Today 21 May 2022
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

হারিয়ে যাচ্ছে বা গেছে যে সব প্রাচীন ঐতিহ্য

লিখেছেন: গোলাম মাওলা আকাশ | তারিখ: ০৪/০৯/২০১৪

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 2195বার পড়া হয়েছে।

1
হাজার বছরের চলে আসা বাঙ্গালিদের কিছু ঐতিহ্যবাহী জিনিস যা আমরা সেই প্রাচীন কাল হতে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করে আসছি। এই ঐতিহ্যবাহী জিনিস গুলি হাজার বছরের বাংলার সংস্কৃতির এক একটি উপাদান ও বাঙ্গালী সংস্কৃতি – ঐতিহ্যর ধারক যা গ্রাম বাংলার গৃহস্থের সচ্ছলতা ও সুখ সমৃদ্ধির প্রতিক হিসাবে প্রচলিত ছিল। আজ এই আধুনিক যুগে আধুনিক পণ্যের কাছে , আধুনিক কলা কৌশলের নিকট মার খেয়ে আস্তে আস্তে বিলুপ্তির পথে। বাংলাদেশের গ্রামে গঞ্জে এখন পুরোপুরি যান্ত্রিক ঢেউ লেগেছে। মাছে ভাতে বাংগালীর ঘরে এক সময় নবান্নের উত্সব হতো ঘটা করে। উত্সবের প্রতিপাদ্যটাই ছিল মাটির গন্ধ মাখা ধান। ঢেকি ছাটা ধানের চালের ভাত আর সুস্বাদু পিঠার আয়োজন।
যতই দিন যাচ্ছে ততই যেন মানুষের জীবনে এটে সেটে বসছে আধুনিকতার ধারা। একে একে নতুনের চমকে পুরনোরা যেন আস্তে আস্তে দূরে সরে যাচ্ছে। আগের সেই সৌম কান্তি চেহারায় এখন মাঞ্জা পড়ছে ধাপে ধাপে রঙের প্রলেপ। সব কিছু ঢেকে যাচ্ছে চক্মকিতে। এতে করে জীবন ধারায় সঞ্চালিত হয়ে উঠেছে রকেট গতির প্রতিযোগিতা। একটার পর একটা পরিবর্তন এনে দিচ্ছে কী করে নিজেকে আরো বেশি প্রাপ্তির খাতায় নাম লেখানো যায়। ঐতিহ্যের ধারা আজ যেন বার্ষিক উত্সবে পরিণত হয়েছে। প্রদর্শনী আর ক্ষাণিক হৈ চৈ জীবনকে নতুন করে তোলে তার ক্লান্তির ধারায়। মানুষ যেন আজ শারিরীক শ্রম ভুলে যাচ্ছে। খাঁচার পাখি বা খামারে লালন পালন করা মুরগীর মত উৎপাদন করে যাচ্ছে তার চাহিদার মত করে। বেড়ে চলা মানুষের ভীড়ে আর প্রয়োজনের তাগিদে মানুষও যেন যন্ত্র হতে চলেছে। সারা বিশ্ব জুড়ে আরো বেশি প্রাপ্তি ও আরো একটু আরাম আয়েশের আশায় সময় ও শ্রম বাঁচিয়ে নিজেকে আরো বেশি সমৃদ্ধ করে তুলছে। বর্তমানে ভিনদেশী চাকচিক্য সংস্কৃতি সমাজে প্রবেশ করে আমাদের পুরোনো নিজস্ব ঐতিহ্যকে পশ্চাতে ফেলে যেন জ্যামিতিক হারে এগিয়ে চলছে। ঠিক আমাদের পুরোনো সংস্কৃতি গাণিতিক হারের মত দুর্বল হয়ে পড়ছে। তাই এই দুর্বলতাকে পাশকাটিয়ে আমাদের সংস্কৃতিকে আমাদেরই লালন করতে হবে। তা না হলে তখন হয়ত আমাদের নতুন প্রজন্ম এই ঐতিহ্য থেকে একবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।
সত্যি কথা বলতে গেলে আমাদের বাঙ্গালী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যর প্রতীক গুলির কথা আজ যেন রূপকথার গল্পের মতো করে শোনাতে হয় আমাদের নতুন প্রজন্মকে। আগামী প্রজন্মের কাছে হয়তো এটা স্বপ্নের মত মনে হবে। তখন ইতিহাসের পাতায় পড়া ছাড়া বাস্তবে খুঁজে পাওয়া দুঃপ্রাপ্য হবে। নতুবা কোনো যাদুঘরের কোণে ঠাঁই করে নিবে নিজের অস্তিত্ব টুকু নিয়ে।
হারিয়ে যাওয়া আমাদের বাঙ্গালী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যর প্রতীক গুলিঃ
১। পালকের কলম: পাখির পালককে প্রাচীন কাল হতে কলম হিসেবে ব্যবহার করা হতো। পাখির পালককে অফিস আদালতে ও সমাজের অভিজাত ব্যক্তি গন কর্তৃক কিছুটা শৌখিনতার প্রতীক হিসেবে কলম হিসেবে ব্যবহার করা হত। এটি আর দেখা যায় না।
2
২। বন গাছের কলম: বন এক প্রকার গাছ, অনেকটা বাঁশের কঞ্চির মত। এক সময় এই বন গাছের দ্বারা তৈরি কলম ব্যবহার করা হত। বনের কলম কে কালীর দোয়াতে কিছুক্ষণ ডুবিয়ে রাখলে এটি কালি শোষণ করে নিত। এটির কাণ্ড ফাঁপা (অনেকটা এখন কার বিভিন্ন রং এর খাতায় দাগ টানার জন্য যে কলম আমরা ব্যবহার করি তার ভিতরের স্পঞ্জের শিষের মত) বলে সহজে কালি শুষে নিত। এর পর চলত তা দিয়ে লিখা। কালি শেষ হলে আবার চুবিয়ে নিতে হত।
3
৩। বাঁশের কঞ্চির কলম: খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। আমাদের অনেক বাপ দাদারা ( ৪০-৫০ বছর আগে) বাঁশের তৈরি কলম দিয়ে প্রথম লিখা শিখার হাতে খড়ি নিয়েছে। বাঁশের কঞ্চিকে ৪-৫ ইঞ্চি পরিমাণ কেটে নিয়ে তার এক প্রান্ত চোখা করে তাতে কালি ভরে কলম হিসেবে ব্যবহার করা হত।

@@ এই কলম গুলি আধুনিক কালি কলম ও বল পয়েন্ট কলমের নিকট মার খেয়ে আজ বিলুপ্ত।

৪। কলা ও তাল পাতায় লিখা: কাগজের প্রচলন থাকলেও , কলার ও তাল পাতাকে কাগজের বিকল্প হিসেবে লেখার কাজে ব্যবহার করা হত। বিশেষ করে প্রাথমিক স্কুলের ছোট ছোট বাচ্চারা লিখা সুন্দর করতে ও লিখা শিখতে কলা ও তাল পাতা ব্যবহার করত।

@@ কাগজের প্রাপ্যতা ও মূল্য এটি ব্যবহারের একটি কারণ। আমি শুনেছি আমার বড় ভাই তাল পাতায় লিখেছে।

৫।পালের নৌকা: পালের নৌকা বাংলার ঐতিহ্যের অন্যতম একটি উপাদান। ছোট বড় সবধরনের নৌকাতেই পাল ব্যবহার করা হত। মূলত মাঝিরা যখন দাড় টানতে টানতে ক্লান্ত হয়ে যেত বা বাতাস অনুকূল থাকলে পাল তুলে খুব তাড়াতাড়ি এক জায়গা হতে অন্য জায়গায় যাওয়া আসা করা হতো।
5
@@ তবে বর্তমানে প্রত্যেক নৌকায় পালের যায়গা দখল করেছে মেশিন।

৬। খড়ম: খড়ম এক প্রকার জুতা বিশেষ। গ্রাম বাংলায় অনেকে আগে আধুনিক স্যান্ডেলের বা জুতার বিকল্প হিসেবে পায়ে ব্যবহারের বস্তু। কাঠ দ্বারা তৈরি করা হত । খড়ম ২ প্রকার দেখা যায়। যথা:
ক) বয়েল খড়ম
7

খ) দলযুক্ত খড়ম
8
বর্তমানে খড়ম ব্যবহার করা যেন রূপ কথার মত শোনায়।

@@ বর্তমানে তৈরি স্যান্ডেল এর কাছে খড়ম মার খেয়ে গেছে।

৭। পালকী: পালকি আগে অভিজাত শ্রেণীর চলাচলের জন্য (বিশেষ করে মেয়েদের) ব্যবহার করা হত। তবে বর-কনের পরিবহণ করতে এই বিশেষ
9
যানটির ব্যবহার উল্লেখ যোগ্য। বাঁশ, কাঠ, টিন ও লোহার শিক দ্বারা তৈরি পালকি খুব দৃষ্টিনন্দন ও শিল্প সমৃদ্ধ ছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। চারজন বেহারা পালকি বহন করত। সেকালে পালকি ছাড়া বিয়ের সুন্দর আয়োজনটা যেন অসম্পূর্ণ থেকে যেত।
10
@@ আজ যান্ত্রিক সভ্যতায় যন্ত্রের পরিবহণ ব্যবস্থার নিকট টিকতে না পেরে হারিয়ে গেছে পালকি।

৮। গরুর গাড়ি: আমার গরুর গাড়িতে
বউ সেজে…………………………।

11

ওকি গাড়োয়াল ভাই………………………………………………।
12

এরকম জনপ্রিয় গানের কথায় গরুর গাড়ির কথা উল্লেখ আছে। গরুর গাড়ি বাঁশ ও কাঠ দ্বারা তৈরি করা হয়। সাধারণত পল্লী অঞ্চলে গ্রামের মহিলারা নায়েরে গেলে একমাত্র বাহন এই গরুর গাড়ি। গাড়িতে টপর বা নৌকার ছই আর মত ছাওনি দিয়ে একে সাজানো হত।এছাড়া গ্রামের যে কোন পণ্য পরিবহণে ব্যবহার হত গরুর গাড়ি।

@@ আধুনিক পরিবহণ ব্যবস্থার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এখনো কিছু কিছু এলাকায় টিকে আছে গরুর গাড়ি।

৯। শিকা: শিকা গ্রাম বাংলায় গ্রামীণ বধূদের নিপুণ হস্তশিল্পের একটি শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। শিকার ছিল বহুমুখী ব্যবহার। পল্লী বধূরা শিকায়
13

ঝুলিয়ে রাখতো সংসারের বিভিন্ন জিনিস। মাঝে মাঝে রঙিন শিকেয় ঘরের মাঝে নতুন হাঁড়িপাতিল ও অন্যান্য জিনিস সারি সারি ভাবে ঝুলিয়ে রাখতো। আজ সে শিকা সত্যিই শিকাই উঠে গেছে।
@@ সভ্যতার উৎকর্ষ সাধনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন বাড়ি ঘর ও জিনিস পত্র রাখার বিভিন্ন জিনিস আবিষ্কার হবার ফলে শিকা সত্যিই শিকাই উঠে গেছে।

১০। হুক্কাঃ হুক্কা ছিল গ্রাম বাংলার অতি প্রাচীন একটি ঐতিহ্য। এটি গ্রামীণ কৃষক থেকে শুরু করে অবস্থা বান সকলের কাছে অতি পরিচিত ও অবসর
15

কাটানোর মাধ্যম। কাজের ফাঁকে বা গল্প গুজবের মাঝে বা অবসরে ধূমপান করার বিশেষ একটি মাধ্যম। হুক্কা ২ ধরনের দেখা যেত। প্রথম টা পিতলের বা রুপার তৈরি, দ্বিতীয়টা নারিকেলের মালার মালার( শক্ত খোল) আর সঙ্গে কাঠের দণ্ডের হুক্কা। বিত্তবান ও অভিজাত শ্রেণীরা ব্যবহার করতেন পিতল বা রুপার তৈরি হুক্কা আর নিন্মবিত্ত বা মধ্যবিত্তরা ধূমপায়ীরা ব্যবহার
16
করতেন নারিকেলের হুক্কা। আমি খুব ছোট থাকতে আমাদের গ্রামে এক বুড়ির( দাদী, তিনি অনেক আগে মারা গেছেন) কাছে দেখতাম এই হুক্কা। তিনি তা নিয়মিত খেতেন।
গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের প্রতীক হুক্কা কৃষকের ঘর থেকে ছেড়ে আজ স্থান নিয়েছে জাদুঘরে।
17

@@ আজ মেশিনে তৈরি বিড়ি ও সিগারেট এর কাছে হুক্কা পারেনি টিকতে।

১১। ঢেঁকি: গ্রাম বাংলার আর একটি প্রাচীন ঐতিহ্য হল ঢেঁকি। সেই প্রাচীন কাল হতে চাউল করতে, আটা করতে এবং বিভিন্ন মসলা গুঁড়া করতে ব্যবহার করা হত ঢেঁকি।
18

ঢেঁকি চাটা চাল………………।।
ঢেঁকি চাটা চালের ভাত কত দিন যে খাই নি আর শেষ কবে খেয়েছি মনে নেই।
@@ বর্তমানে ইঞ্জিন চালিত মেশিন ঢেঁকির স্থান দখল করে নিয়েছে।

১২।আলতা বড়ি: আলতা বড়ি মেয়েদের একপ্রকার প্রসাধনী। এর সাহায্যে মেয়েরা তাদের হাত, ঠোঁট, গাল ও পা লালা রঙ্গে রাঙ্গাতে। বিয়ের বাজারে লালা এই আলতা বড়ির নাম থকতো সবার উপরে।

@@ বর্তমান যুগে কৃত্রিম আলতা ও বিভিন্ন লিপিষ্টিক নেল পালিশ এই নিকটে মার খেয়ে একেবারে বিলুপ্ত এই আলতা বড়ি।

১৩। পিড়ি: বাড়ির মেহমান এলে বা বাড়ির বিভিন্ন কাজে বা কোথাও বসতে যে জিনিসটি এখনো গ্রামের মহিলারা ব্যবহার করে তা হল এই পিড়ি। এটি আগে তৈরি করা হত দুই ভাবে।
ক) মাটি দিয়ে ও
খ) কাঠ দিয়ে
20
তবে এখনো কাঠের পিড়ি ব্যবহার করা গরমে। আর এক প্রকার ব্যবহার হয় বর্তমানে রুটি বলতে।
@@ এখনো টিকে আছে এটি। তবে কম।

১৪। মাথাল বা মাথলঃ মাথাল গ্রামীণ কৃষকদের বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির হাত হতে বাঁচতে মাথায় দিয়ে বের হবার একটি বিশেষ ছাতা। বাঁশ ও শাল পাতার সাহায্যে এটি প্রস্তুত করা হয়। রোদ ও বৃষ্টি হতে রক্ষা পেতে গ্রামীণ কৃষকদের নিকট এটি স্মরণীয়। অনেকে এটি তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করতো।
21

@@ আধুনিক কালে এখনো এটি ব্যবহার হয়। যদিও ছাতা ও রেইন কোট এর নিকট হয়েছে এর হার।

22

১৫। নকশীকাঁথা: নকশীকাঁথা বাংলার ঐতিহ্য। পাখি, ফুল। লতা পাতা ও বিভিন্ন চিত্র একে মেয়েরা এককালে এক প্রকার আকর্ষণীয় কাঁথা তৈরি করতো। এই বিশেষ কাঁথাকে বলা হয় নকশী কাঁথা। নকশীকাঁথা সেলাই করা একদিকে যেমন মেয়েদের শিল্প নৈপুণ্যের পরিচয় বহন করত, তেমনি অবসর কাটানোর একটি মাধ্যম এই নকশীকাঁথা। সে সময় এটি ছিল শীত নিবারণে গরীবদের অনন্য বন্ধু। আজ নকশীকাঁথা ধনীদের বিলাস পণ্যে পরিণত হয়েছে। যদিও এটি পাওয়া খুব কঠিন।
23

@@ আধুনিক পোশাক , কাপড়ের ও কম্বলের জন্য ও সময়ের অভাবে গ্রামের মহিলারা আর এটি সেলাই করেন না। এক একটি নকশীকাঁথা সেলাই করতে ৬ মাস হতে ১ বছর লাগে।

১৬। ডুলি: বাঁশ ও পাটের দড়ি দিয়ে নির্মিত এক প্রকার ঝুলন্ত আরামদায়ক পরিবহণ। ডুলি দু জন বেহারা কাঁধে করে বহন করত। গ্রামের নববধূরা বাবার বাড়ি নায়ের করতে যেতে বা বাবার বাড়ি হতে স্বামীয়ে বাড়ি যেত ডুলিতে চড়ে। বিয়ের দিন কনের সহযাত্রী বা আচল-দি হয়ে কনের নানী বা দাদী ডুলিতে চড়ে বরের বাড়ি আসতো।

@@ আজ আর নেই সেই বেহারা আর ডুলি। সব কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে।

১৭। কলুর ঘানি:কলুর বলদ বাগধারার অর্থ কি সকলেই জানেন। আর এই কলুর ঘানি হতেই কলুর বলদ কথাটির উদ্ভব। কলুর ঘানি বলতে তৈলবীজ( সরিষা, তিল, তিসি……………………… নারিকেল) হতে তেল উৎপাদন করার একটা সরল যন্ত্র। ৭-১০ ফুট লম্বা বাঁশ দিয়ে ও কাঠের গুড়ির
44

সহযোগে ঘানি তৈরি করা হতো। এবং একটি গরু বা বলদ বা গাধা বা ঘোড়া দিয়ে একে টানানো হতো। একপ্রকার পেশাজীবী ঘান ভাঙ্গিয়ে তেল উৎপন্ন করে গ্রামে গ্রামে ফেরি করতো। আর এদের বলা হত কলু।
41
আমার মনে আছে অনেক ছোটতে আমাদের এলাকার এক গ্রামে বাবার সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে এই কলুর ঘানি দেখেছিলাম।

@@ আজ যান্ত্রিক তেল ভাঙ্গা মেশিনের আগমনে ঘানি আজ প্রায় বিলুপ্ত।

১৯। পাতি কুপ ও ইঁদারাঃ গ্রামের মানুষের সুপেয় বা খাবার পানির সবচেয়ে ভাল মাধ্যম ছিল এখনো কিছু কিছু গ্রামে দেখা যায় কুপ বা ইন্দ্রা বা ইঁদারা ও পাতকুয়া। ১০-১৫ ফুট গোল গর্ত করে প্রায় ৫০-৬০ ফুট নিচ পর্যন্ত ( বরেন্দ্র অঞ্চলের হিসাব) মাটি খুড়ে কুপ বা ইন্দ্রা বা ও পাতকুয়া তৈরি করা হত। মাটির নিচের ঝর্না ছিল এই কুপের পানির প্রধান উৎস। পাতি কুপ ও ইঁদারার মধ্যে পার্থক্য হল , ইঁদারার নিচ থেকে উপর পর্যন্ত ইট বা রিং( সিমেন্ট বালি দিয়ে তৈরি গোল কাঠামো) দিয়ে বাঁধায় করা হত আর পাতি কুপ বাঁধায় করা হত না।

@@ এই তো নলকূপ আসার আগে আমাদের যাদের গ্রামে বাড়ি তারা প্রত্যেকে কুপ বা ইন্দ্রা বা ইঁদারা ও পাতকুয়ার পানি খেয়েছি। তবে এখন অনেক কমে গেছে এটি।

২০। পাতার বিড়ি: শাল পাতা ও আলাপাত বা তামাক পাতা সহযোগে এক ধরনের বিড়ি আমাদের দেশে প্রচলিত ছিল। এই বিড়ি ছিল দামে সস্তা ও সহজে বানিয়ে ধূমপান করা যেত। আমি নিজেও দু এক টান মেরেছি। তবে কাশি হলে শুধু শাল পাতার বিড়ি ধুয়া খুব উপকারী( সত্যি মিথ্যা জানিনা গ্রামে শুনেছি, এবং দু একবার টান ও মেরেছি)।
43

@@ আজ মেশিনে তৈরি বিড়ি ও সিগারেট এর কাছে পাতার বিড়ি টিকতে পারেনি। তবে আমাদের নওগাঁ এলাকায় সাঁওতালরা কেও কেও এই বিড়ি খায়।

২১। উরুন-গাইন/ডাইল-চিয়াঃ গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী উরুন-গাইন/ডাইল-চিয়া আজ বিলুপ্তির পথে। গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী গ্রামীন বধূদের পছন্দের উরুন-গাইন/ডাইল-চিয়া ও ঢেঁকির ঢুং-ঢাং শব্দ আর শোনা যায় না। কালের বিবর্তনে এখন বিলুপ্তি প্রায় এ দুটি সরল যন্ত্র। আজ থেকে ২০-২৫ বছর পূর্বেকার কথা গ্রামীণ জনপদে গৃহবধূরা উরুন-গাইন /ডাইল-চিয়া ও ঢেঁকির মাধ্যমে ধান ভাংতো, চালের আঠা বানিয়ে নানান ধরনের পিঠা-পুলি বানাতো। এখন ওইসব গ্রামীণ জনপদে আর দেখা মিলছে না উরুন-গাইন /ডাইল-চিয়া ও ঢেঁকির । ঢেঁকি ও উরুন-গাইন দুটিই সরল যন্ত্র। এ দুই এর কাজও এক। বর্তমানে ঢেঁকি দেখা গেলেও দেখা মিলছে না উরুন-গাইনের।
>>এখনকার প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা আর কিছুদিন পর উরুন-গাইন/ডাইল-চিয়া কি জিনিস এবং এ দিয়ে কি কাজ হতো তা জানবে না ।
55
>>আগে গ্রামের মানুষেরা বড় বড় গাছ-পালা কাটার পর চিন্তা করতো ওই গাছের মুড়াটা তুলে একটা ভালো মানের উরুন /ডাইল বানাতো এবং ভালো শক্ত সোজা ডাল থেকে একটা গাইন/চিয়া তৈরী করতো।

>>আজ আর এসব চোখে পড়ে না। আগের দিনে বিয়ে-সাদী হলে মেয়ের বাপের বাড়ী থেকে স্বামীর বাড়িতে উরুন-গাইন /ডাইল-চিয়া দেয়া হতো এবং ওইগুলো দিয়ে গৃহবধূরা ধান ভাঙ্গিয়ে চাউল এবং চাউলের আঠা বানিয়ে পিঠা-পুলি তৈয়ার করতো।

আর এখনকার গ্রামীণ বউ-ঝিঁরা ধান ভাংগাতো দূরের কথা চাউলের আঠা তৈয়ার করার জন্য বিদ্যুৎ এর মেশিনে নিয়ে যায়। এখন সবকিছু বিদ্যুতের সাহায্যে চালিত মেশিনে করা হয়। তাই উরুন-গাইনের প্রয়োজন নেই। শীত মওসুম এবং পার্বনগুলোতে দিন-রাতে গ্রামীণ বধূদের উরুন-গাইন/ডাইল-চিয়া -এর ঢুং-ঢাং শব্দ এখন আর নেই বললেই চলে। সবমিলিয়ে গ্রাম বাংলার সেই ঐতিহ্যবাহী উরুন-গাইন/ডাইল-চিয়া এখন বিলুপ্তির পথে।
তেমনি ঢেঁকি চাঁটা চাল ও আর করে না গৃহ বধূরা। সব যে বিদ্যুৎ মেশিনেই করা হয় অল্প সময়ে অল্প শ্রমে।

@@ বর্তমানে ইঞ্জিন চালিত মেশিন উরুন-গাইন/ডাইল-চিয়ার স্থান দখল করে নিয়েছে।

২২। “খেজুর পাতার পাটি”
54

হাজার বছরের চলে আসা বাঙ্গালিদের কিছু ঐতিহ্যবাহী জিনিস যা আমরা সেই প্রাচীন কাল হতে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করে আসছি। এই ঐতিহ্যবাহী জিনিস গুলি হাজার বছরের বাংলার সংস্কৃতির এক একটি উপাদান। আজ এই আধুনিক যুগে আধুনিক পণ্যের কাছে , আধুনিক কলা কৌশলের নিকট মার খেয়ে আস্তে আস্তে বিলুপ্তির পথে। আসুন দেখি খেজুর পাতার পাটির সঙ্গে কে কে পরিচিত আছেন।
এক সময় ছিল যখন বিশেষ করে গ্রামবাংলায় খেজুর পাতার পাটির বিকল্প কোন চিন্তাই করা যেত না। তখন গ্রামবাংলার প্রতিটি বাড়ী- ঘরে ব্যবহার করা হতো গৃহস্থালি বিভিন্ন কাজে খেজুর পাতার পাটি । কিন্তু বর্তমানে আধুনিকতার ছেয়ায় তা আর কোন বাড়ীতে বলতে গেলে দেখাই যায়না।
আমাদের গ্রামের নিন্ম বিত্ত ও উচ্চ বিত্ত সব পরিবারের মহিলারা তাদের ঘরে শোবার জন্য বা বারান্দায় বিছানো বা আমাদের শহুরে বাড়ির অনুকরণে ঘরের কার্পেট এর পরিবর্তে সবচেয়ে জনপ্রিয় কমন জিনিসটি হল খেজুরের পাতার পাটি। এটি আর একটি গ্রামীণ ঐতিহ্যের অংশ। এই পাটি এ ছাড়াও ধান গম আটা রৌদ্রে শুকাতে দেবার কাজেও ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া হাজার রকম কাজে এটি ব্যবহার করা হয়। আগে মসজিদে দেখতাম খেজুর পাতার পাটি বিছিয়ে নামাজ আদায় করা হত। গ্রামের মহিলারা মসজিদের জন্য দান হিসেবে বানিয়ে দিতেন খেজুর পাতার পাটি ও জায়নামাজ। এই তো বছর ১০-১২ আগে আমার বাড়িতে আমার বোনরা বানাতেন সুদৃশ্য খেজুর পাতার পাটি। এই পাটিকে বলা গ্রামের শীতল পাটি।
@@ তৈরির প্রক্রিয়া: প্রথমে খেজুর গাছের ডাল কেটে রৌদ্রে উত্তম রূপে শুকাতে হবে। এর পর ডাল হতে পাতা গুলি ছিঁড়ে নিতে হবে। এর পর ঐ শুকনো পাতা গুলির গোঁড়ার দিকে বোটার অংশ এবং সামনের ছুঁচালো কাটার অংশ কেটে ফেলে দিতে হবে। এর পর পাতাকে দু ভাগে ভাগ করতে হবে। এই দুই ভাগ কে প্রয়োজন মত চিকন করে পাটি বুননের জন্য পাতা হিসেবে তৈরি করা হয়। এখন পাটির বুননে জন্য দক্ষ একজনের কাছ হতে এর প্রাথমিক নকশা বা শুরুর জাল তৈরি করে নিতে হয়। এর পর শুধু পাতার পর পাতা জোড়া দিয়ে এক একটা লম্বা ৪-৫ আঙ্গুল প্রস্থের সাপের মত লম্বা সীট তৈরি করা হয়।
51
কেও কেও এই সীটের মধ্যে লাল, নীল রঙ করা পাতা যুক্ত করে পাটি বুনেন। এর এজন্য যে পাতাকে যে রঙ এ রাঙ্গাতে চান তাকে প্রথমে বাজার হতে সস্তা রঙ কিনে এনে প্রথমে পানিতে মিশিয়ে আগুনে জ্বাল দিয়ে গরম করা হয়, এবার ঐ পানিতে প্রয়োজনীয় পাতা (এই দুই ভাগ কে প্রয়োজন মত চিকন করে পাটি বুননের জন্য তৈরি করা পাতা কে।) কে ডুবিয়ে একটু সিদ্ধ করে নিতে হবে। এতে রঙ গুলি ঐ পাতায় ঢুকে যাবে। এখন ঐ পাতাকে উত্তম রূপে রৌদ্রে শুকিয়ে নিতে হবে। এবার পাটির সীটের মাঝে মাঝে লাল বা সবুজ পাতা দিয়ে পাটি বুনানো হয়। এই পাটি গুলি দেখতে এত সুন্দর উন্নত মানের কার্পেট এর কাছে নস্যি। এই লম্বা সীট গুলি একটা পাটির মত তৈরি হলে এগুলিকে সাপের মত গোল করে জড়িয়ে রাখা হয়। লম্বা সীট হতে একটা একটা পার্ট কেটে নেওয়া হয়। যত লম্বা পাটি আপনি চান সেই মত দৈর্ঘ্যে এক একটি কেটে নিয়ে এই সীট পার্ট গুলি আবার একটার সঙ্গে একটা জুড়ে দেওয়া হয় পাতা দিয়ে। এই জোড়া গুলি এমন মসৃণ ভাবে দেওয়া হয় কি বলব। এ যেন একটা শিল্প। পার্ট পার্ট জোড়া দিয়ে এবার দৈর্ঘ্যের দিকে কাটা মাথা মুড়িয়ে নিচের দিকে সেলাই করা হয় সুতা দিয়ে। এভাবে তৈরি হয়ে গেল একটা পাটি। এবার কি কাজে ব্যবহার করবেন ঠিক করে ব্যবহার করুন প্রয়োজন মত।
তবে এখন খুব কম তৈরি হয় এই পাটি। গ্রামে গেলে মাঝে মাঝে দেখি।

গ্রামের মহিলারা অবসরে বুনিয়ে এক একটা পাটি তৈরি করতে সময় লাগে প্রায় ৪-৬ মাস। আগে এক একটা পাটি ৫০-২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রয় করতেন এ সব মহিলারা। এ ক্ষুদ্র আয় প্রচেষ্টা পরিবারকে দিতে চেষ্টা করতেন একটু সচ্ছলতা।
@@ কিন্তু এই পাটিটি অনেক অঞ্চলে হারিয়ে যেতে বসেছে।

আরও এমন হাজারো গ্রামীণ ঐতিহ্য আজ আমরা হারাতে বসেছি।
জাতা—- বা যাতি
77
ডোল—
৯৯
ধান/চাল রাখার কুটির
91
কুড়ে ঘর
87

পানি সেঁচের জাঁত বা ডোঙ্গা

কাগজের তৈরি ডালি

২,১৩৯ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
আমি খুব সাধারণ।
সর্বমোট পোস্ট: ১৩৩ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ৯৭৪ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৪-০৮-২২ ১৬:৩০:৪৭ মিনিটে
banner

১১ টি মন্তব্য

  1. ছাইফুল হুদা ছিদ্দিকী মন্তব্যে বলেছেন:

    এইসব ঐতিহ্যগুলো হারিয়ে গেছে। অসাধারন লিখেছেন আমাদের তথা বাংলার এইসব ঐতিহ্য নিয়ে। আপনার লেখা ও ছবি অসাধারন। আমাদের নতুন প্রজন্ম আপনার এই লেখা পড়া উচিৎ। অনেক ধন্যবাদ।

  2. ব্যবস্থাপনা সম্পাদক মন্তব্যে বলেছেন:

    অসাধারন একটা লেখা। আপনি লেখাটি জমা দিতে পারেন। লেখাটি যদি আর কোথাও প্রকাশ না হয়ে থাকে তবে, আমরা আমাদের প্রিন্ট প্রকাশনাতে দেবার আগ্রহ করছি। ধন্যবাদ আপনাকে।

    • গোলাম মাওলা আকাশ মন্তব্যে বলেছেন:

      লিখাটা আগে প্রকাশ হয়েছে। ছবি সহ নতুন করে প্রকাশ করা হয়েছে। পরে কিছু সংজোজন হয়েছে,

      যাতি, ডোল , পানি সেঁচের জাঁত বা ডোঙ্গা

      কাগজের তৈরি ডালি, ধান রাখার কুটির এ গুলি নতুন করে লিখছি। সংগ্রহ চলছে। পান খাবার ডুগডুগি, পানের বাটা, পিতলের ও কাসার প্লেট, গ্লাস, কদুর নুনের বাটি, মাটির সনকি। খড়ের পালা।টপর–গরুর গাড়ির উপরে। ইত্যাদি

      আপনার আগ্রহের জন্য ধন্যবাদ।

      • গোলাম মাওলা আকাশ মন্তব্যে বলেছেন:

        কিছু ছবি বাড়ি গেলে তুলব—- কুটির, ডুগডুগি, পালা, পানি সেচের জাত, টপর, আরও সমৃদ্ধ হবে লিখা। লিখাটা ১৩ সালে প্রকাশ করেছিলাম, ফেসবুকে, ওএকটি ব্লগে।তখন ছবি দেওয়া হয়েছিল না। কিছুদিন পরেএকটি অনলাইন পত্রিকায় চুরি করে প্রকাশ করে। তাই নতুন করে প্রকাশ করলাম।

  3. আর এন মিলি মন্তব্যে বলেছেন:

    অনেক কিছু হারিয়ে গেলেও ঢেঁকি ,গরুর গাড়ি হুক্কা শিকা আর নকশি কাঁথা এখনও আছে।আমার জানা মতে নকশি কাঁথা বিদেশেও পাঠানো হয়।আড়ং এ একেকটা নকশি কাঁথা বেশ দামে বিক্রি হয় ।

  4. সাঈদুল আরেফীন মন্তব্যে বলেছেন:

    সময়কে উপজীব্য করে দারুণ একটি লেখা। প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা জানেনা ও বোঝেনা আমাদের ঐতিহ্য শেকড়ে কী আছে। ছোট বড়ো সবাইকে সত্যিই ভাবনার জগতে নিয়ে গেছে এই লেখা । এই ধরণের লেখা যতোই প্রকাশ পাবে ততোই আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য আমাদের হয়ে ধরা দেবে নতুন ভাবে।
    ধন্যবাদ শুধু ধন্যবাদই নয় লেখক সত্যিকার অর্থেই অভিনন্দন পাবার যোগ্য

  5. এই মেঘ এই রোদ্দুর মন্তব্যে বলেছেন:

    সুন্দর লেখা কিন্তু আপ্নেরে কইছিলাম যে লেখা পর্বে ভাগ করে দিবেন। দিলেই ত হবে না পাঠকের সুবিধাও দেখতে হবে তাই না?

    ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top