Today 01 Dec 2022
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

আলো আঁধারির খেলা

লিখেছেন: মুহাম্মদ দিদারুল আলম | তারিখ: ০৭/১১/২০১৩

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 1235বার পড়া হয়েছে।

চাঁদ, দ্য ল্যাম্প অফ দ্য নাইট। রাতের প্রকৃতিকে দেখতে আকাশে ঝোলানো থাকে! এই চাঁদের আলো, মানে জ্যোৎস্নায়, বড় মায়া জড়িয়ে থাকে। শান্ত নিশ্চিন্ততার ভাবনা জ্যোৎস্নার মধ্যে খুঁজে পাই।
এমনি এক আলোআঁধারি জ্যোৎস্নায় খোলা আকাশে বসে আছে শুভ্র। গরমের দিন, রাতের দিকে গরম কমে যায়। না ঠান্ডা, না গরমের মাঝখানে,আরও যদি জ্যোৎস্না রাত হয়, ভালোতো লাগবেই। আর ঘিঞ্জি এই মফস্বল শহরে রাস্তাঘাট ছেড়ে ছোটবড় কোনো পার্কে কিছু সময়ের জন্য বসলে সত্যি ভালো না লেগে কি পারে। খোলা হাওয়া যেটুকু পাওয়া যায়, তাতেই মনে হয় শরীর জুড়িয়ে গেল।
শুভ্রর ভালো লাগছিল,একাই এসেছিল এই শহরে। যেখানে ওঠেছে শুভ্র,সেই বাসার ধারেকাছে কোথাও বড় ইলেকট্রনিক্্েরর দোকান নেই। আর সেই যদি কোথাও বের হতে হয়, তবে পার্কের আশ-পাশে মার্কেট আছে এমন জায়গায় গেলে ক্ষতি কি? ঘোরায় ঘোরা হয়ে যাবে, সেই সঙ্গে বেশ ক’টা দোকান ঘুরে পছন্দ মত মোবাইল কিনতে পারবে। এমনই ভেবে এ জায়গাটাতে আসা। মোবাইলের মধ্যে নকিয়ার নতুন মডেলের একটি সেট পছন্দ করল শুভ্র। দাম সাত হাজার আটশত টাকা। সুন্দর, মজবুত। পুরোনো যে মোবাইল তার কাছে আছে, সেটা অনেক দিনের পুরোনো। ওপরটা ঘষেটষে ঔজ্বল্য হারিয়েছে। আর মডেল বড় পুরোনো ছিল, সব দিক ভেবে নতুন নেওয়া।
সন্ধ্যের মধ্যে মোবাইল তো নেওয়া হয়ে গেল,এবার কি করা যায় ভাবছিল শুভ্র। এত তাড়াতাড়ি বাসায় ফেরারও ইচ্ছা নেই। মার্কেট থেকে ক্ষানিকটা দূরে পার্কটার কথা মনে হলো তার। এদিক-ওদিক না ঘুরে নিশ্চিন্তে ক’টা মিনিট বসা যাক ভেবে পার্কে এসে বসল। আশপাশে তাকিয়ে দেখল আরও বেশ কিছু লোকজন বসে আছে। দু’তিন জায়গায় যত দূর নজর যায় জোড়া জোড়া বসে থাকতেও দেখা গেল। পার্ক মানেই তো তাই, জোড়া এসে বসে থাকার প্রশস্ত জায়গা, সামান্য আনন্দ-ফূর্তি, খুনসুটি, বসন্ত বয়সে সবাই এটা চায়।
খালি জায়গা নিয়েই বসে আছে শুভ্র। পাঁচ মিনিট বসে থাকার পর ওঠবে ওঠবে ভাবছিল,এমনি সময় একটা মেয়ে এসে দাঁড়ালো তার সামনে, একটু দূরত্ব নিয়ে। শুভ্র অবাক হল।
কি ব্যাপার? মেয়েটার হাবভাবে মনে হচ্ছে কিছু বলতে চায়। মেয়েটি মৃদু স্বরে কি যেন বলল, শুভ্রর বোধদয় হল না। আবার মেয়েটি ক্ষানিক চাপা স্বরে বলে ওঠল, সঙ্গিনী চাই?
মানে বুঝলাম না,শুভ্র বলে ওঠে। মনে মনে সে ভয় পায়,খারাপ মেয়েছেলে নয় তো! পটিয়ে-পাটিয়ে টাকাপয়সা নিয়ে ভেগে পড়তে পারে। যা আজকাল হচ্ছে। ভালোবাসার লোক চাই? ঈষৎ হাসি মেয়েটির মুখে,যদিও মলিনতা ঘিরে আছে তার সমস্ত শরীর।
ভয় পেয়ে যায় শুভ্র, নিশ্চয়ই মেয়েটি দেহপসারিণী হবে। এ ধরণের ঘটনার সামনাসামনি কখনো হয়নি সে, বলে ওঠে, না না, আমি এখন ঘরে যাব। মেয়েটি মিষ্টি ভাবে বলে ওঠে, ঘরে তো কেউ না কেউ থাকবেই, পার্কেতো আপনি একা!
না না, আমার কাউকে চাই না,এখনই আমি ঘরে যাব,উৎকণ্ঠায় বলে ওঠে শুভ্র।
মেয়েটি বলে ওঠে, এত ভয় পাচ্ছেন কেন? আমি বাঘ-ভাল্লুক নই, মানুষ,না হয় দু’টি কথা আপনার সঙ্গে প্রেমিকা হয়ে বললাম! বেশী লাগবে না, আধ ঘন্টায় বিশ-ত্রিশ টাকা দিলেই হবে।
ওঠে যেতে থাকে শুভ্র, ভাবে, মেয়েটি বলে কি! প্রেমিকার অভিনয় করবে বিশ-ত্রিশ টাকায়! তারপর জমে গেলে আরও কত কিছুর রেট বলে বসবে। এমনি করে ফাঁসিয়ে সর্বশান্ত করবে।
মেয়েটি আরও একটু কাছে এল, ফিসফিস করে বলে ওঠলো-জানেন, আজ সারা দিন একটি টাকাও পাইনি, সকাল থেকে পেটে এক দানা কিছুই পড়েনি, ঘরে মা আর ভাইকে কি খাওয়াব বলুন!
শুভ্র দাঁড়ায়। মনে হয় এমনি ভাবে ওরা কথার ফাঁদ পাতে, মিষ্টি মিষ্টি সুন্দর সুন্দর কথা বলে, তারপর নিয়মিত খদ্দের বানায় আর লোকেদের চরিত্র হনন করে, টাকা পয়সা আত্মসাৎ করে পথে বসায়। শুভ্র কি মনে করে পকেট থেকে বিশ টাকা বের করে, মেয়েটার হাতে দিয়ে বলে, এটা রাখো। মেয়েটি টাকা নেয় না, বলে, না এমনি এমনি আমি টাকা নিই না, আমায় বিশ্বাস করুন আমি কোন ছলনা করছি না, এমন কি আমি আপনাকে দেহ দান করতেও আসিনি, শুধু দু’টি মিষ্টি কথার অভিনয় করে ক’টা পয়সা চাই আমি।
কি উত্তর দেবে শুভ্র বুঝতে পারল না। বেশভূষায় মেয়েটিকে অতি সাধারণ মনে হচ্ছে। বয়স বিশ কি একুশ হবে, উগ্র সাজসজ্জা শরীরে নেই, গা থেকে পারফিউমের কোনো গন্ধ আসছে না। পরিচ্ছদে উগ্র চাকচিক্য নেই। তবে কি মেয়েটি যা বলছে তা সত্যি! কিন্তু এমনি ভাবে কি কেউ পয়সা রোজগার করতে পারে? লোকেরা এমনি ভাবে তাকে পয়সা রোজকার করতে দেবে? দু’দিন পরেই তো সে বাধ্য হবে দেহ দান করতে,তখন! যাক এতসব ভাববার তার কি দায় পড়েছে।
মেয়েটি শুভ্রর দিকে তাকিয়ে করুণ ভাবে হাসল, বিশ্বাস করতে পারছেন না আমায়! আমি তো আপনার কোন ক্ষতি চাই না।
-না না, আমায় যেতে হবে, আর্জেন্ট কাজ আছে।
-ঠিক আছে যান, আপনার নামটা বলবেন?
-কেন, নাম দিয়ে কি হবে?
– ধরুন রোহান আপনার নাম, আমার আপনাকে বলতে হবে, রোহান ভাই কত দিন পরে তোমার সঙ্গে দেখা, চলো না দু’মিনিট কোথাও বসি, আমায় কি তোমার ভালো লাগে না!
-মেয়েটি তার রোজের অভিনয়ের কিছু অংশ বলে চলে। সত্যি কি অদ্ভুত! জীবনে খুব কমই এমন চমকদার ঘটনা ঘটে।
কিন্তু শুভ্রর হঠাৎ চমক ভাঙল তখন যখন দেখল পার্কের আবছায়ায় কোনো ঝোঁপ থেকে দুটো মেয়ে বেরিয়ে এসে এই মেয়েটির চুল টেনে ধরল। একি! কি হচ্ছে শুভ্রর চোখের সামনে? পরে আসা মেয়েদু’টির মধ্যে একজন বলে ওঠলো, হারামজাদী, বাহির হয় এখান থেকে! আবার আইলি তুই! সাথের অন্য মেয়েটা আরও কদর্য কিছু গালি দিয়ে, একজন চুল টেনে, আর একজন ধাক্কাতে ধাক্কাতে শুভ্রর অভিনেত্রী প্রেমিকা মেয়েটিকে পার্ক থেকে বের করে দিতে তৎপর হয়ে ওঠলো। যেতে যেতে প্রেমিকা মেয়েটি মিনতি ভরা চোখ নিয়ে দু’তিনবার তাকাল শুভ্রর দিকে।
সত্যি খুব খারাপ লাগছে শুভ্রর। বেচারী, সত্যি হয়তো সারা দিন কিছুই তার পেটে পড়েনি। একবার মনে হল, কেন ওর হাতে আরো বেশ কিছু টাকা গুঁজে দেয়নি!
এমনি সময় ফিরে এলো জাঁদরেল মেয়ে দুটি, শুভ্রকে বলে ওঠলো, ওর পাল্লায় পইড়েন না যেন, আপনারে দু’দিনে শেষ কইরা দিবো! তারপর ওদের মুখ থেকে উত্তেজনার ভাবটা সরে গেল, শান্ত হয়ে এক জন অন্য জনকে দেখিয়ে হেসে বলল, এর সঙ্গে চইলা যান ওই গাছডার আড়ালে, ওর নাম রেখা, ওর সঙ্গে ভালবাসা করেন গিয়া।
-না না, আমি চলে যাচ্ছি, শুভ্র বলে ওঠে।
-কোথাই যাইবেন, সবে তো সন্ধ্যা, শুভ্রর হাত আলতো ভাবে সুন্দর ভঙ্গিমায় তুলে ধরে রেখা। প্রেমিকার মত হাসে সে, শরীরে উগ্র পারফিউমের গন্ধ তার। গন্ধে আশপাশের জায়গাটা পর্যন্ত উৎকট হয়ে ওঠেছে। হেসে চলেছে মেয়েটা শুভ্রর মুখের দিকে চেয়ে।
-কি হইল, চলেন না, মজা পাইবেন, বলে নাচের ভঙ্গি করে আবার হেসে ওঠে মেয়েটা।
কি করবে এবার শুভ্র, সাথে রাখা মোবাইল, টাকাপয়সা সবই এবার বুঝি গেল! শুনেছে শুভ্র, কথা না শুনলে ওরা নাকি আরও দুর্র্ধষ হয়ে ওঠে। জামা-প্যান্ট খুলে ল্যাংটা করে ছেড়ে দেয়! ভয় আরও জাঁকিয়ে বসল শুভ্র মনে।
শুভ্র বলে, আমার আর্জেন্ট কাজ আছে, আমি যাব।
-কোথাই যাইবা তুমি! শুভ্র গায়ে হেলান দিয়ে আরও নিবিড় হয় রেখা।
-সরুন আমি বাড়ি যাব।
-বাড়ির ছেলে বাড়ি তো যাইবে, তার আগে চলো না আমরা একটু মজা কইরা লই দু’জনে!
হেসে টানতে থাকে শুভ্রকে। রেখা বুঝতে পারে এ ছোকরা একেবারে আনকোরা।
আশপাশের হেঁটে যাওয়া আসা লোকেরা কেউ কেউ ওদের দিকে তাকাচ্ছিল, কেউ কেউ হাসছিল। শুভ্রর কাছে ভীষণ লজ্জাকর ছিলো ব্যাপারটা।
প্রায় টেনে নিয়ে যাচ্ছে রেখা শুভ্রকে। পাশে ঝোঁপের মত জায়গায়। দু’কাঁধে হাত রেখে প্রেমিকার মত সুন্দর করে বসিয়ে দিল শুভ্রকে। আর কিছু না বলে সোজা শুভ্রর দু’গালে চুমু খেয়ে দিল। শুভ্র কি বাইরে থেকে শান্ত হয়ে যাচ্ছে? ভিতরে গুপ্ত স্থানে কি তার ধীরে ধীরে সাড়া জেগে ওঠছে? না, তেমন হয়নি, ভয়ে সে এখনো স্বাভাবিক হয়ে ওঠতে পারেনি। ওর মনে একটাই চিন্তা, কি করে ওর হাত থেকে রেহাই পাবে!
দেখ,সময় নিবো না, পাঁচ মিনিটে তোমারে ঠান্ডা কইরা দিমু! বলে রেখা নিজের কোমরে হাত দিল,সামনের দিক থেকে ব্লাউজের ভিতরে হাত ঢুকিয়ে কিছু খুঁজল। না,নেই, নিজের মনেই বলে ওঠলো রেখা, নিশ্চয়ই পড়ে গেছে কোথাও। তার পর কিছু একটা মনে করে চিৎকার করে ওঠল, ওই মাগী মেয়েটারে তাড়াইতে গিইয়া শিশিডা পইড়া গেছে কোথাও, হারামজাদী আমার দশ টেকার তেল ফালাইয়া দিল! মুহূর্ত চুপ থেকে শুভ্রর মুখটা টেনে নিজের কাছে নিয়ে আবারও চুমু কাটল রেখা, লক্ষীটি, একটু বসো তুমি, আমি এখনই আইতাছি। রেখা ঝট করে তেলের যোগাড়ে চলে গেল।
মাথাটা কেমন করে ওঠলো শুভ্রর,বুদ্ধি খুলে গেল হঠাৎ, কেউ যেন তাকে বলে দিল, পালা, পালা শিঘ্রীই। চারিদিক তাকিয়ে দেখে নিল, চারিদিকে গাড়িঘোড়ার শব্দ ছাড়া কিছুই শোনা যাচ্ছিল না,তবে হ্যাঁ, একদিক থেকে বেশ উজ্জল আলোর আভা আসছিল,সে দিকে তাকাল, অদূরে রাস্তার সামান্য অংশ দেখা যাচ্ছিল, সারি সারি লাইনে গাড়ি যাতায়াত করছে, আর সময় নেই, ঝোঁপঝাঁপের ফোকর গলিয়ে ছুটল সে। প্রায় শ’পা ছুটেই পেয়ে গেলো পার্কের সীমানার দেওয়াল, এক কোমর উঁচু ছিলো সেটা, টপকাতে বিশেষ বেগ পেতে হলো না শুভ্রর। লাফ দিয়ে টপকে সে জনতা আর গাড়ির ভীড়ে মিশে গেল।
সেখান থেকে চার নম্বর বাস ধরে সোজা খালার বাসায় পৌঁছে গেল। শুভ্র খালার বাসায় বেড়াতে এসেছে, এমনি সামার ভেকেশনের সময় প্রতিবারই প্রায় খালার বাসায় ঘুরে যায়। তাদের কোন সন্তান নেই বলে খালা-খালু দু’জনেই তাকে খুব ভালবাসেন, সব সময় তাঁদের কাছে ঘুরে যেতে বলেন। সেইমত এবার শুভ্র এসেছে খালার বাসায়, আরও চার পাঁচদিন তার থাকার কথা।
পার্কের ব্যাপার তার কাছে জীবনের নতুন অভিজ্ঞতা। বন্ধুদের কাছে শুনেছে এধরণের ঘটনা বড় বড় শহর-নগরে ঘটে। তবে মফস্বল এই শহরে সত্যিই চমক যেন ছিল অন্য রকম! জীবনকে কত অভিজ্ঞতা নিয়েই না এগিয়ে যেতে হয়। ওই মেয়েটির কথা মনে পড়ে যাচ্ছে যে তাকে ওর প্রেমিক হতে বলেছিল। ও হতে চেয়েছিল তার প্রেমিকা, বিনিময়ে বিশ ত্রিশ টাকা সে নেবে। দিন-দিন রোজগারের পন্থা কত বিচিত্র ধরণের হয়ে যাচ্ছে।
মেয়েটি গরীব ছিল সন্দেহ নেই,সংসারে সেই হয়তো একমাত্র রোজগারের লোক,সত্যি হয়তো তিন-তিনটি পেট ওর রোজগারেই চলে। ও খুব নিরীহ ধরনের ছিল,তবেই তো ওকে মার খেতে হল। আহা, বেচারী বলছিল, দিনভর কিছুই খায়নি! শুভ্রর মন কেমন করে ওঠলো।
মেয়েটির চেহারা ছিল ছিমছাম, আবছা আলো-অন্ধকারে তেমন বোঝা যাচ্ছিল না কতটা সুন্দরী দেখতে ছিল। তবে শুভ্র দেখেছে ও মার্জিত ছিল। কথাবার্তায় তো খুব মিষ্টি ছিল তাতে সন্দেহ নেই।
শুভ্র এখন যদি তার দেখা পায় চিনতে পারবে না। তবে হ্যাঁ, তার গলার মার্জিত সুর এখনো তার কানে গেঁথে আছে। সে যদি তার সামনে এসে কোন কথা বলে, তার কন্ঠ নিশ্চয় শুভ্র চিনে যাবে।
মন্দ হত না যদি আবার তার সঙ্গে দেখা হয়ে যেত। আর রেখা,সে কেমন! নিজের মনকে প্রশ্ন করে শুভ্র, ওরে বাবা, সে তো সাংঘাতিক, পারলে গায়ের সব রস সে নিংড়ে নিতে পারে। ভাগ্যক্রমে ওর হাত থেকে বিনা তেলে ফসকে আসতে পেরেছে সে! শুভ্র ভাবলো,যাবে নাকি আরেকবার সেই পার্কে, যেখনে রঙচরীরা খেলা করে! এমনই মনের কোণায় লুকোনো ইচ্ছা থেকেই একদিন আবার শুভ্র চলে গেল সেই পার্কে। আর,আর কোন মূল্যবান জিনিস তার সাথে রাখল না, সামান্য কয়টা টাকা ছাড়া। পার্কের আশপাশে ঘুরতে লাগলো শুভ্র। পার্কের এদিক ওদিক বাইরে লক্ষ্য করতে লাগলো। তখন স্পষ্ট দিবালোক ছিলো, ওই দিনের মত সন্ধ্যের কাছাকাছি সময় নয়, জোড়া জোড়া ছেলে মেয়েরা পার্কে ঢুকছে আর বের হচ্ছে। এর মধ্যে কি আছে সেই মেয়েটি যে তাকে বলেছিল রোহান ভাইয়ের অভিনয় করতে!
শুভ্র লক্ষ্য করে দেখল,পার্কের এক কোণায়, বাইরের দিকে দেওয়ালে হেলান দিয়ে এক মহিলা এদিক সেদিক তাকাচ্ছে। কে জানে, ওদিনের মেয়েটি হবে কি না? শুভ্র তাকালো মহিলার দিকে, না, সে চোখ সরিয়ে নিল, শুভ্রর দিকে চাইবার উৎসাহ দেখাল না। তার মানে, এ মহিলা সেই মেয়ে হতে পারে না। আর এক জায়গায় শুভ্র খেয়াল করল, পার্কের বাইরে, গেটের একদিক থেকে বেশ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে একটি মেয়ে কাউকে খুঁজে বেড়াচ্ছে, মনে হল পার্কের ভেতরে যেতে তার ইচ্ছা নেই। চেহারা-আকৃতিতে মনে হলো সে হলেও হতে পারে। শুভ্র আরও কাছে গেল তার, মেয়েটির থেকে হাত-দশেকের মত দূরত্ব নিয়ে দাঁড়াল। বাইরের দিকে মেয়েটি কম তাকাচ্ছে। পার্কের ভিতরের দিকে যেন কাউকে খুঁজে বেড়াচ্ছে, অথচ ভেতরে ঢুকছে না। তবে কি ভেতরে ঢুকতে সে ভয় পাচ্ছে! শুভ্র ভেবে নিল, এই সে হতে পারে, রেখা আর তার সাথের মেয়েটিকে তার ভয়, আবার যদি তারা গলাধাক্কা দিয়ে, চুলের মুঠি ধরে পার্ক থেকে তাকে বের করে দেয়! এমনি সময় মেয়েটি শুভ্রকে লক্ষ্য করল, তারপর দু’তিনবার তাকাল, তৃতীয়বার চোখাচোখি হতে শুভ্র সাহসে ভর করে এক পা দু’পা করে ওর দিকে এগোতে থাকল। অনেক কাছে এগিয়ে গেল শুভ্র, মেয়েটি তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
মেয়েটি মৃদু হাসল শুভ্রর দিকে তাকিয়ে,তারপর বলল, কাকে খুঁজছেন আপনি?
কি বলবে শুভ্র একটু সময় চুপ থেকে ইতস্তত করে বলল, হ্যাঁ, মানে – আপনিও কি কাউকে খুঁজছেন?
মিষ্টি হেসে ও বলল, হ্যাঁ, কোন বন্ধুকে।
শুভ্রর এবার খেয়াল হলো, হ্যাঁ, এ কণ্ঠ তার পরিচিত মনে হচ্ছে! ও সাহস ভরে বলে ওঠলো, আচ্ছা আপনার সঙ্গে কি আমার গত পরশুদিন আলাপ হয়েছিল?
-আপনার সঙ্গে! বলে ও কিছু সময় চিন্তা করল।
-হ্যাঁ, আমার নাম রোহান, রোহান ভাই, নামটা আপনি দিয়ে ছিলেন, শুভ্রর বদ্ধ ধারণা এ সে না হয়ে পারে না -মেয়েটি তার রোজকার নাটকের মাঝখান থেকে রোহান ভাইয়ের নাটকের সংলাপ স্মরণ করে ওঠতে পারছে না, আরও পরিষ্কার ভাবে মনে করিয়ে দেবার জন্য বলে ওঠে শুভ্র, আপনাকেই তো দু’টো মেয়ে পার্ক থেকে বের করে দিয়েছিল!
এবার মাথা নাড়ল মেয়েটি, আচ্ছা আপনি ছিলেন সে দিন! সেই বোকা বোকা কম কথা বলা ছেলেটা! মেয়েটি এবার প্রাঞ্জল হাসল, শুভ্র আরও একটু কাছে এসে দাঁড়াল।
নিজেকে সংযত করতে পারলনা শুভ্র, বলে ফেলল, চলুন না, পার্কে ঘুরে আসি একটু সময়।
মেয়েটির মুখে ভয়ের ছায়া পড়ল, না, পার্কে না, চলুন আমরা পার্কের বাইরে, রাস্তা দিয়ে হাঁটি। কেন যেন শুভ্রর ওকে আজ বড় আপন বলে মনে হচ্ছে, আপনার নাম জানতে পারি? -নাম! বলে, ইতস্তত করে বলল, শাহানা।
-না, আপনার নাম শাহানা বলে মনে হয় না।
-কেন?
-আপনাদের তো হাজারটা নাম, শুভ্র বড় স্বাভাবিক ভাবে কথা বলে চলেছে।
-কিছু ভেবে নিয়ে মেয়েটি বলল, লাকী, সত্যি আমার নাম লাকী, আর আপনার নাম?
-রোহান, শুভ্র চট করে উত্তর দেয়।
-বাহ, আপনিও বানানো নাম বলে দিলেন! অবশ্য বলার ইচ্ছে না থাকলে থাক, বলতে হবে না, আমি না হয় রোহান ভাই বলেই ডাকব।
-থাকো কোথায় তুমি? শুভ্র নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না, সে কখন আপনি থেকে তুমিতে নেমে এসেছে! তবু সামলে নেবার চেষ্টা করল, সরি, তুমি বলে ফেললাম!
-ভালো লাগছে, আমিও অভিনয়ে না হয় আপনাকে তুমি ডাকব, বুঝেছ! কেমন চোখকে প্রেমিকার মত ঈষৎ নাচিয়ে ওঠলো লাকী।
-ঠিক আছে, কোনো আপত্তি নেই, হেসে বলে শুভ্র।
শুভ্র থামল এক জায়গায়, দু ঠোঙা বাদাম কিনে নিল। লাকীর হাতে এক ঠোঙা দিয়ে, নিজে একটা নিয়ে প্রেমালাপ করতে করতে ওরা হেঁটে চলল বেশ সময় ধরে।আস্তে আস্তে রাত বাড়তে লাগলো, লাকীর হয়তো ঘরে ফেরার সময় হয়েছে।
-লাকী, ঘরে ফেরার তোমার সময় হল, না?
-হ্যাঁ, রাত হয়ে গেল।
-তুমি কোথায় যাবে লাকী, মানে তোমার ঘর কোন দিকে?
-আমাদের লাইনে, কিছুই সত্যি বলতে নেই, তবে রোহান ভাই, আমি সত্যি বলছি তোমায়, আমি পল্টন মার্কেটের দিকে থাকি, এখান থেকে কাছেই, একটা বস্তি বাড়িতে।
-আমি,এই শহরে খালার বাসায় বেড়াতে এসেছি। চট্টগ্রামের আমার বাড়ী।
লাকী কিছু ভেবে নিয়ে বলল, তা হলে বিদায় নিতে হয়!
-হ্যাঁ, চল আমরা বাড়ি ফিরি। পকেটে হাত ঢুকালো শুভ্র, একশত টাকার একটা নোট বের করল, দেবার জন্য লাকীকে দিকে হাত বাড়ালো। লাকী কি ভেবে থমকে দাঁড়াল, শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বলে ওঠলো, আজ নয় রোহান ভাই, অন্য একদিন। আজ তো সত্যিকারের বন্ধু হয়ে ঘুরলাম, আমার অভিনয় আজ অভিনয় হয়ে ওঠতে পারেনি।
-তা হয় না লাকী, তোমার সংসার আছে, হয়তো স্বামী ছেলে মেয়ে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল শুভ্র। মাঝখানে লাকী বলে ওঠলো, না, রোহান ভাই আমি অবিবাহিতা, আমার বাবা নেই, আমার মা আর এক ছোট ভাইকে নিয়ে সংসার, মা আমার বিছানায় শয্যাশায়ী।
-বাবা কোথায়?
– দেখিনি, মা বলেছে খুব ছোট বেলায় আমাদের ফেলে চলে গেছে।
-তোমার টাকার খুব প্রয়োজন লাকী, রাখ এটা, শুভ্র আবার এগিয়ে ধরে টাকাটা লাকীর সামনে।
-না, রোহান ভাই আজ নয়, আজ তোমার কাছ থেকে কিছুতেই টাকা নিতে পারব না।
-আবার কবে দেখা হবে লাকী?
-মন থেকে চাইলে কোথাও না কোথাও কখনো না কখনও ঠিক দেখা হয়ে যাবে রোহান ভাই! উভয়ের নীরবতায় কেটে গেল কিছু সময়।
-আমি আসি, বলে লাকী কয়েক মুহূর্ত শুভ্রর দিকে তাকিয়ে থাকল, মনের অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস পড়ল তার, ঘরে ফেরার তাগিদে এগিয়ে গেল রাস্তা ধরে, আর পরক্ষণেই ভীড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
শুভ্র দেখেছিল,লাকীর চোখের কোণদুটি জলের আভায় চকচক করছিল, কেন যেন মনে হয়েছিল নিজের আসল নামটা লাকীকে বলে দেয় সে। সময় আর সুযোগের অভাবে তা আর বলা হল না।

১,২৭৮ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
সর্বমোট পোস্ট: ৭৭ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ১০১ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৮-২৮ ১১:৫৮:৪৮ মিনিটে
banner

২ টি মন্তব্য

  1. শাহ্‌ আলম শেখ শান্ত মন্তব্যে বলেছেন:

    ভাল লাগল ।

  2. আমির হোসেন মন্তব্যে বলেছেন:

    খুব ভাল হয়েছে।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top