Today 25 Sep 2022
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

সাদা কাগজে বৃষ্টির ফোটা

লিখেছেন: জুবায়ের হুসাইন | তারিখ: ২৪/০৮/২০১৩

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 932বার পড়া হয়েছে।

মাঝে মাঝে বোধহয় এমনই হয়। ভাবনাগুলো হয়ে যায় একেবারে সাদা কাগজের মতো। ভোতা ভোতা একটা অনুভূতি গ্রাস করে নেয় সমস্ত সত্তা। ফিকে হয়ে আসে সম্মুখের দৃশ্যগুলো।
মতিন সাহেব মাঝ বয়স ছাড়িয়ে যাওয়া একজন মানুষ। এই বয়সেই অনেকগুলো পোড় খেয়েছেন। সে কারণেই হয়তো মাথাভর্তি চুলগুলো সাদা ধবধবে হয়ে গেছে, শুকনো খড়খড়ে পাটের আঁশের মতোÑ মতিন সাহেবরা যেটাকে কুষ্টা বলেন। দাড়িতে এতবার ব্লেড চালিয়েছেন যে এখন আর তেমন একটা চুল বেড়ে উঠতে দেখা যায় না। মুখের চামড়াগুলো কেমন দোমড়ানো মতো। কপালে স্পষ্ট তিনটে ভাঁজ। ঘাড়েও ভাঁজ পড়ে, মাথা সোজা রাখলে। একটু লম্বাটে ধরনের মুখমণ্ডলটা। প্রথম সাক্ষাতেই যে কেউ বলবে একসময় সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন তিনি।
এলোমেলো পা ফেলে হাঁটছেন মতিন সাহেব। কোথায় যাচ্ছেন নিজেও জানেন না। আনমনেই ডান হাতের মধ্যমায় লাগানো বাদামী পাথরের আংটিটা বুড়ো আঙুল দিয়ে ঘুরিয়ে চলেছেন।
ব্যস্ত শহরের ততটাই ব্যস্ত রাস্তা। অনবরত ছুটে চলছে যাত্রীবাহী বাসগুলো। সাথে আছে প্রাইভেট কার। ছুটছে মানুষও। মানুষগুলো ছুটছে মনে হচ্ছে এই কারণে যে, দ্রুত গৃহে ফেরার জন্য পদব্রজে চলমান মানুষগুলো কে কাকে ওভারটেক করতে পারে তার যেন প্রতিযোগিতায় নেমেছে। ফুটপাতে চমৎকার একটা ভিড় লেগে থাকে অফিস ছুটির এই সময়টাতে। টেমপোরারি দোকানগুলো সাজিয়ে খদ্দের ডেকে চলেছে দোকানদাররা। একটা ভ্যানের ওপর সাদা পাঞ্জাবি ছড়িয়ে দু’জন বিক্রেতা অবিরাম হেঁকে চলেছে : ‘যা নেবেন- একশো, একদাম- একশো’ আর ফুটপাতে পলিথিন বিছিয়ে তাতে টি-শার্ট ছড়িয়ে অন্য দু’জনও একই আওয়াজ তুলেছে। তবে তাদের দামের পার্থক্য হলো হাফ অর্থাৎ পঞ্চাশ, ওদের ভাষায় ‘পঞ্চাশে’। কান ঝালাপালা অবস্থা। কিন্তু সেদিকে যেন কারোরই ভ্রƒক্ষেপ নেই। যার প্রয়োজন পড়ছে সে দাঁড়িয়ে কিনে নিচ্ছে।
এসব ছাড়িয়ে মেইন রাস্তায় চলে এলেন মতিন সাহেব। এখানেও ফুটপাতগুলো হকারদের দখলে চলে গেছে। এক জায়গায় তো কাঁচা বাজার মতো বসে গেছে। সুবিধায় হয়েছে অফিস ফেরত এই ব্যস্ত মানুষগুলোর জন্য। একবারে বাজার-সদায় করেই ফিরতে পারছে বাড়িতে-বাসায়।
মতিন সাহেব আজ কোনো দোকানের সামনে দাঁড়ালেন না, অন্যদিনের মতো দাম নিয়ে দু’পাঁচ কথাও বললেন না। আর দোকানদাররা আড়চোখে তাকালোও না তার দিকে। যে কয়জন চেনা দোকানি প্রতিদিনই তাকে দেখে অভ্যস্ত, তারা তো বেশ অবাকই হলো।
আসলে হয়েছে কি, মতিন সাহেব তার এই দীর্ঘ চাকরিজীবনে ছুটি-ছাটা খুব একটা নেননি। বছরের পাওনা ছুটির সিকিভাগও ভোগ করেননি কোনোবার। আজ সকালে অফিসে ঢোকার পর থেকেই মনটা কেমন পানসে হয়ে যায় তার, কোনো কারণ ছাড়াই। জোহরের ঠিক আগ দিয়ে বসকে বলে ছুটির কথা। অন্য একটা কথা বলতে গিয়ে মুখ দিয়ে দু’দিনের ছুটির কথা বেরিয়ে যায়। বস শুধু একবার মুখ তুলে তার দিকে তাকান। তারপর বলেন, ‘ঠিক আছে, অ্যাপ্লিকেশন দেন।’
মতিন সাহেবের দু’দিন ছুটি মঞ্জুর হয়েছে। কিন্তু কী করবেন তিনি ছুটির এই দু’দিন? গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার কোনো প্লান নেই। নেই পারিবারিক অন্য কোনো প্রোগ্রামও। তাছাড়া বুধ-বৃহস্পতি দু’দিন ছুটি নেয়া মানে শুক্র আর শনিবার ধরে মোট চারদিন অফিস করতে হবে না। কী করে কাটাবেন তিনি এই চার চারটি দিন?
‘প্যাঁ-অ্যা-অ্যা…’ করে একটা শব্দ হতেই চমকে উঠলেন মতিন সাহেব। তার পেছন দিয়ে ঠিক গা ঘেষে ছুটে গেল যাত্রী বোঝায় মিনিবাসটা। আরেকটু হলেই হয়তো তাকে কালো পিচের সাথে মিশিয়ে দিত যন্ত্রদানবটা। রোড ডিভাইডারের উপরে উঠে থমকে দাঁড়িয়ে থাকলেন পাক্কা দুই মিনিট। বুকের ধুকপুকুনিটা এখনও আছে। হঠাৎ করেই তেষ্টা পেয়ে বসল। গলা শুকিয়ে খসখস করছে, ঠিক সিরিষ কাগজের মতো।
পাশের একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে পড়লেন মতিন সাহেব। হাল-আমলের রেস্টুরেন্ট। আজকাল তো যে কেনো হোটেলকেই রেস্টুরেন্ট নাম দেয়া হচ্ছে। তার সাথে সাম্প্রতিক সংযোজন ‘ক্যাফে’। এসব নিয়ে একসময় তিনি আপত্তিও করতেন। যদিও সেটা নিজের কাছেই। এখন আর ওসবে মাথা ঘামান না। কোনো অস্বাভাবিক কিছু নজরে পড়লেও না দেখার ভান করেন। বরং বলা যায়, অনিয়ম আর অন্বাভাবিকতাগুলো দেখে সেগুলোতেই অভ্যস্ত হয়ে গেছেন।
এক কোনায় একটা টেবিল ফাঁকা পেয়ে তাতে বসে পড়লেন তিনি। বেয়ারা দু’গেলাস ঠাণ্ডা পানি দিল। ঢকঢক করে খেয়ে ফেললেন তিনি গোটা দুই গেলাসের পানিই। আহ্! বেশ আরাম বোধ হচ্ছে এখন। তবে পিপাসার পুরোটা মিটলো না। অন্যের বেলায় এমন হয় কি না তা জানেন না মতিন সাহেব, কিন্তু তিনি যতবারই ঠাণ্ডা পানি পান করেছেন, ততবারই তৃষ্ণা অপূর্ণ থেকে গেছে। পরে নতুন করে পানি পান করে তৃষ্ণা নিবারণ করতে হয়েছে।
মতিন সাহেব রাস্তার দিকে মুখ করে বসেছিলেন। সেদিকেই তাকিয়ে ছিলেন, কিন্তু দৃষ্টিতে নিরেট শূন্যতা। সবকিছুই দেখছেন, অথচ কিছুই মগজে আঁচড় কাটছে না।
‘স্যার, কী খাবেন?’
কিছুই শুনতে পেলেন না মতিন সাহেব। যেন তিনি এই পৃথিবীতে থেকেও অন্য কোনো জগতে চলে গেছেন, যেখানে গেলে এখানকার কোনো কিছুই কর্ণকূহরে প্রবেশ করার নিয়ম নেই।
আবারও জিজ্ঞেস করল বেয়ারা ছেলেটা, ‘স্যার, কী খাবেন?’
এবারও শুনতে পাননি তিনি। চেয়ারে মৃদু হেলান দিয়ে হাত দু’টো কোলের মধ্যে গুটিয়ে রেখে বাইরে শূন্য দৃষ্টি মেলে বসে আছেন। যেন শোকেসে সাজিয়ে রাখা পুতুল।
‘স্যার!’
এবার যেন কানের মধ্যে বিরক্তিকর কিছু একটা ঢুকল মতিন সাহেবের। ঘাড় ফিরিয়ে পাশে ঔৎসুক্য নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা হাস্যোজ্জ্বল ছেলেটার দিকে তাকাল এক পলক। তারপর চেয়ার ছেড়ে উঠে গটগট করে বেরিয়ে গেলেন। বেয়ারা ছেলেটা এতই অবাক হয়েছে যে পানির দামটা পর্যন্ত চাইতে পারল না। নিষ্পলক তার প্রস্থান পথের দিকে তাকিয়ে রইল।
রেস্টুরেন্ট থেকে বাইরে বেরিয়ে ডানে মোড় নিতেই পেছন থেকে কেউ একজন জড়িয়ে ধরল মতিন সাহেবকে। প্রথমটায় কিছুই বুঝে উঠতে পারলেন না তিনি। নিজেকে ছাড়িয়ে নিতেও চেষ্টা করলেন না কোনো। মুহূর্ত কয়েক পর ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকালেন। ততক্ষণে পেছনের লোকটা মতিন সাহেবের সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। হাসি এ-কান ও-কান ছাড়িয়ে গেছে তার। বিপরীতক্রমে মতিন সাহেব ততটাই নিরুত্তাপ।
‘কেমন আছিস দোস্ত?’ মুখে একগাল হাসি ছড়িয়েই জিজ্ঞেস করলেন লোকটি।
‘দোস্ত! মানে? আবার তুই তুই করে বলছে। কে লোকটা?’ নিজেকেই যেন বললেন মতিন সাহেব, মনে মনে।
‘কি রে, আমাকে চিনতে পারছিস না?’ মতিন সাহেবকে নিরুত্তর এবং নিরুত্তাপ দেখে আবারও বললেন লোকটি। ‘আরে আমি, আমি হাবিব, তোর হবি!’
তবুও চিনতে পারলেন না মতিন সাহেব। আসলে আজ কী এক অজানা রোগে যেন তাকে পেয়ে বসেছে।
‘এই মতি,’ হাবিব সাহেব এবার অবাকই হলেন। মুখের হাসি মিলিয়ে গেছে নিমিষেই। ‘সত্যিই তুই আমাকে চিনতে পারছিস না?’
মৃদুভাবে এপাশ ওপাশ মাথা নাড়লেন মতিন সাহেব।
‘সত্যিই চিনতে পারছিস না আমাকে?’
এবার আগের চেয়ে একটু বেশি করে উপর-নিচ মাথা নাড়লেন মতিন সাহেব। মুখে বললেন, অস্ফুট উচ্চারণের মতো, ‘হবি! ফ্রেন্ড হবি!’
হাসিটা আবারও ফিরে এলো হাবিব সাহেবের চেহারায়। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন একটা। বললেন, ‘যাক, চিনতে পেরেছিস শেষ পর্যন্ত। কিন্তু এ কী হাল হয়েছে তোর! মাথার চুল তো একেবারেই সাদা হয়ে গেছে, কুষ্টার ফেঁসোর (পাটের আঁশ) মতো।’
মতিন সাহেবের দিনটাই আজ যেহেতু অন্যভাবে শুরু হয়েছে, তাই এক্ষণে অন্যরকমই অনুভূত হলো তার কাছে। তিনি পিছিয়ে গেলেন অনেক বছর পেছনে। তখন তিনি সবে কৈশোরের মাঝামাঝি। থাকেন গ্রামে। নিজেদের জমিতে ফসলের চাষ করেন আব্বা মোসলেম উদ্দিন। মূলত ধান আর পাট পর্যায়ক্রমে চাষ হতো সেসময়। এ দু’টোই ছিল তখন প্রধান ফসল। পাটের মৌসুমে জমিতে পাটের বীজ বপন থেকে শুরু করে পাট কাটা পর্যন্ত আব্বাকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করতেন তিনি। আব্বা নিজ হাতেই সব করতেন। কোনো কোনো সময় পেরে না উঠলে পেটে-ভাতে একজন জোন নিতেন। সকালে-দুপুরে আব্বা আর ওই জোনের জন্য খাবার নিয়ে মাঠে যেতেন তিনি। পাটক্ষেতে নিড়ানি দিতেন আব্বা। খাবার এলে আঁইলের উপর বসে তা খেয়ে নিতেন। ছেলের সাথে সুখ-দুঃখের অনেক কথা বলতেন। মতিন সাহেব তখন আব্বার বেশিরভাগ কথাই বুঝতেন না। পরে অবশ্য আব্বার বলা সে কথাগুলো অনেক কাজে লেগেছে। জীবনে চলার পরতে পরতে আব্বার সাথের স্মৃতিগুলো হাতড়ে অনেক উপাদান নিংড়ে নিয়েছেন।
লক লক করে পাটের গাছগুলো বেড়ে উঠতে থাকে। চিকন লম্বা গাছের মাথার দিকে সবুজ পাতা, দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। একদিন সেই সবুজ পাতায় ধূসর রং ধারণ করে। ঝরেও পড়তে থাকে। তখন শুরু হয় কাস্তে দিয়ে গোড়া থেকে পাটগাছগুলো কাটা। আব্বার সাথে তিনিও কেটেছেন পাটগাছ। খুবই কষ্টের কাজ। তবুও তৃপ্তি পেয়েছেন তিনি, যখন আব্বা তার ঘর্মাক্ত শরীর নিজের দেহের সাথে জড়িয়ে ধরে ঘামে ভেজা কপালে স্নেহের চুমু এঁকে দিয়েছেন। একটু আগের কান্তিগুলো কোথায় মিলিয়ে গেছে তখন!
নদীটা তাদের জমি থেকে একটু দূরেই ছিল। ছোট ছোট চার-পাঁচটি আঁটি (যাকে তারা মুটো বলতেন) একত্র করে অপেক্ষাকৃত দুর্বল কোনো পাটগাছ দিয়ে বেধে আরেকটি বড় আঁটি তৈরি করা হয়। তারপর সেগুলোকে বয়ে নেয়া হয় নদীর পাড়ে। কখনও কখনও অন্যের গরুর গাড়ি চেয়ে নিয়ে তাতে করেও পাটগাছগুলো বয়ে এনেছেন নদীর পাড়ে। তারপর কোমর সমান পানিতে সেগুলো সুন্দরভাবে সাজিয়ে তার উপর মাটির চাং ও কলাগাছ দিয়ে ঢেকে জাগ তৈরি করা হয়েছে। অন্য গাছের পাতাপুতিও ব্যবহার করা হয়েছে। নদীতে স্রোত না থাকায় সেগুলো ভেসে যাওয়ারও কোনো সম্ভাবনা ছিল না। আব্বা মাঝে মাঝে দেখে এসেছেন পাটগাছগুলো পচতে শুরু করেছে কি না। কিছুদিনের মধ্যে ওগুলো পচে গেলে আব্বা পানিতে দাঁড়িয়েই কুষ্টা ধোওয়া শুরু করেছেন, অর্থাৎ পাটগাছ থেকে আঁশগুলো ছাড়ানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। তখনও খাবার নিয়ে গেছেন তিনি। ছায়ায় দাঁড়িয়ে-বসে দেখেছেন আব্বার কাজ। নিজেও পানিতে নেমে গেছেন। আব্বা জোর করে উঠিয়ে দিয়েছেন ডাঙায়।
আব্বা খুব কর্মঠ ছিলেন। প্রচুর কাজ করতে পারতেন তিনি। এতবড় সংসারটাকে তিনিই তো সুন্দরভাবে বাঁচিয়ে রেখেছেন! এতটুকু কষ্ট কাউকে সজ্ঞানে পেতে দেননি। তারপরও সংসারে অভাব-অনটনের কমতি ছিল না। কিন্তু সেগুলোর সাথে পরিবারটি মানিয়ে গিয়েছিল। মোসলেম উদ্দিনের সন্তানেরা অল্পতেই তুষ্ত ছিল। কখনও আব্বাকে এটা চায় ওটা চায় বলে বেদনা দেয়নি।
মতিন সাহেবের অন্য ভাইবোনরা ছোট হওয়ায় তাকেই বেশি কাজ করতে হতো। এতে তিনি কখনও এতটুকু কান্তি অনুভব করেননি। বরং মনের মধ্যে এক প্রকার নির্ভেজাল সুখ বয়ে বেরিয়েছেন। সাহিত্যিক ইব্রাহিম খাঁ’র ‘জোঁক’ গল্পটি তখন তাদের কাসে পড়ানো হতো। সে সময় কিন্তু তিনি গল্পের অর্থ ততটা বুঝতে পারতেন না। কেবল পরীক্ষার খাতায় লিখতে হতো বলে কিছু বিষয় মুখস্থ করতেন। পরে বুঝেছেন, যদিও আব্বাকে তেমন কোনো জোঁকের পাল্লায় পড়তে হয়নি কখনও, তারপরও জোঁককে তিনি চরম ভয় পেতেন। একবার তো পায়ের আঙুলে একটা রোগাটে জোঁক দেখেই প্রায় অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। আর একটা বিষয় তখন তাকে বেশ ঘেন্নায় ফেলে দিত। পাটক্ষেত আর তার আশপাশে বহুদূর পর্যন্ত শুঁয়োপোকারা হেঁটে বেড়াতো। গা-টা কেমন ঘিনঘিন করতো তখন। কুষ্টার শাক ছিল মোসলেম উদ্দিনের প্রিয় সবজি। অন্য ভাইবোনরাও পছন্দ করতো। কিন্তু মতিন সাহেব ওটা দিয়ে ভাত খেতে বসলেই নাক সিটকে রাখতেনÑ এই বুঝি বেরিয়ে এলো একটা শুঁয়োপোকা! কিন্তু কখনোই তেমনটা হয়নি।
যাক, পাটের আঁশ ছাড়িয়ে পানিতে ভালো করে ধুয়ে উঠানে আড়ার উপর শুকাতে দেয়া হতো। আর সাদা পাটকাঠিগুলোকে গোল করে সুন্দর ভঙ্গিতে দাঁড় করিয়ে রেখে সেগুলোও রোদে শুকানো হতো। পাটকাঠিগুলো শুকিয়ে গেলে তার গায়ে জড়িয়ে থাকা আঁশের অবশিষ্টাংশগুলো সংগ্রহ করা হতো আবার। সেগুলোকে বলা হতো ‘ফেঁসো’। এগুলো মাটির ঘর লেপা, হাড়ি-পাতিল ডলে পরিষ্কার করা ও অন্যান্য গৃহস্থালি কাজে ব্যবহার করা হতো।
হাবিব সাহেব সেই কুষ্টার ফেঁসোর কথা উঠাতেই এতগুলো ঘটনা আজ চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে ভেসে উঠল মতিন সাহেবের। সত্যিই কি তার মাথার চুল সাদা ধবধবে কুষ্টার ফেঁসোর মতো হয়ে গেছে? হতে পারে। আয়নাতে তো এখন আর চেহারাটা সেভাবে দেখাই হয় না। সময় কই? ব্যস্ত শহরের তিনিও তো একজন ব্যস্ত বাসিন্দা!
ততক্ষণে তারা একটা চায়ের দোকানে বসে এক কাপ করে চা-ও খেয়ে নিয়েছেন। মতিন সাহেব চা খেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তার মধ্যেই এই স্মৃতিগুলো থেকে ঘুরে এসেছেন।
‘এবার বল, তোর খবর কী?’ জানতে চাইলেন হাবিব সাহেব।
মতিন সাহেবের দৃষ্টিতে এখনও নিরুত্তাপ। কেমন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকালেন বন্ধুর দিকে।
‘এই মতি, কী হয়েছে তোর বল তো? সেই থেকে কেমন ঝোঁম (ঝিঁম) মেরে আছিস। এতক্ষণে একটা কথাও বলিসনি।’ বন্ধুকে জোরে ঝাঁকি দিয়ে কথাগুলো বললেন হাবিব সাহেব।
‘তুই আমাদের হবি তো!’ চেহারায় রং ফিরে এলেও এখনও যেন ঘোরের মধ্যে আছেন মতিন সাহেব।
‘মানে!’ যার পরনাই অবাক হলেন হাবিব সাহেব। এক্ষণে কেমন সন্দেহও লাগতে লাগল তার, তার পাশে বসা লোকটা তারই বন্ধু মতিন তো, না অন্য কেউ? ‘তুই, তুই…’ আর কোনো কথা জোগালো না তার কণ্ঠে।
হঠাৎ হাবিব সাহেবকে জড়িয়ে ধরলেন মতিন সাহেব। তারপর ডুকরে কেঁদে উঠলেন। অল্পক্ষণেই তার অশ্রুতে ভিজে গেল হাবিব সাহেবের শার্টের বুকের কাছটা।
হাবিব সাহেব কিছুই বুঝতে পারলেন না। কিন্তু কেন জানি বন্ধুকে জোরে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরলেন। চোখ জোড়াও সজল হয়ে উঠছে তার।
সামনে রাস্তায় বড় বড় ফোটায় বৃষ্টি পড়তে লাগল এই সময়।

= ঃ =

১,০১৭ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
লেখালেখি শুরু সেই ছোটবেলা থেকে। ১৯৯৪ সালে একটি জাতীয় সাপ্তাহিকে প্রথম লেখা ছাপা হয়। লেখাটি ছিল একটি ছোটগল্প। মূলত গল্প ও উপন্যাস লিখতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করি। তবে ছড়া, কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ প্রভৃতিও লিখে থাকি। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক পত্রিকায় নিয়মিতই আমার লেখা ছাপা হয়। আমি মূলত শিশু-কিশোরদের জন্য লিখতে বেশি স্বাচ্ছন্ন বোধ করি। বড়দের জন্যও কম লিখি না। মৌলিক বিষয়ের উপর লিখতে ভালো লাগে। গতানুগতিক কিছুই ভালো লাগে না। চেষ্টা করি ব্যতিক্রম কিছু সৃষ্টি করতে।
সর্বমোট পোস্ট: ৬ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ৯ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৬-০৪ ১৩:৫২:১৫ মিনিটে
banner

৩ টি মন্তব্য

  1. তাপসকিরণ রায় মন্তব্যে বলেছেন:

    কাহিনী অতি সাধারণ–কিন্তু আপনার লেখার গুণে তা হয়ে উঠেছে অসাধারণ।আপনাকে ধন্যবাদ।

  2. আমির হোসেন মন্তব্যে বলেছেন:

    অসাধারণ একটি জীবনের গল্প পড়লাম। ভাল থাকবেন আপনি।

  3. এ হুসাইন মিন্টু মন্তব্যে বলেছেন:

    অনেক ভালো লাগল, গল্প পড়ে ।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top