Today 01 Dec 2022
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

দৈন্য স্মৃতি

লিখেছেন: তাপসকিরণ রায় | তারিখ: ১৩/০৯/২০১৩

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 1499বার পড়া হয়েছে।

সে বার মেট্রিক পরীক্ষায় পাস করলাম। বন্ধুরা মিলে ঠিক করলাম কলোনিতে আলাদা করে পূজা করব। সরস্বতী পূজা। কারো আপত্তির কিছু থাকবে না–কারণ সরস্বতী পূজা তো বাড়ি বাড়ির পূজা–এক কলোনিতে একাধিক পূজা হবে–এতে বলার কি থাকতে পারে !

বড় পূজা না হলেও একটু জাঁকজমক তো করতে হবে–নিয়মিত যে পূজা হয় তার চে বেশী কিছু হলে লোকের চোখে পড়বে। আমরা প্রশংসাও পাব।

আগে থেকে পূজার প্রোগ্রাম ছাপিয়ে বিলি করে দেওয়া হল ঘরে ঘরে। না, চাঁদা তখন চাওয়া হল না। সবাই অন্তত জানুক আমাদের আলাদা একটা পূজার আয়োজন তোড়জোড় করে চলছে। আর জানার পরে চাঁদা তুলতে গেলে বেশী কথা খরচ করতে হবে না–কেবল বলতে হবে, আমাদের প্রোগ্রাম পেয়েছেন তো?–ওই যে নব নিবেদিতা সঙ্ঘের পূজা–।তারপরও দরকার হলে আমাদের হাতে রাখা প্রোগ্রামের স্যাম্পল  দেখিয়ে দিলেই হবে। ব্যাপারটাও তাই হল, চাঁদা তুলতে আমাদের বেশী বেগ পেতে হল না–তবে ছোট কলোনি, আশা করার মত চাঁদা উঠবে কোত্থেকে ?

আমাদের সঙ্ঘের মেম্বার দশ বার জন–ভোলা, শ্যামল, মনোজ, দুলাল, এমনি সব বন্ধুরা। আমরা ওই কজন মেম্বার মিলেই, নব নিবেদিতা সঙ্ঘ, গঠন করেছি। আমাদের মেম্বারদের মধ্যে আবার শিল্পীও রয়েছে—মৃৎ শিল্পী–মাটির মূর্তি তৈরি করতে পারে। না, ওরা নিয়মিত কিছু বানায় না–কখনো কখনো নিজেদের ঘরের লক্ষ্মী, সরস্বতীর মূর্তি বানিয়ে থাকে।

আমরা সঙ্ঘের কম খরচের দিকে নজর রেখে ঠিক করলাম, ওই দুই শিল্পী দিয়ে দুটো সরস্বতী মূর্তি তৈরি করাবো। কেবল রং তুলি কাঠামোর পয়সা খরচ করলেই চলে যাবে। আর যে মূর্তি বেশী সুন্দর হবে সে মূর্তি সঙ্ঘের পূজার জন্যে রাখব। অন্যটা আমি নিয়ে যাবো আমার স্কুলের পূজার জন্যে। আমি তখন একটা গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতা করতাম। আমাদের কলোনি থেকে সে গ্রামের দূরত্ব ছিল প্রায় এগার কিলোমিটার।

যে হেতু আমিই ছিলাম একমাত্র রোজগেরে ছেলে, সে জন্যে আমিই সঙ্ঘের হর্তা কর্তা ছিলাম। মূর্তি তৈরির প্রস্তাব আমিই পেশ করে ছিলাম–হ্যাঁ তা খোলা মন নিয়েই করেছিলাম। আর খোলা মন নিয়ে বন্ধুরাও তা সমর্থন করে ছিল। শিল্পী দ্বয় আমাদের প্রস্তাব সানন্দে গ্রহণ করে ছিল। উভয় শিল্পীর মধ্যে একটা প্রতিযোগিতার মত চলবে এবং যে জন্যে সুন্দরতর মূর্তি দ্বয় তৈরি হবে–এটাও আমাদের মনে হয়েছিল।

যথা সময়ে ভোলা ও শ্যামল, আমাদের সদস্য বন্ধু শিল্পী, তৈরি করল দুটো সুন্দর সরস্বতী মূর্তি। এবার নির্বাচনের পালা। সঙ্ঘের সব বন্ধুরা মিলে মূর্তি নির্বাচনে গেলাম। প্রথমে ভোলার তৈরি মূর্তি দেখলাম। সুন্দর মূর্তি–তবে বড় সাদামাটা ধাঁচের তৈরি–সচরাচর আমরা যেমনটা প্যান্ডেলে দেখে থাকি আর কি ! এবার শ্যামলের বানানো প্রতিমা দেখতে গেলাম। শ্যামল তখন শেষ তুলির টান দিতে ব্যস্ত ছিল। ও খুব সুন্দর প্রতিমা বানিয়েছে। বড় একটা শঙ্খ, তারই মাঝখানের ফাঁকা জাগায় বসে আছেন সরস্বতী মা।  কারুকার্যময় কাজ–অনেকটা অজন্তা ইলোরার আর্টের কথা মনে করিয়ে দেয়। আমরা সবাই এক বাক্যে সেই সুন্দর কারুকাজের মূর্তির প্রশংসা না করে পারলাম না। অগত্যা বলা বাহুল্য, আমরা সঙ্ঘের পূজার স্থাপনার জন্যে শ্যামলের তৈরি প্রতিমাকে নির্বাচন করলাম। আমাদের সঙ্গে ভোলাও ছিল। ভোলাকে জিজ্ঞেস করে ছিলাম, কি রে তোর কি মনে হয়?

সে সময় ও বিষণ্ণ হয়ে বলে ছিল, তোরা দেখ।

এক সময় ভোলা স্বীকার করে নিয়ে ছিল যে শ্যামলের তৈরি মূর্তি তার বানানো মূর্তি থেকে সুন্দরতর হয়েছে। বেশী কিছু তখন ভাববার অবকাশ আমাদের ছিল না, তা অল্প বয়সের জন্যে হোক কিম্বা নতুন সঙ্ঘের প্রথম পূজার আনন্দে মাতোয়ারা থাকার জন্যে হোক। স্মৃতি থেকে ছুটে এসে বর্তমানের ভবনায় যদি ফিরে আসি তবে বলতে হয়, সে দিন ভালো করে ভোলাকে আমরা লক্ষ্য করিনি। তার ম্লান হয়ে যাওয়া মুখটা আমাদের কারো চোখে ধরা পড়েনি। ভালো করে তার দিকে তাকালে হয় তো দেখতে পেতাম, তার মুখে দুঃখের স্পষ্ট ছাপটা ! তার নিজের হাতে তৈরি প্রতিমায় সেইই তো মাটি ছেনে, কাঠামো বানিয়ে, মাটির প্রলেপে ধীরে ধীরে ফুটিয়ে তুলে ছিল তার প্রাণ প্রতিম সরস্বতী মাকে !

আমি সানন্দে ভোলার তৈরি প্রতিমা স্কুলের পূজার প্যান্ডেলে নিয়ে গেলাম। প্রতিমা ভোলাদের বাড়ি থেকে গাড়িতে তুলে নেবার সময় আমরা একবারও ভোলার মুখের দিকে তাকাই নি। যদি তাকাতাম তবে নিশ্চয় দেখতে পেতাম, ভোলার করুণ দুটি ছল ছল চোখ ! ওর মা, বাব, ভাই, বোনেরা তো তখন ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসেছিল—ওদের সবার মুখ কি তখন হাসিখুশি, আনন্দময় ছিল ? সাধারণ ভাবে এমনটা তো হবার কথা ছিল না।

যাই হোক, ধুমধাম করে অনেক আনন্দের ভিতর দিয়ে আমাদের পূজা হয়ে গেল। প্যাডেলে নাটক হল। ভোলা, শ্যামল–আমরা সবাই নাটকে অভিনয় করলাম। আনন্দে আমরা হয়ে উঠে ছিলাম আত্মহারা !

আজ সে সব দিনের স্মৃতি মনের কাছে এসে ভিড় করে। সে দিন বন্ধু ভোলার মনটা আমি কতটুকু বুঝতে পেরেছিলাম? বয়সের উচ্ছ্বাস উন্মাদনায় তার মনের মাঝে উঁকি দিয়ে দেখার বয়স ও গাম্ভীর্য কি তখন আমাদের মনে ছিল ? আজ পরিণত, পোক্ত বয়সে বারবার ভোলার মুখটা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। মনে হচ্ছিল, সে দিন ভোলা তার ঘরের এক কোণে আঁধারে বসে বারবার বুঝি তার চোখ মুছে নিচ্ছিল!

সমাপ্ত

 

১,৬০৪ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
নাম :তাপসকিরণ রায়। পিতার নাম : স্বর্গীয় শৈলেশ চন্দ্র রায়। জন্ম স্থান: ঢাকা , বাংলা দেশ। জন্ম তারিখ:১৫ই এপ্রিল,১৯৫০. অর্থশাস্ত্রে এম.এ.ও বি.এড. পাস করি। বর্তমানে বিভিন্ন পত্র পত্রিকাতে নিয়মিত লিখছি। কোলকাতা থেকে আমার প্রকাশিত বইগুলির নামঃ (১) চৈত্রের নগ্নতায় বাঁশির আলাপ (কাব্যগ্রন্থ) (২) তবু বগলে তোমার বুনো ঘ্রাণ (কাব্যগ্রন্থ) (৩) গোপাল ও অন্য গোপালেরা (শিশু ও কিশোর গল্প সঙ্কলন) (৪) রাতের ভূত ও ভূতুড়ে গল্প (ভৌতিক গল্প সঙ্কলন) (৫) গুলাবী তার নাম (গল্প সঙ্কলন)
সর্বমোট পোস্ট: ১১২ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ১৬৬৯ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৮-১১ ১৫:৪৩:৫৪ মিনিটে
banner

১১ টি মন্তব্য

  1. শাহ্‌ আলম শেখ শান্ত মন্তব্যে বলেছেন:

    কাকা , শৈশবের স্মৃতি কথা বেশ সুন্দর করেছেন তো ।

  2. এম, এ, কাশেম মন্তব্যে বলেছেন:

    দারুন অভিব্যাক্তি
    ভালো লেগেছে

  3. আলমগির সরকার লিটন মন্তব্যে বলেছেন:

    দাদা

    শৈশবের কথা মনে পরে গেল

    অভিনন্দন–

  4. তুষার আহসান মন্তব্যে বলেছেন:

    “ভালো করে তার দিকে তাকালে হয় তো দেখতে পেতাম, তার মুখে দুঃখের স্পষ্ট ছাপটা ! তার নিজের হাতে তৈরি প্রতিমায় সেইই তো মাটি ছেনে, কাঠামো বানিয়ে, মাটির প্রলেপে ধীরে ধীরে ফুটিয়ে তুলে ছিল তার প্রাণ প্রতিম সরস্বতী মাকে !”

    আমরা পেছন ফিরে দেখলে,এমন অনেক কিছু চোখে পড়ে যায়।

    ভাল লাগল স্মৃতিকথা।

  5. তাপসকিরণ রায় মন্তব্যে বলেছেন:

    আমার স্মৃতিকথা ভাল লেগেছে জেনে আনন্দিত হলাম।অনেক ধন্যবাদ রইল।

  6. আমির হোসেন মন্তব্যে বলেছেন:

    গল্পতো দারুন হয়েছে দাদা।

  7. তাপসকিরণ রায় মন্তব্যে বলেছেন:

    মন্তব্যের জন্যে অনেক ধন্যবাদ।

  8. সবুজ আহমেদ কক্স মন্তব্যে বলেছেন:

    চমৎকার স্মৃতি কথা জীবনগাথাঁ
    বেশ ভালো ভাবনার প্রয়াস
    বেশ সুন্দর
    শুভ কামনা থাকলো

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top