Today 21 Jul 2019
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

ভূত,ভূতুড়ে

লিখেছেন: তাপসকিরণ রায় | তারিখ: ০৭/১১/২০১৪

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 930বার পড়া হয়েছে।

images (33)স্মৃতি

পিসেমশাইয়ের কুয়াটারে একবার ঘুরতে গিয়েছিলাম । তখন আমি অবিবাহিত এক সাহসী যুবক।
পিসেমশাই তখন মানা ক্যাম্পে এসিস্টেন্ট ক্যাম্প কম্যাডেন্ট ছিলেন । তাঁর কুয়াটারে যখন পৌঁছালাম , তখন তিনি ছিলেন না । আধ ঘন্টা বিশ্রাম করে , পিসিকে বলে রায়পুর ঘুরতে চলে গেলাম । উদেশ্য নতুন কোন সিনেমা দেখে আসা ।
পিসি বারবার বলেছিলেন , যাচ্ছিস যা , রাত করবি না কিন্তু !
আমি তাঁর কথা মেনে নিয়ে বেরিয়ে পরলাম রায়পুর শহরের দিকে । রায়পুরকে শহর না বলে নগর বললে চলে । তখনকার দিনে সেখানে দশ বারটা সিনেমা হল ছিল মনে আছে ।
নতুন পিকচার ছিল , ম্যাটিনি শোতে টিকিট পেলাম না । এমন কি ব্ল্যাকে চেষ্টা করেও কোন কাজ হলো না । সিনেমার ভূত মাথায় চেপেছিল তাই লম্বা লাইন দিয়ে অনেক ঠেলাঠেলি করে ইভিনিং শোর একটা টিকিট পেলাম । ছটা নটার শো । মাঝের দু আড়াই ঘন্টার সময় পাস করার জন্যে মার্কেট ঘুরে বেড়ালাম ।
কি পিকচার ছিল , আজ আর তা মনে নেই । তবে সুপার হিট , মারকাটের কিছু একটা ছিল । পিকচার দেখে যখন হল থেকে বের হলাম তখন প্রায় রাত সাড়ে নটা বাজে ।
এখানে একটা কথা বলা হয়নি । মানা ক্যাম্প থেকে রায়পুর যেতে হলে তখন ডাইরেক্ট বাস ছিল না । ছোট লাইনের ট্রেন বা অটোর যাতায়াত ছিল । তবে রাত নটার পরে কোন ট্রেন ছিল না , আর সে সময়টায় অটোর যাতায়াতও অনেক কমে যায় । সমস্যা ছিল ঘরে , মানে পিসেমশাইয়ের কুয়াটারে পৌঁছানো নিয়ে । এন.এচ. ৪৩ দিয়ে বাস ট্রাকের যাতায়াত আছে বটে তবে অত রাতে যানবাহনের যাওয়া আসা খুব কমে যায় । আরও একটা ব্যাপার হলো সে রাস্তা থেকে মানা ক্যাম্পের দূরত্ব আরও তিন কিলো মিটারের ।
দেখতে দেখতে রাত বাড়তে লাগলো । দু একটা বাস দাঁড় করাবার চেষ্টা করলাম । দাঁড়ালো না । কোনো অটো পাচ্ছিলাম না । বড় মুসকিলে পড়ে গেলাম । ও দিকে পিসেমশাই নিশ্চয় ভীষণ চিন্তা করছেন । কি যে করি ! এ দিকে দেখতে দেখতে রাত সারে দশটা বেজে গেল । ভাবছিলাম , ট্রাক ধরেও যদি বড় রাস্তার মোড় মানে ক্যাম্পের লিংক রাস্তা পর্যন্ত যেতে পারতাম ! কিন্তু কোন গাড়ীই তো দাঁড়াচ্ছে না !
দেখতে দেখতে রাত এগারটা হয়ে এল । তখনকার দিনে মোবাইলের প্রচলন ছিল না । যেখানে সেখানে টেলিফোন বুথও ছিল না । পিসেমশাইয়ের ঘরের সঙ্গে যোগাযোগের কোন চান্সই ছিল না ।
এক সময় একটা ট্রাক আমার পাশে এসে থেমে গেল , ড্রাইভার গলা বাড়িয়ে বলে উঠলো , কাঁহা জানা হায় ?
ক্ষীণ আশার আলোটুকু চোখে নিয়ে বলে উঠলাম , মানা ক্যাম্প ।
–নেহী যায়ে গা , মেইন রোড তক যানা হায় তো চলো !
তাই সই , তড়িঘড়ি করে ট্রাকের পেছনের ডালায় উঠে বসলাম । দেখলাম আরও অনেক সওয়ারী সেখানে বসে । সাত আট কিলোমিটারের দূরত্ব । তারপর তিন কিলোমিটার হেঁটে যেতে হবে । এত রাতে সেখান থেকে কোনো গাড়ি পাবারও কথা নয় । তবে পিসেমশাই নিশ্চয় বসে থাকবেন না । তিনি সরকারী গাড়ি নিয়ে হলেও আমার খোঁজে বেরিয়ে পড়বেন ।
এত রাতে মানার লিংক রোড চিনতে পারলাম না । যখন বুঝলাম তখন দু কিলিমিটার পার হয়ে এসে গেছি । চীত্কার করে ট্রাক থামালাম । ট্রাকের এক সওয়ারী বলল , ক্যাম্প কে রাস্তা ছোড় কর তুম বহুত দূর আ গয়ে হো–ফির ভী ও দেখো মানা ক্যাম্প কী বাত্তি দিখাই দে রাহী হায় !
আর বাত্তি , কান্না পাওয়ার মত আবস্থা হচ্ছিল । কি দুর্দশায় যে পড়লাম ! তাড়াতাড়ি ট্রাক থেকে নেমে থ মেরে গেলাম । অন্ধকার । চারদিক ঘুঁটঘুটে অন্ধকার । বরাবর দূরের ক্যাম্পের টিমটিম করা আলোগুলি দেখতে পাচ্ছিলাম । রাস্তা চিনি না , ঠিক করলাম , যা আছে কপালে ওই আলোগুলো লক্ষ্য করে নাক বরাবর হাঁটবো । মেন রোড থেকে নেমে ঝোপ ঝাড় জঙ্গলের পথ বেপথ ধরে হাঁটতে থাকলাম । লম্বা লম্বা পা ফেলে দ্রুত হেঁটে চলেছি । পাঁচ মিনিট হাঁটার পর দেখলাম আমার সামনে রেল লাইন ! ওই ছোট ট্রেনের লাইন যেটা চলে গেছে মানা ক্যাম্প স্টেশনে ।
এখন আর একটা ভাবনার উদয় হল , সিধা আলো দেখে হাঁটবো না কি রেল লাইন ধরে মানা ক্যাম্প স্টেশনের দিকে হাঁটবো ! লাইন দিয়ে হেঁটে গেলে আমায় আরও অন্তত দেড় মিলোমিটার বেশী হাঁটতে হবে । তবে সেখান থেকে ক্যাম্পের সিধা রাস্তা আমার চেনা । কিন্তু এ সময়ে আবার ওই দেড় কিলোমিটার বেশী হাঁটবো ? অগত্যা ঠাকুরের নাম করে নাক বরাবর দূরের আলোর দিশা ধরে হাঁটা দিলাম । মিনিট পাঁচ হাঁটার পর হঠাৎ আমার পায়ে এসে কি একটা ঠেকলো , ঠক করে কিছুতে পা লেগে কিছু একটা গড়িয়ে গেল । নিচে তাকিয়ে এবার আমার নজরে এলো , আমার পায়ের নীচে ছাই , কয়লা , পোড়া কাঠের টুকরো ছড়ানো । লক্ষ্য করলাম , দড়ি কলসি বাঁশ কাঁথা কাপড় এদিক ওদিক ছড়িয়ে পড়ে আছে । আমার পায়ে যেটা ঠেকে ছিল সেটা একটা ভাঙ্গা মাটির হাঁড়ি ছিল–আরও ভাঙাচোরা হাঁড়ি চারদিকে ছড়িয়ে আছে । তখনও এক জাগা থেকে ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে ওপরে উঠছিল । বুঝে নিতে দেরী হল না যে আমি মানা ক্যাম্পের শ্মশানে এসে গিয়েছি । ওরে বাবা ! সমস্ত শরীর আমার ঝাঁকি দিয়ে উঠল । থমকে দাঁড়িয়ে আছি আমি । মনে হলো সামনে নির্ঘাৎ আমার মরণ দাঁড়িয়ে আছে । শুনেছি , যেখানে বাঘের ভয় , সেখানেই নাকি সন্ধ্যে হয় ! বাঘ তো এখানে নেই কিন্তু ভূত ! এ ব্যাপারে আমার খাঁটি বিশ্বাস আছে ।
সামান্য দুরে খসখস করে কিসের যেন শব্দ হলো । অন্ধকার । চারদিক অন্ধকার–ভয়ের কিছু একটা দেখে ফেলার ভয়ে আমি কোন দিকে তাকাচ্ছিলাম না । ভূত ছাড়া আর কিছুই যে আমার চোখে পড়বে না এ ব্যাপারে নিঃসন্দেহ ছিলাম । মনে মনে রাম নাম , হরে কৃষ্ণ নাম , জপ করে নিলাম । তাতে ভয় কতটা দূর হলো তা জানি না তবে ভেবে নিলাম আমি কোনও দিকে তাকাবো না–কেবল পায়ের দিকে তাকিয়ে পথ চলব । স্থির করলাম কিছুটা ফিরে গিয়ে রেল লাইন ধরে স্টেশনের দিকেই হাঁটতে থাকব ।
রেল লাইনের কাঠের পাটাতনগুলি এক নির্দিষ্ট দূরত্বে পাতা থাকে । আমি অন্য কোন দিকে না তাকিয়ে ঠিক সেই মাপের স্টেপ ফেলে ফেলে এগচ্ছিলাম । এবার মানা ক্যাম্প স্টেশনে যেতে হবে । গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল । মাথার চুল থেকে নিয়ে গায়ের প্রতিটি লোম কূপ মনে হল সচেতন হয়ে গেছে । শুনেছি , মানা ক্যাম্পের শ্মশানের খুব বদনাম আছে । এখনে থাকে আমার এক বন্ধু , বাধন , সে বলে ছিল , এ শ্মশানের ধারে নাকি বেশ কয়েকজন ভয় পেয়ে জ্ঞান হারিয়ে ছিল । এক জনকে তো ভুতে ধরেও ছিল । শেষে বাইরে থেকে ওঝা এনে ভূত ছাড়াতে হয়ে ছিল । পেত্নীরা নাকি বয়স্ক ছেলেদের ইশারায় ডেকে নেয় ! ওরে বাবা ! না , না , না , এসব কথা না চাইলেও কেন যে মন থেকে উঠে আসে কে জানে ! শেষে কি পেত্নীর কবলে পড়ে প্রাণ হারাতে হবে ? এক ফালি চাঁদ আকাশের কোণে দেখতে পাচ্ছিলাম । কিন্তু সে চাঁদের আলোছায়ায় ভয় আরও বেড়ে গেল । চারদিক কেমন ঘোর ঘোর তন্দ্রা জড়িত স্তব্ধতা ছেয়ে গিয়ে ছিল ।
আচমকা আমি থেমে গেলাম–দুরে একজন হেঁটে যাচ্ছে বলে মনে হলো না ! অন্ধকারে কারো ছায়া স্টেশনের দিকে যেতে যেতে মিলিয়ে গেল যেন ! এবার মনে হলো আমার পেছনেও কেউ আছে–তার পায়ের তাল শুনতে পাচ্ছিলাম আমি । আর ধরে রাখতে পারলাম না নিজেকে । হঠাৎ আমি গলা ছেড়ে চীত্কার দিয়ে উঠলাম । ভয়ে আমার পা কাঁপছে , শরীর কাঁপছে । আর তারপর ,তারপর আর কিছু মনে নেই…
যখন জ্ঞান ফিরল আমার মুখের সামনে দেখলাম চার পাঁচটা মুখ ঝুঁকে আছে । আমি বিছানায় শুয়ে আছি । আমার শিয়রে একজন বসে আছেন । আবছা দৃষ্টি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছিল ।
পিসেমশাই বলে উঠলেন ,কি রে কেমন আছিস এখন ?
বন্ধু বাধনও দাঁড়িয়ে ছিল , ও জিজ্ঞেস করল , ভাল আছিস তো তুই ?
কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল না , কেবল মাথা নাড়িয়ে জানালাম , ভাল আছি ।
শিয়রে বসে থাকা লোকটা ডাক্তার হবে , আমার নাড়ি দেখে বললেন , এখন অনেকটা ঠিক ।
আমার দেরী দেখে পিসেমশাই বাধনকে নিয়ে গাড়িতে আমায় খুঁজতে বেরিয়ে ছিলেন–রায়পুরে খুঁজে না পেয়ে ঘরের দিকে ফিরছিলেন । প্রায় ঘরের কাছাকাছি আসার পর পেছন থেকে আমার চীৎকারের ক্ষীণ আওয়াজ শুনতে পেয়েছিলেন । তারপরেই তিনি আমাকে উদ্ধার করে কুয়াটারে নিয়ে আসেন ।
পিসি , পিশেমশাইকে ঘটনাটা বলে ছিলাম । ওঁরা ঘটনাকে অবিশ্বাস্য বলে উরিয়ে না দিয়ে বলে উঠলেন , তোরই তো দোষ– ইভিনিং শো দেখতে গেলি কেন ?
সমাপ্ত

৮৮২ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
নাম :তাপসকিরণ রায়। পিতার নাম : স্বর্গীয় শৈলেশ চন্দ্র রায়। জন্ম স্থান: ঢাকা , বাংলা দেশ। জন্ম তারিখ:১৫ই এপ্রিল,১৯৫০. অর্থশাস্ত্রে এম.এ.ও বি.এড. পাস করি। বর্তমানে বিভিন্ন পত্র পত্রিকাতে নিয়মিত লিখছি। কোলকাতা থেকে আমার প্রকাশিত বইগুলির নামঃ (১) চৈত্রের নগ্নতায় বাঁশির আলাপ (কাব্যগ্রন্থ) (২) তবু বগলে তোমার বুনো ঘ্রাণ (কাব্যগ্রন্থ) (৩) গোপাল ও অন্য গোপালেরা (শিশু ও কিশোর গল্প সঙ্কলন) (৪) রাতের ভূত ও ভূতুড়ে গল্প (ভৌতিক গল্প সঙ্কলন) (৫) গুলাবী তার নাম (গল্প সঙ্কলন)
সর্বমোট পোস্ট: ১১২ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ১৬৬৯ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৮-১১ ১৫:৪৩:৫৪ মিনিটে
banner

৭ টি মন্তব্য

  1. সহিদুল ইসলাম মন্তব্যে বলেছেন:

    ভূত ছাড়া আর কিছুই যে আমার চোখে পড়বে না এ ব্যাপারে নিঃসন্দেহ ছিলাম ।

    দাদা ভুত দেখে ভয় পেয়েছেন! হা…হা…হা…
    যাই হোক বর্ণনা ভালো লাগলো।

    • তাপসকিরণ রায় মন্তব্যে বলেছেন:

      সত্যি ঘটনা নিয়ে লেখা।আমার নিজের জীবনের অনেক ঘটনা আমি আগেও গল্পে লিখেছি।আমি এ ব্যাপারে শতভাগ বিশ্বাসী।ধন্যবাদ।

  2. দীপঙ্কর বেরা মন্তব্যে বলেছেন:

    কাহিনী ভালই
    এমন হয়ই
    ভাল লাগল

  3. তাপসকিরণ রায় মন্তব্যে বলেছেন:

    পড়ার জন্যে ধন্যবাদ।

  4. এই মেঘ এই রোদ্দুর মন্তব্যে বলেছেন:

    কি ভয়ংকর পরিস্থিতি অরে বায়া। ভাল লাগল ভুতের গল্প।

  5. তাপসকিরণ রায় মন্তব্যে বলেছেন:

    ভাল লেগেছে জেনে আমারও ভাল লাগল–ধন্যবাদ।

  6. সবুজ আহমেদ কক্স মন্তব্যে বলেছেন:

    দারুন চমৎকার গল্প
    বেশ ভালো লাগলো পড়ে

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top