Today 19 Jun 2021
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

শুদ্ধ

লিখেছেন: আযাহা সুলতান | তারিখ: ১৯/০৭/২০১৩

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 1048বার পড়া হয়েছে।

‘অকর্মণ্যলোক অপদার্থ বটে’ অনেকক্ষেত্রে বাক্যটা যথার্থ মনে করি না। বাঘের খাঁচা ভাঙতে যাদের বিন্দুমাত্র বলপ্রয়োগ করতে হয় না, তাদের যে সামান্য কাম দেখে ঘাম ঝরে যায় তা শুদ্ধকে না দেখা পর্যন্ত বুঝা দায়। তীর্থ ঘুরে, পবিত্রস্থান প্রদক্ষিণ করে, মসজিদ-মাজারে মানত রেখে; মা-বাবার বহু সাধনার ফল : জন্ম নেয় একটি সন্তান–পবিত্রাত্মার ফসলসরূপ নাম রাখা হয় ‘শুদ্ধ’।

কোথায়–কী কিতাব পড়ে সে এমন্ত্র আবিষ্কার করল জানি না, সারা দিন টো টো করে ঘুরবে আর যথাসময়ে আহারসামগ্রী গিলবে। প্রতিদিন শঙ্খনদীর তীরে বসে বড়শির ছিপ ফেলে মাছের অপেক্ষা করবে আর জলের বুদবুদ দেখবে এবং মনে মনে বলবে, সৃষ্টিকর্তা বোধহয় এখানেই তাঁর সমস্ত গুপ্তধন লুকিয়ে রেখেছে! কিন্তু ডুব দিয়ে দেখার দুঃসাহস কখনো করতে পারবে না।

 

: শুদ্ধ!

: কী?

: ওখানে বসে কী করিস?

: তোর মাকে হাঙ্গা দিতাছি। দেখিস-না শালার পুত বড়শি ফেলছি। পানিতে বড়শি ফেললে যে মাততে নেই সেকথা জানিস না জানোয়ার?

: তাই নাকি! বড়শি ফেললে বুঝি মাততে নেই?

: হাঁ রে গাধা।

: মাতলে কী হয়?

: মাছে শুনে ফেলে।

: মাছে বুঝি শুনতে পায়?

: শুনতে পায় না মূখ্য? মাছের কি কান নেই?

: কই, আমি ত মাছের কান দেখি না।

: তোর চৌদ্দ গোষ্ঠি মাছ খেলেই ত কান দেখে–দাঁড়া হারামজাদা বলেই ছিপ নিয়ে তার পিছু ছুটে। শুদ্ধসম্বন্ধে যারা ভাল জানে তারা শুদ্ধকে উত্ত্যক্ত করার উদ্দেশ্যে এমন কাণ্ডকারখানা প্রতিনিয়ত করে। শুদ্ধের কথাবার্তায় যতই-না মজা পাওয়া যায় তারচেয়ে তার গালিগালাজ শুনতে তাদের অনেকবেশি স্বাদ লাগে!

 

: শুদ্ধ, এভাবে কি কারও জীবন কাটে?

: তবে?

: কিছু একটা করতে হবে না? আজ পিতার আছে বিধায় চলছে, কাল এ অবস্থাপন্ন নাও থাকতে পারে; তখনকার অবস্থার কথা কিছু ভাবছ কি?

: অবস্থা! অবস্থা আবার কী?

: কেন, বিয়েটিয়ে একটা করতে হবে না? তোমার বাপকে বলি? বিপিন পোদ্দারের পরীর মতো মেয়ে ’নিপি’ শুদ্ধকে খুব পছন্দ করে।

তখন শুদ্ধের নাচন কে দেখে! কারণ, শত পরিহাস সহ্য করতে পারে সে কিন্তু বিয়ের কথাতে ভূতের যত আছর। কুকুরের ভয়ে শিয়াল যেমন হাওয়ার বেগে ছুটে, একথা বলার পর শুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা পেতে হলে সেরূপ ছুটতে হয় উত্ত্যক্তকারীকে। নইলে শুদ্ধের পাটকেলের আঘাতে মাথার খুলি উড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।

 

মণি আছে এমন সাপের মতো শুদ্ধ কারও সঙ্গে মিশে না। চলতে চলতে আপনা-আপনি কথা বলে। পৃথিবীতে এ ধরণের মানুষ খুব বিরল। কেউ জিজ্ঞেস করল, শুদ্ধ, কার সঙ্গে কথা বলছ? ‘তোর বাপের সঙ্গে’ বলে এমনভাবে চেয়ে থাকে যেন ক্ষুধার্ত বাঘ।

 

পুকুর থেকে গোছল সেরে উঠছে এমন সময় কেউ একজন বলল, শুদ্ধ, ওখানে যে কাদা লেগে আছে। আবার ডুবের পর ডুব ডুবের পর ডুব। আবার বললে আবার শুরু… …

এজন্যে শুদ্ধের মায়ের সঙ্গে অনেকের ঝগড়াবিবাদ হতে তুমুল লড়াই চলছে অনেকবার। ঝগড়াপর পরিস্থিতি শান্ত হলে জননীকে প্রায়ই বলতে শুনা যেত, আমার অমন সহজসরল ছেলেটি কি কারও ক্ষতি করে? তাকে খেপিয়ে তোমরা কী মজা পাও শুনি? তোমাগো মতো অত বুদ্ধিসুদ্ধি থাকলে কি আমাগো শুদ্ধের এ কপাল।

 

এ ধরণের অনেক কথা শুদ্ধসম্বন্ধে অনেকে বলাবলি করতেও শুনা যায় : ছয় ফুট দেহের অধিকারী হয়েছে ঠিকই তবে স্বভাব এখনো নির্বোধ বালকের মতো… …ইত্যাদি।

 

: শুদ্ধ, তোর বুদ্ধিটা যে কবে হয় বাবা।

: কেন মা, আমার বুদ্ধি কি এতই কম?

: লোকে ত তাই বলে।

: আমি কি লোকের কোনো দোষ করি মা?

: এই পৃথিবীটা তোর মতো ভাল লোকের বসবাসের জায়গা নয় গো বাপ।

: কেন গো মা?

: তোরে যে আমি কি করে বুঝাই! আচ্ছা, তুই যাকে তাকে গালি দিবি কেন?

: আমি কি শুধু শুধু গালি দি মা? আমাকে তারা এভাবে খেপায় কেন?

: তোকে খেপালেই তুই খেপবি কেন? কয়েকবার কোনো জবাব না দিয়ে চলে আসতে পারিস না? তখন থেকে দেখবি তোকে আর কেউ খেপাচ্ছে না।

: ওরা এমন কতক আচরণ করে মা, সহ্য করতে যে পারি নে। ছেলে-যুবক হতে এমনকি বৃদ্ধরাও…বলে কি, আমি নাকি…

: বদলোকের স্বভাব অমন করা, ভাল লোকের কাজ সহ্য করা। এ কানাঘুষা আর লালায়িত নানান কথা শুনতে শুনতে ত আমাগো জীবন গেল–মরলে বাঁচি কিনা জানি না। বর্তমানে তোর বাবার সেই অবস্থা আর নেই, খুবই অসুস্থ দেখতেছিস; কখন যে মরে তার হিসেব নেই, সেকথা তোর বুঝতে হবে বাবা।

 

শুদ্ধের বাপের বিষয়াশয় যা ছিল তা শুদ্ধের জীবন চলার জন্যে যথেষ্ট ছিল, কিন্তু বাপের সৎ ভাইদের চক্রান্তে তা আর ধরে রাখা গেল না। ইদানীং দেখলে দেখা যায়–বড়দিঘি আর ছোটবিলে বিঘা দুয়েক জমি এবং ভিটেবাড়ি ছাড়া বেশি কিছু দেখা যায় না। ঋণের পাহাড় মিটাতে গেলে তারও বোধহয় ঘাটতি হবে। তবু এতটুকু আশা–পুত্রকে সাংসারিক দেখা।

 

: তোর বাপের বড়ই ইচ্ছে, মরার আগে বউয়ের মুখ দেখে যাওয়া।

: আমার বউ? কি যে বল-না মা!

: লোকের কানাকানি ত আর ভাল লাগে না রে পুত। তুই এখন অনেক বড় হয়েছিস, সেটা তোকে বুঝতে হবে শুদ্ধ।

: বুঝব না কেন, সামনে আমার পরীক্ষা : সেটা দিয়ে নি–তারপর না হয়…

: বিয়ে করেও ত পড়ালেখা করা যায়–পরীক্ষাটা নাহয় বিয়ের পরে দিবি। তোর বাপের কখন যে কি হয় সেটা ত আর বলা যায় না রে বাবা।

: তা হলে আমি একটা মেয়ের কথা বলি?

মা খুব খুশি হল : স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল–তোর খুশিতে আমাগো খুশি; তবে মেয়েটি কার, কোথাকার শুনি?

: বিপিন পোদ্দারের মেয়ে নাকি পরীর মতো সুন্দর, আমাকে খুব পছন্দ করে।

: কে বলেছে বাবা?

: নন্য ডাকাত্য।

আহা রে পুত তোর যে কবে বুঝ হয় বলে মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে–বিপিন পোদ্দার রাজার মতো লোক, তার একমাত্র আদরের দুলালীকে আমাদের এ অভাবের সংসারে কি দেবে বাবা। তারচেয়ে অনেকবেশি সুন্দরী একখান মেয়ে আমাগো শুদ্ধের জন্যে আমরা বউ করে আনব।

 

বিপিন পোদ্দার মামার বাড়ির দিক থেকে প্রায় শত বিঘা জমি পেয়ে আজ মস্ত পোদ্দার। চলনে-বলনে নবাবের হাবভাব। রোজ কত কত লোকের আনাগোনা তার বাড়িতে। পিছে পিছে গ্রামসুদ্ধ লোক ঘুরেবেড়ায়। ‘কর্তা নমস্কার’ ‘হুজুর সালাম’ প্রতিদিন চৌরঙ্গিহাটের বৈঠকখানায় বসে বিপিন পোদ্দারের বিচারাসর। ‘সালামতুল্লার ধানখেত কেন খেয়েছে আমানতুল্লার গাইয়ে?’ ‘রঞ্জুনাথের সেগুনবাগানে কেন ডুকেছে পিনাক দাসের ছাগল?’ ‘অরণির মার শিমের চারা অনিষ্ট করছে কেন বর্ণার মার মোরগে?’ এগুলো বিচারের মূলসূত্র।

 

শুদ্ধের বিয়ে হয়ে গেল। বধূর স্বর্ণময়ী রূপ দেখলে অনেকের বাকশক্তি হারিয়ে যায়। অনেকের ফিসফিসানি দেখলে গায়ে কাঁটা দেয়। ‘গরুর গলায় সোনার ঘণ্টা’ এসব কটূক্তির যুক্তি কি বুঝি না। সুনাম করা কঠিন কিন্তু হিংসে করা সহজ।

 

আমরা প্রতিবেশিরা জানলেও–একথা এখনো অনেকে জানে না যে, শুদ্ধ কী ধরণের মানুষ! ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলেও বুঝার সাধ্য নেই শুদ্ধের মধ্যে কোনো অপূর্ণতা বিদ্যমান। কর্ম বিমুখ; তবে যে কাজ স্বেচ্ছায় করবে তার অনেকটা আশা করা যায়, কিন্তু কোনো কিছু জোর করে আদায় করতে গেলে তার নাস্তানাবুদ শতভাগ বলা যায়। স্কুল বন্ধ থাকলেও স্কুলের দরোজা একবার দেখে আসতে ভুল করবে না, কিন্তু পড়তে বললে বলবে, বই পড়ে কি আর রাজা হওয়া যায়। এমন ভাব দেখাবে–যেন পৃথিবীর সমস্ত গ্রন্থ তার পড়া।

 

শুদ্ধ প্রায়ই অলৌকিক কিছু দেখতে পায়। সেদিন চৌরঙ্গিহাট থেকে ফেরার সময়–সন্ধ্যার পর পর দুই বাঘ তার সঙ্গে এসে বাড়ির সদরে পৌঁছে দিয়ে পলকে চম্পট হয়ে যায়। এ কাণ্ডগুলো কিন্তু শুদ্ধ ছাড়া অন্য কারও দৃষ্টিগোচর হয় না। প্রতিনিয়ত দেখা মিলে বিশাল বিশাল সাপের। যেমন প্রহরীরা রাজ্য পাহারায় থাকে তেমন দেখা যাচ্ছে শুদ্ধের পাহারায় সাপজোড়া–কখনো দু-চারটা মিলে তাকে লক্ষ করে আগে-পিছে চলছে! প্রথমদিকে মনে হত–ভয়ে কণ্ঠনালি শুকে কাঠ হত তার। পরে পরে সাপগুলোর আচরণোনুক্রমে ভয় ভেঙে যায়। বিষাক্ত জীবের মধ্যে এমন শান্ত আচরণ কল্পনা করা অসম্ভব। এটা একটা সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার। বিষয়গুলো মায়ের কাছে দুয়েকবার প্রকাশ করেছে সে। মা নিষেধ করছে এগুলো কারও কাছে প্রকাশ না করতে। মায়ের আদেশ পদেপদে পালন করে সে।

 

‘মা, আমি পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি। খুব করে দোয়া করো কিন্তু।’ আজ শুদ্ধের বিএ ফাইনাল শুরু। এক দৌড়ে বাড়ির আঙিনা পার হয়ে গেল। দেখতে-না-দেখতে হাওয়ার বেগে অদৃশ্য হয়ে যায়। মা ছুটে এসে দেখতে না পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে সেজদায় পড়ে ছেলের জন্যে দোয়া করতে লাগে–প্রভু, আমার অবোধ ছেলেটিকে তুমি দুজাহানে সফল করো। মায়ের দোয়া শুদ্ধের জন্যে বিরাট সফলতা বয়ে আনে।

 

পরীক্ষার খাতা নিয়ে বসল, এমন সময় দেখতে পাচ্ছে শুকপাখির মতো অসম্ভব সুন্দর একটা পাখি তার মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। পাখিটার পাখনার বাতাসে শুদ্ধের সমস্ত শরীর বরফের মতো হিম হয়ে আসছে। ঝাপসা হয়ে আসছে চোখের আলো।

 

একটুপর শুদ্ধকে হল ছেড়ে চলে যেতে অনেকে দেখেছে, কিন্তু খাতায় একটি আঁচড়ও দিতে কেউ দেখে নি তবে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর নিখুঁতভাবে লিখিত জমা পড়ছে!

 

মুহূর্তের মধ্যে সারা গ্রামে ঢিঢি পড়ে গেল–শুদ্ধ পাগল হয়ে গেছে! সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায় শিবনাথের মন্দিরে এসে নেচেকুদে কাঁসা বাজাচ্ছে। শান্তার বিয়েতে ডুকে হাঙ্গামা করছে। কালাচাঁদের গাভীবাছুরকে খুটাহারা করে দুলু সিকদারের ধানখেত খাওয়াচ্ছে। খিদির আলির খোঁয়াড় থেকে ছাগলঝাঁক ছাড়িয়ে এনে অরিণ শেখের আলুখেতে চরাচ্ছে। শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে শালাসম্বন্ধীকে ডোরাবেত দিয়ে ইচ্ছেমতো পিটাচ্ছে এবং বলছে : ভাল মানুষ হ, ভাল মানুষ হ।

 

নিশীথে পরিষ্কার কাপড়চোপড় পরিধান করে সেজেগুজে কোথায় অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে কেউ চেষ্টা করেও হদিশ পাচ্ছে না। আরেকদিন মা ডেকে বলছে, আমার জানা হয়েছে–তোর বাবার পরলোকগমন তোর জন্যে শুভাশীষ। আমারও যাওয়ার দিন ঘনিয়ে আসছে রে শুদ্ধ, তখন তোর আজাদ; তবে তোর একটা বিশ্রী কাণ্ড আমার বুঝে আসে না রে বাপ, তুই মানুষের সামনে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে থাকিস; আবার রাতের অন্ধকারে…

শুদ্ধ ঈষৎ হেসে বলে, এখানে মানুষ কে রে মা, আমি উলঙ্গদের সামনে উলঙ্গ থাকি–মানুষের সামনে ঠিকই পরিধান করি; তুমি ভাল করে দেখো, তোমার সামনে কখনো কি আমি…

এটা সত্য, মায়ের সামনে সে কখনো দিগম্বর হয় না। যদিওবা কোনক্রমে মায়ের গোচরে এসে যাচ্ছে, সঙ্গে সঙ্গে কোনো কাপড়চোপর, ছেঁড়া কাঁথা বা বস্তাছেঁড়া খুঁজে তাড়াতাড়ি ঢেকে মাথা নিচু করে বসে পড়বে মাটিতে।

 

শুদ্ধ আজ পাগলের চেয়ে অনেকবেশি পাগলামি করছে! মা আল্লাহর ডাকে চলে যাচ্ছে। হাতীর রশি দিয়ে শুদ্ধকে বেঁধে রাখা যাচ্ছে না। আচরণবিধি ভয়ঙ্কর–যমদূতকে পেলে বোধ হয় গলটিপে হত্যা করত আজ। গালাগালি যা করছে কারও বুঝে আসার সাধ্য নেই। চোখেমুখে আগুনের স্ফুলিঙ্গ বের হচ্ছে। দশ গ্রামের লোক এসেছে মায়ের জানাজায়; তবে জানাজার চেয়ে বেশি এসেছে শুদ্ধের তামাশা দেখতে। তাকে ঘিরে আছে সবাই।

 

সেই প্রথম থেকেই শুদ্ধ বউয়ের প্রতি উদাসীন–কোনো খোঁজখবর রাখে না, কোনো কথাবার্তা বলে না। সামনে এলে বড় বড় চোখ করে দেখবে। যেন চিরশত্রু। বউ মনে করে–শুদ্ধ হাবা। এত দিন শাশুড়ির ভালবাসায় কেটেছে। তাঁর অবর্তমানে এখন সে নিঃসঙ্গ। নিঃসন্তান মেয়েটি কার আশ্রয়ে থাকে…

 

আজকাল শুদ্ধ খুবই শান্ত। কাউকে গালি দেয় না, খেপালেও খেপে না। কারও সঙ্গে কোনো কথাবার্তা বলে না, বোবার মতো শুধু চেয়ে থাকে। কোথায় যায়, কী করে তারও খোঁজখবর রাখে না কেউ। কে খাওয়ায়–কী খায় তাও তদারকের মানুষ নেই আর। নিঃসঙ্গও বটে। কারণ, বউ চলে গেছে কবে। এসংসারে পাগলের ধার ধারে কে। এমন পাগলের কাণ্ড অনেকে দেখেছে বটে তবে শুদ্ধের মতো পাগলের তামাশা সম্ভবত কেউ দেখে নি কখনো। কারও দেওয়া এঁটোভাত খাবে কিন্তু কারও দেওয়া কোর্মাপোলাওতে বালি মিশে দিবে। অনেকের দেওয়া খাদ্য পাখিদের ডেকে খাওয়াবে, কুকুর-বিড়ালকে খেতে দিবে। অনেকের দেওয়া খাদ্য পানিতে ছুড়ে মারবে। অনেক দিনের ভুখা–তবু অনেকের দেওয়া দানাপানি একজর্রা ছুঁয়ে দেখবে না।

 

একবার ভরদুপুরে নির্জন একটি ডোবায় নিজপেটের আঁতড়ি মুখ দিয়ে বের করে ধুচ্ছে! এ অলৌকিকতা এক রাখাল দেখে ফেললে–ভয়ে রাখালের হাত-পা অবশ হয়ে আসে। শুদ্ধ অভয়াশ্বাস দিয়ে রাখালকে কাছে ডাকে এবং ঘটনাটি কাউকে না বলার জন্যে বারণ করে তার হাতে একটা থলি দিয়ে বলে, ঘরে গিয়ে কেউ না দেখে মতো খুলিস। রাখাল ঘরে এসে দেখে থলিপূর্ণ স্বর্ণমুদ্রা! এভাবে শুদ্ধের একের পর এক আধ্যাত্মিকতা নিজগ্রামে জাহির হওয়ার আগেই উধাও হয়।

 

আচার আচরণে শুদ্ধকে যারা কষ্ট দিয়েছে তারা আজ অর্থের ভিখারি–এক পয়সার মুহতাজ। যারা তার প্রতি ভাল ব্যবহার করেছে তারা ধনেজনে জ্ঞানেগুণে হয়েছে বিরাট মানুষ। আজ সারা গ্রাম মশাল জ্বেলেও শুদ্ধের ছায়া খুঁজে পাচ্ছে না। ‘হায় হায়’ করে দিন কাটছে সকলের। আপসোস, এমন মহারত্নকে আমরা চিনতে পারি না!

 

২৬/ ৯/২০১২

চট্টগ্রাম।

১,১৬১ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
সর্বমোট পোস্ট: ৩৭ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ১০৩ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৫-২৯ ২২:০৪:১৮ মিনিটে
banner

৮ টি মন্তব্য

  1. আমির হোসেন মন্তব্যে বলেছেন:

    গল্পটি ভাল লাগল। নিয়মিত গল্প চাই।

  2. আরিফুর রহমান মন্তব্যে বলেছেন:

    বেশ লাগছে। নিয়মিত লিখবেন।

  3. এ হুসাইন মিন্টু মন্তব্যে বলেছেন:

    এটাকে ছোট গল্প বলা যাবে না ।

  4. আসমা নজরুল মন্তব্যে বলেছেন:

    বেশ লাগছে।

  5. কাউছার আলম মন্তব্যে বলেছেন:

    গল্পটি ভাল লাগল। নিয়মিত লিখবেন।

  6. এম, এ, কাশেম মন্তব্যে বলেছেন:

    দারুন গল্প
    অনেক ভাল লাগা ।

  7. মুহাম্মদ দিদারুল আলম মন্তব্যে বলেছেন:

    ভালো লাগলো

  8. শাহ্‌ আলম শেখ শান্ত মন্তব্যে বলেছেন:

    ভাল লেগেছে খুব । ধন্যবাদ আপনাকে ।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top