Today 16 Dec 2018
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

স্বপ্ন

লিখেছেন: সুখী মানুষ | তারিখ: ১২/১২/২০১৩

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 242বার পড়া হয়েছে।

হাতের কব্জি থেকে গলগল করে রক্ত ঝরছে। বাসে ধাক্কাধাক্কি করে উঠতে গিয়েই এই আকাজটা হয়েছে। শেষ মুহূর্তে বাসে আর উঠলো না সেকান্দার। সে হাতের দিকে তাকিয়ে দুঃখ দুঃখ একটা মুচকি হাসি দিলো। এই হাসির অন্য একটা কারন আছে।

 

মাত্র সকাল বেলা সেকান্দর বউকে বলে এসেছে – রাতে স্বপ্ন দেখলাম, বাসে উঠতে গিয়ে হাত কেটে ফেলছি। মায়া হাসতে হাসতে বলেছিল – চিন্তার কারন নাই, নিজের উপর স্বপ্ন দেখলে তা দূরের উপর দিয়ে যায়। না জানি আজ কার হাত কটার ব্যবস্থা স্বপ্নে করলা। ভাল কিছু দেখতে পার না?

 

হাতে ব্যান্ডেজ করে সে ভাবতে থাকল মায়াকে ফোন দিবে কি না। প্রথমে ভাবল দরকার নাই, ফাও টেনশান করবে। মুহূর্তের মধ্যেই মনে হল, না জানানোর ফলাফল হবে ভয়াবহ। দেখা যাবে বাসায় ফেরার সাথে সাথেই খুব উদভ্রান্ত হয়ে সব জানতে চাইবে। আর এর পর শুরু হবে নাটক। ‘তোমার হাত কাটছে তুমি আমাকে জানাবা না! ও আচ্ছা আমাকে জানাবা কেন? আমি তো তোমার কেউ না! আমি তোমার একটা প্রজেক্ট মাত্র। প্রজেক্টের এপেন্ডিক্স লেখা শেষ তো খাতা বন্ধ’।

দেখা যাবে হাত কাটার ইস্যু চাপা পড়ে যাবে না জানানোর অপরাধের আড়ালে।

 

সেকান্দার বাসায় ফোন দিল –

–     হ্যালো।

–     হ্যাঁ, আরে তুমি? বলছিলাম না নিজের উপর স্বপ্ন দেখলে অন্যের উপর ফলে?

–     হুম

–     পাশের ফ্ল্যাটের ভাবি বাথরুমে গিয়ে ধপাস। হি হি হি…

মায়া খিলখিল করে হেসে যাচ্ছে। সেকান্দার মুগ্ধ হয়ে বউ এর হাঁসি শুনছে। মাঝে মাঝে মায়া এমন ভাবে হাঁসে মনে হয় দুনিয়াতে কোন দুঃখ নাই। সেকান্দার মনে মনে ঠিক করলো সে তার হাত কাটার কথাটা বলবে না। কি দরকার? থাক না বউ টা একটু আনন্দে থাক। পাশের বাড়ীর মহিলা বাথরুমে পড়ে যাবার আনন্দও কম আনন্দ না। মানুষ এক বিচিত্র প্রাণী। অন্যের ছোটখাটো দুঃখ দেখে এরা আনন্দ পায়।

 

অফিসে ঢুকতেই ইদ্রিসের সাথে দেখা। ইদ্রিস হচ্ছে কথার ব্যাটসম্যান। কথা সে স্পিনই হোক আর ফাষ্টই হোক হালকা করে ঘুরিয়ে তাকে চার ছক্কা করা কোন ঘটনাই না ইদ্রিসের কাছে। হাতে ব্যান্ডেজ দেখে ভাল মন্দ কিছুই জিজ্ঞাসা করলো না। মুচকি একটা হাসি দিয়ে বল্লো, কর্ম সারছেন, কাটছেন তো কাটছেন একেবারে বাম হাত! আগামি দিন সকালের কাজ সারবেন কি দিয়া?

–     কেন সকালে আবার কি হবে?

–     সকালেরটা সকালেই টের পাইবেন। ডান হাতের কাজ বাম হাত দিয়া চালানো যায়। কিন্তু বাম হাতের কাজ ডান হাত দিয়া করা যায়না। অফিসে দেখেন না, কোন কাম নাই এর পরেও খবিশ ভাইয়ের কি ক্ষমতা। মি: খবিশ হইল অফিসের বাম হাত। সে যা পারে তা অন্যরা পারে না। বুঝলেন সেকান্দার ভাই, দুনিয়ায় বাম হাতের কাজ সবাই পারে না। আর যারা পারে তাদেরকে কেউ দেখতে পারুক আর না পারুক ক্ষমতাবানরা ঠিকই এদেরকে পুষে।

 

ইদ্রিসের এই আর এক রোগ। নাম নিয়ে একটু এদিক সেদিক করে বলা।  খবির কে বলে খবিশ। বদরুলকে বলে বদ। এমনকি কারো সাথে প্রথম দেখা হলে সে হ্যান্ডশ্যাক করে হলে, আমি ইবলিশ। যার সাথে হ্যান্ডশ্যাক করা হলো সে একটু থতমত খেয়ে যদি বলে, সরি..। তখন সে শুদ্ধ করে বলে, জ্বী আমার নাম ইদ্রিশ। ইদ্রিশ নামের একজন নবি ছিলেন জানেন না? বাইবেলে যার নাম আসছে ‘ইনক’ নামে। নবিজীর মেরাজের সময় তিনি চতুর্থ বেহেস্ত এ যেই নবীকে দেখছিলেন। পবিত্র কুরআন শরীফে যার নাম দুই বার উল্লেখ করা আছে তার নাম শুনেন নাই?

 

যার সাথে হ্যন্ডশ্যাক করা হলো সে একটু বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে। আর কিছু না।

 

সেকান্দার এর অফিসিয়াল ডেজিগনেশন হলো ডেপুটি ম্যানেজার, এইচ. আর. , অ্যাডমিন। ইন্টারভিউ যখন দিতে এসেছিল তখন পোষ্টটা অনেক বড় মনে হয়েছিল। কত প্রশ্ন, কত কি। কিন্তু জয়েন করার পর দেখে ঠুস আর ঠাস। চব্বিশ জনের মত অফিস স্টাফ। এত ছোট অফিসে আলাদা করে এইচ আর এর প্রয়োজন নেই। এর পরেও সেকান্দারের সাথে একজন এক্সিকিউটিভ আছে। তারমানে এইচ আর এডমিনেই দুই জন।

 

হাত যে কেটেছে তা ভুলেই গিয়েছিল সেকান্দার। কম্পিউটারে বসে কী-বোর্ডে হাত দিয়েই মনে হলো হাত কেটেছে। পাসওয়ার্ডটা টাইপ করতে যথেষ্ঠই কষ্ট হলো। কারন বার বার শিফ্ট চাপতে ঝামেলা হচ্ছিল। সেকান্দারের পাসওয়ার্ড হলো, PaSsWoRdLaGeNa

 

অন্যদিন অফিসে ঢুকেই মায়াকে ফোন দেয়া হয়। আজ ফোন না দিয়ে একটা এসএমএস দিলে কেমন হয়? বিয়ের শুরুতে কি সুন্দর সুন্দর এসএমএসই না চালাচালি হতো। মায়ার এসএমএসগুলো হতো সব খাটি বাংলায়। যেমন, , I love you sweetheart  না লিখে সে লিখবে, আমি তোমায় অনেক ভালবাসি মিষ্টিহৃদপিন্ড। কোথায় যে সে এই সব পায়? একদিন ফোন দিয়ে বল্লো, এ্যাই তোমার অগ্নি-শিয়ালতো ওপেন হচ্ছে না! সেকান্দার খুঁজে পাচ্ছে না অগ্নিশিয়াল কি জিনিস। মায়া যখন খিলখিল করে হেসে ওঠলো তখনই সে বুঝতে পারলো মায়া ফায়ারফক্সের কথা বলছে। এত সুন্দর করে মেয়েটা হাসে! হাসিগুলোকে পপকর্ণ ভাজার মত। একটা দানা যেন আর একটা দানাকে ধাক্কা দিয়ে সামনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। স্বতঃস্ফুর্ত প্রক্রিয়া।

 

সেকান্দার ছোট্ট করে একটা এসএসএস লিখে পঠিয়ে দিল, Powchhechhi

mv‡_ mv‡_B wic­vB G‡jv, eto deri kore jananor sasti hishabe aaj sei jinish ta pabe na ja tumar posondo othocho amar na. bujheso pranonath?

 

 

সাড়ে এগারোটা থেকে বারোটার মধ্যে ইদ্রিস একবার রুমে এসে ঢু মারবে নিশ্চিৎ। মানুষের জীবনটা আসলে ছোটখাটো কিছু সিডিওলে বাঁধা থাকে। এই সিডিওলগুলো প্রায় সব মানুষের জন্যই কমন। সেকান্দার ঘড়ি দেখলো, বাজে ১২ টা ২০। ঘটনা কি? এর মধ্যে তো একবার ঢু মারার কথা।

 

ইদ্রিস এলো, সাড়ে বারোটার দিকে। সাথে একজন ছেলে। ঘরে ঢুকেই ইদ্রিস বল্লো, সেকান্দার ভাই আপনিতো লেট করে আসেন না কোন দিন। আজ দেরী দেখেই ভাবছি রাস্তায় কিছু একটা হইছে। বেন্ডেজ দেখে নিশ্চিন্ত হইলাম। কাটাছিড়া যে করছেন, টিটেনাস নিশ্চয়ই নেন নাই। আর নিতে বল্লেওতো নিবেন না। তাই সাথে করে ডাক্তার নিয়ে এসেছি। এম এ কামেল ডক্টরে মুদাচ্ছের… এতটুকো বলেই ছেলেটির দিকে তাকিয়ে ইদ্রিস জিজ্ঞাসা করলো, ব্রাদারের নামটা জানি কি?

ছেলেটি কিছুটা বিব্রত, কিছুটা আনন্দিত হয়ে জানালো তার নাম খলিল।

–     যাক ত্ওা খবি…

বাকিটা বলতে পারলো না। এর আগেই সেকান্দার হাত চেপে থামালো ইদ্রিসকে।

 

সোকন্দার বাধ্য ছেলের মত টিটেনাস ইনজেকশান নিলো। কিছু কিছু ব্যাপার আছে যার নাম উভয় সংকট। সেকান্দার মাঝেমাঝেই এমন উভয়সংকটে পড়ে। যেমন এখন পড়লো। ঔষধের টাকা দিতে গেলে হয়ত ইদ্রিসকে ছোট করা হয়। আবার না দিলে নিজের মনে একটা অপরাধবোধ লাগবে। এরপরেও মানিব্যাগটা ইদ্রিসের হাতে তুলে দিযে বল্লো, ডক্টরে মুদাচ্ছেরকে যা লাগে দেন।

ইদ্রিস মুচকি হাসি দিয়ে বল্লো, প্রি পেইড বস। অলরেডী দিয়ে এসেছি। আপনি নেক্স্ট তিন দিন সিঙ্গারা আর পল্টির বিল দিবেন এতেই শোধবাদ হয়ে যাবে।

 

পল্টি লাগানো মানে সিগারেট খাওয়া। কোত্থেকে এই নাম সে বের করেছে কে জানে। কতক্ষন পরপর এসে বলবে, চলেন ওস্তাদ পল্টি লাগায়ে আসি।

 

 

সেকান্দার আজ বাসায় ফিরলো দেরী করে। বাসের জন্য অপেক্ষা করতে করতে যথেষ্ঠই দেরী হলো। ঢাকা শহরে মানুষজন চক্রবৃদ্ধির হারে বাড়ছে। বাসার নীচে এসে মনে হলো বাসায় বাজার বলতে কিছুই নেই। সে আবার প্রায় আধা মাইল হেটে বাজারে গেল। বাজার করে হেটে হেটে বাসায় আসলো। বাজার করে বাসায় হেটে আসার বিষয়টা বেশ মজার। বেশীর ভাগ পুরুষমানুষই বাজার করে বাসায় ফিরে হেটে হেটে। আর বেতনের বাইরে যাদের অতিরিক্ত কোন ইনকাম নেই তারা প্রায় সবাই বাজার করে বাসায় ফিরেন হেটে হেটে। সৎ মানুষ চিনার এইটাও একটা উপায় বলে মনে হয় সেকান্দারের কাছে।

 

বাসায় ফিরে যা হবার তাই হলো, কান্নাকাটি হলো, রাগ অভিমান হলো। এর মধ্যে আবার বাজার করা হয়েছে! তারওপর নিশ্চয়ই হেটেহেটে ফিরা হয়েছে। সব কিছু মিলিয়ে মায়ার প্রচন্ড অভিমান হলো নিজের উপর। মানুষটা হাত কেটে ফোন দিয়েছিল তাও সে বুঝেনি! সে কেমন বউ? তারউপর আবার বাজার করে হেটে হেটে ফিরেছে। সে কি একবেলা ডিম ভেজে খেতে পারবে না? আর এক বেলা না খেয়েওতো থাকা যায়। আর সেকান্দার কোনদিন খাওয়া নিয়ে যন্ত্রনা করেনি। যাই দেয়া হয়েছে তাই খেয়েছে।

 

রাতে শুয়ে শুয়ে সেকান্দার ভাবছে। বেশ ক’দিন ধরেই যা সে স্বপ্নে দেখছে তা ই হচ্ছে। মজার ব্যাপার হলো ততক্ষন পর্যন্ত সে স্বপ্নের ঘটনাটা নিজের মধ্যে রাখতে ততক্ষন পর্যন্ত কিছুই হচ্ছে না। যখনই স্বপ্নের বিষয়টা কারো সাথে শেয়ার করেছে এর পরেই ঘটনাটা ঘটে।

 

মাত্র ক’দিন আগে একটা ঘটনার কথাই ধরা যাক। স্বপ্নে দেখলো ভূমিকম্পে এদের অফিসের পাশের একটা আন্ডার কনস্ট্রাকশন বিল্ডিং ধসে পড়েছে। বেশ কয়েকদিন বিষয়টা নিজের মধ্যে চাপা রেখেছিল। সেদিন অফিসের কয়েকজন মিলে চা খেতে নীচে নেমেছে। এমনি কথায় কথায় সেকান্দার বল্লো, সেদিন স্বপ্নে দেখলাম এই বিল্ডিংটা ভূমিকম্পে পড়ে গেছে। ইদ্রিস তখন হাসতে হাসতে বলেছিল, ওস্তাদ এই বিল্ডিংএর যেদিন টেন্ডার পাশ হইছে সেইদিনই আমি ভবিষ্যৎবাণী করছি ধসের বিষয়টা। আপনে এই ব্যপারে পিছায়ে আছেন।

 

সবাই হু হু করে হেসে ওঠলো। সবার হাসি শেষ হওয়ার পর ইদ্রিস বল্লো, এর কাজ পাইছে আমার এলাকার বড় ভাই। সরকার দলের লোক। হারমীর হারামী। তার বাবা টাকা দিত মায়ের ঔষধ কিনার জন্য, এই টাকা দিয়া সে নেশা করতো। বিষয়টা ধরা পড়ার পর এর বাবা ঔষধ কিনে দিয়ে আসতো। হারামজাদা সেই ঔষধ নিয়া দোকানে বেচতো। এবার বুঝেন এই লোক যদি কন্ট্রাকটর হয় এই বিল্ডিং কেমনে টিকবো?

 

হলোও তাই। সামান্য একটা ভূমিকম্পে আশেপাশের কিছুই হলোনা এই বিল্ডিংঠা ধসে গেল। ইদ্রিসের মজা করার জন্য হয়ত অন্য কলিগদের কাছে ব্যপারটা তেমন গুরুত্ব পেল না। কিন্তু সেকান্দার মনে মনে ধাক্কা খেল। ধাক্কা খাওয়ার কারন হলো, সে স্বপ্নে যেভাবে ভেঙ্গে পড়তে দেখেছে ঠিক সেভাবেই বিল্ডিংটা ভেঙ্গেছে। ছাদের একটা অংশ পাশের রাস্তায় পড়ে একটা গাড়ী দুমড়েমুচড়ে গেছে। স্বপ্নের গাড়ীটা ছিল মাজদা কম্পানির। সেকান্দার নিজে গিয়ে গাড়ীর লগো চেক করে এসেছে। ঘটনা সপ্নের সাথে হুবহু মিলে গেছে। আজ হাত কাটার বিষয়টাও একই। স্বপ্নের ঘটনা যা ঘটেছে তারই যেন পুনরাবৃত্তি।

 

এমন স্বপ্ন আতংকে আরো কয়েকটা দিন গেল। এর মধ্যে টুকটাক কিছু স্বপ্ন যে সে দেখলো না তা না। তবে ঘুম ভাঙ্গার পর স্বপ্নগুলো কিছুক্ষন মনে থাকছে। পরে একেবারেই মনে থাকছে না। তারমানে স্বপ্নগুলো সত্য হবার সম্ভাবনা নেই। এমনটা ভেবে কিছুটা স্বস্তি পেল সেকান্দার।

 

আজ একটা স্বপ্ন দেখেছে সেকান্দার। প্রথমে ভাবলো এই স্বপ্ন একটু পর ভুলে যাবে। কিন্তু না, ভুললো না। পরে ভাবলো অফিসে গিয়ে কাজের চাপে পড়লে ভুলে যাবে। কিন্তু না, ভুলাতো হলোইনা উল্টা স্বপ্নের ডিটেইলস মনে হতে শুরু করলো। স্বপ্নে একটা মেয়ে দেখেছিলো, দূর থেকে কেউ একজন মেয়েটাকে ডাকছিলো। নামটা মনে রাখার মত কিছু ছিলোনা। এখন সে স্পষ্ট মনে করতে পারছে, শিপ্রা, শিপ্রা নামে ডাকছিলো মেয়েটাকে। মেয়েটাকে ইদ্রিস অনেক পছন্দ করে। মেয়েটা বেশ কয়েক বছর ধরেই ইদ্রিসের কাছ থেকে টাকা পয়সা নিচ্ছে। সম্ভবত এলাকার পরিচিত কেউ হবে। মেয়েটা অন্য একটা ছেলের খুব কাছে চলে গেছে, যতটা কাছে ইদ্রিসও যায়নি।

 

সেকান্দার কোনদিন ইদ্রিসের পার্সোনাল বিষয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করেনি। কিন্তু একেবারে বাস্তব মনে হচ্ছে সব কিছু। কেবলই মনে হচ্ছে, ইদ্রিস এই ধাক্কা সামলে উঠতে পারবে না। হাসিখুশি চটপটে ছেলেগুলো সবার সাথে হেসে খেলে জমিয়ে রাখে। কিন্তু নিবিড় বেদনার সূতা বেঁধে রাখে কেবল একটি জায়গায়। কবিগুরুর, দূর হতে আমি তারে সাধিব / গোপন বিরহ ডোরে বাধিব’র মত বাধন। আচ্ছা সেকান্দারকে কি একটাবার জিজ্ঞাসা করা যায় শিপ্রা নামের কাউকে সে চিনে কি না? নাহ্ এক কথা, দুই কথায় পরে সব বলতে হবে। এবার সেকান্দার নিশ্চিৎ, স্বপ্নে দেখা কথাটা কারো সাথে শেয়ার করলেই ঘটে যাবে।

 

ঘরে ফেরার পরও মাথায় কেবল এই স্বপ্নের কথাটাই ঘুরছে। শিপ্রা নামের শ্যামলা, বোরকা পড়া মেয়েটার মুখটা সেকান্দার এখন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। সুন্দরী মেয়েরা ওপেন বুক টাইপ হয়, এদের প্রেম, বিচ্ছেদ, অঘটন সবকিছুই সবাই জানে। সমস্যা হয় শ্যামলা বা অসুন্দর মেয়েরকে নিয়ে। এদের প্রতি কেউ তেমন বিশেষ নজরও দেয়না, খবরও রাখেনা। তাই এই সুযোগে এরা বইয়ের বিভন্ন পাতায় যথেচ্ছা ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটায়। এই বই কেউ ঘেটে দেখার আগ্রহ দেখায়না বলে রক্ষা। বইয়ের পাতা উল্টানো শুরু করলে অবাক হয়ে দেখা যাবে, তলে তলে এত কিছু!

 

সেকান্দারের খুব মন খারাপ হচ্ছে ইদ্রিসের জন্য। কেবলই সাবধান করে দিতে ইচ্ছা করছে। কোন কিছুতেই মন দিতে পারছেনা সেকান্দার। মায়া বেশ কয়েকবার জিজ্ঞাসা করেছে, সমস্যাটাকি তোমার? চেহারা ভোঁতা করে আছো কেন? সেকান্দার কিছু বলেনি।

 

রাতের বেলা বাতি নিভিয়ে দিয়ে মায়া একটু দূরে গিয়েই পাশ ফিরলো। মেয়েদের খুব শীতল একটা কণ্ঠ আছে, যে কণ্ঠের সাথে যার পরিচয় নেই তাকে উদাহরণ গুলিয়ে খাওয়ালেও বুঝবেনা। সেই শীতল কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলো, তুমি কি রোকসানার কথা ভাবছো নাকি আজকাল? এই হলো মেয়ে মানুষের বদ স্বভাবের মধ্যে সর্বোচ্চটা। এদের জীবনে ফেলে আসা কোন ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয়া যাবেনা। কিন্তু কারনে অকারনে পুরুষের জীবনের অতীতে ফেলে আসা তিলকে তাল না বরং কাঠাল করে খোটা মারবে। রোকসানাকে সেকান্দারের অনেক পছন্দ ছিলো। রোকসানা পাত্তা দেয়নি, ব্যাস। জীবনে এমন অনেক বিফল প্রেমের কথা থাকে। কোন কুক্ষনে সে বউয়ের সাথে এই কথা অতি প্রেমে গদগদ হয়ে বলেছিল তা ভেবে সে নিজেই অবাক। সেকান্দার খুব আস্তে করে বউয়ের উপর হাত রাখলো, মায়া ঝাড়া দিয়ে হাত সরিয়ে দিলো। এই মুহূর্তগুলোতে কি করতে হয় তা সেকান্দার আজও শিখেনি। এখন যাই করুক না কেন ঘটনা চোখের পানিতে গড়াবে।

 

এবারের ঘটনা চোখের পানি পর্যন্ত গড়ালো বলা ঠিক হবে না বরং চোখের পনি দিয়ে শুরু হলো। এতই যদি পিরিত ছিল তো মায়ার জীবন কেন ধংস করা হলো ইত্যাদি ইত্যাদি। মাঝরাতে মায়া দরজা খুলে বের হয়ে গেল। ইদ্রিসকে নিয়ে দেখা স্বপ্নের যে কথা কাউকে বলতে চায়নি সেই কথা শেষমেষ মায়াকে বলতে হলো।

 

পরের দিন খুব অপরাধীর মত অফিসে ঢুকলো সেকান্দার। সে জানে ইদ্রিসের যা হবার তা হয়ে গেছে। নিশ্চয়ই জেনে গেছে সব। বেশ কয়েকবার ইদ্রিসের রোমে গিয়ে দেখে আসলো সেকান্দার। ইদ্রিস আজ অফিসে আসেনি। ইদ্রিসের ফোনও বন্ধ। সেকান্দারের ভিতরটা গুলিয়ে গুলিয়ে উঠছে। ছোটবেলায় বেশী খুধা লাগলে বুকের ভিতরটা কেমন জানি চিনচিন করে উঠতো। আব ঠিক এমন একটা অনুভূতি হচ্ছে বুকের ঠিক মাঝখানটাতে। ছেলেটা আত্মহত্যা টাত্মহত্যা করে ফেলেনিতো আবার!

 

সারা দিন কাজে মন বসলো না। দুপুর বেলা চেয়ারে হেলান দিয়ে একটু তন্দ্রার মত আসলো। এর মধ্যেই সেকান্দার স্বষ্ট একটা স্বপ্ন দেখলো। এবারের স্বপ্নটা নিজেকে নিয়ে। সেকান্দার থ হয়ে বসে রইলো। গ্র্যান্ডফাদার প্যারাডক্স নামের একটা থিয়োরাম খুব মনে পড়ছে হঠাৎ করেই।

 

ইদ্রিসের বাসার ঠিকানা সেকান্দারের কাছে আছে। সে ভেবেছিলো অফিস শেষে বাসায় গিয়ে খবর নিবে। কিন্তু সে যা স্বপ্নে দেখেছে তা নিয়েই আচ্ছন্ন হয়ে রইলো সেকান্দার।

 

বাসায় পৌছে সোফায় চুপ করে বসে রইলো। সে যা স্বপ্নে দেখেছে তা কোন ভাবেই বলা যাবে না। অসতর্ক হয়েও যদি বলে ফেলে তখন? কিন্তু সমস্যা হলো মায়া তো খুচিয়ে খুচিয়ে জিজ্ঞাসা করবেই! মাত্র গত রাতেই কি নোংড়া ঘটনার মধ্য দিয়ে যেতে হলো সিম্পল একটা বিষয় নিয়ে। ইদ্রিসকে নিয়ে দেখা স্বপ্ন গোপন করতে গিয়ে তার নিজের সংসারই ভেংেগে যাবার যোগার হয়েছিলো। শেষমেস, যা ঢাকতে চেয়েছিলো তা সে ঢাকতে পারেনি। আজ ইদ্রিসটার কোন খবরই পাওয়া গেল না। তার মোবাইলতো কখনোই বন্ধ থাকে না! তবে কি…?

 

মায়া আজ বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছে। স্বামীর খুব কাছে এসে ঢং করে বল্লো, আমি তোমার খুব বাজে একটা বউ তাইনা? অন্যসমযের মুডে থাকলে সেকান্দার দুষ্ট একটা হাসি দিয়ে বলতো, খুউব। গতদিন ঝগড়ার কারনেই হয়ত মায়া আজ হরেক রকমের রান্না করেছে। ডালে আম আর পোড়া মরিচ খুব পছন্দ সেকান্দারের। আজ সেভাবেই রান্না হয়েছে। ভাত খেতে বসে সেকান্দার ভাত মুখে দিয়েই ঝরঝর করে কেঁদে দিলো। খাওয়া কি এত স্বাদের হয়? দুনিয়া কি এত সুন্দর হয়? মায়া অবাক হয়ে কাছে এসে জড়িয়ে ধরে বল্লো, সোনা আমার কি হইছে? এ্যাই কি হইসে জান আমার? আই এ্যাম সরি…

 

আজও হয়ত কথায় কথায় স্বপ্নের কথা বলে দিতে হবে। স্বপ্নের কথা বলা মানেইতো তা ফলে যাওয়া! এখনোতো কিছুই গুছানো হয়নি! সেকান্দার কিচ্ছু না বলে না খেয়ে ওঠে গেল।

 

সারা রাত কেউই কিছু বল্লোনা। দুইজন দুই মেরুর হয়ে সারা রাত জেগেই কাটিয়ে দিলো। সকাল বেলা সেকান্দার মায়াকে বল্লো, রেডি হয়ে নাও, আমার সাথে একটা ব্যাংকে যাবে। মায়ার উত্তর দিতে ইচ্ছে হলো না। যেমনি বসেছিলো তেমনি বসে রইলো। মায়ার পাশে সেকান্দার খুব আস্তে করে গিয়ে বসলো। খুব আস্তে করেই বল্লো, তোমার কোন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নাই। আমি মরে টরে গেলে নমিনি হিসাবে টাকা তোলা অনেক ঝামেলার হবে তোমার জন্য। এর চেয়ে ভালো, চলো তোমার অ্যাকাউন্ট করে এফডিআরগুলো ভেংগে তোমার অ্যাকাউন্টে জমা দিয়ে দেই। আরো অনেক কাজ বাকী। মায়া কিছুই বল্লো না, ক্ষনে ক্ষনে শরীরর কাটাকাটা দিয়ে ওঠলো তার। শেষমেস আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলোনা। সেকান্দারকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো।

 

আজও কাজের কাজ কিচ্ছু হলো না। মায়া ব্যাংক আ্যাকউন্ট করতে রাজি হলো না। অফিসের দেরী হচ্ছিলো বলে সেকান্দার বেড়িয়ে গেল। ইদ্রিসের খোঁজটাও নেয়া হয়নি। অনেক কাজ বাকী, অনেক…

 

বাসায় ফিরলো সেকান্দার সন্ধার দিকে। মায়া যেখানে বসেছিল সোফার সেই জায়গাটিতেই বসা। সারাদিন সে ফোন করেওনি ধরেওনি। সারা দিন মনে হয় নাওয়া খাওয়া কিছুই করেনি। সেকান্দার খুব সন্দিহান হয়ে গেল। সে কি পারবে না বলতে যে বউ আমি স্বপ্নে যা দেখি তা বলতে পারিনা। বল্লেই তা ফলে যায়। তুমি আমিতো সুখেই আছি। যা বলতে চাইছিনা তা ঘাটাঘাটি করে আমাকে দিয়ে বলানোতেই কি তোমার শান্তি? নাকি দুইটা মানুষ পাশাপাশি সুখে দুঃখে পাশাপাশি থাকো এতে শান্তি?

 

কি করবে সেকান্দার? বউ প্রায়ই অভিযোগ করে খুব বাজে ভাবে বলে, তুমি এমন হাজবেন্ড যে, বউ কি কারনে রাগ করলো সেই কারনটাই খুঁজে পাওনা। এই জন্যই রাগ, বিরক্ত আরো বেশী লাগে। সারা জীবন সব বলে দিয়েছে বউকে। সত্য কথা বলে বলেও সংসারে সুখের সুখ কতটা হয়েছে? আজ একটু মিথ্যা বলে যদি স্বপ্নের কথাটা আড়াল করা যায় তাহলেই এই যাত্রা বাঁচা যায়। কিন্তু মিথ্যা বলতে গেলেই যে হাসি আসে! অন্যে বুঝার আগে সে নিজেই বুঝে যায় যে মিথ্যা বলছে। আচ্ছা স্বপ্নের কথা সত্যা বা মিথ্যা কিছুই বলার দরকার নাই। সে কি পারবে না একটা জিনিষ না বলে অন্য জিনিস বলে মায়ার মান ভাংাগতে। কিন্তু সমস্যা হলো, মায়ার যা স্বভাব একবার বলা শুরু করলে ঠিকই সে খুচিয়ে খুচিয়ে সব বের করবে।

 

সেকান্দার একটা বুদ্ধি করলো। খুব সাহস নিয়ে মায়ার পাশে বসে হাত দুটো নিজের কোলের উপর নিলো। মায়া বাধা দিলো না। সেকান্দার খুব ধীরে ধীরে গম্ভীর হয়ে বল্লো, বউ গত কয়েকদিন ধরেই আমি স্বপ্নে যা দেখি তা কারো কাছে শেয়ার করার আগ পর্যন্ত ঘটে না। কিন্তু কারো কাছে শেয়ার করলেই তা ঘটে যায়। গত দিন আমাকে নিয়ে খুব বাজে একটা স্বপ্ন দেখছি। তাই বলতে চাচ্ছিলামনা। ঘটনা হইলো…

 

পরিশেষে: ঘটনা অনেক রকমই হতে পারে। সেকান্দার সবই বল্লো, কিন্তু পরে কিছুই হলো না। স্বপ্নতো স্বপ্নই! আবার এমনও হতে পারে, মায়া তার স্বামীর মুখ চেপে বল্লো, চুপ করো, তুমি এক্ষনি চুপ করো। আবার যা হবার তাও হতে পারে।

২৮১ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
সর্বমোট পোস্ট: ৩ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ১ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৯-০১ ১৬:৩১:২৫ মিনিটে
banner

৩ টি মন্তব্য

  1. এস এম আব্দুর রহমান মন্তব্যে বলেছেন:

    ভাল লাগল গল্পটি । শুভ কামনা ভাল থাকুন ।

  2. শাহ্‌ আলম শেখ শান্ত মন্তব্যে বলেছেন:

    চমত্‍কার হয়েছে গল্পটি অসংখ্য অসংখ্য ভাল লাগা জানালাম । শুভ কামনা ।

  3. আরজু মন্তব্যে বলেছেন:

    চমৎকার লাগল সুখী মানুষ আপনার গল্প।ধন্যবাদ আপনাকে।শুরু শেষ মাঝে গল্পের বিন্যাস অপূর্ব।অনেক ভাল লাগল।শুভ কামনা আপনার জন্য।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top