Today 08 Aug 2022
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

দিবসহীনদের গল্প, ওরফে চেঙ্গু

লিখেছেন: এ হুসাইন মিন্টু | তারিখ: ০৪/০৭/২০১৩

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 1444বার পড়া হয়েছে।

আমি এখন যে গল্পটি বলব, সেটা নিছক কোনো গল্প নয় । যে জীবনকে ঘিরে প্রতিদিন তৈরী হয় অসংখ্য গল্প, সেই জীবনেরই কয়েক মূহুর্তের কথা । সদ্য গত হওয়া বাবা দিবসে আমি বাড়িতে ছিলাম । আমাদের বাড়ি থেকে চার বাড়ি পেছনে নসিবুদ্দিনের বাড়ি । বাড়ি তো নয় যেন এক ঝুঁপড়ি । মাটির সেঁতসেঁতে দেওযাল, ধানের খড় দিয়ে ছাওয়া ঘরের চাল, এতেই ওদের কষ্টের দিনাতিপাত । ঘর বলতে নসিবুদ্দিনের বাড়িতে এই একটিই । দুই সন্তান, স্ত্রীসহ নসিবুদ্দিনের পরিবারের সদস্য সংখ্যা চারজন । ছোট সন্তান মর্জিনার বয়স চার বছর । বড় সন্তান মতিউর রহমানের বয়স আট বছর । বড়ই অভাবের সংসার নসিবুদ্দিনের । নসিবুদ্দিনের বয়স যখন পনেরো কি ষোল, তখন গ্রামে এসে ছিল মহামারি কলেরা । সেই মহামারিতে নসিবুদ্দিনের দুই ভাই ও বাবা মা গত । সেই থেকেই নসিবুদ্দিন একেলা । জমিজমা বলতে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া আট শতাংশ জমির উপর ভিটে বাড়ি খান । নসিবুদ্দিনের স্ত্রী বানেছা বেগম পাশের গ্রামের এক দিন মজুরের ঘরের মেয়ে বলে, স্বামীর সাথে সংসার কর্ম করতে অথবা পাশের বাড়িতে ভাড়া ভানতেও অসুবিধে হয় না তার । বুঝমান হবার পর থেকে নসিবুদ্দিনও পরের বাড়িতেই চুক্তি কাজ করত । জৈষ্ঠ, অগ্রাহায়ন মাস তথা ধান কাটা সিজন এলেই নসিবুদ্দিন বাইক আর কাস্তে নিয়ে চলে যেত টাঙ্গাইলের সখিপুর কিংবা পাহাড়ী এলাকায়, যেখানে মাইনে বেশি পাওয়া যায় ।

আমাদের এখান থেকে সখিপুরের দূরত্ব কত হবে ? নসিবুদ্দিনের বাড়ি থেকে মাইল চারেক হেটে বা ভ্যান রিকশা করে সাগরদিঘী, তারপর সাগরদিঘী থেকে সখিপুরের বাস ভাড়া নয় টাকা । এমনি এক জৈষ্ঠ মাসের শুরুতে কাজের উদ্দেশ্যে নসিবুদ্দিন রওনা হয়ে ছিল সখিপুরে । নয় টাকার ভাড়া পাঁচ টাকায় চুক্তি হওয়ায় বাসের কন্টেক্টর কামলাদেরকে জায়গা দিয়ে ছিল বাসের ছাদে । নসিবুদ্দিন হাউশ করে বাসের ছাদের রেলিং-এর উপর দিয়ে পা ঝুলিয়ে বসে ছিল বাম দিকে মুখ করে । নসিব দোষে কাঁঠাল গাছের ডালের সাথে বাড়ি লেগে ভেঙ্গে গিয়ে ছিল নসিবুদ্দিনের বাম পা । সেই থেকে নসিবুদ্দিন অচল । কত চিকিত্সা করাল পা আর ভালো হল না । প্রথমে কবিরাজি, এই গাছের বাকল, ঐ গাছের পাতা । পরে ডাক্তারি, প্রথমে থানা শহর, পরে জেলা শহর, অবশেষে ঢাকা । নসিবুদ্দিনের পুঁজি বলতে ছিল দুই হাত, পা, আর আট শতাংশ জমির উপরে ভিটে বাড়িখান । অচল পা-এর চিকিত্সা করাতে ভিটে বাড়ির আট শতাংশ থেকে পাঁচ শতাংশ জমিও বিক্রি করতে হয়ে ছিল নসিবুদ্দিনকে । তবুও পা ভালো হল না, অবশেষে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী হাটু পর্যন্ত পা কেটে ফেলে দিলো । পঙ্গু নসিবুদ্দিনও জীবন যুদ্ধের কাছে হার মানে নি, মানলে চলে না । পঙ্গু হয়েছে পা, পেট তো নয় । পেটের আহার চাই-ই চাই । নিজের চাই, সন্তানের চাই, স্ত্রী-র চাই ।

 

নসিবুদ্দিনের আট বছর বয়সী ছেলে মতিউর রহমান, অনাহারে অর্ধাহারে থাকতে থাকতে বুকের হাড় বেরিয়ে পড়েছে, হাত পা শুকিয়ে লেঁকলেঁকে হয়ে চুড়াই পাখির মতো দেখায় বলে আশেপাশের সাবই ওকে চেঙ্গু বলেই ডাকে । চেঙ্গু নামে আপত্তিও নেই ওর, দিব্যি সাড়া দেয় হেসে হেসে । চেঙ্গুর মা বানেছা বেগম মানুষের বাঁশের ঝোঁপ থেকে কঁঞ্চি কেটে আনে । সেই কঁঞ্চি দিয়ে চেঙ্গুর বাবা নসিবুদ্দিন খাঁচা ও টোকরী বুনে । চেঙ্গু সেই খাঁচা, টোকরী বাজারে বিক্রি করে সংসার চালায় । যে বয়সে হাতে থাকবে খাতা, কলম, বই, নসিব দোষে সেই বয়সেই হাতে খাঁচা নিয়ে চেঙ্গু দাড়িয়ে থাকে বাজারের গলিতে ।

 

বাবা দিবসের দিন বিকেল থেকেই আমাদের এলাকায় থেকে থেকে বৃষ্টি হচ্ছিল । আমি বাজারে গিয়ে আটকে পড়ে ছিলাম চায়ের দোকানে । রাত আটটার পর বৃষ্টি হঠাত থেমে আকাশ কিছুটা পরিষ্কার হয়ে এল । এই ফাঁকেই আমি রওনা দিলাম বাড়ির দিকে । বাজার থেকে বের হয়ে সামান্য এগুনোর পর আবছা আধারে পাশ দিয়ে একজনকে যেতে দেখেই জিজ্ঞাস করলমা, কে, চেঙ্গু না ?

আমার পাশে থেকে কোমল কন্ঠটি বলল, জে ।

চেঙ্গু মাথায় একটি খাঁচা, খাঁচার মধ্যে একটি পিলিথিনের ব্যাগে কী যেন আরো । আমি জিজ্ঞাস করলাম, চেঙ্গু তোর বাবার শরীর কেমন ?

চেঙ্গু বলল, জে ভালাই ।

আমরা দুইজন কথা বলতে বলতে হেটে চলছি । চেঙ্গু নিজে থেকে কিছু বলছে না । আমি জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিচ্ছে । মাথায় বোঝা নিয়েও চেঙ্গু আমার চেয়ে দ্রুত গতিতেই পা ফেলছে । খানিক পর আমি ফের জিজ্ঞাস করলাম, তোর মাথায় কি ?

চেঙ্গু বলল, খাঁচা । খাঁচার মধ্যে চাইল আর নোণ ।

আমি বললাম, তোর বাবার জন্য বাজার থেকে কিছু আনিস নি ?

চেঙ্গু সহজ স্বরে বলল, বাজানের লাইগা আবার কী আনমু ?

আমি বললাম, আজ যে বাবা দিবস, জানিস ?

চেঙ্গু আবারো সহজ ভঙ্গিতেই বলল, হেইডা আবার কি ?

আমি সংক্ষেপে অর্থাত যেভাবে চেঙ্গুকে বুঝানো সহজ সেভাবেই বললাম, আজকের দিনে সব সন্তানেরাই বাবাদের সাথে সময় কাটায়, বাবাকে শুভেচ্ছা জানায়, পারলে উপহার দেয় ।

চেঙ্গু বলল, আমি আবার বাজানরে কী উপহার দিমু ? দুইদিন ধইরা বৃষ্টি, কইঞ্চা কাটবার পাই না বইলা বাজান খাঁচা বানাইতে পারে না । যাও বা দুইডা বানাইছিল বৃষ্টির লাইগা বাজারে একটার বেশি বেচবার পারি নাই । মায় কইছিল, চাইল আনতে, মাছ আনতে, পেয়াজ আনতে । আমি খালি চাইল, নোণ আর মরিচ লইয়া আইছি । আর বাজান রে উপহার দিলেও নিবো না । হে তো ঈদের মধ্যেও নতুন জামা কাপড় কিনে না ।

আমি বিস্মিত স্বরে জিজ্ঞাস করলাম, ঈদের মধ্যেও কিনে না, কেন ?

চেঙ্গুর সরল স্বীকারোক্তি, কিনব কেম্নে, খাঁচা বেইচা যা অয়, তা দিয়া তো মর্জিনা আর আমারই অয় না, আবার মা-র লাইগাও কিনতে অয় ।

আমি আর কিচ্ছু বলি নি । আমার পা কেমন যেন অসাড় আসছিল । কিছুক্ষণ পর চেঙ্গু চলে গেল নিজের বাড়ি, আমি চলে এলাম আমাদের বাড়িতে । সারা রাত ঘুম হল না । আজকের এই সময়ে এসে সন্তান তার বাবাকে মোবাইলে মেসেজ করে, ফোন করে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে, গিফটের সমাহারও কম না । রেডিও, টেলিভিশন, পত্রিকা, ব্লগ, ফেইসবুক, ইন্টারনেট, সর্বত্র বাবা দিবসের জয়গান । কেউ কেউ আবার সাজানো গল্প লিখে নিজের বাবাকে সম্রাট শাহজাহান বানিয়ে ফেলছে । কিন্তু এই দেশে এখনো নসিবুদ্দিনের মতো অসংখ্য হতভাগা বাবা, আর চেঙ্গুর মতো অসংখ্য অসহায় সন্তান আছে, যারা জানেই না দিবস কি ? আমরা কি এদের কথা একবার ভেবেছি ? এরা কি আমাদেরই অংশ না, আমরা কি পারব নিজেদের অস্তিত্ব থেকে পালিয়ে বেড়াতে, বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে, পারলেও কতদিন ?

 

১,৫৬৬ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
পুঁজিবাদের এই জমানায় কলম আমার পুঁজি চেনা মানুষের ভিড়ে আমি অচেনা মুখ খোঁজি,, কলমে ভর করে দাড়ানোর প্রচেষ্টায় রত এক শব্দ শ্রমিক । লেখকের প্রকাশিত বইসমূহঃ- কাব্যগ্রন্থ-জীবন নদীতে খরা উপন্যাস-অশ্রু, নরক ও প্রচ্ছায়া ।
সর্বমোট পোস্ট: ৯৮ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ১২৫০ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৬-২৬ ১২:২৭:৩১ মিনিটে
banner

১৮ টি মন্তব্য

  1. আরিফুর রহমান মন্তব্যে বলেছেন:

    ঠিকই বলেছেন ভাই, গল্পটা শুনে আমার ও খুব খারাপ লাগল। আসলে আমরা সবাইত বাবা দিবসে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন পোস্ট করে থাকি। কিন্তু আমাদের পেছনে যে কত গল্প রয়েছে তা আমরা কেউ ভাবার চেষ্টা করি না। আপনাকে সালাম এবং ধন্যবাদ। শুভেচ্ছা রইল। নিয়মিত লিখবেন। আপনার গল্প আমার খুব ভালো লাগে। ভালো থাকবেন।

  2. তৌহিদ উল্ল্যাহ শাকিল মন্তব্যে বলেছেন:

    বেশ ভালো লিখেছেন।জীবন এমনি ? আপনার লেখার হাত ভাল । নিয়মিত লিখবেন আশা রাখি।

  3. আরিফুর রহমান মন্তব্যে বলেছেন:

    চিরায়ত গল্প তাতে কি হয়েছে। খুব ভাল হয়েছে। ধন্যবাদ।

  4. কাউছার আলম মন্তব্যে বলেছেন:

    খুব ভাল হয়েছে। ধন্যবাদ।

  5. এ হুসাইন মিন্টু মন্তব্যে বলেছেন:

    সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা ।

  6. শাহ্‌ আলম শেখ শান্ত মন্তব্যে বলেছেন:

    পাকা হাতে গল্প লেখা সুন্দর তো হবেই ।

  7. আরজু মন্তব্যে বলেছেন:

    এই দেশে এখনো নসিবুদ্দিনের মতো অসংখ্য হতভাগা বাবা, আর চেঙ্গুর মতো অসংখ্য অসহায় সন্তান আছে, যারা জানেই না দিবস কি ? আমরা কি এদের কথা একবার ভেবেছি ? এরা কি আমাদেরই অংশ না, আমরা কি পারব নিজেদের অস্তিত্ব থেকে পালিয়ে বেড়াতে, বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে, পারলেও কতদিন ?

    বাহ মানবিক গল্প।বাবা দিবসের জন্য যথার্থ গল্প।ধন্যবাদ এবং শুভকামনা।

  8. এই মেঘ এই রোদ্দুর মন্তব্যে বলেছেন:

    সুন্দর গল্প

    ভাল লাগল

  9. সবুজ আহমেদ কক্স মন্তব্যে বলেছেন:

    বেশ সুন্দর গল্প

    ভালো লাগলো পড়ে

    থাকলো শুভ কামনা
    শুভ সন্ধ্যা

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top