Today 18 Oct 2018
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

রওশন ইজদানী: লোক-ঐতিহ্য অন্বেষার এক প্রাজ্ঞ পুরুষ

লিখেছেন: হাসান ইকবাল | তারিখ: ০৯/০৭/২০১৪

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 474বার পড়া হয়েছে।

দুঃখু কইও বন্দের লাগ পাইলে
                        গো নিরলে,
আমার বন্দু রঙিচঙি
জলের উপর বানচে টঙ্গিগো
দুই হাত উড়ায়া বন্ধে
ডাকে গো নিরলে
দুঃখু কইও বন্ধের লাগ পাইলে।।
(রাখালী গান, রওশন ইজদানী)

রওশন ইজদানী প্রখ্যাত কবি ও প্রাবন্ধিক, লোক. সাহিত্যের গবেষক ও সংগ্রাহক। তিনি ‘মোমেনশাহীর লোক সাহিত্য’ ও ‘পূর্ব পাকিস্তানের লোক সাহিত্য’- এ দুটি মৌলিক গবেষণা গ্রন্থের জন্য খ্যাতি অর্জন করেন। প্রখ্যাত কবি ও প্রাবন্ধিক, লোকসাহিত্যের গবেষক ও সংগ্রাহক রওশন ইজদানী ১৯১৭ইং সাল, বাংলা ১৩২৪ সালের ১৫ ফাল্গুন নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার বিদ্যাবল¬ভ গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। তাঁর পিতার নাম শেখ আলী কবির। পিতা শেখ আলী কবিরের পেশা ছিল কবিরাজি চিকিৎসা। দশ বছর বয়সে পিতার মৃত্যু হলে স্থানীয় ওল্ড স্কিম মাদ্রাসায় রওশন ইজদানীর বিদ্যাশিক্ষার হাতে খড়ি। পরে আশুজিয়া হাইস্কুলে ভর্তি হন রওশন ইজদানী। এ স্কুলে দশম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন তিনি। আঠারো বছর বয়সে মা মারা যাবার কারণে তাঁর লেখাপড়ায় ছেদ পড়ে। মা চলে যাবার পর  উদাসীন হয়ে বাউলদের প্রতি ঝুঁকে পড়েন ইজদানী এবং বাউল গান গেয়ে সময় কাটান। এর কিছুকাল পর জুবায়দা আখতার খাতুনকে বিবাহ করে সংসার ধর্মে প্রত্যাবর্তন করেন।

প্রথম জীবনে ১৩৪৬ সালে গ্রামের প্রাইমারী স্কুলে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন ইজদানী। এর কিছুকাল পরে ঋণ সালিসি বোর্ডের কেরানির চাকুরিতে যোগদান করেন। ১৯৪৮ সালে ‘দৈনিক আজাদের’ রিডিং সেকশনে যোগ দেন তিনি। এর পর ১৯৫৮ সালে ফ্রাঙ্কলিন পাবলিকেশনের প্রুফ রিডার, গ্রেড-১ পদে যোগদান করেন। ভগ্ন স্বাস্থ্যের জন্য ১৯৫৯ সালে প্রুফ রিডারের চাকুরি ছেড়ে দিয়ে তিনি গ্রামের বাড়িতে প্রত্যাবর্তন করেন এবং সাহিত্য সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত করেন।

রওশন ইজদানী মূলত: পল¬ী কবি হিসেবে খ্যাত। তিনি রসুল (সা.)-এর উপর একটি পুরো কাব্য খাতামুন নবীঈন রচনা করেন। তিনি লোকসাহিত্য নিয়ে তিনি অনেক লেখালেখি করেছিলেন। তার গবেষণা গ্রন্থ ‘মোমেনশাহীর লোক সাহিত্য’ ও ‘পূর্ব পাকিস্তানের লোক সাহিত্য’।, কবি রওশন ইজদানীর প্রকাশিত গ্রন্থ ২৬টি এবং অপ্রকাশিত গ্রন্থ ১৮টি। পাঠ্য পুস্তক প্রকাশনার সংখ্যা ৬টি। তাঁর উলে¬খযোগ্য গ্রন্থ হলো- নীল দরিয়া, মরুর কাফেলা, হৃদয় বীণা, ভাঙ্গা বীণা, বজ্রবাণী, ইউসুফ জুলায়খা, মোমেনশাহীর প্রাচীন পল¬ী ও সমাজ জীবন ইত্যাদি।

মূলত: তিনি পল¬ীকবি হিসেবে খ্যাত। তার কবিতায় বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি উজ্জ্বলভাবে প্রকাশিত হয়েছে। মতাদর্শের ক্ষেত্রে ইসলামি ভাবধারা অনুসারী। লোকসাহিত্যের বিস্ময়কর ভান্ডার ময়মনসিংহের লোক-ঐতিহ্য অনুসন্ধান ও গবেষনার যে ধারাটি প্রবাহমান, সে ধারারই এক উজ্জ্বল প্রতিভা কবি ও লোককবি রওশন ইজদানী। রওশন ইজদানীর সাহিত্য জীবনে ময়মনসিংহ গীতিকার কিংবদন্তী পুরুষ চন্দ্রকুমার দে, খ্যাতনামা ফররুখ আহমেদ, লোক সাহিত্যপ্রেমী সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরী প্রমুখের অবদান, সাহচর্য, প্রভাব ও পরামর্শ ছিল অপরিসীম।

নেত্রকোনা জেলাধীন কেন্দুয়া থানাধীন চন্দ্রকুমার দে’র আইথর গ্রাম এবং রওশন ইজদানীর গ্রাম বিদ্যাবল¬ভ মাত্র ছ মাইলের ব্যাবধান। আর সে সুবাদেই জীবনের প্রথম পর্বে বাউল গীতি সাধনার কবি রওশন ইজদানীর সাথে চন্দ্রকুমার দে’র যোগাযোগ গড়ে উঠে। আর সে সময়ই চন্দ্রকুমার দে’র পরামর্শ ও অনুপ্রেরণায় তিনি বাউল গীতি রচনার স্তর থেকে লোকসাহিত্য চর্চার প্রতি আকৃষ্ট হন। কবি ফররুখ আহমদও তার কবিত্ব বৈশিষ্ট্য অনুধাবন করে তাকে পল¬ী সাহিত্যের জগত থেকেই সাহিত্য রচনার তাগিদ দেন। এ ব্যাপারে সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরীও তাকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। তার লেখনীতেই এসব কথার প্রমাণ মেলে-
‘আশা কইরে বাঁধলাম বাসা
না-পুরিল মনের আশা গো,
আমার আশা বৃক্ষের ডাল ভাঙিয়া গেলরে।
চাতক রইল মেঘের আশে
মেঘ ভাইস্যা যায় অন্য দেশে গো,
জল বিনে চাতকের প্রাণ গেলরে।’
(রাখালী গান, রওশন ইজদানী)

রওশন ইজদানী সেখান থেকে উৎসাহিত হয়েই বিভিন্ন পুথি, পালা, গীতিকা, কিচ্ছা-কাহিনি, ধাঁধাঁ, প্রবাদ প্রভৃতি সংগ্রহ ও এসবের গবেষণায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন অটল সাধনায়। সেই সাধনারই ‘মোমেনশাহীর লোক সাহিত্য’ ও ‘পূর্ব পাকিস্তানের লোক সাহিত্য’। লোক জীবনের বিশ্বাস ও আচার অনুষ্ঠান, উৎসব-আনন্দ, ব্রত-পূজা-পার্বণ, জারি-সারি, প্রবাদ-প্রবচন, ধাঁধাঁ, লোকগাঁথা ও তন্ত্রে-মন্ত্রে প্রতিফলিত হয়েছে। তাই তিনি দক্ষতার সাথে তুলে ধরেছেন এই অমূল্য দুটি গ্রন্থে।

কোন প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ ও সহযোগিতা ছাড়াই রওশন ইজদানী ময়মনসিংহের লোকসাহিত্যের সংগ্রহে ও বিশ¬ষণে যে বিশাল কাজ সম্পন্ন করেছেন তাতে তার একনিষ্ঠ সাধনাই জয় লাভ করেছে। বাংলা একাডেমি থেকে এখন প্রতিবছর ফোকলোর সিরিজ প্রকাশিত হয়, ‘মোমেনশাহীর লোক সাহিত্য’ ছিল সে সিরিজের প্রথম প্রকাশনা। তিনি ময়মনসিংহের বিখ্যাত বাউলদের সম্পর্কেও ‘আজাদ’ ও ‘মোহাম্মাদী’ সহ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রবন্ধ রচনা করেছেন। বাউল কবি আব্বাছ, বাউল সাধক রশিদ উদ্দিন ইত্যাদি তার উলে¬খযোগ্য প্রবন্ধ। লোকসাহিত্যের আঙিকে কাব্যরচনা করে যিনি যিনি সর্বাপেক্ষা খ্যাতি অর্জন করেছেন তিনি সেই লোক-ঐতিহ্য অন্বেষার প্রাজ্ঞ পুরুষ রওশন ইজদানী।

তার কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো- তিনি নেত্রকোনা তথা পূর্ব ময়মনসিংহের লোকভাষাকে তার কবিতায় ব্যবহার করেছেন। তিনি একজন খাঁটি পল¬ীদরদী কবি। বর্ণনাভঙ্গী, বিষয়বস্তু, ভাষা এমনকি উপমা প্রয়োগেও তিনি পল¬ীর সহজ সরল ভাষাকেই ব্যবহার করেছেন। এ ব্যাপারে কখনও তিনি লোকজ ঐতিহ্য ও উপমাকে নতুন অভিধায় ব্যাঞ্জিত করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি নিজেই বলেছেন- ‘আমার কথায় এতটুকুন পালিশ টালিশ নাই, যাদের লাগি সাজছি ‘গায়েন’, তাদের সুরেই গাই।’

‘সাহিত্যের ভাষার উৎস হবে জনজীবন’-এই বিশ্বাস থেকে রওশন ইজদানী তার নিজস্ব পথে ধরে চলতে গিয়ে রচনায় আটপৌরে গ্রামীণ শব্দ ব্যবহার করে জ্ঞাত কিংবা অজ্ঞাতসারেই হোক বাংলা সাহিত্যের শব্দ ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। তার রচিত গান ও গানের ভাবাদর্শ আমাদের আজও উদ্বেলিত করে। কিছু গান এখনো আমাদের হৃদয়ে দোলা দেয়, হৃদয় ব্যাকুল হয়। এগুলোর সংরক্ষন এখন খুব জরুরী।

তিনি রচনা করেছিলেন কাহিনিকাব্য ‘ইউসুফ জুলেখা’। নীল রংয়ের কালিতে হস্তাক্ষরে লিখিত ৭৭ পৃষ্টার এই পান্ডুলিপি কাহিনিকাব্যের শুরুর অংশের খানিকটা তুলে ধরছি জুলেখার বর্ণনা অংশ থেকে-
তৈমুছ জাদী জুলেখার রূপে উজালা বাপের পুরী,
গলে গজমতী শোভে গলাহার-হাতে শোভে অঙ্গুরী।
নাই কোন দুখ-ধনের জনের, ভরা ধন ভান্ডার,
বাপের মায়ের একা গুলনিধি-টুকরাটি কল্জার।
ধনের উপরে উঠে বসে শোয়-ধনে যায় গড়াগড়ি,
মনের উলাসে রাখে বাপ মায় সাজায়ে রূপের পরী।
কত মতিলাল উড়ে শিক ছাড় ভাবে নাকো বাপ মায়,
মনের উলাসে সাজাইয়া রাখে সোহাগিনী কন্যায়।
….
স্বর্ন খাট পালং সজ্জিত সারি সারি
পান থেকে চুন খসিলেই- হয় তার মন ভারী।
সোনার মহলে রূপের কুমারী-হেসে খেলে যায় দিন,
পঞ্চ সুখের সুখী সংসার-দুখ ব্যথা লেশহীন।

‘জুলেখার পয়লা খাব’ অংশে তিনি তুলে ধরেছেন নান্দনিক ছন্দে জুলেখার স্বপ্নের বর্ণনা। যা পাঠককে শুধু মুগ্ধই করেনা, পাঠের আরো গভীরে টেনে নিয়ে যায়-
অবসান প্রায় ফাগুন যামিনী-কুলায় জাগিছে পাখি,
ফুলবাগে ফুল খুলিতেছে ধীরে-ঢুলু ঢুলু আঁখি।
উঠিলা বসিয়া ধড়মড় করি জুলেখা শয্যাপর,
বিস্মিত আঁখে চাহিয়া বারেক হেরিলা সকল ঘর।
ডাকিতে লাগিলা যত সখিজনে ‘ওগো তোরা কে কোথায়?’
আয় ত্বরা যবে আয়
শীঘ্র খুলিয়া বল,
একি হেরিলাম আজিকে স্বপনে-কে গেল ছলিয়া ছল?
একি এক অপরূপ রূপে-রূপের পূর্ণ চাঁন,
সেই অপরূপ রূপের ঝলকে পুড়িয়া গিয়াছে প্রাণ।
… …
এসেছিল এক রূপের কুমার নীরব নিশুতি রাতে,
হাসিয়া নীরব, ধীরে ধীরে আসি বসিল এ শয্যাতে।
রূপের কুমার সে যে অপরূপ-রূপে ভরে গেল ঘর,
ভরে গেল সেই রূপের রাশিতে- এ ভূবন চরাচর।

‘ইউনুসের পয়দায়েস’ অংশে ইউনুসের বর্ণনাসহ নানান বিষয় উঠে এসেছে অত্যন্ত নিঁপুন শব্দের বুননে। এছাড়া জুলেখার দুছরা খাব, প্রকৃতিস্’া জুলেখা, জুলায়খার শাদী, আজিজকে জুলেখার প্রথম দর্শন- পর্বগুলি পাঠক হৃদয়কে মোহাচ্ছন্ন করে। ঘটনার ধারাবাহিকতা, শব্দচয়ন এবং সহজ সরল বর্ণনা স্বাভাবিকভাবেই পাঠক-শ্রোতার মনকে সেই পটভূমিতে নিয়ে যায়। রওশন ইজদানী তার লেখা ‘পল¬ীসাহিত্যে চন্দ্রকুমারের মুনশিয়ানা’ শিরোনামের অগ্রনি’হত প্রবন্ধে পল¬ীসাহিত্য নিয়ে কিছু আলোচনা করেছেন। সেখানেও চন্দ্রকুমার দে’র সাথে তার ঘনিষ্টতার কথা জানা যায়।
‘…..মৈমনসিংহ গীতিকা’র সংগ্রাহক চন্দ্রকুমার দে’র সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে তার জীবন সায়াহ্নে। তার জন্মস্’ান ‘আইথর’ গ্রাম আমার বাড়ি থেকে মাইল পাঁচেক পূর্ব্বদিকে অবসি’ত। বর্তমান কেন্দুয়া থান অফিস থেকে এক মাইল উত্তর-পশ্চিম দিকে। আমি প্রায়ই তার বাড়িতে যেতাম। আলাপ আলোচনা হতো পল¬ীসাহিত্য সম্বন্ধে।’

পল¬ীসাহিত্য সম্পর্কে তিনি আরো বলেন-
‘…..দেশ-কাল-পাত্র বিবেচনা করে পল¬ীকে- পল¬ীর সমাজ মানসকে বিচার বিবেচনা করার মতো এমন নির্ভরযোগ্য দলিল আর দ্বিতীয়টি আর নেই। পল¬ী সাহিত্যের এসব প্রাচীন সম্পদ একান্তভাবে খাঁটি ও নিরাভরন। এ গুলির প্রত্যেকটি আমাদের সমাজ মানসের সুষ্ঠু সর্ব্বাঙ্গ সুন্দর ও নির্ভর যোগ্য আলেখ্য।’

‘আমার সাংবাদিক জীবন’ প্রবন্ধে তিনি তার সাহিত্য চর্চার কথা তুলে ধরেছেন। যা তার সাহিত্য চর্চাকে আরো শাণিত ও বেগবান করেছিল।
‘…..আজাদে চাকুরি করে সাংবাদিকতার ছিঁটেফোটা শিখেছি কিনা জানিনা; তবে অন্য বিষয়ে আমি যথেষ্ট লাভবান হয়েছি। কাগজের অফিসে চাকুরি করলে যে বহুমূখী শিক্ষার সুযোগ ঘটে, তার মূল্য অপরিসীম। আজাদে এমনও হয়েছে যে, একটি শব্দ নিয়ে তর্ক উঠেছে, শেষ মওলানা কাছ পর্যন্তও গিয়ে তার ফাইনাল বা শেষ মীমাংসা হয়েছে। শিক্ষণীয় বিষয় নিয়ে বিতর্কের এই যে প্রশস্ত ক্ষেত্র এমনটি আর কোথাও নাই।

কাগজ শুধু সাংবাদিকতারই কেন্দ্রভূমি নয়-সাহিত্যেরও। এ দুটি  ক্ষেত্রে পরস্পর অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। দীর্ঘ সাত বৎসর আমি ‘আজাদে’ সংশি¬ষ্ট ছিলাম। এর মধ্যে আজাদে’র কল্যাণে যেটুকু লাভবান হয়েছি, সম্ভবত: আরও অধিক মাত্রায় হতে পারতাম যদি শ্রদ্ধেয় মওলানা আকরম খাঁ সাহেব এর সাক্ষাৎ সম্পর্কে থাকতাম। তথাপি মাঝে মাঝে বা কালেভদ্রে তার নিকট থেকে যে দু-একটা কথা শুনেছি তার মূল্যও নেহায়েত কম নয়। মওলানা সাহেব একদিন কি এক প্রসঙ্গক্রমে বলেছিলেন-‘ভাঙ্গবে, কিন্তু মচ্কাবে না।’ আমি বিশ্বাস করি বাস্তবিক তার জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে সংকল্পের এই কঠোরতা ছিল বলেই তিনি এই বিরাট ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে পেরেছেন।’

এছাড়া আজাদ পত্রিকার সম্পাদক জনাব আবুল কালাম শামসুদ্দীন এবং তার লেখা ‘খাতামুন নবীঈন’ সম্পর্কেও স্মৃতিচারণ পাওয়া যায় এ প্রবন্ধে-
‘…..আজাদ চাকুরি জীবনে আমি সমধিক উপকৃত হয়েছি আজাদ সম্পাদক জনাব আবুল কালাম শামসুদ্দীন সাহেবের নিকট থেকে। তিনি যা ভাল বুঝেন তা অকপটে প্রকাশ করেন-তার সপক্ষে কেউ থাক্ বা না থাক্। অবশ্য এই স্পষ্টবাদিতার জন্য তার মতের প্রতি সুধী ব্যাক্তিমাত্রেরই একটা শ্রদ্ধা থাকে। সাহিত্য সংক্রান্ত ব্যাপারে শামসুদ্দিন সাহেবের নীতি এবং মতামতকে আমি একান্তভাবে শ্রদ্ধা করি। কতিপয় ক্ষেত্রে তার যে পরিচ্ছন্ন দূরদৃষ্টির পরিচয় আমি পেয়েছি তাতে করেই তার মতের প্রতি আমার প্রত্যয় হয়েছে আরও সুদৃঢ় ও সুগভীর।
বিশেষত: আমার ‘খাতামুন নবীঈন’ রচনার প্রাথমিক প্রেষনা কবি ফররুখ আহমদ সাহেব দিলেও তা রচনায় আমি সাহসী হতাম না যদি শামসুদ্দীন সাহেব এটি রচনার সাথে ধারাবাহিকভাবে মাসিক ‘মোহাম্মদী’ তে প্রকাশের অগ্রীম প্রতিশ্রুতি না দিতেন। তার উৎসাহেই আমি এমন সুবিশাল কাজের গুরু দায়িত্বভার মাথায় তুলে নেই।’

রওশন ইজদানীর আরেকটি প্রবন্ধ ‘সাংবাদিক জীবনের স্মৃতিকথা’ বাংলা ১৩৭৪ সালের ১৭ই আষাঢ় আজাদে ছাপা হয়েছিল। সে পবন্ধে তার সাংবাদিক জীবনের স্মৃতিময় দিনগুলোর কথা তুলে ধরেছেন-
‘….আমি আজাদ পত্রিকার সাক্ষাৎ সম্পর্কে আসি ১৯৪৮ সালের শেযাশেষি। কলকাতা থাকাকালে আজাদে কচিৎ দু-একটি লেখা পাঠাতাম- হয়তো কোন একটি প্রকাশিত হত- মুকুলের মাহফিলেও দু-একটা।
….ঢাকায় আমাদের নবনির্মিত ঘরে তখন সবেমাত্র কাজ শুরু হয়েছে। চাকুরী করার বাসনা নিয়ে জনাব শামসুদ্দীন ও জনাব মুজিবর রহমান সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম। উভয়ই আশ্বাস দিলেন। অত:পর ১৯৪৮ সনের শেষাশেষি আজাদের বার্ত্তা বিভাগে নিযুক্ত হলাম। আমি কখনও পারতপক্ষে অতিরিক্ত বা ডবল ডিউটি করে অতিরিক্ত রোজগারের প্রয়াস পেতাম না। এ জন্য সহকারী মওলবী আবু আহমদ সাব হেসে বলতেন-‘ইজদানী সাবের টাকার গরজ নেই।’
…..আজাদের পরিবেশটা যেমন ছিল মধুর তেমন ছিল আকর্ষণীয়। সেকশনে একটি মানুষ ছিল। আমাদের নিত্য নৈমিত্তিক হাসিখুশি জমিয়ে রাখার কেন্দ্র। নামটি ছিল তার আবদুল মালেক মোল¬া। সাপ্তাহিক মোহাম্মাদী’র জন্ম থেকে তিনি কাগজে চাকুরী করেন। সাব এডিটর, প্রুফরীডার দুপদেই তিনি সম পারদর্শী। আর একটি যোগ্যতা ছিল তার- তিনি ভাল স্কুল মাষ্টার। তিনি হঠাৎ রেগে যেতেন। কিন্তু আদতে ছিলেন তিনি একান্ত সরলমনা, রাগও অধিকক্ষন স’্ায়ী হতো না।’

কবি রওশন ইজদানী সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল আজাদের ১৭ আষাঢ় ১৩৭৪ সংখ্যায়। প্রবন্ধটির শিরোনাম ছিল ‘সাংবাদিক রওশন ইজদানী’। প্রবন্ধটি লিখেছিলেন জনাব আবদুল মালেক। তার স্মৃতিচারণে কিছু বিষয় উঠে এসেছে-
‘কলিকাতা হইতে আজাদ অফিস ঢাকায় আসবার পর এই পত্রিকার সংশোধন বিভাগে যে কয়জন নতুন সহকর্মীর সঙ্গে আমার কাজ করার সুযোগ হয় বন্ধুবর কবি রওশন ইজদানী ছিলেন অন্যতম। আজাদের সংশোধন বিভাগের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল বা আছে- তা হল মধুর পরিবেশ। রওশন  ইজদানী কয়েক বৎসর পূর্ব্বেই  এই পত্রিকার কাজ ছাড়িয়া চলিয়া যান কিন্তু এই বিভাগের সহকর্ম্মীদের প্রীতির আকর্ষণ তিনি কোনদিনই ছিন্ন করিতে পারেন নাই। ঢাকা আসিলেই তিনি তার প্রিয়  সহকর্ম্মীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ না করিয়া দেশে ফিরিতে পারিতেন না।’

এ প্রবন্ধে, আজাদে চাকরীকালীন ঢাকায় থাকা এবং তাদের পারস্পরিক হৃদ্যতায় ঘেরা দিনগুলোর কথা বর্ণনা করেছেন এভাবে-
‘১৯৫২ সালের দিকে ২২নং শায়েস্তা খান রোডে আজাদ এর কর্ম্মচারীদের একটি মেস ছিল। আমাদের সঙ্গে ইজদানী সাহেবও এখানে আলাদা একখানি কামরা লইয়াছিলেন। …তিনি লেখক, কবি এবং সাহিত্যিক। নীরবে নি:ঞ্ঝাটে মেসের কল কোলাহল হইতে দূরে থাকিয়া লেখালেখির জন্য আলাদা রুম ছাড়া তার চলিত না। তার হাতের লেখা অত্যন্ত সুন্দর ছিল। তার হস্তাক্ষরের মধ্য দিয়া মুন্সিয়ানার ছাপ ফুটিয়া উঠিত। কবি সাহিত্যিক ছাড়াও তার কাছে এমন সব সুফী কামেলকে আসা-যাওয়া করিতে দেখিয়াছি যারা আল¬ার নাম এবং কামকেই জীবনের সম্বলরূপে গ্রহণ করিয়াছিলেন। তার ক্ষুদ্র পুস্তাকাগারে যেসব বই দেখিয়াছি তাহা হইতে সহজেই ধরিয়া লইতে পারি যে, আধ্যাত্মিকতার দিকেও তিনি পা বাড়াইয়া ছিলেন।

১৯৫৩ কি ৫৪ সালের দিকে তিনি ধানমন্ডি এলাকায় দশ কাঠা জমি কিনিয়া কাঁচা বাড়ী তৈরি করিয়াছিলেন। কিন্তু পল¬ীকবি পল¬ীর মায়া কাটাইয়া উঠিতে পারেন নাই। ঢাকার ঐ জায়গাটুকু তিনি বিক্রয় করিয়া দিয়া নেত্রকোনার পল¬ীভবনে চলিয়া যান এবং সেখান হইতেই সমাজ সাহিত্য সেবা করিয়া যাইতে থাকেন।’

আ.ন.ম. গোলাম মোস্তফা তার লেখা ‘রওশন ইজদানীর সাহিত্যকর্ম ও সাধনা’ প্রবন্ধে রওশন ইজদানীর সাহিত্য চেতনা ও মূল্যায়ন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। প্রবন্ধটি তৎকালীন সময়ে দৈনিক আজাদে প্রকাশিত হয়েছিল। সেখান থেকে কিছু অংশের উদ্ধৃতি পাঠকদের জন্য তুলে ধরছি-
‘….পল¬ীকবি রওশন ইজদানী নিষ্ঠাবান কবি এবং পল¬ীর জীবনবোধকে তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন। সাহিত্য ক্ষেত্রে পরিশীলিত বুদ্ধিমত্তার পরিচয় হয়তো তিনি সর্ব্বত্র দেননি কিন্তু  হৃদয়াবেগের অকৃত্রিম প্রকাশ ঘটেছে তার প্রতিটি রচনাতে- যা পল¬ী কবীদের জন্য অপরিহার্য।
তার ভাবের তচ্ছতা এবং রচনা শৈলীর অনন্য সাধারনতার অভাব থাকা সত্বেও চলতি কথায় স্বচ্ছন্দ চলতি ভাব, চলতি বিষয় সাধারণের কথা তাদের অগভীর ও সহজ ধর্ম্মশিক্ষা এসব সাধারণের মত করেই সহজভাবে উপসি’্ত করার কৃতিত্ব অনস্বীকার্য। তার সৃষ্টি সংখ্যায় সীমিত কিন্তু নব নব রসের পরিবেশনে তা স্বার্থক। তার সকল লেখাতে গ্রাম-বাংলার মাটির মানুষের নাড়ীর স্পন্দন আমরা অনুভব করতে পারি।’

নেত্রকোনার সাহিত্যিক হামিদুর রহমান তার লেখা ‘জীবনবৃত্তে’ বইয়ে ‘আমার চোখে পল¬ীকবি রওশন ইজদানী’ শিরেনামের প্রবন্ধে কবির স্মৃতিচারন করেছেন এভাবে-
‘১৩৭০ সনে যখন আমি নবম শ্রেণিতে অধ্যয়ন করি, তখন ফাল্গুনের এক বসন্ত দিনে কবির সাথে দেখা করার জন্য তার বাস-ভবন বিদ্যাবল¬ভে উপস্থিত হই। ছেলে বয়সে কী এক দুবার আকর্ষণে ছুটে গেছি আজ আর বলতে পারব না। ঘরে প্রবেশ করে দেখতে পাই তিনি একটি জায়নামাজ সেলাই করছেন, সূঁচে সূতা পরাতে ব্যর্থ হয়ে আমাকে সূঁতা গেঁথে দেবার জন্য বলেন। সালাম বিনিময়ের পর অতি সংকোচের সাথে আমার লিখা কবিতার খাতা তাঁর হাতে দেই। অগ্নিবীণা কাব্যটি তখন আমার হাতে ছিল। অনেকক্ষন ধরে তিনি খাতাটি পড়ে দেখেন, বলেন: ‘এই ‘অগ্নিবীনার’ ছন্দ অনুসরন করলেও লেখার এত ভুল হবে না।’ অতপর দুটি লেখা শুদ্ধ করে দিয়ে বলেন-তুমি উত্তর আকাশ সম্পাদক জনাব খালেকদাদ চৌধুরীর কাছে যাও, আমার কথা বললে তোমার লেখা উত্তর আকাশে ছেপে দেবে।
সম্ভবত: তখন তিনি ‘মোমেনশাহীর লোকসাহিত্য’ বইটি লিখছিলেন, আমাকে আটপাড়া থানার সাল্কি গ্রামের ‘হাসান-কুলির দীঘি’র কিংবদন্তির কথা জিজ্ঞাসা করেন। অনেক ছড়া, প্রবাদ শোলকের কথা বলেন। আমি তাঁর একটি ছড়া সংগ্রহ করে আনি।
ছড়াটি এই-
বড় নদীর থোর নাই- থোর পড়েছে খাড়ির,
ভাল মানুষের ‘গুমান’ নাই ‘গুমান’ পড়েছে দাড়ির।
আঁ-মানুষে মানুষে নিন্দে ‘ভাওয়াসে’ নিন্দে- ঝারি,
জোনাক পোকায় মানিক নিন্দে এই না দুঃখে মারি।

রওশন ইজদানীর কাব্যে সাহিত্যিক মানস লালিত। তার কাব্যে পল¬ীর শ্যামল প্রান্তর আর মাটির মায়ার সাথে দেখি মুক্তিলাভের প্রবল আকাঙ্খা। চিনুবিবি আর মোমেন যেমন রয়েছে তার সাহিত্যে তেমনি সুজলা-সুফলা শস্য শ্যামলা সোনার বাংলার মাটি ও মানুষের মন ও মনন, বজ্রবাণীতে দেখি মেহনতি মানুষের পক্ষে বাঁচার লড়াই করার দৃঢ় অঙ্গিকার।
আর ‘খাতামুন নবীঈন’ অত্যন্ত সহজ সরল ভাষায় ও পল¬ীমাটির প্রাণের সুরে রচিত নবীজীর জীবনকাব্য। বাংলা ভাষায় হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর এতো নান্দনিক জীবনী একেবারেই কম। বাংলা সাহিত্যে গ্রামীণ ভাষায় রচিত এটিই প্রথম জীবনীভিত্তিক কাব্য। অথচ আমাদের অশিক্ষিত সমাজে বাংলা ভাষায় রচিত জীবনীকাহিনির প্রয়োজনীয়তা ব্যাপক। সে বিষয়টি সামনে রেখেই রওশন ইজদানী এ জীবনীকাব্য রচনায় মনোনিবেশ করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে রওশন ইজদানীর নিজের বক্তব্য ছিল-
‘এখনও গায়ে প্ুঁথি পাঠের আসর জমে। একজন কোন রকমে গলা টেনে টেনে শহীদে কারবালা, বা কাছাছেল আম্বিয়া সুর করে, আর চারপাশে স্বাক্ষর নিরক্ষও সকলে ঘিরে বসে কান পেতে শোনে। তাই সমাজের সামনে পরিবেশন করার ইচ্ছা নিয়েই আমি রচনা করেছি-সহজ সাবলীল মাটির সুরে- মাটির মুখের ভায়া নিয়ে খাতামুন নবীঈন।’

এ কাব্যের ভাযা  অত্যন্ত হালকা সহজ। বর্ণনাগুলি গ্রাম্যগাথা বা পালার মত। কবি উপমা রূপকও সংগ্রহ করেছন গ্রাম বাংলার পথ প্রান্তর থেকে। কাব্যটি নবম মনজিলে বিভক্ত। প্রথম  মনজিলে রয়েছে হামদ নাতের পর নবীজীর  পিতার জীবন কাহিনি ও নবীজীর জীবন বৃত্তান্ত । অন্যান্য অধ্যায়  গুলোতে রয়েছে  জালেমদের অত্যাচার, বিবি আয়েশার  বিবাহ কাহিনী, মনজিলে মেরাজ ও দোজকের বর্ণনা। মনজিলে হিজরত, মদীনার জীবন, আজান প্রথা  প্রবর্ত্তনের  কাহিনী, মনজিলে জেহাদ, বদরের যুদ্ধ, বিবি জয়নাবের পানি গ্রহন, পরিখার লড়াই, হোদায়বিয়ার  সন্ধি, জংগে খয়বর, শেষ  বিজয়, সুতা অভিযান, আখেরী হজ, মা ফাতেমার বিলাপ, ছাহাবীদের শোক এবং নাতে রসুল।

তিনি এদেশের মানুষের লোক মানসে যে কাহিনি  সুপ্ত হয়ে আছে তা কাহিনিকাব্যে ও সঙ্গীতে রঙে রসে উপস্থাপন করেছিলেন এবং লোক সংস্কৃতির একটা  রূপরেখা  প্রণয়ন করতে পেরেছিলেন। লুপ্তপ্রায় এসব লোকসংস্কৃতির বিস্মৃতি থেকে কিছুটা হলেও আমাদেরকে দিয়ে যেতে পেরেছেন। তা শুধু সম্ভব হয়েছে তার সাংস্কৃতিক মানসিকতার কারনে। এ ছাড়া তিনি ময়মনসিংহের মুর্শিদী, মারফতি , বাউল সাহিত্য, জারি-সারি গান, পাড়া গাঁয়ের ছড়া, মেয়েলী গীত, পালাগীতিও সংগ্রহ করেছেন। বাউল সঙ্গীতের প্রতি আলাদা টান থাকায় বাউল সাহিত্য নিয়েও তিনি গবেষনা করে ছিলেন। ইয়াছিন খাঁ, জালাল উদ্দিন খাঁ, আলী নেওয়াজ, মদন পাগল, ফিকির চান বাউলের গানও সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও তিনি ময়মনসিংহের প্রচলিত গাইনের গীত, ঘটুগান, রাখলী গান, প্রবাদ-প্রবচন, শিলুক শিমাসা প্রভৃতি লোক-সাতিত্যেও বিভিন্ন আঙ্গিক নিয়েও গবেষনা করেন।

বিশ্বসাহিত্যের দিকে দৃষ্টিপাত করলে এ সত্য খুব সহজেই আমাদের সামনে প্রতিভাত হবে যে, প্রত্যেক দেশেই আধুনিক যুগে শিল্প সাহিত্যের সমান্তরাল রেখায় লোকসাহিত্য প্রবাহিত হয়েছে। প্রকৃতির আপন পরিবেশের অনায়সলব্দ সৌন্দর্য বর্ণনা  হচ্ছে লোকসাহিত্য। রওশন ইজদানী লোকসাহিত্য সাধনার মধ্য দিয়ে মুক্তো তুলে এনেছেন। তিনি শুধু লোকমুখে প্রচারিত সাহিত্যকেই চয়ন করেননি, লোকসাহিত্যের স্বভাব ধর্মকে পুরোপুরি  বজায় রেখে যে সাহিত্য রচিত হয়ে লোকসাহিত্য জগতে প্রবেশের ছাড়পত্র পেয়েছে, ইজদানীর ভান্ডারে  সেগুলোও সযতেœ রক্ষিত ছিল।

চিনুবিবি এক গ্রাম্য গীতালুর ফরমায়েশ মত রচিত হলেও কাহিনির পরিচ্ছন্নতায়, প্রকাশভঙ্গির নৈপুন্যে এককথায় অতুলনীয়। এ কাব্যে একটি সহজ সুন্দর পালা গান ঝরনার মত তরতর করে বয়ে চলেছে। এ ঝরনা পানি পল¬ীমাটির রূপ রস গন্ধের সাথে মিশে এক অপূর্ব স্বাদ আর ঘ্রান লাভ করেছে। কাব্যের কাহিনীর মধ্যে তেমন নতুনত্ব না থাকলেও পরিবেশন ভঙ্গিটি অত্যন্ত সুন্দর ও মর্মস্পর্শী। গভীর আন্তরিকতা ও অকৃত্রিম প্রকাশই এ কাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

ড. কাজী মোতাহার হোসেন চিনুবিবির কাব্য সম্পর্কে বলেন-
‘চিনুবিবি কব্যের ধারায় এক বিচক্ষণ ক্ষমতা এবং ঠিক গেঁয়ো কথা বলার নৈপূন্যই বইখানার প্রধান বিশেষত্ব। পল¬ীকবি জসিম উদ্দীনের কাছে আমরা পল¬ীর একরূপ দেখেছি-তার ভাষায় শিষ্ট প্রয়োগ আর ভাবের সুমধুর বিষন্নতা আমাদিগকে মোহিত করে। কিন্তু ইজদানীর মধ্যে দেখি গ্রামের আরেক রূপ। তার ভাষায় গ্রাম্যতা গুণ আর ভাবের গ্রাম্য যথার্থতা আমাদিগকে আকৃষ্ট করে।’

রওশন ইজদানীর জন্ম গ্রামে, গ্রামের মাটিতে তিনি লালিত পালিত হয়েছেন। গ্রামের মানুষকে তিনি ভালবাসতেন গভীরভাবে। গ্রামের মানুষের সুখ-দু:খ, আশা-আকাঙ্খা, জীবনবোধ প্রতিফলিত হয়েছে তার অমর লেখনীতে। এজন্য তাকে বলা হয়-পল¬ীকবি, তিনি পল¬ী জীবনের স্বার্থক রূপকার-যথার্থ পল¬ীকবি।

রওশন ইজদানীর রচিত ‘রঙিলা বন্ধু’ গীতিকাব্য গ্রন’্টি গ্রামীন সমাজ জীবনের একটি প্রামাণ্য দলিল। মানুষের দু:খ কষ্ট, হাসি কান্না, বন্ধু বিরজ সব কিছুর ছবি একেছেন তার লেখনীর মাধ্যমে। ‘আকালের বছর’ চাষীর দু:খ শিরোনামে লেখাটিতে তিনি সে সময়কার সামাজচিত্র তুলে ধরেছেন।
হায়রে…
ক্ষেতে ফসল নাই
ডোলেতে নাই মু্ষ্িট দানা-বাছুর মরা গাই।

হায়রে…
ঝরার বেলা খরায় নিলো, খরায় দিলো বান,
রাঁজার হাঁসে খাইল বাঁকে পাক্না ক্ষেতের ধান।

বৌ এর হাতের বেঁকি খাড়ু বান্ধা দিয়া পরে,
কিইন্যা আনলাম পেটের খোরাক- বউ মরিলো জ্বরে।
বউ মরিলো ওষুধ বিনা-হাতের কড়ি শেষ,
আইলো দারুন ম্যালেরিয়া ছাইড়্যা আসাম দেশ।

নিজে গেলাম পরের বাড়ী-বছর বান্ধা হই।
পঞ্চাশ টাকার চাক্রী খাইট্যা পঁচিশ টাকা লই।
আচম্বিতে পড়লো ঠাডা-হইলো মায়ের জ্বর,
ডাক্তারে নিল  পঁচিশ টাকা- মা-ও গেলে কবর।

হায় গো আল¬া কাহার কাছে কই!
কে দিলো মোর অঘান মাসে পাক্না ধানে মই
মাঠেতে নাহি ঘাসি-ডেঙ্গা, ক্ষেতে ফসল নাই।

রওশন ইজদানী ছিলেন একজন গ্রামীন শব্দ ভান্ডারের সুনিপূণ কারিগর। এ জন্যই তিনি শব্দের শৈলীতে আঁকতে পেরেছিলেন গ্রামীণ জীবনের জলছবি। রওশন ইজদানীর লেখা ‘একটি মেয়ের বাল্যস্মৃতি’ লেখাটি পাঠকদের জন্য তুলে ধরে আমার প্রবন্ধের ইতি টানছি-
বন্ধুরে…
মনে পড়ে সেই অতীতের
সাধের ছেলেবেলা
বনে বনে ঘরের কোণে
লুকোচুরি খেলা।

রাঙ্গামাটি হলদি দিয়া
হইত মোদের লকল বিয়া,
বালু দিয়া ভাত রাঁধিতাম
বেজুন রানতাম ঢেলা।
সেই সাধের ছেলেবেলা।

বন্ধুরে…
হয় মনে সেই আমের তলায় হিঙ্গলালি টানা
কেউ চড়িতাম, কেউ ঠেলিতাম করতো না কেউ মানা,
আমের আশায় বসতো কাগা
পাতি ডালের লাগা লাগা
গাইতাম মোরা- কাগা ও ভাই
একটারে আম ফালা।

সহায়ক তথ্যপঞ্জি:
১. রওশন ইজদানী : ১৯৮০ : ইমামুর রশীদ : বাংলা একাডেমী, ঢাকা
২. মোমেনশাহীর লোক সাহিত্য : ১৯৫৮ : রওশন ইজদানী : বাংলা একাডেমী, ঢাকা।
৩. নেত্রকোনা মুখশ্রী : ২০০৫: নেত্রকোনা জেলা সমন্বয় পরিষদ: ঢাকা।
৪. জীবনবৃত্তে : ২০১৩ : হামিদুর রহমান : নান্দনিক : ঢাকা।
৫. নেত্রকোনার প্রবাদ-প্রবচন ও লোকছড়া: ২০১৪: হাসান ইকবাল: রাঁচী গ্রন্’নিকেতন: ঢাকা।
৬. আজাদ, সম্পাদক-আবুল কালাম শামসুদ্দীন, ১৭ আষাঢ় ১৩৭৪ বঙ্গাব্দ
৭. কবি রওশন ইজদানীর জেষ্ঠ পুত্র জনাব জুলফিকার ইজদানীর কাছ থেকে প্রাপ্ত কবির অগ্রন্’িত পান্ডুলিপি।
৭. উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে।

৫১৯ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
...আমার বাবার লেখা ডাইরীতে আমার জন্ম তারিখ লেখা আছে ২০ আগস্ট। নীল রংয়ের উইনসন কলমের কালিতে গোটা অক্ষরে। .... ছেলেবেলার দুরন্ত শৈশব কেটেছে নেত্রকোনায়। আর সবচেয়ে মধুর সময় ছিল সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার দিনগুলি। আর এখন কাজ করছি সুবিধাবন্ঞ্চিত শিশুদের জন্য একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায়। স্নাতকোত্তর করেছি সমাজ বিজ্ঞান বিষয়ে। কবিতা পড়তে ভালোলাগে...ভালোলাগে লিখতেও। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের আঁকা ও লেখা নিয়ে শিশু-কিশোরদের সাহিত্য বিষয়ক প্রকাশনার সম্পাদনা সহযোগী হিসেবেও আছি । লিটলম্যাগ পড়া হয় বেশি, ততটা বইপোকা আমি না। তবে বই পড়তে ভালবাসি। গ্রামে বেড়াতে গেলে আমার বাবার গড়া "পাঠাগার" -এ সময় কাটে বেশি। ই-মেইল: hasan_netsu@yahoo.com
সর্বমোট পোস্ট: ৪ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ৭ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৪-০৭-০৯ ০৩:৩৪:১৪ মিনিটে
Visit হাসান ইকবাল Website.
banner

৬ টি মন্তব্য

  1. ব্যবস্থাপনা সম্পাদক মন্তব্যে বলেছেন:

    চলন্তিকা ব্লগে আপনাকে পেয়ে আমরা আনন্দিত। আপনার তথ্যমূলক লেখা এখানে স্বর্ণপালক যোগ করবে নিঃসন্দেহে। শুভকামনা জানবেন সবসময়।

  2. আহমেদ রব্বানী মন্তব্যে বলেছেন:

    পোস্টটি স্টিকি করা হোক।হাসান ভাইয়ের পোস্ট মানে শৈল্পিক এক প্রকাশ।চমৎকার এই পোস্টটির জন্য অশেষ ধন্যবাদ প্রিয় হাসান ভাইকে।

  3. হাসান ইকবাল মন্তব্যে বলেছেন:

    সম্পাদক মহোদয়কে ধন্যবাদ জানাচ্ছি আমার লেখাটি সময় করে পড়বার জন্য।
    ভালো থাকুন। শুভ কামনা নিরন্তর।

  4. হাসান ইকবাল মন্তব্যে বলেছেন:

    অনেক অনেক ধন্যবাদ আহমেদ রব্বানী ভাই আপনার সুন্দর মন্তব্যের জন্য। আপনার মন্তব্য ভালো কিছু লিখতে অনুপ্রেরণা জোগাবে।

  5. দীপঙ্কর বেরা মন্তব্যে বলেছেন:

    সুন্দর লেখাটি ।

  6. হাসান ইকবাল মন্তব্যে বলেছেন:

    ধন্যবাদ দীপঙ্কর ভাই।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top