Today 28 Sep 2021
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

ধারাবাহিক উপন্যাস “নিয়োগ পত্র” – চতুর্দশ পর্ব

লিখেছেন: মিলন বনিক | তারিখ: ২৫/১১/২০১৩

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 980বার পড়া হয়েছে।

চতুর্দশ পর্ব
(পনের)
এখন জ্যেষ্ঠ মাস। তিমির ক’দিনের জন্য বাড়ী এসেছে। এতক্ষন পর্যন্ত বাবার পাশে বসতে হয়েছে। ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস পড়ছিল জগদীশ বাবুর। ধীরে ধীরে জিজ্ঞাসা করছিল-ঢাকায় যে পরীক্ষা দিতে গেলি তার কি হলো।
– কোন খবর পায়নি বাবা।
– এক কাজ করলে কেমন হয়।
– কি কাজ বাবা।
– আমাদের পূর্ব পাড়ার সুধারামের ছেলে যতীন নাকি বড় চাকরী করে। একবার দেখা করলে কেমন হয়।
– দেখা করেছি বাবা। বললো চেষ্টা করবে।
– কোন একটা স্কুলে চেষ্টা করলে কেমন হয়।
– কিন্তু পাচ্ছি কোথায়। প্রায় স্কুলে শিক্ষকরা আগে থেকে অনারারি এপয়েন্টমেন্ট নিয়ে বসে থাকে। বিনা বেতনে মাসের পর মাস যায়। তারপর একসময় বিজ্ঞাপন দিয়ে পারমেনেন্ট করে নেয়।
শম্পা ঘুমাতে যাচ্ছিল। চুপি চুপি এসে বললো-দাদা খুব সকালে আম কুড়াতে যাবো। তুমি যাবে ?
– যাবো। আমাকে ডেকে নিবি কিন্তু।
– ঠিক আছে।
অনেক্ষন চুপ থেকে বললো-
– বাবা আমি ভাবছি যতদিন চাকরির বয়স আছে দেখি চেষ্টা করে। নয়তো কোন মুদীর দোকানে গিয়ে বসবো। জগদীশ বাবু নিরুত্তর। ছেলের মনের অবস্থা বুঝতে পেরে সান্তনা দিলেন। ধৈর্য্য ধর বাবা। ভগবানের কৃপায় সব হয়ে যাবে। ঠাকুরের উপর বিশ্বাস রাখ।
অনেক রাত হয়েছে। আকাশে দ্বাদশীর চাঁদ উঠেছে। সিঁদুরে গাছের আমগুলো চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। চিক চিক করছে টকটকে লাল আমগুলো। এর মধ্যে টিনের চালে কয়েকটা আম পরেছে। কুড়াতে ইচ্ছা করছে না। সকালে শম্পাকে নিয়ে একসাথে কুড়ানো যাবে। বাড়ী আসার পর মা ঝুড়ি ভর্তি আম বের করে দিয়েছে। বাবা পাশে বসে দেখিয়ে দিচ্ছে কোনটা কোন গাছের আম। সেই সাথে আম গাছের সংক্ষিপ্ত বর্ননা। কোনটা মিষ্টি, কোনটা টক। কোন গাছটা কখন কিভাবে লাগিয়েছে। কিভাবে আমের বিচি পকেটে করে কোথা থেকে এনেছে। এসব। এত খাওয়ার পরও মায়ের তৃপ্তি হয়নি। বলল-এই আমটা খেয়ে দেখ। আমি কুড়িয়ে পেয়েছি। তিমির ভাবছে সংসারী মানুষ বুঝি এমনই হয়।
জগদীশ বাবুর আম গাছের প্রতি এক বিশেষ দুর্বলতা ছিল। যেখানেই ভালো আম খেতেন বোটাটা পকেটে করে নিয়ে আসতেন। বাড়ী এসে সেটা রোপন করে পরিচর্যা করতেন। আজও বেশ গর্ব করে বলছিলেন-এই আমটা খেয়ে দেখ। এটা বার্মার মংডু থেকে এনেছি। রাংগুই আম। তখন রেঙ্গুনে ছিলাম। আসার সময় মংডুর এক গাছতলায় কুড়িয়ে পেয়েছি। বেশ মিষ্টি। একদম পোকা নেই। প্রথম দিকে অনেক বড় হত। ফজলি আমের মত। ইদানীং সাইজটা ছোট হয়ে আসছে।
এবার অনেকদিন পর বাড়ী আসা হয়েছে। পরিবর্তনও হয়েছে অনেক। শম্পার জন্য নতুন জামা, অপুর জন্য জামা জুতো, বাবার জন্য ধূতি পাজ্ঞাবী, মায়ের জন্য শাড়ী সব দেখে বাড়ীর সবাই অবাক। ভেবেছে নতুন চাকরীর মাইনে পেয়েছে বোধ হয়। মা খুব খুশী। শম্পা যে কতবার তিমিরের মুখে আদর করে চুমু খেয়েছে তার হিসাব নেই। জগদীশ বাবু শুধু পাংশু মুখে জিজ্ঞাসা করেছিল-তনু তোর চাকরি হয়েছে বুঝি।
– না বাবা।
– তবে এতসব কি করে আনলি।
– টিউশানির টাকা থেকে কিছু কিছু সঞ্চয় করেছি। তাছাড়া শুধু চাকরির আশায় বসে থেকে লাভ কি। কিছু না কিছু একটা তো করতে হবে।
– দেখিস বাবা, এই কিছু করতে গিয়ে যেন জীবনের গতি হারিয়ে না ফেলিস। আজকাল ভালো মানুষের বড়ই অভাব।
– বাবা, ভালো মানুষ যারা তারা সমাজে অচল। কোন রকমে ঘরকুনো অবস্থায় দু’টো খেয়ে পরে বেঁচে আছে।
জগদীশ বাবু বিশ্বাস করতে পারছেন না ভালো মানুষদের এই দুর্দশা। নিজেও বোধ হয় একজন মানুষ। এখনও ভালো মানুষ হয়ে উঠতে পারেন নি। তাই মাঝে মাঝে কষ্ট পেতে হয়। খুব ছোট খাট বিষয়েও অনেক বড় কথা মুখ বুজে সহ্য করতে হয়।
পৃথিবীর তাবৎ ভালো মানুষগুলো বোধ হয় প্রথমতঃ নিজের সংসারেই বেশী মূল্যহীন। কারন সংসার যা চাই জগদীশ বাবুরা তার সবটুকু দিতে না পারলেও অন্তরে একটা গভীর অনুশোচনা থাকে। মনে হয় এই বুঝি আমার দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু দিতে পারিনি। আর যারা পেতে চাই তাদের কাছে অনুশোচনা মানে ভালো মানুষের ভন্ডামি। তাই মুখগহ্বরের সজাগ ইন্দ্রিয়গুলো প্রতিনিয়ত বিষবারি বর্ষন করে। মনের তৃষ্ণা মেটায়। কেন পাওয়া হয়নি এই যেন বিরাট পরিতাপের বিষয়। এক্ষেত্রে জগদীশ বাবুরা অত্যন্ত দুঃখের সহিত সর্বশেষ উক্তিটা করে যান। এই বলে যে, কোন জন্মে কি পাপ করেছি জানি না। নয়তো এত দুঃখ কেন। এই সংসারে বাস করার চেয়ে বনে জঙ্গলে গিয়ে বাস করা অনেক ভালো।
তিমিরের নিজের পোষাকেও অনেকটা বৈচিত্র এসেছে। আগে যা পরে পথ চলতো তাতে নিজেকে অন্য সবার চেয়ে ছোট মনে হতো। কারন যুগের সাথে তা বেমানান। এবারের নতুন পোষাক একেবারে যুগোপযোগী। অপু দেখা মাত্রই বায়না ধরেছ্-েদাদা আমাকে তোমার মত একটা জিন্স প্যান্ট কিনে দিও। আচ্ছা দেবো বলে তিমির অপুর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
তিমির ঘুমিয়ে আছে। শম্পা চুপি চুপি কানের কাছে গিয়ে ফিস ফিস করে বলছে-দাদা আম কুড়াতে উঠ। এক্ষুনি সব আম ওপাড়ার ছেলেরা কুড়িয়ে নিয়ে যাবে। তিমির ঘুমের ঘোরে কাৎ হয়ে শুতেই শম্পা গায়ে হাত দিয়ে জোড়ে ধাক্কা দেয়। জিজ্ঞাসা করে-কে?
– আমি। শম্পা চুপি চুপি কথা বলছে। পাছে বাবা শুনতে পায়।
– এত রাতে আম কুড়াতে যাবি।
– ও মা। রাত কোথায়। এইতো ভোর হয়ে এলো। তোমরা শহরে থাকতো, তাই দিনের অর্ধেকটা সময় রাত বলে মনে হয়।
তিমির নিরুপায়। কাঁধে গামছাটা নিয়ে বেরিয়ে পরে। শম্পার হাতে একটা চটের থলে। বাইরে তখনও আলো ফুটেনি। পূব আকাশটা আংশিক রক্তিম হয়ে উঠছে। শীত শীত লাগছে গায়ে। যদিও গ্রীষ্ম কাল। সকালের ঠান্ডাটা বেশ মোলায়েম। শম্পা বললো-
– আগে চলো, মৌ পুকুরের আমগুলো কুড়িয়ে নিয়ে আসি। নয়তো ও বাড়ীর ছেলেরা সব শেষ করে দেবে। ওই ছেলেগুলো যা বাঁদর। দিন দুপুরে গাছ তলায় ওৎ পেতে থাকে।
– সে কি রে।
– হ্যাঁ দাদা। কি সাংঘাতিক ছেলে। ও বাড়ীতে তো একটাও আম গাছ নেয়।
– তবে তো ভালোই। শোন-গাছের ফুল ফল, নদীর জল, পাখির গান এগুলো কারও একার নয়। সবারই কিছু কিছু অংশ থাকে।
– তাহলে ওরা আমাকে দেখে ভেংচি কাটে কেন। বলে কিনা, আমের মালিক যাচ্ছো কোথায়, আম খাবো যে আমরা সবাই।
– খুব ভালো বলে তো।
– তুমিও বুঝি ওদের দলে? রাগ করে শম্পা।
– না রে। ওদের দলে যাবো কেন। তুই তো আমার বোন।
– বোন না ছাই। তুমি ওদের শাষন করতে পারো না।
– ঠিক আছে। আচ্ছা করে বকে দেবো। তুই ওদের নামটা বল।
– ঐ যে, ঝন্টু, কাকলী, রমেশ সবাই।
চারদিকটা ধীরে ধীরে ফর্সা হয়ে আসছে। অনেকগুলো ঝড়া পাতা। ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নানা জাতের আম। ল্যংরা, ট্যারা, সিঁদুরে আরও কত জাতের আম। এ অপার্থিব আনন্দ কতদিন উপভোগ করা হয়নি। সেই ছেলেবেলায় ফিরে যায় তিমির। কত ছোট ব্যাপারেও যে এত দুর্লভ আনন্দ লুকিয়ে আছে। এ শুধু আত্মোপলব্দিতেই পরিমাপ করা সম্ভব। আলতো করে জড়িয়ে ধরে শম্পাকে। আদর করে বলে আমিও একদিন তোর মত ছিলাম রে। এখনও তোর মত থাকতে পারলে ভালো হতো। অথচ তা কেউ পারে না। তুইও যখন বড় হবি, তখন তোরও অনেক পরিবর্তন আসবে। তখন এসব আর ভালো লাগবে না। শম্পার চোখে মুখে বিস্ময়। সে বিশ্বাস করতে পারছে না তার আম কুড়ানোয় কখনও আনন্দের কমতি হবে। অথচ সময়টা কত দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।
চলবে………………..

১,০৫০ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
একজন চাকরিজীবি। অবসরে লেখালেখি। সামাজিক দায়বদ্ধতাও আছে অনেকটা। তারই মধ্যে কিছু বিচ্ছিন্ন ভাবনার যোগফল এই প্রচেষ্টা। ভ্রমন, বই পড়া, গান শোনা প্রিয় শখগুলোর অন্যতম। আপনাদের ভালো লাগা, মন্দ লাগা, পরামর্শ, গঠনমূলক সমালোচনা সবই মন্তব্য হিসাবে পেতে ভালো লাগে। মন্তব্য পেলে আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবো অনেক বেশী।
সর্বমোট পোস্ট: ৭০ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ৬৯১ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৫-২৮ ০৩:৪৬:৩৪ মিনিটে
banner

৫ টি মন্তব্য

  1. আমির হোসেন মন্তব্যে বলেছেন:

    পড়লাম। সাথে আছি।

  2. আরজু মন্তব্যে বলেছেন:

    কত ছোট ব্যাপারেও যে এত দুর্লভ আনন্দ লুকিয়ে থাকে।সত্যি ছোট ছোট এরকম অনেক জিনিস থেকে আনন্দ পেতে পরি।ভাল লাগছে উপন্যাসটি পড়তে।

    ধন্যবাদ আপনাকে চমৎকার লেখাটির জন্য।

  3. শাহ্‌ আলম শেখ শান্ত মন্তব্যে বলেছেন:

    সাথেই আছি ।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top