Today 14 May 2021
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

অপ্রকাশিত ভালবাসা

লিখেছেন: আজিম | তারিখ: ০৮/০১/২০১৪

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 896বার পড়া হয়েছে।

তীরবেগে ছুটে চলেছে ট্রেন, বরেন্দ্র এক্সপ্রেস । এই ট্রেনেই ছুটে চলেছে পিলুর চিন্তার গতি । পাত্রী দেখতে চলেছে ও রাজশাহীতে । কিন্তু তার চিন্তায় রয়েছে অন্য আরেকজন, জেসমিন । জেসমিন ওর বন্ধু হীরার ছোট বোন ।

ইঞ্জিনিয়ার পিলু কিছুদিন আগে চাকুরী পেয়েছে, পোষ্টিং দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলায় । থাকে অন্যান্য অফিসারদের সাথে উপজেলার একটি বাসায় । তাদেরই একজন অফিসারের শ্যালিকাকে, কিছুটা উত্তেজনার বশে এবং কিছুটা অন্যান্য অফিসারদের একরকম চাপে পড়েই তার এই পাত্রী দেখার উদ্যোগ ।

ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে হীরা ছিল পিলুর অত্যন্ত ভাল একজন বন্ধু এবং এক বছর ওরা রুমমেটও ছিল । ওদের আর্থিক অবস্থা মোটেও ভাল ছিলনা । বাবা ছোটখাট চাকরী করতেন এবং ওদেরকে আকূল সাগরে ভাসিয়ে একসময় মৃত্যুবরন করেন । হীরার সতের আর জেসমিনের বয়স তখন মাত্র দশ । স্কুলশিক্ষিকা ওদের বড় বোনের সহায়তায় খুব কষ্টে চলত তাদের ।

পাত্রী দেখতে যাওয়ার মাসকয় মাত্র আগে পিলু প্রথম দেখে জেসমিনকে হীরার ঢাকার বাসায় । ততদিনে হীরারও চাকরী হয়ে যায় বিদ্যুত বিভাগে । তখনও জেসমিনকে ছোটবোনের মতই দেখত পিলু । পাশেই নিজের ছোটবোন আরজুর বাসায় নিয়ে যায় ওকে, পরিচয় করিয়ে দেয় । এরপর আসে হীরার বিয়ের দিন । হীরা ঢাকা থেকে বিয়ে করতে রাজশাহী যায় । কেন জানি পিলু যায়নি সে-বিয়েতে, পুরোদিন থেকে যায় হীরাদের ঢাকার বাসায় । জেসমিনের একটি ফটো দেখে স্বপ্নের অন্যরকম একটা জাল বোনার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায় তার মনে, সেই-ই শুরু । মনে হতে শুরু করে এটা ভালোবাসা ছাড়া আর কিছু নয় । আগেও জেসমিনের অকাল পিতৃবিয়োগের কারনে অসম্ভব একটা সহানুভূতি পিলুর মধ্যে কাজ করত, তবে আর যা-ই হোক, সেটা ভালোবাসা ছিলনা । কিন্তু কেন জানি ঐদিন ফটোটা দেখার পর থেকেই জেসমিনের উপর তার প্রচন্ড একটা ভালবাসা জন্ম নিতে শুরু করে ।

চিরিরবন্দর ফিরে গিয়ে পিলু প্রায়ই মনে করত, নাইটকোচে ঢাকা গিয়ে সকালে লালমাটিয়া কলেজের গেইটে দাঁড়িয়ে থাকবে আর জেসমিন কলেজে এলে তাকে বলবে, চল তোমার ভাইয়ের পরিবর্তে আজ তোমার সাথে ঘুরি । তারপর একটা বেবীট্যাক্সীতে করে ঘুরবে ওরা পুরো ঢাকা শহরে, জেসমিনের মাথা থাকবে ওর কাঁধে ।

বরেন্দ্র ট্রেনে যেতে যেতে পিলুর মনে হচ্ছিল, জেসমিনকে তার পেতেই হবে, কোনমতেই ছাড়া যাবেনা । কেন জানি ওর মনে হচ্ছিল, নিজে ও উদ্যোগী না হওয়ার কারনে দুজনের যদি অন্য দু’জন সঙ্গী হয়ে যায়, তবে জেসমিন তাকে দোষারোপই করবে । যেন তাকে বলবে, কেন আমাকে নাওনি ? জেসমিনের মনে তার জন্য বিরাট একটা জায়গা রয়েছে বলে কেন জানি তার মনে হত । মনে হত, ওরা এক না হলে দু’জনকেই ওদের পস্তাতে হবে, কোনভাবেই যা থেকে উত্তোরনের আর কোন পথ থাকবেনা ।

কিছুদিন পরে পিলুর কুমিল্লায় একটা ট্রেনিং-এ অংশগ্রহনের প্রোগ্রাম হয় । পিলু সিদ্ধান্ত নেয়, ট্রেনিং-এর পর ছোটবোনের বাসায় জেসমিনকে ডাকিয়ে এনে ওর সামনেই জেসমিনের হাত ধরে বলবে, উপরে আল্লাহ এবং নীচে আমার এই বোনকে স্বাক্ষী রেখে আমি তোমাকে বিয়ে করলাম । কিন্তু এসব কল্পনাতেই রয়ে যায়, কিছুই হয়না । আসলে, কল্পনাই ভর করত তখন পিলুর মধ্যে বেশী করে ।

বাবা-মার চাপে পিলু আরেকটি পাত্রী দেখতে বাধ্য হয় ঐ রাজশাহীতেই । পিলুর ঘনিষ্ট দুই বন্ধু একদিন হাজির চিরিরবন্দরে, অতি প্রত্যুষে । ঐদিনই সকাল এগারোটায় ট্রেনে চেপে আবার রওয়ানা হয় পিলু রাজশাহীর উদ্দেশ্যে । অফিসার এক বন্ধুকে বলে যায়, এবার জেসমিনকে না নিয়ে আর ফিরছিনা । লোকাল ট্রেন, রাজশাহী পৌছে পরদিন সকালে । পথে দুই বন্ধুকে জেসমিনের বিষয়ে বিস্তারিত বয়ান করে পিলু । রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের সামনে বাড়ী পাত্রীর । দেখা হয় পাত্রীর বাবার সাথে । মায়ের মন রক্ষার্থেই শুধুমাত্র তার এই আয়োজন ।

আর দেরী করেনা পিলু । প্রথমে দুই বন্ধু এবং পরে রাজশাহী মেডিক্যালে ইন্টার্নীরত আরেক ছোটবোনকে বলে তার স্থির সিদ্ধান্তের কথা ।

দুইদিন পর মা, ছোটভাই , বোন এবং তিনজন ঘনিষ্ট বন্ধুবিহারে পিলু শুভপরিনয়ের উদ্দেশ্যে ঢাকা গমন করে । পথে সিরাজগঞ্জে জেসমিনের মা-কে জানানো হয়, তাঁর সন্মতি গ্রহন করা হয় এবং মা সন্মতিসহ তাঁর বড়মেয়েকে সাথে দেন শুভকাজ সম্পাদনের জন্য ।

আজ পিলু ও জেসমিনের বাসররাত । পিলুর একান্ত ইচ্ছা, আজ সে জেসমিনকে বুকে নিয়েই পার করবে রাতটা । পিতৃহীন এবং সুন্দর মেয়েটাকে এভাবেই আগলে রাখবে ও সারাজীবন । নিজের এসমস্ত অনুভূতিসমূহের কথা বলার পর তার অনুভূতি জানতে চাইলে প্রথমে ডুকরে কেঁদে ওঠে জেসমিন । পরম মমতায় চোখ মুছিয়ে দেয় পিলু, ভিজে যায় নিজেরও চোখ ।

একসময় জেসমিন বলে, আপনাকে আমি দেখার পর থেকেই মনে মনে চাইতাম, কিন্তু আপনি ইঞ্জিনিয়ার, আপনাকে পাওয়ার অধিকার আমার মত গরীব মেয়ের না থাকার কথা মনে করেই সেপথে যাইনি আমি ।

দেখ, আমরাও কিন্তু তোমাদের থেকে খুব একটা বড়লোক নই, পার্থক্য আমার বাবা আছে । ওসব বাদ দিয়ে বলো, আমাকে তুমি চাইতে কি-না ।

আরজুর কাছে জানতে পারি, আপনারা আসছেন মানে আপনি বিয়ে করতে ঢাকা আসছেন । তখন থেকে আমি চোখের পানি ধরে রাখতে পারছিলামনা । মনে করছিলাম, আমার সব শেষ হয়ে গেল । উঠতে, বসতে সবসময় কেমন যেন একটা চাপ অনূভব করতাম, আর বেশী বেগ আসলে বাথরুমে যেয়ে কেঁদে কিছুটা হাল্কা হয়ে আসতাম ।

পাত্রীটা কে শুনতে চাওনি ?

না, চাইনি । কারন আমি ধরেই নিয়েছিলাম যে আমি নই । আপনি কল্পনার এতো শাখা-প্রশাখা যে ছড়িয়ে বসে আছেন, তাতো আমি কল্পনাও করিনি । আপনার এসব কল্পনার কথাগুলো আমাকে বললে কি হত ? এখনতো আমার মনে হচ্ছে, বিয়ের আগে পছন্দের মানুষের সাথে চলাফেরা, ঘোরাফেরা ইত্যাদিসহ সুখের যে আমেজগুলো, সেগুলো থেকে আমি বঞ্চিত-ই হলাম ।

আমিও কি বঞ্চিত হইনি জেসমিন ?

কেন তবে আমরা সেগুলো থেকে বঞ্চিত হলাম পিলু ভাই? আগের অভ্যাসবশতঃ এই সম্বোধনটাই করে ফেললো জেসমিন ।

যদি তুমি না করে দিতে ? যদি বলতে, আপনি আমার বড় ভাইয়ের বন্ধু, কিভাবে আপনি আমার সম্পর্কে এসব ভাবতে পারেন ? আপনাকেতো আমি ভাই ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারিইনা । তখনতো আমার স্বপ্ন ভেঙ্গেচুরে একেবারে শেষ হয়ে যেত । আসলে তোমাকে আমি হারাতে চাইনি কোনভাবে । আর তাইতো তোমাকে আমি হঠাৎ করেই স্থায়ীভাবে পাওয়া, মানে হঠাৎই বিয়ে করতে চেয়েছি, যাতে করে আমাকে ফিরিয়ে দেয়ার সুযোগ তোমরা না পাও ।

কেন আপনার এতো চাওয়া আমাকে, আমার খুব কি কিছু আছে ? সুন্দরীতো আমি মোটেই নই, আর তাছাড়া ইন্টারমিডিয়েটের গন্ডীইতো  পার হইনি আমি এখনো । আমাদের বাসায় আপনি আসতেন, কই কখনো তো মনেই হয়নি আমার উপর আপনার কোন টান আছে এবং এমনকি আপনি আমার দিকে তাকাতেনওনা ।

দেখ জেসমিন, সুন্দরী তুমি নও এটা মোটেও ঠিক নয়, বরং যেকোন পাত্রের কাছেই তুমি অত্যন্ত আকর্ষনীয় পাত্রী হিসেবেই বিবেচিত হবে, আমি নিশ্চিত । তুমি সুন্দর এবং তোমার একটা আকর্ষনও আছে । তবে সেটাই তোমাকে পাওয়ার আমার একমাত্র আকাঙ্ক্ষা নয় । অতি অল্প বয়সে তোমার বাবা মারা গেছেন, যখন তোমার একরকম পুতুল খেলার বয়স । এটা আমি গভীরভাবে ভাবতাম এবং আমার মনে হোত যে, আমার মত করে ভালবাসতে, যত্ন করতে তোমাকে আর কেউ পারবেনা । তোমার উপর আকৃষ্ট হওয়ার এটাও কিন্তু আমার বিরাট কারন, যাতে পিতৃহীন তোমার যত্ন-আত্মির কোন অভাব না হয় সারাজীবন । যেন আমার মনে হোত, তোমাকে দেখভাল করার অধিকার শুধুই আমার, আর কারো নয় ।

নিশব্দ উদ্বেলিত একটা কান্নার আভা শুরু হয়ে তা আরো উথাল-পাতাল হয়ে উঠলো, যখন পিলু আরো জোরে আঁকড়ে ধরল ওকে । জেসমিনও পরম নির্ভরতায় সেভাবেই পড়ে রইলো কতক্ষন, জানেনা ওরা ।

পবিত্র ফজরের আজানের সুমধুর আহ্বান ভেসে আসতে শুরু করেছে ততক্ষনে ।

৯৬৫ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
সর্বমোট পোস্ট: ২৯ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ২৩৭ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-১১-১৭ ০৭:২৪:৪৩ মিনিটে
banner

৭ টি মন্তব্য

  1. আমির হোসেন মন্তব্যে বলেছেন:

    ভাল লাগল আপনার গল্পটি। অনেক অনেক ভাল লাগল।

  2. এস এম আব্দুর রহমান মন্তব্যে বলেছেন:

    খুব ভাল লাগল গল্পটি । শুভ কামনা । ভাল থাকুন ।

  3. জিয়াউল হক মন্তব্যে বলেছেন:

    সুন্দর গল্প আজিম ভাই। চালিয়ে যান।

  4. আরজু মন্তব্যে বলেছেন:

    পবিত্র ফজরের আজানের সুমধুর আহ্বান ভেসে আসতে শুরু করেছে ততক্ষনে ।
    সুন্দর গল্প আজিম ভাই।

    পিলু জীবনের নায়িকা জেসমীন হওয়াতে প্রীত হলাম।জেসমীন আমার সবচেয়ে প্রিয় ছোটবোন আমার তিন নাম্বার বোনের নাম।আপনার ছোটবোনের নাম আরজু হওয়াতে আমি অনেক খুশী।আপনাকে তাহলে এখন থেকে বড় ভাইয়ের মর্যাদা দিয়ে ফেললাম।পিলুর ট্রেনিং কুমিল্লা আমার অরিজিন ষ্টেট কুমিল্লা মানি আমি কুমিল্লার মেয়ে।

    ধন্যবাদ আজিম ভাই সুন্দর গল্প।অনেক ভাল লাগল।শুভকামনা।ভাল থাকুন সবসময়।

  5. এই মেঘ এই রোদ্দুর মন্তব্যে বলেছেন:

    অনেক ভাল লাগল গল্পটি

  6. তাপসকিরণ রায় মন্তব্যে বলেছেন:

    কোথাও শিথিল একটা ভাব থাকলেও ভাল লেগেছে গল্পটি।

  7. আজিম মন্তব্যে বলেছেন:

    আপনাদের সবাইকে গল্পটি ভাল লেগেছে বলে আমি আপনাদের নিকট কৃতজ্ঞ ।
    আমার চলন্তিকায় যোগদানের পর থেকেই আমার ছোটবোনের নামের সাথে মিলে যাওয়ায় আমি আরজু আপা, আপনাকে আপন ছোটবোনের মতই মনে করে আসছি সর্বদা ।
    শ্রদ্ধেয় তাপসকিরন রায় দাদা, শিথিল ভাবগুলি কোথায় আছে, অনূগ্রহপুর্বক বললে আমি শুধরে যেতে পারতাম এবং কৃতজ্ঞও থাকতাম আপনার প্রতি ।
    সবাইকে ধন্যবাদ ।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top