Today 14 May 2021
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

মৃদু দীর্ঘশ্বাস

লিখেছেন: জুবায়ের হুসাইন | তারিখ: ১৮/০৬/২০১৩

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 776বার পড়া হয়েছে।

আকাশটা আজ সকাল থেকেই মুখ গোমড়া করে আছে। বেলা অনেক হয়েছে, একটিবারের জন্যেও সূর্যটা তার মুখ বের করেনি মেঘের আড়াল থেকে। যেন আজ তার বিশ্রামের দিন। অবিরাম পৃথিবীর প্রান্তরে আলো ও তাপ বিলাতে বিলাতে আজ সে কান্ত-শ্রান্ত। কিন্তু সে কি জানে না তার মুখ দর্শন ছাড়া পৃথিবী আলোকিত হয় না, পৃথিবীর কোলে অন্ধকার নেমে আসে? থমকে যায় জীবনের গতিশীলতা?
হাসমত উল্লাহ এনকক্ষণ ধরেই এখানে বসে আছেন। জবুথবু হয়ে নিজের মধ্যে কেমন গুটিয়ে আছেন তিনি। বয়স কত হবে তার? এই তো চল্লিশ ছুঁই ছুঁই করছে। অথচ এই বয়সেই কেমন বুড়িয়ে গেছেন তিনি। শরীরটা শুকিয়ে তিন ভাগের এক ভাগ কমে গেছে। মাথায় এক দঙ্গল চুল। কয়েকদিন ধরে চুলগুলো যেন পুরোটাই সাদা রং ধারণ করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। দেখতে হয়েছে অনেকটা ঘরের কোনায় চড়–ই পাখির বাসার মতো। কান-মুখ বেয়ে পড়ছে মাথার এলোমেলো চুলগুলো।
হাসমত উল্লাহর কপালে এখন চারটা ভাঁজ স্পষ্ট পড়া যায়। মানুষের বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার কপালে সাধারণত তিনটা ভাঁজ পড়ে। কিন্তু হাসমত উল্লাহর কপালের চামড়ায় কেন চারটা ভাঁজ তা কারোর জানা নেই। হাসমত উল্লাহ নিজেই কি কখনও ভেবেছেন এ নিয়ে? বোধহয় না। ভাববার সময় কোথায় তার?
এই লোকটার গায়ের সাদা শার্টটা ততোধিক ময়লা। ময়লার আস্তরণ পড়ে পড়ে প্রকৃত সাদা রং হারিয়ে কেমন একটা কমপ্লেক্স কালারে রূপ নিয়েছে। কাপড় প্রস্তুতকারীরা এই রংটাকে তাদের কাপড় তৈরির নতুন কালার হিসেবে নিতে পারেন। তাহলে আনকমন একটা কালারের পোশাক তৈরি করতে পারবে ফ্যাশানেবল মানুষ। হাসমত উল্লাহর শরীরে চামড়ার মতো লেগে আছে যে আনকমন কালারের শার্টটাÑ সেটাতে ভিন্ন রঙের কাপড়ের তালিও পড়েছে কয়েকটা। কোনো কোনো তালি’র পাশ ঘেষেই আবার ছিড়তে শুরু করেছে কাপড়। যোগ হয়েছে আরও কয়েকটা নতুন ফুটো। পরনের লুঙ্গিটা হাঁটু ছুঁই ছুঁই। কোমরের দিকটার অনেকখানিই কয়েকবার করে ছিড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে। পরের বার ছিড়তে হলে কাপড় হাঁটুর উপরে উঠে যাবে। ফরজ রক্ষা করা তখন সম্ভব হবে না হাসমত উল্লাহর।
হাসমত উল্লাহর হাঁটুর নিচ থেকে পায়ের বাকি অংশটুকু চামড়া ফাটা খসখসে। অবশ্য তার সমস্ত শরীরেই এরূপ অবস্থা যদিও এই অংশটার মতো এতটা দগদগে নয়। পায়ের দশটা নখের কোনোটাই অক্ষত নেই। আঙুলের ন্যায় সেগুলোও ফেটে-কেটে গেছে। কোনো কোনোটার গোড়ায় রক্ত জমে কালচে হয়ে গেছে।
মাথাটা নুয়ে আছে তার দুই পায়ের মাঝখানটিতে। কিছুক্ষণ পর পর মুখ তুলে তাকাচ্ছেন। করুণ আর্তি ঝরে পড়ছে তখন তার চোখে-মুখে। পরক্ষণই আবার কোনো অবলম্বনহীন বস্তুর ন্যায় ঝুলে পড়ছে নিচের দিকে। ঘাড়ের পেছনের চামড়া আর ওখানকার অস্থিগুলো বাধা দেয়ায় মাটিতে লুটিয়ে না পড়ে মাঝপথেই ঝুলে থাকছে।
ফুটপাতের এ অংশটাতে ভোর না হতেই কামলারা জড়ো হয়। ঝুড়ি, কোদাল এবং অন্যান্য যন্ত্রাদি সামনে রেখে কেউ বসে কেউ দাঁড়িয়ে থাকে। মহাজনরা তাদের সাথে কথাবার্তা বলে মজুরি ঠিক করে সঙ্গে নিয়ে যায়। মহাজনের বাসায় বা অন্যত্র গিয়ে কাক্সিত কাজটি করে তারা। সন্ধ্যা হলে মজুরি নিয়ে ঘরে ফেরে বাজার-সদয় করে।
এই মুহূর্তে জায়গাটা অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে গেছে। হাসমত উল্লাহসহ চার-পাঁচজন বাকি আছে আর। একটা প্রাইভেট কার এসে থামল রাস্তার ধারে। কিশোর বয়সের এক কামলার সাথে কিছু কথা বলল। তারপর ছেলেটিকেগাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে চলে গেল। ঘাড় তুলে মুখ ঘুরিয়ে তাকালেন হাসমত উল্লাহ।
ভোর থেকেই ফুটপাতের চায়ের দোকানগুলো খুলে গেছে। কোনো কোনোটা অনেক রাত অবধি খোলা থাকায় দোকানদার সবে উঠতে শুরু করেছে। কাপ-পিরিচের টুং টাং আর মানুষের হাক-ডাক, কথাবার্তায় মুখরিত চারপাশটা।
হাসমত উল্লাহর ভীষণ তেষ্টা পেয়েছে। তার বাম পাশ ঘেষেই একটা চায়ের দোকান। মুখ তুলে দোকানদারকে বললেন, ‘ইট্টু পানি খাওয়াবা ভাই?’
‘দিচ্ছি।’ বলল দোকানদার। কিন্তু তার এই ‘দিচ্ছি’টা আর ‘দেয়া’য় রূপ নিল না। খদ্দের সামলানোয় ব্যস্ত হয়ে গেল সে।
হাসমত উল্লাহও আর পানি চাইলেন না।
বেলা অনেক হয়েছে। কিন্তু আকাশে মেঘ থাকায় কত বেলা হয়েছে তা বোঝা যাচ্ছে না।
হাসমত উল্লাহর সামনে দিয়ে লোকজন হেঁটে যাচ্ছে। অফিস-আদালত অর্থাৎ কর্মক্ষেত্রে গমন যাদের উদ্দেশ্য, তাদের পরিমাণ এই মুহূর্তে হাতে গোনা। এখন বেশিরভাগই পথচারী।
হাসমত উল্লাহ সঙ্গে একটা ঝুড়ি এনেছেন। তার নিজের শরীরের মতোই ঝুড়িটাও ভাঙাচোরা।
প্রচণ্ড কান্তি এসে তার শরীরটাকে জড়িয়ে ধরছে। ক্ষিধের জ্বালা এখন আর তিনি ততটা উপলব্ধি করেন না। ওটা সয়ে গেছে। বরং পেটে কিছু পড়ার পরেই গা’টা কেমন গুলিয়ে ওঠে। কিছু পর অবশ্য তৃপ্তি ছড়িয়ে পড়ে সমস্ত দেহে। কিছুক্ষণ আগে পিপাসায় বুকের ছাতি ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলেও এখন আর তেমন বোধ হচ্ছে না। কেবল গলার কাছটা শুকিয়ে আছে। যেন কেউ শিরিশ কাগজ ঘষে দিয়েছে ওখানটায়।
হাসমত উল্লাহর দেহের ভার এখন পুরোটায় ঝুড়ির ওপর। চোখ দু’টো তার খোলা। পলক পড়ছে না। কিন্তু সেখানে অস্পষ্টতা। অন্য যারা এসেছিল কাজের জন্য, অধিকাংশই কাজ পেয়ে চলে গেছে। আর যাদের ভাগ্যে কাজ জোটেনি, তারা কেউ ঘরে ফিরে গেছে, কেউবা গেছে অন্য কাজের সন্ধানে। জীবিকার যে বড় দায় তাদের!
কেবল হাসমত উল্লাহই রয়ে গেছেন। আসলে এখান থেকে উঠে যাওয়ার শক্তিটুকুও তিনি পাচ্ছেন না।
হাসমত উল্লাহ আরামবাগের এক বস্তিতে থাকেন। ঘরে তার অসুস্থ স্ত্রী আর দুই ছেলেমেয়ে। স্ত্রী নূরজাহান কঠিন অসুখে ভুগছেন। সারাক্ষণ কেবল কাশেন। এখন তো কফের বদলে কাশির সাথে থোকা থোকা রক্ত বের হয়।
হাসমত উল্লাহর ছেলে ও মেয়ে টোকাইগিরি করে। অবশ্য তারা দু’জনেই স্কুলে যেত। কিন্তু একটা ঘটনা ওদের জীবন থেকে স্কুল নামক জিনিসটি কেড়ে নিয়েছে। তছনছ হয়ে গেছে ওদের সংসারটা।
ভালোই দিন কাটছিল হাসমত উল্লাহর। বউ ছেলেমেয়ে নিয়ে একপ্রকার সুখীই ছিল তার পরিবার। তিনি রিকসা চালাতেন। স্ত্রী নূরজাহান বেগম দু’টো মেসে রান্না-বাড়ার কাজ করতেন। তাদের আশা ছিল- ছেলেমেয়ে দু’টোকে শিক্ষিত করে তুলবেন। ছেলেমেয়ের কামাই খাবেন, এ আশা তারা করতেন না। তবে তারা যেন নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারে, সে প্রত্যাশা মনের মধ্যে বপন করেছিলেন। আর প্রতিনিয়ত তার ডালপালা বিস্তার করে চলছিলেন। কিন্তু কেত্থেকে এক দমকা হাওয়া এসে বুকের মধ্যে বেড়ে ওঠা সেই আশার বৃক্ষটাকে সমূলে উৎপাটিত করে দিল। পথের দেখা না পেতেই পথের উপর থমকে দাঁড়ালো স্বপ্নেরা।
বস্তিটা দেখাশোনা করতেন রফিকুল ইসলাম নামের এক মানুষ। বড় ভালো মানুষ ছিলেন তিনি। যেমন ধার্মিক, তেমনি দরদী ছিলেন। মনটা তার খুবই উদার ছিল। বস্তির সবার সুখ-দুঃখে সাথী হতেন। কিন্তু গেল নির্বাচনের সময়ই সব কিছু কেমন হয়ে গেল। ভোটের সাতদিন আগে খুন হলেন রফিকুল ইসলাম। স্তর নিয়ন্ত্রণ নিলেন নান্টু শেখ। লোকটা গুণ্ডা টাইপের। একগাদা সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে ঘোরেন। রফিকুল ইসরামের সাথে অনেকবারই ঝামেলায় জড়াতে চেয়েছেন তিনি। কিন্তু প্রতিবারই রফিকুল ইসলাম সেটা কৌশলে এড়িয়ে গেছেন। আসলে নান্টু শেখের রোলুপ দৃষ্টিটা বরাবরই এই বস্তিটার উপর ছিল। তিনিই বস্তিটা নিয়ন্ত্রণ করতে চাইতেন। বস্তিবাসীরা মনে করে, রফিকুল ইসলাম খুনের পেছনে নান্টু শেখের হাত আছে।
বস্তিবাসীরা“ফিকুল ইসলামের মৃত্যুটাকে একপ্রকার ভুলেই গেল যখন শুনল একটি দল এই বলে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে যে তারা ক্ষমতায় গেলে চালে কেজি দশ টাকা করে দেবে। আরও অনেক প্রতিশ্রুতির কথা তারা শুনেছে। কিন্তু সেসব কেউ মনে রাখেনি। মনে রাকার প্রয়োজনীয় দেখা দেয়নি। আসলে দু’বেলা পেট পুরে দু’মুটো ভাত খেতে পেলেই যে তারা সুখী। পরম সুখী। এর বাইরে কোথায় কী হলো না হলো- তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না।
অধিকাংশ মানুষই দলটির এই কথাটাকে বিশ্বাস করেনি। কারণ এই দলটি যে বরাবরই জনগণের সাথে প্রতারণা করে! কিন্তু বস্তির সবাই ওই দলকে ভোট দিয়েছে তা না, আসলে দু’একজন ছাড়া বস্তির আর কাউকেই ভোটকেন্দ্রে যেয়ে ভোট দিতে হয়নি। নান্টু শেখই তাদেরকে ভোটকেন্দ্রে যেতে নিষেধ করেছে। কিন্তুহাসমত উল্লাহ নান্টু শেখের বারণ শোনেননি। তিনি গিয়েছিলেন ভোট দিতে।
যাই হোক, ভোটের দিন সন্ধ্যার পর থেকেই চারপাশটা বদলে যেতে শুরু করে। নান্টু শেখ পরদিন সকালে এসেই নিয়ে গেলেন হাসমত উল্লাহর রিকসাটা। বাধা দিয়ে কোনো লাভ হলো না। নান্টু শেখের পা জড়িয়ে ধরে অনুনয় বিনয় করলেন নূরজাহান বেগম। তখন নান্টু শেখ সজোরে নূরজাহান বেগমের বুকে লাথি চালালেন। মূলত সেখান থেকেই শয্যাশায়ী তিনি।
হাসমত উল্লাহ অনেকের কাছেই ছুটে গেছেন তার রিকসাটা উদ্ধারের জন্য। ওটাই যে তার জীবিকার একমাত্র অবলম্বন! কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। কেউ ওর পাশে এসে দাঁড়ায়নি। আসলে পাশে এসে দাঁড়ানোর মতো অবস্থা তখন কারোরই নেই। সবাই আতঙ্কিত কখন তার উপরও নেমে আসে কোনো বিপদ। হারাতে হয় সবকিছু। বউ-ছেলেমেয়ে নিয়ে বসতে হয় পথে।
বস্তিবাসীদেরকে এমন নিরূপায় এর আগে দেখা যায়নি। দু’টো জিনিস এখন তাদের মধ্যে কাজ করছে- এক. ভীতি, আর দুই. দলটি তো দশ টাকা কেজি চাল খাওয়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যাক, অন্তত বউ-ছেলেমেয়ের মুখে ভাত তো তুলে দিতে পারবে! আর তাছাড়া বস্তিবাসীরা চায় না কোনো ঝামেলা-ফ্যাসাদে জড়াতে। অবশ্য ঘর থেকে উচ্ছেদ করা হতে হাসমত উল্লাহকে বাঁচিয়েছে বস্তির লোকেরা। কিন্তু প্রতিশ্রুত দশ টাকা কেজির চাল তারা পায়নি। বরং হু হু করে চালসহ অন্যান্য নিত্রপণ্যের দাম ক্রমেই বেড়ে চলেছে। তাদের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে এখন সেসব। তারা বুঝতে পারছে দলটি তাদের সাথে চরম মিথ্যাচার করেছে।
ওই ঘটনার পর এক প্রকার নিরাশই হয়ে যান হাসমত উল্লাহ। তার সকল স্বপ্ন-আশা যে ধূলিসাৎ গয়ে গেছে!
এরপর তিনিও অসুখে পড়েন। কেবলই শ্বাসকষ্ট হয় তার। অনেকভাবে চেষ্টা করেছেন অনেক কিছু করার। কিন্তু কোনো কাজেই তিনি মন বসাতে পারেননি আর।
স্ত্রীর জন্য ওষুধ কিনতে পারেন না, ছেলেমেয়ের মুখে অন্ন তুলে দিতে ব্যর্থ হন হাসমত উল্লাহ। স্কুল ছাড়তে হয় বাচ্চাদের। বাপ-মায়ের অসহায়ত্ব প্রথম প্রথম না বুঝলেও একসময় বুঝতে শুরু করে। ফলে টোকাইয়ের কাজ বেছে নেয় তারা। মাকে ঠিক মতো ওষুধ কিনে দিতে না পারলেও সকাল-সন্ধ্যে একটা করে পাউরুটি খেতে দিতে পারে ওরা। এরা ভাই-বোন বেজায় খুশি। দারুণ সুখী ওরা।
মা কিছুই করতে পারেন না। কেবল ফ্যালফ্যাল চোখে ছেলেমেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকেন। কপালে-গালে চুমু খান আর আড়ালে নীরবে চোখের অশ্রু বিসর্জন দেন।
এই তো সেদিন এসে নান্টু শেখ শাসিয়ে গেছে, ‘সাত দিনির মধ্যি তিন বছরের ঘর ভাড়া শোধ করবা। তা যদি না পারো, আমার ঘর ছাইড়া দিবা। বুঝবার পারছ? আমি হলাম গে এক কথার মানুষ।’
হাসমত উল্লাহর মাথায় নতুন করে বাজ পড়ে। এদিকে শরীরে প্রচণ্ড জ্বর বয়ে যাচ্ছে তার। সাত দিনের তিন দিন চলে গেছে। আর চারদিনের মধ্যে টাকা ম্যানেজ করতে হবে তাকে। তা না হলে… আর ভাবতে পারেন না।
আজ সকালে জ্বর নিয়েই কাজের খোঁজে বেরিয়ে আসেন তিনি। কিন্তু কেউ তাকে কাজে নিল না। কয়েকজন তার দিকে ফিরে তাকালেও কেউ আগ্রহ দেখাল না। আসলে এই শরীরে তিনি যে কোনো কাজ করতে পারবেন না, তা তারা ভালো করেই বুঝতে পেরেছে।
হাসমত উল্লাহ তার ভাঙা ঝুড়িটার উপর একইভাবে কাঁত হয়ে পড়ে আছেন। চোখজোড়া এখনও খোলা। দেখছেন ব্যস্ত শহরের চলাচল। একসময় তিনিও ছিলেন এই ব্যস্ততার একজন। তার পায়ের ধূলিও মিশে আছে এই শহরের রাস্তাগুলোর পিচের সাথে। তার গায়ের ঘাম ঝরেছে এখানেই। দুপুরের তপ্ত রোদে ফুটপাতের কোনো চায়ের দোকানে বা কোনো চালার নিচে আশ্রয় নিয়েছেন। বৃষ্টির সময় রিকসার হুড তুলে রাস্তার কিনার ঘেষে রিকসা দাঁড় করিয়ে রেখে তাতেই আশ্রয় নিয়েছেন। দুপুরের খাওয়া সেরেছেন কত জায়গায়! সব কিছুই এই মুহূর্তে তার চোখের সামনে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। স্মৃতিরা আজ বড্ড জ্বালাতন করছে তাকে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন তিনি। কিন্তু কেমন যেন মৃদু দীর্ঘশ্বাস হলো সেটা।
হাসমত উল্লাহর চোখের দৃষ্টিতে অস্পষ্টটা স্পষ্ট হয়ে উঠছে ক্রমে। মাথার উপরে কারেন্টের তারে কয়েকটা কাক কা-কা করছে। বিরক্তিকর! কিন্তু নিত্য হরেক রকম শব্দের মাঝে বাস করতে করতে ওসবে আর বিরক্তি আসে না এই শহরের মানুষের মনে।
হাসমত উল্লাহর বাম গালের উপর এক ফোঁটা পানি পড়ল। ছিটকে তা থেকে বিন্দুপানি বাম কানে প্রবেশ করল। ঠোঁটের উপর পড়াতে তৃষ্ণাটা চনমন করে উঠল। চোখের পাতা বার দুয়েক নাড়লেন তিনি। এরপর বড় বড় ফোঁটায় পানি পড়তে লাগল। চায়ের দোকানি চিল্লিয়ে বলল, ‘চাচা মিয়া, এইবার ঘরে যান গা। বিষ্টি আসতেছে। ঝড়ও আইবো বোধহয়।’
তাড়াতাড়ি নিজের টং দোকানটা গুছিয়ে সবুজ পলিথিন দিয়ে মুড়ে ফেলল দোকানি। তারপর যাওয়ার আগে বলে গেল, ‘অখনও যান নাই? জলদি করে ঘরে যান গা।’
হাসমত উল্লাহ একটুও নড়লেন না। কিছু বললেনও না।
কোত্থেকে একটা মাছি এসে মুখের কাছটায় ভন ভন করে গেল।
বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। মুষলধারায় বৃষ্টি।
হাসমত উল্লাহ তেমনিই পড়ে আছেন। সামনে দিয়ে ছুটন্ত পায়ের আবছায়া দেখলেন। ছিটকে তার গায়ে পানি লাগল। তারপর চোখের সামনেটা এক ঝটকায় অন্ধকার হয়ে গেল। আগ মুহূর্তে শরীরটা একটা মৃদু ঝাঁকুনি দিল। তার আগে চোখেমুখে একটা বেদনার ছাপ দেখা গেল। সেই সাথে মৃদু একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এলো বুকের গভীর থেকে। তারও আগে দূর থেকে একটা ছেলেকে ছুটে আসতে দেখলেন। বৃষ্টির পানি আশাপাশে ছিটিয়ে শাঁ করে বীরদর্পে চলে গেল একটা পিকআপ গাড়ি। গাড়িটা চলে যেতেই রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখলেন ছেলেটাকে। বৃষ্টির পানিতে দ্রুত ছড়িয়ে যাচ্ছে লোহিত তরল যোজক কলাগুলো।
= ঃ =

৮৩৯ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
লেখালেখি শুরু সেই ছোটবেলা থেকে। ১৯৯৪ সালে একটি জাতীয় সাপ্তাহিকে প্রথম লেখা ছাপা হয়। লেখাটি ছিল একটি ছোটগল্প। মূলত গল্প ও উপন্যাস লিখতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করি। তবে ছড়া, কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ প্রভৃতিও লিখে থাকি। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক পত্রিকায় নিয়মিতই আমার লেখা ছাপা হয়। আমি মূলত শিশু-কিশোরদের জন্য লিখতে বেশি স্বাচ্ছন্ন বোধ করি। বড়দের জন্যও কম লিখি না। মৌলিক বিষয়ের উপর লিখতে ভালো লাগে। গতানুগতিক কিছুই ভালো লাগে না। চেষ্টা করি ব্যতিক্রম কিছু সৃষ্টি করতে।
সর্বমোট পোস্ট: ৬ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ৯ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৬-০৪ ১৩:৫২:১৫ মিনিটে
banner

৬ টি মন্তব্য

  1. আমির হোসেন মন্তব্যে বলেছেন:

    জুবায়ের ভাই চমৎকার গল্প। লিখতে থাকুন অবিরত।

  2. আজিম হোসেন আকাশ মন্তব্যে বলেছেন:

    ভাল লাগল।

  3. আরিফুর রহমান মন্তব্যে বলেছেন:

    গল্পটি ভাল লাগল। ধন্যবাদ।

  4. শাহ্‌ আলম শেখ শান্ত মন্তব্যে বলেছেন:

    বাহ্ চমত্‍কার লিখেছেন !
    অসংখ্য ভাল লাগা জানালাম । এগিয়ে যান ।
    ভাল থাকবেন প্রত্যাশা রইল ।

  5. সবুজ আহমেদ কক্স মন্তব্যে বলেছেন:

    একটি চমৎকার গল।প পড়লাম বেশ ভাল ভাবণা
    বেশ সুন্দর লিখণী
    বেশ বেশ ভাল

    শুভ কামনা রইল
    ভাল থাকুন ভাল লিখুন

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top