Today 02 Dec 2021
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

বিলুপ্তির পথে গ্রামের বাঁশ শিল্প

লিখেছেন: আমির ইশতিয়াক | তারিখ: ২৭/০৬/২০১৬

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 1016বার পড়া হয়েছে।

বাঁশ ও বেত শিল্প
বাঁশ এমন একটি উদ্ভিদ যা আমাদের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নানা কাজে দরকার পড়ে। অনাদিকাল থেকে বাঁশের ব্যবহার বহুমাত্রিক। বাঁশবিহীন সমাজ পৃথিবীতে কখনো ছিল না, আজও নেই। গ্রামীণ জনপদে একসময় বাঁশঝাড় ছিল না এমনটা কল্পনাও করা যেতো না। যেখানে গ্রাম সেখানে বাঁশঝাড় এমনটিই ছিল স্বাভাবিক। মানুষের জীবনে বাঁশের প্রয়োজনীয়তা যে কতটা, তা লিখে তো নয়ই, বলেও শেষ করা যাবে না। বাড়ির পাশে বাঁশঝাড় ঐতিহ্য গ্রাম বাংলার চিরায়ত রূপ। কিন্তু বনাঞ্চলের বাইরেও এখন যেভাবে গ্রামীণ বৃক্ষরাজি উজাড় হচ্ছে তাতে হারিয়ে যাচ্ছে এ জাতীয় অজস্র গাছপালা। বাংলাদেশের জনজীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী বাঁশ ও বেত শিল্প।
মানবজীবনে বাঁশ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। বাঁশ মূলত ঘাস জাতীয় উদ্ভিদ। ঘাস জাতীয় উদ্ভিদের মধ্যে বাঁশই বৃহত্তম। বাঁশ গাছ সাধারণত একত্রে গুচ্ছ হিসেবে জন্মায়। এই বাঁশগুচ্ছকে প্রচলিত বাংলায় ‘বাঁশঝাড়’ বলে। এক একটি গুচ্ছে ৭০-৮০টি বাঁশ একত্রে থাকে। বাঁশ বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদ। বাঁশ চিনে না এমন মানুষ বাংলাদেশে পাওয়া যাবে না। কমবেশি বাংলাদেশের সর্বত্র বাঁশ উৎপন্ন হলেও; চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামেই বাঁশ উৎপন্ন হয় বেশি। সেখানে রয়েছে বাংলাদেশের বৃহত্তম বাঁশ বন। বাংলাদেশে এই তৃণ গোত্রের ২৬ প্রজাতির বাঁশ পাওয়া যায়। যেমন, মূলী, মিতিয়া, ছড়ি, আইক্কা, বাইজা, বররা, মাকাল, তল্লা বাঁশ ইত্যাদি।
বাঙ্গালী সংস্কৃতিতে বাঁশ শিল্পের গুরুত্ব অপরিসীম। বাঁশ শিল্প একটি লোকশিল্প। এর প্রধান মাধ্যম বাঁশ। সাধারণত গ্রামের লোকেরা এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত এবং বেশির ভাগ তারাই এসব ব্যবহার করে। নিত্য ব্যবহার্য এই বাঁশ কালক্রমে লোকসংস্কৃতি ও কারুশিল্পের প্রধান উপকরণ হয়ে ওঠে। বাঁশের তৈরি এই শিল্প দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ছাড়াও আদিবাসীদের জীবনাচরণ ও অনুভূতির প্রতীক। আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে বাঁশের তৈরি শিল্পকর্ম দীর্ঘস্থায়ী না হলেও লোকজীবনে ব্যবহারের বহুমাত্রিকতা ও প্রয়োজনের কারণে এই শিল্পকর্ম বংশপরম্পরায় চলে আসছে।
বাঁশ দিয়ে সংসারের প্রয়োজনীয় ও সৌখিন উভয় পণ্যই তৈরি করা যায়। গ্রাম বা শহর উভয় জায়গাতেই বাঁশের তৈরি পণ্যের চাহিদা রয়েছে। দৈনন্দিন জীবনে আমরা বাঁশের তৈরি নানান সামগ্রী ব্যবহার করে থাকি। কাঠ ও বেতের পাশাপাশি প্রাচীনকাল থেকেই আমাদের দেশে বাঁশের তৈরি পণ্যের ব্যবহার হয়ে আসছে। শিশুদের বিভিন্ন খেলনাপাতিও বাঁশ দিয়ে তৈরি হয়ে আসছে। বাংলা বিভিন্ন লোকজ বিশ্বাস থেকে এদেশের মানুষ তৈরি করে বাঁশের খেলনা ও পুতুল। শিশুরা আকাশে ঘুড়ি উড়ায়। সেই ঘুড়িও বাঁশের চটা দিয়ে তৈরি।
বাংলাদেশের যে কয়েকটি প্রাকৃতিক উপাদান লোকজীবনের সঙ্গে মিশে আছে তার মধ্যে বাঁশ অন্যতম। বাংলাদেশের লোকজীবনের খুব কম দিকই আছে যেখানে বাঁশের তৈরি সামগ্রী ব্যবহার হয় না। বাঁশ দিয়ে আমাদের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস তৈরি হয়। তার মধ্যে অন্যতম হলো- ঝুড়ি, ঝাকা, চালুন, খাঁচা, পাটি, খাড়ি, ঝাড়ু, কুলা, হাতপাখা, মাদুর, মোড়া ইত্যাদি। বাঁশের দোচালা ও চারচালা ঘর; বাড়ি-ঘরের বেড়া, ঘরের খুঁটি, ঘরের ঝাপ, বেলকি, কার, দরমা বাংলাদেশের নিজস্ব শিল্প-সংস্কৃতির প্রতীক। ঘরের মাচা, ঘরের খাট বাঁশ দিয়ে তৈর করা যায়। ঘরের আসবাব হিসেবে মোড়া, চাটাই, সোফা, বুকসেলপ, ছাইদানি, ফুলদানি, প্রসাধনী বাক্স, ছবির ফ্রেম, আয়নার ফ্রেম, সিগারেট রাখার ছাইদানি, নূনদানি, পানদানি, চুনদানি, ইত্যাদি বহুল প্রচলিত।
বাঁশের তৈরি মাথাল, ওরা, ভার, পাতি, পানি আটকানোর বেড়া, পাজন, মই, লাঙ্গল, জোয়ালসহ যাবতীয় কৃষি কাজে ব্যবহার হয়। গৃহপালিত পশু লালন পালনের জন্য ঘোয়াল ঘর, গরুকে ঘাস খাওয়ানো খোয়ার তৈরি করা হয়। বাঁশের তাজা পাতা গরু, ছাগলকে খাওয়ানো হয়। গরু ছাগলকে রশি দিয়ে আটকাতে বাঁশের খুটি ব্যবহার করা হয়। বাঁশের ছিপা দিয়ে কৃষক তার ক্ষেতে-খামারে মাটিতে গেঁথে বেড়া দেয়। সিম, বরবটি, করলা লাউ, চিচিঙ্গা, কুমড়া ইত্যাদি সমুদয় লতাযুক্ত গুল্ম মাটিতে থাকতে পারে না বিধায় কৃষক বাঁশ দিয়ে মাচা তৈরি করে দেয়। মাচার বাঁশ বেয়ে এইসব লতাযুক্ত গুল্ম উপরে উঠতে খুবই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। লতা আর বাঁশের প্রত্যঙ্গের জঞ্জালের ফাঁকে বিভিন্ন পাখি বাসা বাঁধে। পাখি ধরে আটকিয়ে রাখার খাঁচাটিও বাঁশ দিয়ে তৈরি হয়। শিশু গাছের গোড়ায় খুটি হিসেবে বাঁশের বিকল্প নেই।
মাছ ধরার চাই, পলো, ডুলা, চোঙা, ঠেলা ঝাল, ধর্ম জাল, ছিপ ইত্যাদি মৎস্যজীবীদের হাতিয়ার। মৎজীবীরা মাচ চুরি ঠোকানোর জন্য বাঁশের শাখা-প্রশাখা পুকুরে ফেলে রাখে। মাছ বাঁশের গায়ে লেগে থাকা পিচ্ছিল নোংরা খুবই পছন্দ করে, সেটা খেয়ে মাছ বেঁচে থাকে। বাঁশ এমন এক ঘাস, যা পানিতে ফেললে পানি দুষিত হয়না বরং মাছ, শামুক, ঝিনুকের উপকার হয়। তাদের বংশ বিস্তারে সহায়ক হয়। শামুক, ঝিনুক এই কর্দমাক্ত বাঁশ বেয়ে উপরে উঠেই বর্ষার নতুন পানির স্বাদ গ্রহণ করে।
মানুষের প্রথম আত্মরক্ষার জন্যও আরণ্য জীবনে প্রয়োজন হয়েছে বাঁশের। আত্মরক্ষার কাজে ব্যবহূত বর্শা, ঢাল, লাঠি, তীর, ধনুক ও বল্লম, টেটা, সূচালো অস্ত্র ইত্যাদি বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হয়। বিশেষ করে চরাঞ্চল এলাকায় যে গ্রামে গ্রামে যুদ্ধ হয় বাঁশের তৈরি অস্ত্রই একমাত্র অবলম্বন।
পাল তোলা নৌকা, ইঞ্জিন চালিত নৌকা এবং গরুর গাড়ির ছাদ বা ছই নির্মাণের উপাদান হিসেবে বাঁশের বিকল্প নেই। নৌকায় কাঠের তক্তার পাটাতন অনেক পরে আসছে, তার আগে বাঁশের ফালা দিয়েই পাটাতন বানানো হতো। বন্যার পানিতে যখন দেশ সয়লাব হয় তখন নৌকা, ভেলায় চড়তে হলে বাঁশের বিকল্প নেই। বাঁশের লগি দিয়েই তখন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নৌকা, ভেলা চালিয়ে নিতে হয়। জলবায়ু দূষণ রোধ ও পরিবেশ রক্ষায় বাঁশের ভূমিকা রয়েছে। অন্যান্য উদ্ভিদের চেয়ে বাঁশ অনেক দ্রুতগতিতে কার্বন শোষণ করে। মাটির ক্ষয় রোধেও বাঁশের অনন্য ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু দূষণের হুমকির মুখে থাকা দেশের জন্য তাই বাঁশ অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উদ্ভিদ। বর্ষাকালে বাঁশের তৈরি সাঁকো গ্রামবাংলার যোগাযোগ রক্ষার অন্যতম মাধ্যম হয়ে ওঠে।
গ্রামীণ ঘরবাড়ি তৈরির উপাদানের মতো করে না হলেও শহুরে বহুতল ভবন নির্মাণের সহায়ক সামগ্রী হিসেবে বাঁশের বহুল ব্যবহার রয়েছে। তবে ইদানীং সরকারি-বেরসকারি ভবন নির্মাণ, রাস্তাঘাট নির্মাণের কংক্রিটের মধ্যে রডের পরিবর্তে যেভাবে বিভিন্ন স্থানে বাঁশের ব্যবহার করা হয়েছে সেভাবে নয়। সম্প্রতি বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী দেশের বিভিন্ন জেলায় কমিটি গঠন করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মাঝে বাঁশের লাঠি বিতরণ করছে।
বাঁশি বিশেষ করে অলঙ্কৃত বাঁশি লোক বাদ্যযন্ত্রের অন্যতম প্রধান উপাদান। বাঁশের তৈরি বাঁশির সুর দিয়ে প্রেমিকার মন জয় করা যায়। ভাটিয়ালী, ভাওয়াইয়া আর পল্লীগানের প্রধান যন্ত্রের নাম বাঁশের বাঁশি। বেলুনের সাথে বাঁশের কঞ্চি বেঁধে শিশুদের জন্য তৈরি হচ্ছে বিশেষ বাঁশি। চা বাগানে চায়ের পাতা তোলার ঝুড়ি, খাসিয়াদের পান রাখার ঝুড়ি এবং বিভিন্ন উপজাতীয়দের দৈনন্দিন কাজে ব্যবহূত বাঁশের তৈরি গৃহস্থালি পাত্রসমূহ খুবই আকর্ষণীয়। এসব পাত্র বা ঝুড়িতে বুননের মাধ্যমে নানা ধরনের নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়।
বাঁশ কোন ফলজ বৃক্ষ নয়, ফুলের জন্য তার কোন সুনাম-সুখ্যাতি নাই। তারপরও বাঁশ মানুষের জন্য খুবই দরকারি উদ্ভিদ। বাঁশের শাখা-প্রশাখা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের জন্য বড় প্রয়োজনীয়। জ্ঞানার্জনেও বাঁশ অপরিহার্য। বাঁশের কঞ্চি দিয়ে একসময় কলম তৈরি হতো। সেই কঞ্চির কলমে বিশ্বের সব জ্ঞান লিপিবদ্ধ হতো। গ্রামাঞ্চলের লোকেরা বাঁশের কঞ্চি দিয়েই একসময় লিখত। বই ও খাতা তৈরিতে ব্যবহৃত কাগজ তৈরির কাঁচামালও বাঁশ থেকেই তৈরি হয়। বাংলাদেশের প্রচুর বাঁশের উৎপত্তিস্থল চন্দ্রঘোনায় পাকিস্তান আমলে স্থাপিত কর্ণফুলী পেপার মিল এশিয়ার সবচেয়ে বড় পেপার মিল প্রতিষ্ঠিত হয়। এই পেপার মিলের একমাত্র কাঁচামাল বাঁশ। কাগজ হিসেবে বাঁশের কাগজ সেরা; সুন্দর, উজ্জ্বল ও দীর্ঘস্থায়ী হয়। বাঁশের বেত দিয়ে পিটিয়ে মাষ্টার মশাই ছাত্র-ছাত্রীদেরকে মানুষ বানায়। জীন ভুত তারাতে কবিরাজরা বাঁশের ছিপা, ঝাড়– ব্যবহার করে।
চারু ও কারুকলা শিল্পের প্রধান উপাদান হচ্ছে বাঁশ। হিন্দুরা পূজোর জন্য প্রতিমা বানাতে বাঁশ ব্যবহার করে। বাঁশ না থাকলে বাঙ্গালী সংস্কৃতি প্রদর্শনে ব্যাঘাত ঘটত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশাখী মেলার ভুত, পেঁচা, ময়ূর বানিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রা করার কথা চিন্তাই করা যেত না। বাঁশ বাংলাদেশে জ্বালানী লাকড়ি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। বাঁশের শলা দিয়ে কাবাব পোড়ানো হয়, আলু সিদ্ধ, পিঠা সিদ্ধ, দাঁতের খিলালসহ অনেক কাজে ব্যবহার হয়। বাঁশের শলা দিয়ে আইসক্রীম বানানো হয়।
রাজনৈতিক মিছিল-মিটিংয়ে বাঁশের ব্যাপক ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। প্ল্যাকার্ড বহন, ব্যানার টাঙ্গানো, সামিয়ানার খুঁটি হিসেবে বাঁশের ব্যবহার যথেষ্ট। সমাবেশে হামলা হলে কিংবা অপরের সমাবেশ প- করতে হলে প্ল্যাকার্ডের বাঁশ খুবই কাজে আসে। পতাকা উড়াতে বাঁশ লাগে। টিভির এন্টিনা লাগাতে বাঁশ লাগে। এক সময় গ্রামের লোকেরা টাকা পয়সা সঞ্চয় করত ঘরের বাঁশের খুঁটি ছিদ্র করে।
মানুষ কচি বাঁশের ডগা খেয়ে থাকে। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী ‘বাঁশকরুল’ নামের কচি বাঁশের ডগা দিয়ে সুস্বাদু খাবার তৈরি করে থাকে। তবে বাঙালির জীবনে বাঁশ এত প্রয়োজনীয় হলেও তা কাউকে দিতে গেলে তিনি অপমাণিত বোধ করেন, ক্ষতির আশঙ্কা করেন। তাই কাউকে ‘বাঁশ দেয়া’ বাংলায় অতি গর্হিত কাজ।
আমরা সবাই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম শহীদ দেশপ্রেমিক তিতুমীরের নাম শুনেছি। নারকেলবাড়িয়া পশ্চিমবঙ্গের বারাসাতে অবস্থিত। ইংরেজদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের শুরুতে তিতুমীরের ওপর অত্যাচার শুরু হয়। নিজ গ্রাম ছেড়ে তিনি বারাসাতের নারকেলবাড়িয়ায় চলে যান। নারকেলবাড়িয়ার লোকজন তাঁকে সাদরে গ্রহণ করেন। হাজার হাজার সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এখানে তিতুমীর এক দুর্ভেদ্য বাঁশের দুর্গ তৈরি করেছিলেন। এই দুর্গ নারকেলবাড়িয়ার ‘বাঁশের কেল্লা’ নামে পরিচিত।
কবিদের কবিতায়ও বাঁশের কথা উঠে এসেছে। যতীন্দ্রমোহন বাগচী এই বাঁশকে নিয়ে লিখেছিলেন- বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ঐ/ মাগো আমার শোলক বলা কাজলা দিদি কই।
জীবনেও বাঁশ, মরনেও বাঁশ। বাঁশ গ্রামীণ মানুষের নিত্য দিনের সঙ্গী। মানুষের জীবনের শেষ যাত্রার শেষ উপকরণটির নাম হল বাঁশ। একসময় মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরে ধাইয়েরা নবজাতকের নাড়ি কাটতেন ব্লেডের পরিবর্তে বাঁশের সিলকা দিয়ে তারপর শিশুকে বাঁশের দোলনায় শুয়ানো হয়। সেই দোলনা থেকে মরণ কালে লাশ কবরে রাখার পর, দুনিয়ার জীবনের শেষ ছাদখানা নির্মিত হয় বাঁশ দিয়ে। চিতায় লাশ জ্বালানোর সময়, তাড়াতাড়ি ছহি সালামতে লাশকে ছাই বানাতে বাঁশের বিকল্প নাই। বেওয়ারিশ ও দুর্ঘটনায় লাশের শেষ বস্ত্র হয় বাঁশের তৈরি চাটাই। মানুষের জীবনে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বাঁশ প্রয়োজন। পুরুষ শিশুকে খাতনা করাতেও বাঁশের ব্যবহার করা হয়। হাজামরা বাঁশের ছিলকা দিয়েই লিঙ্গের অনাবশ্যক ত্বক কর্তন করেন। দালান-কোঠা, যেখানেই মারা যান না কেন, শেষ আশ্রয় বাঁশের ঘরে। বাঁশের খাটে করেই মৃত লাশকে গোরস্তানে নেয়া হয়। তারপর কবরে লাশ শুইয়ে মাটি চাপা দেওয়ার আগে বাঁশের টুকরা আড়াআড়ি করে দেওয়া হয়। তার ওপর বিছানো হয় চাটাই। সেটা চাটাইও বাঁশের তৈরি। তারপর যে কোদাল দিয়ে মাটি চাপা দেয়া হয় সেটাও বাঁশের তৈরি। এখানেই শেষ নয়। লাশ নিয়ে যাতে শিয়াল টানাটানি করতে না পারে সে জন্য দেয়া হয় বাঁশের বেড়া।
একসময় এদেশের গ্রামাঞ্চলে বিপুল পরিমাণে এসব বাঁশের সামগ্রী তৈরী হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে চালান হয়ে যেতো। এখন গ্রামীণ উৎসব বা মেলাতেও বাঁশজাত সামগ্রী সচরাচর চোখে পড়ে। ঐতিহ্যবাহী বাঁশ ও বাঁশ শিল্প আজ ধ্বংসের মুখে। জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বাঁশ ঝাড় উজার হয়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন। যতই দিন যাচ্ছে ততই কমে যাচ্ছে এই হস্তশিল্পের চাহিদা। মূল্যবৃদ্ধি, বাঁশের দুষ্প্রাপ্যতা আর অন্যদিকে প্লাস্টিক, সিলভার ও মেলামাইন জাতীয় হালকা টেকসই সামগ্রী নাগরিক জীবনে গ্রামীণ হস্তশিল্পের পণ্যকে হটিয়ে দিয়েছে। এভাবেই বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশ শিল্প। প্রয়োজনীয় পূজির অভাব এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় বাঁশ শিল্প এখন বিলুপ্ত হতে চলেছে। বর্তমানে বাঁশ শিল্পে চলছে চরম মন্দা। ফলে এ শিল্পের উপর নির্ভরশীল লোকজন বেকার হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। অনেকেই আবার এ পেশা ছেড়ে চলে যাচ্ছে অন্য পেশায়। তাছাড়া দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়েছে এ শিল্পের কাঁচামাল বাঁশ। নির্মাণ ব্যয় বেশি পড়ায় এসব পণ্যের দামও পড়ছে বেশি। ফলে সাধারণ মানুষ ঝুঁকে পড়ছে অপেক্ষাকৃত কম দামে পাওয়া প্লাস্টিক পণ্যের উপর।
বলা হয়ে থাকে, মানুষের দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত বাঁশের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদ মানব জীবনে সর্বাবস্থায় উপকারী হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে বাঁশ শিল্প আজ ধ্বংসের মুখে। তাই বাঁশ শিল্পকে বাঁচাতে এখনই আমাদের সবার এগিয়ে আসা উচিত।

তথ্যসূত্র: বাংলা পিডিয়া, জাতীয় ই-তথ্যকোষ, বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকা।

১,০০৩ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
আমির ইশতিয়াক ১৯৮০ সালের ৩১ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর থানার ধরাভাঙ্গা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা শরীফ হোসেন এবং মা আনোয়ারা বেগম এর বড় সন্তান তিনি। স্ত্রী ইয়াছমিন আমির। এক সন্তান আফরিন সুলতানা আনিকা। তিনি প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন মায়ের কাছ থেকে। মা-ই তার প্রথম পাঠশালা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু করেন মাদ্রাসা থেকে আর শেষ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নরসিংদী সরকারি কলেজ থেকে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখি শুরু করেন। তিনি লেখালেখির প্রেরণা পেয়েছেন বই পড়ে। তিনি গল্প লিখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করলেও সাহিত্যের সবগুলো শাখায় তাঁর বিচরণ লক্ষ্য করা যায়। তাঁর বেশ কয়েকটি প্রকাশিত গ্রন্থ রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হলো- এ জীবন শুধু তোমার জন্য ও প্রাণের প্রিয়তমা। তাছাড়া বেশ কিছু সম্মিলিত সংকলনেও তাঁর গল্প ছাপা হয়েছে। তিনি নিয়মিতভাবে বিভিন্ন প্রিন্ট ও অনলাইন পত্রিকায় গল্প, কবিতা, ছড়া ও কলাম লিখে যাচ্ছেন। এছাড়া বিভিন্ন ব্লগে নিজের লেখা শেয়ার করছেন। তিনি লেখালেখি করে বেশ কয়েটি পুরস্কারও পেয়েছেন। তিনি প্রথমে আমির হোসেন নামে লিখতেন। বর্তমানে আমির ইশতিয়াক নামে লিখছেন। বর্তমানে তিনি নরসিংদীতে ব্যবসা করছেন। তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা একজন সফল লেখক হওয়া।
সর্বমোট পোস্ট: ২৪১ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ৪৭০৯ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৬-০৫ ০৭:৪৪:৩৯ মিনিটে
Visit আমির ইশতিয়াক Website.
banner

১ টি মন্তব্য

  1. হাসান ইমতি মন্তব্যে বলেছেন:

    চলন্তিকায় আজকাল আর আগের মত প্রান নেই, লেখা,পাঠসংখ্যা ও মন্তব্য দুটোরই বড় আকাল। এমনও
    দেখা যায় গোটা সপ্তাহে মাত্র এক বা দুটি লেখা আসে। আগে প্রথম পাতায় এক লেখকের দুটো
    লেখা দেয়া যেত না, এখন সে নিয়ম মানতে গেলে মাসে কেউ একটির বেশি লেখা দিতে পারবে
    না, তাতে আরো কমে যাবে মোট লেখা ও ব্লগের গতি। অথচ মাসে বিশটির উপরে লেখার জন্য
    আলাদা প্রমোশনাল পয়েন্ট আছে, তার মানে এখন এই প্রমোশনাল অফার গ্রহন করতে গেলে ভাঙতে
    হয় প্রথমোক্ত নিয়ম। তবুও পুরনো দিনের কথা মনে করে, চলন্তিকা আবার প্রান ফিরে পাবে ভেবে
    এখন সপ্তাহে এক থেকে দুটো লেখা দিয়ে যাই। এমন ভাবনার সচল লেখকের সংখ্যাও এখন হাতে
    গোনা কয়েক জন।
    আজ সেলফোন দিয়ে আমার লেখায় আসা বিরল মন্তব্যের উত্তর দিতে গিয়েও নাকাল হতে হল, সাইট
    একদম স্লো, একবার, দুইবার, তিনবার চেষ্টা করার পর মন্তব্যের উত্তর দিতে সমর্থ হলাম। সম্প্রতি
    মন্তব্য দিতে গিয়ে বেশ কয়েকবার এই একই সমস্যা হয়েছে আমার। মন্তব্য করে এড বাটনে চাপ দিলে
    সাইট রিলোড হয় কিন্তু মন্তব্য যোগ হয় না, এই সমস্যা কি আমার একারই হচ্ছে না অন্য কারো বা
    সবারই হচ্ছে, এই বিষয়ে সঞ্চালক ও লেখক বন্ধুদের মনোযোগ আকর্ষণ করছি।
    লেখা পোষ্ট করার পর এডিট করে আবার লিখছি কারন লেখা যোগ করতেও তিন বারের চেষ্টায় সফল
    হলাম, খুবই দুঃখজনক ব্যাপার।
    হঠাৎ করে কেন এমন অচলাবস্থা হল চলন্তিকার, বিভিন্ন অফার দিয়েও আগের মত সচল হচ্ছে না ব্লগ।
    বিষয়গুলো ভাবা দরকার। সঞ্চালকরাও আগের মত একটিভ নন। সাইট নিয়মিত ঠিকমত আপডেট হয় না,
    পত্রিকার প্রকাশনার বিজ্ঞপ্তি দিয়ে লেখা নিয়েও হল না প্রকাশনা, কেন হল না সে বিষয়ে কোন
    স্পষ্ট বক্তব্যও চোখে পড়েনি। একই ব্লগে এখন সাহিত্যের পাশাপাসি যোগ হয়েছে ব্যবসায়িক
    উদ্যোগ। যান্ত্রিক সমস্যার কারনে এমনিতেই লেখা, মন্তব্য দেয়া ঝামেলার কাজ। তারপরে আগে
    যেখানে লেখা ও মন্তব্য দূটোতেই পয়েন্ট ছিল বেশি, এখন সেখানে দুটোতেই পয়েন্ট কমিয়ে অর্ধেক
    করে আকাশচুম্বী পয়েন্টের বিমান টিকেটের এক অফার দেয়া হয়েছে যা আসলে সঞ্চালকদের
    আন্তরিকতার অভাব বা ব্লগের লেখক পাঠকদের মন বুঝতে না পারার কারনে বলেই মনে হয়। দুর্বল হয়ে
    যাচ্ছে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গাগুলো। যাইহোক আশা করছি সব জটিলতা কাটিয়ে
    চলন্তিকা আগের রুপে ফিরে আসবে।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top