Today 17 Jan 2022
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

সবুজ আলো

লিখেছেন: তাপসকিরণ রায় | তারিখ: ৩০/১০/২০১৩

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 1097বার পড়া হয়েছে।

তখন ট্রেন চলতে শুরু করেছে। বম্বে গামী ট্রেন।

এখনও অচেতন শুয়ে আছে রোহিত। সঙ্গে দুটি লোক–তার মধ্যে একটি একেবারে ষণ্ডা-গুণ্ডা মার্কা—নাম তার কামাল। অন্যটি অপেক্ষাকৃত সাদাসিধে চেহারার,ও রতন। কামাল ও রতন–ওরা ভাড়া  নিয়েছিল রোহিতদের ঘরের পাশেই। উদ্দেশ্য একটাই– রোহিতকে ধরে নিয়ে যাওয়া।

এক কথায় ওদের ছেলে ধরা বলে। ছেলে মেয়েদের ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে যায় বোম্বাইয়ে। আর সেখানে অনেক দাম দিয়ে ওদের বিক্রি করে দেয়। খরিদ্দার স্বদেশী হলে বেশী দাম পায় না,বিদেশী হলে ভাল পয়সা হাতে এসে যায়।

কামাল পেশাদার ছেলে ধরা।

রতন মেট্রিক পাশ করে ভ্যাগাব্যান্দের মত ঘুরে বেরিয়েছে পথে ঘাটে। নিজের পায়ে দাঁড়াবার আগেই মা,বাপ তার মারা গেছে। অনেক চেষ্টা করেও কোনও ফল হয় নি,কথাও চাকরি যোগার করতে পারে নি। অবশেষে পেটের দায়ে এ ঘাট ও ঘাট ঘুরেও যখন দেখল পয়সা কমাবার কোনও সোজা পথ তার জন্যে খোলা নেই তখন বাধ্য হয়ে কামালের দলে যোগ দিয়ে ছিল।

বেশ কটা ছেলে মেয়ে তার হাত দিয়ে পাচার হয়েছে। তার সঙ্গে কামাল বা তার দলের অন্য কেউ ছিল।

রতনের মাঝে মাঝে রাতে ঘুম ভেঙ্গে যায়। ওর জালনা দিয়ে চাঁদ দেখা যায়। বিষাদে তার মন ভরে যায়–আকাশ যে তার কাছে মৃত–চাঁদ যেন তার ঘরে ছাই রঙা আলো ছড়িয়ে যায় ! ও স্বপ্ন দেখে, ফুটফুটে সেই মেয়েটির–যার নাম ছিল রুণু। চুরি করে নিয়ে যাবার সময় ও কত না কেঁদে ছিল ! রতনের পা ধরে বলে ছিল, কাকু,আমি বাড়ি যাবো,কাকু,আমার বাবা,মা কেঁদে কেঁদে মরে যাবে ! আমায় ছেড়ে দাও কাকু।

রতনের  কথাও যেন নরম একটু স্থান আছে। সে স্থান বড় ছোট হলেও মাঝে মধ্যে ছুঁয়ে যায় তাকে। তখন সে ভালবাসার স্বপ্ন দেখে–সবুজ পৃথিবীর আলো দেখে। তারপর হঠাৎ সে সব ভাবনা কোথাও যেন মিলিয়ে যায়। তার বদলে উঠে আসে সেই কালো মেঘলা আকাশ,ছাই ময়লা জ্যোৎস্না !

রুণু সে দিন রতনের ভেতর থেকে সেই সবুজ ইচ্ছেগুলিকে যেন খুঁড়ে খুঁড়ে বের করছিল। রতন যেন ক্রমশ গলে যাচ্ছিল,স্বপ্নে এক রুণুকে দেখতে পাচ্ছিল। রুণু যেন নীল আকাশের সাদা মেঘের ভেলায় দাঁড়িয়ে অমায়িক হাসছিল।

কামাল রুণুর কথার ওপর আচমকা ধমকে উঠেছিল,চুপ ! কাকু ? কে তোর  কাকু !

ঠিক সে সময় দুজন পুলিশ তাদের দিকে আসছিলি। কামাল আড়াল করে তার রুমাল রুণুর নাকে চেপে ধরে ছিল,গলা পাল্টে নিয়ে বড় আপন সুরে বলে উঠেছিল,এবার শুয়ে পড় মা ! ক্লোরফর্মের আবেশে আচ্ছন্ন হয়ে ঘুমিয়ে গিয়েছিল রুণু। রতনের মন সে দিন বড় বিষণ্ণ হয়ে গিয়েছিল।

পুলিশ তাদের পাশ কাটিয়ে চলে গেলে কামাল ধমকে উঠেছিল রতনের ওপর। গালি দিয়েছিল ওকে। এমন কি তাকে মারার জন্যে হাতও উঠিয়ে ছিল। এই কামালটার ওপর ভীষণ রাগ হয় রতনের। এটা কোন দিন মানুষ ছিল বলে তার মনে হয় না। শেষ পর্যন্ত রুণুকে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল। সে বার অনেক টাকা পেয়েছিল রতন ওরা।

সেই রুণুর কথা অনেক চেষ্টা করেও রতন ভুলতে পারে না। রাতে নেশা করে স্মৃতির পর্দা থেকে সব কিছু সে মুছে দিতে চায়। তবুও কোন দিন মাঝ রাতে যখন ঘুম ভেঙ্গে যায় তার সেই ছাই রঙা চাঁদ তার চোখে এসে প্রতিফলিত হয় !

–কাকু ,আমরা কোথায় যাচ্ছি?

চমকে রতন পাশ ফিতে তাকায়।

রোহিতের সে আচ্ছন্ন ভাব কেটে গেছে–কখন যেন সে রতনের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।

–অনেক দূরে,রতন তার উদাসী গলা ভেঙে বলে ওঠে।

–কেন? রোহিত রতনের দিকে তাকিয়ে আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করে, তারপরই সে কান্নায় ভেঙে পড়ে, আমি ঘরে যাব রতন কাকু,আমি ঘরে যাব !

ট্রেন ছুটে চলেছে–ট্রেনের জানলা দিয়ে হু হু করা শোকার্ত বাতাস যেন কামরার মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। শীতের লোম কাঁটা দেওয়া হওয়ার আবেগ। শুরুতে রতন ও কামাল রোহিতের সঙ্গে ভাব জমিয়েছে –মাত্র কত দিনেই রোহিত কাকু,কাকু বলে রতনের নেওটা বনে গিয়েছিল।

রোহিত কাঁদছে। দু চোখ তার লাল–জলে ভরা। মাঝে মাঝে দু হাত দিয়ে সে কচলে যাচ্ছে তার দু চোখ।

পাশের যাত্রী কামালকে জিজ্ঞেস করলো,ও কাঁদছে কেন ? সে সময় রোহিত চীৎকার করে কেঁদে বলে উঠল,আমি বাড়ি যাব।

পাশ থেকে কামাল রেগে গিয়ে কষে তার গালে এক থাপ্পড় লাগাল।  রোহিত ধপ করে নিজের সিটে বসে নীরবে কান্না করতে লাগলো।

কামাল এবার পাশের যাত্রীর প্রশ্নের উত্তরে বলল,এটা হাড় বদজাত ছেলে,তারপর রতনকে দেখিয়ে বলল,ঐ তো ওর বাবা।

রতনের চোখ পড়ল রোহিতের দিকে–ও রতনের দিকে করুণ দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে।

কামাল বোধহয় টয়লেটের দিকে চলে গেল।

রোহিত নিজের সিট ছেড়ে উঠে এসে রতনের হাতে ঝাঁকি দিয়ে বলে উঠলো,আমি বাড়ি যাব কাকু ! আমি বাড়ি যাব।

গাড়ির ছুটে চলার আওয়াজ ভেঙে রতনের কানে এসে রোহিতের সে কথাগুলি যেন স্পষ্ট হয়ে বেজে উঠলো।

কিছু সময় রতন চুপ করে ছিল। হঠাৎ ও দেখতে পেল,গাড়ির জানালা দিয়ে দেখতে পেল,সকালের নরম হলুদ রোদ। ও দেখতে পেলো সেই সবুজের দেশ,ওর চোখের সামনে,ওর মনের জানলা দিয়ে ওর ছোট বেলা যেন উঠে এলো–সেই শৈশবের মা,বাবার মুখ ফুটে উঠলো।

আজ রতন মা,বাপ হারা,কিন্তু এমনটা তো তার ছিল না !…

গাড়ি কোন ছোট স্টেশনে থেমে আছে। হয় তো লাইন ক্লিয়ার নেই।

কামাল এখনও ফিরে আসে নি।

রতন হঠাৎ উঠে দাঁড়ালো। রোহিতের এক হাত টেনে ধরল–চাপা স্বরে বলে উঠলো,চল !

রোহিতের হাত ধরে সেই অজানা স্টেশনে নেমে গেল রতন। তারপর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে ওরা ছুটতে লাগলো। মাঝে একবার পেছনের দিকে চোখ ফিরিয়ে দেখল,ওদের ট্রেন তখন ছেড়ে দিয়েছে। না,কামাল তাদের কথা টের পায় নি। রতন রোহিতকে নিয়ে ছুটে চলতে চলতে দেখল, তাদের সামনে ছুটে চলেছে এক সবুজ আলো !

সমাপ্ত

 

১,১৮৫ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
নাম :তাপসকিরণ রায়। পিতার নাম : স্বর্গীয় শৈলেশ চন্দ্র রায়। জন্ম স্থান: ঢাকা , বাংলা দেশ। জন্ম তারিখ:১৫ই এপ্রিল,১৯৫০. অর্থশাস্ত্রে এম.এ.ও বি.এড. পাস করি। বর্তমানে বিভিন্ন পত্র পত্রিকাতে নিয়মিত লিখছি। কোলকাতা থেকে আমার প্রকাশিত বইগুলির নামঃ (১) চৈত্রের নগ্নতায় বাঁশির আলাপ (কাব্যগ্রন্থ) (২) তবু বগলে তোমার বুনো ঘ্রাণ (কাব্যগ্রন্থ) (৩) গোপাল ও অন্য গোপালেরা (শিশু ও কিশোর গল্প সঙ্কলন) (৪) রাতের ভূত ও ভূতুড়ে গল্প (ভৌতিক গল্প সঙ্কলন) (৫) গুলাবী তার নাম (গল্প সঙ্কলন)
সর্বমোট পোস্ট: ১১২ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ১৬৬৯ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৮-১১ ১৫:৪৩:৫৪ মিনিটে
banner

৯ টি মন্তব্য

  1. আমির হোসেন মন্তব্যে বলেছেন:

    সুন্দর গল্প। দারুন হয়েছে।

  2. শাহ্‌ আলম শেখ শান্ত মন্তব্যে বলেছেন:

    কাকা ,
    গল্পেও আপনার হাত পাকা ।

  3. সাঈদ চৌধুরী মন্তব্যে বলেছেন:

    কাহিনির আবর্তে স্বপ্নের মধ্যে ডুবে গিয়েছিলাম ।এখানেই লেখকের স্বার্থকতা । অনেক ধণ্যবাদ । সবুজ আলো কথাটি ভালো হয়েছে ।

    • তাপসকিরণ রায় মন্তব্যে বলেছেন:

      সাঈদ,আপনার মন্তব্যে প্রেরণা পেলাম।অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।তবে সম্পাদকের নজরে লেখাটি নির্বাচনের যোগ্যতা পায় নি বলেই মনে হচ্ছে!

  4. আরজু মন্তব্যে বলেছেন:

    কামাল রতন
    রোহিত এর গল্প
    সবুজ আলো
    লাগল ভাল।

  5. সবুজ আহমেদ কক্স মন্তব্যে বলেছেন:

    গল্পটা বেশ চমৎকার মুগ্ধতায় ভরপুর বেশ
    দারুন ভাল ভাবনার প্রয়াশ
    শুভ কামনা

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top