Today 01 Dec 2022
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

উটন দাদুর কাহিনী-পর্ব-১৮ (শিশু ও কিশোরদের বনজঙ্গলের রোমাঞ্চকর উপন্যাস)

লিখেছেন: তাপসকিরণ রায় | তারিখ: ২২/০২/২০১৪

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 1443বার পড়া হয়েছে।

images (60)

এ দিকে উটন দাদুদের দলের সবার খিদে পেয়েছিল ভীষণ। বনে বনে ওরা ঘুরে ঘুরে দেখছিল যে কোন ফলমূল পাওয়া যায় কিনা–জঙ্গলে এ সবই পাওয়া যায়। তবে তা কোথায় পাওয়া যাবে তা কে বলে দেবে ? সামান্য চলেই ওরা দেখতে পেল চিরঞ্জি ফলের গাছ। গাছগুলি বেশী বড় হয় না–ফলও ছোট ছোট,কালো রঙের হয়–অনেকটা কালো জামের অণু সংস্করণ বলা যায়। এ ফলকে চারু ফল বলে–এর বীজই হল চিরঞ্জী দানা যা অনেক সুস্বাদু,দামি মিষ্টি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এ ফলের দাম অনেক– এলাচ,লবঙ্গ,দারুচিনির মতই মূল্যবান। পাশেই ওরা দেখল গাছ ভরে হয়ে আছে তেন্দু ফল। ব্যাস,আপাতত পেট পূর্তির ব্যবস্থা হয়ে গেল।

সবাই কারু ফলের গাছের মাথা নুইয়ে পেড়ে খেতে লাগলো কারু ফল। শমী,বুনাই,নবু জীবনের শঙ্কা ভুলে মুখে আনন্দ সূচক শব্দ করতে করতে ছুটে চলে গেল তেন্দু গাছের নিচে–সেখানে অনেক পাকা তেন্দু পড়ে আছে–গাছের তলে বিছিয়ে আছে। তেন্দু ফলও পাকলে হলদে রঙের হয়,আবার হলদের সঙ্গে লালাভাও থাকে। এগুলি ভাল ভাবে পাকলে বেশ সুস্বাদু হয়। ওরা সবাই সাগ্রহে কুড়িয়ে খেতে থাকলো তেন্দু। সাধারণ ভাবে নিচে পড়ে থাকা  এ ফল সবই থাকে পাকা,পেকে গেলেই ওগুলি আর গাছে লেগে থাকতে পারে না–বোটা নরম হয়ে গিয়ে ঝরে পড়তে থাকে গাছের নিচে। অল্প সময়ের মধ্যেই ওদের পেট ভরে গেল।

এবার সমস্ত চিন্তাগুলি আবার মাথায় জেঁকে বসলো। নেচুকে নিয়েই সবাই ভাবছিল। ও বেঁচে থাকলে,ওর সমর্থ থাকলে,নিশ্চয় ফিরে আসবে–এই অপেক্ষায় সবাই মুহূর্ত গুনছিল। উটনের মাথায় আরও একটা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল–ওদের নৌকো কি কোন ভাবে ওরা আবার ফিরে পেতে পারে ? ওর ধারণা ওদের নৌকা ওই বুনোরা নিশ্চয় নিয়ে গেছে। বুনোদের কাছে নৌকো বড় নতুন ধরনের বস্তু,তবে রাবুনদের নৌকো ওরা আগেই দেখে থাকবে। ওরা বেশীর ভাগ নদী সাঁতরে পারাপার করে–নদী পথে বেশী দূর যেতে হলে ভাসমান শুকনো গাছ দিয়ে কাজ চালায়। উটনদের নৌকো শুরুতে এক বুনোই দেখেছিল–সেই পরে ওদের গাঁয়ে গিয়ে খবর দিয়ে ছিল। ওরা জানে না,পরে ওদের নৌকো ওরা কি করেছে। সেখানেই ছেড়ে গেছে,না কি অন্য কিছু ! নৌকোর মত এক নতুন জিনিস দেখে হতে পারে ওরা ওদের গাঁয়ের ঘাটেই রেখে দিয়েছে।

উটন দাদু এবার সবাইকে ডেকে বলল,তোমরা সবাই নদীর পারে খুঁজে দেখো,কোন নৌকা দেখতে পাও কি না। আমাদের ভাগ্য ভাল হলে হয়তো আমাদের নৌকা কিম্বা রাবুনদের নৌকা আমরা পেলেও পেতে পারি। ছেলেরা সবাই তৎক্ষণাৎ নদীর তীর ধরে খুঁজে দেখার জন্যে দ্রুত এগিয়ে গেল। উটন দাদুর কথামত সবাই সঙ্গে তাদের হাতিয়ার নিতে ভুলল না। হাতিয়ার অনেক আগে থেকেই ওদের সাথেই রাখা ছিল। বুনোদের থেকে ওদের সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে–এ কথাও উটন সবাইকে বলতে ভুলল না। উটন বলে ছিল,সাবধান ! তোমরা কখনও বুনোদের আস্তানার ধরে কাছে যাবে না।

–যদি নৌকো পাই ? নবু বলে ওঠে।

–তবে খবর দেবে আর পারলে দু তিনজন মিলে ধরে নৌকো এখানে নিয়ে আসবে। আমি তোমাদের মাঝামাঝি নদীর পারে থাকছি। তোমরা দুই দল আমার দুই দিকে নদীর পার ধরে নৌকা খুঁজতে যাও।

শমী বলে উঠলো,আর যদি না পাই !

তবে ফিরে এস–আমরা রাতে দেখতে যাব বুনোদের গাঁয়ের পাশে,নদীর পারে। আমার মনে হয়,সেখানে আমরা আমাদের নৌকা পেয়ে যাবো। তবে সাবধান,বুনোরা এখন কিন্তু আমাদের হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে !

ছেলেদের দুই দল উটন দাদুর দুই বিপরীত দিশায় নদীতীর ধরে এগিয়ে চলল নৌকোর তালাশে। নদীর পারে জঙ্গলটা এত ঘন নয়–কথাও ছোট,কথাও বড় গাছপালা–তবে ঝোপ ঝাড় অনেক বেশী। হঠাৎ শমীর নজরে পড়ল,দুর থেকে এক বুনো যেন ওদের দিকেই হেঁটে আসছে ! ওরা সবাই থমকে দাঁড়ালো।  ওরা গাছের আড়াল থেকে লোকটাকে দেখার চেষ্টা করল। হ্যাঁ,তাই,একটা লোক যেন ধীরে ধীরে নদীর পরের দিকেই এগিয়ে আসছে। কিন্তু লোকটা ল্যাংড়াতে ল্যাংড়াতে আসছে না ! হঠাৎ বনুইয়ের মুখ থেকে চীৎকারের মত আওয়াজ বেরিয়ে আসতে আসতে থেমে গেল,ও নিজেকে সামলে নিয়ে চাপা গলায় বলে উঠলো,ওটা নেচু নয় তো ?

শমী ফিসফিসিয়ে উঠলো,সে রকমই তো মনে হচ্ছে !

ওরা গাছের আড়ালেই দাঁড়িয়ে থাকলো। লোকটা আরও একটু কাছে এলেই ওকে চেনা যাবে। সামান্য সময় পরেই স্পষ্ট হয়ে গেল,হ্যাঁ,ওই তো নেচুই আসছে ! নেচু ফিরে আসছে,সবার মুখেই খুশির ঝলক দেখা গেল। ওদের সবার চোখ মুখ কেমন আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। ওরা জোরে নেচুকে ডেকে উঠতে  পারল না,দ্রুত পা চালিয়ে নেচুর দিকে ছুটতে লাগলো।

নেচু হঠাৎ গাছ পালার আড়ালে তিনটে লোককে দেখে ভীষণ ঘাবড়ে গিয়ে ছিল। শুরুতে ও ভাবছিল কোন দিকে পালাবে। কয়েক মুহূর্ত পরেই ওদেরকে নিজেদের সাথী বলেই মনে হল ! হ্যাঁ,বনুই,শমী,নবুকে এবার সে চিনতে পারল। নেচুর চোখে মুখে আনন্দের ঢেউ খেলে গেল–তা হলে কি সে মৃত্যুর মুখ থেকে বাঁচতে চলেছে ? আপনজনকে ফিরে পাবার আশায় তার চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এলো–ও আত্মভোলা,বিহ্বল হয়ে পড়ল।

ওরা চারজন মিলিত হল–নেচু ভাল ভাবে কথা বলতে পারছিল না। ওদের পেয়ে ও জোরে জোরে কেঁদে উঠলো–অমোঘ মৃত্যু থেকে ফিরে এসে সে যেন বোবা হয়ে গেছে ! শুধু অবাক হয়ে সাথীদের জড়িয়ে ধরে সে কেবল কাঁদতে থাকলো। ওদের সবার চোখ ভিজে আছে–অবশ্যম্ভাবী মৃত্যু থেকে তাদের আপন সাথী নেচুকে ফিরে পেয়ে সবাই মিলে ওকে আনন্দে কাঁধে তুলে নিলো । এবার ওরা চারজন ফিরে চলল উটন দাদুর কাছে।

দূর থেকেই উটন দাদু দেখে নিয়ে ছিল নেচুকে। সবার কাঁধের ওপরে চড়ে সে আসছে। কিন্তু কোন বড় চোট পায় নি তো সে ? তবু নেচুকে ফিরে পাবার আনন্দে উটন যেন আত্মহারা। ওরা তার কাছে পৌঁছাতেই উটন সস্নেহে নেচুকে জড়িয়ে ধরল। আশীর্বাদের ভঙ্গীতে ওর মাথায় চুম্বন দিল।

নৌকা ওদের দু দলের কেউ দেখতে পায়নি। কুন্তাদের দলও নিষ্ফল হয়ে ফিরে এলো। সে নৌকা তাদের চোখেও পড়েনি। কিন্তু আপাতত ওরা সবাই খুব খুশি–নেচুকে ওরা যে ফিরে পেয়েছে !

অনেক খোঁজা খুঁজির পরেও ওরা কোন নৌকা পেলো না। উটন দাদু ও তার ছেলেরা দিনভর নিজেদের বুনোদের থেকে লুকিয়ে রাখল। আর সে সঙ্গে একটা কাজ ওরা করতে পেরে ছিল,সেটা হল আশপাশের গাছের তলা থেকে ছেলেরা কিছু পাকা তাল, নারকেল,ডাব,কিছু পাকা আম আর সেই ছোট ছোট কালো চারু ফল যোগার করে রেখে ছিল। উটন দাদু বলেছে,নদীর পারেই কোন গাছ তলায় এগুলি রেখে দিতে। সম্ভব হলে যাত্রা পথে এসব ফল ফলারি ওরা পথের খাবার হিসাবে নৌকায় তুলে নেবে। যাত্রা পথে কোথায় কি খাবার পাওয়া যাবে তার তো কোন ঠিক নেই !

সবাই জানে যে আজ রাতেই ওদের পলায়ন যাত্রা শুরু হবে। তার আগে নিজেদের নৌকা খুঁজে বের করতে হবে।

চারদিকে নিঝুম অন্ধকার। উটন দাদুর টর্চ মাঝে মাঝে ফোকাস ফেলছিল। বেশী দুরে নয়,নিজেদের পায়ের আশপাশে–যাতে বুনোরা কোন ভাবেই টের না পায়। বুনোদের গাঁয়ের ঘাট এ দিকটাই হবে–নৌকো–যেটাই হোক–ওদের কিম্বা রাবুনদের –এখানেই ধারে কাছে থাকার কথা।

নদীর পারে অনেক শুকনো গাছ ভাসছিল। নদী পারাপারের জন্যে বুনোরা নিশ্চয় এগুলি ব্যবহার করে। এপাশ ও পাশ  খুঁজে অবশেষে পাওয়া গেল নৌকো। নৌকো ডুবে আছে জলের নীচে। কেবল নৌকার এক দিকের মাথার খানিকটা জলের ওপরে ভেসে ছিল। কুন্তার চোখেই পড়ল সেটা। ও চাপা চীৎকার দিয়ে থেমে গিয়ে ছিল। এবার উপায় ? ডুবে যাওয়া নৌকা কি করে ওপরে তোলা হবে ?

উটন দাদু বলল,তুলতে হবে–যে ভাবে হোক জলের নীচে থেকে তুলতে হবে এই নৌকা।

শেষে সব ছেলেরা আর উটন দাদু মিলে অনেক কষ্ট করে টেনে তুলল সেই নৌকা। কিন্তু দেখা গেল নৌকোতে বড় বড় দুটো ছেঁদা যেগুলি দিয়ে অনায়াসে জল ঢুকে নৌকা খুব শিগগিরি ডুবে যাবে। তবু সে নৌকা তাড়াতাড়ি জলে ভাসানো হল। উটন দাদুর তাড়া খেয়ে তড়িঘড়ি করে সবাই নৌকায় উঠে বসল। আপাতত ভেসে আছে নৌকা কিন্তু বেশী সময় ভাসবে না–কারণ নৌকোর নিচে দিয়ে জল ঢোকা শুরু হয়ে গেছে। নদীর পার থেকেই ওরা কয়েকটি ডাল কেটে নিলো আর লগির মত করে চালাতে থাকলো নৌকা। সামান্য পরেই সেই জাগা এসে গেল যেখানে ওরা জড়ো করে রেখে ছিল সেই সব ফলগুলি।

উটন বলল,ফলগুলি সব নৌকায় তুলে নাও!

–কিন্তু নৌকা যে ডুবে যাবে এত ভারে ! কুন্তা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো।

উটন দাদু বলল,সে আমি দেখব। ওরা এত জন লোক আর সঙ্গে অনেক অনেক ফল ! নৌকায় অনেক জল ভরে গিয়ে ছিল। আবারও উটন বলে উঠলো,আমাদের নৌকার জল ফেলতে হবে–এখান থেকে বেশ কিছুটা দূর না যাওয়া পর্যন্ত আমাদের জীবনের ভয় কাটবে না। যে কোন সময় বুনোরা এসে আমাদের ওপর আক্রমণ করতে পারে।

নৌকোয় অনেক জল ঢুকে গেছে। উটন উতলা হয়ে বলে উঠল,তোমরা নৌকায় রাখা ডাবগুলি কেটে জল খেয়ে নাও–তারপর সেগুলি দিয়েই নৌকার ভিতরে ওঠা জল ছেঁচতে থাকো–এ কাজ খুব তাড়াতাড়ি করতে হবে!

ঠিক এমনি সময় দুরে বুনোদের চীৎকার শোনা গেল–হতে পারে কোন কারণে দু একজন বুনো নদীর পারেই ছিল। ওরা দেখে সবাইকে খবর দিয়েছে। এ দিকে নৌকা মাইল খানেক এগিয়ে গেছে। তাতে অনেক জল ভরে গেছে। ছেলেরা সবাই ডাবকে জলপাত্র বানিয়ে ছেঁচে চলেছে নৌকোর খোলে ভরে যাওয়া জল। নৌকা স্রোতের অনুকূলেই ছুটে চলেছে। ওদের ভাগ্য ভালো বলতেই হবে,নদীর স্রোত তাদের যাত্রা পথের অনুকূলেই বয়ে চলেছে। নৌকা স্রোতের তোরে ছুটে চলেছে। অনেক দূর থেকে উটন,নবু,বনুই,শমী,নেচু ওরা সবাই দেখতে পেল যে দুরে,বহু দূরে অনেকগুলি আগুনের গোলা–বুনোদের হাতের মশাল হবে সেগুলি। ওদের ক্ষীণ চীৎকার হৈহল্লার আওয়াজ দূর থেকে ভেসে আসছিল। উটন দাদুদেরকে ধরার জন্যেই বুনোরা নদীর পার ধরে অনেক দূর পর্যন্ত ছুটে এসেছিল। কিন্তু সে চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে উটন দাদুদের নৌকা ছুটে চল ছিল ওদের আপন গ্রামের দিকে।

সমাপ্ত

১,৪৪৭ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
নাম :তাপসকিরণ রায়। পিতার নাম : স্বর্গীয় শৈলেশ চন্দ্র রায়। জন্ম স্থান: ঢাকা , বাংলা দেশ। জন্ম তারিখ:১৫ই এপ্রিল,১৯৫০. অর্থশাস্ত্রে এম.এ.ও বি.এড. পাস করি। বর্তমানে বিভিন্ন পত্র পত্রিকাতে নিয়মিত লিখছি। কোলকাতা থেকে আমার প্রকাশিত বইগুলির নামঃ (১) চৈত্রের নগ্নতায় বাঁশির আলাপ (কাব্যগ্রন্থ) (২) তবু বগলে তোমার বুনো ঘ্রাণ (কাব্যগ্রন্থ) (৩) গোপাল ও অন্য গোপালেরা (শিশু ও কিশোর গল্প সঙ্কলন) (৪) রাতের ভূত ও ভূতুড়ে গল্প (ভৌতিক গল্প সঙ্কলন) (৫) গুলাবী তার নাম (গল্প সঙ্কলন)
সর্বমোট পোস্ট: ১১২ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ১৬৬৯ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৮-১১ ১৫:৪৩:৫৪ মিনিটে
banner

২ টি মন্তব্য

  1. এই মেঘ এই রোদ্দুর মন্তব্যে বলেছেন:

    এই পর্ব পড়ছিলাম মনে হয়।

  2. সহিদুল ইসলাম মন্তব্যে বলেছেন:

    কালো লাগলো দাদা , ভালো থাকুন সর্বদা।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top