Today 01 Dec 2022
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

পড়ো বাড়ি (ভৌতিক গল্প)

লিখেছেন: তাপসকিরণ রায় | তারিখ: ১৮/১২/২০১৪

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 1571বার পড়া হয়েছে।

Halloween-Ghosts-Picture-Artwork-2864

গজেন বাবু শেষ পর্যন্ত কিনেই নিলেন বাড়িটা। দৈর্ঘ্যে প্রস্তে বেশ অনেকখানি জাগা নিয়ে বলতে গেলে একটা বাগান বাড়ির মত। শুরুতে মনে হেয়ে ছিল পড়ো বাড়ি, অনেকদিন লোকের বাস নেই। তবে বাড়িটাতে বিশেষ কিছু ভাঙচুর নেই, ওপরে রং আর সামান্য প্লাস্টার মেরে দিলেই বসবাসের লায়েক হয়ে যাবে। চারদিকে পাঁচ ফুট উঁচুর পাকা বাউন্ডারি দেওয়াল। আপাতত বাগানের ছোট বড় গাছ, ঝোপ ঝাড় অনেকটা বন প্রদেশের মত লাগলেও সাফ সাফাই করতে আর কতটুকু ঝামেলা ! গিন্নীর আপত্তি ছিল, ছেলে মেয়েরাও গররাজি ছিল। তবু এত বড় বাড়ি আর বাগান দেখে শেষে গজেন বাবু কিনেই ফেললেন। সব চে বড় কথা এত কম পয়সায় আজকাল এমন বাড়ি কোথাও পাওয়া যায় না।
মাস খানেকের মধ্যে বাড়ির সংস্কার কাজ সেরে নেওয়া হল, গৃহ পূজাদি সমাপন করিয়ে গৃহ প্রবেশ করে নিলেন গজেন।
আপত্তি থাকলেও শুরুতে এত বড় ঘর ও বাগান দেখে সবাই খুশি হয়ে গিয়ে ছিল। রংচং করানোর আর ভাঙ্গচুর সরানোর পর কে বলবে যে এটা একটা পুরনো আর পড়ো বাড়ি !
বিকেলে বারান্দায় আরাম কেদারা লাগিয়ে বসেছিলেন গজেন। চার দিকের সুখ দৃষ্টি নিয়ে তিনি দুলছিলেন।
এখন চারদিক শান্ত। সামান্য আগেই বাড়িটা বেশ হৈই হই, রইরই করা ছিল। গৃহ প্রবেশের পূজায় পরিচিত ও আত্মীয় স্বজনরা এসেছিলেন। সবার মুখেই ছিল বাড়ির প্রশংসা, ভায়রা অমলেন্দু বাবু তো বলেই ফেললেন, ইউ আর ভেরি লাকি ! এত অল্প দামে এত বিশাল জাগা নিয়ে বাড়ি !
সন্ধ্যের পর থেকে কেমন নিঝুম নিঝুম লাগতে থাকলো। সবাই বাইরের বৈঠকেই বসে ছিল। গজেন বাবুর স্ত্রী তো বলেই ফেললেন, আমার গাটা কেমন ছমছম করছে! সে সঙ্গে সুর মিলিয়ে কলেজে পড়া মেয়ে পারুল বলল, আমারও কেমন যেন ভয় ভয় করছে। শক্ত সমর্থ বিশ বছরের ছেলে অরুণ বলল, কোথায় জনারণ্যে ছিলাম, এ যেন কোন অজ পাড়াগাঁয়ে এসে পড়েছি!
গজেন বললেন, অভ্যাস, বুঝলে গিন্নী! সব ঠিক হয়ে যাবে। কথাটা বললেন বটে তিনি কিন্তু তাঁর নিজের কাছেও নির্জনতা বড় পীড়া দিচ্ছিল। সে সঙ্গে আরও একটা কথা তাঁর মনে পড়ে গেল, স্থানীয় বাসিন্দা রঘুনাথ বাবু একদিন হেসে বলে ছিলেন, পড়ো বাড়ি, এ বাড়ির পাঁচ জন লোকই নাকি এক্সিডেন্টে মারা গেছে। সিমলার কোন পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে আসার সময়…এ সব কথা আর মনে আনতে চান না গজেন বাবু। তবে রঘুনাথ বাবু বা আশপাশের লোকদের কাছে এ বাড়ির কোন বদনাম তিনি শোনেন নি, এটাই ভরসার কথা।
প্রথম দিন সবাই পরিশ্রান্ত ছিল। কোন মত রাতের খাওয়া দাওয়া সেরে সবাই ঘুমিয়ে পড়ল। আর এক ঘুমেই রাত কাবার হল।
পরদিন যথারীতি সন্ধ্যা হতেই সেই নিঝুম ভাব, গা ছমছম আবহাওয়া। বেশী রাতে খাওয়া সারার অভ্যাস মত সে দিন খাওয়া সেরে রাত এগারটা বেজে গেল শুতে। মাঝে গজেন বাবুর স্ত্রী রান্না ঘর থেকে ভয় পেয়ে ছুটে এসে ছিলেন।
–কি হল ? কি হল ? ঘরের সবার মুখেই ছিল অবাক প্রশ্ন।
গিন্নী বললেন, জানো, রান্না ঘরের জানলা দিয়ে মনে হল কেউ যেন উঁকি মারল!
–ধুস ও কিছু না, মনের ভুল, গজেন বলে ছিলেন। ছেলে মেয়ে দুজনেই চুপ ছিল। মনে মনে ভয় পাচ্ছিল হবে. গজেন স্ত্রীকে বুঝিয়ে ছিলেন, শান্ত পরিবেশে এমনটা মনে হয় গো !
রাতের খাওয়া দাওয়া কোন মত সারা হয়েছিল। মাঝখানে আবার পারুল বাথরুম থেকে ভয় পেয়ে ছুটে এসে ছিল। ওরও নাকি মনে হয়েছিল, বাথরুমের ওপরের ঘুলঘুলি থেকে কেউ উঁকি মেরে দেখছিল। গজেন ভাবলেন, সব মনের ভয়, মনের মাঝে ভয় ঢুকে গেলে এমনটাই হয়–একে তো সুনসান বাগান, তার ওপর পড়ো বাড়ি, এ সব নিয়ে মনের মাঝে সদাসর্বদা অজানা আশংকা ঢুকে আছে।
রাতে ঘুমিয়ে পড়ে ছিলেন গজেন। শোবার আগে দেখে নিয়ে ছিলেন যে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। গিন্নী তো রীতিমত নাক ডেকে চলেছেন–কারও মধ্যে নড়নচড়নের কোন লক্ষণ নেই। গজেন ঘণ্টা খানেক ঘুমিয়ে থাকবেন, হঠাৎ খট, শব্দ পেলেন একটা, কেউ দরজা ধাক্কা দিল নাকি ! এত রাতে কারও আসার কথা নয়, আর গেট খুলে লম্বা বাগান পার করে কেই বা আসতে পারে ? মিনিট খানেক পরেই আবার খটাস, শব্দ হল। তাকালেন গজেন, পায়ের কাছের দরজা খুলে যেতে দেখলেন। স্পষ্টত একটা ছায়ামূর্তি ঘরের ভিতর কিছু যেন নিরীক্ষণ করে চলেছে। এবার আর একটা আওয়াজ করে তাঁর মাথার দিকের জানলাটাও খুলে গেল। আর এ কি! সেখানেও আর এক ছায়াশরীর দাঁড়িয়ে ! সেও উঁকি মেরে ঘরের ভেতরে কিছু দেখার চেষ্টা করছে। কি করবেন এখন গজেন ? চোর ডাকাত হবার সম্ভাবনাই বেশী। চীৎকার করবেন নাকি ? ভয়ে ভয়ে তিনি গলা খাঁকড়ি দিয়ে উঠলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে দুই জানালা থেকেই ছায়ামূর্তিরা সরে গেল। একবার ভাবলেন সবাইকে জাগিয়ে দিলে কেমন হয়, পরে মনে হল, না, তা হলে ওরা আরও ভয় পেয়ে যাবে। তার চে দেখাই যাক না কি হয় !
আরও দু একবার ছোট বড় কাশির শব্দ তুলে গজেন চোখ খুলে নজর রাখলেন চারিদিকে। এক সময় তাঁর মনে হল কেউ বা করা ফিসফিস করে কথা বলছে। হ্যাঁ, স্পষ্ট শব্দ তাঁর কানে আসছে ! পুরুষ ও স্ত্রীলোকের কণ্ঠ। পাশের কোন ঘর থেকে আসছে বলে মনে হল। কি বলছে ওরা, কিছু বোঝা যাচ্ছে না, তবে তিন চার জনের গলার আওয়াজ ভেসে আসছে।
আর চুপ করে থাকতে পারলেন না গজেন।তিনি স্ত্রী ও ছেলে মেয়েকে ডেকে তুললেন। সবাই ভয়ে জড়সড় হয়ে জটলা হয়ে বসে রইলো। তখন আর শব্দ নেই।
–জানালা খোলা কেন ? স্ত্রী ভয়ে ভয়ে বলে উঠলেন।
–জানলা হওয়ায় খুলে গেছে হবে, ক্ষীণ গলায় বলে উঠলেন গজেন।
একটা ঘণ্টা পার হয়ে গেল। সবার চোখ বুজে আসছিল, ঝিম ঘুমে সবাই আচ্ছন্ন। এমনি সময় আবার ফিসফিসানি শুরু হল–ধীরে ধীরে কথার তোড় বেড়ে যাচ্ছিল। অস্পষ্ট হলেও ভালো ভাবে শুনতে পাচ্ছিলেন গজেন। ছেলেকে জাগিয়ে দিলেন তিনি। বালিশের নিচে থেকে টর্চ, আর ঘরের কোন্ থেকে কাঠের রুল হাতে তুলে নিয়ে ছেলেকে বললেন, চল তো আমার সঙ্গে। ওরা দুজনে ঘর থেকে বেরিয়ে পাশের লনে এলো। হ্যাঁ, কথাবার্তা চলছে, বাড়ির পেছনের দিকের কোন ঘর থেকেই কথাবার্তা ভেসে আসছে।
পা টিপে টিপে ওরা পেছনের ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। ভেজানো দরজা ধাক্কা দেবার সাহস কারও নেই। চোর ডাকু হবার সম্ভাবনাই বেশী, কি করবেন ? গজেন ভাব ছিলেন। এত বড় ছেলেটাও ভয়ে গজেনের কোমর ধরে আছে।
মনে হচ্ছিল ওরা যেন বোবা হয়ে গিয়েছে। কিছু সময় পর গজেন আঁতকে উঠলেন, ভেজানো দরজা কখন যেন হাট হয়ে খুলে গিয়েছে। দরজার ঠিক সামনেই ঘোমটা দেওয়া এক বউ দাঁড়িয়ে আছে। কম্পমান এক আলোছায়ার শরীর যেন ! গজেন আর তাঁর ছেলে নিথর হয়ে দেখতে লাগলো, ওদের মুখ ফুটে কোন কথা বের হচ্ছিল না, ওরা যেন অনাদিকাল থেকে স্ট্যাচু হয়ে এখানে দাঁড়িয়ে! ওদের চোখের সামনে আলোআঁধারির বিদ্যুৎ চমক চলছিল। ওরা স্বপ্নের মত চোখ মেলে দেখছিল, ঘরের আলোআঁধারির খেলা এবার হঠাৎ স্থির হয়ে গেল আর অস্পষ্ট চার পাঁচটি মানুষের মূর্তি ভেসে উঠলো। আধআলো ছায়াগুলি দাঁড়িয়ে আছে—অন্ধকারে হাজারও জিগজাগ আলোক রেখার মাঝে সে মনুষ্য আকৃতিগুলি স্থির হয়ে আছে!
এক সময় গজেন ছেলের সাথে নিজেকে খুঁজে পেলেন। সম্বিত ফিরল তাঁর। এদিকে ভোর হয়ে আসছিল। দু একটা পাখির কিচিরমিচির ক্ষীণ শব্দ ওদের কানে ভেসে এলো। তখন কোথাও কিছু নেই–এক স্বপ্নের ঘোর নিয়ে ওরা ফিরে এলো শোবার ঘরে।
গজেন বাবু আর একটা দিনও থাকলেন না সে বাড়িতে, সপরিবারে উঠে গেলেন ভাড়া বাড়িতে।
সমাপ্ত

১,৫৪০ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
নাম :তাপসকিরণ রায়। পিতার নাম : স্বর্গীয় শৈলেশ চন্দ্র রায়। জন্ম স্থান: ঢাকা , বাংলা দেশ। জন্ম তারিখ:১৫ই এপ্রিল,১৯৫০. অর্থশাস্ত্রে এম.এ.ও বি.এড. পাস করি। বর্তমানে বিভিন্ন পত্র পত্রিকাতে নিয়মিত লিখছি। কোলকাতা থেকে আমার প্রকাশিত বইগুলির নামঃ (১) চৈত্রের নগ্নতায় বাঁশির আলাপ (কাব্যগ্রন্থ) (২) তবু বগলে তোমার বুনো ঘ্রাণ (কাব্যগ্রন্থ) (৩) গোপাল ও অন্য গোপালেরা (শিশু ও কিশোর গল্প সঙ্কলন) (৪) রাতের ভূত ও ভূতুড়ে গল্প (ভৌতিক গল্প সঙ্কলন) (৫) গুলাবী তার নাম (গল্প সঙ্কলন)
সর্বমোট পোস্ট: ১১২ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ১৬৬৯ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৮-১১ ১৫:৪৩:৫৪ মিনিটে
banner

৫ টি মন্তব্য

  1. সহিদুল ইসলাম মন্তব্যে বলেছেন:

    ভুতের গল্প আমার ভালো লাগে কম। তারপরও ভালো লাগলো।

  2. তাপসকিরণ রায় মন্তব্যে বলেছেন:

    ধন্যবাদ ভাই,সহিদুল ইসলাম!

  3. দীপঙ্কর বেরা মন্তব্যে বলেছেন:

    দারুন

  4. তাপসকিরণ রায় মন্তব্যে বলেছেন:

    অনেক ধন্যবাদ।

  5. এই মেঘ এই রোদ্দুর মন্তব্যে বলেছেন:

    ভুতের গল্প দারুন লাগে

    গল্পটা অনেক ভাল লাগল

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top