Today 01 Dec 2022
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

যেখানে আকাশ মাটি ছুঁয়েছে

লিখেছেন: মোস্তাক আহমেদ | তারিখ: ২১/০৯/২০১৩

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 1081বার পড়া হয়েছে।


হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে গেল। ভোর রাতের এ সময়ে আমার তেমন ঘুম ভাঙে না। কী জানি একটা স্বপ্ন দেখছিলাম। আবছা আবছা মনে পড়ছে; জঙ্গল, ফুল, ছোট সাদা বাড়ি। স্বপ্নে নাকি কোন রঙ দেখা যায় না। আমার মাথায় বোধহয় কোন সমস্যা আছে। আমি সবসময়ই রঙিন স্বপ্ন দেখি। এই তো – ঘন নীল ফুল, তার পাশে হলুদ ছোট্ট একটা ফুল, পিছনে সবুজ জঙ্গল।

বিছানার পাশের টেবিল থেকে পানির গ্লাসটা নিয়ে ঢক ঢক করে পুরোটা খেয়ে ফেললাম। তেষ্টা পেয়েছিল খুব। ঘড়িতে দেখি ৪টা বাজে। মনে হচ্ছে আর ঘুম আসবে না। বিছানা থেকে নামার সময় জোরালো ক্যাঁচর-ম্যাচর শব্দ করে খাট তার দুর্বলতার কথা জানিয়ে দিল। খাট টা বদলানো দরকার। যখন প্রথম রাজশাহীতে চাকরী নিয়ে আসি তখন ভেবেছিলাম অল্প কয়েকদিন থাকব, সস্তা কিছু খাট-টেবিল কিনে কয়দিন চালিয়ে নিই। ২৯০০ টাকায় খাট, টেবিল, চেয়ার, আলনা পুরো প্যাকেজ কিনেছিলাম! সব কেরোসিন কাঠের। দোকানদার আশ্বাস দিয়েছিল, ‘ভাই, নিয়া যান, জন্মেও ঘুণ ধরব না।’ ঘুণ ধরেনি সত্যি কিন্তু কাঠগুলো খুব দুর্বল, বড়ই ক্যাঁচর-ম্যাচর করে। অবশ্য দাম হিসেবে যথেষ্ট সার্ভিস দিয়েছে। অল্প কয়দিন, অল্প কয়দিন করে তো বছরখানেক হয়ে গেল। আমার যাবার ডাক আর আসে না। আসবে বলেও আর মনে হচ্ছে না।
এই কাঠের নাম কেরোসিন কাঠ কেন কে জানে! কেরোসিন নামে কোন গাছ থাকার কথা না। কোন গাছ থেকে কেরোসিন তেল পাওয়া তো সম্ভব না!

একটু শীত শীত লাগছে। টিশার্টের উপর একটা শার্ট চাপিয়ে নিলাম। তারপর চেয়ারটা নিয়ে বারান্দায় আসলাম। এখানে কোন বাল্ব নেই। আজকে সকাল হওয়াটা দেখা যাক। অনেকদিন দেখা হয়নি।

ভার্সিটিতে পরীক্ষার সময় রাতে দশটা-এগারটায় ঘুমিয়ে ভোর তিনটা-চারটায় উঠতাম। ওই সময় পড়তে ভালো লাগতো। তখন সকাল হওয়াটা দেখতে পেতাম। সূর্যের কোমল রূপটা দেখতে খুব ভালো লাগতো। চারপাশ খুব শান্ত। কিছু নামাজী ছেলে নামাজ পড়তে হলের মসজিদে যেত। আমিও দু-একবার গিয়েছি। একটু হাঁটাহাঁটি করতাম আর ভাবতাম এত সুন্দর সকালটা মিস করা উচিত না। এরপর থেকে পরীক্ষার পরেও ভোরে উঠে সকাল হওয়াটা দেখব। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠে নি। পরীক্ষা শেষ, ভোরে উঠাও শেষ। আর কেন জানি পরীক্ষার সময় সকাল দেখতে বেশি ভালো লাগে। বোধহয় এই অজুহাতে পড়াশোনায় কিছুক্ষণ ফাঁকি দেওয়া যায়, তাই।

পড়াশোনা, পড়াশোনা করে লাইফ হেল করে ফেললাম। তবে খুব ভালো রেজাল্ট করেছিলাম। আমাদের ডিপার্টমেন্টে নাকি আগে কেউ এত ভাল করে নি (আমি দাবি করছি না। আমার কাছে কোন প্রমান নেই)। ভার্সিটির শেষ পরীক্ষা শেষে হেডস্যার তাঁর রুমে ডেকে বললেন, ‘হাসান, তুমি আগামীকালই তোমার CV দিয়ে যাবে। আমি চাই তুমি আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই ডিপার্টমেন্টে জয়েন কর। আপাতত পার্টটাইম, পরে সুযোগমতো সার্কুলার দিয়ে পার্মানেন্ট করে নেব।’

হেডস্যারের রুম থেকে বের হয়েই দিলাম একটা লাফ। প্রচণ্ড জোরে চিৎকার দিতে ইচ্ছা করছিল। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলালাম। এত ভালো লাগছিল! আমার আজীবন স্বপ্ন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হব। আমি যখন ফার্স্ট ইয়ারে বাড়ি থেকে আসি তখন আমার হাইস্কুল শিক্ষক বাবা বলেছিলেন, ‘ভালো করে পড়াশোনা করবে। তুমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পারলে খুব খুশী হব।’ বাবাকে ফোন দিয়ে খুশির ব্যাপারটা জানালাম।

এর কিছু দিন পর ডিপার্টমেন্ট বিল্ডিং এর নিচে এক ছোট ভাই (হেডস্যারের থিসিস স্টুডেন্ট) উত্তেজিত হয়ে বলল,
‘ভাই শুনছেন, রিফাত ভাই টিচার হইছে। পার্টটাইম’।
‘কোন রিফাত ভাই? ০৫ এর?’ আমার খুব খারাপ আশঙ্কা হল।
‘হ ভাই’।
‘ও কিভাবে টিচার হবে! ওর তো রেজাল্ট খুব খারাপ!’
‘ওনার CGPA ৩.১০!’
‘তুই খবর ঠিক জানিস?’
‘হ ভাই, গতকাল রাতে হেডস্যার কইছে।’

আমি ওর কাছ থেকে সরে আসলাম। আমার খুব কান্না পাচ্ছিল। ওর উত্তেজিত হয়ে আমাকে বলার কারন বুঝতে পারছি। টিচার একজনই হয়েছে, আমি হই নি। ওরাও আশা করছিল আমি ওদের টিচার হয়ে জয়েন করব। আমার তখনও বিশ্বাস হচ্ছিল না। হেডস্যারের সাথে দেখা করলাম। স্যার অনেক কথা বললেন, কিন্তু এ ব্যাপারে একটা কথাও বললেন না। আমি যা বোঝার বুঝে নিলাম। হেডস্যারের রুম থেকে বের হওয়ার পর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। ভাগ্যিস কেউ দেখে নি।এতবড় ধাড়ী ছেলে কান্নাকাটি করছে, নিশ্চয় খুব বাজে দেখাচ্ছিল। কিন্তু কী করব! আমি যে অনেক বেশি আশা করেছিলাম।


সূর্য ওঠা শুরু করেছে। কোমল লালচে-কমলা আভা ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। এখন আর দুঃখের কথা ভাবব না। সুন্দর কিছু ভাবি। ‘সুন্দর’ কথাটা ভাবলেই আমার নীলার মুখ মনে পড়ে। একটা মানুষ এতো সুন্দর হয় কি করে! আমি এ জীবনে সুন্দর যা কিছু দেখেছি, হোক সে মানুষ, ফুল, নদী বা অন্য কিছু, সব থেকে সুন্দর হল নীলা। অসম্ভব সুন্দর এবং অসম্ভব নিষ্ঠুর। আমার ধারনা নিষ্ঠুরতার কারণে ওকে আরও বেশি সুন্দর আর দুষ্প্রাপ্য লাগে। কোন এক কারণে ও আমাকে পছন্দ করে। আমি এখনও কারণটা জানি না। নিষ্ঠুরতার একটা উদাহরণ দেই, আমি যখন ওকে আমার শিক্ষকতা বিষয়ক দুঃখের কথা জানালাম (সে কিন্তু তখন আমার প্রেমিকা), ওর প্রথম কথা হল, ‘এসব টিচার-ফিচার হয়ে কি হবে। কয়টাকাই বা বেতন। তুই অন্য কিছু দ্যাখ।’ আমার আহত দৃষ্টি দেখে বলল, ‘এত ছিঁচকাঁদুনে ভাব করতেছিস কেন? আমার একটু কাজ আছে, ভাবীর সাথে মার্কেটে যাব। তুই থাক, আমি গেলাম।’

খুব অভিমান হয়েছিল। ভেবেছিলাম অনেক হয়েছে। এই প্রেম-প্রেম খেলার আর কোন মানে হয় না। কিন্তু ও সামনে আসলেই আবার ওর প্রেমে পড়ে যেতাম। একদম সত্যি। আমি সারাদিনে অসংখ্যবার ওর প্রেমে পড়তাম। একদিন সন্ধ্যার দিকে ওকে বললাম,
‘আজ সারাদিনে অন্তঃত একশ বার তোর প্রেমে পড়েছি।’
‘তোর পায়ে কি গ্রীপ বলতে কিছু নাই? যেখানে-সেখানে পড়ে যাস।’
যেখানে-সেখানে তো না, শুধু তোর উপর পড়ি।’
‘খবরদার, কোন ফাজলামি করবি না এখন।’

এমনিতে মেয়ে হিসাবে অতটা খারাপ ছিল না। ওর কিছু খুব দুর্বল বিষয় ছিল। কখনো একটা কথাও বলত না সে ব্যাপারে। আমি কিছু বুঝতে পারতাম। ওর উপর মায়া হত খুব। আমার ধারণা এই দুর্বল ব্যাপারগুলো ঢেকে রাখতেই নিষ্ঠুরতা। শিক্ষকতা বিষয়ক ঘটনার কিছুদিন পর একদিন হঠাৎ নীলা বলল,
‘আমি ঠিক করেছি তোকে বিয়ে করব। তুই কি রাজী আছিস?’
‘মানে!!!’ আমার মাথা আসলেই একটা চক্কর দিয়ে উঠল।
‘মানে হল, তুই কি আমাকে বিয়ে করতে রাজী আছিস?’
‘আমি রাজী (আমি তো সবসময়ই রাজী ছিলাম!) কিন্তু এখন বিয়ে করব কিভাবে! আমি বেকার, তুই বেকার। তোরে খাওয়াবো কি?’
‘আমার খাওয়া নিয়ে এত চিন্তা করতে হবে না। বিয়ে করব গোপনে। আমরা যেরকম ছিলাম সেরকমই থাকব। শুধু বিয়েটা করে রাখব।’
‘হঠাৎ বিয়ে নিয়ে খেপলি কেন?’
‘আমি ভেবেচিন্তে দেখলাম, পাত্র হিসাবে তুই নেহায়েত খারাপ না। তাই আর দেরী না করার সিদ্ধান্ত।’

এবং আমারা বিয়ে করে ফেললাম। আমি আজও জানি না ও হঠাৎ কী মনে করে আমাকে বিয়ে করেছিল। শিল্পপতির মেয়ে, অসাধারণ সুন্দরী; ওর পাত্রের অভাব হওয়ার প্রশ্নই আসে না। সত্যি বলতে কি, এতদিন আমার প্রেমিকা থাকলেও আমি নিজেকে এটা বিশ্বাস করাতে পারতাম না যে, আমারা একদিন বিয়ে করব।

বিয়ের পর আমি ওর কাছ থেকে কিছু ভালবাসা পেয়েছিলাম। কাজী অফিস থেকে বেরিয়ে রিকশায় উঠে বলল,
‘আজ থেকে আমি তোমাকে তুমি করে বলব।’
আমি একটু চমকে গেলাম। এত কোমল গলায় ওর কথা এর আগে কখনো শুনতে পাই নি।
‘বলবি…..মানে.., বলবে’
‘তুমি কখনও আমাকে ছেড়ে যাবে না।’
‘যাব না’
‘পুরো বাক্য বল।’
‘আমি কখনও তোমাকে ছেড়ে যাবে না।’
‘প্রমিস?’
‘প্রমিস।’
তারপর চুপ করে থাকল। ওকে এত শান্ত, এত কোমল আমি আগে কখনো দেখিনি।

সেদিন আমাদের বাসরঘর হয় নি। তার কিছু দিন পর যখন রাজশাহীতে চাকরী নিয়ে আসি তখন ও বাসায় ম্যানেজ করে আমার এখানে তিন দিন ছিল। স্বপ্নের মতো তিন দিন! আমার জীবনের সবচেয়ে সুখের তিন দিন। এই তিন দিনে আমি যত ওর সঙ্গ পেয়েছিলাম গত তিন বছরেও আমি তত পাইনি। আমার প্রতি ওর ভালবাসাটা বুঝতে পেরেছিলাম। এই এক রুমে আমাদের সুখের সংসার তৈরী হয়েছিল। আমরা একসাথে বাজার করেছি, একসাথে রান্না করেছি, একসাথে ঘুমতে গেছি। সকালে ঘুম থেকে উঠে ওর মুখটা দেখতে পেলে বুকের মধ্যে খুব শান্তি লাগত। নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মনে হত।

আইনত এখনও নীলা আমার স্ত্রী। তবে আর বেশি দিনের জন্য না। মাসখানেক আগে নীলা জানিয়ে দিয়েছে, ও আর এই রিলেশনটা রাখতে চায় না। ডিভোর্স দিতে চায়। আমি যেন কোন ঝামেলা না করি। সে হিসাবে বোধহয় আর মাসদুয়েক নীলা আমার স্ত্রী।

 


সূর্য পুরোপুরি উঠে গেছে। দোতলায় ফাহমিদের সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে। চার-পাঁচ বছর এর অসম্ভব দুরন্ত একটা বাচ্চা। ইদানীং আমার সাথে একটু খাতির হয়েছে। ওকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় বড় হয়ে কি হবে, তাহলে গম্ভীর মুখে বলে, বাসের ড্রাইভার হবে। পল্টু নামে তার একটা হেল্পার থাকবে যে তাকে ‘ওস্তাদ’ বলে ডাকবে আর বলবে, ‘ওস্তাদ, ডাইনে পেলাস্টিক’, আর ও প্যাঁ পোঁ হর্ন বাজিয়ে অনেক জোরে বাস চালাবে। ইদানীং অবশ্য ওকে সিনেমাজগতে আগ্রহী হয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে এবং মনে হচ্ছে অচিরেই বলিউডের রণবীর কাপুর বাস ড্রাইভার এর শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়াবে।

সকালটা বেশ ভালো লাগছে। একটা নতুন দিনের শুরুটা খারাপ হল না। একটু তাড়াহুড়া করতে হবে। ফয়সাল ভাই আজ তাড়াতাড়ি অফিস যেতে বলেছে। একটা আর্কিটেক্চারাল ফার্মে জুনিয়র আর্কিটেক্ট হিসেবে বছরখানেক চাকরী করছি। আপাতত এটাই আমার রুটি-রুজির অবলম্বন। ফয়সাল ভাই যদিও আমার বস এবং বেশ সিনিয়র তবু আমার ভার্সিটির বড় ভাই হিসাবে সম্পর্কটা একটু আন্তরিক।

অফিসে এসে ফয়সাল ভাইয়ের দেওয়া কাগজপত্রগুলো দেখে খুব মেজাজ খারাপ হল। গতকাল সাবমিট করা আমার ডিজাইনে কিছু কারেকশন করতে বলেছে। অনুসরণীয় ডিজাইন হিসেবে কিছু ফালতু চলতি বিল্ডিং এর ছবি দিয়েছে। আসল ডিজাইনটা আমার অনেক পছন্দ ছিল। কিন্তু এই ব্যাটা ডিজাইনটা স্রেফ খুন করতে চায়।
‘ভাই, এই ব্যাটা কি আলু-পটলের ব্যবসা করে?’
‘না, রড-সিমেন্টের’ ফয়সাল ভাই হেসে ফেলে।
‘তা রড-সিমেন্ট নিয়ে থাকলেই তো পারত। রুচি বলতে কিছু নাই। একটা সুন্দর জিনিস যে অসুন্দর হয়ে যাবে তা বোঝার এতটুকু বুদ্ধি নাই।’
‘ও নিয়ে মাথা ঘামিও না। আমরা প্রফেশনাল ডিজাইনার। সো, ক্লায়েন্টের খুশীই আমাদের খুশী। আর তোমার আগের ডিজাইনটা আমার পছন্দ হয়েছে। ওটা নিয়ে আমার একটা আইডিয়া আছে। ফাইনাল হলে তোমাকে জানাবো।

বিকেলের দিকে জানতে পারলাম আমাদের ঢাকা ব্র্যাঞ্চের এক ক্লায়েন্ট আমার আগের ডিজাইনটা পছন্দ করেছে। আমাকে ঢাকা যেতে হবে। আমার চোখ জ্বালা করে উঠল। ঢাকা! এই শহর নিয়ে ভার্সিটি লাইফসহ আরো অনেক স্মৃতিই আছে। কিন্তু এখন ঢাকা শুনলেই মনে হয়, যে শহরে নীলা থাকে!


ধানমণ্ডির এই রেস্টুরেন্টে আগে কখনো আসিনি। বছরখানেক আগে এই রেস্টুরেন্টটা ছিল না। সাইনবোর্ড দেখে নিশ্চিত হয়ে নিলাম। ‘পানকৌড়ী’। বেশ বড়লোকি হাব-ভাব। এখানেই নীলা দেখা করার কথা বলেছিল। একটু ইতস্তত করে ভিতরে ঢুকে গেলাম। নীলা এসেছে কিনা কে জানে। অবশ্য ও খুব সময় সচেতন। আমিই বরং সবখানে মিনিট পাঁচেক দেরি করি। সত্যিই মিনিট পাঁচেক। এর বেশিও না, আবার কমও ঘটেছে খুব কম।এত চেষ্টা করেছি যেন এক মিনিটও দেরি না হয়, তারপরও কাজ হয় না। বোধহয় কোন এক ধরনের মেন্টাল ব্লক।

যা ভেবেছি তাই, নীলা আগেই এসে বসে আছে। একটা কালো শাড়ি পরেছে। কালো কিন্তু জমকালো, পাড়ের দিকে গাঢ় লাল রঙের চিকন লাইন টানা। একটু সাজগোজ করেছে। কালো আগুনের মতো জ্বলছে। মনে হচ্ছে পুরো রেস্টুরেন্ট আলো হয়ে গেছে।
‘কেমন আছো?’ চেয়ার টেনে বসতে বসতে জিজ্ঞেস করি।
‘ভালো। বেশ ভালো। তোমার কাজের খবর কি? শেষ?’
‘হ্যা, অফিস থেকে বের হয়েই এখানে আসলাম।’ ‘তুমি আগের থেকেও বেশি সুন্দর হয়েছো’, আমি যোগ করি।
একটু হাসল। ‘থ্যাংকস। তোমার এ ধরনের প্রশংসা করতে পারছি না। আগের থেকে একটু রোগা হয়েছ। এক্সারসাইজ করা কি বাদ দিয়েছ?’
‘মাসকয়েক ধরে করা হচ্ছে না’
‘শরীরের যত্ন নাও। সুঠামদেহী ব্যাপারটা কিন্তু চলে যাওয়া শুরু করেছে।’
আমি হাসি।
‘পেপারস গুলো?’ ডিভোর্সের পেপারস। ওগুলো সাইন করার জন্যই আসা!
যদিও অনেক নির্লিপ্ত থাকার চেষ্টা করছিলাম, তারপরও সাইন করার সময় খুব কষ্ট হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল ঠোঁট কেটে গেছে। মুখের ভিতরটায় নোনা রক্তের স্বাদ।
‘তোমার স্কলারশিপের কি খবর?’ খাওয়া শুরু করতে করতে নীলা জিজ্ঞেস করে।
‘কোন খবর নাই। এখনও অ্যাপ্লাই ই করি নাই।’
‘সেই ভালো দুইটা আর খারাপ দুইটা?’
‘হ্যা’
ভালো দুইটা আর খারাপ দুইটা মানে হল বিশ্বের দুইটা খুব ভালো ইউনিভার্সিটি আর দুইটা তুলনামূলক খারাপ যেগুলো র‍্যাংকিং এ ৯০ এর পরে।
‘ভালো দুইটা তো এমআইটি আর মেলবোর্ন?’ নীলার জিজ্ঞাসা।
‘হ্যা, আগের দুইটাই।’
‘তুমি কি খুব তাড়াতাড়ি আবার বিয়ে করছ?’ এবার আমি জিজ্ঞেস করি।
‘নাহ, কোন তাড়াহুড়ো নাই।’ নীলা হাসে।
‘তোমার পোর্টফোলিও তৈরি কমপ্লিট?’ নীলা আবার প্রশ্নকর্ত্রীর ভুমিকায়।
‘না’
‘তোমার সেই কাঁচ বাড়িটা পোর্টফোলিওতে দিও। এমআইটি হয়ে যাবে।’
‘কাঁচ বাড়ি’ র কথা আমি ভুলেই গেছিলাম। ‘কাঁচ বাড়ি’ হল আমার ড্রিম প্রোজেক্ট। একটা বাড়ি, সম্পূর্ণটা কাঁচের তৈরি। কোনোরকম রঙ করা হবে না, কিন্তু সূর্যের আলোর সাত রঙ কাঁচের বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলের মাধ্যমে ব্যবহার করে বাইরের এবং ভিতরের দেওয়াল গুলো রঙিন হয়ে থাকবে। সেই রঙ আবার দিনের বিভিন্ন সময়ে বদলে যাবে। দেওয়ালে দেওয়ালে থাকবে রংধনুর রঙ ব্যবহার করে নানা পেইন্টিং। সবই সূর্যের আলো ব্যবহার করে।
‘ওটাতে কাঁচ নিয়ে কিছু টেকনিক্যাল ব্যাপার আছে যে বিষয়ে আমার তেমন পড়াশোনা নেই’, আমি নীরবতা ভাঙি।
‘তোমার ফ্ল্যাটে কাঁচ বিশেষজ্ঞ একজন আছেন না? ওনার সাহায্য নাও।’
নীলা রুয়েটের গ্লাস এন্ড সিরামিক্স ইঞ্জীনিয়ারিং এর প্রভাষক শফিক ভাই এর কথা বলছে। আমরা তিনজন রাজশাহীর ফ্ল্যাটটা ভাড়া নিয়েছি। বাকিজনও রুয়েটের প্রভাষক।
‘দেখি কি করা যায়।’

‘মাস তিনেক ধরে মাউন্টেন ক্লাইম্বিং ট্রেনিং করছি। আই জাস্ট লাভ ইট। সো থ্রিলিং! ব্যাপারটা সিরিয়াসলি নেওয়ার ডিসিশন নিয়েছি। ঠিক করেছি আগামী দুই বছরের মধ্যে এভারেস্ট এক্সপেডিশন এ যাব।’ নীলা একটু উত্তেজিত গলায় বলে।
‘খুব ভালো’, আমি খুব একটা অবাক হই না। নীলার সবসময়ই নতুন কিছু করার দিকে ঝোঁক।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ।
‘তোমার জানতে ইচ্ছে করে না যে কেন আমি তোমাকে ডিভোর্স দিচ্ছি?’
‘না, জেনে আর কী লাভ। যে কারণেই হোক, নিশ্চয় সেটা তোমার কাছে ডিভোর্স দেওয়ার জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।’

‘তোমাকে কিছু কথা বলতে চেয়েছিলাম। তারপর ভাবলাম লিখে জানালে ভালো হবে। এই চিঠিটা রাখ। এখান থেকে বের হবার পর পড়বে।’
ওর বাড়িয়ে ধরা খামটা নিই। একটু অবাক হই। নীলা সাধারণত কিছু লিখে জানাতে পছন্দ করে না। ওর কাছে ব্যাপারটা নাকি অনেক ন্যাকা লাগে।
আমি খাওয়ার দিকে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করি। অজান্তেই চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। কি খাচ্ছি দেখতে পারছি না। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিই। নীলার দিকে তাকাই। এত সুন্দর! আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। এই মেয়েটা কিছুদিন আগেও সম্পূর্ণ আমার ছিল।

(চলবে)

 

১,১৯৭ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
বই পড়তে ও স্বপ্ন দেখতে ভালবাসি । পেশায় ছাত্র শিক্ষক দুটোই। মাস্টার্স করছি এবং একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে আছি ৯-১০ মাস হল। সাহিত্যের কিছু বুঝি না। যা ভালো লাগে তাই পড়ি। অনেক অনেক কিছু লিখতে ইচ্ছে হয়। কত-শত মানুষ, কত হাসি, কত গান, কত দুঃখ! কিন্তু হায়, লেখক হিসেবে আমার ক্ষমতা খুবই সীমিত।
সর্বমোট পোস্ট: ৫ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ১৬ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৭-১২ ১৪:৪৭:৩৪ মিনিটে
banner

১০ টি মন্তব্য

  1. এ টি এম মোস্তফা কামাল মন্তব্যে বলেছেন:

    বেশ মজা পাচ্ছি। তবে সব কিছু যে রকম তাড়াতাড়ি ঘটছে সেটা উপন্যাসের চেয়ে গল্পের কথাই মনে করিয়ে দেয়। লেখার ভঙ্গিটা বেশ লাগলো। পাঠককে আঠা দিয়ে আটকে রাখবে।

  2. শাহ্‌ আলম শেখ শান্ত মন্তব্যে বলেছেন:

    বেশ তো লিখেছেন !
    ভাল লাগা জানিয়ে গেলাম ।

  3. এম, এ, কাশেম মন্তব্যে বলেছেন:

    চালাইয়া যান
    অনেক ভাল লাগা।

  4. তৌফিক মাসুদ মন্তব্যে বলেছেন:

    জীবনের বিভিন্ন বাঁকের চমৎকার ধারাবাহিক বর্ননা এঁকেছেন আপনার লেখায়। পরবর্তি পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।

    আপনার জন্য শুভকামনা রেখে গেলাম অবিরত। আপনার অনুভুতিগুলো সকলকে ছুয়ে যাক এই কামনাই রইল।

  5. আরজু মন্তব্যে বলেছেন:

    চমৎকার ধারাবাহিক বর্ননা আপনার লেখায়
    ভাল থাকুন
    শুভকামনা

  6. আমির হোসেন মন্তব্যে বলেছেন:

    অনেক ভাল লাগল। :)

  7. আমির হোসেন মন্তব্যে বলেছেন:

    পড়লাম ‍সাথে আছি।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top