Today 28 Sep 2021
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

ধারাবাহিক উপন্যাস “নিয়োগ পত্র” (তৃতীয় পর্ব)

লিখেছেন: মিলন বনিক | তারিখ: ০২/০৯/২০১৩

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 1079বার পড়া হয়েছে।

তৃতীয় পর্ব
(চার)
দরজায় টোকা দিতেই ভিতর থেকে দরজা খুলে দেয় অনন্ত দা। গলা খেকিয়ে বলল-
–    ও এসেছেন তাহলে। এজন্য বলি আমাকে বিদায় করে দাও। এতসব ঝামেলা আমার সইবে না বাবা। এই বলে রাখলাম। আরে বাবা এটা ব্যাচেলর কোয়াটার। যাদেও বউ নেয় এখানে কেবল তারা আসবে। মেয়েরা আসবে কেন। তাও আবার মিষ্টি, ফুলের তোড়া। না না এসব আমি সহ্য করব না। আমি কালই যাচ্ছি।
–    আঃ অনন্ত দা। কি হয়েছে বলবে তো। সেই কখন থেকে খালি বক বক করে যাচ্ছো।
অনন্ত দা গম্ভীর। মুখে হাসি নেই। বলল-
–    ব্যাচেলর বাসায় মেয়ে মানুষ এসেছে।
–    বিবাহিত না অবিবাহিত?
–    সে আমি কি করে বলব। শাঁখা সিঁদুর তো দেখলাম না। তাছাড়া আজকাল যে যুগ পরেছে তাতে বিবাহিত না অবিবাহিত বুঝা মুশকিল।
বিদ্যুৎ নেয়। তিমির জামাটা খুলে হাত পাখাটা নিয়ে বলল,
–    তাতে দোষের কি। এসেছে তো কি হয়েছে। তুমি সেই কবে থেকে বক বক করে যাচ্ছো। একি মিষ্টির প্যাকেট আবার রজনীগন্ধার তোড়া। ওই মেয়েটা এনেছে বুঝি।
–    তবে আর বলছি কি। সময়ের শুভ সুচনা হয়েছে।
–    অনন্ত দা। ডাকল তিমির।
–    বলো।
–    ক্ষিদেয় পেট জ্বলছে। থাকলে কিছু দাও, নয়তো আবার বেরোচ্ছি।
–    ইস্। তাইতো। সারাদিন কোথায় ছিলে। মুখটাও শুকিয়ে গেছে। আমিও কেবল বক বক করে যাচ্ছি। আমার এ বেশী কথা বলার স্বভাবটা গেল না।
–    ও মা, পাঁচটা বাজে। আমি গেলাম।
–    সে কি। এই দিচ্ছি। । অনন্ত বেড়ে রাখা ভাতের থালাটা তিমিরের হাতে দেয়। চৌকির উপর বসে বসে পরে তিমির।
–    কখন ফিরবে বলে অনন্ত জলের গ্লাসটা এগিয়ে দেয়।
–    জানি না।
–    আমি জানি।
–    তার মানে।
–    রাত বারোটা। প্রতিদিন যেমন হয়।
হাসে তিমির। অনন্ত প্রায়ই বলে। আমার এত বিশ্রাম। কোন কাজ নেয়। তিমিরের চাকরী নেয়। কাজ শুধু চাকরীর পেছনে দৌড়ানো। তাতে এতটুকু অবসর নেয়। টিউশনি আর চাকরী খোঁজা। কাজের কাজ এই যা।
বাসা বলতে আবছার কলোনীতে ছোট এক কামরার একটা ঘর। ঘরের ভিতর রান্না। একটা পাবলিক টিউব ওয়েল সাথে বাথরুম, গোসলখানা । সকালে দীর্ঘ লাইন। মোট ঘরের সংখ্যা ষোল। দুপাশে আটটা করে ঘর। মাঝখানে চার ফুট চওড়া রাস্তা। টিনের চালা। টিনের সাথে লাগানো বাশেঁর চাটাই কিংবা বেড়া কোনটাই নেয়। যাতে গরমটা একটু কম লাগে। ভাড়া পাঁচশো।
ষোলটা ঘরে বত্রিশ জন ব্যাচেলর। রাতের বেলা মাঝে মধ্যে সংখ্যা বেড়ে দাড়ায় জনা পঞ্চাশ ষাট। সবাই বেকার। কেউ কারো বন্ধু, কারো আত্মীয়। কোন না কোন কাজে আসা। অতিথি পাখির মত। কাজ শেষ হলে আবার ফিরে যায়। হয়তো আবার আসে। কোন ইন্টারভিউ কিংবা কারো পরীক্ষা। কিংবা কারো ডাক্তার দেখানো।
এখানে যারা আছে তারা অনেকেই নিম্ম মধ্যবিত্ত শ্রেনীর। সাধারন জীবন ধারায় বিশ্বাসী। পরিবারের উপর খুব বেশী নির্ভরশীল হওয়ার সুযোগ নেয়। প্রায় সবার পরিবারে কম বেশী টানা পোড়েন। কোন কোন সময় কারও বাবা বা বড় ভাই এসে কিছু ঘরের চাল, গরুর দুধ, টাটকা সব্জী, গাছের ফল দিয়ে যায়। যার জন্যই আসুক না কেন একটা ভাগ সাবার জন্য থাকে। শুধু চালটার ভাগ হয় না। ওটা ধারে দেওয়া হয়। গৃহীনিদের নুন, মরিচ, তেল, পেঁয়াজ এর মত।
প্রায় সকলের পেশা টিউশনি। কেউ ছাত্র, কেউ বা পরীক্ষার্থী, অধিকাংশ বেকার। চাকরী খোাঁজাখুজিঁ চলছে। দিনের বেলা সাধারনত কেউ থাকে না। গরমের দিন হলে তো কথায় নেয়। প্রয়োজনে কোন চা দোকানে বসে সময় কাটাবে। তবুও এই টিনের চালের গরমে সিদ্ধ হতে নারাজ। রাত বাড়ার সাথে সাথে কোলাহল বাড়তে থাকে। চলতে থাকে অনেক রাত পর্যন্ত। পরস্পর পরস্পরের কত আপন হয়ে উঠে। খালি গায়ে গামছা কিংবা তোয়ালেটা কাঁধে জড়িয়ে দরজায় বসলেই মুখোমুখি হয়ে যায় সবাই।
আসবাব পত্র কিংবা সাজ সজ্জা বলতে সবার প্রায় একই। দুটো সিংগেল রেডিমেড কাঠ। দাম দেড়শো থেকে দুশো। একটা কাঠের টেবিল এবং চেয়ার। বাশেঁর শেল্প। কোনটা পাল্লা দেওয়া। কোনটা খোলা। দরকারী জিনিষপত্র রাখার একমাত্র সম্বল। ঘরের এক কোণায় কারও ষ্টোভ, কারও ইলেকট্রিক হিটার। আশে পাশে দু’একটা হাড়ি পাতিল। সৌখিন জিনিষের মধ্যে দু’তিন জনের বাসায় ফ্যান আছে।
চৌকির তলা গুলো যেন পঁচা মালের গুদাম। ভ্যাপসা গন্ধ।
তিমিরের বিছানার মাথার উপর দু’টো ছবি। রবীন্দ্রনাথ আর নজরুল। ধুলোবালি পরে ঝুল জমে গেছে। পরিষ্কার করা হয়না অনেকদিন। এলামেলো কাপড় চোপড়, বেডশীট, বালিশ সব গুছিয়ে রাখে অনন্ত দা।
অনন্তদা কথা বলল। বুঝলে ভাই, ঐ মেয়েটার কথা বলছি। ভাগ্যিস দুপুরে তেমন কেউ ছিল না। পরীক্ষায় পাশ করেছে ভালো কথা। মিষ্টি না হয় এনেছো। তাই বলে এত টাকা খরচ করে ঐ ফুলগুলো আনার কি দরকার ছিল। থাকলে কি। কথায় বলে না—–।
–    অনন্ত দা। থামিয়ে দিয়ে বলল তিমির।
–    বলো।
–    ভাতগুলো খুব খড় খড়ে হয়ে গেছে।
–    হবে না। সেই কবে রান্না হয়েছে। একটু ডাল দেবো।
–    না। কে এসেছিল বললে না তো।
অনন্ত খুশী হয়। এক গ্লাস জল গিলে মুখের পাশ দিয়ে গড়িয়ে পরা জলটা লুঙ্গির খোঁচা দিয়ে মুছে নিয়ে বলল-তোমার ছাত্রী। নামটা কি যেন বলল। দাড়াও একটু ভেবে নিই।
–    আজ তো মেট্রিকের রেজাল্ট দিয়েছে। শেলী তো পরীক্ষা দিয়েছে।
–    হ্যাঁ, হ্যাঁ শেলী। কি সুন্দও চেহারা। আমি তো ভেবেছিলাম—-
–    কি ভেবেছিলে।
–    না ভাবছিলাম। আবার কোন বিপদে পরলাম না তো।
–    আচ্ছা অনন্ত দা।
–    কি।
–    তোমার এত ভয় কিসের।
–    না এমনি।
–    ও আমার ছাত্রী। এবার মেট্রিক পাশ করেছে।
–    ও বলেছে। খুব ভালো মেয়ে। ফাষ্ট ডিভিশন পেয়েছে। তোমার অনেক প্রশংসা করেছে। তুমি না থাকলে নাকি ওর পাশ করায় হতো না।
–    শেলী বাড়িয়ে বলেছে। আমি টাকার বিনিময়ে ওকে পড়িয়েছি মাত্র।
–    অনেক্ষন অপেক্ষা করেছিল। আমি খেয়ে যেতে বলছিলাম। খায়নি। বলল ক্ষিদে নেয়।
–    ভালো করেছো। ওরা অনেক বড় লোক। আমাদের এই দু’দিনের বাসি ডাল আর ডিম সেদ্ধ দিয়ে ওদের পেট ভরবে না। আর কিছু বলেছে।
ভাত শুদ্ধ থালায় জল ঢেলে দিয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে পা তুলে বসল তিমির। একটা সিগারেট বের করল। অনন্ত ষ্টোভের উপর থেকে দিয়াশলাইটা এনে দিয়ে বলল-
–    বলেছে তুমি যেন কালকের মধ্যে একবার যাও।
তিমির সিগারেট জ্বালায়। অনন্ত কিছুক্ষন থেমে আবার বলল,
–    -না গেলে কষ্ট পাবে।
–    কি করে বুঝলে।
–    বারে, আমি বুঝব না। এমনিতে তোমার দেখা না পেয়ে বেচারী মন খারাপ করেছে। ও হ্যাঁ, আর পাঁচশোটা টাকা দিয়ে গেছে। এক মাসের মাইনে নাকি বাকী ছিল। তোমার বিছানার নীচে আছে।

এক মাসের টাকা! তিমির মনে করতে পারে না। যাক্ ভালোই হলো। মাসের শেষ। পকেটও খালি। তিমির সিগারেটে জোড়ে একটা টান দেয়। রজনীগন্ধার তোড়াটা তুলে নেয় হাতে। বিড় বিড় করে নিজের মনে বলছে-শেলী তুমি মিছেমিছি ছুটছো। তোমাকে আমার সাবধান করা উচিত। কিন্তু পারছি না। তুমি ব্যর্থ হলেও প্রাচুর্যের আড়ালে তা হারিয়ে যাবে। আমার ব্যর্থতা কোন দিন মুছবে না। আমি দূরে সরে থাকতে চাই। তুমি ভূল বুঝনা। আমার পৃথিবীটা বড় নির্মম।
কি সব আবোল তাবোল ভাবছি। কই অনন্ত দা। মিষ্টি দাও। যত খুশী মিষ্টি খাও। আর শোন, সন্ধ্যার পরে সবাই আসলে কলোনীর সবাইকে মিষ্টি খাওয়াবে। আর এই নাও বাজার থেকে একটা ইলিশ মাছ  আর তাজা কাঁকড়ল নিয়ে এসো। কতদিন ইলিশ খাওয়া হয়নি।
আমি বের হলাম। আর এই তোড়াটায় একটু জলের ছিটা দিও। কয়েকদিন তাজা থাকবে। আর গন্ধও ছড়াবে বেশ।
–    আচ্ছা। রাতে তাড়া তাড়ি ফিরবে তো। আমি কিন্তু অত রাত পর্যন্ত জেগে থাকতে পারবো না।
–    জেগে থাকতে কে বললো তোমাকে। সবাইতো তো জেগে থাকে। তুমি না হয় ঘুমিয়ে পরো। বুঝলে অনন্ত দা এ পৃথিবীতে বেকারের মত ব্যস্ততা কারও নেয়।
তিমির সিগারেটের শেষ অংশটা পায়ে পিষে শার্টটা গায়ে দিয়ে বেরিয়ে পরে। অনন্ত তাকিয়ে থাকে। আর বলে-পাগল, তোমার এ জীবন আমার আর সহ্য হয় না। আমার খুব কষ্ট হয় তুমি যখন হাসো। এভাবে নিজেকে আর কতদিন লুকিয়ে রাখবে।
চলবে……

১,১৩৯ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
একজন চাকরিজীবি। অবসরে লেখালেখি। সামাজিক দায়বদ্ধতাও আছে অনেকটা। তারই মধ্যে কিছু বিচ্ছিন্ন ভাবনার যোগফল এই প্রচেষ্টা। ভ্রমন, বই পড়া, গান শোনা প্রিয় শখগুলোর অন্যতম। আপনাদের ভালো লাগা, মন্দ লাগা, পরামর্শ, গঠনমূলক সমালোচনা সবই মন্তব্য হিসাবে পেতে ভালো লাগে। মন্তব্য পেলে আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবো অনেক বেশী।
সর্বমোট পোস্ট: ৭০ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ৬৯১ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৫-২৮ ০৩:৪৬:৩৪ মিনিটে
banner

৪ টি মন্তব্য

  1. এম, এ, কাশেম মন্তব্যে বলেছেন:

    খুবই ভালো লেগেছে

  2. আমির হোসেন মন্তব্যে বলেছেন:

    পড়ে নিলাম। ভালই লিখছেন।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top