আপন মনে কাজ করে চলছে । আর একটা অদ্ভুত জিনিষ দেখলাম এই মন্দিরের নকশা মানে দেয়াল চিত্র। যাইহোক ওদের পাশ কাটিয়ে আমাদের গাড়ি ছুটল পুনাখার পথে।

পুনাখায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় দুপুর হয়ে গেল ,তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম আগে খাবার খেয়ে নিব ।গরম গরম ভাত। বড় মরিচের /মিষ্টি মরিচের  একটা সব্জি ,ডাল আর ভাজি দিয়ে খাবার সারলাম ।এরপর গেলাম পুনাখা জং দেখতে ।নদীর উপর কাঠের ঝুলন্ত ব্রিজ পার হয়ে জং এ যেতে হয় ।

 

DSC00510

এমনিতেই ভুটানে চারপাশে গাছ আর ফুলের সমারোহ কিন্তু এখানে এসে মনে হল পুরাই ফুলের মেলা। সন্ন্যাসীরা যে যার মত নিরবে কাজ করে যাচ্ছে ।অনেকে আবার প্রেয়ার হুইল ঘুরিয়ে জপ করছে। এখানে    আছে যে গুলা ঘুরাতে ঘুরাতে কোন ইচ্ছা করলে তা পূরণ হয়। এই জিনিষ সব প্যাগোডা আর জং এ আছে । জং টা অনেক বড়। আশেপাশে দেখা যায় পুনাখা ভ্যালির মোহনীয় রুপ। ভুটানের অধিকাংশ ধান এই ভ্যালীতেই উৎপন্ন হয়।  নিচে দেখলাম অনেক গুলা ঘোড়া ঘাস খাচ্ছে। চারপাশে বাগান বিলাস ,গোলাপ আরও কত শত ফুল । পুরা জংকে ঘিরে আছে অনেক বড় বড় গাছ।

এক সন্ন্যাসী আমাদের জানালো এগুলা জারকান্ডা গাছ ।বসন্তে এই গাছের পাতাই দেখা যায় না ।পুরা গাছ আচ্ছাদিত থাকে বেগুনি রঙ এর ফুলে ।

ইশ! একথা শোনার পর মনে হল যদি বসন্তে আসতাম ।

ভাল করে পুরো জঙটা দেখে কিছুক্ষণ উপরে উঠে বসে থাকলাম দুরের প্রবাহিত নদী গুলো কলকল করে বয়ে যাচ্ছিল । এরপর জং থেকে বের হয়ে আমরা গেলাম মো আর ফো ছু এর সঙ্গম স্থলে।

দুইদিক থেকে দুই ছু মানে নদী এখানে এসে মিলিত হয়েছে। মো এর পানি ফো এর চেয়ে অপেক্ষাকৃত সাদা ।ড্রাইভার আমাদের জানাল ওদের ফোকলোর অনুযায়ী মো হল মেয়ে আর ফো হল ছেলে ,এখানে এসে ওদের বিয়ে হয়েছে আর তাই একসাথে হাসতে হাসতে ওরা যাচ্ছে সাগর পানে।

 

একথা শুনেই ড্রাইভার কে বললাম ,তাইলে তো আমরা মো ছু এর শ্বশুর বাড়ির লোক কারন পড়বে তো সেই বঙ্গোপ সাগরেই । এই দুই নদী পুনাখাতে একত্র হয়ে ভারত সীমান্ত পর্যন্ত প্রবাহিত হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে মিশেছে ।

 

CIMG0290

 

আগেই বলেছি পুনাখাতে রাত কাটানোর ইচ্ছা নাই তাই বিকাল বিকাল ফেরার পথ ধরলাম।ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেল। এটাই থিম্ফু তে আমাদের শেষ রাত ।পরের দিন যাব পারো ।  লেতঠো এর সাথেও আর দেখা হবে না তাই রাতেই ওর কাছ থেকে বিদায় নিলাম। যেহেতু পারো একটু দূরে তাই ট্যাক্সিতে যাওয়া যাবে না।

রাতের খাবার খেয়ে হোটেল মালিক আর তার মেয়েদের সাথে অনেকক্ষণ আড্ডা মারলাম,ছবি তুললাম আর শেষমেশ ক্লান্ত শরীর নিয়ে গেলাম বিছানায়।

পরের দিন খুব সকালে উঠতে হল ,ব্যাগ গুছিয়ে তৈরি হয়ে নেমে গেলাম নাস্তা খেতে। গাড়ি চলে এসেছে আগেই তাই দেরি না করে ঝটপট রওয়ানা দিলাম। এবারের ড্রাইভারটা একটু গোমরামুখো ,কথা বলে কম। একদল যাত্রী নিয়ে পারো থেকে থিম্ফু এসেছে গতরাতে আর সকালে আমাদের নিয়ে আবার যাচ্ছে পারো।কথায় কথায় জানতে পারলাম থিম্ফু তার পছন্দ না কারন এখানে অনেক ভীর হইচই । শুনেই আমরা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম ।বলে কি লোকটা ? একে যদি ফার্মগেট বা নিউমার্কেট ওভার ব্রিজ এ দাড় করানো হয় তাইলে তো সে হার্ট ফেল করবে। যাক যেথায় যেমন । পথিমধ্যে দুবার থেমে চা খেয়ে নিলাম।

এর মাঝে ঘটলো এক আজব ঘটনা ।পারোতে প্রবেশ করার একটু আগে রাস্তায় বেশ জ্যাম ছিল কারন একতা বিদ্যুতের খুঁটি দেখলাম উপড়ে গেছে । পিছনের গাড়ির এক ভদ্রলোক গাড়ি থেকে নেমে হাতজোড় করে বার বার ক্ষমা চাচ্ছে আর বলছে তার জরুরি মিটিং আছে তাই সে লাইন ব্রেক করে আগে যেতে চায়। সবাই রাজি হলে সে হুশ করে ওভারটেক করে আগে চলে গেল। পরে ড্রাইভার বলল তোমরা কিছু মনে কর না উনি একজন মন্ত্রি আর রাজার সাথে তার জরুরি মিটিং আছে তাই আগে গেল !!! একি শুনলাম ! আমাদের দেশে তো …

পারো তে গিয়ে উঠলাম হোটেল পেলজরলিং এ ।এই হোটেলের ম্যানেজার চমৎকার বাংলা বলতে পারে। আসলে সে অনেকদিন ফুয়েন্টশোলিং ছিল। সেখানে প্রচুর ভারতীয় কাজ করে ,তাদের কাছ থেকেই শেখা।

সন্ধ্যা নামতেই দেখি ঘুটঘুটে অন্ধকার ,কিছু দোকানপাট এ মোম বা অন্য আলো জ্বলছে ।ভাবছি তাইলে ভুটানেও লোড শেডিং হয়। নিচে গিয়ে জানলাম একটু আগে ল্যান্ডস্লাইড এ খুঁটি উপড়ে পরাতে এই বিপত্তি । কিছুক্ষণ পরেই বিদ্যুৎ চলে এল।

আমরাও বাইরে বের হয়ে কিছুক্ষণ ঘোরাফেরা করলাম। ওদিকে আমরা যখন বাইরে টুকটাক কেনাকাটা করছিলাম কেয়াপু তখন কিনে নিয়ে আসলো পিচ ফল।

এখানে ওদের নিজস্ব নকশায় তৈরি রুপার দুল আর পুতির ব্যাগ দেখলাম তুলনামুলক ভাবে সস্তা ।আর সস্তা জ্যাম ,জেলি মারমালেড।আমরা অনেকগুলা কিনলাম ।

তারপর রাতের খাবার খেয়ে রুমে ফিরে ঘুম । তবে খেতে বসে আমরা জি জাঙ্গ এর খাবার খুব মিস করলাম কারন ওদের রান্নাটা ছিল আসলেই অনেক মজাদার। আর ঘুমানোর আগে আমার আর সফেনের উপর চলল চরম মানসিক নির্যাতন । আমাদের  পিচ ফল খেতে হবে ।দেখতে সুন্দর হলেও স্বাদটা আমার কাছে গাব এর মত মনে হচ্ছিল। অনেক কষ্টে দুইজন দুই পিস খেলাম ।

সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই মনটা ভাল হয়ে গেল ।এখানকার আবহাওয়াটা আসলেই চমৎকার । সেপ্টেম্বর মাস কিন্তু রাতে ফ্যান চালাতে হয়নি। এখানে সারা বছর তেমন গরম পড়ে না।

পরোটা সবজি দিয়ে ভরপেট নাস্তা খেয়ে বের হলাম পারো দর্শনে ।সারদিনের জন্য গাড়ি নেয়া হল আর ড্রাইভার সেই গতকালের জন। যিনি আমাদের থিম্ফু থেকে পারো নিয়ে এসেছে। আমার কাছে আগে থেকেই লিস্ট করা ছিল কোন কোন জায়গায় যাব । প্রথমেই গেলাম পারো ন্যাশনাল মিউজিয়াম এ। এটা অনেক বড় একটা দুর্গ । আগে ছিল ওয়াচ টাওয়ার । ভিতরে প্রবেশ করে ঢালু রাস্তা বেয়ে নেমে গেলাম।

সতেরশ শতকে নির্মিত তা জং এখন পারো ন্যাশনাল মিউজিয়াম। ভিতরে প্রদর্শনীতে আছে  নানা রকম গয়না , যুদ্ধের সরঞ্জাম ইত্যাদি ।

ওখান থেকে বের হয়ে গেলাম দ্রুকগিয়েল জং দেখার জন্য। এই জং এর সাথে জড়িয়ে আছে অগ্নিকান্ডের এক ইতিহাস। কোন এক অজ্ঞাত কারনে এই জং টা বার বার আগুনে পুড়ে যায় । পাহাড়ের উপর এর অবস্থান। গাড়ি থেকে নেমে আমরা উপরে উঠতে থাকলাম ।বেশ চড়াই। কোথা থেকে যেন পানির কলকল শব্দ আসছিল ।বুঝতে পারছিলাম কাছে কোন নদী বা ঝর্ণা আছে। যত উপরে উঠছিলাম পানির কলকলানি তত বাড়ছিল ।শব্দের উৎস কিছুতেই খুজে পেলাম না।

অবশেষে দুর্গের আঙ্গিনায় প্রবেশ করলাম। চারপাশে ঝোপঝাড় আর অযত্নে বেড়ে ওঠা গাছপালা । আর ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে আগুনে পোড়া দুর্গের ভাঙ্গাচোরা কাঠামো । আমরা ছাড়াও আরও দুইজন পর্যটক আসল ।  কিছু সময় কাটিয়ে ধরলাম ফিরতি পথ।ফেরার পথে গাড়ি থেকে নেমে দেখলাম আপেল বাগান ।সবুজ লাল আপেলে গিজগিজ করছে গাছগুলো ।

 

DSC00554

দুপুরের খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে বের হয়ে গেলাম ।প্রথমেই গেলাম কিছু লাখাং এ। ওখানে একটা গাছে অনেক পাকা কমলা দেখে ভাবলাম অনুমতি নিয়ে দুই একটা ছিঁড়ব, কিন্তু সন্ন্যাসী কে বলতেই সে বলল ওরা গাছ থেকে ফল ছিড়ে না। আমাকে বলে কি না গাছের কাছে দাঁড়িয়ে প্রেয়ার কর একটা যদি পড়ে তাইলে নিও । কি আজব কথা।

এখানে অনেক খানি সময় পার করে গেলাম টাইগার নেস্ট বা  তাক সাঙ্গ এ। সমতল থেকে অনেক উঁচুতে এর অবস্থান। পাহাড়ের পাদদেশে গাড়ি রেখে হেটে যেতে হয় এখানে। ওদের লাগে ঘন্টা তিনেক আর আমাদের মত মানুষদের লাগবে সাড়ে চার কি পাঁচ ঘন্টা।

 

DSC00557

চিন্তা করছি কি করা যায় এমন সময় দেখি একটা দল তাক সাঙ্গ ঘুরে নেমে এল। আমাদের দেখে এসে নিজেরাই আলাপ করল ।একজন ছাড়া সবাই ভারতীয় দূতাবাসের কর্মকর্তা ।একজন এসেছেন লেসোথো থেকে । উনারা আমাদের খুব ইন্সিস্ট করল উপরে ওঠার জন্য। বিশেষ করে আমাকে,কেয়াপু আর সফেনকে । তবে দেরি হয়ে যাওয়ায় আমরা গেলাম না।

সন্ধ্যা সন্ধ্যা হোটেলে ফিরে এলাম।  কারন পরের দিন আবার যেতে হবে ফুয়েন্টশলিং ।সকাল বেলা নাস্তা খেয়ে ব্যাগ বোঁচকা নিয়ে চলে গেলাম বাস স্ট্যান্ড । তারপর দুপুরের এক্তু পর পর পৌঁছলাম ফুয়েন্টশলিং। ফ্রেশ হয়ে খাবার খেতে বের হলাম তারপর শপিং। এখানে খুব সুন্দর ডিজাইনের চাইনিজ স্যান্ডেল পাওয়া যায়।

সন্ধ্যার পর কেয়াপু কে পটিয়ে পাটিয়ে ভুটান গেট পার হয়ে গেলাম ইন্ডিয়ায়।  প্রচুর লোক জাওয়া আসা করছে। ওখানে কিছু কেনা কাটা করে রাতের খাবার খেয়ে ফিরলাম।

পরের দিন দেশে ফেরার পালা। এবার দলটা দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেল। ছুটি না থাকায় কেয়াপু আমি আর সফেন ধরলাম দেশের পথ আর উনারা দুইজন দার্জিলিং এর।

ফিরতে ফিরতে মনে হল আহা কত কিছুই দেখা হল না । তাই ভাবছি আবার যাব তবে অবশ্যই বসন্তে।

 

৬২৪ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
আমি মিলি ,ভাল লাগে বই পড়তে,ঘুরে বেড়াতে আর বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে ।
সর্বমোট পোস্ট: ৩৮ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ৩৯৩ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৪-০৯-০৩ ১৫:৫৪:৫০ মিনিটে
banner

৭ টি মন্তব্য

  1. দীপঙ্কর বেরা মন্তব্যে বলেছেন:

    অতি সুন্দর পোষ্ট
    কত কি জানা গেল ।
    ভাল খুব ভাল

  2. মরুভূমির জলদস্যু মন্তব্যে বলেছেন:

    যাওয়ার খুব ইচ্ছে আছে।

  3. সহিদুল ইসলাম মন্তব্যে বলেছেন:

    ওমা দেখি সামনে পাহারের ঢাল লাল হয়ে আছে ছোট ছোট ফল এর গাছে ।মনে হয় মিনি আপেল। টুকটুকে লাল আর ফলের জন্য গাছের পাতাই দেখা যায় না । যথারীতি আমি আর সফেন ছুটলাম কয়েকটা ছিঁড়ে আনার জন্য । এমন সময় আমাদের শান্ত ড্রাইভার হই হই করে ছুটে আসলো । আমরা তো রীতিমত ভয় পেয়ে থমকে গেলাম। আধো আধো হিন্দিতে সে যা বোঝানোর চেস্টা করল তা হল এই ফলগুলা মারাত্মক বিষাক্ত। একটা খেলে একজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষ মারা যেতে পারে।

    আপু সুন্দর আপনার বর্ণনা, বেড়াতে যাওয়ার ইচ্ছা আছে, তাই জানা হল ঐ ফল গুলো খাওয়া যাবেনা।

  4. মিলি মন্তব্যে বলেছেন:

    হুম খেলেই খবর হয়ে যাবে :-)

  5. এই মেঘ এই রোদ্দুর মন্তব্যে বলেছেন:

    ফোরামে পড়েছিলাম এখন আবার দেখে ভাল লাগল

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top