Today 14 Dec 2019
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

সম্মোহন

লিখেছেন: তাসরুজ্জামান বাবু | তারিখ: ২১/১১/২০১৯

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 44বার পড়া হয়েছে।

ইকবালের মোবাইল ফোনটায় কল লাগালাম আমি, ‘হ্যালো ইকবাল? আজ বিকেল চারটায় আমাদের বাসায় আসতে পারবি?… কী বললি?… সে তুই আসলেই বুঝবি… হ্যাঁ, হ্যাঁ নাজমুলকে ডেকেছি, সিজানকেও ডেকেছি, তোকেও ডাকছি। আসবি কিন্তু, না হলে পরে পস্তাবি… না না কোন হিন্টস টিন্টস দিতে পারব না… ওকে বাই।’
ইকবাল আসতে চেয়েছে। চারটার দিকে আসতে বলেছিলাম, সাড়ে তিনটার দিকেই চলে আসবে বলেছে। নিশ্চয়ই এখন ওর সময় কাটতে চাইবে না। কী কারণে ডাকলাম তা জানার জন্য ওর জান আনচান করবে।
‘আমি তোদের ডেকেছিলাম একজন মানুষ দেখাতে।’ বললাম আমি।
আমার ঘরটা খুব ছোট না। আমার বন্ধুদেরকে তাই সেখানেই বসিয়েছি। আমরা গোল হয়ে খাটের ওপর বসেছি।
আমার পাশে বসে থাকা সিজান বলল, ‘মাফ কর, তোর কীভাবে ধারণা হল যে আমরা একজন মানুষ দেখার জন্য লালায়িত, বিশেষ করে যখন বাংলাদেশে বাস করি?’
‘আরে… আগে বলতে দিবি তো ! ইনি যে সে মানুষ নন… অবশ্য আমার আব্বার বন্ধু!’
নাজমুল কিছু বলার জন্য মুখ খুলছিল কিন্তু ইকবাল ওকে হাতের ইশারায় থামিয়ে দিল।
আমি বলে চললাম, ‘লোকটার নাম দস্তগীর আহমেদ। আমেরিকায় থাকেন। কিছুদিন আগে একমাসের ছুটিতে বাংলাদেশে এসেছেন। আমাদের বাসায় এসেছেন আজ সকালে। তার সাথে তোদের পরিচয় করিয়ে দেব।’
‘শুধু এজন্যই ডেকেছিস?’ এবার ইকবালের কন্ঠেও স্পষ্ট হতাশা।
‘আরে শোন না! তার পরিচয় শুনলে আঁৎকে উঠবি। বলব?’
‘ভণিতা রাখতো, তাড়াতাড়ি বল!’ বিরক্তি ঝড়ে পরল সিজানের কণ্ঠ থেকে।
সবার মুখের দিকে একবার নজর বুলিয়ে নিলাম আমি। ওদের চোখ-মুখ থেকে আগ্রহ উপচে পড়ছে। মা পাখি খাবার মুখে তুলে দেওয়ার সময় ছানাটি যতবড় হাঁ করে ওরা সবাই তত বড় হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। বুঝলাম, দেরি করলে ‘আমি’ বেচারাকে ওদের আহারে পরিণত হতে হবে।
তাই আর দেরি না করে ভরাট কণ্ঠে বললাম , ‘তিনি একজন হিপ্নোথেরাপিস্ট। আমেরিকায় হাজার হাজার মানুষকে সম্মোহন করেন ।’
‘হিপ্নোথেরাপিস্ট!!!’ একসাথে চিৎকার দিয়ে উঠল সবাই। কৌতুহলে যেন দুম করে ফেটে যাবে।
আমাদের মধ্যে সম্মোহন বিষয়টা নিয়ে আগে থেকেই প্রবল কৌতুহল ছিল ।
ইকবাল ব্যগ্রভাবে বলে উঠল, ‘কোথায়! কোথায় তিনি?’
ঠিক এমন সময় দরজার কাছে একটা ভারী কণ্ঠ বেজে উঠল, ‘আসতে পারি মাই সান্স?’
ধড়মড় করে খাট থেকে নেমে পড়লাম সবাই।
আমি বললাম, ‘আসুন চাচ্চু।’
ভেতরে ঢুকলেন একজন মাঝবয়েসী ভদ্রলোক। চোখের তারা দিয়ে তাঁর বুদ্ধি ঝিলিক মারছে। আধপাকা চুল। শান্ত-সৌম্য চেহারা। দেখলে ভক্তি আসে। বন্ধুরা একসাথে সালাম দিয়ে উঠল। তিনি সুন্দর করে সালামের জবাব দিলেন।
আমি বললাম, ‘চাচ্চু, অনেকদিন বাঁচবেন। আপনার কথাই বলছিলাম। এরা আমার বন্ধু, আপনাকে দেখার জন্য এসেছে।’
‘রিয়েলি?!’ অবাক হয়ে চাচ্চু হাসলেন।
বিছানার মাঝখানে আমরা চাচ্চুকে বসালাম। আমরা অর্ধবৃত্ত তৈরী করে তার মুখোমুখি বসলাম। আসরের মধ্যমণি তিনি। চাচ্চু সবার সাথে পরিচিত হলেন। তার পরিচয়টাও নিজে থেকেই দিয়ে দিলেন। আমার ছোটবোন শ্রাবণী চা নাস্তা নিয়ে এল। সেগুলো সাবড়ে দেবার পর শুরু হল আলোচনা। আমরা তাকে জানালাম সম্মোহনবিদ্যার প্রতি আমাদের আগ্রহ কতখানি। তিনি শুনে ভারী খুশি হলেন। সবশেষে চাচ্চুকে আমি একটা জম্পেশ প্রস্তাব দিয়ে ফেললাম।
আমি বললাম, ‘চাচ্চু, আমাদের মধ্য থেকে একজনকে সম্মোহিত করে দেখান না!’
বন্ধুরা এই অভিনব প্রস্তাবে স্তম্ভিত হয়ে গেল। পরক্ষনেই হৈ হৈ করে চাচ্চুকে ছেঁকে ধরল।
চাচ্চু কোন রকমে হাত তুলে বললেন, ‘ওকে, ওকে।’
আর একদফা হৈ চৈ হয়ে গেল। আমি লক্ষ্য করলাম, বন্ধুরা মুহূর্তের মধ্যে চাচ্চুর সাথে ফ্রেন্ডলি হয়ে গেছে।
চাচ্চু বললেন, ‘ইট ডাজ নট ম্যাটার না বাট হতে চাও কে?’
আমরা চুপ মেরে গেলাম। প্রচণ্ড আগ্রহ দেখালেও আমরা আসলে সম্মোহনবিদ্যাকে একটু ভয় বা সমীহই করতাম। কারণ, এ ব্যাপারে আমাদের ধারণা স্পষ্ট ছিল না। কেমন যেন রহস্যময় মনে হত এটিকে। হয়ত আমাদের কারো প্র্যাক্টিক্যাল অভিজ্ঞতা ছিল না বলে।
আমি রাজি হব নাকি হব না এ নিয়ে দোটানায় ভুগছি, এমন সময় নিরীহ গোছের বন্ধু নাজমুল কড়াৎ করে বলে ফেলল, ‘আমি রাজি!’
যদিও বলার সময় ওর কণ্ঠের কাঁপুনিটা চাচ্চুরও নজর এড়াল না।
‘ভয়ের কিচ্ছু নেই’ বলে নাজমুলকে অভয় দিলেন তিনি।
চাচ্চু আমাদের বললেন খাট থেকে নেমে চেয়ারে বসতে। আমরা তার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করলাম। তিনি আর নাজমুল থেকে গেলেন চেয়ারের ওপর।
চাচ্চু নাজমুলকে বললেন, ‘কাউকে হিপ্নোটাইজড করার জন্য তার ইচ্ছাটাই এনাফ। তুমি যদি হিপ্নোটাইজড হতে না চাও, তাহলে করা মুশকিল। সো, ডোন্ট ওরি এন্ড বি রিলাক্সড । তোমার মন থেকে দ্বিধা-দ্বন্দ মুছে ফেলে দিয়ে আয়েশী ভঙ্গিতে বস।’
নাজমুল নড়ে চড়ে বসল।
চাচ্চু বললেন, ‘রেডি?’
‘রেডি।’
‘ওকে মাই বয়। এবার আমার চোখের দিকে তাকাও প্লিজ!’
নাজমুল চাচ্চুর চোখের দিকে তাকাল। সাথে সাথে আমার মনে হল, ওর চোখ যেন চাচ্চুর চোখের সাথে আটকে গেল। প্রচন্ড অস্বস্তিতে নাজমুল বার কয়েক চোখ সরানোর চেষ্টা করল। ব্যর্থ চেষ্টা, ওর চোখের পাতা যেন প্রাণহীন, পলক ফেলতে জানে না। একদৃষ্টে চেয়ে আছে চাচ্চুর দু চোখের দিকে, ঘাড় কাত করে বাধ্য ছাত্রের ভঙ্গিতে। কেঁপে উঠলাম আমি। দৃশ্যটা কেমন যেন অতিপ্রাকৃতিক, কেমন যেন ভৌতিক! নিথর পরিবেশ। আমরা চেয়ার ছেড়ে খাটের কিনারে বসে পড়েছি, কখন- টের পাইনি। নাজমুলকে একবার দেখছি, একবার সম্মোহককে। কথা বলে উঠলেন সম্মোহক। তার কণ্ঠস্বর গম্ভীর, নাটকীয়। কোমল স্বর কিন্তু তাতে স্পষ্ট আদেশের সুর, স্পষ্ট কর্তৃত্বের সুর। প্রথমে ধীরে ধীরে, তারপর ক্রমশ চড়া হচ্ছে তার গলা। দৃশ্যটা কেমন যেন সিনেমার মতো লাগছে। গা’টা শিরশির করে উঠল আমার।
নাজমুলকে বলছেন তিনি, ‘আমার কথা শোন, আমি দস্তগীর আহমেদ চৌধুরী, তোমাকে কী আদেশ দিচ্ছি মন দিয়ে শোনো। আমি জানি, এখন তোমার ঘুম পাচ্ছে, ভীষণ ঘুম, ভী-ষ-ণ ঘুম। কিছুক্ষনের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়বে তুমি, গভীর ঘুমে ঢলে পড়বে। তুমি ঘুমিয়ে পড়, গভীর নিদ্রার কোলে ঢোলে পড় তুমি… এই তো, এই তো তোমার চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। এই তো তুমি ঘুমিয়ে যাচ্ছ…ঘুমের গভীরে তলিয়ে যাচ্ছ তুমি… শান্তিময় ঘুম, তুমি ঘুমিয়ে পড়, দস্তগীর আহমেদ চৌধুরীর আদেশে তুমি ঘুমিয়ে পড়, ঘুমিয়ে পড়।’
একঘেয়ে কণ্ঠে একই সুরে তিনি এমনভাবে কথাগুলো বলতে লাগলেন যে আমারই ঘুম পেতে লাগল। আমি তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নাজমুলের দিকে তাকালাম। কী অবাক কাণ্ড! নাজমুলের চোখের পাতা পিটপিট করছে। ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে ফেলছে ও! ঘুমিয়ে যাচ্ছে নাজমুল!
‘হ্যাঁ হ্যাঁ এভাবেই ঘুমিয়ে পড়তে হয়, এভাবেই ঘুমিয়ে পড় তুমি । ঘুমেই শান্তি… ঘুমেই তৃপ্তি …… অনন্ত সুখ ঘুমে… অনাবিল আনন্দ ঘুমে…।
তিনি নাজমুলের চোখের পাতা হাত দিয়ে বন্ধ করে দেওয়ার ভঙ্গি করলেন। সাথে সাথে ওর পিটপিটে চোখের পাতা দুটো বন্ধ হয়ে গেল।
‘ঘু-উ-ম ঘু-উ-ম ঘু-উ-ম গভীর নিদ্রা। ঘু-উ-ম ঘু-উ-ম ঘু-উ-ম গভীর নিদ্রা।’ ক্রমাগত বলেই যাচ্ছিলেন তিনি, নাজমুলের সমস্ত দেহের উপর দিয়ে স্পর্শবিহীন পাস দিতে দিতে। প্রচণ্ড ঘুমে নাজমুল একেবারে কাহিল হয়ে পড়ল। বিছানার ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে যাচ্ছিল, তড়িঘড়ি করে চাচ্চু ধরে ফেললেন। ধীরে ধীরে ওকে বিছানায় শুইয়ে দিলেন তিনি। তাড়াতাড়ি ওর মাথার নিচে একটা বালিশ গুঁজে দিলেন।
আমরা সবাই তখন স্তম্ভিত! বিস্ময়ে বিমূঢ়! চোখের সামনে একটা ভার্সিটি পড়ুয়া ছেলে কয়েকটা কথা শুনে ঘুমিয়ে পড়ল বাচ্চা ছেলের মত!
চাচ্চু তখনো টেনে টেনে বলে যাচ্ছিলেন, ‘ঘু-উ-ম ঘু-উ-ম ঘু-উ-ম গভীর নিদ্রা… শা-ন-তি-ম-য় নিদ্রা।’
কিছুক্ষণ পর তিনি থেমে গেলেন। কান পেতে শুনতে লাগলেন নাজমুলের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ। বেশ কিছুক্ষণ গভীর মনোযোগে শুনলেন তিনি। আমরাও শুনলাম। প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস সমান তালে চলছে। তার মানে সত্যি সত্যি ঘুমিয়ে পড়েছে ও। এবার তিনি ঘুমন্ত নাজমুলের উদ্দেশ্যে গমগমে কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘এখন আমি তোমার শরীরে ক্যাটালেপসি উৎপাদন করব।’
ক্যাটালেপসির মানেটা সময় বুঝে ডিকশনারিতে দেখে নিতে হবে । চাচ্চু মনে হয় আমাদের অস্তিত্বের কথা ভুলে গেছেন। তার সম্পূর্ণ মনোযোগ নাজমুলের দিকে। আমরা থ’ হয়ে তার ভূতুড়ে কারবার দেখছি। তিনি নাজমুলের ডান হাতটি ওপরে তুলে ধরলেন। ওর হাতটিতে নিজের ডান হাত দিয়ে স্পর্শ পাস দিতে লাগলেন।
মন্ত্র পড়ার মতো বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন, ‘আমার শরীরের সমস্ত শক্তি তোমার শরীরে প্রবিষ্ট হচ্ছে। তোমার হাত শক্ত হচ্ছে… শক্ত হচ্ছে… শক্ত হচ্ছে। তোমার হাত কেউ নাড়াতে পারবে না, হাতুড়ির আঘাতেও কেউ ভাঙতে পারবে না… আরো আরো শক্ত হচ্ছে তোমার হাত… ক্রমশ শক্ত হচ্ছে… লৌহ দণ্ডের মত শক্ত হচ্ছে।
তিনি নাজমুলের হাতটা ছেড়ে দিলেন। আমরা দেখলাম ওর হাতটা এতটুকু নেতিয়ে পড়ল না, বরং ধীরে ধীরে টান টান হচ্ছে। তিনি ওর হাতটা প্রাণপণে নিচে নামাতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু নাজমুলের সেকি শক্তি! ওর হাতটা সটান ঊর্ধ্বমুখী হয়ে আছে! আগের মতোই স্থির- অবিচল।
চাচ্চু বললেন, ‘এবার তোমার সমস্ত শক্তি নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। তোমার হাতটা নেতিয়ে পড়ছে । তুমি তাকে ধরে রাখতে পারছ না, পারছ না।’
নাজমুলের হাতটা নিচে নামতে নামতে ধপ করে বিছানার ওপর পড়ল। আমরা তিনজন দর্শক পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম। চাচ্চু পকেট থেকে কিছু কাগজের টুকরো বের করলেন। তারপর নাজমুলের উদ্দেশে বললেন, ‘এবার আমি তোমাকে এমন রসগোল্লা খাওয়াব যা তুমি জীবনে খাওনি।’ বলতে বলতেই তিনি এক টুকরো কাগজ পুরে দিলেন নাজমুলের মুখে।
‘খেয়ে দেখ, খেয়ে দেখ… কত মিষ্টি, কত মিষ্টি! বল কেমন?’
‘মিষ্টি।’
আমি একবার ঢোক গিললাম।
‘কেমন মিষ্টি?’
‘ভী-ই-ষ-ণ মিষ্টি!’
‘কেমন মিষ্টি?’
‘দা-আ-আ-রু-ণ মিষ্টি!’
তিনি সন্তুষ্ট হয়ে ওর মুখ থেকে কাগজটা বের করে নিলেন। তখনও সেটি ভাল করে ভেজেনি। চাচ্চু বললেন, ‘এবার তোমাকে তেতো খাওয়াব, নিমের চেয়ে তেতো ফল খাওয়াব তোমাকে।’
বলতে বলতে ওর মুখে পূর্বের কাগজের টুকরোটাই পুরে দিলেন। কী বিস্ময়! এ কাগজকে একটু আগে মিষ্টি বলেছিল নাজমুল অথচ এখন মুখ বিকৃত করে ফেলল।
‘বল কেমন?’
‘ভী-ই-ই-ষ-ণ তেতো!’
কাগজের টুকরোটা নাজমুলের মুখ থেকে বের করে দিলেন সম্মোহক।
‘তুমি এখন হিপ্নোটাইজড হয়েছ। তুমি এখন সম্মোহিত হয়েছ। পুরোপুরি সম্মোহিত হয়েছ। এখন তুমি আমার অধীন। আমার আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে তুমি।’
‘পালন করব আমি।’
‘বলো, আদেশ করুন মাস্টার।’
‘আদেশ করুন মাস্টার।’
ততক্ষণে আমার পুরো শরীর থেকে তীব্রবেগে ঘাম ছুটছে। কিন্তু মুখের চোয়াল ঠকঠক করে কাঁপছে।
‘আমি তোমাকে আদেশ দিচ্ছি, যখন তোমার ঘড়িতে ৬টা বাজবে ঠিক তখন’ বলে চললেন দস্তগীর আহমেদ চৌধুরী, ‘ঠিক তখন তুমি একটা অদ্ভুত কাজ করবে। তোমার কাজটি হচ্ছে একটা চেয়ার তুলে খাটের ওপর রাখা। আমার আদেশ পালন করবে তুমি।’
‘পালন করব আমি।’
‘অবশ্যই পালন করবে।’
‘পালন করব আমি।’
এখন তুমি ঘুমিয়ে পড়। স্বাভাবিক ঘুমে আচ্ছন্ন হও তুমি। তুমি আবার আগের মত হয়ে যাও। আগের মতই হয়ে যাচ্ছ তুমি। নাই, নাই…কিচ্ছু নাই, কিচ্ছু ছিল না।
কবিরাজের মত জোরে জোরে তিনি বার কয়েক ফুঁ দিলেন নাজমুলের শরীরে। ওর পা থেকে মাথা পর্যন্ত উল্টো করে স্পর্শ পাস দিলেন। কিছুক্ষণ নীরব থেকে চোখ মেলল নাজমুল। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল আমাদের বিস্মিত মুখগুলোর দিকে।
বলল, ‘কীরে ওমন করে কী দেখছিস তোরা? আমাকে? আমি কী সম্মোহিত হয়েছিলাম নাকি এখনই সম্মোহিত?’
সবার প্রথমে কথা বলে উঠল সিজান, ‘কাগজটা সত্যি তোর কাছে মিষ্টি আর তেতো লেগেছিল?’
‘কাগজ? মিষ্টি? তেতো? কী বলছিস?’
হঠাৎ টিটিট করে নাজমুলের হাতঘড়িটা ৬ টার এলার্ম দিয়ে উঠল। চমকে উঠল নাজমুল। মুখ দেখে মনে হলো কিছু একটা মনে পড়েছে ওর। ধড়মড় করে বিছানা থেকে নেমে পড়ল ও। আমরা চেয়ে চেয়ে ওর কাণ্ড দেখতে লাগলাম। কিছুক্ষণ ইতস্তত করে আমার চেয়ারটা তুলে নিল ও, তারপর একটানে উঠিয়ে দিল খাটের ওপর।
আমি আর একবার ঢোক গিললাম।
চাচ্চু বললেন, ‘ছিঃ ছিঃ ময়লা লাগবে তো, নামাও নামাও।’
থতমত খেয়ে চেয়ারটা নামিয়ে দিল নাজমুল।
চাচ্চু বললেন, ‘উঠিয়েছিলে কেন?’ তাঁর ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ঝুলে রয়েছে।
নাজমুল ‘ইয়ে মানে মানে’ করতে করতে আমার দিকে তাকাল অসহায় ভঙ্গিতে। সম্ভবত আমি রসগোল্লার মত চোখ করে ওকে দেখছিলাম। তাই দ্রুত আমার দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিল ও।
মিনমিনে কণ্ঠে বলল, ‘ইয়ে মানে মানে… ধ্যাৎ, মনে হল যে!’
চাচ্চু ব্যাখ্যা করলেন, ‘তুমি সম্মোহিত হয়েছিলে। ওই সময় যা আদেশ করা হয় তা ব্যক্তির অবচেতন মনে জমা থাকে। পরে স্বাভাবিক অবস্থায় এলেও সে ওই আদেশ পালন করতে বাধ্য থাকে। তোমাকেও আমি আদেশ করেছিলাম এটা করতে। এটা কিন্তু হেলাফেলার বিষয় নয়। ইটস আ থেরাপি। সাপোজ একজন নেশাখোর নেশা ছাড়তে চায় বাট পারছে না, তাকে হিপ্নোটাইজড করে যদি আদেশ দেওয়া হয় নেশা ছাড়তে, ধীরে ধীরে সে নেশা ছেড়ে দেবে।’
শুনে মুগ্ধ হয়ে গেলাম আমরা।
নাজমুল বলল, ‘হেব্বি ব্যাপার তো!’
সিজান বলল, ‘ইন্টারেস্টিং।’
ইকবাল বলল, ‘সম্মোহন! জিনিস বটে একখান!’
আমি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, ‘আহ! জীবনটাই তো সম্মোহন!’
ঝট করে আমার দিকে ঘুরে গেল ইকবালের চোখ, ‘কি বললি! কি বললি তুই?’
থতমত খেয়ে গেলাম আমি। বললাম, ‘খারাপ কিছু তো বলিনি।’
‘না, তুই কী বললি আবার বল।’
‘আমি বললাম যে, জীবনটাই তো সম্মোহন।’
‘আর একবার বল।’
‘জীবনটাই তো সম্মোহন।’
‘আর একবার বল!’
‘পাগল হয়ে গেলি নাকি?’ সিজান আর নাজমুল বিরক্ত কণ্ঠে বলে উঠল। চাচ্চুও ইকবালের ব্যবহারে বেশ অবাক হয়েছেন বোঝা যাচ্ছে! ইকবালের সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই।
বলল, ‘প্লিজ দোস্ত বল! আর একবার বল!’
ইকবালের কাতর মিনতি এড়াতে না পেরে আবার বললাম, ‘জীবনটাই তো সম্মোহন।’
‘ঠিক, ঠিক বলেছিস তুই! থ্যাঙ্ক ইউ দোস্ত! তোকে অনেক অনেক ধন্যবাদ, তোকে…।’
‘কী ব্যাপার বল তো? তু…?’
‘পরে কথা হবে, বাই।’ ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে গেল ইকবাল।
আমরা তো থ’। ওকে বাধা দেওয়ার সময়ও পেলাম না। ওর এ ধরণের পাগলামোটা অবশ্য এর আগেও দেখেছি, কিন্তু এত প্রকট আকার ধারণ করতে দেখিনি। খানিক বাদে বাইরে মোটর সাইকেল স্টার্ট নেওয়ার শব্দ পেলাম।

দুই
‘কানন, চলে আয় দোস্ত।’ ইকবাল বলছে ।
দীর্ঘ পাঁচদিন পর ফোন করেছে শালা আমাকে। এই পাঁচদিন কী করেছে, ওই ভালো জানে। ওর মোবাইলে কল লাগিয়েছি, লাভ হয়নি। বন্ধ ছিল। একবার ভাবলাম ওর বাড়িতেই যাব। পরে ভেবে দেখলাম, ছোঁড়া তাতে ‘বিরক্ত’ হবে। ওতো ইচ্ছা করেই যোগাযোগ করছে না। সময় হলে নিশ্চয়ই সব কথা নিজে থেকেই বলবে। পাঁচদিন পর ফোন করায় আমি কৃত্রিম রাগ দেখানোর ভান করে বুঝলাম এতে ওর কোন ভ্রুক্ষেপই নেই। অন্য সময় আমরা বিভিন্ন ছলে পরস্পরের রাগ ভাঙ্গাই। আমি মনে মনে কিছুটা আহত হলেও ঠিক বুঝলাম, কোন কারণে ও ভীষণ উত্তেজিত। সেজন্য অতিরিক্ত কথা খরচ করতে চাইছে না। সুতরাং কথা বাড়িয়ে কাজ কী? আমিও বলে দিলাম, ‘আসছি।’
‘এবার বল, কেন ডেকেছিলি?’ বললাম আমি।
‘অত অধৈর্য হচ্ছিস কেন? এলি তো সবে। বস না, চা-টা খা তো আগে।’ ইকবাল বলল।
আমি বললাম, ‘দুষ্টামি একদম চলবে না বলে দিলাম, আমার তর সইছে না!’
‘তা সইবে কেন? না সওয়ারই কথা যে!’
‘গৌরচন্দ্রিকা রাখবি?’
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। শোন, ঘটনার শুরু তোদের বাসা থেকে। মনে আছে, সেদিন তুই দস্তগীর আঙ্কেলের সামনে বলেছিলি – জীবনটাইতো সম্মোহন?’
‘রক্ষা কর মাবুদ! ওই কথা দেখছি তুই এখনো ভুলিসনি! হ্যাঁ বলেছিলাম, তো কী হয়েছে? কী এমন অপরাধ করে ফেলেছি আমি!’ আমি গুঙ্গিয়ে উঠে বললাম।
আমাকে তাড়াতাড়ি হাত নেড়ে থামিয়ে দিয়ে ইকবাল বলল, ‘না, না অপরাধ না, আমার মস্ত বড় উপকার করেছিস তুই। আমাকে আবিষ্কারটা করতে সাহায্য করেছিস। থ্যাঙ্ক ইউ দোস্ত!’
হাঁ হয়ে গেলাম আমি। পরক্ষণেই রাগ লাগল ওর ওপর। বললাম, ‘কী এমন হাতির ডিম, ঘোড়ার শিং আবিষ্কার করেছিস তুই যাতে কিনা আমি সাহায্য পর্যন্ত করেছি! বলতে এত প্যাঁচ মারছিস কেন?’
কিন্তু তখনো বুঝিনি এক যুগান্তকারী আবিষ্কার করে ফেলেছে ইকবাল। তখনও বুঝিনি আমার বন্ধু ইকবাল, যে বসে আছে আমার সামনে, যার সাথে আমি হাসি তামাশা করছি সে এক মহান বিজ্ঞানী হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে ফেলেছে সে আবিষ্কার দিয়ে।
ইকবাল বলল, ‘আচ্ছা যা, আর প্যাঁচ মারব না। শোন তুই তো বলেছিলি জীবনটাই সম্মোহন। তা কী ভেবে বলেছিলি কথাটা? কী অর্থ ছিল তোর কথার?’
এবার কিন্তু সত্যি সত্যি ভীষণ লজ্জা পেয়ে গেলাম। বললাম, ‘না, তেমন কিছু না। আসলে ইয়ে মানে কথাটা বিশেষ কিছু ভেবে বলিনি। মনে হয়েছে, বলে ফেলেছি ব্যাস।’
‘তবে দোস্ত…’ উত্তেজনায় মুখটা আমার কাছে এগিয়ে নিয়ে এল ইকবাল। ওর চোখ জোড়া চকচক করছে। আমি দম বন্ধ করে ওর দিকে চেয়ে আছি।
‘তবে, সেদিন তুই এমন একটা অর্থপূর্ণ কথা মনের অজান্তে বলে ফেলেছিস যা দুনিয়াতে এখন পর্যন্ত কেউ বলেনি। আর তার অর্থ এতবড় পৃথিবীতে একমাত্র আমারই জানা আছে।’
কেঁপে উঠলাম আমি, যেন বোম ফাটিয়েছে ইকবাল।
আবার বলা শুরু করল ও, ‘তুই প্রথম যখন কথাটা বলেছিলি তখনই আমার মগজ ঝাঁকি মেরে উঠেছিল। মনে হচ্ছিল তোর কথাটির বিশেষ কোন অর্থ আছে। তাই তোকে বারবার বলতে বলেছিলাম। হয়তো এতে তোরা বিরক্ত হচ্ছিলি, কিন্তু জানিস? তুই যতবারই কথাটা বলছিলি ততবারই একটু একটু করে এর অর্থ আমার মগজে ধরা দিচ্ছিল । সত্যি দোস্ত, একটা কথার মত কথাই তুই বলেছিস সেদিন। সত্যিই জীবনটা সম্মোহন। প্রমাণ নিবি? আয়।’
উঠে দাঁড়িয়ে গটগট করে হাঁটতে লাগল ইকবাল। মন্ত্রমুগ্ধের মত আমি ওর পেছন পেছন পা চালালাম। ইকবাল আমাকে নিয়ে ঢুকল ওর ছোটখাট ল্যাবরেটরিতে। এর আগেও অসংখ্যবার এখানে ঢুকেছি আমি। তবে ঘরের মাঝখানে রাখা বিরাট কাঠের বাক্সটা একবারো দেখিনি। অনায়াসে বাক্সটার পেটের ভেতর দুজন সেঁধিয়ে যেতে পারে। ওটার দিকে আঙ্গুল উঁচিয়ে ইকবাল বলল, ‘ওই যে আমার আবিষ্কার। পার্টসগুলো অন্য কাজের জন্য আগেই বানিয়ে রেখেছিলাম। এখন এখানকার কাজে লেগে গেল। এজন্যই মাত্র চারদিনে বানিয়ে ফেলতে পারলাম। চল ঢুকি।’
বিশাল বাক্সটায় দরজা ছিল, ভেতরে ঢুকে পড়লাম দুজন। ভেতরে অনেক রকমের যন্ত্রপাতি। শুধু যে জিনিসটা চিনতে পারলাম সেটা হচ্ছে চেয়ার। দুটো চেয়ার মুখোমুখি রাখা আছে, গদি আঁটা। ইকবাল আর আমি বসলাম।
ও বলল, ‘এবার খেলা দেখ।’
বলেই ওর চেয়ারের পেছনের কাঠের দেয়ালে বসানো সুইচ বোর্ডের একটি সুইচে চাপ দিল। অবাক কাণ্ড! তৎক্ষণাৎ চোখের সামনে থেকে জলজ্যান্ত ইকবাল ভোজবাজির মত উধাও হয়ে গেল! চমকে উঠলাম আমি। ভয়ও পেলাম ভীষণ! এ কী করে সম্ভব? মুহূর্তের মধ্যে কোথায় হাওয়া হয়ে গেল ও?
ভয়ার্ত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলাম, ‘ইকবাল! ইকবাল!!’
আমার অতি নিকটে ইকবালের অট্টহাসি শুনতে পেলাম।
‘ইকবাল, কোথায় তুই?’ আতঙ্কিত হয়ে বললাম। মুহূর্তের মধ্যেই ঘামে ভিজে জবুথবু হয়ে গিয়েছি।
‘ভয় পাচ্ছিস নাকি কানন?’
‘কোথায় তুই?!’
‘এই তো তোর সামনের চেয়ারেই বসে আছি।’
‘কৈ, দেখতে পাচ্ছি না যে!’
হো হো করে হেসে উঠল ইকবালের কণ্ঠস্বর। বলল, ‘নিজেকে দেখতে পাচ্ছিস তো?’
ঝট করে আমার দেহের দিকে তাকালাম আমি! তাকিয়েই জমে গেলাম। আমিও উধাও হয়ে গিয়েছি! আমার হাত! আমার পা! আমার বুক, পেট কিচ্ছু নেই! সব ফাঁকা! মনে হল আমি যেন একটি অতি ক্ষুদ্র বিন্দু। ভীষণ ভয় পেয়ে গেলাম। কাঁদো কাঁদো স্বরে বললাম, ‘ইকবাল! কী হচ্ছে এসব? বন্ধ কর! আ-আমার ভয় করছে।’
খলখল করে হেসে উঠল ইকবাল। বলল, ‘ভয় পাচ্ছিস তুই কানন? ভয়ের কী আছে? নিজের আসল রূপ দেখে কেউ ভয় পায় পাগল?’
‘নিজের আসল রূপ?’
‘হ্যাঁ। আচ্ছা, তুই এখন কেমন অনুভব করছিস বলত?’
‘আমার মনে হচ্ছে আমি স্থিরভাবে শূন্যে, অনন্ত মহাশূন্যে ঝুলছি। নিজেকে আমার অণুতুল্য আকৃতির মনে হচ্ছে।’ বললাম আমি।
ইকবাল বলল, ‘ঠিক বলেছিস। আমার অনুভূতিও তাই। আমিও তোকে দেখতে পাচ্ছি না, কিন্তু তোর কথা শুনতে পাচ্ছি। আমার কথা শুনে তুই আমাকে পাগল ভাবতে পারিস কিন্তু আমরা এখন নিজেদের যেভাবে অনুভব করছি সেটাই আমাদের আসল রূপ।’
ভূত দেখার মত চমকে উঠলাম আমি। বললাম, ‘এসব কী বলছিস তুই ইকবাল?’
ইকবাল মৃদু হেসে বলল, ‘ঠিকই বলছি দোস্ত। বুঝিয়ে দিলেই বুঝতে পারবি। তবে তুই ভয় পাস না, এটা আধা ঘন্টার ব্যাপার। তারপরেই আমরা আবার আগের রূপে ফিরে যাব। তোকে সবই বুঝিয়ে বলছি, তার আগে দুটো কথা বলে নেই। সেদিন তোর কথা শুনে আমি বাসায় এসে ভাবতে লাগলাম। সত্যি যদি জীবনটা সম্মোহন হয়ে থাকে! সত্যি সত্যি যদি আমরা সম্মোহিত হয়ে থাকি! সেদিন নাজমুলকে তো দেখলি, দস্তগীর আঙ্কেলের আদেশে ঘুমিয়ে পড়ল, একই কাগজকে একবার মিষ্টি বলল আর একবার বলল তেতো। তো প্রকৃতিও যদি আমাদের সবাইকে একসাথে সম্মোহিত করে থাকে তাতে অবাক হওয়ার কিছু আছে কি?’
‘তুই বলতে চাস, প্রকৃতি আমাদের যেভাবে ভাবতে বলছে, দেখতে বলছে, করতে বলছে আমরা তা সেভাবেই করছি?’
‘ঠিক তাই। তোকে চমকে দেওয়ার মতো একটা কথা বলি? তুই নিজেকে যেরকম ক্ষুদ্র বিন্দুর মতো মনে করছিস প্রকৃতি আসলে সেরকম বিন্দুই সৃষ্টি করেছে অসংখ্য পরিমাণে। তারপর তারমধ্যে প্রবেশ করিয়েছে জীবন। এছাড়া প্রকৃতি আর কিছুই সৃষ্টি করেনি, কিচ্ছু না।’
আমি সত্যি সত্যি আর একবার চমকে উঠলাম। এরকম পিলে চমকানো অভিনব কথা আর কয়টা যে বলবে ইকবাল!
আমি ভীষণ বিস্মিত হয়ে বললাম, ‘তারমানে তুই বলতে চাস প্রকৃতি কোন জড় বস্তু সৃষ্টি করেনি? তোর কথা হিসেবে সকাল বেলার টকটকে লাল সূর্য, শরতের কোমল চাঁদ, নীল আকাশে পেঁজা পেঁজা তুলোর মত সাদা মেঘ কিংবা উঁচু পর্বতের বুক চিরে বয়ে যাওয়া ঝর্ণা– এগুলো প্রকৃতি সৃষ্টি করেনি?’
‘আমি ঠিক এই কথাই বলতে চাই।’
‘তবে এগুলো কে সৃষ্টি করেছে?’
হেসে ফেলল ইকবাল। তারপর বলল, ‘তোর প্রশ্নের জবাব দিচ্ছি। তবে তার আগে জীবের সৃষ্টি সম্পর্কে দুটো কথা বলে নেই। প্রথমেই আসি জীবের আকৃতির কথায়। সুইচ দেওয়ার আগে তো তোর সামনে পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি উচ্চতার আমাকে দেখেছিলি বা নিজেকেও পাঁচ ছয় ফুট উচ্চতায় দেখেছিলি তুই, তাই না? তাহলে সুইচ দেওয়ার পর আমাদের আকৃতি বিন্দুর সমান হয়ে গেল কেন? ভাবছিস নিশ্চয়? আসলে সুইচ দেওয়ার পর আমরা আসল আকৃতি ফিরে পেয়েছি। আগেও একবার বললাম কথাটা। যাই হোক, এককোষী এমিবা বল আর মশা-মাছি বল, কিংবা মানুষ, ডায়নোসরই বল সব্বাই আসলে সমান আকৃতির।’
‘বলিস কী?’ আরও একবার চমকে ওঠার পালা আমার।
‘হ্যাঁ, তুই আর আমিও আসলে সমান আকৃতির।’
‘মানতে পারলাম না। আমি তোর চেয়ে অনেক লম্বা।’
‘ওটা আমাদের সম্মোহিত রূপ। আমাদের আসল রূপ বা আকৃতি এতই ক্ষুদ্র যে নিজেকেই দেখতে পাচ্ছিস না। যাই হোক, এমিবা, মানুষ, ডায়নোসর, বটগাছ- এককথায় সকল জীবই একই সমান ক্ষুদ্র। কাজেই তোর আর আমার আকৃতি সমান।’
‘তাহলে তোর চেয়ে আমাকে বড় দেখায় কেন?’
‘সেটা বুঝতে গেলে তোকে সৃষ্টির প্রাথমিক পর্যায়ে ফিরে যেতে হবে। প্রকৃতি তোর আর আমার মতো অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিন্দু সৃষ্টি করেছে। অণুর মতো ক্ষুদ্র, অসংখ্য পরিমাণে। সেই ক্ষুদ্র বিন্দুগুলো জীবন্ত। সেগুলো সৃষ্টি করার পর প্রকৃতি শুরু করেছে তার আসল কাজ।’ রহস্যময়ভাবে থামল ইকবাল।
ততক্ষণে আমার কৌতুহল চরমে। বললাম, ‘কী সেই কাজ?’
‘সম্মোহন।’ থমথমে কণ্ঠ ইকবালের।
‘সম্মোহন?’
‘হ্যাঁ, সম্মোহন। জীবন্ত অণুগুলোকে প্রকৃতি স্থায়িভাবে সম্মোহিত করেছে। যেমন তোর আর আমার কথাই যদি ধরি, আমরা দুজনেও তো আসলে জীবন্ত অণু বৈ নই। ধর, প্রকৃতি আমাকে বলছে-নিজেকে তুমি পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি দেহবিশিষ্ট একজন মানুষ হিসেবে কল্পনা কর। আমার আকার আকৃতি, চেহারা, রঙ-এগুলোকে নির্দিষ্টভাবে কল্পনা করতে বলে দিচ্ছে। তাই ক্ষুদ্র অণুর সমান হয়েও নিজেকে আমি পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি উচ্চতায় দেখতে পাচ্ছি। আমার হাত, পা সব কিছু দেখতে পাচ্ছি। তোর ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা তাই। এভাবে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সকল জীবই একটি ক্ষুদ্র অণুর সমান হলেও প্রকৃতির আদেশের ওপর ভিত্তি করে একেক জীবের আকৃতি একেক রকম। তবে প্রকৃতির এই আদেশ অনেকটা গণসম্মোহনের মতো। এই আদেশ প্রকৃতি একসাথে সবাইকে দিচ্ছে। যেমন ধর, প্রকৃতি শুধু আমাকে নির্দিষ্ট চেহারা বা আকৃতিতে কল্পনা করতে বলেই ক্ষান্ত হচ্ছে না, সেই সাথে দুনিয়ার সবাইকে আমার ব্যাপারে একই আদেশ দিয়ে ফেলছে। সেই কারণে আমি তোর কাছে যেই চেহারা বা উচ্চতায় আছি দুনিয়ার যেখানেই যাই না কেন সবাই আমাকে সেই চেহারা বা উচ্চতাতেই দেখবে। তবে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপারে প্রকৃতির আদেশ ভিন্ন হতে পারে। সেই কারণে কোনো খাবার হয়তো আমার কাছে ভীষণ প্রিয় অথচ দেখা যায় সেটা তুই মুখে তুলতেই পারিস না। এবার তোর কথায় আসি। তুই বলছিলি, চাঁদ, সূর্য-এগুলোকে প্রকৃতি সৃষ্টি না করে থাকলে কে সৃষ্টি করেছে, তাই না?’
‘হ্যাঁ।’
‘তোর প্রশ্নের জবাব নে।’ হেসে বলল ইকবাল, ‘আসলে চাঁদ, সূর্য-এগুলোকে কেউই সৃষ্টি করেনি।’
আবারো চমকে উঠলাম আমি। তোতলাতে তোতলাতে বললাম, ‘মা-মানে, তাহলে এগুলো এলো কোথা থেকে?’
এবার আরো জোরে হেসে ফেলল ইকবাল। বলল, ‘আসলে চাঁদ, সূর্য বলে কোনো কিছু সৃষ্টিই হয়নি।’
গুড়ুম করে আমার মাথার ভেতর বাজ পড়ল। কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে রইলাম। বিস্ময়ের ধাক্কা কাটাতে না পেরে বললাম, ‘তা-ত্তাহলে?’
ইকবাল বলল রহস্যময় কণ্ঠে, ‘সম্মোহন। প্রকৃতি প্রাণীকে বলছে সূর্যের অস্তিত্ত্ব কল্পনা করতে তখন তারা তা করছে। উদ্ভিদ তো আরেক ধাপ এগিয়ে! সূর্যের আলো ছাড়া বাঁচতেই পারে না! হাহ! সূর্যই নেই, তার আবার আলো! তুইও ভাবছিস উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় সূর্যের আলোর উপস্থিতিতে খাদ্য তৈরী করে নিজে বাঁচছে আর তোকেও অক্সিজেন দিয়ে বাঁচতে সাহায্য করছে। অক্সিজেন বলে কিছু থাকলে তো? প্রকৃতির আদেশে উদ্ভিদ ভাবছে খাদ্য তৈরী করে অক্সিজেন ছাড়লাম, যদিও খাদ্য বলে কিছু নেই। এটাও প্রকৃতির আদেশে উদ্ভিদ কল্পনা করছে। আর তুই ভাবছিস অক্সিজেন নিয়ে কার্বন ডাই অক্সাইড ছাড়লি, এটা তোর কল্পনা- প্রকৃতির আদেশে। এই যে উদ্ভিদ-প্রাণী করছি এতক্ষণ ধরে, আসলে তো উদ্ভিদ ও প্রাণির মধ্যে কোনো পার্থক্যই নেই। প্রকৃতির আদেশে ক্ষুদ্র একটা বিন্দু হয়ে যাচ্ছে বিরাট বটগাছ, আবার হুবহু একই আরেকটি বিন্দু হয়ে যাচ্ছে তোর মত প্রাণী। প্রকৃতি যদি তোকে বলত নিজেকে উদ্ভিদ হিসেবে কল্পনা করতে তাহলে তুই কানন না হয়ে, হতে পারতি ক্ষুদ্র শৈবাল কিংবা লম্বা ইউক্যালিপ্টাস গাছ। হাঃ হাঃ।’
আমি বললাম, ‘বুঝলাম। কিন্তু তোর কথা হিসেবে তো আগুন–পানি বলেও কিছু নেই, তাই না? যেহেতু তুই বললি যে প্রকৃতি কোনো জড় পদার্থ সৃষ্টি করেনি।’
‘হ্যাঁ।’
‘তাহলে আগুনে পুড়ে বা পানিতে ডুবে মানুষ মারা যায় কেন?’
‘ভালো প্রশ্ন। ধর, তুই স্বপ্নে দেখছিস তোকে কেউ লাঠিপেটা করছে। তোর সারা শরীরে লাঠির দাগ পড়ে গেছে। ভীষণ ব্যথা করছে তোর শরীর। কিন্তু ঘুম থেকে জাগার পর কি তোর আর ব্যথা লাগে, কিংবা তোর শরীরে লাঠির দাগ থাকে? থাকে না। তেমনি, আগুন নেই কিন্তু একজন মানুষ নিজেকে দাউদাউ আগুনের মধ্যে দেখছে, জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে তার শরীর । পানি নেই কিন্তু নিজেকে দেখছে সে পানির গভীরে । নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে পানির তলে। মৃত্যুযন্ত্রণা অনুভব করতে পারছে সে। কারণ, এগুলো সমস্ত কিছু প্রকৃতি তাকে ভাবতে আদেশ দিচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটাও স্বপ্নের মতো অবাস্তব। বাস্তবে তার অণুতুল্য দেহটি আগুনেও পুড়ছে না, পানিতেও ডুবছে না। নিজ জায়গাতেই থাকছে সেটা। এদিকে তাহলে আগুন বা পানি বলেও কিছু থাকছে না। কিন্তু প্রকৃতি যখন কোনো জীবন্ত অণুকে শেষ আদেশ দিয়ে ফেলে অর্থাৎ ভাবতে বলে যে সে মারা গেছে সম্ভবত তারপর অণুটিকে ধ্বংস করে ফেলে।’
‘ঠিক।’ সায় দিয়ে আমি বললাম, ‘তবে ধ্বংসের ব্যাপার থাকলে কিন্তু সৃষ্টির কথাও এসে যায়।’
‘তা তো যায়ই। জীবের মৃত্যু বলতে যদি একটি জীবন্ত অণুর ধ্বংস হয়ে যাওয়া বোঝায় তাহলে জন্ম বলতে একটি জীবন্ত অণুর সৃষ্টিও বোঝাতে পারে। তুই বিয়ে করার পর তোর যদি একটি সন্তান হয় তাহলে প্রকৃতি সম্ভবত একটি জীবন্ত অণু সৃষ্টি করবে। অথচ তোর স্ত্রী কল্পনায় গর্ভযন্ত্রণা ভোগ করবে। হয়তো তোর অণুতুল্য দেহটির পাশে তোর সমান আকৃতির একটি নতুন অণুর সৃষ্টি হবে যাকে তুই তোর পিচ্চি সন্তানের আকারে দেখতে পাবি। হয়তো সেই সাথে দেখবি তাকে তুই দোলনা থেকে তুলে সোনামণি সোনামণি বলে আদর করছিস, আর সে হুয়া হুয়া করে কাঁদছে। ’
‘দাদ-দারুণ তো!’ কথা আটকে গেল আমার।
ইকবাল আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু একটা প্রশ্ন মাথায় এল। আমি বললাম, ‘সবই তো বুঝলাম। কিন্তু প্রকৃতি আমাদের সম্মোহিত না করে বাস্তবেই সব কিছু সৃষ্টি করতে পারতো না?’
ইকবাল বলল, ‘দস্তগীর আঙ্কেল নাজমুলের মনে মিষ্টি খাওয়ার অনুভূতি তৈরী না করে কি বাস্তবেই মিষ্টি খাওয়াতে পারতেন না? পারতেন। তেমনি হয়তো প্রকৃতিও পারত । আমার প্রকৃতির ক্ষমতা বৈচিত্রময়, প্রকৃতির বড় সাধ বিচিত্র ক্ষমতা প্রকাশ করার। কিছু সৃষ্টি না করেই যদি প্রকৃতি পারে সেগুলোর অস্তিত্ব অনুভব করাতে তাহলে সৃষ্টি করতে যাবে কোন দুঃখে? তাছাড়া…’
হঠাৎ করে ইকবাল আমার সামনে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। কাঠের ঘর, সুইচবোর্ড সবকিছু আবার জায়গামতো দেখতে পেলাম আমি। নিজেকেও ইকবালের মুখোমুখি চেয়ারে ফিরে পেলাম। সবকিছু আগের মতো ঠিকঠাক হয়ে গেছে দেখে আমার কেমন যেন আনন্দ লাগতে থাকে। ইকবাল তড়িঘড়ি করে সেই সুইচটা অফ করে দিল যেটা অন করাতে আমরা আধাঘন্টা আগে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলাম।
ইকবাল বলল, ‘অটোমেটিক প্রোগ্রাম। প্রথমে সুইচ অন করলে সঙ্গে সঙ্গে অদৃশ্য হয়ে যাব। আধাঘন্টা পর যখন দৃশ্যমান হবো তখন পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে আবার অফ করতে না পারলে আবার অদৃশ্য…হাঃ হাঃ হাঃ চলতেই থাকবে।’
ইকবাল ব্যাপারটাকে কত হালকাভাবে দেখছে! ও জানেই না ও কত বড় একটা আবিষ্কার করে ফেলেছে। ওকে আমি নতুন করে দেখছি, কী সৌভাগ্য আমার! এতবড় একজন বিজ্ঞানী আমার বন্ধু! এতবড় একটা আবিষ্কার দেখাতে প্রথমে ডেকেছে আমাকে!
হঠাৎ করে আমি বললাম, ‘কীভাবে এমন একটা যন্ত্র তুই বানালি ইকবাল! এই সাংঘাতিক যন্ত্র…।’
ইকবাল হেসে বলল, ‘ওরে বাপরে, ওভাবে তাকাস না। তোর আলুর সমান চোখ দেখেই আমার ভয় করছে! এমনভাবে আমাকে দেখছিস যেন আমি মস্ত কোনো বিজ্ঞানী! আসলে কী জানিস? আমার এই আবিষ্কারে আমার চেয়ে প্রকৃতিই বড় ভূমিকা রেখেছে। এই যে কাঠ-কাঠালি আর লোহা লক্কর দিয়ে যন্ত্রটা বানালাম এটাওতো আসলে প্রকৃতির আদেশে আমরা কল্পনা করছি। আসলে তো কোনো যন্ত্রই আমরা বানাইনি। তাহলে প্রকৃতি ইচ্ছা করলে এমন একটা যন্ত্রের কল্পনা আমাদের করতে না দিলেও পারত। কিন্তু প্রকৃতি তা করেনি। এ থেকে বোঝা গেল প্রকৃতি নিয়ম ভঙ্গ করে না, তাতে তার রহস্য উন্মোচিত হয়ে পড়লেও না। যাই হোক যন্ত্রটা কীভাবে কাজ করে জানিস? সুইচ দিলেই আমাদেরকে ঘিরে ফেলে এক শক্তিশালী আর বিশেষ ধরণের ডিম্যাগনেটাইজিং শীল্ড যার বৈশিষ্ট্য হলো যে কোনো কম্পাঙ্কের তরঙ্গকে বিকর্ষণ করা। ফলে সুইচ দিলে প্রকৃতির তরঙ্গরূপ আদেশ আমাদের কাছে পৌঁছায় না। তখন আমরা আমাদের সম্মোহিত রূপটা না দেখে আসল রূপটাই দেখতে পাই। বুঝলি?’
আমি একেবারে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। ইকবালের উচ্ছসিত প্রশংসা করতে লাগলাম, ‘দারুণ, দারুণ! সত্যি চমৎকার! এবং অসাধারণ…। সত্যি বলছি, আপনি নিশ্চিত নোবেল পাবেন। ’
কখন যে আমি ওকে তুই থেকে আপনি বলতে শুরু করেছি টেরও পাইনি।
আমি আবার বললাম, ‘এ নিয়ে তো পেপার লিখলে বিশ্বের সেরা সায়েন্স জার্নালে ছাপা হবে! হইচই পড়ে যাবে সারা দুনিয়ায়। লিখবেন একটা পেপার, শিগগির?’
‘আপনি’ করে বলাটা খেয়ালই করেনি ইকবাল। ভঙ্গিটা ওর উদাস উদাস।
আবার বললাম, ‘লিখবেন?’
দেয়াশলায়ের কাঠি জ্বালানোর মতো ‘ফস’ শব্দ করে হাসল ইকবাল। তারপর ধীরে ধীরে ডানে-বামে মাথা নেড়ে বলল, ‘না।’
***

৪৫ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
i am a final year student of Bsc in Mechanical Engineering from RUET
সর্বমোট পোস্ট: ১ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ১ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-১০-২৮ ১৮:০৪:২৪ মিনিটে
banner

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top