Today 24 Sep 2018
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

স্মৃতির পাতা থেকে

লিখেছেন: এস এম আব্দুর রহমান | তারিখ: ২৬/০৫/২০১৪

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 417বার পড়া হয়েছে।

মিশনে যাওয়ার প্রস্তুতি পুরোদমে চলছে । জাতি সংঘের এক প্রতিনিধি যিনি জর্দানের নাগরিক, অবসর প্রাপ্ত পুলিশ অফিসার , তিনি এসে যথারীতি পরীক্ষা নিয়ে আমাদের নির্বাচিত করলেন । দীর্ঘ দের মাস প্রশিক্ষণ গ্রহন করার পরও আমাদের কিছু লোক ফেল করলো । আমার ধারণা কিছু লোককে ফের করানো হলো । কারণ আমাদের মিশনে লোক লাগবে ১৪০ জন । প্রশিক্ষণ গ্রহন করেছে ১৪৮ জন ।সঙ্গত কারণেই ৮ জন বাদ দিতে হবে ।যথার্তই যারা অকৃতকার্য হয়েছেন তারা বাদ পড়লে বলার কিছুই ছিল না । কিন্তু আমাদের মিশনের ক্ষেত্রে সে রকম হয়নি বলে অনেকে মনে করেন । কারণ প্রশিক্ষণের শেষ সপ্তাহে স্বাস্থ্য পরীক্ষার রিপোর্ট এলে দেখা গেল ৪ জনের বিরুদ্ধে বিরুপ রিপোর্ট এসেছে । উক্ত ৪ জনের বিপরীতে পরবর্তীতে ৮ জন এসে যোগ দিল । শেষাবদী দেখা গেল উক্ত ৮জনের কেহই বাদ যায়নি । খোঁজ নিয়ে জানা গেল ঐ ৮ জনের সকলেই ছিল কোন না কোন উচ্চ পদস্ত কর্মকর্তার বডি গার্ড অথবা ড্রাইভার । কাজেই তাদেরকে তো আর বাদ দেওয়ার কায়দা নেই । আর সংখা ঠিক রাখতে হলেতো কারোর না কারোর গলা কাটতেই হবে ।কাজেই শেষ মূহূর্তে গলা কাটতে হয়েছে সেই নিরীহ ছাগ শিশুদের । যাদের অন্তরে প্রতিবাদের ভাষা আছে কিন্তু প্রকাশের ক্ষমতা নেই ।মুখ ট্যাপ দিয়ে আটকানো । বাদ পরা লোকদের দু:খ দেখেনিজের মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে গেল । কারণ ছোট বড় সবারই অবস্থা ভেদে সামাজিক মর্যাদা আছে । তারা মিশনে যাবে একথা আত্নীয় স্বজন , পাড়া প্রতিবেশী সকলেই জেনে গেছে । সেই ক্ষেত্রে তীরে এসে যদি তরী ডুবে যায় তবে তার অবস্থা এক মাত্র ভুক্তভোগীই উপলব্দি করতে পারবে , অন্য কেহ নয় ।
সকল প্রতি বন্ধকতা উৎড়িয়ে মিশনে যাওয়ার দিন অর্থাৎ ফ্লাইট ডেট ঘনিয়ে এল । জানতে পারলাম ১৪০ জন ফোর্সকে তিন ভাগে ভাগ করে পাঠানো হচ্ছে । প্রথম দলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সহসকল এ এস পি গন যাবেন, ২য় দলে ৬৫ জন লোক ও অন্যান্য মালামাল সহ আমি যাব । ৩য় দলে যাবেন সি ও সাহেব নিজে । আমি াবাক হলাম এই ভেবে যে, সকল অফিসারদের ১ম দলে পাঠানোর সিদ্ধান্ত সি, ও সাহেব কিভাবে নিলেন । ৬৫ জন সদস্যের একটি দল নিয়ে কোন দিকে রওয়ানা হওয়া , যার ৯৫/ভাগ লোকই জীবনের প্রথম বহির্গমন করবেন । ২৩ মে রাত ৮ টায় বাসা ছেড়ে বের হলাম । আমার স্ত্রী, ছেলে , মেয়েসকলের চোখেই পানি । মনটা ভারাক্রান্ত হলো বটে , কিন্তু বিচলিত হলো না । কারণ দুটো ছেলে মেয়ে নিয়ে বেঁচে থাকার মতো দক্ষতা আমার স্ত্রীর আছে । তবু সে জল ছল ছল চোখে যখন ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকলো সে দৃষ্টি যেন আমার হৃদয় বিদীর্ণ করে দিচ্ছিল । আমি আমার স্ত্রীকে কতটা ভাল বাসি তা জানি না । তবে সম্ভবত একটু বেশীই ভাল বাসি । সে কথা না হয় আর একদিন বলবো । আজ শুধু এটুকু বলতে পারি যে , ৬৫ জন লোককে সকল কার্যক্রম সম্পন্ন করে ঠিক ভাবে নিয়ে যাওয়ার দ্বায়িত্ব বোধ আমাকে স্ত্রী ও ছেলে মেয়ের কথা ভবাববার সময় দেয়নি । রাস্তায় জ্যাম থাকার কারনে নির্ধারিত সময়ের কিছু পরে বিমান বন্দর এসে পৌঁছলাম । বিমান বন্দরে যেহেতু সকল কার্যক্রম আমাকেই সম্পন্ন করতে হবে , সে কারনেই একবার টার্মিনালের ভিতরে প্রবেশ করলে আর বের হওয়ার সময় পাবো না ভেবে আমার স্ত্রীকে বিমান বন্দর নিয়ে আসিনি । বাস্তবে হলোও তাই । আমি দেরীতে পৌঁছানোর কারনে সকল কাজ তাড়াহুড়া করে করতে হলো । ফলে পূনরায় বাইরে এসে অপেক্ষমান ছেলের মুখ দেখে যেতে পারলাম না । রাত ১২.৩০ মিনিটে অথা ২৪ সম রাত.৩০ ঘটিকার সময় জর্দান এয়ার লাইন্সের একটি জেড বিমানে আমাদের নিয়ে বাংলার মাটি ত্যাগ করলো । আকাশে উড়ে চললাম আমরা । রাতের অন্ধকারে ঢাকা শহরের বাতি ছাড়া অন্য কিছু দেখতে পেলাম না । শুধু বারবার মনে পরতে লাগলো আমার স্ত্রী ও মেয়ের জল ভরা ড্যাব ড্যাব করে তাকানো চোখ এবং বিমানবন্দর টারমিনালে রেখে আসা আমার ছেলের পিতৃ বিচ্ছেদে আক্রান্ত মুখ ।
মেঘের উপর ভর করে আমরা ভেসে ভেসে যাচ্ছি । চার দিক নিঝুম অন্ধকার ।অভ্যন্তরীণ বিমানে ইতো পূর্বেও উঠেছি, কিন্তু আজকের মতো এতো বড় বিমানে এত দীর্ঘ ভ্রমন ইতো পূর্বে আর করিনি । আসলে কেউ যদি মনে মনে এ ই ভাবনা না রাখে যে , সে বিমানে পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে হাজার হাজার ফুট উচু দিয়ে উড়ে যাচ্ছে, তবে সে বুঝতেই পারবে না যে, সে উড়ে যাচ্ছে । বিমানে উড়ে যাচ্ছি একথা জানা না থাকলে বাংলাদেশের নাইট কোচ মনে করলেও কোন অসুবিধা নেই । হাওয়ায় ভেসে যাচ্ছে বলে ভাববার কোন কারণ নেই যে, বিমানে কোন ঝাকুনি লাগেনা , বাসের মতই যথেষ্ট ঝাকুনি লাগে । বসার সীট গুলো পিছনের দিকে এলিয়ে দিয়ে শুয়ে থাকা যায় । অনেকেই সে সুযোগ গ্রহন করে ঘুমিয়েও পড়লো । কিন্তু আমার ঘুম এলো না । চোখ বন্ধ করলেই স্ক্রীনে ভেসে উঠতে লাগলো ছেলে মেয়ে ও স্ত্রীর মলিন মুখ । মন আমাকে ছেড়ে যেতে লাগলো দূর অতীতে, যেখানে হাড়িয়ে গেছে আমার শৈশব কৈশোর ও যৌবন কাল । বার বার মনে হতে লাগলো আমি কেন যাচ্ছি সুদানে ? সুখের জন্য না টাকার জন্য ? সুখ আপেক্ষিক বিষয় টাকা থাকলেই সুখ থাকবে একথা জোর দিয়ে বলা যায় না । আমার টাকা নেই , ছিলওনা কোন দিন । কিন্তু সুখের অভাব কোন দিন হয়েছে বলে অনুভব করিনি । বরং যত লোকের সাথে আমাদের পরিচয় হয়েছে , তারা সকলেই কোন না কোন ভাবে প্রকাশ করেছে যে, আমরা খুবই সুখী পরিবার ।টাকা হলেই সুখ আসে কিনা তা ভেবে দেখার বিষয় । আমার চাকরীর শুরুতে যারা আমার কোর্স মেট ছিল, তারা বর্তমানে সকলেই কোটি পতি এবং তারা সকলেই জানে আমার কোন টাকা পয়সা নেই ।এজন্য আমি পারত পক্ষে সকলকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি । তথাপি কেহ কেহ অর্থের দাপটে নিজেকে সুখী বলে মনে করে ।
আমার এক বন্ধু , সে চাকরীর ক্ষেত্রে আমার কোর্সমেট । তার কথাই ধরা যাক –সে কোটি কোটি টাকার মালিক । পরিবারের সকলেরই একটি করে ব্যক্তিগত গাড়ি আছে বলে শুনেছি ।ঢাকার আশে পাশে তার দুটি পেট্রোল পাম্প আছে । জীবনের শুরুতেই তারা তাদের জীবন নিজস্ব লাইনে চালিয়ে দিয়েছে । তারা তাদের লাইনে সফলতাও পেয়েছে । তখন ১৯৯৪ সাল । আমি পটুয়া খালী সদর থানার ও, সি । নিরিবিলি সরকারী কাজ করে যাচ্ছি । ইতোমধ্যে আমার উল্লেখিত কোর্সমেট রোমী( ছদ্ম নাম )কোন কারণে চেইন আউট হয়ে ঢাকা মহানগর এবং তার পার্শবর্তী থানা গুলো থেকে ছিটকে লাইন চ্যুত হয়ে পড়েছে । শেষ রক্ষা করতে না পারায় তখন তার সি আই ডি তে পোষ্টিং । তার নৌকার পাল তখন এতই ছেড়া যে, তাতে মোটেই বাতাস আটকাচ্ছিল না । ফলে তখন তার সি, আই, ডি থেকেও বরিশাল জোনের পটুয়াখালী জেলায় পোষ্টিং ।অর্থা তখন সে ঢাকা মহানগরের কোন ইউনিটেই নিজের নৌকার নোঙ্গর করতে পারেনি । ফলে তার পটুয়াখালী জেলায় যোগদান করতে হয়েছে । সেই সুবাদে রোমী মাঝে মাঝে পটুয়াখালী এলে আমার বাসায় আসতো । আমার সংসারের অভাব অনটনের কথা সে ইতো পূর্বেই শুনে থাকবে । ফলে সঙ্গত কারণেই আমি একটু ভাল ভাবে চলি সেটাই সে চেয়ে থাকবে । এজন্য সে আমাকে নানা ভাবে অনুপ্রাণিত করতে থাকে যাতে আমার সংসারে একটু সচ্ছলতা আসে । অবশ্য বন্ধু হিসেবে তার পক্ষে এটা করাই সাভাবিক । ও, সি, হিসেবে কিভাবে টাকা উপার্জন করা তার নানা কায়দা কৌশল সে আমাকে শিখাতে চেষ্টা করতো । বুঝতেই তো পারছেন, ও, সি হিসেবে টাকা উপার্জন করা মানেই অবৈধ পন্থায় টাকা উপার্জন করা । আর যে থানার আওতায় কোন শিল্প কারখানা বা ব্যবসা বানিজ্য নেই সেখানে অবৈধ টাকা উপার্জন মানেই থানার সাধারন নাগরিকদের বিভিন্ন মিথ্যা মামলায় ফেলে নির্যাতন করে টাকা আদায় করা । কাজেই আমাকে এই বিষয়ে অনুপ্রাণিত করার এক পর্যায়ে এ কথা গুলো াামি তাকে বললাম । প্রতি উত্তরে সে আমাকে বরলো—
“ শোন থানা এলাকায় কোন মানুষ থাকুক আর নাই থাকুক , শুধু যদি মাটিও থাকে তা হলেও আমাকে টাকা দিতে হবে । তুমি শুধু আমাকে চেয়ারটা ছেড়ে দাওএবং আমার পাশে বসে বসে দেখ টাকা কিভাবে আসে ।“
কিন্তু আমি তার প্রস্তাবে রাজি হতে পারিনি এবং তার কাছ থেকে এ প্রশিক্ষণও গ্রহন করতে পারিনি । রোমী বন্ধু হিসেবে তার দ্বায়িত্ব পালন করেছে । প্রাণ পণ চেষ্টা করেছে আমাকে তাদের লাইনে নিয়ে তার বন্ধুর ইপকার করতে । কিন্তু আমি দুর্ভাগা , তাই তার এ চেষ্টার কোন মূল্র্য দিতে পারিনি । তাই বলে এত সহজে সে হাল ছেড়েও দেয়নি ।দীর্ঘ দিন অর্থাৎ সে যতদিন পটুয়াখালী ছিল, ততদিন চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছে । আমার কাছ থেকে কোন সাড়া না পেয়ে শেষে আমার স্ত্রীকে বুঝানোর চেষ্টা করে । সে আমার স্ত্রীকে বলে—
“ আচ্ছা ভাবী ওকেতো মানুষ করতে পারলাম না । আপনি কেমন মানুষ বলুনতো ? আপনার ভবিষ্যতের জন্য কোন চিন্তা হয় না । আপনি ওকে তাগিদ দিতে পারেন না ? আমার স্ত্রী তো সব সময় বলে ‘মোর এ্যান্ড মোর ‘আমি যত টাকা দেই তার পরও টাকা চাইতে থাকে ।আপনি চাপ না দিলে তো ও উপার্জনের দিকে মনই দিবে না । “ আমার স্ত্রী শুনে আর হাসে । রোমী বলে—
“আপনি হাসছেন ?” আমার স্ত্রী বলে —
‍‌”হাসার কথা বললে হাসবো না ?” রোমী বলে—-
“ভবিষ্যতের জন্য ভাবনা হয়না আপনার ? এমন একদিন আসবে যখন দেখবেন আমরা বছর বছর গাড়ির মডেল বদলাব আর আপনারা ছেলে মেয়ে ও লাগেজ নিয়ে রাস্তার পাশে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন ।“
আমার স্ত্রী নির্বিকার বদনে বলে—“ কি আর করা যাবে ভাই । যার যেমন স্বভাব । যে অস্র ঢালাই লোহা দিয়ে তৈরী, তাকে যদি নিজের ইচ্ছে মতো ব্যবহারের জন্য আঁকা বাঁকা করতে চান – তাহলে বাঁকা তো হবেই না বরং ভেঙ্গে অকেজু হয়ে যাবে । তার চেয়ে ভাল যে যেমন আছে তাকে তেমনি থাকতে দেওয়া ।“ রোমী বলে—
“ আপনার সুখে থাকতে ইচ্ছে করে না ?” আমার স্ত্রী বলে—-
“সুখ ? সুখের তো কোন সজ্ঞা নেই ভাই । কেউ না খেয়ে থেকে সুখে থাকে, আবার কেহ টাকার বিছানায় শুয়েও সুখের সন্ধান পায় না । তাই বলি কি আমার সুখ নিয়েই আমাকে থাকতে দিন না । আর শেষ জীবনের কথা বলছেন ? জীবনের ভ্রমন যখন শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছবে , তখনই তো জীবনের হিসেব । সুখের হিসেব না হয় ঐ সময়ই মিলিয়ে নিব । “
ইতোমধ্যে অনেক সময় কালের গর্ভে বিলিন হয়ে গেছে । গঙ্গা, যমুনা , মেঘনার মতো প্রমত্ত নদীতেও মাঝে মাঝে চর পরেছে , দিক পরিবর্তন হয়েছে অনেক বার ।মাঝে লিখিত হয়েছে১৫/১৬ বছরের ইতিহাস । আমি নিজেও পদোন্নতি পেয়ে এ এস পি হয়েছি । হাতেগুনা দু একজন বাদে তেমন কারুর সাথে আমার যোগাযোগ নেই ।
তখন আমার নারায়নগঞ্জ পোষ্টিং ।হঠাৎ একদিন মোবাইল ফোন বেজে উঠলো । আমি বললাম—হ্যালো—কে ?অপর প্রান্ত থেকে জবাব এল—-
“ আমি রোমী । দোস্ত তুমিতো আমার কোন খোঁজ খবরই রাখ না । সে দিন রহিমের কাছ থেকে তোমার ফোন নম্বর পেলাম । তা আছ কেমন ? “
আমি বলি আমার আবার ভাল মন্দ । চলে যচ্ছে কোন রকম । বেঁচে আছি এই আর কি । আমি মনে মনে ভাবি, ব্যপার কি রোমীতো বিনা কারনে ফোন করার লোক নয় । রোমী আবার জানতে চায় —
“ ভাবী কেমন আছে ? “আমি বলি –
আছে ভাল ।
“ছেলে মেয়ে কয়টি তোমার ? “
এক ছেলে, এক মেয়ে । রোমী আবার প্রশ্ন করে—
“ ছেলে মেয়ে কি করে ?” আমি বলি মেয়ে বড় । সে ইডেন মহিলা কলেজে বোটনী অনার্স থার্ড ইয়ারে এবং ছেলে
ছোট রাজউক কলেজে ক্লাশ এইটে পড়ে । তা তোমার খবর বল ।
“ খবর….। বড়ই ঝামেলার মধ্যে আছি দোস্ত । আমার দুই ছেলে এক মেয়ে । তুমি কিছু জান না ? যাক সে কথা । যে কারণে তোমাকে রিং করেছি । চিটাগাং রোডে কাঁচপুর ব্রীজের পরে আমার দুটি পেট্রোল পাম্প আছে । এতদিন ভালই ছিলাম । সম্প্রতি এলাকার কিছু চাঁদাবাজ খুব ঝামেলা করছে । তুমি তো র্যা বে আছ । তাই মাঝে মাঝে আমার পেট্রোল পাম্পে গেলে আমার একটু উপকার হয় । “
আমি বললাম—ঠিক আছে যাব । কোন অসুবিধা নেই । আগে তোমার কথা বলো । তোমার পরিবারের কথা বলো । তোমার পোষ্টিং কোথায় ? রোমী কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে, যেন একটা কিছু ভাবে । তার পর বলে—
“ দোস্ত চাকরী ছেড়ে দিয়েছি । “ বলেই চুপ হয়ে যায় । আমি বলি – হঠাৎ চাকরী ছেড়ে দিলে কেন ?
“ ব্যবসা বানিজ্যে জড়িয়ে পড়েছি ।কাজেই এখন আর চাকরীর ক্ষেত্রে সময় দিতে পারছিলাম না । “
তোমার চাকরী করা আর না করা তো সমান কথা । চাকরী করার চেয়ে না করাতেই আয় বেশী হবে । ছেলে মেয়ে কে কি অবসাথায় আছে ? আমি প্রশ্ন করি । রোমী বলে –
“ তুমি কি কিছুই জান না ?
আরে ভাই জানবো কি , তাইতো জানিনা । আস্তে আস্তে রোমীর কথার মধ্যে উচ্ছাস এক দম কমে যায় । সে বলে—
“ দোস্ত বললাম না ঝামেলায় আছি ।পেপারে দেখ নাই গুলশান থেকে প্রথম চার জন বড় লোকের বখাটে ছেলে এক অপকর্ম করে ধরা পরে , তার মধ্যে একটা আমার ছেলে । ছেলেরা একটু বেশী স্বাধীন হয়ে গেছে । ছোট টাকে তার মা গাড়ি কিনে দিয়েছে ।সারা দিন নানা রংয়ের মেয়ে নিয়ে ঘুরে বেড়ায় । “আমি বলি এ নিয়ে ভেব না । একটু বড় হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে । আমি নানা কথায় তাকে শান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করলাম । তাতে তার মনের কোন পরিবর্তন হলো বলে মনে হলো না । আমি তার মেয়ের খবর জানতে চাইলাম । রোমী বললো—
“ মেয়ে বিয়ে দিয়েছিলাম অনেক বড় ব্যবসায়ী ছেলে দেখে । কিন্তু মেয়ের সাথে ছেলে এবং তার পরিবারের লোক জনদের বনি বনা হচ্ছে না । কাজেই বিয়ে টিকছে না । রাখি দোস্ত । “বলেই রোমী লাইন কেটে দেয় । রোমী আমার সাথে কথা বললো ঠিকই , কিন্তু তার কথার মধ্যে আমি কোন আনন্দ বা খুশী খুঁজে পেলাম না । রোমীর পরিবারের বর্ণনা শুনে আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল । পরে আমি রহিমের কাছে ফোন করলাম । রোমীর সাথে কথা হয়েছে সেটাও বললাম । রোমী চাকরী ছেড়ে দিয়েছে বলতেই রহিম বললো—
“ আরে না , রোমী চাকরী ছেড়ে দেয়নি । সে চাকরী চ্যুত হয়েছে । আর তার মেয়ের বিয়ে ভেঙ্গে গেছে । গুলশানের এক বড়লোকের ছেলের সাথে তার মেয়ের বিয়ে হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ছেলে এবং তার পরিবারের লোকেরা মেয়েকে দেখতে পারতো না । ফলে মেয়ে বিয়ে ভেঙ্গে দিয়ে চলে আসতে চাইতো । কিন্তু রোমী তাতে রাজি ছিল না । উপায়ান্তর না পেয়ে একদিন মেয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে তার একমাত্র ছেলেকে ভবতের সাথে ঘুমের ঔষধ মিশিয়ে খাওয়ায় এবং নিজে খায় । র্দীঘ সময় ঘরের দরজা বন্ধ থাকায় বাড়ির লোকদের সরন্দহ হয় । তারা ঘরের দরজা ভেঙ্গে ঘরে প্রবেশ করে দেথখ উভয়ে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে আছে । তাদেরকে দ্রুত হাসপাতালে নিলে মেয়েটি বেঁচে যায় বটে, কিন্তু তার বাচ্চাটি মারা যায় । “ আমি বলি যাক ঝামেলা গেছে । রহিম বলে—
“ না ঝামেলা শেষ হয়নি, ঝামেলা আরও বেড়েছে । “ সে কি রকম ? আমি বলি —
রহিম বলে – “ রোমীতো আর সোজা পথের লোক নয় । সে মেয়ের স্বামীর পরিবারের লোকদের সায়েস্তা করার জন্য মেয়েকে দিয়ে এই র্মমে একটি মামলা দায়ের করিয়েছে যে মেয়ের স্বামীর পরিবারের লোকেরা তাকে ভাতের সাথে বিষ মিশিয়ে খাইয়ে মারতে চেয়েছে । “তার পর ?
“ তার পর আর কি । যা হবার তাই হয়েছে । তদ্তে প্রমানিত হয়েছে যে , তার মেয়ে নিজে ঘুমের ঔষধ খেয়েছে এবং তার সন্তানকে খাইয়েছে । এখন তার মেয়ের বিরুদ্ধে খুনের মামলার চার্জ এসেছেএবং সে মামলার ট্রায়াল চলছে । “ রোমীর খবর এখানেই শেষ নয় । তার সুখের শেষ খবর হলো – সে তার বিধবা জেইঠাস অর্থা তার স্ত্রীর বড় বোনকে ভবল বেসে গোপনে বিয়ে করেছে । ইসলাম ধর্ম মোতাবেক দুই বোন একত্রে বিয়ে করা যায় না । কাজেই আগের স্ত্রী আপনা আপনিই তালাক প্রাপ্তা হয়েছে ।
যে রোমী আজ থেকে ১৫ বছর আগে বলেছিল— এমন একদিন আসবে যখন তারা প্রতি বছর গাড়ির মডেল বদলাবে আর আমি স্ত্রী সন্তান ও লাগেজ নিয়ে বাসের অপেক্ষায় রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকবো । এই হলো সেই রোমীর বর্তমান অবস্থা । আমি জানি না রোমী সুখে আছে না দু:খে আছে । এখন আপনারাই বলুন—সুখ নামীয় বস্তুটি রোমীর নতুন মডেলের গাড়িতে না আমার হাতে ধরা অপেক্ষমান ব্যাগের ভিতর । জানি সুখের কোন সজ্ঞা নেই । সুখ মূল্যায়ন করার কোন মান দন্ডও নেই । আর সেই জন্যই আমি সুখের সন্ধানে সুদান যাচ্ছি না । যাচ্ছি টাকার জন্য । কারণ আমি আটকে পড়েছি সামাজিকতা নামীয় বেড়াজালে । সামাজিকতা রক্ষা করে মেয়ের বিয়ে শেষ করতে হলে এ টাকা আমার অতি দরকার । তা ছাড়া বাবা হিসেবে এটা আমার দ্বায়িত্বেও আমি মনে করি ।

মিশনে যাওয়ার প্রস্তুতি পুরোদমে চলছে । জাতি সংঘের এক প্রতিনিধি যিনি জর্দানের নাগরিক, অবসর প্রাপ্ত পুলিশ অফিসার , তিনি এসে যথারীতি পরীক্ষা নিয়ে আমাদের নির্বাচিত করলেন । দীর্ঘ দের মাস প্রশিক্ষণ গ্রহন করার পরও আমাদের কিছু লোক ফেল করলো । আমার ধারণা কিছু লোককে ফের করানো হলো । কারণ আমাদের মিশনে লোক লাগবে ১৪০ জন । প্রশিক্ষণ গ্রহন করেছে ১৪৮ জন ।সঙ্গত কারণেই ৮ জন বাদ দিতে হবে ।যথার্তই যারা অকৃতকার্য হয়েছেন তারা বাদ পড়লে বলার কিছুই ছিল না । কিন্তু আমাদের মিশনের ক্ষেত্রে সে রকম হয়নি বলে অনেকে মনে করেন । কারণ প্রশিক্ষণের শেষ সপ্তাহে স্বাস্থ্য পরীক্ষার রিপোর্ট এলে দেখা গেল ৪ জনের বিরুদ্ধে বিরুপ রিপোর্ট এসেছে । উক্ত ৪ জনের বিপরীতে পরবর্তীতে ৮ জন এসে যোগ দিল । শেষাবদী দেখা গেল উক্ত ৮জনের কেহই বাদ যায়নি । খোঁজ নিয়ে জানা গেল ঐ ৮ জনের সকলেই ছিল কোন না কোন উচ্চ পদস্ত কর্মকর্তার বডি গার্ড অথবা ড্রাইভার । কাজেই তাদেরকে তো আর বাদ দেওয়ার কায়দা নেই । আর সংখা ঠিক রাখতে হলেতো কারোর না কারোর গলা কাটতেই হবে ।কাজেই শেষ মূহূর্তে গলা কাটতে হয়েছে সেই নিরীহ ছাগ শিশুদের । যাদের অন্তরে প্রতিবাদের ভাষা আছে কিন্তু প্রকাশের ক্ষমতা নেই ।মুখ ট্যাপ দিয়ে আটকানো । বাদ পরা লোকদের দু:খ দেখেনিজের মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে গেল । কারণ ছোট বড় সবারই অবস্থা ভেদে সামাজিক মর্যাদা আছে । তারা মিশনে যাবে একথা আত্নীয় স্বজন , পাড়া প্রতিবেশী সকলেই জেনে গেছে । সেই ক্ষেত্রে তীরে এসে যদি তরী ডুবে যায় তবে তার অবস্থা এক মাত্র ভুক্তভোগীই উপলব্দি করতে পারবে , অন্য কেহ নয় ।
সকল প্রতি বন্ধকতা উৎড়িয়ে মিশনে যাওয়ার দিন অর্থাৎ ফ্লাইট ডেট ঘনিয়ে এল । জানতে পারলাম ১৪০ জন ফোর্সকে তিন ভাগে ভাগ করে পাঠানো হচ্ছে । প্রথম দলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সহসকল এ এস পি গন যাবেন, ২য় দলে ৬৫ জন লোক ও অন্যান্য মালামাল সহ আমি যাব । ৩য় দলে যাবেন সি ও সাহেব নিজে । আমি াবাক হলাম এই ভেবে যে, সকল অফিসারদের ১ম দলে পাঠানোর সিদ্ধান্ত সি, ও সাহেব কিভাবে নিলেন । ৬৫ জন সদস্যের একটি দল নিয়ে কোন দিকে রওয়ানা হওয়া , যার ৯৫/ভাগ লোকই জীবনের প্রথম বহির্গমন করবেন । ২৩ মে রাত ৮ টায় বাসা ছেড়ে বের হলাম । আমার স্ত্রী, ছেলে , মেয়েসকলের চোখেই পানি । মনটা ভারাক্রান্ত হলো বটে , কিন্তু বিচলিত হলো না । কারণ দুটো ছেলে মেয়ে নিয়ে বেঁচে থাকার মতো দক্ষতা আমার স্ত্রীর আছে । তবু সে জল ছল ছল চোখে যখন ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকলো সে দৃষ্টি যেন আমার হৃদয় বিদীর্ণ করে দিচ্ছিল । আমি আমার স্ত্রীকে কতটা ভাল বাসি তা জানি না । তবে সম্ভবত একটু বেশীই ভাল বাসি । সে কথা না হয় আর একদিন বলবো । আজ শুধু এটুকু বলতে পারি যে , ৬৫ জন লোককে সকল কার্যক্রম সম্পন্ন করে ঠিক ভাবে নিয়ে যাওয়ার দ্বায়িত্ব বোধ আমাকে স্ত্রী ও ছেলে মেয়ের কথা ভবাববার সময় দেয়নি । রাস্তায় জ্যাম থাকার কারনে নির্ধারিত সময়ের কিছু পরে বিমান বন্দর এসে পৌঁছলাম । বিমান বন্দরে যেহেতু সকল কার্যক্রম আমাকেই সম্পন্ন করতে হবে , সে কারনেই একবার টার্মিনালের ভিতরে প্রবেশ করলে আর বের হওয়ার সময় পাবো না ভেবে আমার স্ত্রীকে বিমান বন্দর নিয়ে আসিনি । বাস্তবে হলোও তাই । আমি দেরীতে পৌঁছানোর কারনে সকল কাজ তাড়াহুড়া করে করতে হলো । ফলে পূনরায় বাইরে এসে অপেক্ষমান ছেলের মুখ দেখে যেতে পারলাম না । রাত ১২.৩০ মিনিটে অথা ২৪ সম রাত.৩০ ঘটিকার সময় জর্দান এয়ার লাইন্সের একটি জেড বিমানে আমাদের নিয়ে বাংলার মাটি ত্যাগ করলো । আকাশে উড়ে চললাম আমরা । রাতের অন্ধকারে ঢাকা শহরের বাতি ছাড়া অন্য কিছু দেখতে পেলাম না । শুধু বারবার মনে পরতে লাগলো আমার স্ত্রী ও মেয়ের জল ভরা ড্যাব ড্যাব করে তাকানো চোখ এবং বিমানবন্দর টারমিনালে রেখে আসা আমার ছেলের পিতৃ বিচ্ছেদে আক্রান্ত মুখ ।
মেঘের উপর ভর করে আমরা ভেসে ভেসে যাচ্ছি । চার দিক নিঝুম অন্ধকার ।অভ্যন্তরীণ বিমানে ইতো পূর্বেও উঠেছি, কিন্তু আজকের মতো এতো বড় বিমানে এত দীর্ঘ ভ্রমন ইতো পূর্বে আর করিনি । আসলে কেউ যদি মনে মনে এ ই ভাবনা না রাখে যে , সে বিমানে পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে হাজার হাজার ফুট উচু দিয়ে উড়ে যাচ্ছে, তবে সে বুঝতেই পারবে না যে, সে উড়ে যাচ্ছে । বিমানে উড়ে যাচ্ছি একথা জানা না থাকলে বাংলাদেশের নাইট কোচ মনে করলেও কোন অসুবিধা নেই । হাওয়ায় ভেসে যাচ্ছে বলে ভাববার কোন কারণ নেই যে, বিমানে কোন ঝাকুনি লাগেনা , বাসের মতই যথেষ্ট ঝাকুনি লাগে । বসার সীট গুলো পিছনের দিকে এলিয়ে দিয়ে শুয়ে থাকা যায় । অনেকেই সে সুযোগ গ্রহন করে ঘুমিয়েও পড়লো । কিন্তু আমার ঘুম এলো না । চোখ বন্ধ করলেই স্ক্রীনে ভেসে উঠতে লাগলো ছেলে মেয়ে ও স্ত্রীর মলিন মুখ । মন আমাকে ছেড়ে যেতে লাগলো দূর অতীতে, যেখানে হাড়িয়ে গেছে আমার শৈশব কৈশোর ও যৌবন কাল । বার বার মনে হতে লাগলো আমি কেন যাচ্ছি সুদানে ? সুখের জন্য না টাকার জন্য ? সুখ আপেক্ষিক বিষয় টাকা থাকলেই সুখ থাকবে একথা জোর দিয়ে বলা যায় না । আমার টাকা নেই , ছিলওনা কোন দিন । কিন্তু সুখের অভাব কোন দিন হয়েছে বলে অনুভব করিনি । বরং যত লোকের সাথে আমাদের পরিচয় হয়েছে , তারা সকলেই কোন না কোন ভাবে প্রকাশ করেছে যে, আমরা খুবই সুখী পরিবার ।টাকা হলেই সুখ আসে কিনা তা ভেবে দেখার বিষয় । আমার চাকরীর শুরুতে যারা আমার কোর্স মেট ছিল, তারা বর্তমানে সকলেই কোটি পতি এবং তারা সকলেই জানে আমার কোন টাকা পয়সা নেই ।এজন্য আমি পারত পক্ষে সকলকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি । তথাপি কেহ কেহ অর্থের দাপটে নিজেকে সুখী বলে মনে করে ।
আমার এক বন্ধু , সে চাকরীর ক্ষেত্রে আমার কোর্সমেট । তার কথাই ধরা যাক –সে কোটি কোটি টাকার মালিক । পরিবারের সকলেরই একটি করে ব্যক্তিগত গাড়ি আছে বলে শুনেছি ।ঢাকার আশে পাশে তার দুটি পেট্রোল পাম্প আছে । জীবনের শুরুতেই তারা তাদের জীবন নিজস্ব লাইনে চালিয়ে দিয়েছে । তারা তাদের লাইনে সফলতাও পেয়েছে । তখন ১৯৯৪ সাল । আমি পটুয়া খালী সদর থানার ও, সি । নিরিবিলি সরকারী কাজ করে যাচ্ছি । ইতোমধ্যে আমার উল্লেখিত কোর্সমেট রোমী( ছদ্ম নাম )কোন কারণে চেইন আউট হয়ে ঢাকা মহানগর এবং তার পার্শবর্তী থানা গুলো থেকে ছিটকে লাইন চ্যুত হয়ে পড়েছে । শেষ রক্ষা করতে না পারায় তখন তার সি আই ডি তে পোষ্টিং । তার নৌকার পাল তখন এতই ছেড়া যে, তাতে মোটেই বাতাস আটকাচ্ছিল না । ফলে তখন তার সি, আই, ডি থেকেও বরিশাল জোনের পটুয়াখালী জেলায় পোষ্টিং ।অর্থা তখন সে ঢাকা মহানগরের কোন ইউনিটেই নিজের নৌকার নোঙ্গর করতে পারেনি । ফলে তার পটুয়াখালী জেলায় যোগদান করতে হয়েছে । সেই সুবাদে রোমী মাঝে মাঝে পটুয়াখালী এলে আমার বাসায় আসতো । আমার সংসারের অভাব অনটনের কথা সে ইতো পূর্বেই শুনে থাকবে । ফলে সঙ্গত কারণেই আমি একটু ভাল ভাবে চলি সেটাই সে চেয়ে থাকবে । এজন্য সে আমাকে নানা ভাবে অনুপ্রাণিত করতে থাকে যাতে আমার সংসারে একটু সচ্ছলতা আসে । অবশ্য বন্ধু হিসেবে তার পক্ষে এটা করাই সাভাবিক । ও, সি, হিসেবে কিভাবে টাকা উপার্জন করা তার নানা কায়দা কৌশল সে আমাকে শিখাতে চেষ্টা করতো । বুঝতেই তো পারছেন, ও, সি হিসেবে টাকা উপার্জন করা মানেই অবৈধ পন্থায় টাকা উপার্জন করা । আর যে থানার আওতায় কোন শিল্প কারখানা বা ব্যবসা বানিজ্য নেই সেখানে অবৈধ টাকা উপার্জন মানেই থানার সাধারন নাগরিকদের বিভিন্ন মিথ্যা মামলায় ফেলে নির্যাতন করে টাকা আদায় করা । কাজেই আমাকে এই বিষয়ে অনুপ্রাণিত করার এক পর্যায়ে এ কথা গুলো াামি তাকে বললাম । প্রতি উত্তরে সে আমাকে বরলো—
“ শোন থানা এলাকায় কোন মানুষ থাকুক আর নাই থাকুক , শুধু যদি মাটিও থাকে তা হলেও আমাকে টাকা দিতে হবে । তুমি শুধু আমাকে চেয়ারটা ছেড়ে দাওএবং আমার পাশে বসে বসে দেখ টাকা কিভাবে আসে ।“
কিন্তু আমি তার প্রস্তাবে রাজি হতে পারিনি এবং তার কাছ থেকে এ প্রশিক্ষণও গ্রহন করতে পারিনি । রোমী বন্ধু হিসেবে তার দ্বায়িত্ব পালন করেছে । প্রাণ পণ চেষ্টা করেছে আমাকে তাদের লাইনে নিয়ে তার বন্ধুর ইপকার করতে । কিন্তু আমি দুর্ভাগা , তাই তার এ চেষ্টার কোন মূল্র্য দিতে পারিনি । তাই বলে এত সহজে সে হাল ছেড়েও দেয়নি ।দীর্ঘ দিন অর্থাৎ সে যতদিন পটুয়াখালী ছিল, ততদিন চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছে । আমার কাছ থেকে কোন সাড়া না পেয়ে শেষে আমার স্ত্রীকে বুঝানোর চেষ্টা করে । সে আমার স্ত্রীকে বলে—
“ আচ্ছা ভাবী ওকেতো মানুষ করতে পারলাম না । আপনি কেমন মানুষ বলুনতো ? আপনার ভবিষ্যতের জন্য কোন চিন্তা হয় না । আপনি ওকে তাগিদ দিতে পারেন না ? আমার স্ত্রী তো সব সময় বলে ‘মোর এ্যান্ড মোর ‘আমি যত টাকা দেই তার পরও টাকা চাইতে থাকে ।আপনি চাপ না দিলে তো ও উপার্জনের দিকে মনই দিবে না । “ আমার স্ত্রী শুনে আর হাসে । রোমী বলে—
“আপনি হাসছেন ?” আমার স্ত্রী বলে —
‍‌”হাসার কথা বললে হাসবো না ?” রোমী বলে—-
“ভবিষ্যতের জন্য ভাবনা হয়না আপনার ? এমন একদিন আসবে যখন দেখবেন আমরা বছর বছর গাড়ির মডেল বদলাব আর আপনারা ছেলে মেয়ে ও লাগেজ নিয়ে রাস্তার পাশে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন ।“
আমার স্ত্রী নির্বিকার বদনে বলে—“ কি আর করা যাবে ভাই । যার যেমন স্বভাব । যে অস্র ঢালাই লোহা দিয়ে তৈরী, তাকে যদি নিজের ইচ্ছে মতো ব্যবহারের জন্য আঁকা বাঁকা করতে চান – তাহলে বাঁকা তো হবেই না বরং ভেঙ্গে অকেজু হয়ে যাবে । তার চেয়ে ভাল যে যেমন আছে তাকে তেমনি থাকতে দেওয়া ।“ রোমী বলে—
“ আপনার সুখে থাকতে ইচ্ছে করে না ?” আমার স্ত্রী বলে—-
“সুখ ? সুখের তো কোন সজ্ঞা নেই ভাই । কেউ না খেয়ে থেকে সুখে থাকে, আবার কেহ টাকার বিছানায় শুয়েও সুখের সন্ধান পায় না । তাই বলি কি আমার সুখ নিয়েই আমাকে থাকতে দিন না । আর শেষ জীবনের কথা বলছেন ? জীবনের ভ্রমন যখন শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছবে , তখনই তো জীবনের হিসেব । সুখের হিসেব না হয় ঐ সময়ই মিলিয়ে নিব । “
ইতোমধ্যে অনেক সময় কালের গর্ভে বিলিন হয়ে গেছে । গঙ্গা, যমুনা , মেঘনার মতো প্রমত্ত নদীতেও মাঝে মাঝে চর পরেছে , দিক পরিবর্তন হয়েছে অনেক বার ।মাঝে লিখিত হয়েছে১৫/১৬ বছরের ইতিহাস । আমি নিজেও পদোন্নতি পেয়ে এ এস পি হয়েছি । হাতেগুনা দু একজন বাদে তেমন কারুর সাথে আমার যোগাযোগ নেই ।
তখন আমার নারায়নগঞ্জ পোষ্টিং ।হঠাৎ একদিন মোবাইল ফোন বেজে উঠলো । আমি বললাম—হ্যালো—কে ?অপর প্রান্ত থেকে জবাব এল—-
“ আমি রোমী । দোস্ত তুমিতো আমার কোন খোঁজ খবরই রাখ না । সে দিন রহিমের কাছ থেকে তোমার ফোন নম্বর পেলাম । তা আছ কেমন ? “
আমি বলি আমার আবার ভাল মন্দ । চলে যচ্ছে কোন রকম । বেঁচে আছি এই আর কি । আমি মনে মনে ভাবি, ব্যপার কি রোমীতো বিনা কারনে ফোন করার লোক নয় । রোমী আবার জানতে চায় —
“ ভাবী কেমন আছে ? “আমি বলি –
আছে ভাল ।
“ছেলে মেয়ে কয়টি তোমার ? “
এক ছেলে, এক মেয়ে । রোমী আবার প্রশ্ন করে—
“ ছেলে মেয়ে কি করে ?” আমি বলি মেয়ে বড় । সে ইডেন মহিলা কলেজে বোটনী অনার্স থার্ড ইয়ারে এবং ছেলে
ছোট রাজউক কলেজে ক্লাশ এইটে পড়ে । তা তোমার খবর বল ।
“ খবর….। বড়ই ঝামেলার মধ্যে আছি দোস্ত । আমার দুই ছেলে এক মেয়ে । তুমি কিছু জান না ? যাক সে কথা । যে কারণে তোমাকে রিং করেছি । চিটাগাং রোডে কাঁচপুর ব্রীজের পরে আমার দুটি পেট্রোল পাম্প আছে । এতদিন ভালই ছিলাম । সম্প্রতি এলাকার কিছু চাঁদাবাজ খুব ঝামেলা করছে । তুমি তো র্যা বে আছ । তাই মাঝে মাঝে আমার পেট্রোল পাম্পে গেলে আমার একটু উপকার হয় । “
আমি বললাম—ঠিক আছে যাব । কোন অসুবিধা নেই । আগে তোমার কথা বলো । তোমার পরিবারের কথা বলো । তোমার পোষ্টিং কোথায় ? রোমী কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে, যেন একটা কিছু ভাবে । তার পর বলে—
“ দোস্ত চাকরী ছেড়ে দিয়েছি । “ বলেই চুপ হয়ে যায় । আমি বলি – হঠাৎ চাকরী ছেড়ে দিলে কেন ?
“ ব্যবসা বানিজ্যে জড়িয়ে পড়েছি ।কাজেই এখন আর চাকরীর ক্ষেত্রে সময় দিতে পারছিলাম না । “
তোমার চাকরী করা আর না করা তো সমান কথা । চাকরী করার চেয়ে না করাতেই আয় বেশী হবে । ছেলে মেয়ে কে কি অবসাথায় আছে ? আমি প্রশ্ন করি । রোমী বলে –
“ তুমি কি কিছুই জান না ?
আরে ভাই জানবো কি , তাইতো জানিনা । আস্তে আস্তে রোমীর কথার মধ্যে উচ্ছাস এক দম কমে যায় । সে বলে—
“ দোস্ত বললাম না ঝামেলায় আছি ।পেপারে দেখ নাই গুলশান থেকে প্রথম চার জন বড় লোকের বখাটে ছেলে এক অপকর্ম করে ধরা পরে , তার মধ্যে একটা আমার ছেলে । ছেলেরা একটু বেশী স্বাধীন হয়ে গেছে । ছোট টাকে তার মা গাড়ি কিনে দিয়েছে ।সারা দিন নানা রংয়ের মেয়ে নিয়ে ঘুরে বেড়ায় । “আমি বলি এ নিয়ে ভেব না । একটু বড় হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে । আমি নানা কথায় তাকে শান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করলাম । তাতে তার মনের কোন পরিবর্তন হলো বলে মনে হলো না । আমি তার মেয়ের খবর জানতে চাইলাম । রোমী বললো—
“ মেয়ে বিয়ে দিয়েছিলাম অনেক বড় ব্যবসায়ী ছেলে দেখে । কিন্তু মেয়ের সাথে ছেলে এবং তার পরিবারের লোক জনদের বনি বনা হচ্ছে না । কাজেই বিয়ে টিকছে না । রাখি দোস্ত । “বলেই রোমী লাইন কেটে দেয় । রোমী আমার সাথে কথা বললো ঠিকই , কিন্তু তার কথার মধ্যে আমি কোন আনন্দ বা খুশী খুঁজে পেলাম না । রোমীর পরিবারের বর্ণনা শুনে আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল । পরে আমি রহিমের কাছে ফোন করলাম । রোমীর সাথে কথা হয়েছে সেটাও বললাম । রোমী চাকরী ছেড়ে দিয়েছে বলতেই রহিম বললো—
“ আরে না , রোমী চাকরী ছেড়ে দেয়নি । সে চাকরী চ্যুত হয়েছে । আর তার মেয়ের বিয়ে ভেঙ্গে গেছে । গুলশানের এক বড়লোকের ছেলের সাথে তার মেয়ের বিয়ে হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ছেলে এবং তার পরিবারের লোকেরা মেয়েকে দেখতে পারতো না । ফলে মেয়ে বিয়ে ভেঙ্গে দিয়ে চলে আসতে চাইতো । কিন্তু রোমী তাতে রাজি ছিল না । উপায়ান্তর না পেয়ে একদিন মেয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে তার একমাত্র ছেলেকে ভবতের সাথে ঘুমের ঔষধ মিশিয়ে খাওয়ায় এবং নিজে খায় । র্দীঘ সময় ঘরের দরজা বন্ধ থাকায় বাড়ির লোকদের সরন্দহ হয় । তারা ঘরের দরজা ভেঙ্গে ঘরে প্রবেশ করে দেথখ উভয়ে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে আছে । তাদেরকে দ্রুত হাসপাতালে নিলে মেয়েটি বেঁচে যায় বটে, কিন্তু তার বাচ্চাটি মারা যায় । “ আমি বলি যাক ঝামেলা গেছে । রহিম বলে—
“ না ঝামেলা শেষ হয়নি, ঝামেলা আরও বেড়েছে । “ সে কি রকম ? আমি বলি —
রহিম বলে – “ রোমীতো আর সোজা পথের লোক নয় । সে মেয়ের স্বামীর পরিবারের লোকদের সায়েস্তা করার জন্য মেয়েকে দিয়ে এই র্মমে একটি মামলা দায়ের করিয়েছে যে মেয়ের স্বামীর পরিবারের লোকেরা তাকে ভাতের সাথে বিষ মিশিয়ে খাইয়ে মারতে চেয়েছে । “তার পর ?
“ তার পর আর কি । যা হবার তাই হয়েছে । তদ্তে প্রমানিত হয়েছে যে , তার মেয়ে নিজে ঘুমের ঔষধ খেয়েছে এবং তার সন্তানকে খাইয়েছে । এখন তার মেয়ের বিরুদ্ধে খুনের মামলার চার্জ এসেছেএবং সে মামলার ট্রায়াল চলছে । “ রোমীর খবর এখানেই শেষ নয় । তার সুখের শেষ খবর হলো – সে তার বিধবা জেইঠাস অর্থা তার স্ত্রীর বড় বোনকে ভবল বেসে গোপনে বিয়ে করেছে । ইসলাম ধর্ম মোতাবেক দুই বোন একত্রে বিয়ে করা যায় না । কাজেই আগের স্ত্রী আপনা আপনিই তালাক প্রাপ্তা হয়েছে ।
যে রোমী আজ থেকে ১৫ বছর আগে বলেছিল— এমন একদিন আসবে যখন তারা প্রতি বছর গাড়ির মডেল বদলাবে আর আমি স্ত্রী সন্তান ও লাগেজ নিয়ে বাসের অপেক্ষায় রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকবো । এই হলো সেই রোমীর বর্তমান অবস্থা । আমি জানি না রোমী সুখে আছে না দু:খে আছে । এখন আপনারাই বলুন—সুখ নামীয় বস্তুটি রোমীর নতুন মডেলের গাড়িতে না আমার হাতে ধরা অপেক্ষমান ব্যাগের ভিতর । জানি সুখের কোন সজ্ঞা নেই । সুখ মূল্যায়ন করার কোন মান দন্ডও নেই । আর সেই জন্যই আমি সুখের সন্ধানে সুদান যাচ্ছি না । যাচ্ছি টাকার জন্য । কারণ আমি আটকে পড়েছি সামাজিকতা নামীয় বেড়াজালে । সামাজিকতা রক্ষা করে মেয়ের বিয়ে শেষ করতে হলে এ টাকা আমার অতি দরকার । তা ছাড়া বাবা হিসেবে এটা আমার দ্বায়িত্বেও আমি মনে করি ।

৪৫৩ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
সর্বমোট পোস্ট: ৩৩১ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ২৪৮৪ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৯-০৮ ১৩:৩৯:৪৭ মিনিটে
banner

৬ টি মন্তব্য

  1. জসীম উদ্দীন মুহম্মদ মন্তব্যে বলেছেন:

    পড়লাম ভাই —- অনেক বড় পোস্ট !!

  2. এই মেঘ এই রোদ্দুর মন্তব্যে বলেছেন:

    জীবন এমনই। সুন্দর লেখা

  3. আরজু মূন মন্তব্যে বলেছেন:

    স্মৃতিচারণ ভালো লাগলো রহমান ভাই। চমত্কার লেখাটির জন্য ধন্যবাদ। শুভেচ্ছা থাকল। ভালো থাকবেন।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top