Today 05 Feb 2023
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

নরক (পোস্ট২)

লিখেছেন: এ হুসাইন মিন্টু | তারিখ: ২৮/০৬/২০১৩

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 1236বার পড়া হয়েছে।

(গতকালের পর)

আমার মা যদি ইচ্ছা করতেন সারা জীবন পা থেকে জুতা খোলবেন না, পারতেন। চাকর বাকর রেখে রাজরানীর মতন হুকুম চালিয়ে জীবন কাটাতে চাইলেও পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেন নি। দুই চারজন কাজের লোক যে আমাদের বাড়িতে ছিল না তা নয়। তাদের সাথে কখনো চকরের মত আচরণ করা হয়েছে বলে মনে পড়ে না।

এজন্য আমি আমার বাবা মা-কে ভালো মানুষ বলি না মোটেও। আমার ধারনা তারা যতখানি ভালো ছিলেন তার চেয়ে অনেক বেশি ছিলেন বোকা অথবা তাদের চিন্তা ভাবনা ছিল অত্যান্ত নিম্ন মানের, যার দরুন তারা কখনো গ্রাম আর সাধারণ মানুষের গন্ডির বাহিরে যেতে পারেন নি। অথবা এটাকে খান্দানি ব্যাধিও বলা যায়, যা আমার দাদার শরীর থেকে শুরু করে আমার শরীর পর্যন্ত বিরাজমান।
আর সেই ব্যাধির কারণেই হয়ত আমার মা ঘরে বসে থাকতে পারতেন না। সে আমলে কলেরার নাম শোনলে আতংকে মানুষ ঘর বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেত। নিশীচর শিয়ালেরা যেখানে হাক ছাড়ার সাহস পেত না, গৃহস্থের নিশীথ প্রহরী কুকুরেরা পর্যন্ত ঘেউ ঘেউ করত না। সে রকম নিঃশব্দ রজনীতে বাবার সাথে আমার মাও রোগিদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাবারাদি সরবরাহ করলেন। কিন্তু সব কাজ সবাইকে দিয়ে হয় না। মা বোধ হয় একটু বেশিই পুন্যি করে ছিলেন । তাইতো স্বর্গ খালি থাকতে পারল না, আমার মাকে নিয়ে গেল ! ঐ বছরই কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মা মারা গেলেন !
বাবা যেদিন আমাদেরকে খালাদের ওখানে রেখে এলেন, তার তিনদিন পর মা মারা গেলেন ! বাবা একদিকে যেমন সাহসী ছিলেন, আরেক বিবেচণায় ছিলেন একেবারেই ভীত। বাবা সাহসী এজন্য, তিনি কখনো নিজ মৃত্ত্যুর পরোয়া করতেন না। বাবাকে ভীত বলার কারণ, কলেরা আক্রান্ত গ্রামে ফিরে এলে যদি অমাদের কোনো সমস্যা হয়, সেজন্য মায়ের মৃত্ত্যুর খবর পর্যন্ত আমাদেরকে জানান নি।
মাস খানেক পর আমি আর বুবু যখন বাড়ি ফিরে এলাম মাকে দেখতে পেলাম না। দেখলাম, মায়ের কবর ! শুরু হল আমার বিরহের জীবন। আমার প্রথম বিরহ। সবচেয়ে প্রিয় মানুষটির চির বিদায় ! জগতের সবচেয়ে বোকা মানুষদের একজনের মহাপ্রয়াণ।
তখন থেকেই বাবা ও মাকে আমার বোকা মনে হয়। বোকা নয়ত কি ? সবকিছু থাকার পরও যারা ভোগ করে না, তাদেরকে আর কি বলা যায় ? মায়ের কবরের পাশে দাড়িয়ে আমি তেমন কাঁদি নি। কেন কাঁদি নি তা বলতে পারব না। ঐ বয়সে কারো চলে যাওয়াকে তেমন গভীরভাবে হয়ত অনুভব করা যায় না, সে জন্য কান্না আসে নি। বুবু অনেক কেঁদে ছিল। তার কান্না দেখে আমার চোখেও জল এসে ছিল। আমাকে কাঁদতে দেখে নিজ কান্না থামিয়ে বুবু আমাকে আদর করতে শুরু করল।
বাবাকে কাঁদতে দেখি নি, কেন কাঁদেন নি ? বলতে পারব না। তবে মার মৃত্ত্যুর পর বাবা একেবারেই চোপসে গেলেন। কারো সাথে বিশেষ কথা বার্তা বলতেন না। জমিজমা সব বর্গাদারদের মধ্যে ভাগ করে দিলেন। চাষবাষ করে বর্গাদাররা যা দিতো বিনা কৈফিয়তে তাই ঘরে তুলতেন। আমাদের পুরানা এক বর্গাদার করিম চাচাকে জমিজমার সমস্ত দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে নিজেকে প্রায় সংসার ঝামেলা থেকে গুটিয়ে নিলেন ।
করিম চাচা অত্যান্ত সৎ ও বিশ্বাসী। এখনো আমাদের জমিজমার ব্যাপারটা তিনিই দেখেন। মায়ের মৃত্ত্যুর পর বুবুই আমাকে মায়ের মতন স্নেহ করত। আমার গোসল, খাবার দাবারসহ সকল প্রকারের পোষণ কার্য বুবুই করত। তাও বুঝি বাবার সহ্য হল না। আমাকে বেশিদিন বাড়িতে থাকতে দিলেন না। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া শেষ করার পর আমাকে ভর্তি করে দিলেন ময়মনসিংহের এক অভিজাত স্কুলে।
আমাকে রেখে আসার সময় বললেন, মন দিয়ে লেখাপড়া করো বাবা। তোমাকে নিয়ে আমার অনেক আশা।
আমাকে নিয়ে বাবার কি এমন আশা ? এই ভাবনা না ভাবলেও কিছুক্ষণ এতটুকু ভেবেছিলাম, বাবা হঠাৎ আমার লেখাপড়া নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে উঠলেন কেন ?
ভাবনাটা মাথায় বেশিক্ষণ থাকে নি। মাকে হারালেও বাড়িতে থাকলে বুবুর সাথে গল্গ করে, পাড়ার ছেলেমেয়েদের সাথে খেলা করে সময় কেটে যেত। বাবা আমাকে তা থেকেও বঞ্চিত করলেন। আমাকে একেবারে একা করে দিলেন।
তিন বছর পর বাবা নিজে গিয়ে আমাকে বাড়িতে নিয়ে এলেন। দীর্ঘ তিন বছর পর বাড়ি ফিরছি, সে যে কি আনন্দ বলে বুঝানো যায় না। বুবু দৌড়ে এসে আমাকে কোলে নিতে চাইলেন। আমি তখন অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র, কারো কোলে উঠতে লজ্জা লাগছে। আমাকে জড়িয়ে ধরে বুবু ইচ্ছামত কাঁদল। বুবুর কান্না দেখে অন্যদিকে ঘুরে বাবা তার নিজের চোখ মুছলেন।
বাবার দিকে তাকাতেই অবাক হলাম, তিনি কেন কাঁদছেন ঠিক বুঝতে পারছি না। আমার জন্য যদি তার এতই মায়া তাহলে দূরে সরিয়ে রেখেছেন কেন ? তাও বুঝতে পারছি না। বাবাকে জিজ্ঞাস করব, সাহসে কুলোয় না।
আঙ্গিনার এক কোণে করিম চাচার হাত ধরে দাড়িয়ে আছে তার মেয়ে বেগম। বেগমের বয়স তখন পাঁচ ছয় হবে, নাকে কাঁচা সর্দি লেগে আছে। বেগমের মা নেই। করিম চাচার সাথে সারাক্ষণ আমাদের বাড়িতেই থাকে। নানান কাজে বুবুকে সাধ্যমত সহযোগিতা করে। বুবুর কান্না দেখে বেগমও কাঁদতে শুরু করেছে। ও কেন কাঁদছে তাও বুঝতে পারছি না।
পরের দিন থেকে আমাদের বাড়িতে লোক সমাগম বাড়তে শুরু করল। এমন এমন লোকজন আসছেন, যাদের অনেককেই আমি চিনি না। বুবুকে জিজ্ঞাস করলাম, বুবু কিছু না বলে শুধু মুচকি হাসল। এই হাসির কারণ বুঝতে পারলাম না। এই মূঁহুর্তে আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় যিনি, সেই যখন লুকাচ্ছে আর কাকে জিজ্ঞস করব ? কিঞ্চিৎ নিরাশ হলাম বটে।
দুইদিন পর আমাদের বাড়ি নতুন করে সাজতে শুরু করল। করিম চাচাকে জিজ্ঞাস করার পর তিনি জানালেন বুবুর বিয়ে। বিয়ে কাকে বলে সে বয়সে না বুঝলেও আমার রক্ত কণিকায় আনন্দের স্রোত বইতে শুরু করল। দৌড়ে গিয়ে বুবুকে জিজ্ঞাস করলাম, বুবু তোমার নাকি বিয়ে ?
বুবু কোনো উত্তর না দিয়ে লজ্জিত ঠোঁটে হাসল। লাল শাড়ী পরে বুবু বসে আছে, দেখতে যা সুন্দর লাগছে। মাদ্রসার এক শিক্ষকের সাথে বুবুর বিয়ে হল। বুবুর সাথে আমি যেতে চাইলাম ওর শ্বশুর বাড়ি। বাবা বাঁধা দিয়ে গম্ভীর স্বরে বললেন, তোমার স্কুল আছে। এখন যেতে হবে না, পরে যেও।
অনেকগুলো দোষের মধ্যে বাবার এই এক বড় দোষ ছিল, তিনি কখনো অন্যের ইচ্ছাকে পাত্তা দিতেন না। আমি কি এমন পড়তাম তখন ? দুইদিন স্কুলে না গেলেই কি মহাভারত অসাধ্য হয়ে যেত ? বিএ, এম এ-র ছাত্ররাও তো লেখাপড়ায় ফাঁকি দেয়, আমি তো তখন মাত্র অষ্টম শ্রেণীতে। দুইদিন স্কুলে না গেলেই কি এমন ক্ষতি হত ? বাবার জন্য সেই অধিকার থেকেও বঞ্চিত হলাম। বাবার গম্ভীর স্বরের কাছে আমার আবদার শেওলার মত ভেস্তে গেল।
পালকিতে চড়ার আগে আমাকে জড়িয়ে ধরে বুবু অনেক কাঁদল। আমার দ্বিতীয় প্রিয়জনও আমাকে ছেড়ে দূরে চলে গেল ! আমার প্রিয় নিবাস, এই বাড়ি, আমার জন্যে ধীরে ধীরে নরকখানায় পরিনিত হল।

১,৩৫০ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
পুঁজিবাদের এই জমানায় কলম আমার পুঁজি চেনা মানুষের ভিড়ে আমি অচেনা মুখ খোঁজি,, কলমে ভর করে দাড়ানোর প্রচেষ্টায় রত এক শব্দ শ্রমিক । লেখকের প্রকাশিত বইসমূহঃ- কাব্যগ্রন্থ-জীবন নদীতে খরা উপন্যাস-অশ্রু, নরক ও প্রচ্ছায়া ।
সর্বমোট পোস্ট: ৯৮ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ১২৫০ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৬-২৬ ১২:২৭:৩১ মিনিটে
banner

৬ টি মন্তব্য

  1. আমির হোসেন মন্তব্যে বলেছেন:

    আপনার উপন্যাস খানা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ার ইচ্ছা পোষণ করছি।

  2. এ হুসাইন মিন্টু মন্তব্যে বলেছেন:

    পড়ার জন্য সাদর আমন্ত্রণ, ধন্যবাদ

  3. এ হুসাইন মিন্টু মন্তব্যে বলেছেন:

    উপন্যাসের পাঠক কম হলে কেমনে

  4. এম, এ, কাশেম মন্তব্যে বলেছেন:

    নরকে ভাল লাগে না
    স্বর্গের কথা বলুন।

  5. শাহ্‌ আলম শেখ শান্ত মন্তব্যে বলেছেন:

    সুন্দর লিখেছেন তো !
    অসংখ্য অসংখ্য ভাল লাগা জানিয়ে দিলাম ।

  6. সবুজ আহমেদ কক্স মন্তব্যে বলেছেন:

    পড়ে অনেক ভালো লাগলো
    সুন্দর লিখনী
    বেশ ভালো তো
    চমৎকার ভাবনার প্রয়াস
    শুভ কামনা থাকবে

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top