Today 14 May 2021
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

বাসস্ট্যাণ্ড

লিখেছেন: অদিতি ভট্টাচার্য্য | তারিখ: ২৫/১১/২০১৩

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 800বার পড়া হয়েছে।

আমাদের পাড়ায় মোড়ের মাথায় একটা বাসস্ট্যাণ্ড আছে। বছর কয়েক আগে রিকশায় মাইক লাগিয়ে ঘুরে ঘুরে ঘোষণা করা হল যে মোড় দিয়ে বাস যাবে। একখানা বাসস্ট্যাণ্ড বানানো হল। ঘটা করে উদ্বোধনও হল। সবাই খুব খুশী, বাস ধরতে আর বেশী দূরে যেতে হবে না, রিকশা নির্ভরতাও কমবে। চলল বাস কয়েক মাস। কিন্তু তারপরেই বাস এই নতুন রুট পালটে আবার পুরোনো রুটেই ফিরে গেল। কিছুদিন পরে অটো চালু হল। কিন্তু তাও বেশীদিন নয়। আমাদের কপালে কোনোটাই সইল না। বাস, অটো কোনোটাই টিঁকল না কিন্তু তিনদিকে বেঞ্চ আর মাথায় রঙচঙে টিনের ছাদওয়ালা ছোট্ট ঘেরা জায়গাটা বাসস্ট্যাণ্ড নামটা প্রহসনের মতো ঘাড়ে করে দিব্যি টিঁকে গেল।

অবশ্য বাসস্ট্যাণ্ডের যে কোনো উপকারিতা নেই তা নয়। আছে, অনেক আছে। মাঝে মাঝে বয়স্ক ব্যক্তিরা সেখানে বসে গল্পগুজব করেন। পেছনেই পার্কে বাচ্ছারা খেলে, হঠাৎ বৃষ্টি এসে গেলে তাদের মা সুদ্ধু তারা বাসস্ট্যাণ্ডেই আশ্রয় নেয়। পাশে রোজ বিকেলে এক ফুচকাওয়ালা বসে, তার ফুচকার বেশ খ্যাতি আছে। লাইন লম্বা হয়ে গেলে অনেকেই বাসস্ট্যাণ্ডে বসে অপেক্ষা করে। এছাড়া রামু পাগলা তো মাঝে মাঝেই বসে থাকে। না, রামু কাউকে বিরক্ত করেছে বলে আজ অবধি কাউকে শোনা যায় নি। শুধু দেখে, অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে আশপাশ দেখে। কথা যে বলে না তা নয়, তবে সে সব অত্যন্ত জ্ঞানগর্ভ কথাবার্তা।

এই যেমন সেদিন মন্টিকে বলেছিল। রামু লক্ষ্য করেছিল মন্টি প্রায়ই ফুচকা খায়।

সেদিনও মন্টি ফুচকা খেয়ে সবে সাইকেলে উঠতে যাচ্ছে, রামু বলল, ‘রোজ রোজ এত ফুচকা না খেয়ে সেই টাকাটা তো কোনো গরীব দুঃখীকে দিলে হয়। এতে নিজের শরীরটাও বাঁচে আর একটু পুণ্যিও হয়।’

মন্টি অবশ্য পাত্তা না দিয়ে সাইকেল চড়ে চলে গেছিল কিন্তু বৃদ্ধ আশুবাবু যিনি তখন বাসস্ট্যাণ্ডে বসেছিলেন, ফোকলা মুখে জড়িয়ে জড়িয়ে বললেন, ‘কথাটা কিন্তু রামুর একেবারে ফেলনা নয়।’

সেদিন সন্ধ্যেবেলা ফিরছিলাম মোড় হয়েই, দেখলাম বাসস্ট্যাণ্ড খুব জমজমাট। বেশ লোকজন রয়েছে, জোর কিছুর আলোচনা চলছে মনে হল। ভালো লাগল বাসস্ট্যাণ্ডকে এরকম জমজমাট দেখে। যাক, বাস বিহনেও বাসস্ট্যাণ্ড তাহলে জনবিরল নয়! এরপর থেকে রোজই প্রায় ফেরার সময় বাসস্ট্যাণ্ডকে ওরকম জমজমাটই দেখতাম। পরিচিত মুখও চোখে পড়ত। একদিন তো দেখলাম বেঞ্চে বসে সবাই চা খাচ্ছে, বেশ হইহুল্লড়ও হচ্ছে, হাসির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। একটু অবাকই হলাম এবার। হচ্ছে কি রোজ রোজ এখানে?

রবিবার সকালে সে খবরটা পেলাম। সপ্তক এসেছিল, আমার ছোটোবেলার বন্ধু, আড্ডা মারছিলাম।

ওই বলল, ‘আমাদের পাড়ার নতুন খবর শুনেছিস তো? বাসস্ট্যাণ্ডে রোজ নাকি জম্পেশ আড্ডা বসছে।’

‘সে তো দেখছি রোজই ফেরার সময়। কিন্তু হঠাৎ বাসস্ট্যাণ্ডে আড্ডার কারণ?’ জানতে চাইলাম।

‘এক ভদ্রলোক এর হোতা। এখানকার নয়। কাছাকাছি কারুর বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন। তিনি একদিন মোড়ের দোকানে কেনাকাটি করে নাকি বাসস্ট্যাণ্ডে বসে ছিলেন। আশুজেঠু আর দু একজনও ছিলেন। ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয় হল। ওনারা নাকি ভদ্রলোকের কথাবার্তায় একেবারে মুগ্ধ। ভদ্রলোকও নতুন জায়গায় সঙ্গী খুঁজছিলেন। ব্যাস গেলেন জমে এখানে। তারপর থেকে রোজই এই চলছে। তবে অবাই যে আশুজেঠুর এজ গ্রুপ তা ভাবিস না,’ সপ্তক দেখলাম অনেক খবর রাখে।

‘তাই বুঝি? তাহলে তো দেখতে হচ্ছে। আজ সন্ধ্যেয় গেলেই হয়।’

‘হ্যাঁ আমি তো যাচ্ছিই। কেসটা ঠিক কি একবার সামনাসামনি না দেখলে হচ্ছে না।’

সন্ধ্যেবেলায় গেলাম। দেখি বসার জায়গা নেই। অনেকেই দাঁড়িয়ে আছে। সপ্তক ঠিকই বলেছিল, সবাই আশুবাবুর বয়সী নয়। আমাদের দুটো বাড়ি পরে থাকে অভিদাও আছে। রবিবার বলেই বোধহয় ভিড় বেশী। যাঁর আকর্ষণে এই এতজন একত্রিত হয়েছেন তাঁকেও দেখলাম। ধুতি পাঞ্জাবি পরিহিত এক ভদ্রলোক, একেবারে সাধারণ চেহারা। বছর পঁয়ষট্টি তো হবেই। কি আছে এনার মধ্যে যার জন্যে আমাদের অঞ্চলে এই চাঞ্চল্য? বোঝা গেল অনতিবিলম্বে, আড্ডা জমে উঠতেই। যে কোনো বিষয় নিয়ে ভদ্রলোকের কথা বলে যাবার ক্ষমতা অসীম। সে শেয়ার মার্কেট হোক কি রাজনীতি কি টেনিস কি সিনেমা। সর্বত্রই তাঁর অনায়াস বিচরণ। কথা বলেনও বেশ সুন্দর, সবাই উপভোগ করতে পারে এমন করে। তাঁর বয়স হয়েছে কিন্তু সে ছাপ কথাবার্তায় পড়ে নি। কারুর আপত্তি শুনলেন না, মোড়ের দোকান থেকে সবার জন্যে চা আনালেন। আরেকজন তেলেভাজা কিনে আনল। কোথা দিয়ে যে ঘন্টাদুই কেটে গেল বুঝলাম না।

সবাই উঠব উঠব করছে এমন সময় একজন বললেন, ‘একটা গান হয়ে যাক শ্যামসুন্দরবাবু।’

বুঝলাম ভদ্রলোকের নাম শ্যামসুন্দর। এতক্ষণ ওনার কথায় এতই মজে ছিলাম যে নামটা জানার কথা অবধি মনে হয় নি।

দুবার বলতে হল না, ভদ্রলোক উদাত্ত গলায় ধরলেন “বহু যুগের ওপার হতে আষাঢ় এল আমার মনে।”

বৃষ্টি ভেজা হাওয়া আর ভদ্রলোকের গলার মাদকতায় এক অদ্ভুত ভালো লাগা নিয়ে ফিরে এলাম।

পরের দিন আড্ডার লোভেই আগের ট্রেনটাতে প্রায় ঝুলতে ঝুলতে ফিরলাম। বাসস্ট্যাণ্ডে এসে দেখি সপ্তকও রয়েছে। আমাকে দেখে একটু অপ্রস্তুত হাসল। চলল এরকম ক’দিন। কোনোদিন আমি যোগ দিতে পারলাম, কোনোদিন নয়। কিন্তু না গেলেও খবর সব পেতাম। ভদ্রলোক যেন সবাইকে জাদু করেছেন। সবার মুখেই শুধু ওনার কথা।

কিন্তু ওই যে বললাম না আমাদের কপালের কোনো কিছুই সয় না। এটাও সইল না। ভদ্রলোক বেড়াতে এসেছিলেন, কাজেই ফিরেও গেলেন একদিন। আমি মাঝে দুতিন দিন আসতে পারিনি। রবিবার সন্ধ্যে হতে না হতেই দৌড়লাম বাসস্ট্যাণ্ডের দিকে। গিয়ে শুনলাম ভদ্রলোক চলে গেছেন। বেশ কয়েকজন বসে আছেন বিমর্ষ হয়ে।

‘বেশ কাটছিল সন্ধ্যেগুলো কত রকম গল্পে। এখন আবার আগের মত সেই চুপচাপ বসে থাকা,’ বললেন আশুবাবু।

মনটা আমারও যে একটু খারাপ হল না তা নয়, তবে এটাই তো স্বাভাবিক। এখানে তো আর ওনার বাড়ি নয়।

‘কিরে কি করছিস এখানে?’ পেছেনে গলার আওয়াজ শুনে ঘাড় ঘোরালাম।

দেখি দীপ্ত।

‘না কিছু নয়, এই দোকানে এসেছিলাম,’ আড্ডার কথাটা কেন জানি না চেপে গেলাম।

‘সবাই এরকম শোকসভা মার্কা মুখ করে বসে আছে কেন বল তো? কিছু হয়েছে?’ চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে আমার কানের কাছে মুখটা এনে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল দীপ্ত।

‘ধুর, ওসব কিছু নয়,’ আমি হেসে ফেললাম ওর কথা বলার ধরণে, ‘এখানে এক ভদ্রলোক আসতেন রোজ। তাঁকে ঘিরে বেশ জমাটি একটা আড্ডা বসত। কারুর বাড়ির বেড়াতে এসেছিলেন। শ্যামসুন্দরবাবু……..’

‘ছোড়দাদু এখানে এসেও জমিয়ে বসেছিল?’ দীপ্ত যেন আঁতকে উঠল

‘ছোড়দাদু?’ আমি অবাক। শুধু আমি নই, আশেপাশের সবাই।

‘হ্যাঁ ছোড়দাদু। আমার বাবার ছোটোকাকা। নামেই কাকা, বাবার থেকে অল্পই বড়ো। কিন্তু যেটা আসল কথা সেটা হচ্ছে বাবার এই কাকাটি একেবারেই অপদার্থ। সারা জীবন তেমন কিছু কাজকর্মও করে নি। ওই কোনো রকম ছোটোখাটো কিছু করে চালিয়েছে। এখন বুড়ো বয়েসে এর ওর বাড়িতে ঘুরে ঘুরে বেড়ায়। আমাদের নতুন বাড়িতে কখনো আসে নি বলে এতদিন এসে থেকে গেল। শুধু এই আড্ডা মারার ক্ষমতাটি অতি প্রবল। কোনো কাজের নয় শুধু বকবক করে জমিয়ে বসা! আর হ্যাঁ গানের গলাটা ভালো। রবীন্দ্রসঙ্গীতটা মন্দ গায় না। নাহলে একেবারেই…….’

‘অপদার্থ!’ দীপ্তর মুখের কথা কেড়ে নিয় বলল রামু। সে এতক্ষণ মেঝেতে বসেছিল। এবার ধীরেসুস্থে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘অপদার্থ না হলে কি আর এতগুলো লোককে এতদিন ধরে এভাবে বাসস্ট্যাণ্ডের মধ্যে আটকে রাখতে পারে? আবার গাঁটের কড়ি খরচ করে চাও খাওয়ায়! কে যে পদার্থ আর কে অপদার্থ বোঝা দায়!’ বলে আমাদের দিকে কেমন একটা বাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে সামনের দিকে হাঁটা লাগাল।

৮৯৪ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
সংখ্যাতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করেছি। কর্মসূত্রে আরব দুনিয়ায় বসবাসের অভিজ্ঞতাও আছে। বই পড়তে ভালোবাসি। ভ্রমণ,ছবি তোলা,এম্ব্রয়ডারির পাশাপাশি লেখালিখিতেও সমান উৎসাহী।
সর্বমোট পোস্ট: ৩ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ১৫ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৬-১৭ ০৫:১৯:৫৪ মিনিটে
banner

৭ টি মন্তব্য

  1. তাপসকিরণ রায় মন্তব্যে বলেছেন:

    তুমি সুন্দর গল্প লেখ–কাহিনী প্রধান গল্পগুলিকে সাজিয়ে গুছিয়ে লিখতে পার এবং তা বেশ আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।এ সাইটে বহুদিন পরে তোমায় পেলাম।প্রিন্ট প্রকাশনার জন্যে লেখা পাঠিও সময় করে।

  2. আমির হোসেন মন্তব্যে বলেছেন:

    গল্পটি ভাল লাগল।

  3. রাজিব সরকার মন্তব্যে বলেছেন:

    ভাল লিখেছেন দিদি……

  4. আরজু মন্তব্যে বলেছেন:

    সুন্দর গল্প।লেখিকাকে ধনবাদ।

  5. অদিতি ভট্টাচার্য্য মন্তব্যে বলেছেন:

    পড়ার জন্যে সবাইকে অনেক ধন্যবাদ :)

    তাপসকিরণকাকু,
    আপনি পড়েছেন দেখে খুব ভালো লাগল। হ্যাঁ প্রিন্ট প্রকাশনার জন্যে দিচ্ছি, সে তো এরকম ছোটো লেখাই দিতে হবে।

  6. শাহ্‌ আলম শেখ শান্ত মন্তব্যে বলেছেন:

    গল্পটি ভাল লেগেছে ।

  7. সবুজ আহমেদ কক্স মন্তব্যে বলেছেন:

    কবি তাপসকিরণ দাদা র সাথে সহমত
    সো নাইস গল্প

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top