Today 17 Jul 2018
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

মোহনীয় গজনী

লিখেছেন: মোঃ অলিউর রহমান | তারিখ: ১০/০৬/২০১৩

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 457বার পড়া হয়েছে।

আকাশ ডাকে আজ আমায়, পাহাড় ডাকে আজ আমায়, পথ হারিয়ে… মুখে মুখে ছড়িয়ে থাকা গানটির দুই লাইন মনে পড়তেই হৃদয়পটে ভেসে ওঠে আকাশছোঁয়া পাহাড়-পর্বতের কথা। সেসব পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে অদ্ভুত আলো-অাঁধারিতে যেন আকাশের সঙ্গেই মিতালি হয়ে যায়। তবে রাঙামাটি-বান্দরবানের মতো সুউচ্চ পাহাড়-পর্বতমালা না থাকলেও বৃহত্তর ময়মনসিংহের গারো পাহাড়ের আকর্ষণটা সম্পূর্ণ অন্যরকম। সেখানকার পরিবেশ-প্রকৃতি, জীবন হাতছানি দেয় বন্ধুত্বের, আরও বেশি আন্তরিকতার। গজনী থেকে মধুটিলা, অাঁচকিপাড়া থেকে লাউচাপড়া পর্যটন স্পটের সারি সারি পাহাড়-টিলা বেয়ে ইচ্ছামতো মাইলের পর মাইল ঘুরে বেড়ানো যায়।

image_762_121297

ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা এসব পাহাড়চূড়ায় উঠে আকাশের সঙ্গে মিতালি না হলেও মেঘের সঙ্গে চমৎকার ভালোবাসা গড়ে ওঠে। বর্ষা মৌসুমে মুহূর্তে মুহূর্তে মেঘের ঝাপটায় দেহমনজুড়ে শীতল অনুভূতি ছড়িয়ে দেয়। এ কারণে শেরপুরের মোহনীয় গজনী শীত, বর্ষা, গ্রীষ্ম, বসন্ত_ সব ঋতুতেই পর্যটকদের কাছে টানে, অাঁকড়ে রাখে। শেরপুর জেলা সদর থেকে ২৮ কিলোমিটার উত্তরে ঝিনাইগাতী উপজেলায় গজনী পাহাড়মালার অবস্থান। মেঘালয়-বাংলাদেশ সীমান্তরেখার ঠিক পাশেই পাহাড়-ঝরনা-লেক আর শাল-গজারির বনবেষ্টিত গজনী প্রাকৃতিকভাবেই সাজানো-গোছানো এলাকা। সেখানে সীমান্তরেখা বরাবর এক টিলা থেকে অন্য টিলার চমৎকার সংযোজন রয়েছে। পাহাড়চূড়ার একাধিক ঝরনা-ঝিরির পানি আপনমনে ঘুরেফিরে পাহাড়-টিলার চারপাশে। নিচু জায়গাগুলো হয়ে উঠেছে স্বচ্ছ পানির আধার। জেলা প্রশাসন পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়ায় চমৎকার লেক হয়েছে। এখন মুক্ত বিহঙ্গের মতো এর সৌন্দর্য উপভোগ করেন পর্যটকরা, নৌকা আর প্যাডেল বোটে সারা দিন ঘুরে বেড়ান তারা। ১৯৯৫ সালে শেরপুর জেলা প্রশাসন প্রায় ১০০ একর পাহাড়ি টিলা ঘিরে গড়ে তোলে চমৎকার এক পিকনিক ও শুটিং স্পট। পর্যটকদের জন্য আয়েশে ঘুরে বেড়ানোসহ বিশ্রামের নানা আয়োজন করে নাম দেওয়া হয় ‘গজনী অবকাশ কেন্দ্র’। লেকের কাছাকাছি পাহাড়ের নিচু অংশে বানানো হয় সুড়ঙ্গপথের ‘পাতালপুরী’ আর অপেক্ষাকৃত উঁচু পাহাড়চূড়ায় নির্মাণ করা হয়েছে সাইট ভিউ টাওয়ার। অন্যদিকে লেকের মাঝে ছোট আকারের দ্বীপটিলায় ‘লেকভিউ পয়েন্ট’ গড়ে তোলায় পর্যটক আকর্ষণ বেড়েছে বহুগুণ। ঝুলন্ত সেতু দিয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে লেকভিউ পয়েন্টকে। সেখানে পর্যটক ভিড় যেন লেগেই থাকে। শিশুপার্ক, মিনি চিড়িয়াখানা, মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিস্তম্ভ, পাথরের মৎস্যকন্যা, ডাইনোসর, বাঘ, হাতি, জিরাফ, বানর, কুমির, হরিণসহ বিভিন্ন জীবজন্তুর প্রতিকৃতি স্থাপন করায় পর্যটন কেন্দ্রটি সত্যিই ভ্রমণের সেরা স্থানে পরিণত হয়েছে।

লেকপাড়েই রয়েছে বিরাট আকৃতির এক বটগাছ। প্রকৃতির কোলে এমন বিশাল বটবৃক্ষের নিচে বসে আড্ডা মারার তুলনাই হয় না। এই বটতলাকে-ঘিরে চারপাশে সিমেন্টের বাঁধানো বেদিতে বসার চমৎকার ব্যবস্থা রয়েছে। পাশেই ক্রিসেন্ট লেক। লেকের মাঝখানে আছে লেকভিউ দ্বীপ। সেখানে যাওয়ার জন্য আছে রংধনু নামক ঝুলন্ত ব্রিজ। লেকে ঘুরে বেড়াতে প্যাডেল বোটের পাশাপাশি আছে পানসি নৌকা। লেকঘেঁষা টিলাতেই রয়েছে কৃত্রিম জলপ্রপাত। অবকাশ রেস্ট হাউস আর পার্ক থেকে নিচে নামার জন্য আছে ১৩০ ধাপের পদ্মসিঁড়ি। ধাপগুলো পেরিয়ে ওঠানামায় কষ্ট আছে, ক্লান্তি আছে, তবে অফুরান আনন্দ-উচ্ছ্বাসও আছে বেশ।

সুড়ঙ্গপথ-পাতালপুরী : সুড়ঙ্গপথ ড্রাগনের বিশাল আকৃতির মুখ-গহ্বর দিয়েই ভেতরে প্রবেশ করতে হয়। পাতালপুরীর অাঁকাবাঁকা চোরাপথ দিয়ে এপার থেকে ওপার যেতে একাকী যে কারও ভয় লাগবে, গা ছমছম করে উঠবে। দিনের বেলাতেও ভেতরে থাকে জমাট অন্ধকার। অনেকে মোবাইলের আলো জ্বেলে লেকপ্রান্ত থেকে ঢুকে বেরিয়ে যাচ্ছে অপর প্রান্তের অভিও গারোদের বাড়ির দিকে। আবার কেউ কেউ দল বেঁধে ঢুকছে পাতালপুরী।

সাইড ভিউ টাওয়ার : পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণ সাইড ভিউ টাওয়ার। এ টাওয়ারে দাঁড়িয়ে পর্যটকরা গজনী ও আশপাশের পুরো এলাকা অবলোকন করতে পারেন। ১২০ ফুট উঁচু টাওয়ারে উঠে ভারতীয় ভূখণ্ডে লোকজনের চলাফেরা, বাড়িঘর আর আকাশছোঁয়া উচ্চতার পাহাড়-পর্বত দেখেন অনায়াসে। ওপারের পাহাড়গুলোর অর্ধেকটা স্বাভাবিক দেখা গেলেও তার উপরের অংশ ঘন বনের জমাট কালো অাঁধারে ঢাকা থাকে। দূর থেকেও ভয়ার্ত পরিবেশের কথাই মনে করিয়ে দেয়। তবে এ প্রান্তে গজনীর পাহাড় ছোটখাটো গাছপালা আর ঘন ঝোপঝাড়ে আবৃত, এখানকার চূড়ায় দেখা মেলে মেঘের খেলা।

হনুমান সর্দার কর্তৃক পোশাক ছিনতাই : অবকাশ কেন্দ্র ঘুরেফিরে দেখলেও উত্তর-পূর্ব দিকের কোচপাড়ার পথে পা না বাড়ানোই ভালো। সেখানে সীমান্তরেখা ‘জিরো পয়েন্ট’ অাঁকাবাঁকা। কখন যে বাংলাদেশ সীমানা ছাড়িয়ে মেঘালয় প্রান্তে পা পড়বে তা বুঝে ওঠা মুশকিল। তাই ওতপেতে থাকা বিপদ স্থানটি এড়িয়ে চলতেই পরামর্শ দেন স্থানীয় বিজিবি কর্মকর্তারা। অবকাশ কেন্দ্র ছেড়ে পশ্চিম দিকে বেরিয়ে রাস্তার মোড়ে এলেই উত্তর দিকে বনের ভেতর দিয়ে পিচঢালা পথ দেখা যায়। সে রাস্তা ধরে পায়ে পায়ে ছোট গজনী গ্রামে গেলেই দেখা যাবে গারো, হাজং, কোচ আদি বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার সুপ্রাচীন সংস্কৃতি। তবে একাকী এ পথ না মাড়ানোই ভালো_ এ পথের দুই ধারে বনে বনে অসংখ্য হনুমান-বানরের উপস্থিতি রয়েছে। একা কাউকে পেলে শায়েস্তা করার নানা নজির রয়েছে বানর দলের। ভয় দেখিয়ে জামা-কাপড় খুলে নিয়ে নিজের গায়ে লাগিয়ে হনুমান সর্দারের ঘুরে বেড়ানোর দৃশ্য অনেকেই দেখেন। তা দেখে দর্শকরা হাসাহাসি করলেও যিনি পোশাক হারান তার অবস্থা শোচনীয় হয়ে দাঁড়ায়।

ছোট গজনীর পলাশ রেমাকে খুঁজে পাওয়া গেলে তার সহায়তা নিয়ে ঘুরে দেখা যাবে পুরো উপজাতি পল্লীটি। পলাশ রেমার বাড়ি যাওয়ার পথেই নাম নাজানা একটি গাছের সন্ধান মেলে বনের সামান্য ভেতরেই। স্থানীয়রা বলেন, গাছটি রাত-দিন কাঁদে। সে গাছের ডালপালা, পাতা, শিরা, কাণ্ড সবকিছু থেকে অবিরাম পানি ঝরে। সূর্যতাপ প্রখর হলে, ভ্যাপসা গরমে মানুষ অস্থির হলে তখন গাছটি থেকে পানি ঝরার মাত্রাও বেশ বেড়ে যায়। পানি ঝরতে ঝরতে ইতোমধ্যেই গাছটির চারপাশে ডোবা আকার ধারণ করেছে। স্থানীয় মুরবি্বরা জানান, আনুমানিক ২০-২২ ফুট উঁচু-ডালপালাবেস্টিত গাছটিকে তারা আরও ৪০-৫০ বছর ধরেই কাঁদতে দেখছেন।

যেভাবে যাবেন গজনী : ঢাকার মহাখালী থেকে শেরপুরের যাত্রীবাহী বিভিন্ন কোচ সার্ভিসে সোজা শেরপুর জেলা শহরের বাস টার্মিনালে যাওয়া যায়। সময় লাগে সাড়ে তিন ঘণ্টা থেকে চার ঘণ্টা। ভাড়া সর্বোচ্চ ২২০ টাকা। সেখান থেকে সামান্য দূরেই লোকাল বাস টার্মিনালে যেতে হবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা অথবা রিকশায়। লোকাল বাস টার্মিনাল থেকে বাসে উঠে যেতে হয় ঝিনাইগাতী, বাস ভাড়া লাগে জনপ্রতি ২৫ টাকা। অবশ্য চাইলে শেরপুর জেলা শহরের খোয়ারারপাড় মোড় থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা রিজার্ভ করেও ২০ কিলোমিটার উত্তরের ঝিনাইগাতি উপজেলা সদরে পেঁৗছানো যায়। সেখান থেকে রিকশা, ভ্যান, অটোরিকশা অথবা টেম্পোযোগে আট কিলোমিটার দূরের গজনী অবকাশ কেন্দ্রে পেঁৗছানো যায়। জনপ্রতি খরচ পড়ে ৩০-৩৫ টাকা।

থাকবেন কোথায় : গজনী অবকাশ কেন্দ্রে নির্মিত সরকারি বিশ্রামাগারটিতে দুটি ভিআইপি কক্ষ ছাড়াও চারটি সাধারণ কক্ষ রয়েছে। শুধু দিনের বেলার জন্য শেরপুর জেলা নেজারত শাখায় ৫০০ টাকা অগ্রিম জমা দিয়ে একেকটি রুম বুকিং করা যায়। তাছাড়া লেকের ওপর ব্যক্তিগত উদ্যোগে নির্মাণ করা হয়েছে দুই কক্ষবিশিষ্ট ‘জিহান রেস্ট হাউস।’ জেলা পরিষদের রেস্ট হাউসের প্রতি কক্ষ এক রাতের জন্য ভাড়া ৫০ টাকা, এলজিইডির বাংলোয় প্রতি কক্ষ ৫০ থেকে ১০০ টাকা এবং সার্কিট হাউসের প্রতি কক্ষ ৪০০ টাকায় ভাড়া দেওয়া হয়। শহরের আবাসিক হোটেলগুলোর মধ্যে হচ্ছে হোটেল সম্পদ, হোটেল বাগানবাড়ি ও কাকলি গেস্ট হাউস অন্যতম। এসব হোটেলের রুম ভাড়া ১০০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত। ৫০০ টাকা ভাড়ার মধ্যে এসি রুমও পাওয়া যায়।

৫৮৬ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
সর্বমোট পোস্ট: ৩২ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ২০ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৫-১৯ ০৭:৪০:২১ মিনিটে
banner

৯ টি মন্তব্য

  1. আজিম হোসেন আকাশ মন্তব্যে বলেছেন:

    লিখে যান প্রতিনিয়ত।

  2. আমির হোসেন মন্তব্যে বলেছেন:

    কিছু ভ্রমন কাহিনী আমার কাছে পান্ডুলিপি আকারে জমা আছে। এত ব্যস্তসময় কাটাচ্ছি, সময় পাচ্ছি না। আশা রাখি ভবিষ্যতে তা প্রকাশ করব। আপনার লেখাটি ভাল লাগল। ধন্যবাদ।

  3. মিলন বনিক মন্তব্যে বলেছেন:

    চমৎকার অবিজ্ঞতা….জেনে খুব ভালো লাগল…একসময় ঘুরে আসতে পারলে ভালো লাগবে….লেখককে ধন্যবাদ…

  4. বদরুল হোসেন মন্তব্যে বলেছেন:

    khub e sundor lekha

  5. এ হুসাইন মিন্টু মন্তব্যে বলেছেন:

    গল্প ও ছবি দুটোই খুব ভালো লাগল

  6. শাহ্‌ আলম শেখ শান্ত মন্তব্যে বলেছেন:

    গল্পের সহিত ছবি বেশ সাদৃশ্য ।

  7. সহিদুল ইসলাম মন্তব্যে বলেছেন:

    বর্ণনা ভালো লাগলো, কিন্তু যাতায়াতের জন্য ভালো কোন বাস নাই আমার মনে হয়, কারণ ২০০৭ সালে আমি একবার ময়মনসিংহ-শেরপুর গিয়েছিলাম।

  8. দীপঙ্কর বেরা মন্তব্যে বলেছেন:

    অনেক কিছু জানা গেল

  9. সবুজ আহমেদ কক্স মন্তব্যে বলেছেন:

    পড়ে ভালো লাগলো

    চালিয় যান

    শুভ কামনা রইল

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top