Today 17 Jan 2022
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

কমন স্যার এবং আহত বেদনা

লিখেছেন: শাহ্‌ আলম বাদশা | তারিখ: ২২/০৭/২০১৪

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 1336বার পড়া হয়েছে।


শেষ পর্ব

নুরুল হুদার কথামতো কায়েস এখন আর প্রেমসঞ্জাত প্রাপ্তিযোগে আপত্তি না করে বিনা বাক্যব্যয়ে সবকিছু খেয়ে নেয়! কিন্তু মানুষতো ফেরেস্তা নয় যে, প্রচন্ড গতিশীল হৃদয়কেও সহজে লাগাম পরিয়ে দেবে ? ফলে মনের অজান্তে তারও দুর্বলতা তৈরী হয়ে যায়। রহস্যময়ী মেয়েটাকে দেখারও সাধ জাগে মনে। বিশেষ করে শিউলীর চাচাসম্পর্কের একজন মুরুব্বী যেদিন সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দেন, সেদিন থেকে কেমন একটা ভাল্লাগাভাবও অন্তরে দোলা দিতে থাকে। বিবেক তাকে প্রতিনিয়ত শাসালেও উদগ্র বাসনা দিনদিন প্রবল থেকে প্রবলতর হয়। এমন যুক্তিও মনে হানা দিতে শুরু করে, বিয়ে করতে হলে পাত্রীতো দেখতেই হবে? সেই দেখাটা শিউলীকেই দেখিনা কেন ? অবশেষে তার সুপ্ত প্রেমিক মনেরই জয় হলো। একবিকেলে পরিকল্পনামতো সংগোপনে সে বাসায় ঢোকার সময় দেখে নেয় শিউলীকে। মানানসই সেলোয়ার কামিজের পাশাপাশি আকর্ষণীয় ওড়নায় মাথাঢাকা থাকলেও মিষ্টি মুখখানা চিনে নিতে একটুও কষ্ট হয়না। সুশ্রী মুখচ্ছবিটা যেন অন্তরে একদম আঁকা হয়ে যায়। এরপর অবশ্য একদিনমাত্র মুখোমুখি দেখা হয়  দু’জনার, সেও দৈব্যক্রমে। ইস্কুল থেকে ফেরার পথে মেসের গলিতে বাঁক নিতেই দেখে, সেই অনিন্দ্য সুন্দর মুখখানা। ওদের গেটের সামনের বড়রাস্তায় দাঁড়িয়ে রিক্সা বিদায় করছে। হঠাৎ চোখাচোখি আর মুচকী হাসির বিনিময় হয়ে যায় আরকি!

সময় থেমে থাকে না। বরং বছরখানেক যেন দ্রুত কেটে যায় শিক্ষকজীবনের। প্রতিমাসে লালমনিরহাটে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের দেখে আসে কায়েস। সাতবছর যাবত সে তাদের ভরন-পোষন করে। সে এক করুণ ইতিহাস। তখন সবেমাত্র পঞ্চমশ্রেণীর ছাত্র সে। মা’র অসুস্থতার অজুহাতে তার প্রিয়বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে বসেন। শীঘ্র অসুস্থ মা আরোগ্যলাভ করলেও সর্বনাশ যা হবার তা হয়েই যায়। সন্তানবাৎসল্য পিতার মতিগতির অস্বাবিক পরিবর্তন ঘটে। ফলে তাদের বিমাতার মন জুগিয়ে চলাছাড়া আর গত্যন্তর থাকেনা। অন্যথায় শারিরীক নির্যাতন কিংবা আরোপিত অনশন হয়ে দাঁড়ায় তাদের ভাগ্যলিপি। সৌভাগ্যবশত: প্রাথমিক ও জুনিয়রবৃত্তি পাওয়ায় এসএসসি র্পযন্ত পড়াশুনাটা স্বাচ্ছন্দে চালিয়ে নিলেও ইন্টারমিডিয়েটে এসে সব লণ্ডভণ্ড হয়। দুঃখিনী মায়ের বুকফাঁটা কান্নাও তাদের বিপর্যয়রোধ করতে পারে না। একতরফাভাবে জুদা করে দেয়া হয় তাদের । সুতরাং সমস্ত ভরন-পোষণের দায়ভার এসে চাপে জাগ্রতবিবেক কিশোর কায়েসের ঘাড়ে। তখন থেকে অবিরাম টিউশনী হয় তাদের বাঁচার একমাত্র অবলম্বন। পাশাপাশি ডাক্তারী পড়ার সপ্নসাধকে চিরবিসর্জন দিয়ে কোনমতে এমএ পাশের পর তাকে ছুটতে হয় যেনতেন একটা চাকরীর পেছনে।

download

চলতিমাসেও বেতন নিয়ে বাড়ী চলে যায় সে। দু’দিন পর আজই চলে আসে ভারাক্রান্ত মনে। মা’র খুব অসুখ, মরণাপন্ন অবস্থা। বহু টাকার দরকার। মা কি তবে বিনাচিকিৎসায় মরে যাবে- মনে তার কাঁন্নার প্রবল উচ্ছ্বাস! এ মুহুর্তে সোনালী-মধুর বিকেলটাকে কেন যেন মনে হয়, তার মায়েরই পান্ডুর মুখ। শিউলির মায়াভরা মুখ কিংবা মধুর স্মৃতিগুলোও ভাল্লাগে না আর। অতএব কাপড়চোপড় পাল্টিয়ে বের হয়ে পড়ে টাকার ধান্ধায়।

ঠিক এশার নামাজের পর মেসে ফেরে সে। অবসন্ন-ক্লান্ত দেহটা ঘুমাতে চায় কিন্তু ঘুমের বদলে রাজ্যের টেনশন তাকে কুরেকুরে খেতে থাকে। কাঙ্খিত অর্থের জোগার হয়নি এখনো। খুব ভোরে আরেকবার বেরোতেই হবে। চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে ভাবতে থাকে যতসব আকাশ-পাতাল। মাস্টার সাব, আছেন নাকি- রহিম চাচার ডাকে চিন্তার জাল সহসা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। ইনি শিউলীর আত্মীয়, বেশ রাশভারী লোক।

: চাচা আছি, আসেন ভেতরে আসেন, কায়েস ঝটপট স্বাভাবিক হয়ে সাড়া দেয়।

: কী ব্যাপার এত তাড়াতাড়ি এলেন যে এবার, বাড়ীর খবর ভালোতো?

: ইয়ে, মানে হ্যাঁ চাচা- কী বলবে জবাব খুজে পায়না সহসা।

: তা, জরুরী একটা ব্যাপারে এলাম। আপনিতো আবার ক্লান্ত- তিনি কথাপাড়ার মওকা খোঁজেন।

: না–বলুন অসুবিধে নেই, কথাকেড়ে নিয়ে সম্মতি দেয় কায়েস।

: তাহলে মেসে নয় বাইরে চলুন- এ প্রস্তাবে ঘাবড়ে যায় সে। কী বলবেন ইনি, কিসের জরুরী কথা? অনাহুত টেনশনে ঢিবঢিব করতে থাকে বুক। মুর্হুতে অন্যজগতে চলে যায় সে। এমনকি অসুস্থ মায়ের কাতরানীর কথাও ভুলে যায় সে, এ-ই তার দোষ। কেউ জরুরী কিছু বলার আভাস দিলেই হলো- না শোনা পর্যন্ত বুক দুরুদুরু বাড়তেই থাকবে। শিউলীর ব্যাপারে কোন অভিযোগ নয়তো- সন্দেহটা অন্তরে উঁকি দেয়ামাত্র একটা অপরাধবোধও জাগে তার মনে।

: কথা হলো কী, শিউলীর তো বিয়ের কথাবার্তা চলছে? আপনি, মানে শুনেছিলাম- আমতা আমতা করেন চাচা। কায়েসের নাড়ীর গতিও বেড়ে যায় যেন। হ্যাঁ, শুনেছিলাম শিউলী আপনার ব্যাপারে খুব আগ্রহী আর আপনিও নাকি অর্থাৎ আপনার মতামতটা আরকী- তার শেষকথায় মাটিতে মিশে যাবার অবস্থা কায়েসের। তবু নিজেকে সামাল দিয়ে দ্রুত একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। নাহ- এভাবে আর লুকোচুরি নয়। শিউলীর স্মৃতিগুলো এমূহুর্তে কেন যেন বিষের ফলার মতো বিঁধতে থাকে হৃদয়ে। এক্ষণে সবকিছু ছাপিয়ে মৃতপথাযাত্রী মায়ের ফ্যাকাশে মুখটাই আবার চোখের সামনে ভাসতে শুরু করে। হ্যাঁ- তাকে মায়ের মুখেই হাসিফোটাতে হবে আগে? প্রবল দ্বন্দ্বে পড়ে অথৈই সাগরে কিছুক্ষণ হাবুডুবু খায় সে

: কী মাস্টার, চুপ থাকলেন যে, কিছু বলেন- চাচার প্রশ্নে বাস্তবতায় ফিরে আসে আবার।

: জ্বী চাচা, আসলে কাউকে ভালোলাগাটা দোষের কিছু নয় বরং স্বাভাবিক। কিন্তু আমার অবস্থাতো জানেন, নিতান্ত বাধ্য হয়ে সামান্য বেতনের চাকরী করি। মানে, বুঝতে পারছেন বয়স হলেও বিয়ের কথা এখন ভাবছিনা। এতটুকু বলে কায়েস এমন একটা দূর্বোধ্য অথচ অস্ফুটহাসি ছড়িয়ে দেয়, যার মর্মোদ্ধার বড়ই কঠিন।

: এই কথা আপনার? রহিম চাচার কন্ঠে আহত বিস্ময়, বহুত ধন্যবাদ, খুশি হলাম শুনে- এ বলে যেন কিছুটা ঘৃণাচ্ছলেই হন্ হন্ করে চলে যান তিনি।

কখন ফজর নামাজ শেষ হয়েছে। লাল টুকটুক শাড়ীপড়া সূর্যটা সবেমাত্র পূর্বাকাশে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। আজ নিত্যদিনের চেয়ে একঘন্টা আগে নাস্তা আসার কথা। তীর্থের কাকের মতো তাই অপেক্ষায় আছে কায়েস। এক্ষুনি  টাকার খোঁজে বেরোতে হবে। অতপর ধরতে হবে আটটার বাস। চরম উৎকণ্ঠায় কাঁপছে যেন। এমন সময় কাজের লোক নাস্তা নিয়ে হাজির। ভূতদেখার মতোই চমকে ওঠে সে। আরে, ইনিতো নাস্তা দেননা কখনো- ! মনে পড়ে, প্রথমদিকে দু’একদিনমাত্র এ বৃদ্ধলোকটি খাবার নিয়ে এসেছেন। এরপর আর কোনদিন আসেননি।

: আজ হঠাৎ আপনি যে, সুমিরা কেউ নেই নাকি- অকস্মাৎ মুখ ফসকে বেরিয়ে যায় প্রশ্নটা। না বাহে, সগায় (সবাই) আছে, শিউলীই ওমাক (ওদের) আইসপার (আসতে) দিল না। ওমরা (ওরা) আর আইসপার (আসবে) নয় (না)। এ্যালা (এখন) থাকি মুই আসিম (আসবো)– বৃদ্ধ একটানে বলে যান কথাগুলো।

: কেন কী হয়েছে– তাজ্জ্বব বনে যায় যেন? ততক্ষণে মনেমনে কিছু একটা অাঁচও করতে পারে বোধ’য়।

: কী জানি বাপু(বাবা) কাইল আইত(রাত) থাকি শিউলী মা’র যে কী হইছে, কবার(বলতে) পাংনা(পারিনা)। মনটাও খুব খারাপ। আইতোৎ(রাতে) শুতি শুতি (শুয়েশুয়ে) কাঁনছেও(কেঁদেছেও) ম্যালা(অনেক)। আচ্ছা বাহে- মুই গেনু(গেলাম) বলে আর দাঁড়ান না তিনি। সংগে সংগে কায়েসের অন্তরটাও আহত বেদনায় মোচড় দিয়ে ওঠে। সেখানে বয়ে যায় প্রবল জলোচ্ছ্বাস এবং প্রচন্ড একটা ঝড়!! (সমাপ্ত)

আগের পর্ব পড়ুন 

১,৩১৬ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
৮০ দশকের কবি, ছড়াকার, গীতিকার বিশেষত; শিশুসাহিত্যিক। ৬টি প্রবন্ধ সংকলন, ৩টি গল্প সংকলন, ১টি শিশুতোষ ছড়াগ্রন্থ, ৭টি অডিও-ভিডিও এলবাম প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৭৭ সাল থেকেই বাংলাদেশ ও ভারতের পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি। ১৯৭৮ সালে তৎকালীন রেডিও বাংলাদেশ রংপুর কর্তৃক ‘‘উত্তরবঙ্গের শ্রেষ্ঠ ছড়াকার’’ হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। ১৯৮৬ সালে সিলেট ছড়া পরিষদ কর্তৃক ছড়ায় অবদান রাখার জন্য পুরস্কৃত। ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত জাতীয় বিভিন্ন দৈনিকে সাংবাদিকতাছাড়াও বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকা যেমন; লালমনিরহাট থেকে ত্রৈমাসিক চলমান, ত্রৈমাসিক ব্যতিক্রম, ত্রৈমাসিক দারুচিনি, ত্রৈমাসিক কিশোরকন্ঠ, ত্রৈমাসিক প্রজাপতিসহ (অধুনালুপ্ত) বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদক এবং লালমনিরহাটের প্রথম প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক জানাজানি’র প্রতিষ্ঠাতা সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন। শাহ আলমা বাদশা’র প্রকাশিত অডিও-ভিডিও এলবাম এবং গ্রন্থসমূহঃ ১। ভোরের পাখিরা [অডিও-ভিডিও এলবাম-১৯৮৯] ২। শিহরণ ১ ও ২ [অডিও এলবাম-১৯৯৩] ৩। শিহরণ ২ [অডিও এলবাম-১৯৯৩] ৪। প্রত্যয় [অডিও এলবাম-১৯৯৪] ৫। প্যারোডি গান [অডিও এলবাম-১৯৯৫] ৬। তথ্য পেলেন কাশেম চাচা [নাটিকার ডিভিডি-২০০১৪] ৭। তথ্য কমিশনের বিচারিক কার্যক্রম [প্রামাণ্যচিত্রের ডিভিডি-২০১৪] ৮। কিশোকন্ঠ গল্প সমগ্র-১ [যৌথ গল্পগ্রন্থ-২০০১] ৯। মা ও শিশু [যৌথ প্রবন্ধগ্রন্থ [১খণ্ড)-২০০৬] ১০। মা ও শিশু [যৌথ প্রবন্ধগ্রন্থ [২খণ্ড-২০০৭] ১১। মা ও শিশু [যৌথ প্রবন্ধগ্রন্থ [৩খণ্ড-২০০৮] ১২। মা ও শিশু [যৌথ প্রবন্ধগ্রন্থ [৪খণ্ড-২০০৯] ১৩। স্বপ্ন দিয়ে বোনা [যৌথ গল্পগ্রন্থ-২০১৩] ১৪। মুক্তিযুদ্ধ এবং অন্যান্য গল্প [যৌথ গল্পগ্রন্থ-২০১৫] ১৫। দুরছাই ধুত্তোরী ছাই [শিশুতোষ ছড়াগ্রন্থ-২০১৫] শাহ আলম বাদশা’র প্রকাশিতব্য গ্রন্থসমুহঃ ১। ইষ্টিপাখি মিষ্টিপাখি [শিশুতোষ ছড়াগ্রন্থ] ২। ষড়ঋতুর দেশে [শিশুতোষ ছড়াগ্রন্থ] ৩। লিন্তামনির চিন্তা [শিশুতোষ ছড়াগ্রন্থ] ৪। ফুল-পাখি-নদী [কিশোর কবিতাগ্রন্থ] ৫। ফুলবনে হই-চই [কিশোর উপন্যাস] ৬। সানিনে অভিযান [[কিশোর উপন্যাস] ৭। কালো মুরগি [শিশুতোষ গল্প] ৮। বেওয়ারিশ লাশ [শিশুতোষ গল্প] ৯। কবিকবি ভাব ছন্দের অভাব [ছন্দপ্রকরণ-প্রবন্ধগ্রন্থ] ১০। বাংলাবানান এবং শব্দগঠনঃ ভুল শুধু ভুল [প্রবন্ধগ্রন্থ] ১১। আমাদের মুসলমানিত্ব এবং কামড়াকামড়ির রকমফের তিনি বিসিএস তথ্য ক্যাডারের সদস্য এবং এলএলবি'র ছাত্র। তথ্যমন্ত্রণালয়ে কর্মরত। ফোনঃ ০১৮১৭১১৭৯২৯/০১৫৫২৩৪২৪৪৯ Website: http://mediamaster1.blogspot.com/
সর্বমোট পোস্ট: ৪৪ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ২২৫ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৫-২৬ ১৫:০৭:৪২ মিনিটে
Visit শাহ্‌ আলম বাদশা Website.
banner

২ টি মন্তব্য

  1. দীপঙ্কর বেরা মন্তব্যে বলেছেন:

    Besh
    porhlam
    bhalo laglo
    bhalo thakben

  2. শাহ্‌ আলম বাদশা মন্তব্যে বলেছেন:

    অনেক ধন্যবাদ

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top