Today 12 Nov 2019
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

ভৌতিক উপাখ্যান

লিখেছেন: তাপসকিরণ রায় | তারিখ: ০৪/০৭/২০১৪

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 779বার পড়া হয়েছে।

10457524_10152428313440751_844385797525101477_n

ভবতোষ ও ঊর্মিলা স্বামী স্ত্রী। স্বামী স্ত্রী দুজনের সংসার।
বিয়ের এক বছর যেতে না যেতে ঊর্মিলার ক্যান্সার ধরা পড়ল। ফুড পাইপে ক্যান্সার ছিল। এত কম বয়সে সাধারণত এ ধরনের ক্যান্সার হয় না। তবু হয়েছে এ কথাটাই সত্য। কিছু দিন থেকে ঊর্মিলার খাবার খেতে অসুবিধা হচ্ছিল। এমন কি জল গিলতেও বেশ বাধ বাধ ঠেকত–বুকে সব সময় চাপ চাপ অনুভব করত।
শেষে রোগ ধরা পড়ল–প্রায় লাস্ট স্টেজে। কিছু দিন খাদ্য পানীয় আলাদা পাইপ লাগিয়ে গলার নলীর ভেতর দিয়ে শরীরে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। এর মাস তিন পরে অপারেশনের সময় মৃত্যু হল ঊর্মিলার।
ঊর্মিলা খুব ভালবাসত ভবতোষকে। এক মধুময় রাতে ঊর্মিলা ভবতোষ যখন বড় কাছাকাছি ছিল, ভবতোষের কোলে শুয়ে দাম্পত্য জীবনের সুখে আপ্লুত হতে হতে বলে ছিল, তুমি আমায় ভালবাস তো ভব?
–খুব, খুব, খুব ভবতোষ আহ্লাদিত হয়ে বলেছিল। আর ঊর্মিলা ভবতোষের ঠোঁটে বারবার চুম্বন এঁকে দিতে দিতে বলে ছিল, আমি তোমায় ভীষণ, ভীষণ ভালবাসি–আমি তোমায় জন্ম জন্মান্তরের জন্যে ভালবাসি গো!
এ ঘটনার পর একটা বছরও পার হতে পারল না–ঊর্মিলার অতৃপ্ত জীবন সাঙ্গ হল–যেন বান ডাকা সুখের মাঝখানেই তার মৃত্যু ঘটল।
ঊর্মিলার মৃত্যুর পর বড় অসহায় হয়ে পড়ে ছিল ভবতোষ। কিছু তার ভাল লাগছিল না–অফিসেরও ছুটি চলছিল তার। সময় কাটতে চাইছিল না। নিঃসঙ্গ বিরহ জীবন চলছিল। দিন ভর মন মরা হয়ে স্তব্ধতার ভিতর একলাটি ঘরে বসে থাকত ভবতোষ।
স্ত্রীর মৃত্যুর রাত ছিল তার কাছে ভীষণ ভয়াবহ ! একলাটি স্ত্রীর মড় দেহ পাহারা দেওয়া—সে যে কি অসহায়তা তা কাউকে বলে বোঝানো যায় না। পর দিন দাদা, বৌদি এসে ছিলেন। আর অফিস থেকে ক’জন স্টাফ এসে ছিল।
এখন খালি তিন তলার ভবর ফ্ল্যাট নিশ্চুপ নিঃসাড় পড়ে আছে। স্ত্রীর মারা যাবার পর তিন দিন অতিবাহিত হয়ে গেল। দাদা বৌদিরা আজই নিজেরদের ঘরে বেরিয়ে গেলেন। ভবতোষ ঘরে আজ সম্পূর্ণ একলা।
তখন অনেক রাত, ঘুম আসছিল না ভবতোষের। নিঃসঙ্গ অসহায় জীবনের স্মৃতি কথা ভেবে ভেবে সবে মাত্র তার চোখটা লেগে এসেছিল, হঠাৎ খুট করে একটা আওয়াজে তন্দ্রা ছুটে গেল তার। অন্ধকার ঘর। ভব রাতে ব্যালকনির দিকের জানলার ছিটকিনি এঁটে দিয়ে ছিল। ঘরের পাখা মিডিয়ম স্পীডে ঘুরছিল।
কিসের শব্দ হল–একেবারে হালকা শব্দ ছিল না। ঘুম ভেঙে যাবার মত শব্দ–পাখার শব্দকে ছাপিয়ে যাওয়া শব্দ। জানালার দিকে চোখ পড়ল ভবর। আরে জানলা তো বন্ধ ছিল, খুলে গেল কি করে ! জানলার বাইরের আকাশে তখন ফালি কাটা চাঁদ উঁকি মারছিল। তেজহীন মরা জ্যোৎস্নার আলোর বিষণ্ণ ছায়া ঘরময় ছড়িয়ে পড়ে ছিল। জানলা থেকে চোখ ফিরিয়ে যেই দু চোখের পাতা বুজেছে ওর অমনি আবার আওয়াজ হল। মনে হল জানলার পাট কেউ কিছু দিয়ে ঠুকছে। চমকাল ভবতোষ। জানলার বাইরে কিছুর ছায়া পড়েছে মনে হচ্ছে না? সে ছায়া ঈষৎ কেঁপে কেঁপে উঠছিল। এ ছায়া নিশ্চয় কোন মানুষের হবে–চোর, এ তিনতলায় ব্যালকনিতে কি তা হলে চোর উঠে এসেছে ! অসম্ভব কিছু না।
ভব, কে ? বলে চীৎকার করল–ভাবটা তার এমন ছিল যে চোর হলে মানে মানে কেটে পরো বাবা, সামনা সামনির মোকাবিলার আমার হিম্মত নেই।
ছায়া সরে গেল–জানলা তেমনি খোলা। ভবর সাহস হল না উঠে গিয়ে জানলা বন্ধ করার। পাঁচ মিনিটও পার হল না, আবার সেই ছায়া–এবার জানলার শিক ধরে দাঁড়িয়ে আছে !
ভব স্পষ্ট চোখ নিয়ে তাকাল–একটা মেয়ের ছায়া না ! আলুথালু চুল তার মাথার দুপাশ ছড়িয়ে ঝুলছে !
–কে,কে ওখানে? নিজের ভয় ভাঙ্গার জন্যে ভবতোষ জোরেই চীৎকার করে উঠে ছিল।
–আমি, মিষ্টি মেয়েলি চাপা কণ্ঠ–বাতাসে ভেসে আসার মত।
–আমি, শব্দে ভব ভীষণ চমকে উঠলো। পরিচিত কণ্ঠ–তবে কি উর্মির কণ্ঠ ! ঊর্মির প্রেতাত্মা !
–কে, কে কথা বলছে? ভয় নিয়ে আবারও প্রশ্ন করে উঠলো ভব। কালো ছায়া ক্রমশ তার রূপ পালটাচ্ছিল। ভব স্পষ্ট দেখতে পেল–ছায়া কেমন ঘূর্ণির মত ঘুরছিল—আর অতি ধীরে ধীরে ঠিক যেন মানুষের মুখের আকৃতি নিচ্ছিল!
ভয় ও বিস্ময়ে ভব দেখতে থাকলো–একটা হালকা আলোর আবরণে এক নারীর মুখমূর্তি তৈরি হতে লাগলো। তত স্পষ্ট নয়–গোধূলির ম্লান আলোর মত–যেমন আগুন আলো হয়–হালকা দীপ শিখার মত ক্রমে ক্রমে তাতে ঊর্মির মুখ ভেসে উঠতে লাগলো!
–ঊর্মি ! হতভম্ব ভবর গলা চিরে বেরিয়ে এলো।
হাসছে ঊর্মি—জানলার শিকের বাইরে অবিকল সেই রূপ, সেই উর্মির মুখমণ্ডল–যেমত ছিল জীবিত ঊর্মির হাসি উজ্জল মুখটা !
–কি–ভয় পাচ্ছ? ঊর্মির গলা। ধীরে হলেও সে আওয়াজ ঘরের মধ্যে গমগম প্রতিধ্বনিত এক মিষ্টি আওয়াজ হয়ে ভাসছিল।
–তুমি ! ভীত সন্ত্রস্ত ভব বলে উঠল।
একান্ত আপন ভাব নিয়ে ঊর্মি বলে উঠলো–হ্যাঁ, তোমার একাকিত্ব আর দেখতে পারছি না গো !
ভবর ভয় আস্তে আস্তে কি কমে যেতে লাগলো ? ওর ভেতরে কেমন আবেশ আবেশ ভাব জড়িয়ে যেতে থাকলো। ওর শরীরের অনুভূতি অনেক কম হয়ে যাচ্ছিল। মনে হল কোন তন্দ্রায়িত দেশে সে পাড়ি জমাচ্ছে। নাকি এর পুরোটাই স্বপ্ন–ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ভব স্বপ্ন দেখছে না তো ! ও চেষ্টা করল নিজেকে নাড়িয়ে চাড়িয়ে দেখে নিতে কিন্তু না কিছুতেই তা সম্ভব হচ্ছে না।
এবার ভব চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে, ব্যালকনির দরজা না খুলেই ঊর্মির দেহ ক্রমশ ঘরের মধ্যে দৃশ্যমান হয়ে যাচ্ছে। হ্যাঁ, এবার ঊর্মিকে পরিপূর্ণ দেহের ঊর্মি মনে হচ্ছে–এক আস্ত ঊর্মি ? নিষ্পলক তাকিয়ে আছে ভবতোষ তার প্রিয়তমার দিকে। ঊর্মির মৃদু হাসি হাসি মুখ।
এক পা, এক পা এগিয়ে আসছে ঊর্মি। আর মাত্র দু হাত দুরে ও দাঁড়িয়ে আছে। যেমনটা হাসে সমস্ত শরীর দুলিয়ে ঠিক তেমন করে এবার ঊর্মি হেসে উঠলো–খিলখিল করে হেসে উঠলো। ভব নির্বাক দেখে যাচ্ছে। মুখ খুলে কিছু বলতে তার ইচ্ছে হচ্ছিল না।
–আমি আছি…জেনো তুমি…যেমনটা ছিলাম আগে…আবার গা নাচিয়ে খিল খিল হেসে উঠলো ঊর্মি।
ভব এবার নড়ে উঠলো–কলের পুতুলের মত। মনের গহনে তার ইচ্ছের উদয় হতে লাগলো। ভালবাসার ইচ্ছে–প্রেমিক প্রেমিকার ছুঁয়ে থাকার ইচ্ছে।
–আমায় শুতে দাও ভব ! ধীরে ধীরে ঊর্মি ঠিক তেমনি ভাবে এসে শয্যায় শুয়ে পড়ল–যেমনটি রোজ সে ভবর পাশটাতে শুত।
–আস না ভব…কাছে আসো…
ভবর মনে সব কিছু গুলিয়ে আছে–ও হাত বাড়িয়ে দিল। ঊর্মিকে স্পর্শ করতে–আর ঊর্মিকে স্পর্শ করা মাত্র ভব চমকে উঠলো। বরফ ঠাণ্ডা এক ছোঁয়ায় ও যেন নিজেকে দেখতে পেল, কে ! কে তুমি ? বলে ভব গলা ফাটা চীৎকার করে উঠলো।
পর মুহূর্তে নেই, কিচ্ছু নেই–সমস্ত কিছু যেন ভেনিস হয়ে গেছে! ঊর্মি নেই, আগুন আলো নেই, প্রদীপ শিখা নেই, এমন কি জানলাটাও খোলা নেই !
কেবল স্তব্ধ ঘর পড়ে আছে। মাথার ওপর পাখার ঘূর্ণায়মান শব্দ ভবর কানে ফিরে এলো।
পরদিন হঠাৎ গভীর রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেল, বিছানায় ধড়ফড় করে উঠে বসলো ভবতোষ। জানলার কাঁচ ফুঁড়ে ঝলমল রোদ এসে বিছানায় পড়েছে। দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকাল। ওরে বাবা, বেলা দশটা বেজে গেছে ! এবার পেট চোঁ চা করতে লাগলো–খুব খিদে পেয়েছে তার।
মনে পড়ল ভবর, গত কাল রাতে সে কি শুধু স্বপ্নই দেখেছিল? কিন্তু এত স্পষ্ট কি স্বপ্ন হতে পারে ?
না, হতে পারে না । এ যে স্বপ্ন নয়–প্রতি রাতের বাস্তবতা।
–তোমায় খুব ভালবাসি, ঊর্মি ! ভবতোষ ঊর্মিকে জড়িয়ে আছে। আর ঊর্মি খিল খিল করে হেসে চলেছে। না, সেই বরফ ঠাণ্ডা ভাব ভব আর অনুভব করতে পারে না।
–আমি তোমাকে জন্মজন্মান্তর এ ভাবেই পেতে চাই, ভব, তোমার সঙ্গে মিশে যেতে চাই !
পরম সোহাগে ভব ও ঊর্মি একে অন্যকে নিবিড় জড়িয়ে ঘুমোচ্ছে।
নিশুতি রাত পেরিয়ে যাচ্ছে—ঊষার পূর্ব মুহূর্তের আবছায়া অন্ধকার ঘিরে ধরেছে পৃথিবীকে। ঘন আঁধার কেটে ভোরের আলো ফুটে উঠছে।
ভবতোষ দেখল, নেই, বিছানায় ঊর্মি নেই।
এমনি ভাবেই তাদের প্রতিদিনের জীবন এগিয়ে চলছিল।
সমাপ্ত

৮৪৬ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
নাম :তাপসকিরণ রায়। পিতার নাম : স্বর্গীয় শৈলেশ চন্দ্র রায়। জন্ম স্থান: ঢাকা , বাংলা দেশ। জন্ম তারিখ:১৫ই এপ্রিল,১৯৫০. অর্থশাস্ত্রে এম.এ.ও বি.এড. পাস করি। বর্তমানে বিভিন্ন পত্র পত্রিকাতে নিয়মিত লিখছি। কোলকাতা থেকে আমার প্রকাশিত বইগুলির নামঃ (১) চৈত্রের নগ্নতায় বাঁশির আলাপ (কাব্যগ্রন্থ) (২) তবু বগলে তোমার বুনো ঘ্রাণ (কাব্যগ্রন্থ) (৩) গোপাল ও অন্য গোপালেরা (শিশু ও কিশোর গল্প সঙ্কলন) (৪) রাতের ভূত ও ভূতুড়ে গল্প (ভৌতিক গল্প সঙ্কলন) (৫) গুলাবী তার নাম (গল্প সঙ্কলন)
সর্বমোট পোস্ট: ১১২ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ১৬৬৯ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৮-১১ ১৫:৪৩:৫৪ মিনিটে
banner

১৩ টি মন্তব্য

  1. আহমেদ রব্বানী মন্তব্যে বলেছেন:

    দারুণ লিখেছেন দাদা।ধন্যবাদ।

  2. আহমেদ রব্বানী মন্তব্যে বলেছেন:

    দারুণ লিখেছেন দাদা।ধন্যবাদ জানবেন।অনেক দিন দেখি না আপনাকে।

  3. আরজু মূন মন্তব্যে বলেছেন:

    আপনার ভৌতিক উপাখ্যান পড়ে ভয় পেলাম। যদিও চমত্কার একটি লিখা। অনেক ভাল লাগলো তাপস দা। শুভেচ্ছা জানবেন। আগের মত চমত্কার গল্প লিখবেন আবার। অনেক ধন্যবাদ এই লিখার জন্য। শুভেচ্ছা রইল।

  4. আরজু মূন মন্তব্যে বলেছেন:

    নিশুতি রাত পেরিয়ে যাচ্ছে—ঊষার পূর্ব মুহূর্তের আবছায়া অন্ধকার ঘিরে ধরেছে পৃথিবীকে। ঘন আঁধার কেটে ভোরের আলো ফুটে উঠছে।
    ভবতোষ দেখল, নেই, বিছানায় ঊর্মি নেই।
    এমনি ভাবেই তাদের প্রতিদিনের জীবন এগিয়ে চলছিল।

    সুন্দর সমাপ্তি টেনেছেন তাপসদা।

  5. সারমিন মুক্তা মন্তব্যে বলেছেন:

    গা ছম ছম করে উঠছে৤

  6. তাপসকিরণ রায় মন্তব্যে বলেছেন:

    আপনার লেখা বোধহয় আগে পরিনি–ব্লগে নতুন কি আপনি?ভুতের গল্পে গা ছমছম করাটা উচিত–তা না হলে লেখার মজা কথায়?মন্তব্যের জন্যে ধন্যবাদ।

  7. মুহাম্মদ আনোয়ারুল হক খান মন্তব্যে বলেছেন:

    সত্যি বলতে কি তাপস ভাই, আপনার অন্য লেখার চাইতে এটা খুব বেশি ভাল লাগেনি। আপনি আরও ভাল ভাল ভূতের লেখা কিন্তু আমাদের উপহার দিয়েছেন। রাগ করবেন না প্লিজ।

  8. তাপসকিরণ রায় মন্তব্যে বলেছেন:

    সব লেখা ভাল হয় না–এ লেখাটি কাল্পনিক–আর সে কারনেই ভিত আলগা হয়ে থাকবে–আমার কিছু ভৌতিক লেখা কিন্তু সত্যি ঘটনা আধারিত।আমি মনে কিছু করিনি–বাস্তবটা মানতেই হবে।আন্তরিক ধন্যবাদ আপনাকে।

  9. সাখাওয়াৎ আলম চৌধুরী মন্তব্যে বলেছেন:

    ভালো লাগা রইলো।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top